Thursday, 29 January 2026

আত্মজীবনী - সুভাষচন্দ্র বসু

এক সময়ে ব্রাহ্মসমাজই যে দেশের সব রকম প্রগতিশীল আন্দোলনের কর্ণধার ছিল যে কথা সকলেই স্বীকার করবে। প্রথম থেকেই ব্রাহ্মসমাজের দৃষ্টিভঙ্গীতে পাশ্চাত্য বিজ্ঞান ও দর্শনের প্রভাব পড়েছিল এবং সদ্যপ্রতিষ্ঠিত ব্রিটিশ সরকার যখন স্থির করে উঠতে পারছিলেন না যে এদেশে তাঁরা সম্পূর্ণ দেশীয় শিক্ষাব্যবস্থাই সমর্থন করবেন, না পাশ্চাত্য সংস্কৃতি প্রচার করবেন, তখন রাজা রামমোহন রায় মুক্তকণ্ঠে পাশ্চাত্য সভ্যতার স্বপক্ষে রায় দেন। তাঁর আদর্শ টমাস ব্যাবিংটন মেকলেকে কতখানি প্রভাবান্বিত করেছিল মেকলের বিখ্যাত 'মিনিট অন এডুকেশন'এ তার পরিচয় পাওয়া যায়। রামমোহন রায়ের আদর্শকেই সরকারের পক্ষ থেকে গ্রহণ করা হয়। রামমোহন তাঁর গভীর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে বহুদিন আগেই বুঝেছিলেন পাশ্চাত্য বিজ্ঞান ও দর্শনকে গ্রহণ না করলে দেশের উন্নতি অসম্ভব।


অবশ্য এই সাংস্কৃতিক বিপ্লব শুধু যে ব্রাহ্মসমাজেই নিবদ্ধ ছিল তা নয়। যাঁরা ব্রাহ্মদের সমাজদ্রোহী ও ধর্মবিরোধী বলে মনে করতেন তাঁরাও স্বদেশের প্রাচীন সংস্কৃতিকে পুনরুজ্জীবিত করবার জন্য উৎসুক হয়ে উঠেছিলেন। পাশ্চাত্য সংস্কৃতির সঙ্গে সমতালে চলবার জন্য ব্রাহ্ম এবং অন্যান্য প্রগতিপন্থী সম্প্রদায় যখন পাশ্চাত্য সভ্যতার সার জিনিসগুলি আহরণ করতে ব্যস্ত তখন অধিকতর গোঁড়া সম্প্রদায়ের লোকেরা হিন্দুসমাজের মহিমা কীর্তন করতে ব্যগ্র হয়ে পড়লেন এবং প্রচার করতে লাগলেন হিন্দুসমাজে সবই অভ্রান্ত। এমন কি তাঁরা এও দাবি করলেন যে পাশ্চাত্য সভ্যতা যেসব নতুন নতুন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার নিয়ে আজ গর্ব করছে সেসবই ভারতের প্রাচীন মুনিঋষিরা বহুদিন আগেই আবিষ্কার করে গেছেন। এইভাবে পাশ্চাত্য সভ্যতার সঙ্গে সংঘর্ষের ফলে অত্যন্ত গোঁড়া সম্প্রদায়ও কর্মতৎপর হয়ে উঠেছিল।

***************************************************

সব দিক বিচার করে আজকের দিনে এই ধরনের স্কুলে ভারতীয় ছেলেমেয়েদের শিক্ষালাভের আমি পক্ষপাতী নই। বিদেশী আবহাওয়ার সঙ্গে তারা কখনোই খাপ খাবে না, পদে পদে অশান্তি ভোগ করবে; বিশেষ করে যদি কেউ একটু চিন্তাশীল হয় তবে তো কথাই নেই। অনেক অভিজাত পরিবারে ছেলেদের বিলেতে পাবলিক স্কুলে রেখে শিক্ষা দেবার রীতি আজও চলে আসছে। এ ব্যবস্থাও আমার মোটেই ভালো মনে হয় নি। একই কারণে বিলিতী ছাঁচে গড়া এবং ইংরেজ শিক্ষক পরিচালিত ভারতীয় স্কুলের পরিকল্পনাও আমি অনুমোদন করি না। অনেক ছেলে হয়তো এই বিজাতীয় পরিবেশের সঙ্গে নিজেদের বেশ মানিয়ে নিতে পারে, কিন্তু যারা একটু চিন্তাশীল তাদের পক্ষে এখানকার পরিবেশ মোটেই অনুকূল নয়, একদিন না একদিন তাদের মন বিদ্রোহী হয়ে উঠবেই। এসব কথা ছেড়ে দিলেও এই শিক্ষাব্যবস্থার বিরুদ্ধে আরো বড় আপত্তি এই যে এতে ভারতীয় পরিবেশ, ভারতীয় বৈশিষ্ট্য এবং ভারতীয় ঐতিহ্য ও সমাজনীতিকে সম্পূর্ণ অবহেলা করা হত। অল্পবয়সের ছেলেদের উপর জোর করে ইংরিজি শিক্ষা চাপালেই প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সভ্যতার সমন্বয় হয় না। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে ভালোমন্দ বিচার করবার জ্ঞান হলে পর ছেলেদের পাশ্চাত্য দেশে খাঁটি পাশ্চাত্য আবহাওয়ায় কিছুদিন রাখলে তবে তারা পাশ্চাত্য সভ্যতার ভালো জিনিসটুকু গ্রহণ করতে পারবে।

***************************************************

পার্থিব ভোগসুখ বর্জন করে কোনো মহৎ উদ্দেশ্যে জীবন উৎসর্গ করার সিদ্ধান্তে পৌঁছতে আমাকে মোটেই বেগ পেতে হয়নি। এই রকম জীবনের উপযুক্ত করে শরীর মনকে গড়ে তুলতেও আমাকে খুব বেশি কষ্ট করতে হয়নি। কিন্তু গোলমাল বেধেছিল যৌনপ্রবৃত্তি দমন করার বেলায় - মানুষের স্বাভাবিক একটি প্রবৃত্তিকে দমন করার বেলায় - মানুষের স্বাভাবিক একটি প্রবৃত্তিকে দমন করা কি মুখের কথা! কী প্রাণান্তকর দ্বন্দ্ব যে আমার সারাজীবন ধরে চলেছে তা বোঝানো যায় না।


যৌনসম্ভোগ বর্জন তো বটেই, যৌনকামনা দমন করাও আমার মতে তেমন দুঃসাধ্য নয়। কিন্তু আমাদের দেশের যোগী ঋষিদের মত আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য শুধু এই যথেষ্ট নয়। যে মানসিক আবেগ এবং সহজপ্রবৃত্তি থেকে যৌনকামনার উদ্ভব তাদের এমনভাবে নিয়ন্ত্রিত করতে হবে যাতে সবরকম যৌন আকর্ষণের বিলুপ্তি ঘটে - শরীর মন যৌনচেতনার ঊর্দ্ধে ওঠে। কিন্তু এ কি কখনো সম্ভব, না এ শুধু কষ্টকল্পনা? রামকৃষ্ণ বলে গেছে, এ সম্ভব, এবং শরীর মনকে এভাবে পবিত্র না করলে আধ্যাত্মিক উন্নতির চরমে পৌঁছান যায় না। শোনা যায় অনেকেই রামকৃষ্ণের চরিত্রবল এবং আধ্যাত্মিক সিদ্ধি নানাভাবে পরীক্ষা করবার চেষ্টা করেছিলেন - কিন্তু যতবারই তাঁকে সুন্দরী স্ত্রীলোকদের মাঝখানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে দেখা গেছে নিষ্পাপ শিশুর মতোই তিনি তাদের প্রতি নির্বিকার, নিরাসক্ত ব্যবহার করেছেন। এসব ক্ষেত্রে তাঁর মনে সম্পূর্ণ অযৌনপ্রকৃতির প্রতিক্রিয়া দেখা যেত। রামকৃষ্ণ সর্বদা বলতেন সাধনার পথে সবচেয়ে বড় বিঘ্ন হচ্ছে কামিনী এবং কাঞ্চন। রামকৃষ্ণের এই বাণী আমি ধ্রুবসত্য বলে মেনে নিয়েছিলাম।


গোড়ার দিকে রামকৃষ্ণের উপদেশ অনুযায়ী চলতে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল - যৌনপ্রবৃত্তি দমন করবার জন্য আমি যত বেশি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হতাম প্রবৃত্তির তীব্রতাও যেন ততই বেড়ে যেত। কতকগুলি যোগাসন এবং বিশেষ প্রক্রিয়ার ধ্যানের সাহায্যে যৌনসংগম আমার কাছে সহজসাধ্য হয়ে এসেছিল এবং আমি নিজেকে বেশ নিরাসক্ত করে এনেছিলাম। কিন্তু নিরাসক্তি বলতে রামকৃষ্ণ যাতে বিশ্বাস করতেন সে আমার কাছে একেবারে অসম্ভব বলে মনে হত। যাই হোক, হাল না ছেড়ে অসম্ভবকে সম্ভব করবার চেষ্টা করেছিলাম। কখনো আসত হতাশা, কখনো অনুশোচনা। সে সময়ে একবারও মনে হয়নি যে যৌনপ্রবৃত্তিটা মানুষের পক্ষে কতখানি স্বাভাবিক। রামকৃষ্ণের আদর্শকে জীবনের মূলমন্ত্র হিসেবে গ্রহণ করে তখন আমি আজীবন ব্রহ্মচারী থাকবার সাধনায় রত।


মানুষের স্বাভাবিক যৌনপ্রবৃত্তিকে দমন করবার জন্য এত সময় ও শক্তির অপচয়ের কোনো সার্থকতা আছে কি না এ সম্বন্ধে আজকের দিনে স্বভাবতই প্রশ্ন উঠেছে। কৈশোর এবং যৌবনে ব্রহ্মচর্য পালনের অবশ্যই প্রয়োজন আছে, কিন্তু রামকৃষ্ণ ও বিবেকানন্দের মতে যৌনচেতনাকে চিরকালের মতন সম্পূর্ণভাবে দমন করা উচিত। আমাদের শরীর ও মনের বল তো আর অপর্যাপ্ত নয়! এক্ষেত্রে যৌনপ্রবৃত্তি দমনের অসাধ্যসাধনে সময় ও শক্তির এত অপচয় সত্যিই কি সমর্থনযোগ্য? আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য যৌনপ্রবৃত্তি দমন কি একান্তই অপরিহার্য? দ্বিতীয়ত, আধ্যাত্মিক উন্নতির চাইতে জনসেবাই যার জীবনে বড় স্থান অধিকার করেছে তার পক্ষে ব্রহ্মচর্যের প্রয়োজনীয়তা কতখানি? এই দুটি প্রশ্নের জবাব যাই হোক না কেন, ১৯১৩ সালে আমি যখন কলেজে ঢুকলাম তখন আমার মনে এই ধারণা বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছিল যে আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য যৌনপ্রবৃত্তি দমন একান্ত প্রয়োজন এবং আধ্যাত্মিক সাধনায় সিদ্ধিলাভ না করলে বেঁচে থাকারই কোনো অর্থ হয় না। কিন্তু মনে মনে এই সংকল্প থাকলেও তাকে কার্যে পরিণত করা আমার পক্ষে তখনো সুদূরপরাহত ছিল।


জীবনটাকে গোড়ার থেকে যদি আবার শুরু করা যেত তবে বোধ হয় আমি কখনোই যৌনপ্রবৃত্তি দমনের প্রয়োজনীয়তাকে এতখানি বড় করে দেখতাম না। অবশ্য তাই বলে ভাববেন না আমি যা করেছিলাম তার জন্য অনুশোচনা করছি। যৌনপ্রবৃত্তি দমন করা নিয়ে বাড়াবাড়ি করে যদি আমি ভুল করেও থাকি তবে সে আমার পক্ষে শাপে বর হয়ে দাঁড়িয়েছিল, কারণ এই কৃচ্ছ্রসাধনের ফলে জীবনের সবরকম বাধাবিঘ্ন, দুঃখকষ্টের জন্য নিজেকে আমি প্রস্তুত করে তুলতে পেরেছিলাম।

***************************************************

তীর্থ দর্শনের ফাঁকে আমরা দিল্লী, আগ্রা প্রভৃতি ঐতিহাসিক জায়গাগুলিও দেখে নিয়েছিলাম। সব জায়গাতেই সাধুসন্ন্যাসী যতজনের সঙ্গে পেরেছি দেখা করেছি। এ ছাড়া কয়েকটি আশ্রম এবং গুরুকুল ও ঋষিকুল বিদ্যায়তনও পরিদর্শন করেছিলাম। শেষোক্ত বিদ্যায়তন দুটি প্রাচীন ভারতীয় আদর্শে পরিকল্পিত। এদের মধ্যে গুরুকুলই একটু সংস্কারপন্থী, বিশেষ করে জাতিভেদের ক্ষেত্রে। হরিদ্বারের একটি আশ্রমে আমাদের বেশ মুশকিলে পড়তে হয়েছিল। আশ্রমবাসীরা আমাদের সহজভাবে গ্রহণ করতে ইতস্তত করছিলেন, কারণ তাঁরা বুঝতে পারছিলেন না আমরা বাস্তবিকই ধর্মভাবাপন্ন, না ধর্মের ছদ্মবেশে একদল বিপ্লববাদী বাঙালী যুবক। দুমাস ধরে এইভাবে তীর্থে তীর্থে ঘুরে অনেক ধার্মিক পুরুষের দেখা পেয়েছিলাম সত্যি, কিন্তু সেই সঙ্গে হিন্দু সমাজব্যবস্থার মূল গলদগুলিও আমার কাছে ধরা পড়েছিল। সাধুসন্ন্যাসীদের সম্বন্ধে আমার ধারণা একেবারে বদলে গিয়েছিল। প্রথম আমার চোখ খোলে যেবার হরিদ্বারের একটি ভোজনালয়ে আমাদের খেতে দিতে আপত্তি জানালো। বাঙালীরা মাছ খায়, কাজেই তারা খৃস্টানদের মতোই অপবিত্র - অতএব ভোজনালয়ে আর সকলের সঙ্গে বসে খাবার অধিকার তাদের নেই। আমাদের নিজের নিজের বাসনে ভোজনালয় থেকে খাবার নিয়ে এসে নিজেদের ঘরে বসে খেতে হত। আমাদের বন্ধুদের মধ্যে একজন ছিল ব্রাহ্মণ, কিন্তু সেও এই ব্যবস্থা থেকে নিষ্কৃতি পায়নি। বুদ্ধগয়ায় একই ব্যাপার। বারাণসীর রামকৃষ্ণ মিশনের অধ্যক্ষের পরিচয়পত্র নিয়ে আমরা একটি মঠে আতিথ্য গ্রহণ করেছিলাম। খাওয়ার সময়ে আমাদের জিজ্ঞাসা করা হল আমরা আলাদা আলাদা বসে খাবো কি না, কারণ আমরা সকলে একজাতের ছিলাম না। প্রশ্ন শুনে আমি তো অবাক, কারণ এরা সকলেই ছিল শঙ্করাচার্যের ভক্ত। আমি চট করে শঙ্করাচার্যের একটি শ্লোক আউড়ে তাদের বুঝিয়ে দিলাম শঙ্করাচার্য নিজে সবরকম ভেদাভেদের একান্ত বিপক্ষে ছিলেন। হাতে হাতে যুক্তি পেয়ে আমার কথায় তারা প্রতিবাদ করতে পারল না। কিন্তু পরের দিন যখন আমরা কুয়োর ধারে স্নান করতে গিয়েছি, কয়েকটি লোক এসে বলে গেল আমরা কুয়ো থেকে জল তুলতে পারবো না, কারণ আমরা ব্রাহ্মণ নই। সৌভাগ্যক্রমে আমাদের ব্রাহ্মণ বন্ধুটির গলায় সেই পৈতে বের করে তাদের দেখিয়ে জল তুলে এক এক করে আমাদের দিতে শুরু করে দিল। বেচারাদের তখন যা অবস্থা!

***************************************************

প্রতিদিন কলেজে যেতে এবং কলেজ থেকে ফিরতে সাহেবপাড়ার মধ্য দিয়ে আমাকে যাতায়াত করতে হত। ট্রামগাড়িতে প্রায়ই নানারকম অপ্রিয় ব্যাপার ঘটত। ইংরেজরা ভারতীয়দের সঙ্গে অত্যন্ত খারাপ ব্যবহার করত। কখনো কখনো দেখা যেত ইংরেজযাত্রীদের সামনের সীটে ভারতীয় বসে থাকলে নির্বিকারচিত্তে তারা সেই সীটে জুতো শুদ্ধু পা তুলে দিয়েছে, ভারতীয় যাত্রীটির গায়ে হয়তো জুতো ঠেকত, কিন্তু তাতে ইংরেজদের কোনো ভ্রূক্ষেপই ছিল না। অনেক ভারতীয় বিশেষ করে গরিব কেরানীর দল এসব অত্যাচার মুখ বুজে সহ্য করে যেত, কিন্তু সকলের পক্ষে তা সম্ভব হত না। আমি তো এসব একেবারেই সহ্য করতে পারতাম না। ট্রামে যেতে প্রায়ই ইংরেজদের সঙ্গে আমার বচসা লাগত। ক্কচিৎ কখনো সাহেবদের সঙ্গে ভারতীয়দের মারামারি করতে দেখা যেত। রাস্তায়ও একই ব্যাপার ঘটত। ইংরেজরা চাইত তাদের দেখলেই ভারতীয়রা যেন পথ ছেড়ে দেয়, না ছাড়লে ধাক্কা দিয়ে, ঘুষি মেরে তাদের পথ থেকে সরিয়ে দিত। ইংরেজ সৈন্যগুলি ছিল আর এক কাঠি সরেস - বিশেষ করে গর্ডন হাইল্যান্ডারগুলির তো কথাই নেই। আত্মসম্মান বজায় রেখে রেলে যাতায়াত করাও ভারতীয়দের পক্ষে বেশ কঠিন ছিল। রেলকর্তৃপক্ষ বা পুলিশ এসব ক্ষেত্রে ভারতীয়দের কোনোরকম সাহায্যই করত না, কারণ, দেখা যেত তারা নিজেরাই হয়তো ইংরেজ কিংবা অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান ভারতীয় কর্মচারীরা আবার উপরওয়ালার কাছে ইংরেজদের বিরুদ্ধে নালিশ করতে ভয় পেত। কটকের একটি ঘটনা মনে পড়ে। আমি তখন খুব ছোটো। আমার এক কাকার কোথায় যাবার কথা ছিল, কিন্তু তিনি স্টেশন থেকে ফিরে এলেন, কারণ উঁচু শ্রেণীর কামরাগুলিতে কতকগুলি ইংরেজ ছিল, তারা ভারতীয়দের কোনোমতেই সেই কামরায় ঢুকতে দিতে রাজী হয়নি। রেলে এই ধরনের ব্যাপারে ইংরেজদের সঙ্গে উচ্চপদস্থ ভারতীয়দের প্রায়ই ঝগড়া লাগত বলে শোনা যেত। এইসব কাহিনি স্বভাবতই লোকের মুখে মুখে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ত।


যখনই এই জাতীয় কোনো ঘটনা ঘটত, আমার স্বপ্ন যেত ভেঙে, শঙ্করাচার্যের মায়াবাদে তখন আর সান্ত্বনা খুঁজে পেতাম না। বিদেশীর হাতে অপমানিত হয়ে তাকে মায়া বলে উড়িয়ে দেওয়া আমার পক্ষে কোনোমতেই সম্ভব হয়নি। কলেজে কোনো ইংরেজ অধ্যাপক যদি আমাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করতেন আমার মেজাজ সাংঘাতিক বিগড়ে যেত। দুঃখের বিষয় এ রকম ব্যাপার প্রায়ই ঘটত। আমাদের আগের যুগে অনেক ইংরেজ অধ্যাপককেই এজন্য ছাত্রদের হাতে মার খেতে হয়েছে। কলেজে প্রথম বছর আমারও এই জাতীয় অভিজ্ঞতা কয়েকবার হয়েছিল, তবে সে তেমন গুরুতর নয়। অবশ্য মেজাজ বিগড়ে দেবার পক্ষে তাই যথেষ্ট ছিল।


ইংরেজ ও ভারতীয়দের মধ্যে সংঘর্ষ লাগলে আইনের দিক থেকে ভারতীয়রা কখনো সুবিচার পেত না। এর ফলে শেষটায় অন্য কোনো উপায় না দেখে তারাও পাল্টা আক্রমণ শুরু করে দিল। রাস্তায়, ট্রামে, রেলে তারা ইংরেজদের অত্যাচার অবিচার আর মুখ বুঝে সহ্য করত না। মনে পড়ে আমাদের কলেজের একটি ছেলে ভালো বক্সিং জানত, সে সেধে সেধে সাহেবপাড়ায় গিয়ে টমিদের সঙ্গে মারামারি করে আসত। ভারতীয়দের এই পরিবর্তিত মনোভাবের ফল হাতে হাতে পাওয়া গেল। ইংরেজরা ভারতীয়দের সমীহ করে চলতে শুরু করল। লোকে বলাবলি করতে লাগল ইংরেজরা শক্তের ভক্ত, নরমের যম। এই মনোভাবই বাঙলাদেশে সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের ভিত্তি। উপরোক্ত ঘটনাগুলি স্বভাবতই আমার রাজনৈতিক চেতনাকে জাগিয়ে তুলেছিল, কিন্তু তখনো আমার মনে সঠিক কোনো মত গড়ে ওঠেনি।

