ফারগানা আর কাসঘরের মাঝখানে পর্বতশ্রেণীতে আন্দেজানের জঙ্গল অঞ্চলে এক উপজাতিদল থাকে। তারা 'জাগ্রে' সম্প্রদায়ের লোক। দুর্গম অঞ্চলে থাকে বলে তারা রাজস্ব দিতে চায় না। কাশিম বেগের নেতৃত্বে একদল সৈন্যকে সেখানে পাঠালাম। জাগ্রেরা এক ধরণের পাহাড়ি ষাঁড় পালন করে। তাছাড়া প্রচুর ভেড়া এবং প্রচুর দুরন্ত ঘোড়া আছে তাদের। উদ্দেশ্য - যদি কিছু লুঠ করে আনা যায়। কাশেম বেগ প্রায় কুড়ি হাজার ভেড়া আর পনের হাজার ঘোড়া লুঠ করে নিয়ে এল। সেগুলো আমার সৈন্যদের মধ্যে বিলিয়ে দিলাম।
**************************************************************
সুলতান আহমেদের মেয়ে আইষা বেগমের সঙ্গে আমার নিকাহর কথা আব্বা ও চাচার উপস্থিতিতেই ঠিক করা হয়েছিল। খোজেন্দে পৌঁছে শাবান মাসে তাকে বিয়ে করি। বিবাহিত জীবনের প্রথমদিকে তার প্রতি আমার ভালোবাসা খুব গভীর হলেও লজ্জায় তার কাছে সবসময় যেতে পারিনি। পনের-বিশ দিন পরপর তার কাছে যেতাম। পরে অবশ্য আমার ভালোবাসায় মন্দা পড়ে গেল। ফলে আম্মি রেগে গিয়ে বকাবকি করে জোর করে আমাকে তার কাছে পাঠাতে লাগলেন। আমিও অপরাধীর মতো ত্রিশ-চল্লিশ দিন পরপরে তার কাছে যেতাম।
প্রায় এই রকম সময়ে শিবিরের বাজারের একটি ছেলের সঙ্গে আমার আলাপ হয়। তার নামও বাবুরি। আমার নামের সঙ্গে অদ্ভুত মিল ছিল। তার প্রতি আমি অদ্ভুত আকর্ষণ অনুভব করি। এর আগে আমি কারো প্রতি উগ্র আকর্ষণ অনুভব করিনি। বলতে গেলে, এরকম উগ্র কামনার অভিজ্ঞতা আমার আগে কখনো হয়নি, এমনকী কারো কাছে শুনিওনি। এই রকম অবস্থায় পড়ে ফারসিতে কয়েকটি কবিতা লিখি, তার মধ্যে একটি -
'আমার মতো মুগ্ধ প্রেমিক কে আছে আর
প্রেমের আগুনে জ্বলে যায় যার হৃদয় ভার
আমার মতো কে বয় এত অপমান-দায়
নেই কোনো মায়া, শুধু আছে ঘৃণা, প্রাণ যে যায়!'
**************************************************************
সকালবেলাই সৈন্যদের অস্ত্রশস্ত্রে সাজিয়ে দেওয়া হলো, ঘোড়াদের জিন-বলগা চাপিয়ে তৈরি করা হলো। তারপর সামনে-পিছনে-ডাইনে-বাঁয়ে সৈন্য সাজিয়ে যুদ্ধের জন্য বেরিয়ে পড়লাম। শেয়বানি খাঁর সৈন্যও তৈরি ছিল। তারাও এগিয়ে এল। আমরা যখন সামনাসামনি হলাম, তখন শত্রুপক্ষের সৈন্যরা আমাদের বাঁদিক দিয়ে পাশ কাটিয়ে গিয়ে পিছন দিয়ে ঘিরে ফেলে। আমি তাদের সামনা সামনি হওয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়াতে নির্দেশ দিই। কিন্তু হঠাৎ এভাবে দিক পরিবর্তনের ফলে আমার সামনের দিকের সেরা সৈন্যরা পিছনে পড়ে যায় এবং তারা কেউই আমার সঙ্গে আসতে পারে না। তবুও আমার সৈন্যরা এমন বীরের মতো যুদ্ধ করে যে শত্রুপক্ষের সৈন্যরা বিপর্যস্ত হয়ে পিছিয়ে যায়। এমনকী শেয়বানি খাঁর একজন অভিজ্ঞ সেনাপতি তাকে গিয়ে জানায় যে তখনি পিছিয়ে না গেলে সবই শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু সে তাতে সম্মত না হয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যায়। শত্রুপক্ষের ডান সারির সৈন্যরা আমাদের বামদিকের সৈন্যদের পর্যুদস্ত করে পিছন থেকে আক্রমণ করে। আমাদের সামনের সারির সৈন্যরা যেহেতু একদিকে পড়ে যায়, শত্রুপক্ষের সৈন্যরা তীর ছুঁড়ে আমাদের ব্যতিব্যস্ত করে তুলল। যে সব মোগল সৈন্য আমাদের সাহায্য করার জন্য আনা হয়েছিল তারা যুদ্ধ না করে ঘোড়া থেকে নেমে আমাদের লোকদেরই লুঠপাঠ করতে শুরু করল। এই প্রথম যে তারা এরকম করল তা নয়, এটা তাদের স্বভাব। যদি তারা কোনো যুদ্ধে যেতে, সঙ্গে সঙ্গে তারা শত্রুপক্ষের সৈন্যদের লুঠ করতে শুরু করে। আর যদি হারে, তবে নিজেদের পক্ষের সৈন্যদের জিনিসপত্র লুঠ করে যা পারে তাই নিয়ে পালায়।
**************************************************************
সর্বশক্তিমান আল্লা আমাদের ইচ্ছা পূরণ করলেন। আফগানরা আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বার জন্য পর্বত ছেড়ে বিচ্ছিন্ন পাহাড়ে জমায়েত হলো। আমার এক সৈন্যদলকে পর্বত এবং ছোট পাহাড়ের মধ্যে যে জমি আছে, সেইটা দখল করতে আগেভাগেই পাঠিয়ে দিলাম। অবশিষ্ট সৈন্যদলকে পাহাড়ে আক্রমণ চালিয়ে এগিয়ে গিয়ে আফগানদের ঔদ্ধত্যের শাস্তি দেওয়ার জন্য নির্দেশ দিলাম।
আমার সৈন্যরা এগিয়ে যেতেই আফগানরা প্রমাদ গুনল। তারা যে যুদ্ধে এঁটে উঠতে পারবে না এটা বেশ বুঝতে পারল। ত্বরিৎগতিতে সৈন্যরা তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের এক শ কি দেড় শ জনকে ধরাশায়ী করে ফেলল। এদের মধ্যে কয়েকজনকে জীবন্তই আমার কাছে ধরে নিয়ে এল, কিন্তু বেশির ভাগেরই কাটা মুন্ডু আমার সামনে হাজির করা হলো। যুদ্ধে পরাস্ত হলে আফগানরা তাদের বিজয়ী শত্রুর সামনে দাঁতে ঘাস নিয়ে এসে দাঁড়ায়। বোধ হয় তারা বলতে চায় যে আমি তোমার আশ্রিত ষাঁড়। আফগানদের এই রীতি আমি প্রথম দেখলাম। আফগানরা যখন দেখল যে আর সংঘর্ষ চালানো সম্ভব হবে না - তখন তারা দাঁতে ঘাস নিয়ে আমাদের দিকে এগিয়ে এল। যে সব আফগানকে জীবন্ত ধরে আনা হয় তাদের শিরচ্ছেদ করার আদেশ দিলাম। আমাদের পরবর্তী বিশ্রামের জায়গায় ওই সব ছিন্ন মুণ্ড দিয়ে একটা চূড়া করা হলো।
পরদিন সকালে এগিয়ে গিয়ে হাঙ্গুতে শিবির ফেলা হলো। সেদিককার আফগানরা একটা পাহাড়কে সুরক্ষিত করে একটা 'সাঙ্গরে' রূপান্তরিত করে ফেলেছে। আমি কাবুলে এসেই প্রথমে এই 'সাঙ্গর' কথাটা শুনি। একটা বিচ্ছিন্ন পাহাড়কে কোনো আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য যদি সুরক্ষিত করা হয় - সেটাকেই সাঙ্গর বলে। আমার সৈন্যরা এই 'সাঙ্গরের' কাছে আসা মাত্র আক্রমণ চালায়। সাঙ্গরটিকে বিধ্বস্ত করে তা অধিকার করবার পর তারা দু' শ অবাধ্য আফগানকে ধরে এনে তাদের শিরচ্ছেদ করে। এখানেও নরমুণ্ডের আর একটা চূড়া তৈরি করা হয়।