***************************************************

বি.এ.তে দর্শনে অনার্স নিলাম - আমার বহুকালের ইচ্ছা এইবার পূর্ণ হল। লেখাপড়ায় এবার সত্যিই খুব মনোযোগ দিলাম। আমার কলেজ-জীবনে এই বোধ হয় প্রথম পড়ায় রস পেলাম। দর্শন পড়ে আমি যা লাভ করলাম তার সঙ্গে দর্শন সম্বন্ধে আমার ছোটোবেলার ধারণার কোনো মিল ছিল না। স্কুলে পড়বার সময়ে ভাবতাম দর্শন পড়লে জীবনের মূল সমস্যাগুলির সমাধান খুঁজে পাওয়া যাবে। দর্শন অধ্যয়নকে সে সময়ে আমার কাছে এক ধরনের যৌগিক প্রক্রিয়া বলেই মনে হত। দর্শন পড়ার ফলে কোনোরকম তত্ত্বজ্ঞান লাভ না করলেও আমার মনন-ক্ষমতা আগের চাইতে বেড়ে গেল, সব কিছুই বিচার করে দেখতে শুরু করলাম। পাশ্চাত্য দর্শনের গোড়ার কথাই সংশয়বাদ - কেউ কেউ বলেন এর শেষও সংশয়ে। পাশ্চাত্য দর্শন কোনো কিছুকেই নির্বিবাদে গ্রহণ করতে রাজী নয় - যুক্তিতর্কের সাহায্যে তার দোষগুণ বিচার করে তবে গ্রহণ করে - এক কথায়, মনকে সংস্কারমুক্ত করে। এতকাল বেদান্তকে অভ্রান্ত বলে মেনে এসেছি, এখন মনে প্রশ্ন জাগল, বাস্তবিকই বেদান্ত অভ্রান্ত কি না। মননচর্চার খাতিরে জড়বাদের স্বপক্ষে প্রবন্ধ লিখতে শুরু করলাম। কিছুদিনের মধ্যেই দলের অন্য সকলের সঙ্গে আমার বিরোধ লাগল। এই প্রথম আমার খেয়াল হল ওরা কতখানি গোঁড়া ও সংস্কারাচ্ছন্ন। অনেক জিনিসই ওরা নির্বিবাদে মেনে নেয় - কিন্তু যে সত্যিকারের সংস্কারমুক্ত সে কখনোই ভালো করে যাচাই না করে কোনো জিনিসকে সত্য বলে মানবে না।

***************************************************

মাসখানেক পরে আবার ওইরকম একটি ব্যাপার ঘটল। খবর পাওয়া গেল - মিঃ ওটেন আবার একটি ছেলের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছেন, এবারকার ছেলেটি প্রথম বার্ষিকের ছাত্র। ছাত্ররা চট করে বুঝে উঠতে পারল না, এ অবস্থায় কী করা দরকার। আইনসম্মতভাবে ধর্মঘট ইত্যাদি করলে কর্তৃপক্ষ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা অবলম্বন করবেন, আর অধ্যক্ষের কাছে নালিশ কোনো ফলই হবে না। অগত্যা কয়েকজন ছেলে স্থির করল তারা নিজেরাই এর ব্যবস্থা করবে। ফলে মিঃ ওটেন ছাত্রদের হাতে বেদম মার খেলেন। খবর পেয়ে খবরের কাগজের অফিস থেকে শুরু করে লাটভবন পর্যন্ত সর্বত্র ভীষণ উত্তেজনা দেখা দিল।


ছাত্রদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল তারা নাকি মিঃ ওটেনকে পেছন থেকে ধাক্কা মেরে সিঁড়ি দিয়ে ফেলে দিয়েছে। এ অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। পেছন থেকে একবারই মাত্র তাঁকে আঘাত করা হয়েছিল, কিন্তু সেও এমন কিছু মারাত্মকভাবে নয়। তাঁকে যারা ঘায়েল করেছিল তারা সকলেই ছিল তাঁর সামনে। ব্যাপারটা আমি স্বচক্ষে দেখেছিলাম, কাজেই ছাত্রদের বিরুদ্ধে যে মিথ্যা অপবাদ দেওয়া হয়েছিল জোর গলায় তার প্রতিবাদ করছি।


এই ঘটনার পরেই বাঙলা সরকার এক বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে আমাদের কলেজ সে সম্বন্ধে তদন্ত করবার জন্য একটি তদন্ত-কমিটি গঠনেরও নির্দেশ দিলেন। সরকারপক্ষ স্বভাবতই সাংঘাতিক খেপে গিয়েছিল, এবং এমনও শোনা গেল প্রয়োজন বোধ করলে চিরকালের জন্য কলেজ বন্ধ করে দিতেও তারা পেছপা হবে না। বলা বাহুল্য, সরকারের তরফ থেকে কলেজ-কর্তৃপক্ষ সবরকম সাহায্যই পেতে পারতেন, কিন্তু একটা গোলমাল হয়ে গেল। সরকারি বিজ্ঞপ্তি নিয়ে আমাদের অধ্যক্ষের সঙ্গে সরকারপক্ষের বিরোধ দেখা দিল। অধ্যক্ষ মনে করলেন কলেজ বন্ধ রাখবার আদেশ জারি করবার আগে তাঁর সঙ্গে পরামর্শ না করে সরকার তাঁর আত্মসম্মানে ঘা দিয়েছেন। এ নিয়ে তিনি শিক্ষাবিভাগের মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে এক হুলস্থূল কাণ্ড বাধিয়ে দিলেন। পরের দিনই আর একটি সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে প্রকাশ পেল - মান্যবর মন্ত্রী মহোদয়ের সঙ্গে অত্যন্ত অভদ্র ব্যবহারের অভিযোগে আমাদের অধ্যক্ষকে অনির্দিষ্টকালের জন্য 'সাসপেন্ড' করা হয়েছে। এদিকে অধ্যক্ষমহাশয় ক্ষমতা হস্তান্তরিত হবার আগেই তাঁর যথাকর্তব্য সেরে ফেললেন। যেসব ছেলে তাঁর কুনজরে ছিল সবাইকে তিনি ডেকে পাঠালেন। এদের মধ্যে আমিও ছিলাম। দাঁতমুখ খিঁচিয়ে আমাকে তিনি বললেন - "বোস, তোমার মতো বেয়াড়া ছেলে কলেজে আর নেই, তোমাকে আমি সাসপেন্ড করলাম।" কথাগুলো আজও স্পষ্ট মনে আছে। জবাবে আমি শুধু বলেছিলাম, "ধন্যবাদ!" তারপর বাড়ি চলে এলাম। শঙ্করাচার্যের মায়াবাদের ঘোর মন থেকে কেটে গেল।


এর কয়েকদিন পরেই কলেজের পরিচালক-সমিতির একটি অধিবেশনে অধ্যক্ষ মহাশয়ের নির্দেশকে সমর্থন জানানো হল। ফলে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে আমি বিতাড়িত হলাম। অগত্যা, অন্য কোনো কলেজে ভরতি হবার অধিকার দাবি করে বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করলাম। কিন্তু আমার আবেদন অগ্রাহ্য হল। দেখা গেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই আমি বিতাড়িত হয়েছি।

***************************************************

Tuesday, 27 January 2026

বাবরনামা

ফারগানা আর কাসঘরের মাঝখানে পর্বতশ্রেণীতে আন্দেজানের জঙ্গল অঞ্চলে এক উপজাতিদল থাকে। তারা 'জাগ্রে' সম্প্রদায়ের লোক। দুর্গম অঞ্চলে থাকে বলে তারা রাজস্ব দিতে চায় না। কাশিম বেগের নেতৃত্বে একদল সৈন্যকে সেখানে পাঠালাম। জাগ্রেরা এক ধরণের পাহাড়ি ষাঁড় পালন করে। তাছাড়া প্রচুর ভেড়া এবং প্রচুর দুরন্ত ঘোড়া আছে তাদের। উদ্দেশ্য - যদি কিছু লুঠ করে আনা যায়। কাশেম বেগ প্রায় কুড়ি হাজার ভেড়া আর পনের হাজার ঘোড়া লুঠ করে নিয়ে এল। সেগুলো আমার সৈন্যদের মধ্যে বিলিয়ে দিলাম। 

**************************************************************

সুলতান আহমেদের মেয়ে আইষা বেগমের সঙ্গে আমার নিকাহর কথা আব্বা ও চাচার উপস্থিতিতেই ঠিক করা হয়েছিল। খোজেন্দে পৌঁছে শাবান মাসে তাকে বিয়ে করি। বিবাহিত জীবনের প্রথমদিকে তার প্রতি আমার ভালোবাসা খুব গভীর হলেও লজ্জায় তার কাছে সবসময় যেতে পারিনি। পনের-বিশ দিন পরপর তার কাছে যেতাম। পরে অবশ্য আমার ভালোবাসায় মন্দা পড়ে গেল। ফলে আম্মি রেগে গিয়ে বকাবকি করে জোর করে আমাকে তার কাছে পাঠাতে লাগলেন। আমিও অপরাধীর মতো ত্রিশ-চল্লিশ দিন পরপরে তার কাছে যেতাম।


প্রায় এই রকম সময়ে শিবিরের বাজারের একটি ছেলের সঙ্গে আমার আলাপ হয়। তার নামও বাবুরি। আমার নামের সঙ্গে অদ্ভুত মিল ছিল। তার প্রতি আমি অদ্ভুত আকর্ষণ অনুভব করি। এর আগে আমি কারো প্রতি উগ্র আকর্ষণ অনুভব করিনি। বলতে গেলে, এরকম উগ্র কামনার অভিজ্ঞতা আমার আগে কখনো হয়নি, এমনকী কারো কাছে শুনিওনি। এই রকম অবস্থায় পড়ে ফারসিতে কয়েকটি কবিতা লিখি, তার মধ্যে একটি -


'আমার মতো মুগ্ধ প্রেমিক কে আছে আর 

প্রেমের আগুনে জ্বলে যায় যার হৃদয় ভার

আমার মতো কে বয় এত অপমান-দায়

নেই কোনো মায়া, শুধু আছে ঘৃণা, প্রাণ যে যায়!' 

**************************************************************

সকালবেলাই সৈন্যদের অস্ত্রশস্ত্রে সাজিয়ে দেওয়া হলো, ঘোড়াদের জিন-বলগা চাপিয়ে তৈরি করা হলো। তারপর সামনে-পিছনে-ডাইনে-বাঁয়ে সৈন্য সাজিয়ে যুদ্ধের জন্য বেরিয়ে পড়লাম। শেয়বানি খাঁর সৈন্যও তৈরি ছিল। তারাও এগিয়ে এল। আমরা যখন সামনাসামনি হলাম, তখন শত্রুপক্ষের সৈন্যরা আমাদের বাঁদিক দিয়ে পাশ কাটিয়ে গিয়ে পিছন দিয়ে ঘিরে ফেলে। আমি তাদের সামনা সামনি হওয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়াতে নির্দেশ দিই। কিন্তু হঠাৎ এভাবে দিক পরিবর্তনের ফলে আমার সামনের দিকের সেরা সৈন্যরা পিছনে পড়ে যায় এবং তারা কেউই আমার সঙ্গে আসতে পারে না। তবুও আমার সৈন্যরা এমন বীরের মতো যুদ্ধ করে যে শত্রুপক্ষের সৈন্যরা বিপর্যস্ত হয়ে পিছিয়ে যায়। এমনকী শেয়বানি খাঁর একজন অভিজ্ঞ সেনাপতি তাকে গিয়ে জানায় যে তখনি পিছিয়ে না গেলে সবই শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু সে তাতে সম্মত না হয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যায়। শত্রুপক্ষের ডান সারির সৈন্যরা আমাদের বামদিকের সৈন্যদের পর্যুদস্ত করে পিছন থেকে আক্রমণ করে। আমাদের সামনের সারির সৈন্যরা যেহেতু একদিকে পড়ে যায়, শত্রুপক্ষের সৈন্যরা তীর ছুঁড়ে আমাদের ব্যতিব্যস্ত করে তুলল। যে সব মোগল সৈন্য আমাদের সাহায্য করার জন্য আনা হয়েছিল তারা যুদ্ধ না করে ঘোড়া থেকে নেমে আমাদের লোকদেরই লুঠপাঠ করতে শুরু করল। এই প্রথম যে তারা এরকম করল তা নয়, এটা তাদের স্বভাব। যদি তারা কোনো যুদ্ধে যেতে, সঙ্গে সঙ্গে তারা শত্রুপক্ষের সৈন্যদের লুঠ করতে শুরু করে। আর যদি হারে, তবে নিজেদের পক্ষের সৈন্যদের জিনিসপত্র লুঠ করে যা পারে তাই নিয়ে পালায়।

**************************************************************

সর্বশক্তিমান আল্লা আমাদের ইচ্ছা পূরণ করলেন। আফগানরা আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বার জন্য পর্বত ছেড়ে বিচ্ছিন্ন পাহাড়ে জমায়েত হলো। আমার এক সৈন্যদলকে পর্বত এবং ছোট পাহাড়ের মধ্যে যে জমি আছে, সেইটা দখল করতে আগেভাগেই পাঠিয়ে দিলাম। অবশিষ্ট সৈন্যদলকে পাহাড়ে আক্রমণ চালিয়ে এগিয়ে গিয়ে আফগানদের ঔদ্ধত্যের শাস্তি দেওয়ার জন্য নির্দেশ দিলাম।


আমার সৈন্যরা এগিয়ে যেতেই আফগানরা প্রমাদ গুনল। তারা যে যুদ্ধে এঁটে উঠতে পারবে না এটা বেশ বুঝতে পারল। ত্বরিৎগতিতে সৈন্যরা তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের এক শ কি দেড় শ জনকে ধরাশায়ী করে ফেলল। এদের মধ্যে কয়েকজনকে জীবন্তই আমার কাছে ধরে নিয়ে এল, কিন্তু বেশির ভাগেরই কাটা মুন্ডু আমার সামনে হাজির করা হলো। যুদ্ধে পরাস্ত হলে আফগানরা তাদের বিজয়ী শত্রুর সামনে দাঁতে ঘাস নিয়ে এসে দাঁড়ায়। বোধ হয় তারা বলতে চায় যে আমি তোমার আশ্রিত ষাঁড়। আফগানদের এই রীতি আমি প্রথম দেখলাম। আফগানরা যখন দেখল যে আর সংঘর্ষ চালানো সম্ভব হবে না - তখন তারা দাঁতে ঘাস নিয়ে আমাদের দিকে এগিয়ে এল। যে সব আফগানকে জীবন্ত ধরে আনা হয় তাদের শিরচ্ছেদ করার আদেশ দিলাম। আমাদের পরবর্তী বিশ্রামের জায়গায় ওই সব ছিন্ন মুণ্ড দিয়ে একটা চূড়া করা হলো।


পরদিন সকালে এগিয়ে গিয়ে হাঙ্গুতে শিবির ফেলা হলো। সেদিককার আফগানরা একটা পাহাড়কে সুরক্ষিত করে একটা 'সাঙ্গরে' রূপান্তরিত করে ফেলেছে। আমি কাবুলে এসেই প্রথমে এই 'সাঙ্গর' কথাটা শুনি। একটা বিচ্ছিন্ন পাহাড়কে কোনো আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য যদি সুরক্ষিত করা হয় - সেটাকেই সাঙ্গর বলে। আমার সৈন্যরা এই 'সাঙ্গরের' কাছে আসা মাত্র আক্রমণ চালায়। সাঙ্গরটিকে বিধ্বস্ত করে তা অধিকার করবার পর তারা দু' শ অবাধ্য আফগানকে ধরে এনে তাদের শিরচ্ছেদ করে। এখানেও নরমুণ্ডের আর একটা চূড়া তৈরি করা হয়।


বানু প্রদেশে অবতরণ করে সংবাদ পাওয়া গেল যে সমতলবাসী উপজাতিরা উত্তর দিকের পাহাড়গুলোতে সাঙ্গর গড়ে তুলেছে। জাহাঙ্গীর মির্জার অধীনে একদল সৈন্য সেই দিকে পাঠাই। যে 'সাঙ্গর'এর বিরুদ্ধে অভিযান চালায় সেটা 'কিভি' উপজাতিদের। মুহূর্তের মধ্যে সেটা অধিকার করা হলো। তারপর শুরু হলো হত্যাকাণ্ড। অনেকগুলো কাটা মুন্ডু আমার শিবিরে নিয়ে এলো। সৈন্যরা এই অভিযানে নানা রকমের অনেক কাপড় লুঠ করে নেয়। বানুতে মাথার খুলি স্তূপ করে সাজিয়ে রাখা হয়।

**************************************************************
মাইল খানেক দূর থেকে বোঝা গেল যে কালো ছায়ার মতো যেটা দেখাচ্ছিল, সেটা আফগানদের তাঁবুগুলো একজোট হয়েছিল বলে ওই রকম লাগছিল। একদলকে সেদিকে পাঠানো হলো। অনেকগুলো ভেড়া লাভ হলো। একসঙ্গে এতগুলো ভেড়া এর আগে কোনোবারই পাওয়া যায়নি। যখন আমরা ঘোড়া থেকে নেমে লুঠের মাল সংগ্রহ করতে ব্যস্ত ছিলাম, শত্রুপক্ষ একত্রিত হয়ে সমতলভূমিতে নেমে এসে যুদ্ধের জন্য প্ররোচনা দিচ্ছিল। আমাদের দলের কয়েকজন বেগ ও কিছু সৈন্য তাদের দলকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে প্রত্যেককে তলোয়ার দিয়ে হত্যা করে। নাসির মির্জাও এমনি একটি দলকে পেয়ে তাদের প্রত্যেককে কেটে ফেলে। আফগানদের মাথার খুলি দিয়ে একটা স্তম্ভ খাড়া করা হয়।  
**************************************************************
আমাদের দলের আরো অনেকে শত্রুপক্ষের বাধা দেওয়ার শত চেষ্টা সত্ত্বেও তাদের তীর-ধনুকের পরোয়া না করে দুর্গ-প্রাচীরে গর্ত করে ওদের প্রতিরোধ ভেঙে ফেলতে থাকে।

দুপুরের খাওয়ার সময় দোস্ত বেগের লোকেরা উত্তর-পূর্ব কেল্লার যে অংশে গর্ত খুঁড়ছিল সেখানে একটা ভাঙনের সৃষ্টি করল। এই ভাঙনের ভিতর দিয়ে তারা কেল্লার মধ্যে ঢুকে পড়ে শত্রুদের তাড়িয়ে নিয়ে গেল। প্রধান সেনাদলও সেই সময় মই দিয়ে প্রাচীর ডিঙিয়ে দুর্গের মধ্যে ঢুকে পড়ল। আল্লার অনুগ্রহে আমরা দুই-তিন ঘন্টার মধ্যেই এই সুরক্ষিত দুর্গ দখল করে ফেলি। আমার সব অনুচরই খুব সাহস ও সহনশীলতা দেখিয়ে, তারা যে সত্যিই বীর এই সুখ্যাতি লাভ করেছে।

বাজুরের অধিবাসীরা শুধু বিদ্রোহী নয় তারা ইসলাম ধর্মাবলম্বীদেরও বিরোধী। তাদের এই বিদ্রোহ এবং শত্রুতার জন্য তারা শাস্তি পাওয়ার যোগ্য। এ ছাড়াও, তারা বিধর্মী কাফেরের রীতিনীতি পালন করে। তাদের মধ্য থেকে ইসলাম ধর্মকে একেবারে নির্মূল করে ফেলায় তাদের তলোয়ার দিয়ে মাথা কেটে দেওয়া হয় এবং তাদের স্ত্রী ও পরিবার-পরিজনকে বন্দি করা হয়। তিন হাজারের ওপর লোককে এইভাবে হত্যা করা হয়।

বাজুরের বিরুদ্ধে অভিযান এইরকম সন্তোষজনক শেষ হওয়ায় একটি উঁচু মাটির ঢিপির ওপর নরমুণ্ড সাজিয়ে একটি বিজয়স্তম্ভ নির্মাণ করতে আদেশ দিই।
**************************************************************
ত্রিশ-চল্লিশ বছরের মধ্যে শাহাবাজ কালেন্দার নামে একজন আল্লায় অবিশ্বাসী অসাধু লোক ইউসুফজাই ও দিলজাক উপজাতিদের ধর্মে অবিশ্বাসী করে তুলেছিল। মকাম পাহাড় হঠাৎ শেষ হওয়ার পর একটা ছোট পাহাড় দেখা যায় - যেন চারিপাশের সমতলভূমি তার দিকে তাকিয়ে আছে। দৃশ্যটা অতি সুন্দর। নিচু জমি থেকে এই পাহাড়টা মনোরম দেখায়। এই পাহাড়ের ওপর শাহাবাজ কালেন্দারের কবর আছে। আমরা মনে হলো - এমন সুন্দর নয়নাভিরাম জায়গায় একজন অবিশ্বাসীর কবর থাকবে - এটা অন্যায়। সেইজন্য আমি আদেশ দিলাম - কবরটা ভেঙে ফেলে মাটির ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া হোক। এই জায়গাটা আবহাওয়া ও দৃশ্যের দিক দিয়ে খুব সুন্দর হওয়ায় আমার মন ভালো হয়ে গেল। আমি কিছুদিন এখানেই থেকে যাই এবং মদের আসর জমাই।   
**************************************************************
হিন্দুস্তানের লোকেরা বিশেষ করে আফগানরা এক অদ্ভূত নির্বোধ জাত। তাদের না আছে কোনো চিন্তাশক্তি, না আছে দূরদৃষ্টি। তারা রোখ করে বীরের মতো যুদ্ধও চালাতে পারে না, অথচ বন্ধুত্ব ও সৌহার্দ্যের মধ্যেও থাকতে চায় না। 
**************************************************************
আমার সঙ্গী ছয় জন প্রধান আফগান সর্দারকে হিন্দুস্তানের লুঠের মাল থেকে প্রত্যেককে একশ রৌপ্য মুদ্রা, একটা কোর্তা, তিনটে বলদ এবং একটা করে মোষ দিই। আর সকলকেও মুদ্রা, কাপড়, বলদ এবং মোষ তাদের মর্যাদা অনুসারে দিয়েছিলাম।
**************************************************************

একদল সৈন্যকে গাজি খাঁকে অনুসরণ করে বন্দি করার জন্য পাঠিয়ে আমি নিশ্চিত হয়ে রেকাবে পা দিয়ে এবং বলগা হাতে নিয়ে লোদি আফগান বংশের সুলতান বাহলুলের নাতি এবং সুলতান সিকান্দরের ছেলে সুলতান ইব্রাহিমের বিরুদ্ধে যুদ্ধের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ি। এই সময়ে হিন্দুস্তান সাম্রাজ্য ও দিল্লীর সিংহাসন সুলতান ইব্রাহিমের দখলে ছিল। তাঁর অধীনে এক লক্ষ সৈন্য এবং তাঁর ও তাঁর আমিরদের মোট এক হাজার হাতি ছিল। মিলওয়াত দুর্গ থেকে যে সোনা এবং মূল্যবান জিনিসপত্র পাওয়া গিয়েছিল তার অধিকাংশই বাল্খ ও কাবুলে আমার আত্মীয়, বন্ধু-বান্ধব, ছেলে-মেয়ে এবং আমার ওপর নির্ভরশীলদের কাছে উপহার হিসাবে পাঠিয়ে দিই।

**************************************************************

গোয়ালিয়রের রাজা বিক্রমজিৎ একজন হিন্দু। হিন্দু রাজারা এই রাজ্যে একশ বছরের ওপর শাসন করে এসেছে। যে যুদ্ধে সুলতান ইব্রাহিম পরাজিত হয় সেই যুদ্ধেই বিক্রমজিৎকেও নরকে পাঠানো হয়। বিক্রমজিতের পরিবারবর্গ এবং তার গোষ্ঠীর সর্দাররা তখন আগ্রাতেই ছিল। হুমায়ূন আগ্রায় পৌঁছানোর পরই বিক্রমজিতের লোকজন পালাবার চেষ্টা করে, কিন্তু হুমায়ূন যে সব লোককে সতর্ক নজর রাখার জন্য নিযুক্ত করেছিল তারা তাদের আটক করে। কিন্তু হুমায়ুন তাদের ধনরত্ন লুঠ করার আদেশ দেয়নি। তারা স্বেচ্ছায় হুমায়ূনকে সৌহার্দ্যের প্রস্তাব জানিয়ে অনেকগুলো রত্ন ও দামি পাথর উপহার দেয়। এই সব রত্নের মধ্যে একটি প্রসিদ্ধ হীরক ছিল - যার নাম কোহিনূর। সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি বহুমূল্য হীরক সংগ্রহ করেছিলেন। এটা এমন মূল্যবান যে একজন হীরার জহুরি এর দাম ঠিক করেছিলেন - পৃথিবীতে দৈনিক যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়, তার অর্ধেক পরিমাণ অর্থ। এর ওজন প্রায় তিনশ কুড়ি রতি। আমি আগ্রায় পৌঁছালে হুমায়ুন আমাকে সেই হীরক উপঢৌকন দেয় এবং আমিও আবার সেটাকে উপহার হিসাবে তাকে ফিরিয়ে দিই।

**************************************************************

Wednesday, 15 May 2024

অরিজিন অফ স্পিসিস - চার্লস ডারউইন

প্রত্যেক জীব স্বাভাবিকভাবে এত দ্রুতহারে বৃদ্ধি পায় যে যদি না তারা ধ্বংপ্রাপ্ত হয়, তাহলে পৃথিবী এক জোড়া বংশধর দ্বারা শীঘ্রই পূর্ণ হবে। এমনকি মন্থরভাবে প্রজননক্ষম মানুষ পঁচিশ বছরে দ্বিগুণ হয়েছে, এবং এক হাজার বছরের কম সময়ের মধ্যে আক্ষরিক অর্থে এই হারে এদের বংশধরদের দাঁড়াবার কোন জায়গা থাকবে না। লিনিয়াস গণনা করেছেন যে একটি একবর্ষজীবী উদ্ভিদ যদি কেবলমাত্র দুটি বীজ উৎপাদন করে - এভাবে এত অনুর্বর উদ্ভিদ যদি না থাকে - এবং যদি এদের চারাগাছগুলি পরের বছর দুটি উৎপাদন করে এবং যদি এইভাবে চলে, তবে কুড়ি বছরে দশ লক্ষ উদ্ভিদ জন্মাবে। সমস্ত প্রাণীদের মধ্যে হাতি হচ্ছে সবচেয়ে কম প্রজননক্ষম, এবং এদের স্বাভাবিক বৃদ্ধির সম্ভবপর সর্বনিম্ন হার আমি কষ্ট করে হিসেব করেছি। মোটামুটিভাবে ধরে নেওয়া যেতে পারে যে হাতিরা ত্রিশ বছরের হলে সন্তান উৎপাদনক্ষম হয় এবং নব্বই বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকে। যদি এভাবে চলতে থাকে তাহলে ৭৪০ থেকে ৭৫০ বছর পরে প্রায় এক শত নব্বই লক্ষ হাতি বেঁচে থাকবে, যারা প্রথম জোড়ার বংশধর।***********************************************************


Friday, 10 May 2024

প্রাগিতিহাস - মধুশ্রী বন্দ্যোপাধ্যায়

 ১৯৭৪ সালে কেনিয়ার উত্তরে ইথিওপিয়ায় পাওয়া গিয়েছিল একটি জীবাশ্ম যার নাম দেওয়া হয়েছিল লুসি। আমেরিকান নৃতত্ত্ববিদ ডোনাল্ড জোহানসন তখন উত্তর-পূর্ব ইথিওপিয়ার আওয়াস উপত্যকায় হাদার প্রত্নস্থলে কাজ করছিলেন। তিনি সেই সময়ে একটি বাহুর হাড়ের টুকরো পেয়েছিলেন। জোহানসন পরে বলেছিলেন, তখন তার নাড়ির স্পন্দন দ্রুত হয়ে গিয়েছিল, তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে এটি বানর নয়, একটি হোমানিন-এর হাড়। ওই প্রজাতির নামকরণ করা হয় 'অস্ট্রালোপিথেকাস আফারেন্সিস'। এরা হল প্রারম্ভিক হোমিনিন প্রজাতিগুলির মধ্যে একটি। 

সে সময়ে বীটলস-এর বিখ্যাত গান 'লুসি ইন টু দ্য স্কাই উইথ ডায়ামন্ডস'-এর অনুসরণে ওই জীবাশ্মের নাম দেওয়া হয় লুসি। লুসির কঙ্কাল প্রায় ৪০% সম্পূর্ণ অবস্থায় পাওয়া গেছে।

আজ থেকে প্রায় বত্রিশ লক্ষ বছর আগে লুসি মারা গেছে; তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১২ বছর। ও ছিল ছোট্টখাট্ট পূর্ণ নারী। শিম্পাঞ্জির মত মুখ ও দেহকাণ্ড, কিন্তু মানবের মত কোমর থেকে নিচের অংশ। ওদের মধ্যে এপ এবং মানব, উভয় বৈশিষ্ট্যই বর্তমান ছিল। ওরা দুটি পায়ে দাঁড়াতে এবং হাঁটতে পারত। আটত্রিশ থেকে ঊনত্রিশ লক্ষ বছর আগে পর্যন্ত ওরা পৃথিবীতে ছিল। পূর্ব আফ্রিকার ইথিওপিয়া, কেনিয়া, তানজানিয়াতে ওদের জীবাশ্ম পাওয়া গেছে। এই প্রজাতির সদস্যদের নাক ছিল চ্যাপ্টা, নিম্ন চোয়াল দৃঢ়ভাবে বেরিয়ে আসা এবং মস্তিস্ক ছিল ক্ষুদ্র। ওদের মস্তিষ্কের আয়তন ছিল ৫০০ কিউবিক সেন্টিমিটারের (সিসি) কম। ওরা খেত নরম খাবার যেমন পাতা, উদ্ভিদ, ফল।

কীভাবে লুসি মারা গেছে? ওর দেহের কিছু আঘাত দেখে অনুমান করা হয়, হয়তো বেচারি গাছ থেকে পড়ে গিয়েছিল। অথবা হয়তো ওকে দ'লে মাড়িয়ে চলে গিয়েছিল শত শত পশু।
***************************************************************
মানব প্রজাতিগুলি তখন উঠে দাঁড়িয়ে হাঁটতে পারছে, হাত দিয়ে ছোট ছোট পাথরের অস্ত্র বানাচ্ছে। তৈরি করতে শিখেছে পাথরের কুঠার। দাঁত হয়েছে ক্ষুদ্রতর। তার মগজের আয়তন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ধীরে ধীরে তাদের একটি প্রজাতির দেহের গঠন হল অনেকটা আধুনিক মানুষের মত। এমনই এক মানব প্রজাতি হল 'হোমো ইরেক্টাস'। ওদের হাত ও পা ছিল আগের প্রজাতিগুলির তুলনায় আনুমানিকভাবে দীর্ঘ, অনেকটা আজকের মানুষের মত।

ওরা সেই সময়ে রীতিমত শিকার করতে শুরু করে ও খাদ্যতালিকায় আসে মাংস। নৃতত্ত্ববিদরা মনে করেন যে, মানব প্রজাতিসমূহের খাদ্যাভ্যাসে মাংস আসার ফল ছিল সুদূরপ্রসারী। মানব দেহের একটি অত্যন্ত মহার্ঘ অঙ্গ হল মস্তিক। এটি মানুষের দেহের ওজনের মাত্র ২% দখল করে কিন্তু একে পোষণের জন্য মোট প্রয়োজনীয় ক্যালোরির ২৫% পর্যন্ত আবশ্যক হয়। মস্তিষ্কের পর্যাপ্ত পুষ্টি পেতে মাংসের প্রয়োজনীয়তা ছিল।
***************************************************************
আফ্রিকান জন্মদাত্রী 

আফ্রিকার বাইরে পৃথিবীর বিভিন্ন গোষ্ঠীর 'মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ' হ্যাপ্লোগ্রুপ অনুসন্ধান করে দেখা যাচ্ছে সমস্ত মানুষের শিকড় আছে L3 হ্যাপ্লোগ্রুপে। L3 হ্যাপ্লোগ্রুপের উৎস আফ্রিকা। এই হ্যাপ্লোগ্রুপ থেকে পরিব্যক্তি অনুযায়ী বিভিন্ন শাখাপ্রশাখা বেরিয়েছে। আফ্রিকা থেকে যে মহাপরিযানের দলটি বেরিয়েছিল তাদের ছিল L3 'মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ' হ্যাপ্লোগ্রুপ। তাই পৃথিবীতে যে কোন মানুষের 'মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ' হ্যাপ্লোগ্রুপের পরিব্যক্তি ধরে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেই হ্যাপ্লোগ্রুপ একসময়ে উদ্ভূত হয়েছে L3 হ্যাপ্লোগ্রুপ থেকে। আফ্রিকায় অনেক পুরনো, যেমন L1, L2 ইত্যাদি হ্যাপ্লোগ্রুপ রয়েছে। এদের পৃথিবীর অন্য স্থানে দেখা যায় না। L3 হ্যাপ্লোগ্রুপ-এর কিছু নারী আফ্রিকা থেকে ছড়িয়ে পড়েছিল বাকি বিশ্বে, আর কিছু L3 নারী আফ্রিকাতেই থেকে গিয়েছিল। শেষ দলের নারীরা গোটা বিশ্বে শেষ মহাপরিযানের অংশীদার ছিল না।

আদি হ্যাপ্লোগ্রুপ L3 থেকে প্রায় সমান্তরালভাবে M এবং N উদ্ভূত ও বিকশিত হয়েছে। আর N থেকে সরকারি উদ্ভূত হয়েছে R হ্যাপ্লোগ্রুপ। আফ্রিকার বাইরে সমস্ত আধুনিক মানুষের বংশগতির শুরু ওই M, N ও R হ্যাপ্লোগ্রুপ থেকে। দক্ষিণ এশিয়াতে ওই তিনটি হ্যাপ্লোগ্রুপই পাওয়া যায়। ইউরোপে আছে শুধু N ও R।

পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের পুরুষের ওয়াই-ক্রোমোজোম ডিএনএ-র পরিব্যক্তির শৃঙ্খল ধরে মূলে যেতে গিয়ে দেখা গেছে যে, আফ্রিকার বাইরের সমস্ত পুরুষের উদ্ভব হয়েছে C, D ও F এই তিনটি হ্যাপ্লোগ্রুপ থেকে। এই তিনটি হ্যাপ্লোগ্রুপ আবার উদ্ভূত হয়েছে আফ্রিকার CT হ্যাপ্লোগ্রুপ থেকে।

বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানীরা মনে করেন যে কজন L3 হ্যাপ্লোগ্রুপযুক্ত নারী সেই সময়ে আফ্রিকা ছেড়েছিল, আফ্রিকার বাইরের সমগ্র মনুষ্য সমাজের আদি মাতা তারাই। আধুনিক গণনা অনুযায়ী L3 হ্যাপ্লোগ্রুপ উদ্ভূত হয়েছে সত্তর হাজার বছর বা তার কিছু আগে। আর M ও N হ্যাপ্লোগ্রুপ দুটি তার পরবর্তী দশ হাজার বছরের মধ্যে উদ্ভূত হয়েছে। বিজ্ঞানের যত অগ্রগতি হচ্ছে এই সময় গণনা ক্রমাগত নিখুঁত করার চেষ্টা চলছে। যেহেতু আফ্রিকার বাইরের সমস্ত মাতৃক্রমের উদ্ভব একটিমাত্র 'মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ' হ্যাপ্লোগ্রুপ থেকে, সেহেতু এই সফল মহাপরিযান হয়েছে মাত্র একবার। অর্থাৎ আফ্রিকার বাইরে সেই মহাপরিযানের বংশধরেরা আজ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে, বিভিন্ন জাতিতে ভাগ হয়ে টিকে আছে। আগে যে সব পরিযান হয়েছে, সেগুলির আর কোন উত্তরসূরী নেই। কারণ আলাদা আলাদা সফল পরিযান হলে, আমরা আজকের মাতৃক্রম ধরে পিছন দিকে গেলে একাধিক হ্যাপ্লোগ্রুপের সন্ধান পেতাম। সেটা কিন্তু পাওয়া যায়নি। আবার পিতৃক্রম ধরে পিছনে গিয়েও সেই রকম একটা হ্যাপ্লোগ্রুপেরই সন্ধান পাই।
***************************************************************
আদি ভারতীয়দের জিনগত পরিচয় 

ভারত ছিল আফ্রিকা থেকে প্রাচীন মানুষের পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ার পথের এক গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। পঁয়তাল্লিশ থেকে কুড়ি হাজার বছর আগে প্রাগৈতিহাসিক দক্ষিণ এশিয়াতে বিশ্ব জনসংখ্যার অর্ধেক বাস করত। মানুষের সেই অতি গুরুত্বপূর্ণ পরিযান সম্পর্কে জরুরি তথ্য পাওয়া সম্ভব ভারতের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ডিএনএ সিকোয়েন্স থেকে।

এই শতকের প্রথম থেকেই ভারত ও পৃথিবীর বহু জিনবিদ উপমহাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল থেকে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মানুষের ডিএনএ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে তার ফলাফল প্রকাশ করছেন।

এই সমস্ত গবেষণাপত্রে দেখা যায় যে, সমগ্র ভারতীয়দের মূল 'মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ' হ্যাপ্লোগ্রুপ হল M ও N। N থেকে বিভিন্ন সময়ে উদ্ভূত হয়েছে R ও U হ্যাপ্লোগ্রুপ। ভারতীয়দের মধ্যে এই দুই হ্যাপ্লোগ্রুপও দেখা যায়। মাতৃক্রমের বিচারে অন্ততপক্ষে ৬০% ভারতীয় M 'মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ' হ্যাপ্লোগ্রুপের বিভিন্ন শাখা হ্যাপ্লোগ্রুপগুলি বহন করছে। শতাংশে কিছু বিভিন্নতা লক্ষ্য করা যায় দেশের অঞ্চল, জাতি, বর্ণ ইত্যাদির ওপরে। ভারতবর্ষে পরবর্তীকালে যে পরিযানগুলি হয়েছে, বাদবাকিদের মাতৃক্রমের উৎস আছে তাদের মধ্যে।

হায়দ্রাবাদের সেলুলার এবং মলিক্যুলার বায়লোজি কেন্দ্রের বিশিষ্ট জিনবিদ কুমারস্বামী থঙ্গরাজ দীর্ঘদিন ধরে আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের উপজাতিদের জিনোম বিশ্লেষণের কাজে রত। থঙ্গরাজ ও তাঁর সহযোগীরা গ্রেটার আন্দামানিজ ও ওঙ্গেদের 'মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ', 'ওয়াই-ক্রোমোজোম ডিএনএ' ও সার্বিক 'অটোজোমাল ডিএনএ' বিশ্লেষণ করেন। তারা ওদের মধ্যে দুই অভিনব 'মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ' হ্যাপ্লোগ্রুপ M31 ও M32-কে চিহ্নিত করেছেন। এই হ্যাপ্লোগ্রুপের উৎস দক্ষিণ এশিয়াতে, সম্ভবত ভারতে বলে অনুমান করা হয়েছে। প্রাচীন ওই দুই হ্যাপ্লোগ্রুপ থেকে ভারতে মহাপরিযানের সময়কালের একটা আভাস পাওয়া যায়।

আজ থেকে কমবেশি সত্তর হাজার বছর আগে একটি মাত্র তরঙ্গে, অল্প সময়ের মধ্যে, অতি দ্রুত আধুনিক মানুষ উপকূল বরাবর দক্ষিণ এশিয়াতে ছড়িয়ে পড়ে। দীর্ঘদিন ধরে শ্লথ পরিযান হলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৃথক নতুন হ্যাপ্লোগ্রুপ দেখা যেত। তা কিন্তু হয়নি।

২০০৭ সালে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সোসাইটির জেনোগ্রাফিক প্রজেক্ট দ্বারা পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, দক্ষিণ ভারতে মাদুরাইয়ের কাছাকাছি জোথিমনিকাম গ্রামে বসবাসকারী কিছু পুরুষ C হ্যাপ্লোগ্রুপের এক বিরল জেনেটিক মার্কার M130 বহন করে। জেনেটিক মার্কার হল বিপুল ডিএনএ সিকোয়েন্সের মধ্যে একটি ঠিকানা। উল্লেখ করার মতো বিষয় হল, অস্ট্রেলিয়ান আদিবাসীদের মধ্যেও M130 মার্কার পাওয়া গেছে। পুরুষের 'ওয়াই-ক্রোমোজোম ডিএনএ' হ্যাপ্লোগ্রুপের নির্দিষ্ট মার্কার থেকে তিনটি মহাদেশের মধ্যে একটি অতি প্রাচীন যোগাযোগের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এই তথ্য একইসঙ্গে ভারতীয়দের প্রাচীনতা ও ওই মহাপরিযানের সম্ভাব্য পথেরও ইঙ্গিত দেয়। সম্ভবত মাদুরাই অঞ্চল থেকে কিছু মানুষ অস্ট্রেলিয়ায় পরিযান করেছিল। তারা আদিতে এসেছিল আফ্রিকা থেকে। সম্ভবত তারা ছিল মহাপরিযান দলের সদস্য বা তার নিকট বংশধর।

পুরুষদের 'ওয়াই-ক্রোমোজোম ডিএনএ' হ্যাপ্লোগ্রুপ ধরে বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে, ভারতে পিতৃক্রম অনুযায়ী সরাসরি আফ্রিকা থেকে আগত হ্যাপ্লোগ্রুপের প্রভাব তুলনায় কম, ৪০ থেকে ১০ শতাংশের বেশি নয়। এই তথ্য প্রাথমিকভাবে বিভ্রান্তিকর ঠেকে। মাতৃক্রমের দিক দিয়ে অধিকাংশ মানুষ আফ্রিকা থেকে সরাসরি আগত নারীর বংশধর, কিন্তু পিতৃক্রমের দিক দিয়ে পুরুষরা নয় কেন?