বানু প্রদেশে অবতরণ করে সংবাদ পাওয়া গেল যে সমতলবাসী উপজাতিরা উত্তর দিকের পাহাড়গুলোতে সাঙ্গর গড়ে তুলেছে। জাহাঙ্গীর মির্জার অধীনে একদল সৈন্য সেই দিকে পাঠাই। যে 'সাঙ্গর'এর বিরুদ্ধে অভিযান চালায় সেটা 'কিভি' উপজাতিদের। মুহূর্তের মধ্যে সেটা অধিকার করা হলো। তারপর শুরু হলো হত্যাকাণ্ড। অনেকগুলো কাটা মুন্ডু আমার শিবিরে নিয়ে এলো। সৈন্যরা এই অভিযানে নানা রকমের অনেক কাপড় লুঠ করে নেয়। বানুতে মাথার খুলি স্তূপ করে সাজিয়ে রাখা হয়।
**************************************************************একদল সৈন্যকে গাজি খাঁকে অনুসরণ করে বন্দি করার জন্য পাঠিয়ে আমি নিশ্চিত হয়ে রেকাবে পা দিয়ে এবং বলগা হাতে নিয়ে লোদি আফগান বংশের সুলতান বাহলুলের নাতি এবং সুলতান সিকান্দরের ছেলে সুলতান ইব্রাহিমের বিরুদ্ধে যুদ্ধের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ি। এই সময়ে হিন্দুস্তান সাম্রাজ্য ও দিল্লীর সিংহাসন সুলতান ইব্রাহিমের দখলে ছিল। তাঁর অধীনে এক লক্ষ সৈন্য এবং তাঁর ও তাঁর আমিরদের মোট এক হাজার হাতি ছিল। মিলওয়াত দুর্গ থেকে যে সোনা এবং মূল্যবান জিনিসপত্র পাওয়া গিয়েছিল তার অধিকাংশই বাল্খ ও কাবুলে আমার আত্মীয়, বন্ধু-বান্ধব, ছেলে-মেয়ে এবং আমার ওপর নির্ভরশীলদের কাছে উপহার হিসাবে পাঠিয়ে দিই।
**************************************************************
গোয়ালিয়রের রাজা বিক্রমজিৎ একজন হিন্দু। হিন্দু রাজারা এই রাজ্যে একশ বছরের ওপর শাসন করে এসেছে। যে যুদ্ধে সুলতান ইব্রাহিম পরাজিত হয় সেই যুদ্ধেই বিক্রমজিৎকেও নরকে পাঠানো হয়। বিক্রমজিতের পরিবারবর্গ এবং তার গোষ্ঠীর সর্দাররা তখন আগ্রাতেই ছিল। হুমায়ূন আগ্রায় পৌঁছানোর পরই বিক্রমজিতের লোকজন পালাবার চেষ্টা করে, কিন্তু হুমায়ূন যে সব লোককে সতর্ক নজর রাখার জন্য নিযুক্ত করেছিল তারা তাদের আটক করে। কিন্তু হুমায়ুন তাদের ধনরত্ন লুঠ করার আদেশ দেয়নি। তারা স্বেচ্ছায় হুমায়ূনকে সৌহার্দ্যের প্রস্তাব জানিয়ে অনেকগুলো রত্ন ও দামি পাথর উপহার দেয়। এই সব রত্নের মধ্যে একটি প্রসিদ্ধ হীরক ছিল - যার নাম কোহিনূর। সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি বহুমূল্য হীরক সংগ্রহ করেছিলেন। এটা এমন মূল্যবান যে একজন হীরার জহুরি এর দাম ঠিক করেছিলেন - পৃথিবীতে দৈনিক যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়, তার অর্ধেক পরিমাণ অর্থ। এর ওজন প্রায় তিনশ কুড়ি রতি। আমি আগ্রায় পৌঁছালে হুমায়ুন আমাকে সেই হীরক উপঢৌকন দেয় এবং আমিও আবার সেটাকে উপহার হিসাবে তাকে ফিরিয়ে দিই।
**************************************************************
No comments:
Post a Comment