আসলে আফ্রিকা থেকে প্রথম যে মানুষ এদেশে এসেছিল ভারতে ইতিহাস সেখানেই থেমে নেই। পরে আরও পরিযান হয়েছে, হয়েছে মানুষের মিশ্রণ। সেই পরিযানগুলি হয়েছে তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক অতীতে পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চল থেকে। এরাও আদিতে সেই মহাপরিযান গোষ্ঠীর বংশধর। তবে এরা চলে গিয়েছিল পৃথিবীর অন্য প্রান্তে, সেখানে পরিব্যক্তির জন্য তাদের হ্যাপ্লোগ্রুপ হয়ে গেছে ভিন্ন। আবহাওয়া ও খাদ্যের জন্য দেহের আকার, বর্ণ হয়েছে আলাদা। তারা পরবর্তী পরিযানে ভারতবর্ষে আসে। ভারতবর্ষে আগমনকারী সেই পরিযানগুলিতে পুরুষ ছিল নারীদের তুলনায় অনেক বেশি। তারা ভারতে এসে এখানকার নারীদের সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে নিজেদের 'ওয়াই-ক্রোমোজোম ডিএনএ' রেখে গেছে পুরুষানুক্রমে ভারতীয় পুরুষের মধ্যে। যে কোনও কারণেই হোক সরাসরি আফ্রিকা থেকে আগত আদি ভারতীয় পুরুষেরা নবাগতদের তুলনায় কম বংশধর রাখতে সক্ষম হয়েছে - হয়তো তাদের নারীদের কোনোভাবে দখল করেছে নবাগত পুরুষদের দল। ...

সত্তর হাজার বছর আগে আধুনিক মানুষের ছোট এক দল সুদূর আফ্রিকা থেকে আরব দেশ ছাড়িয়ে সিন্ধুনদের তীরে ভারতবর্ষে প্রথম পা রেখেছিল। তারাই হল প্রাচীন ভারতের আদি অধিবাসী। জিনবিদরা সেই প্রাচীন জনগোষ্ঠীর নাম দেন 'আদি প্রাচীন দক্ষিণ ভারতের অধিবাসী শিকারী-সংগ্রাহক' বা 'Ancient Ancestral South Indian Population'। এই গ্রন্থে ওদের বলা হয়েছে 'আন্দামানি শিকারী-সংগ্রাহক', কারণ আজকের আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের আদি অধিবাসী ওঙ্গে, সেন্টিনেলিজ, জারোয়ারা ওই প্রাচীন জনগোষ্ঠীর নিকটতম জেনেটিক প্রতিনিধি।
***************************************************************
জিনবিদ্যা ও আমাদের সংস্কার 

আধুনিক মানুষের উৎস আফ্রিকা। এক সময়ে শ্বেত-আধিপত্যবাদীদের এই সত্য গলাধঃকরণ করতে কষ্ট হয়েছে। তখন প্রচার করা হয়েছিল 'নিয়ান্ডারথাল'দের থেকে ইউরোপীয়দের উৎপত্তি। অর্থাৎ ওরা অন্যদের থেকে ভিন্ন। জিনবিদ্যার গবেষণায় এ দাবি ধোপে টেঁকেনি। কেননা শুধু ইউরোপে নয়, আফ্রিকার বাইরে সকল মানুষের মধ্যেই সামান্য 'নিয়েন্ডারথাল' জিন উপস্থিত আছে।

এমনকি ইংল্যাণ্ডে মিথ্যা জীবাশ্ম তৈরি করে প্রমাণের চেষ্টা হয়েছে ইংল্যাণ্ডেই ওদের উৎস। এ প্রসঙ্গে পিল্টডাউন ম্যানের কথা স্মর্তব্য। ১৯১২ সালে শখের নৃতত্ত্ববিদ চার্লস ডসন দাবি করেছিলেন তিনি এপ ও মানুষের মধ্যেকার 'মিসিং লিংক' আবিষ্কার করেছেন। জিওলজিক্যাল সোসাইটির সভাতেও ঘোষণা করা হয়েছিল যে, ওই করোটি জীবাশ্ম পাঁচ লক্ষ বছর আগের। ওই ঘোষণার মূল প্রতিপাদ্য হল - ইংরেজরা আফ্রিকা থেকে উদ্ভূত নয়, ওরা পৃথিবীর অন্য মানুষদের থেকে পৃথকভাবে ওদের দেশেই উদ্ভূত হয়েছে। তবে ১৯৫৩ সালে ধরা পড়ে যায় তার এই জালিয়াতি।

বিজ্ঞানভিত্তিক নতুন চিন্তা অনেকে সহজভাবে নিতে পারে না, তারা সত্যকে দেখতে পায় না। অথবা হয়তো দেখতে চায় না। ১৮৫৯-এ চার্লস ডারউইনের 'অন দ্য অরিজন অফ স্পিসিস' প্রকাশিত হবার পরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া এসেছিল। এই সম্পর্কিত একটা বিখ্যাত ঘটনার উল্লেখ করছি, আজকে হয়তো তা অকল্পনীয় মনে হবে।

১৯২৫ সালে আমেরিকা হিলসবরোতে এক তরুণ জীববিদ্যার শিক্ষক স্কুলে ডারউইনের বিবর্তনবাদ পড়ান। সেই অপরাধে যুবকটির বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল। আবার সেই ঘটনা নিয়ে ১৯৫৫ সালে আমেরিকাতে বিখ্যাত নাটক 'ইনহেরিট দ্য উইণ্ড' মঞ্চস্থ হয়।

স্কুলশিক্ষক ডারউইনের বিবর্তনবাদ পড়ালে কি দেশের আইন ভঙ্গ হয়? পৃথিবীর সৃষ্টি কি মাত্র ৬,০০০ বছর আগে? বিবর্তনবাদ কি নাস্তিক্য ধর্ম? ইউরোপ, আমেরিকায় কিছুদিন আগেও এই সব প্রশ্ন ছিল। পরবর্তীকালে 'ডারউইনিজম' এক আন্দোলনের জন্ম দেয়। সৃষ্টির ধারণা বিকাশের ক্ষেত্রে তা নেয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। দেহবর্ণ ও জাতিগত বৈষম্যের বিরুদ্ধে মানুষের চিন্তাধারাকে করে তোলে আধুনিক। 

যা কিছুতে আমরা অভ্যস্ত, তা ব্যত্যয় আমরা সহজে গ্রহণ করতে পারি না। আফ্রিকার মানুষের সঙ্গে আমরা সম্পর্কিত, এই কথা অনেক সাধারণ মানুষও মানতে চান না। তাদের প্রশ্ন আসে, আমার দেহের রঙ তো অত গাঢ় নয়? আমি কেন আফ্রিকার মানুষের উত্তরপুরুষ হব?

দেহের ও চুলের রঙ নিয়ে এক সংস্কার দীর্ঘদিন ধরেই আমাদের মধ্যে আছে।

মনে পড়ে হার্পার লির যুগান্তকারী গ্রন্থ 'টু কিল এ মকিং বার্ড' বইটির কথা! আফ্রিকার কালো মানুষদের জন্য এই সেদিনও আমেরিকাতে আলাদা গির্জা রাখা হত। আমাদের পরিচ্ছন্ন আদিবাসীদের সম্পর্কে স্তেপভূমি থেকে আগত শ্বেতকায়দের দৃষ্টিভঙ্গী সুকুমারী ভট্টাচার্যের 'বেদে সংশয় ও নাস্তিক্য' গ্রন্থে আলোচিত হয়েছে। এই দৃষ্টিভঙ্গী স্বাক্ষরিত আছে আমাদের বর্ণভেদ প্রথায়।

অথচ জিনবিদ্যার সাহায্যে বোঝা যায়, হাজার দশেক বছর আগেও আমরা সবাই কালো ছিলাম। জিনোম বিজ্ঞানের গবেষণায় দশ হাজার বছর আগের এক ব্রিটিশের মুখের প্রতিচ্ছবি নির্মাণ করা হয়েছে। তার ছিল ঘন কালো দেহবর্ণ, চুল কৃষ্ণবর্ণ, চোখ সবুজ। ওই প্রাচীন ব্রিটিশের নাম দেওয়া হয়েছে 'ছেডার ম্যান'।

ডিএনএ বিশ্লেষণ করে একটা মানুষের লিঙ্গ, চুলের রঙ, ত্বকের রঙ, বয়স, সে কোন রোগে আক্রান্ত ছিল কিনা কিংবা কোন অঞ্চল থেকে সে উদ্ভূত এবং আরও অনেক তথ্য জানা যায়। আজ থেকে মাত্র ৫,৭০০ বছর আগের ডেনমার্কের একটি মেয়ের মুখের ছবি তৈরি করা হয়েছে। মেয়েটির দেহবর্ণ ছিল কালো, চুল খয়েরি। চোখ নীল। তখনও ইউরোপের কিছু অংশের মানুষের দেহবর্ণ ছিল কালো। বেশ কয়েক হাজার বছর ধরে ধীরে ধীরে ওদের দেহবর্ণের অভিযোজন হয়ে ফ্যাকাসে হয়ে গেছে।

ও থাকত বাল্টিক সাগরের তীরে এক গাঁয়ে। সেই মেয়ে ছিল ইউরোপীয় শিকারী-সংগ্রাহক গোষ্ঠীর সদস্য। মাছ ধরার কাজে সেই সময়ে ওরা বার্চ গাছের আঠা ব্যবহার করত। এই মেয়ে সেই বার্চ গাছের আঠা চিবিয়েছিল। যেখানে মেয়েটি আঠার টুকরো ফেলেছিল সেখানে বালির স্তরের নিচে সেটি আটকে সিল হয়ে গিয়েছিল। সেই আঠাতে রয়ে গেছে ওর দাঁতের দাগ আর তার সঙ্গে রয়ে গেছে ওর ডিএনএ।

সে সময়ে ওরা আঠা ব্যবহার করত জলের মধ্যে ছোট বেড়া তৈরি করতে। সেই বেড়াতে আটকে পড়া মাছ শিকার করত। আশ্চর্যজনকভাবে ওখানে কোন মানুষের দেহাবশেষ পাওয়া না গেলেও আঠাতে লেগে থাকা দাঁতের দাগ থেকে বিজ্ঞানীরা সেই নারীর সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্সিং করতে পেরেছেন। আর সেই জিনোম সিকোয়েন্সিং থেকে ওই নারীর চেহারা সম্পর্কে আজকে একটা আন্দাজ করা সম্ভব হচ্ছে।

পৃথিবীতে সামগ্রিকভাবে বিজ্ঞানের, বিশেষ করে জিনবিদ্যার বিপ্লব ঘটে যাচ্ছে। প্রতিদিন যুগান্তকারী আবিষ্কারের কথা প্রকাশিত হচ্ছে, যা আমাদের পুরনো ধ্যানধারণাকে পাল্টে দিতে সাহায্য করে।

শীতের দেশের মানুষের রঙ হালকা হওয়ার মূল কারণ ত্বকের এক ধরনের অভিযোজন। এক সময়ে সকলের রঙ ছিল গাঢ়। তবে শীতের দেশে সূর্যের আলো কম। মানুষের ত্বক ভিটামিন-ডি সংশ্লেষ করে সূর্যালোকের সাহায্যে। কালো ত্বক সূর্যালোককে চামড়ার গভীরে ঢুকে ভিটামিন-ডি তৈরি করার পথে বাধা দেয়। যেখানে সূর্যের তেজ যথেষ্ট, সেখানে ত্বকের কালো রঙ সূর্যালোকের ক্ষতিকর ও অনাবশ্যক প্রবেশ আটকায়। কিন্তু শীতের দেশে কালো রঙ হলে মুশকিল, বিশেষ করে যদি খাদ্যে ভিটামিন-ডি কম থাকে। মনে করা হয়, যখন সবাই শিকারী-সংগ্রাহক ছিল তখন খাদ্যে ভিটামিন-ডি পরিমাণে ছিল অনেক বেশি। ওরা বিভিন্ন ধরনের মাছ, ডিম খেত। সেই সময়ে কালো চামড়া জৈবিকভাবে অসুবিধাজনক হয়নি। কিন্তু কৃষি খানিকটা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবার পরে খাদ্যাভাস পাল্টে যায় আর তখন শীতের দেশের মানুষের চামড়ার রঙ ফ্যাকাশে হওয়া বেঁচে থাকার পূর্বশর্ত হয়ে দাঁড়ায়।

অল্প কিছুদিন আগেও, ইউরোপ ছিল কালো মানুষের দেশ। শুধু ব্রিটেন বা ডেনমার্ক নয়, অন্য দেশেও মানুষ কালো ছিল। স্পেনে সাত হাজার বছর আগের মানুষের পুনর্নির্মিত মুখ কালো রঙ ফুটিয়ে তুলেছে। গ্রিসেও তাই। সারা ইউরোপের মানুষের ফর্সা হতে কয়েক হাজার বছর লেগেছে। বর্ণের পরিবর্তন এক প্রকার অভিযোজন।
***************************************************************
আধুনিক মানুষের অনুমিত উদ্ভবকাল হল তিন লক্ষ পঁয়ত্রিশ হাজার বছর আগে। আর কৃষিকাজ শুরু হয়েছে এগারো-বারো হাজার বছর আগে। ভাবতে অবাক লাগে, মানুষের মেয়াদকালের ৯৭% সময় সে কৃষিকাজ না করে কাটিয়েছে। দীর্ঘকাল তাদের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় শস্যজাত খাদ্য ছিল না।
***************************************************************
ভারতবর্ষে মানুষের মিশ্রণের প্রাথমিক ইতিহাস 

হলোসিন যুগের শুরু থেকে পূর্ব ইরানের অভিবাসীরা সিন্ধুনদের অববাহিকার দিকে চলে আসতে থাকে। তখন সারা ভারতে ছিল অবিমিশ্র 'আন্দামানি শিকারী-সংগ্রাহক'রা। ওই অঞ্চলের আদি 'আন্দামানি শিকারী-সংগ্রাহক'দের সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে ইরানের অভিবাসীরা বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে বসতি স্থাপন করে। এই মিশ্রণে 'প্রাচীন ইরান-সম্পর্কিত শিকারী-সংগ্রাহক 'দের পরিমাণ ছিল অনেকটা বেশি। হয়তো ওরা দেশের আদি 'আন্দামানি শিকারী-সংগ্রাহক'দের ঠেলে দিয়েছিল প্রত্যন্তে। যাহোক, সেই 'সিন্ধু নদের মিশ্র মানুষ' গড়ে তোলে তৎকালীন ভারত উপমহাদেশের প্রথম নগরকেন্দ্রিক সভ্যতা - হরপ্পীয় সভ্যতা।

পরবর্তীকালে হরপ্পীয় সভ্যতা বিস্তৃত হতে লাগল উত্তর ও পশ্চিম ভারতে। সিন্ধু অঞ্চলের মিশ্র মানুষ হরপ্পীয় সভ্যতার ক্ষয়ের সময় থেকে, অথবা হয়তো আরও আগে, ছড়িয়ে পড়ে সারা ভারতে, দেশের পূর্ব ও দক্ষিণ প্রান্তে। দক্ষিণ ভারতে এসে ওরা সেখানকার 'আন্দামানি শিকারী-সংগ্রাহক'দের সঙ্গে আরও একবার মিশ্রিত হয়। দক্ষিণাঞ্চলে তৈরি হয় 'প্রাচীন দক্ষিণ ভারতের মিশ্র জাতি'। আজও দক্ষিণ ভারতের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যেও 'সিন্ধু নদের মিশ্র মানুষ'র প্রোফাইল পাওয়া যায়।

ডেভিড রাইখ ও তার সহকর্মীদের মডেল অনুযায়ী প্রায় ২,০০০ - ১,০০০ সাধারণ পূর্বাব্দের মধ্যে রাশিয়া/মধ্য-এশিয়ার স্তেপ অঞ্চল থেকে পশুপালকরা আসে উত্তর ভারতে। সেই দলে নারীর সংখ্যা ছিল কম। 'সিন্ধু নদের মিশ্র মানুষ' এর সঙ্গে এই নতুন অভিবাসীদের মিশ্রণে সমগ্র উত্তর ভারত জুড়ে তৈরি হয় 'প্রাচীন উত্তর ভারতের মিশ্র' জাতি। ওই মিশ্রণ ছিল মূলতঃ 'সিন্ধু নদের মিশ্র মানুষ' ও ইন্দো-ইউরোপীয় পশুপালকের মিশ্রণ।

তবে এখন আর 'বিশুদ্ধ' এই দুই পৃথক গোষ্ঠীর মানুষ পাওয়া সম্ভব নয়। কারণ পরবর্তী সময়ে এদের নিজেদের মধ্যে আবার মিশ্রণ হয়েছে। এই দুই প্রাচীন জনগোষ্ঠীর মিশ্রণে আজকের বিভিন্ন ভারতীয় জাতিগোষ্ঠীর সৃষ্টি। এছাড়াও অঞ্চল বিশেষে সংমিশ্রণ হয়েছে পরবর্তীকালে আগত বিভিন্ন আগন্তুকদের সঙ্গেও। এই মিশ্রণের অনুপাত দেশের বিভিন্ন অঞ্চল, জাতি ও বর্ণের ক্ষেত্রে ভিন্ন।

ভারতীয়দের ডিএনএ বিশ্লেষণের মূল কথা এরকম। আগের অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে যে, আমাদের 'মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ' আসে মায়ের দিক থেকে। সেগুলো অধিকাংশই আফ্রিকা থেকে পঁয়ষট্টি হাজার বছর আগে ভারতে আদি আগমনকারী মানুষের 'মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ'-এর সঙ্গে ঘনিষ্টভাবে সম্পর্কিত। সেই আগমনকারীদের দলে নারী ছিল, এবং তাদের উত্তরসূরী এখনও ভারতে যথেষ্ট পরিমাণে আছে। অন্যদিকে, 'ওয়াই-ক্রোমোজোম ডিএনএ' আসে কেবল বাবার দিক থেকে। এই ডিএনএ কেবল পুরুষদের থাকে। তাদের মধ্যে আদি আগমনকারীদের 'ওয়াই-ক্রোমোজোম ডিএনএ' পাওয়া যায় তুলনায় অনেক কম। তার মানে পরে-আসা জনগোষ্ঠীগুলির পুরুষরা পূর্বতনদের চাইতে বেশি বংশধর রেখে গেছে। কেমন করে এটা সম্ভব হল? পরে-আসা গোষ্ঠীগুলিতে পুরুষের সংখ্যা ছিল বেশি, নারী ছিল কম। পুরুষরা মাইগ্রেট করেছে আর নারীরা থেকে গেছে একই অঞ্চলে। নতুন আসা পুরুষরা কোনভাবে ভারতবর্ষের আগে-আসা গোষ্ঠীর নারীদের ওপর নিজেদের অধিকার স্থাপন করতে পেরেছে। হয়তো পুরনো গোষ্ঠীর পুরুষরা লড়াইতে হেরে পালিয়ে গেছে, বা খাদ্যাভাব হওয়ায় তাদের নারীরা নতুন 'ক্ষমতাশালী' গোষ্ঠীর পুরুষদের কাছে এসেছে।

ভারতবর্ষে পিতৃধারায় 'ওয়াই-ক্রোমোজোম ডিএনএ'-র মূল হ্যাপ্লোগ্ৰুপগুলি হল R, H, L ও J। প্রায় ৭৭% ভারতীয় পুরুষ এই চারটি হ্যাপ্লোগ্ৰুপের অন্তর্গত। এর মধ্যে R-এর উৎস স্তেপ অঞ্চলে। আর H ও L হ্যাপ্লোগ্ৰুপের উৎস মধ্য এশিয়ার দিকে, J-এর উৎস ফার্টাইল ক্রিসেন্ট। শাহর-ই-শোকতা ও ব্যাকট্রিয়া-মার্জিয়ানা আর্কিওলজিক্যাল কমপ্লেক্সে প্রাপ্ত ২টি দেহাবশেষের 'ওয়াই-ক্রোমোজোম ডিএনএ' বিশ্লেষণ করে পাওয়া গেছে H1 হ্যাপ্লোগ্ৰুপ।    

এককথায়, ইরান বা পরে স্তেপ থেকে আসা দলে পুরুষ ছিল বেশি, নারী তুলনায় কম। সেই পুরুষেরা ভারতে এসে এখানকার আদি নারীদের সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে পুরুষানুক্রমে নিজেদের ওয়াই-ক্রোমোজোম ডিএনএ রেখে গেছে এই দেশের পুরুষদের মধ্যে।
***************************************************************
প্রায় পৌনে চার হাজার বছর আগে ওই সভ্যতা বিনষ্ট হয়েছে, কিন্তু তাদের সভ্যতা, সংস্কৃতি, অর্জিত জ্ঞান সবই কি নষ্ট হয়ে গেছে? 

একথা সত্য, কিছু প্রযুক্তিগত বিদ্যার ধারাবাহিকতা আর ছিল না। নগরের সেই নির্মাণ শৈলী, পশ্চিম এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য, বন্দরনগরী, অথবা লিখিত সিল হারিয়ে গিয়েছে। এমনকি পরিকল্পিত শহর, সমকোণে মিলিত হওয়া শহুরে রাস্তাঘাট, জনস্বাস্থ্য সচেতনতা কয়েক হাজার বছরে ফিরে আসেনি। তবে গ্রামীণ যে সভ্যতা ওখানে ছিল - চাষের কাজে বলদের ব্যবহার, বিভিন্ন ধরনের গহনা, দাবা ও পাশা খেলা, মূর্তিপূজা, জীবনে গাছ ও পশুর গুরুত্ব, বলদে টানা যানবাহন, মৃৎশিল্প ও চাকার ব্যবহার, ধাতুশিল্প, নাচের মুদ্রা, সঙ্গীতের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের বাজনা ইত্যাদির ধারাবাহিকতা সম্ভবত চলেছে আজও। হরপ্পীয় সভ্যতার নাগরিক নিদর্শন আমরা উদ্ধার করেছি বটে, কিন্তু যুক্তিসঙ্গতভাবে মনে হয় নগরকে উদ্বৃত্ত খাদ্য জোগাত বিরাট গ্রামাঞ্চল। তার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন নষ্ট হয়ে গেছে, কিন্তু সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা হয়তো বজায় থেকেছে বহুকাল। 

আজকে ডিএনএ তথ্য বলছে ওরা পরবর্তীকালে প্রায় সমগ্র ভারতে ছড়িয়ে পড়েছিল।

সাড়ে তিন হাজার বছর আগে নাগাদ ইউরেশিয়দের আগমনের ফলে এদেশে আসে বৈদিক সভ্যতা। এই বৈদিক সভ্যতা দিয়েছে নতুন ভাষা, তৈরি হয়েছে গ্রামভিত্তিক অর্থনীতি। কিছু ধর্মীয় জীবনচর্যা যেমন শবদাহ ও অন্যান্য অগ্নিসংস্কার এদের থেকেই এসেছে। ইতিহাসে বৈদিক সভ্যতার অবদান যতটা চর্চা করা হয়, সিন্ধু সভ্যতার কথা সেভাবে আলোচিত হয় না। যে দেশে একসময়ে এত লিখিত সিলের ব্যবহার হত, সেখানেই পরবর্তীকালে কয়েক হাজার বছর ধরে জোর দেওয়া হয় শ্রুতিতে, শোনা কথায়।
***************************************************************
ইউরোপীয় দেহাবশেষ থেকে প্রাচীন ডিএনএ বিশ্লেষণ করে গবেষকরা কতগুলি ফলাফল লিপিবদ্ধ করেন:

* রাশিয়ার নব্যপ্রস্তর যুগ ও ব্রোঞ্জ যুগের পুরুষদের দেহাবশেষে R1a বা R1b হ্যাপ্লোগ্রুপকে ১০০% জিনে চিহ্নিত করা গেছে। এদের মধ্যে য়াম্নায়া পুরুষরা R1b হ্যাপ্লোগ্রুপ বহন করেছে। এই সময়কাল হল আজ থেকে সাড়ে ন'হাজার থেকে চার হাজার সাতশো বছর আগে পর্যন্ত।

* তবে রাশিয়ার বাইরে নব্যপ্রস্তর যুগে R1b ডিএনএ-বিশিষ্ট প্রাচীন দেহাবশেষ পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ য়াম্নায়ারা আসার আগে ইউরোপে ওই বিশেষ হ্যাপ্লোগ্রুপের কোন অস্তিত্ব ছিল না। এই হ্যাপ্লোগ্রুপ রাশিয়ান স্তেপ অঞ্চলের, আর তা বাকি ইউরোপে বহন করে এনেছে য়াম্নায়ারা।

* R1a ও R1b হ্যাপ্লোগ্রুপ রাশিয়া থেকে ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে পাঁচ হাজার থেকে সাড়ে চার হাজার বছর আগে। এই দুটি হ্যাপ্লোগ্রুপ আজকের রাশিয়া সহ সারা ইউরোপের পুরুষদের মধ্যে সবচাইতে বেশি পরিমাণে পাওয়া যায়।

সহজ কথায় বললে, হ্যাপ্লোগ্রুপ R ও তার উপশাখাগুলি নব্যপ্রস্তর যুগের প্রাচীন ইউরোপে পাওয়া যায়নি। এই হ্যাপ্লোগ্রুপ ও তার শাখা য়াম্নায়াদের ইউরোপ অভিযানের পরে ওই অঞ্চলে প্রাচীন দেহাবশেষে পাওয়া যায়। অপরদিকে য়াম্নায়াদের সবাই এই জিন বহন করেছে; এর কোনও ব্যতিক্রম পাওয়া যায়নি। ওরা আসার আগে ইউরোপে এক স্থিতিশীল কৃষিভিত্তিক সমাজ ছিল। য়াম্নায়ারা ইউরোপের সেই স্থিতিশীল সমাজকে ভেঙে দিয়ে, কৃষকদের প্রতিস্থাপিত করে নিজেদের সম্প্রসারিত করেছিল। ...

... ইউরোপে বর্তমান অধিবাসীদের জিনপুলের মধ্যে অন্তত ১২% থেকে ৮৫% মানুষ প্রাচীন সেই যাযাবর পশুপালকের R1b1b2 মার্কার বহন করছে। শতাংশের বিভিন্নতা নির্ভর করছে অঞ্চলের ওপরে। তুরস্কের পূর্ব দিকে এই জিন সমাহার সবচাইতে কম, আর পশ্চিমে আয়ারল্যাণ্ডে সবচাইতে বেশী। এই নতি তৈরি হয়েছে পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে।
***************************************************************
আজকের উত্তর ইউরোপীয়দের মত অতটা না হলেও য়াম্নায়াদের দেহবর্ণ ছিল বেশ হাল্কা। এটি একটি জেনেটিক রূপান্তরের (SLC24A5) ফলে হয়েছে। মজার কথা হল, নির্দিষ্ট জিনের এই রূপান্তর ইউরোপীয় ও দক্ষিণ এশীয়দের একটা অংশের মধ্যে দেখা যায়। এই রূপান্তর পাওয়া যায় উত্তর ভারত, পাকিস্তান ও মধ্য এশিয়াতে। তবে দক্ষিণ ভারতীয়দের মধ্যে কিন্তু রূপান্তরটি পাওয়া যায় না। পূর্ব এশীয়, অর্থাৎ চীন জাপান ইত্যাদি দেশের মানুষের বর্ণও হালকা। তবে তাদের হালকা বর্ণ কিন্তু অন্য একটি জেনেটিক রূপান্তরের ফল।
***************************************************************
ওয়াই-ক্রোমোজোমে R1a1a-Z93 ডিএনএ ভারতের উচ্চবর্ণের মধ্যে দেখা যায়। বিশেষ করে উত্তর ভারতের ব্রাহ্মণদের মধ্যে এই ডিএনএ বা তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ডিএনএ-র প্রাধান্য অবিসংবাদিত। মধ্য এশিয়াতেও এই ডিএনএ যথেষ্ট পাওয়া যায়। বিভিন্ন আনুষঙ্গিক তথ্যের ওপরে ভিত্তি করে বলা যায় যে, সম্ভবত আজ থেকে চার হাজার থেকে তিন হাজার আটশ বছর আগের মধ্যে ভারতীয় উপমহাদেশে R1a1a-Z93 প্রবেশ করেছে। আজ থেকে প্রায় চার হাজার বছর আগে মধ্য এশিয়ার ব্রোঞ্জ যুগের জনগোষ্ঠী ইউরেশিয়ার পূর্ব ও দক্ষিণ দিকে সম্প্রসারিত হয়েছিল।   
***************************************************************
ইন্দো-ইউরোপীয়রা ভারতে একবারে আসেনি। দলে দলে এসেছে। তাদের মধ্যে একটি দল হয়তো বেদের একটা অংশ বহন করে এনেছে। অধ্যাপিকা সুকুমারী ভট্টাচার্য মনে করেন, তারাই শেষ বৃহৎ দল।

অধ্যাপক রামশরণ শর্মা মনে করেন, ঋগ্বেদে উল্লিখিত দাস ও দস্যু হয়তো এক গোষ্ঠী নয়। দস্যুরা হরপ্পীয় সভ্যতার উত্তরসূরী। দাস হয়তো অগ্রগামী ইন্দো-ইউরোপীয় গোষ্ঠীর অধস্তন পুরুষ। ঋগ্বেদের প্রথম দিকে দাস হত্যার কথা বিশেষ নেই, ওদের সঙ্গে আগন্তুকদের আচরণ ছিল কিছুটা সংযত। কিন্তু দস্যুদের ক্ষেত্রে তা নয়। ইন্দ্রও দাসেদের থেকে দস্যুদেরই বেশি আক্রমণ ও হত্যা করেছে। যারা যাগযজ্ঞ করে না তাদের মেরে ফেলে সেই ধনসম্পদ সকলকে বিলিয়ে দেওয়া হবে, এইরকমই আশা সকলে পোষণ করত। অনেক সময়ে তাদের পরাজিত করা হয়েছে ও গৃহকর্মে নিযুক্ত করা হয়েছে। এদের অপমানজনক অভিধায় ভূষিত করা হয়েছে, যেমন অনাস, বৃষশিপ্র, রাক্ষস, দাস, দস্যু। বৃষের মতো মোটা ঠোঁট বলে তাদের ওরা বলেছে বৃষশিপ্র।
***************************************************************
ভারতের মুসলমান সমাজ 

ভারতীয় মুসলমানরা এদেশীয় নাকি তারা দেশের বাইরে থেকে এসেছেন - এ নিয়ে বিতর্ক চলেছে বহুদিন।

২০০৭ সালে মারিয়া সি টেরেরোস ও তার সহকর্মীরা জিনবিদ্যার প্রাথমিক গবেষণায় দাবি করেন যে, ভারতীয় শিয়া ও সুন্নি সম্প্রদায়ের মধ্যে পশ্চিম-এশিয়ার 'মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ'-র সুস্পষ্ট অনুপস্থিতি প্রমাণ করে তারা দেশের বাইরে থেকে আসেনি। ডিএনএ নমুনা নেওয়া হয়েছিল মূলতঃ উত্তরপ্রদেশের শিয়া ও সুন্নি গোষ্ঠীগুলি থেকে। সেই ডিএনএ বিশ্লেষণ করে মধ্য এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকার হ্যাপ্লোগ্রুপের সঙ্গে তুলনা করা হয়। এরপরে তারা সিদ্ধান্তে আসেন যে, ভারতীয় মুসলিমরা মাতৃক্রমের দিক দিয়ে দেশের বাইরের লোকেদের সঙ্গে নয় বরং অন্যান্য ভারতীয় গোষ্ঠীর সঙ্গে তুলনীয়। তারা মাতৃক্রমে ভারতীয় বংশোদ্ভূত।

পুরুষদের ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী বিভিন্ন ওয়াই-ক্রোমোজোম ডিএনএ ডেটা থেকে উনি সিদ্ধান্তে এসেছেন যে, ভারতীয় মুসলমানরা আঞ্চলিক প্রতিবেশী হিন্দুদের থেকে ধর্মান্তরিত। তবে ভারতীয় শিয়াদের মধ্যে আফ্রিকান ও মধ্য প্রাচ্যের 'ওয়াই-ক্রোমোজোম ডিএনএ'-র YAP মিউটেশনের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি আছে। শিয়াদের এই মার্কার প্রমাণ করে, সম্ভবত একটা জিন প্রবাহ হয়েছিল মধ্য এশিয়া থেকে ভারতবর্ষে। এটি কিন্তু সুন্নিদের মধ্যে অনুপস্থিত।

২০১০ সালে মুথুকৃষ্ণ ঈশ্বরকণ্ঠ, জ্ঞানেশ্বর চৌবে, ক্রিস টাইলার স্মিথ, কুমারস্বামী থঙ্গরাজনদের গবেষণাতে দেখা যায় যে, মুসলিমদের জিনোমিক প্রোফাইল ভৌগোলিকভাবে পার্শ্ববর্তী অমুসলিমদের সঙ্গেই মেলে। তবে সামান্য পরিমাণে আফ্রিকা, আরব ও পশ্চিম এশিয়া থেকেও জিন এসেছে। এইগুলি হল L0a2a2 'মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ' এবং E1b1b1a ও J 'ওয়াই-ক্রোমোজোম ডিএনএ'। শেষ পর্যন্ত ওরাও মারিয়া সি টোরোসাস-এর মত একই সিদ্ধান্তে এসেছেন। ভারতবর্ষে ইসলাম কোন ব্যাপক বহিরাগত জিন প্রবাহ নিয়ে প্রবেশ করেনি।

প্রায় একই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে জোনমিং ঝাও ও তার সহকর্মীদের গবেষণায়। ওরা দেশীয় শিয়াদের মধ্যে সনাক্ত করেন এক বিশেষ হ্যাপ্লোগ্রুপ E1b1b1। এটি সুন্নিদের মধ্যে পাওয়া যায় না। শিয়াদের মধ্যে এই হ্যাপ্লোগ্রুপের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, মুসলিমদের দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে জিনগত পার্থক্য আছে।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ভারতীয় মুসলমানরা যদিও হিন্দু বর্ণপ্রথা অনুসরণ করে না তবে তারাও নিজস্ব সম্প্রদায়ের মধ্যেই বিবাহ সীমাবদ্ধ রাখে। অর্থাৎ সুন্নি এবং শিয়ারা নিজেদের গোষ্ঠীর মধ্যেই বিবাহ করতে পছন্দ করে। দেশজুড়ে মুসলমানদের নিয়ে একাধিক গবেষণায় জিনোম সিকোয়েন্সিং করে এই সিদ্ধান্তে আসা যায় যে, ভারতে ইসলামের বিস্তার মূলতঃ একটি সাংস্কৃতিক সংশ্লেষ, মুসলিম বিশ্ব থেকে জিন প্রবাহের প্রমাণ তেমন পাওয়া যায় না। ভারতীয় মুসলমানরা ক্ষত্রী, কুর্মী, ব্রাহ্মণ এবং ঠাকুরদের মতোই ভারতীয়।
***************************************************************
ডেভিড মহল প্রমুখ ২০১৮ সালে কিছু মূল জনগোষ্ঠীর ওয়াই-ক্রোমোজোম ডিএনএ হ্যাপ্লোগ্রুপগুলি বিশ্লেষণ করে জেনেটিক মার্কারের সাহায্যে তাদের ভৌগোলিক উৎসকে সনাক্ত করার চেষ্টা করেছেন। ভারতীয় উপমহাদেশের ৫০টি বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর থেকে মোট ২৫০৪টি নমুনা সংগ্রহ করে 'ওয়াই-ক্রোমোজোম ডিএনএ' ও 'অটোমোজাল ডিএনএ' বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ফলাফলগুলি থেকে সামগ্রিকভাবে ভারতে পিতৃক্রমের দিক দিয়ে মোট ১৪টি বিভিন্ন হ্যাপ্লোগ্রুপকে সনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। এই হ্যাপ্লোগ্রুপগুলি আবার পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে মিউটেট করেছে। এইসব তথ্য বিশ্লেষণ করে ওরা কতগুলি সিদ্ধান্তে আসেন।

ভারতবর্ষে ওদের পরীক্ষিত প্রতিটি জাতিগোষ্ঠীর একাধিক হ্যাপ্লোগ্রুপের প্রতিনিধিত্ব আছে। এর থেকে বোঝা যায় যে, একটি সম্প্রদায়ের মধ্যেও একাধিক ভৌগোলিক উৎস থেকে আগত মানুষ আছে। যদিও মোট তথ্যভাণ্ডারে ১৪টি হ্যাপ্লোগ্রুপের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া গেছে, তবে দেশের প্রায় ৯০% মানুষই পিতৃক্রমের দিক দিয়ে মাত্র ৭টি হ্যাপ্লোগ্রুপের অন্তর্ভুক্ত। এই গ্রুপগুলি হল: F, G, H, J, L, O এবং R। এদের মধ্যে আবার প্রায় ৭৭% মানুষ ৪টি বৃহত্তম হ্যাপ্লোগ্রুপের অন্তর্ভুক্ত: R, H, L এবং J।

হ্যাপ্লোগ্রুপ R - এটি ভারত ও পাকিস্তানের অন্যতম প্রধান হ্যাপ্লোগ্রুপ। ৩৮.৫% মানুষ এই হ্যাপ্লোগ্রুপ বহন করে। এটি উদ্ভূত হয়েছে প্রায় ২৭ হাজার বছর আগে উত্তর এশিয়ায়। ইউরোপেরও অন্যতম প্রধান এই হ্যাপ্লোগ্রুপ। এই হ্যাপ্লোগ্রুপের উত্তরসূরীদের অধিকাংশ বিভিন্ন ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষায় কথা বলেন। ভারতে হ্যাপ্লোগ্রুপ R আসে য়াম্নায়াদের সঙ্গে সম্পর্কিত বৈদিক সংস্কৃতভাষী ইন্দো-ইউরোপীয় জনগোষ্ঠীর স্তেপভূমি থেকে আগমনের সঙ্গে।

হ্যাপ্লোগ্রুপ H - প্রায় ১৬.১% মানুষ এই হ্যাপ্লোগ্রুপের অধিকারী। এটি ভারতীয় উপমহাদেশের একটি প্রাচীন হ্যাপ্লোগ্রুপ। একে ভারতীয় হ্যাপ্লোগ্রুপ হিসাবে উল্লেখ করা যেতে পারে। মূলতঃ মধ্য প্রাচ্য বা দক্ষিণ মধ্য এশিয়া থেকে প্রায় তিরিশ হাজার বছর আগে এর উৎপত্তি। এরা সম্ভবত আফ্রিকা থেকে আগত জনগোষ্ঠী, তবে ভারতে পরে প্রবেশ করে। উল্লেখ্য, প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর আগের শাহর-ই-শোকতা  ব্যাকট্রিয়া-মার্জিয়ানা আর্কিওলজিক্যাল কমপ্লেক্সে প্রাপ্ত ১১টি দেহাবশেষের মধ্যে ২টি ওয়াই-ক্রোমোজোম ডিএনএ বিশ্লেষণ করে পাওয়া গিয়েছিল H1a1d2 হ্যাপ্লোগ্রুপ।

হ্যাপ্লোগ্রুপ L - প্রায় ১১.২% মানুষ এই হ্যাপ্লোগ্রুপের অধিকারী। এরাই হল হরপ্পীয় সভ্যতা তৈরির অন্যতম কারিগর।

হ্যাপ্লোগ্রুপ J - ১১.১% মানুষ এই হ্যাপ্লোগ্রুপের অধিকারী। প্রায় পনের হাজার বছর আগে ফার্টাইল ক্রিসেন্টে এই হ্যাপ্লোগ্রুপের সৃষ্টি।

হ্যাপ্লোগ্রুপ O - এই হ্যাপ্লোগ্রুপ মূলতঃ দেশের পূর্ব দিকে প্রবেশ করা অস্ট্রো-এশিয়াটিক ও তিব্বতি-বর্মীভাষীদের মধ্যে দেখা যায়।
***************************************************************
বাংলা ও ঝাড়খণ্ডের রাজমহল পাহাড়ে মালতো বা 'মালপাহাড়ি' ভাষা দ্রাবিড় ভাষাপরিবারের। ওরাওঁ, মালপাহাড়ি ইত্যাদিরা দ্ৰাবিড় ভাষায় কথা বলেন। এর থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, পূর্ব ভারতেও একসময় দ্রাবিড় ভাষা প্রচলিত ছিল।
***************************************************************
আধুনিক মানুষের মস্তিস্ক দশকের পর দশকের তথ্য সঞ্চয় করে রাখতে পারে, প্রয়োজন মত সেই তথ্য গোপন গহ্বর থেকে নিয়ে এসে মুহূর্তে প্রক্রিয়াকরণ করতে পারে, সেই প্রক্রিয়াজাত তথ্য বর্তমান সময়ে প্রাপ্ত কোন তথ্যের সাথে তুলনা করে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। সেই তথ্যের ভিত্তিতে প্রক্রিয়াকরণ করতে পারে মূর্ত বা বিমূর্ত ভাবনা, হাইপোথিসিস, চিত্র, উপন্যাস, বিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ নিগূঢ় নিয়ম।

তবে এই বিশাল মস্তিষ্কের জন্য (যার ওজন দেহ ওজনের মাত্র ২%) আমাদের মোট অক্সিজেনের ২০% দিতে হয়। আর দেহের ২০% রক্ত সঞ্চালন হয় ওই মস্তিষ্কে। দ্বিপদী প্রাণী হবার ফলে (সেই সময়ে মানবের পেলভিস ও জননপথ ছোট হয়ে গেছে), শরীর দীর্ঘ হবার ফলে এবং মস্তিষ্কের আয়তন বৃদ্ধি পাবার ফলে সবচাইতে যন্ত্রণা পায় মানুষ মা। বাচ্চা জন্ম দিতে গিয়ে সে মারাও যেতে পারে। কারণ সরু জননপথ দিয়ে বড় মাথাওয়ালা হোমো স্যাপিয়েন্স শিশু জন্মায়। সন্দেহ নেই এই অসুবিধে সত্ত্বেও টিকে থাকার লড়াইতে বৃহৎ মস্তিস্ক মানুষকে সব অসুবিধা ছাপিয়ে অতিরিক্ত সুবিধা দিতে পেরেছিল।
***************************************************************
ইন্দো-ইউরোপীয়দের উদ্ভব ও তাদের দীর্ঘ পরিযানের পথ নিয়ে কিছু গবেষণা ইতিমধ্যেই হয়েছে। প্রাচীন ডিএনএ থেকে বিশ্লেষিত তথ্য এই গবেষণায় সাহায্য করেছে। স্তেপভূমির পোল্ট্যাভকাতে ২৭১০ সাধারণ পূর্বাব্দের এই পুরুষের জীবাশ্ম পাওয়া গেছে। ওই পুরুষটি ওয়াই-ক্রোমোজোম হ্যাপ্লোগ্রুপ R1a-এর এক উপশাখা R1a-Z93 বহন করেছে। এই বিশেষ হ্যাপ্লোগ্রুপটি মিউটেট করবার সামান্য পরেই পুরুষটি তা বহন করেছে। আবার R1a-Z93 হ্যাপ্লোগ্রুপ আজকে উত্তর ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে পাওয়া যায়। দক্ষিণ এশিয়ার ব্রোঞ্জ যুগের ফসিলে কিন্তু R1a হ্যাপ্লোগ্রুপ অনুপস্থিত ছিল। এই সব তথ্য একত্রিত করলে বোঝা যায় স্তেপভূমি থেকে R1a হ্যাপ্লোগ্রুপ বহনকারী এক গোষ্ঠীর পরিযান হয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার দিকে।

আবার বিগত কয়েক বছর ধরে পূর্ব ইউরোপে ব্রোঞ্জ যুগের যে সব জীবাশ্ম পাওয়া গেছে সেখানেও ওয়াই-ক্রোমোজোম হ্যাপ্লোগ্রুপ R1a-এর উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া যায়। খেয়াল রাখতে হবে, রাশিয়ার স্তেপভূমি বা পূর্ব ইউরোপের মানুষের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ায় ব্যাপ্ত 'আন্দামানি শিকারী-সংগ্রাহক' অথবা 'প্রাচীন ইরান-সম্পর্কিত শিকারী-সংগ্রাহক'-এর জিনোমিক প্রোফাইল পাওয়া যায় না। তাই ভারতবর্ষ থেকে পূর্ব ইউরোপে ইন্দো-ইউরোপীয়দের পরিযান হয়েছে এমন কথা বলার কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

স্তেপভূমি থেকে একদিকে পূর্ব ইউরোপ অভিমুখে, অন্যদিকে এশিয়ার দক্ষিণ দিকে ইন্দো-ইউরোপীয়রা পরিযান করেছে, আর এই দক্ষিণমুখী পরিযান তাদের নিয়ে এসেছে ভারতবর্ষে। যুক্তির তীর ভারতে ইন্দো-ইউরোপীয়দের পরিযানের একটাই পথ দেখাচ্ছে। আজ থেকে চার থেকে সাড়ে তিন হাজার বছর আগে রাশিয়া থেকে ওরা এসেছে উত্তর ভারতে।

আর খেয়াল রাখতে হবে এই বৈজ্ঞানিক তথ্যের সঙ্গে বৈদিক সাহিত্য সাযুজ্যপূর্ণ। বিভিন্ন ভাষাতত্ত্ববিদ ও শব্দতাত্ত্বিক যে কথা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, সেই কথাই দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় আজকের জিনবিদ্যার আলোকে।     
***************************************************************
১৩৩ কোটি মানুষের এই দেশ। এই দেশের বিভিন্নতার সঙ্গে অন্য কোন দেশের তুলনা হয় না। ভারত সরকারের 'এনথ্রোপোলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া'-র 'পিপল অফ ইন্ডিয়া' প্রজেক্ট দেশের ৮৬৩৫ জনগোষ্ঠীর মধ্যে গবেষণা করে বিভিন্ন ধর্ম, সম্প্রদায়, গোত্র, বংশনাম নিয়ে এক তালিকা প্রস্তুত করে। ভারতে হিন্দু ধর্মে ৩৫৩৯টি সম্প্রদায় আছে, মুসলিমদের মধ্যে আছে ৫৮৪টি সম্প্রদায়, খৃস্টানদের মধ্যে ৩৩৯টি, শিখদের মধ্যে ১৩০, জৈন ১০০, বৌদ্ধ ৯৩। পার্সি, ইহুদি এবং আরও ৪১১টি ট্রাইবাল সম্প্রদায় আছে যারা ওপরের কোন ধর্মের সঙ্গে নিজেদের সনাক্ত করতে পারেনি। এই প্রসঙ্গে বলি,ভারতবর্ষে আছে ২২টি মূল ভাষা, আর ছোট বড় মিলিয়ে ১৯৫০০টি ভাষায় মানুষ কথা বলে।
***************************************************************

Friday, 26 April 2024

আদি ভারতীয় - টনি জোসেফ

প্রাগৈতিহাসিক ভারতে আধুনিক মানবের সংক্ষিপ্ত কালানুক্রমিক সূচি 

~ ৩,০০,০০০ বছর : মরক্কোর সাফি শহর থেকে প্রায় পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত জেবেল ইরহাউদ-এর এক গুহায় প্রাপ্ত আধুনিক মানুষ হোমো স্যাপিয়েন্স-এর অদ্যাবধি আবিষ্কৃত প্রাচীনতম অবশেষে বয়স।

~ ১,৮০,০০০ বছর : আফ্রিকার বাইরে প্রাপ্ত কোন আধুনিক মানুষের জীবাশ্মের বয়স - উত্তর ইজরায়েলের মিসলিয়াতে এক পাহাড়ের গায়ে।

~ ৭০,০০০ বছর আগে : জিন বিশেষজ্ঞদের গণনামতে সবচেয়ে সফল আফ্রিকা বহির্মুখী পরিযান মোটামুটি এই সময়ের আশেপাশেই হয়েছিল। এই পরিযায়ীদের 'সফল' বলার কারণ এরা আজকের আনফ্রিকীয় জনসংখ্যার সকলেরই পূর্বসূরি। (এর আগের আফ্রিকার বাইরে যাওয়া আধুনিক মানুষরা এমন কোনও বংশ বা কুলের চিহ্ন রেখে যায়নি, যা বর্তমানে শনাক্ত করা যায়।) সম্ভবত, ৭০,০০০ বছর আগের সেইসব আফ্রিকা বহির্মুখী পরিযায়ীরা দক্ষিণের পথ ধরে এগিয়ে গিয়েছিলেন যা হয়তো তাঁদের আফ্রিকা থেকে (বিশেষত, বর্তমানের এরিত্রিয়া এবং জ্বিবৌতি) লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তস্থিত বাব-এল-মান্দেব হয়ে এশিয়ার দিকে (আধুনিক ইয়েমেন) নিয়ে এসেছিল।

~ ৬৫,০০০ বছর আগে : আফ্রিকা বহির্মুখী পরিযায়ীরা ভারতে পৌঁছলেন, আর এসেই তাঁরা বিপুল সংখ্যক আদিম মানবের সম্মুখীন হলেন। তাঁরা সম্ভবত উপ-হিমাচল অংশ দিয়ে অন্তর্দেশীয় পথে এবং সমুদ্রতীরবর্তী পথ ধরে দুটো দলে ভাগ হয়ে গিয়েছিলেন; উপমহাদেশের অন্যান্য হোমো প্রজাতি, যারা মধ্য ও দক্ষিণ ভারতে আধিপত্য বিস্তার করেছিল তাদের থেকে নিজেদের সরিয়ে রাখার জন্যই হয়তো এমনটা করা, এবং তারও পরে সেখান থেকে তাঁরা ভারতীয় উপমহাদেশ পেরিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, পূর্ব এশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়ার দিকে চলে গিয়েছিলেন।

~ ৬০,০০০ - ৪০,০০০ বছর আগে :  আফ্রিকা বহির্মুখী পরিযায়ীদের উত্তরসূরিরা মধ্য এশিয়া ও ইউরোপের এই সময়কালের মধ্যে জনসংখ্যার বিস্তার ঘটায়।

~ ৪০,০০০ বছর আগে : ইউরোপের নিয়ান্ডারথালরা অবলুপ্ত হল, দক্ষিণ-পশ্চিম ইউরোপের আইবেরীয় উপদ্বীপ (আধুনিক পর্তুগাল এবং স্পেন) তাদের অন্তিম আশ্রয়স্থল হয়ে রইল।

~ ৪৫,০০০ - ২০,০০০ বছর আগে : আফ্রিকা বহির্মুখী পরিযায়ীদের উত্তরসূরি আদি ভারতীয়রা এই উপমহাদেশে মাইক্রোলিথিক প্রযুক্তির (অতিক্ষুদ্র পাথরের তৈরি যন্ত্রাদির) ব্যবহার শুরু করেন। তাঁদের জনসংখ্যা মধ্য ও পূর্ব ভারতে অবিশ্বাস্যভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে। উন্নত মানবের 'সর্বাধিক সমাগম' ঘটে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে। আধুনিক মানব ক্রমে মধ্যভারত ও দাক্ষিণাত্যভূমির যে অঞ্চলটায় জড়ো এবং থিতু হতে থাকল, সেটা হয়তো বা দীর্ঘদিন ধরেই অন্যান্য হোমো প্রজাতির আশ্রয়স্থল হয়ে ছিল।

~ ১৬,০০০ বছর আগে (১৪,০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে) : আধুনিক মানব সাইবেরিয়া আর আলাস্কার মাঝে সংযোগকারী সেতুর মতো ভূমি বেরিঞ্জিয়া পেরোনোর পর পৌঁছল আমেরিকায়, যাকে মানুষের বাসস্থানহিসেবে অন্তিম মুখ্য মহাদেশ বলা চলে। 

~ ৭০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে : বেলুচিস্তানের বোলান পাহাড়ের পাদদেশে, বর্তমানে মেহরগড় নামে পরিচিত এক গ্রামে, এক নতুন কৃষিজাত উপনিবেশের পত্তন হয় যা ক্রমেই সিন্ধু এবং ভূমধ্যসাগরের মাঝের অংশে এই সময়ের বৃহত্তম জনবসতিগুলোর অন্যতম হয়ে ওঠে।

~ ৭০০০ - ৩০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে : জাগ্রোস অঞ্চল থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় ইরানীয় কৃষকদের অভিগমনের ফলে আদি ভারতীয়দের উত্তরসূরিদের সঙ্গে তাদের মিশ্রণ ঘটে; এই সময়েরই আশেপাশে। জিনতত্ত্ববিদদের গণনামতে এই মিশ্রণ মোটামুটিভাবে ৪৭০০ থেকে ৩০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে ঘটেছিল।

~ ৭০০০ - ২৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে : মেহরগড় অঞ্চলে যব ও গম চাষ এবং সেইসঙ্গে পোষ মানানো গবাদিপশুর ক্রমবর্ধমান ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে। যদিও এই ভূমি ২৬০০ থেকে ২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে পরিত্যক্ত হয়। ততদিনে অবশ্য কৃষিজাত উপনিবেশ উত্তর-পশ্চিম ভারতের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল - সে সিন্ধু আর ঘাগ্গর - হাকরা নদীর উপত্যকায় হোক কিংবা গুজরাতে।

~ ৭০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে : এই সময়কালেই উচ্চ গাঙ্গেয়ভূমি অঞ্চলে অধুনা উত্তরপ্রদেশের সন্ত কবীরনগর জেলার লহুরাদেওয়াতে ধান চাষের এবং স্থায়ী বসবাসের বন্দোবস্তের প্রভূত প্রমাণ মেলে। জংলা ধান থেকে কৃষিজাত ধান উৎপাদনের এই ক্রমবিকাশের পর্যায়ের কালানুক্রম অবশ্য নিশ্চিত করে বলা যায় না, কিন্তু লহুরাদেওয়ার ব্যাপারটা একটা স্থির ইঙ্গিত দেয়, বা বলা ভালো আমাদের নিঃসন্দেহ করে, সেটা হল কৃষিকার্যে এইসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা দক্ষিণ এশিয়ার বহু জায়গাতেই একইসঙ্গে হচ্ছিল এবং মেহরগড় কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না।

~ ৫৫০০ - ২৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে : হরপ্পা যুগের আদিভাগে, এ সময়ে ভারতের কালিবঙ্গান, রাখিগঢ়ি এবং পাকিস্তানের বনওয়ালি ও রহমান ঢেরির মতো বিভিন্ন নগরে একটু একটু করে তাদের একান্ত নিজস্ব শৈলীতে প্রাথমিক কৃষিজাত উপনিবেশগুলো গড়ে উঠছিল।

~ ৩৭০০ - ১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে : ভারতের বিভিন্ন স্থানে প্রাথমিক কৃষিকার্যের প্রমাণ পাওয়া যেতে থাকে - পূর্ব রাজস্থান, দক্ষিণ ভারত, মধ্য ভারতের বিন্ধ্য পর্বত অঞ্চল, পূর্ব ভারত এবং কাশ্মীরের সোয়াত উপত্যকা।

~ ২৬০০ - ১৯০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে : পরিণত হরপ্পাযুগে নতুন করে নির্মিত ও পুনর্নির্মিত হল বহু জনপদ, আর বহু পূর্বে বিদ্যমান জনপদ পরিত্যক্ত হল। একই ধরনের / নির্দিষ্ট লিপি, শিলমোহর, চিহ্ন তথা পরিমাপক বাটখারার প্রচলন দেখা গেল সারা অঞ্চল জুড়ে উন্নততর মান নির্ধারণের ক্ষেত্রে। আদি হরপ্পাযুগ থেকে পরিণত হরপ্পাযুগের রূপান্তর প্রায় চার বা পাঁচ প্রজন্মেরও বেশি সময়, বা ১০০ থেকে ১৫০ বছর ধরে ঘটেছিল।

~ ২৩০০ - ১৭০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে : ব্যাক্ট্রিয়া - মর্জিয়ানা প্রত্নতাত্ত্বিক কেন্দ্রের সময়ে অক্সাস নদীর (আমু দরিয়া নামেও পরিচিত) এবং অধুনা আফগানিস্তান, দক্ষিণ উজবেকিস্তান আর পশ্চিম তাজিকিস্তান মিলিয়ে আশেপাশের সভ্যতা। ব্যাক্ট্রিয়া - মর্জিয়ানা প্রত্নতাত্ত্বিক কেন্দ্রের হরপ্পা সভ্যতার সঙ্গে নিবিড় বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ ছিল।

~ ২১০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে : কাজাখ স্তেপভূমি থেকে পাস্তোরালিস্টরা মধ্য দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে দক্ষিণাভিমুখী পরিযান করে যাদের আমরা আজ তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান এবং তাজিকিস্তান বলে জানি। এই পরিযায়ীরা  ব্যাক্ট্রিয়া - মর্জিয়ানা প্রত্নতাত্ত্বিক কেন্দ্রের উপর প্রভাব ফেলে, কিন্তু অধিকাংশ অন্য পথ ধরে দক্ষিণ এশিয়া যায় খ্রিস্টপূর্বাব্দে দ্বিতীয় সহস্রাব্দে, যেমন নিচে বর্ণিত হল (২০০০ - ১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে)।

~ ২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে : দুটি মুখ্য পরিযানের ঢেউ ওঠে চিনদেশে তাদের মূল শিকড় - কৃষি বিপ্লবের পর তার ফলে ওঠা জনসংখ্যার ঢেউ - দক্ষিণপূর্ব এশিয়াকে নবরূপ দান করে। অস্ট্রো এশিয়াটিক ভাষা তৈরি হয়, নতুন উদ্ভিদ এবং নতুন প্রজাতির ধানের বৈচিত্র আসে ভারতে ২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের পরে।

~ ২০০০ - ১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে : স্তেপভূমির পাস্তোরালিস্টদের (পশুপালক) নতুন পরিযানের ঢেউ ওঠে অনেক, মধ্য এশিয়া থেকে দক্ষিণ এশিয়ার দিকে। ভারতীয় - ইউরোপীয় ভাষা এবং নতুন ধর্মীয় তথা সাংস্কৃতিক প্রথার উদ্ভব ঘটে।

~ ১৯০০ - ১৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে : হরপ্পাযুগের অন্তিম ভাগে এই সভ্যতার ক্ষয় এবং ঘটনাচক্রে অবলুপ্তি হতে দেখা যায়। প্রাথমিকভাবে দীর্ঘকালীন খরা অনাবৃষ্টিকে দায়ী করা যায়, যা পশ্চিম এশিয়ার সভ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। এমনকী মিশর ও চীনদেশকেও ছাড়েনি।
*******************************************************************
আমাদের সঙ্গে আমাদের নিকটতম বিবর্তনশীল জ্ঞাতি ভাই হোমো ইরেক্টাস, হোমো নিয়ান্ডারথালেন্সিস, ডেনিসোভান প্রভৃতিদের দ্বারা তৈরি করা যন্ত্রপাতি, সরঞ্জামের মধ্যে প্রায়ই কোনও ভিন্নতা ছিল না এবং এমন কোনও আকস্মিক মুহূর্তও ছিল না, যখন হোমো স্যাপিয়েন্সরা দুম করে এসে পড়েছিল!

এই সব হোমো প্রজাতির বিলুপ্ত সদস্যদের (হোমো স্যাপিয়েন্স হচ্ছে বর্তমানে হোমো পরিবারের একমাত্র জীবিত সদস্য) আমাদের মতোই বড় আকারের মস্তিস্ক ছিল।

গত দশকে তো আমরা এমনকী এও জেনেছি যে, তারা জিনগতভাবে হোমো স্যাপিয়েন্স-দের যথেষ্ট কাছাকাছি ছিল। অর্থাৎ তাদের সঙ্গে আমাদের পূর্বপুরুষরা মিলিত হয়েছে এবং পরবর্তীকালে উৎপাদনক্ষম সন্তান উৎপন্ন করেছে।

এগুলো নিশ্চিতভাবে বলতে পারছি কারণ আমরা এখন জানি যে, সকল অনাফ্রিকীয় হোমো স্যাপিয়েন্স বর্তমানে তাদের ডিএনএ-তে প্রায় ২ শতাংশ নিয়ান্ডারথাল-এর জিন বহন করে। আমাদের মধ্যে কিছু যেমন - মেলানেশিয়, পাপুয়ান এবং আদিবাসী অস্ট্রেলিয়ার আবার ৩ থেকে ৬ শতাংশ ডেনিসোভান (অন্তিম প্রস্তর যুগে সাইবেরিয়া থেকে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া অব্দি বিচরণ করা প্রাচীন মানবের এক অবলুপ্ত প্রজাতি) ডিএনএ বহন করে। এই জিনগত উত্তরাধিকারের জন্য, আমরা হয়তো তাদের পূর্বপুরুষ বলতে পারি, কিন্তু যাদের সঙ্গে হোমো স্যাপিয়েন্স একসময়ে হেসেখেলে দিন কাটিয়েছে, তাদেরকে সম্ভবত আমাদের বিবর্তনশীল জ্ঞাতি ভাই হিসাবে দেখাটাই যুক্তিসঙ্গত হবে। জীববিজ্ঞানের দিক দিয়ে, আমরা শুধু একটি ক্রমাগত ঘটতে থাকা নিরবিচ্ছিন্ন বিবর্তনের অংশ, যেখানে হোমো স্যাপিয়েন্স-দের ডিএনএ'র ৯৬ শতাংশ শিম্পাঞ্জিদের দ্বারা অধিকৃত।
*******************************************************************

আমাদের কি আদপেই বাইরের কোনও জায়গা থেকে আসার দরকার ছিল?

আচ্ছা আমরা কেন সবসময় ধরে নিই ভারতে আধুনিক মানুষকে বাইরের কোথাও থেকেই আসতে হয়েছে? কেন এখানেই তাদের উৎপত্তি হল না? মাত্র কয়েক দশক আগেও এটা বেশ একটা যুক্তিযুক্ত প্রশ্ন বলে ভাবা যেত, কারণ আধুনিক মানুষ যে পৃথকভাবে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে হোমো প্রজাতির প্রাচীন বা বিলুপ্ত সদস্যদের (যেমন হোমো ইরেক্টাস) যারা প্রায় ১৯ লক্ষ বছর আগে সমস্ত ইউরেশিয়া জুড়ে ছড়িয়ে গিয়েছিল, তাদের থেকে বিবর্তিত হয়েছিল, সেই তত্ত্বটি তখনও জোরালো ছিল - যদিও চার্লস ডারউইন ১৮৭১ সাল নাগাদই আধুনিক মানুষের আফ্রিকীয় বংশোদ্ভূত হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তত্ত্বটি ছিল বিভিন্নভাবে বিবর্তিত জনগোষ্ঠী পরবর্তীকালে নিজেদের মধ্যে মিশ্রণ ঘটানোর ফলে এইভাবে একটি প্রজাতি হিসাবে আমাদের একত্র করতে পেরেছে, এভাবে বিভিন্ন মহাদেশে আমাদের বিভিন্ন প্রজাতিতে ভেঙে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া আটকানো গেছে।

তবে এই তত্ত্ব এখন আবর্জনাপাত্রে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। কোনও সাচ্চা গবেষক একে কোনও সম্ভাবনা বলেই গণ্য করেন না (যদিও অতি সাম্প্রতিক কাল অবধিও অন্তত ধারণা ছিল, কিছু বিচ্ছিন্ন আস্তানা বিশেষ করে চীনের মতো জায়গা থেকে থাকতে পারে, যেখানে প্রাচীন মানুষ থেকে চীনা মানুষে একেবারে স্বাধীনভাবে এবং স্বতঃস্ফূর্ত বিবর্তন ঘটেছে)। কেন এই তত্ত্ব বাতিল হল তার পিছনে পুরাতাত্ত্বিক এবং জিনতত্ত্বগত উভয় কারণই দায়ী। আফ্রিকার জীবাশ্ম সংক্রান্ত নথি আমাদের নিকটতম আত্মীয়দের অবশিষ্টাংশে পরিপূর্ণ - ৭০ লক্ষ বছর আগে সাহেলানথ্রোপাস চ্যাডেন্সিস, ৪০ লক্ষ বছর আগে আরডিপিথেকাস র‍্যাকমিডাস, ৩৫ লক্ষ বছর আগে কেনিয়ানথ্রোপাস প্ল্যাটিওপ্স, ২৪ লক্ষ বছর আগে হোমো হ্যাবিলিস এবং ৭ লক্ষ থেকে ২ লক্ষ বছর আগে হোমো হাইডেলবার্গেন্সিস - বিশ্বে আর অন্য কোনও অঞ্চল ছিল না যা আফ্রিকার সঙ্গে কোনোভাবে তুলনীয় হতে পারে। কিন্তু বিভিন্ন মহাদেশে বৈচিত্র্যময় মানব উদ্ভবের বিরুদ্ধে অকাট্য যুক্তিটা আসলে ছিল জিনগত। ডিএনএ প্রমাণ আমাদের স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত করেছে যে, আফ্রিকা বহিঃস্থ সমস্ত আধুনিক মানুষ আসলে আফ্রিকা বহির্মুখী একটা মাত্র জনগোষ্ঠীর উত্তরসূরি, যারা ৭০,০০০ বছরের আশেপাশের কোনও একটা সময়ে এশিয়াতে পাড়ি জমিয়েছিল, এবং সম্ভবত এই সময়কালের মধ্যে তাদের নিকটবর্তী জিনতুতো জ্ঞাতি ভাই হোমো নিয়ান্ডারথালেন্সিস-দের সরিয়ে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছিল। সমস্ত সাম্প্রতিক গবেষণালব্ধ ফল আধুনিক মানুষের আফ্রিকীয় বংশোদ্ভূত হওয়ার স্বপক্ষেই বারবার নিশ্চয়তা দেয়। অতি সম্প্রতি এই ২০১৭ সালের জুন মাসে আমরা খবর পেলাম যে মরক্কোর সাফি শহরের থেকে প্রায় পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত জেবেল ইরহাউদ-এর এক গুহায় যে প্রাচীন মাথার খুলিটা পাওয়া গেছে সেটা আধুনিক মানুষ হোমো স্যাপিয়েন্সেরই, যার বয়স প্রায় ৩,০০,০০০ বছর।

যতদিন না এই জেবেল ইরহাউদের গুহা থেকে প্রাপ্ত জীবাশ্মের শ্রেণীবদ্ধকরণ এবং বয়স নির্ণয় করা হয়নি, ততদিন অবধি ইথিওপিয়ার পুরাতাত্ত্বিক স্থান ওমো কিবিশে প্রাপ্ত ১,৯৫,০০০ বছরের পুরোনো দুটো মাথার খুলিই ছিল সবচেয়ে প্রাচীন আধুনিক মানবের জীবাশ্ম। তাই জেবেল ইরহাউদের আবিষ্কার আধুনিক মানবের সূচনার ইতিহাসকে এক ঝটকায় প্রায় ১,০০,০০০ বছর পিছিয়ে নিয়ে গিয়েছিল এবং আমরা কোথা থেকে এসেছি সেই সংশয়ের আর কিছুমাত্র অবশিষ্ট রাখেনি। যদিও জেবেল ইরহাউদের থেকে প্রাপ্ত করোটিতে আমাদের মুখাবয়বের সঙ্গে অনেক গঠনগত সাদৃশ্য আছে, তবে এর পিছনদিকটা আদিম মানবের মতো বেশ খানিকটা লম্বাটে গড়নের, তা ছাড়াও বড় বড় দাঁত রয়েছে, যা ইঙ্গিত দেয় আধুনিক মানুষ হঠাৎ করে একদিনে উৎপত্তি হয়ে পূর্ণবিকশিতরূপ পায়নি, উপরন্তু প্রায় ৩,০০,০০০ বছর ধরে একটানা চলা এক প্রক্রিয়ার ফল মাত্র।
*******************************************************************
'আফ্রিকার বাইরে' যাওয়ার সময়কাল 

এখন জেনেটিক্সের গঠনতত্ত্বটা যেহেতু মোটামুটি জানা হয়ে গেছে, চলুন পরের প্রশ্নে যাওয়া যাক : জিনতত্ত্ববিদরা কেন বলেন আফ্রিকার বাইরের সকল আধুনিক মানুষ একটিই জনগোষ্ঠী থেকে উদ্ভূত, যারা আফ্রিকা মহাদেশ ছেড়ে পরিজন করেছিল?

কেনই বা তারা ৭০,০০০ বছরের কিছু আগে-পরে দলবদ্ধভাবে অভিনিষ্ক্রমণ করেছিল? কারণটা সুস্পষ্ট ও সহজবোধ্য। আপনি বিশ্বব্যাপী আফ্রিকার বাইরের মানুষের এমটিডিএনএ-র দিকে লক্ষ করলে দেখবেন, তারা সবাই L3 নামক একটিই হ্যাপ্লো গোষ্ঠী থেকে এসেছে, যার সঙ্গে আফ্রিকার সম্পর্ক গভীর! একটু ভাবুন এর আসল অর্থটা কী? আফ্রিকার বাইরের সমস্ত মানুষ সেই একজন আফ্রিকান মহিলার বংশধর, যিনি L3 এমটিডিএনএ হ্যাপ্লোগোষ্ঠীর এই ধারার সূচনা করেছিলেন! আফ্রিকায় আরও প্রায় পনেরোটি সুপ্রাচীন বংশধারা রয়েছে যেমন L0, L1, L1a এবং L1c প্রভৃতি, কিন্তু তারা কেউই বাকি দুনিয়ার জনসংখ্যা বিস্তারের জন্য দায়ী দলের অংশ নয়। বর্তমানে L3-র দুটি সরাসরি বংশধর বা উপ-হ্যাপ্লোগোষ্ঠী আছে, M এবং N, N-এর আবার নিজস্ব প্রধান উপ-হ্যাপ্লোগোষ্ঠী হল R। তাই আফ্রিকার বাইরের সমগ্র বিশ্বের জনগণ M, N বা R হ্যাপ্লো গোষ্ঠীর বংশধারার বাহক। দক্ষিণ এশিয়ায় যেমন এই তিনটি হ্যাপ্লোগোষ্ঠীর সবকটিই উপস্থিত, ইউরোপে আবার মাত্র দুটি দেখা যায়, N এবং R, M সেখানে অনুপস্থিত।

Y-ক্রোমোজোমের বংশগতির ক্ষেত্রেও ছবিটা প্রায় এক। C, D এবং F, কেবল এই তিনটি আফ্ৰিকাজাত হ্যাপ্লোগোষ্ঠী গোটা পৃথিবীর বাকি অংশকে জনাকীর্ণ করে - যারা সকলেই আবার একটি জনিতৃ হ্যাপ্লোগোষ্ঠী CT থেকে উদ্ভূত। আবার, এর মানে দাঁড়াচ্ছে, আফ্রিকার বাইরের সব মানুষই Y-ক্রোমোজোমের CT হ্যাপ্লোগোষ্ঠীর সূচনাকারী নির্দিষ্ট একজন মানুষের বংশধর। এইসব তথ্যের ভিত্তিতে বলা যায় আফ্রিকার আধুনিক মানুষের জনসংখ্যার মাত্র একটি উপধারা বিশ্বের বাকি অংশকে জনাকীর্ণ করেছিল। দ্বিতীয়ত, সমস্ত পরিযায়ী এমটিডিএনএ হ্যাপ্লোগোষ্ঠী L3 থেকে উদ্ভূত, অন্য কোনও হ্যাপ্লোগোষ্ঠী থেকে হয়নি। যার ফলে বলা যায় পরিযানের ঘটনাটি একবারই ঘটেছিল, বারংবার নয়। কারণ একাধিকবার পরিযান ঘটলে বর্তমান জনসংখ্যায় শুধুমাত্র L3 নয়, একটি বড় সংখ্যক এমটিডিএনএ হ্যাপ্লোগোষ্ঠীর বংশধরদের পাওয়া যেত। বহুসংখ্যক পরিযানেও সবাই একই L3 হ্যাপ্লোগোষ্ঠীর বংশধর, এমন সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।

অভিবাসনের ঘটনাটি যে ৭০,০০০ বছরের কিছু আগে-পরে ঘটেছিল সেটা আমরা কীভাবে স্থির করলাম? সেটাও সহজেই বোধগম্য। মিউটেশনের হার এবং এই সময়ের জিনোম সংক্রান্ত তথ্যের সাহায্যে জিনতত্ত্ববিদরা কোনও বিশেষ হ্যাপ্লোগোষ্ঠীর উত্থানের সময়কাল গণনা করতে পারেন। তাঁদের সিদ্ধান্ত অনুসারে L3-র আবির্ভাব মোটামুটিভাবে প্রায় ৭০,০০০ বছর আগে ঘটেছে। একইভাবে বলা যায়, N বংশধারার সূত্রপাত আজ থেকে প্রায় ৬১,০০০ বছর আগে এবং M-এর ক্ষেত্রে প্রায় ৪৮,০০০ বছর আগে। তাই আফ্রিকা বহির্মুখী পরিযান বিগত ৬১,০০০ বছরেরও অনেক পরে হওয়ার সম্ভাবনা নেই (অন্যথা আফ্রিকায় N বংশধারার বৃদ্ধি ঘটা উচিত ছিল, যা এক্ষেত্রে হয়নি), আবার তা ৭০,০০০ বছরের অনেক আগেও হয়নি, কারণ তাহলে আফ্রিকাতে L3 হ্যাপ্লোগোষ্ঠীর কোনও বংশধরই থাকত না, এক্ষেত্রে যা অবাস্তব।

বহির্গমনের সময়কে অনেকটা নিশ্চিতরূপে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে একে অকাট্য যুক্তি মনে হতে পারে, কিন্তু এইসব অনুমান উদ্দিষ্ট সকল হ্যাপ্লোগোষ্ঠীর 'গড়' বয়সের ভিত্তিতে গঠিত। প্রতিটি গণনার প্রকৃত সময়সীমা কমবেশি কয়েক হাজার বছর হতে পারে। তাই এটা বলা আরও যুক্তিসঙ্গত হবে যে আফ্রিকা বহির্মুখী পরিযানটি মোটামুটি ৫০,০০০ বছরের পরে এবং প্রায় ৮০,০০০ বছরের আগে কিছুতেই ঘটেনি। যদি আমরা কিছু নির্দিষ্ট জলবায়ুর বৈশিষ্ট্যকে জেনেটিক বৈশিষ্ট্যর উপরে অগ্রাধিকার দিই, তাহলে আমরা এই অপেক্ষাকৃত বড় সময়সীমার পরিবর্তে বিগত অনুমানিক ৫০,০০০ থেকে ৬০,০০০ বছরের মধ্যবর্তী সময়ের একটা ছোট জানলার কাছে পৌঁছতে পারব।
*******************************************************************
হরপ্পা সভ্যতার অবলুপ্তির পিছনেও কি তাদেরই হাত ছিল? কারণ স্তেপভূমির অভিবাসীদের ভারতে পৌঁছানো আর হরপ্পার অবক্ষয় প্রায় সমসাময়িক! আমরা অন্তিম হরপ্পা যুগের হরপ্পা, মহেঞ্জো-দারো বা কালিবঙ্গানের মতো শহরগুলি থেকে সরাসরি কোনও প্রাচীন ডিএনএ প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত এ ব্যাপারে নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে অক্ষম। তবে যদিওবা হরপ্পা সভ্যতার অবক্ষয়ের পিছনে রোগবালাইয়ের কোনও ভূমিকা থেকে থাকে, তাহলেও মোটামুটি নিশ্চিতভাবে বলা যায় ওই সভ্যতা পতনের পিছনে সেটাই একমাত্র কারণ ছিল না। কারণ, ওই একই সময়কালে দীর্ঘকালীন খরা বা অনাবৃষ্টির ভুরি ভুরি প্রমাণ মিলেছে। প্রায় একই সময়ে মিশর, মেসোপটেমিয়া এবং চীনের মতো অন্যান্য সভ্যতাগুলিও ভাঙনের মুখে পড়েছিল, সম্ভবত ওই একই কারণে।

2012 সালের 'ফ্লাভিয়াল ল্যান্ডস্কেপস অফ দ্য হরপ্পান সিভিলাইজেশন' (হরপ্পা সভ্যতার নদীমাতৃক চিত্র) শিরোনামের একটি গবেষণাপত্রে সম্ভবত হরপ্পা সভ্যতার পতনের কারণ বিষয়ক এ যাবৎকালের সবচেয়ে সামগ্রিক, বহু বছরের ভূতাত্ত্বিক গবেষণার ফলাফল সমৃদ্ধ লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে। এখানে পরিষ্কারভাবে একটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে : এক দীর্ঘায়িত খরা যার ফলে বর্ষাকালীন জলপুষ্ট নদীগুলি শেষমেশ শুকিয়ে যায় বা বিশেষ ঋতুভিত্তিক হয়ে পড়ে, এবং তাদের অববাহিকা বরাবর গড়ে ওঠা জনবসতিকেও প্রভাবিত করে। সরাসরি সেখান থেকে উদ্ধৃত করে বলা যায় : 'জলজ ভূ-প্রাকৃতিক চাপ হরপ্পার নগরায়নকে সহায়তা করা কৃষিজ উৎপাদনকে ক্রমশ দুর্বলতর করে, যার ফলে জনবসতি হ্রাস পেতে থাকে, ফসলের বৈচিত্র্য বাড়তে থাকে, এবং বর্ষার মরশুমে উচ্চতর পাঞ্জাব, হরিয়ানা, এবং উত্তর প্রদেশের অঞ্চলগুলিতে জনবসতি স্থাপনে ব্যাপক বৃদ্ধি ঘটতে দেখা যায়।'

এই গবেষণার ফলাফলটি যথার্থ বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে, যখন, 2018 সালের জুলাই মাসে ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অন স্ট্রাটিগ্রাফি [ভূতত্ত্বের স্তরবিন্যাস সংক্রান্ত বিশেষ শাখা] (আইসিএস), ভূতাত্ত্বিক সময়ের ভারপ্রাপ্ত রক্ষক সংস্থা, 'মেঘালয় যুগ' নামে একটি নতুন সময়কালের অবতারণা করেন, যা 2200 খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে বর্তমানকাল পর্যন্ত চলছে। এক ভয়াবহ খরার মাধ্যমে এই যুগের আরম্ভ হয়, যা বিশ্বব্যাপী বেশ কয়েকটি সভ্যতাকে ধ্বংস করে দিয়েছিল। মিশর, মেসোপটেমিয়া, চীন এবং অবশ্যই ভারত তার অন্তর্গত। ওই প্রবল খরা সম্ভবত সামুদ্রিক এবং বায়ুমণ্ডলীয় পরিচলন স্রোতের পরিবর্তনের ফলে উদ্ভূত হয়েছিল।

তাই, সবদিক খতিয়ে দেখে এখন মনে হয়, ব্রিটিশ প্রত্নতাত্ত্বিক তথা 1944 থেকে 1948 সালের মধ্যে ভারতীয় পুরাতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণের মহানির্দেশক, স্যার রবার্ট এরিক মর্টিমার হুইলার যখন লিখেছিলেন, 'উপযুক্ত তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে ইন্দ্রই হলেন প্রধান অভিযুক্ত', তিনি হরপ্পা সভ্যতার অবলুপ্তির জন্য সম্ভবত ভুল ব্যক্তিকে দায়ী করেছিলেন। তিনি বলতে চাইছিলেন, 'অনুপ্রবেশকারী আর্য আগ্রাসন' হরপ্পা সভ্যতাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছিল। তবে এর স্বপক্ষে কোনও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ নেই। বরং বৃষ্টির দেবতা বরুণের দিকে তাঁর আরও বেশি মনোযোগ দেওয়ার প্রয়োজন ছিল! 
*******************************************************************
একক-উৎসজাত নয়, একটি বহু-উৎসজাত সভ্যতা 

ভারত ও ইউরোপ উভয়তই, ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাভাষীরাই জনগণতাত্ত্বিক চিত্র পরিবর্তন করার মতো শেষ গুরুত্বপূর্ণ অভিবাসীদল। ৩২৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে আলেকজান্ডারের সেনাবাহিনী থেকে ১৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ আসা শক বা সিদিয়াবাসী, প্রায় ৪৫০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ আসা হূণ, ৭১০ খ্রিস্টাব্দে আরব, ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দে মুঘল এবং তারপর পর্তুগিজ, ফরাসি, ওলন্দাজ এবং ব্রিটিশরা অবধি - ভারতে একাধিক বিদেশি আক্রমণ ঘটেছে। কিন্তু তাদের কেউই আমাদের জনসংখ্যার চিত্রের উপর একটি সূক্ষ্ম এবং ছোট ছাপের চেয়ে বেশি কিছু রেখে যেতে পারেননি, যদিও আমাদের সংস্কৃতির উপর তাদের বিরাট প্রভাব রয়েছে। সাম্প্রতিক ডিএনএ এবং জেনেটিক্স বিজ্ঞানের সাহায্যে আমরা এখন নিশ্চিতভাবে এটা বলতে পারি। এবং ভবিষ্যতেও সম্ভবত কোনও অভিবাসন বা আক্রমণ আমাদের জনসংখ্যার চিত্র পরিবর্তন করতে পারবে না। তাই এই অধ্যায়ের নাম শেষ অভিবাসীগণ। একাধিক ঐতিহ্য এবং অভিজ্ঞতা থেকে উপাদান সংগ্রহ করে একটি অনন্য সংস্কৃতি সৃষ্টির মাধ্যমে আমাদের সাধারণ ইতিহাস গঠিত হয়েছে। আমরা একটি বহু-উৎসজাত সভ্যতা, কোনও একক উৎস থেকে আমাদের উৎপত্তি হয়নি।

২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের কিছুকাল পরে যখন শেষ অভিবাসী, 'আর্যরা', ভারতে এসে পৌঁছেছিল, উপমহাদেশের ভারতীয়রা তার আগে থেকেই পৃথিবীর আধুনিক মানুষের অন্যতম বৃহৎ জনগোষ্ঠী ছিল (যদি সবচেয়ে বৃহত্তম নাও হয়); ইতিমধ্যেই তারা একটি কৃষি বিপ্লবের নেতৃত্ব দিয়েছিল এবং তারপর একটি নাগরিক বিপ্লবেরও নেতৃত্ব দিয়েছি যা সে সময়ের বৃহত্তম সভ্যতার সৃষ্টি করেছিল; এবং উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিম ... প্রায় প্রতিটি অঞ্চলে একটি করে কৃষি রূপান্তরের নেতৃত্ব দান করেছিল। এটা বললে ভুল হবে না যে, হরপ্পা সভ্যতার আমলেই বর্তমান ভারতের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল।

হাজার বছর বা তারও বেশি যে সময় হরপ্পা সভ্যতার পতনের সাক্ষী ছিল সম্ভবত সেটাই দক্ষিণ এশিয়ায় আধুনিক মানব ইতিহাসের সবচেয়ে অশান্ত এবং আন্দোলিত সময় ছিল। কিন্ত এই বিষয়ে আমাদের কাছে খুব সামান্যই তথ্য আছে বলে এ নিয়ে জানার সুযোগও কম। যা ঘটেছে তার দিকে একবার তাকানো যাক দীর্ঘদিন ধরে চলা এক সভ্যতা, নিজের সময়ের বৃহত্তম, দীর্ঘকালীন খরার দাপটে বিধ্বস্ত, এবং তার সর্বাধিক দৃশ্যমান ক্ষমতা এবং খ্যাতির প্রতীকগুলির ধীরে ধীরে অবলুপ্তি, এমনকী নাগরিকতাবাদও নিজেই তার অস্তিত্ব বিপন্ন করেছিল; মানুষের একটি নতুন জীবন অনুসন্ধানে পূর্ব এবং দক্ষিণে স্থানান্তরিত হওয়া; উত্তর-পশ্চিম থেকে আগত অভিবাসীদের একটি নতুন ধারা, নতুন ভাষা এবং একটি ভিন্ন সংস্কৃতি নিয়ে আসা যেখানে বলিদান প্রথার মতো ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং পশুপালনে অগ্রাধিকার এবং শহুরে বসতি স্থাপনের চেয়ে গবাদি পশুর প্রজননের উপর অধিক জোর দেওয়া হত; উত্তর-পূর্ব দিক থেকে অভিবাসীদের অন্য একটি দল এসেছিল, তারাও নতুন ভাষা, নতুন গৃহ উৎপাদিত উদ্ভিদ এবং সম্ভবত জলাভূমি চাষের কৌশল এবং ধানের একটি নতুন প্রজাতি নিয়ে আসে ... এবং এভাবেই ভারতীয় সংস্কৃতির পাত্রটি পরিপূর্ণ হয়ে ফুটতে আরম্ভ করে। চার হাজার বছর পরে, এটি এখনও ঢিমে আঁচে ফুটছে, মাঝে-মাঝেই ইহুদী থেকে সিরিয়াবাসী থেকে পার্সীদের মতো নতুন নতুন উপাদান যোগ করা হচ্ছে।
*******************************************************************
ঐতিহাসিক রোমিলা থাপারকে উদ্ধৃত করে বলা যায় :

নিজেদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মূল্যায়ন করার সময়ে আমরা প্রায়শই ভুলে যাই বা খেয়াল রাখি না যে, যুক্তিবাদিতা এবং সংশয়বাদ মূলত প্রাচীন ভারতীয় চিন্তাধারারই একটি অংশ ছিল। এটি শুধু চার্বাক বা লোকায়ত চিন্তাবিদদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। দর্শনের অন্যান্য ক্ষেত্রে যেমন বৌদ্ধ ও জৈন চিন্তাধারাতেও এর প্রভাব লক্ষণীয়। আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে প্রশ্ন করার একটি সহজাত ক্ষমতা পেয়েছি, যা স্রেফ দার্শনিক চিন্তাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না বরং জনপ্রিয় সাহিত্যেও স্পষ্টভাবে দ্রষ্টব্য। সেই ঐতিহ্যকে লালন করাই সমুচিত কাজ হবে।
*******************************************************************
ভারতীয় হিসাবে আমরা হয়তো একই ইতিহাসের অধিকারী, তবে বিভিন্ন প্রান্তের বিচারে আমাদের কিছু আলাদা অভিজ্ঞতাও হয়েছে। একদিকে দক্ষিণ এবং পূর্ব ভারত আর অন্যদিকে উত্তর ও পশ্চিম ভারতের মধ্যে রাজনৈতিক এমনকী খাওয়াদাওয়ার অভ্যাসের মধ্যেও যে পার্থক্য রয়েছে, সেটাই এইসব অঞ্চলের মধ্যে ফারাকের প্রতিচ্ছবি এবং তাদের মধ্যে কিছু কিছু সুপ্রাচীন।

উদাহরণস্বরূপ, আমাদের খাদ্যাভাসকেই ধরা যাক। এটা স্পষ্ট যে উত্তর ভারতীয় এবং পশ্চিম ভারতীয়রা পূর্ব ভারতীয় বা দক্ষিণ ভারতীয়দের তুলনায় দুধ এবং দুধজাত খাবার অনেক বেশি আর মাছ মাংস অনেক কম খান। রাজনীতিবিদ এবং ধারাবিবরণকাররা প্রায়শই এই পার্থক্যগুলিকে প্রকৃতিগতভাবে সামাজিক-রাজনৈতিক হিসাবে দেখেন। তবে এগুলির আরও একটি মৌলিক কারণ রয়েছে : জিন। অথবা আরও বিশদে বললে, প্রায় ৭৫০০ বছর আগে ইউরোপে উৎপন্ন 13910T নামক একটি জিনের পরিব্যক্তি (মিউটেশন)। এই জিন মানব শরীরকে শৈশব পেরিয়ে, পরিণত বয়সে দুধ হজম করতে সাহায্য করে। গোটা বিশ্বে হোমো স্যাপিয়েন্স এই ক্ষমতা অর্জনকারী একমাত্র স্তন্যপায়ী প্রাণী। এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। কারণ মানুষেরা গবাদিপশু বা ছাগল পালন এবং তাদের দুধের জন্য ব্যবহার করতে শিখে নেওয়ার আগে, এ জাতীয় মিউটেশনের কোনও প্রয়োজনীয়তা ছিল না। কিন্তু একবার তারা গবাদি পশুপালন শুরু করার পর, প্রাপ্তবয়স্কদের দুধ হজম করার ক্ষমতা অর্জন ভীষণভাবে দরকারি হয়ে পড়েছিল। তাই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে খাপ খেয়ে যাওয়ার মতো একটি পরিব্যক্ত জিন বিবর্তনের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়েছিল।

পরিণত বয়সেও দুধ হজম করার ক্ষমতা একাধিকবার অভিযোজিত হয়েছিল; বিশ্বের চারটি ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলে। তবে 13910T নামক ইউরোপীয় মিউটেশনটির ব্যাপারে আমরা বিশেষ আগ্রহী। কারণ প্রাপ্তবয়স্ক হিসাবে দুধ খাওয়া ও হজম করার ক্ষমতাধারী অধিকাংশ ভারতীয়রা জিনের এই ইউরোপীয় সংস্করণটিরই বাহক। দেশব্যাপী সমস্ত প্রধান ভাষাগোষ্ঠী এবং প্রধান অঞ্চল থেকে ডিএনএ নমুনা বিশ্লেষণ করে ভারতে ল্যাকটেজের স্থায়িত্ব (শৈশবের পরে দুধ হজম করার ক্ষমতার জন্য প্রযুক্তিগত শব্দবন্ধ) বিষয়ক প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে একাধিক সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া গেছে, যার মধ্যে তিনটি নিম্নরূপ প্রথমত, ভারতে এর বিন্যাসের ধরণটি উত্তর-পশ্চিম থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে একটি স্থির অবনতির পথ ধরেছে। দ্বিতীয়ত, মিউটেশনটি ইউরোপীয়দের সঙ্গে অভিন্ন। তৃতীয়ত, প্রাপ্তবয়সে ভারতীয়দের মধ্যে মাত্র এক-পঞ্চমাংশ দুধ খেয়ে হজম করতে পারেন, তার মধ্যে পশ্চিম এবং উত্তর ভারতের লোকেরাই সর্বাধিক। পশ্চিম এবং উত্তর ভারতের অঞ্চলগুলিতে এই জিনের প্রাপ্তির হার ৪০ শতাংশের বেশি হলেও দক্ষিণ-পূর্ব ভারতে তা ১ শতাংশেরও কম।

সুতরাং এর থেকেই স্পষ্ট হয়ে যায় যে, পূর্ব ভারতীয় বা দক্ষিণ ভারতীয়রা কেন উত্তর ও পশ্চিম ভারতীয়দের তুলনায় অনেক কম পান করেন। উদ্দিষ্ট জিনটি থাকুক বা না থাকুক, প্রাপ্তবয়সে তাদের অনেকেই দুধ হজম করতে অক্ষম। যাঁদের এই জিন আছে আর যাঁদের নেই, তাঁদের মধ্যে প্রধান ফারাকটা হল, এই জিনের অধিকারীরা সারাজীবন ধরে স্বচ্ছন্দে দুধ পান এবং হজম করে যেতে পারবেন; আর যাঁদের তা নেই, তাঁরা নিজেদের জন্মের প্রথম বছর থেকে সাবালকত্ব অর্জনের মধ্যে যে কোনও সময়ে এই ক্ষমতা হারাবেন।

এর সঙ্গে একদিকে উত্তর ও পশ্চিম এবং অন্যদিকে দক্ষিণ ও পূর্বের মধ্যে নিরামিষাশী আহার বা মাছ মাংস খাওয়ার অভ্যাসের পার্থক্যের কী সম্পর্ক? সহজভাবে বলা যায়, জিনের মিউটেশন সেই ভারতীয়দের প্রাপ্তবয়সে মাংস বা মাছের বিকল্প প্রাণীজ প্রোটিন উৎস হিসাবে দুধ হজম করার ক্ষমতা দিয়েছে। যা তাদের অনেকেই গ্রহণ করেছেন বলে মনে হয়। জাতীয় নমুনা জরিপ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিবারভিত্তিক খাদ্য ব্যয়ের সমীক্ষা থেকে এই পরিসংখ্যানগুলি পাওয়া গেছে। তথ্যাদি থেকে স্পষ্টভাবে দেখা যায়, অত্যধিক দুধ সেবনকারী রাজ্যগুলি অনেক কম মাছ, মাংস, ডিম খায়। অন্যদিকে মাছ, মাংস, ডিম বেশি খাওয়া রাজ্যে দুধ খাওয়ার পরিমাণ অনেক কম।

দুধ এবং মাংস আহারের একটি বিপরীত প্রবণতাও স্পষ্টতই দৃশ্যমান, তবে সেটা সামান্য কিছু অঞ্চলে। আরও মনে রাখতে হবে, যেসব স্থানে জিন মিউটেশনের আধিক্য বেশি, সেখানেই বেশি দুধ এবং কম মাংস খাওয়ার প্রবণতা রয়েছে, এবং এর বিপরীত ক্রমটিও সত্যি।

জিনের এই কাহিনিটি আমাদের ভারতবর্ষের সমাজতাত্ত্বিক মানচিত্রের এক নির্দেশক। আমাদের সভ্যতার নিরিখে সাধারণ প্রশ্নের উত্তরগুলির মধ্যে তারতম্যের যে নিদর্শনগুলি দেখি, যেমন কী খাওয়া উচিত আর কী অনুচিত, তারও একটা যথাযোগ্য কারণ এর থেকেই মেলে। এই ধরনের পার্থক্য এবং নিদর্শনগুলো মুছে ফেলার চেষ্টা করা বা এক ধাঁচের সংস্কৃতি নির্মাণ করতে চাওয়া একটি অ-ভারতীয় উদ্যোগ হবে, যা যেমন দুর্ঘটনার ঝুঁকিপূর্ণ তেমনই ব্যর্থতার আশঙ্কাজনক।
*******************************************************************


Tuesday, 16 April 2024

পৃথিবীর ইতিহাস - দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, রমাকৃষ্ণ মৈত্র

দেহগত আকৃতি-প্রকৃতি তারতম্য অনুযায়ী, অর্থাৎ চুল, চোখ, নাক, মাথার খুলি, গায়ের রং প্রভৃতির পার্থক্যের ভিত্তিতে মানুষের যে ভাগ-বিভাগ করা হয় - নৃতত্ত্ববিজ্ঞানে সেটা একটা দীর্ঘদিনের প্রচণ্ড বিতর্কমূলক বিষয়। এ বিষয়ে মূল সমস্যা প্রধানত দুটি। এক: প্রাণী-জগতের বিবর্তনের ক্রম-বিকাশে একটি জায়গায় এবং একটি মূল উৎস থেকেই মানুষের আবির্ভাব হয়েছিলো, না, এই ক্রমবিকাশের ধারায় একসঙ্গে বিভিন্ন জায়গা থেকে বিভিন্ন মানুষের গোষ্ঠীর আবির্ভাব হয়েছিলো - এ প্রশ্নের জবাবে নৃতত্ত্ববিজ্ঞানীরা এখনো পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছুতে পারেননি। দুই: উপরের ওই প্রশ্ন থেকেই আরেকটি প্রশ্ন ওঠে। সেটা হলো এই যে, জীব হিসাবে গোটা মানুষের সমাজ একই শ্রেণিভুক্ত হলেও, দৈহিক আকৃতি এবং বর্ণের দিক দিয়ে বিভিন্ন মানুষের গোষ্ঠীতে যে পার্থক্য রয়েছে, সে পার্থক্যের উৎস কি? পৃথিবীর আবির্ভাবের সময় থেকেই কি এই পার্থক্য ছিলো? এ বিষয়েও পণ্ডিতদের মধ্যে নানারকম বিপরীত মত আছে। এক দলের মত হলো যে কিছু কিছু পার্থক্য নিয়েই এই পৃথিবীতে মানুষের আবির্ভাব হয়েছিলো; ফলে গোটা মানুষের সমাজে দেহগত আকৃতি ইত্যাদির দিক দিয়ে মূল কয়েকটি বিশিষ্ট আলাদা আলাদা গোষ্ঠী এখনো পর্যন্ত তাদের পৃথক স্বাতন্ত্র্য নিয়ে টিকে আছে। তাঁদের মতে গোটা মানুষের সমাজে এগুলোই হলো আদি এবং "খাঁটি" জাতি। আরেকদল পণ্ডিত ওই "আদি" ও "খাঁটি" জাতিতে বিশ্বাসী নন। তাঁরা বলেন যে শুরু থেকেই মানুষের মধ্যে ক্রমাগত এমন একটি মিশ্রণ ও সংমিশ্রণের ধারা চলে আসছে যে এই ধরনের কোনো "খাঁটি" জাতির কথা ভাবাই যায় না।

যাই হোক, সারা পৃথিবী জুড়ে ছড়ানো মানুষের মধ্যে মোটামুটি কয়েকটি মূল পার্থক্য এখনো নজরে পড়ে। আগেই বলেছি, এ পার্থক্যগুলি কিন্তু শুধুই শরীরের গঠন, রং ইত্যাদির ভিত্তিতেই প্রতিষ্ঠিত। নৃতত্ত্ববিজ্ঞানীরা এই পার্থক্যগুলি অনুযায়ী মানুষকে মোটামুটি চারটি প্রধান ভাগে ভাগ করেছেন : (১) ইউরোপ, ভূমধ্যসাগর অঞ্চল এবং পশ্চিম এশিয়া জুড়ে শ্বেতকায় যে মানুষের দল চোখে পড়ে, পণ্ডিতরা তাকে ককেশয়েড বলে অভিহিত করেছেন। ককেশিয়ানদের মধ্যে আবার কয়েকটি প্রধান উপশাখা আছে। একেবারে উত্তর অঞ্চলের শ্বেতকায় মানুষ বা নর্ডিক; মাঝামাঝি আরেকটি দল অর্থাৎ আলপাইন; এবং দক্ষিণ অঞ্চলের ঈষৎ ঘন বর্ণের মানুষ অর্থাৎ মেডিটারেনিয়ান বা আইবেরিয়ান। (২) পূর্বএশিয়া এবং আমেরিকা মহাদেশ জুড়ে পীতকায় যে মানুষের দল চোখে পড়ে তারা হলো মঙ্গোলয়েড। (৩) আফ্রিকার ঘন কৃষ্ণকায় মানুষের দল হলো নিগ্রয়েড, এবং (৪) অস্ট্রেলিয়া ও নিউগিনি অঞ্চলের প্রাচীনতম অধিবাসীরা - পণ্ডিতরা যাকে অস্ট্রোলয়েড বলে অভিহিত করেছেন। অবশ্য কালক্রমে এই চারটি প্রধান বৈশিষ্ট্যের জাতির পরস্পরের মধ্যে প্রচুর মিশ্রণ এবং সংমিশ্রণ হবার ফলে নানারকম মিশ্র জাতির সৃষ্টি হয়েছে।

যেমন জাতিগত বৈষম্যের দিক দিয়ে, তেমনি ভাষাগত বৈষম্যের দিক দিয়েও পণ্ডিতমহলের নানারকম মতভেদ রয়েছে। বর্তমানে পৃথিবীতে আমরা অসংখ্য ভাষার ব্যবহার দেখতে পাই। এগুলোকে বিচার-বিশ্লেষণ করে পণ্ডিতরা মানুষের ভাষা-গোষ্ঠীকেও কয়েকটি মূল বিভাগে বিভক্ত করেছেন। (১) ইন্দো-ইউরোপীয়: এর অন্তর্ভুক্ত হলো কেলট, গ্রিক, ল্যাতিন, টিউটনিক, স্লাভ, আর্য, হিটটাইট ইত্যাদি। (২) সেমিটিক: এর অন্তর্ভুক্ত হলো প্রাচীন ব্যাবিলন ও আসীরিয়ার ভাষা, ফিনিশীয়দের ভাষা, হিব্রু, সিরিয়ান, আরব, আবিসিনিয়ান ইত্যাদি। (৩) হ্যামিটিক: প্রাচীন মিশরবাসীদের ভাষা এর অন্তর্ভুক্ত ছিলো। তাছাড়া উত্তর আফ্রিকার বার্বার এবং পূর্ব-আফ্রিকার সোমালী ইত্যাদি ভাষাও এর অন্তর্ভুক্ত। (৪) তুরানিয়ান বা ফিনো-ঊগ্রীয়: ল্যাপল্যাণ্ড, সাইবেরিয়া, ফিনল্যাণ্ড, ম্যাজার, তুর্কী, মাঞ্চু, মঙ্গোল ইত্যাদি ভাষা এর অন্তর্ভুক্ত। (৫) ভোট-চীন: চীন, বর্মী, শ্যাম এবং তিব্বতী ভাষাগুলি এর অন্তর্ভুক্ত। (৬) আমেরিন্ডিয়ান: অর্থাৎ উত্তর আমেরিকার আদিম আদিবাসী রেড-ইন্ডিয়ানদের মধ্যে প্রচলিত ভাষাগুলি। (৭) অস্ট্রিক: মালয় এবং পলিনেশিয়া দ্বীপপুঞ্জের আদিম আদিবাসীদের ব্যবহৃত ভাষাসমূহ। আফ্রিকার বান্টুদের মধ্যে প্রচলিত ভাষাটিও একটি আলাদা বিশিষ্ট ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত বলে পণ্ডিতরা মনে করেন। দক্ষিণ ভারতে প্রচলিত দ্রাবিড় ভাষাগোষ্ঠী সম্পর্কেও নানারকম মতামত আছে।

এই প্রসঙ্গে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সেটা হলো এই যে, এখনো পর্যন্ত মানুষের ব্যবহৃত কয়েকটি প্রাচীন ভাষার পাঠোদ্ধার হয়নি বলে সেই ভাষাগুলোর গোষ্ঠীবিভাগ সম্পর্কে সঠিকভাবে এখনো কিছু বলা যায় না। এগুলো হলো : (১) প্রাচীন সিন্ধু-উপত্যকার সভ্যতার ভাষা, (২) প্রাচীন ক্রীটের ভাষা, (৩) সুমের-এর প্রাচীনতম অধিবাসীদের ভাষা।


Tuesday, 2 April 2024

যে গল্পের শেষ নেই - দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়

পৃথিবীকে অনেক বেশি করে, অনেক ভালো করে, জয় করতে পারা। কী আশ্চর্য এই কীর্তি। ভাবতে গেলে স্তম্ভিত হতে হয়! গোয়ালে গরু, মরাইয়ে ধান - মানুষ আর ভোঁতা হাতিয়ার হাতে খাবার জোগাড়ের আশায় বনে বনে হন্যে হয়ে ঘুরতে বাধ্য নয়। ওই সুদূর অতীতে পৃথিবীকে ওইভাবে জয় করতে শুরু করেছিলো বলেই মানুষ আজ সভ্যতার কোন আশ্চর্য শিখরে উঠে আসতে পারলো! ওইভাবে উঠে আসবার গল্পই হলো মানুষের আসল গল্প।

তবু সে-গল্প শোনাবার সময় ভুলে গেলে চলবে না যে সুদূর অতীতে ওই অসহ্য দারিদ্র্যের জীবন ছেড়ে আসবার সময়, অভাবের অন্ধকার থেকে প্রাচুর্যের আঙিনায় এগিয়ে আসবার জন্যে, মানুষকে মূল্যও দিতে হয়েছে অনেকখানি। আগেকার দিনে সমানে-সমান সম্পর্কটাও গিয়েছে খোয়া। এ-কথায় কোনো সন্দেহই নেই যে ওই রকমের একটা দারুণ মূল্য চোকাতে না পারলে মানুষ আজ এমন বড়ো হতে পারতো না। তাই, তখনকার যুগে সমানে-সমান সম্পর্কটা হারাতে হয়েছিলো বলে চোখের জল ফেলবারও সত্যিই মানে হয় না। কিন্তু সেই সঙ্গেই মনে রাখতে হবে, আজকের দিনে অতুল ঐশ্বর্যের অধিকারী হয়েও মানুষ দেখছে মানুষে-মানুষ সম্পর্কটাকে আবার যদি সমানে-সমান করে নেওয়া না হয় তাহলে শান্তি নেই, সুখ নেই। আজকের দিনে তাই আবার ভালো করে ভেবে দেখা দরকার আদিম যুগের সমানে-সমান সম্পর্কটা খোয়া যাবার কথা। এই সম্পর্কটা হারানোর অনেকগুলো দিক আছে। সেই দিকগুলোর কথাই একে একে বলি।

যেমন ধরো, সিপাই-শান্ত্রী। যেমন ধরো, পাণ্ডা-পুরুত। এরা কারা? এরা এলোই বা কোথা থেকে?

মানুষ যতোদিন পর্যন্ত দল বেঁধে সমানে-সমান হয়ে থাকতো ততোদিন পর্যন্ত মানুষকে শাসন করবার জন্যে কোনো ব্যবস্থার দরকার পড়েনি। দলের কাজ চালাতো দলের মোড়ল আর সর্দার, আর এই মোড়ল আর সর্দার চলতো দলের সবাইকার মত মেনে। কিন্তু মানুষের দল দুভাগে ভাগ হয়ে যাবার পর দরকার পড়লো শাসন করবার ব্যবস্থা। কেননা, তখন থেকে আর সবাই সমানে-সমান নয়, সবাই স্বাধীন নয়। মানুষে-মানুষে ভাই-ভাই ভাব গেছে ভেঙে, দেখা দিয়েছে লোভ, লুঠতরাজ, মানুষের সঙ্গে মানুষের লড়াই। কিন্তু সবাই যদি লুঠতরাজ করতে যায়, সবাই যদি মারামারি আর কাটাকাটি নিয়ে মেতে ওঠে, তাহলে মানুষের দল একেবারে চুরমার হয়ে ভেঙে যাবার ভয়। তাই দরকার পড়লো কতকগুলো আইনকানুনের। আইন-কানুনগুলো সবাইকে মানতেই হবে, না মানলে শাস্তির ব্যবস্থা। শাস্তির ভয়ে আইন-কানুন মানা এমনতরো ব্যাপার এর আগে দরকার পড়েনি। কেননা, মানুষ তখন জানের দায়ে পৃথিবীর সঙ্গে লড়াই করছে, হাতিয়ার উন্নত হয় না বলেই দল বেঁধে একসঙ্গে মিলে লড়াই করছে, প্রাণপণে পৃথিবীর সঙ্গে লড়াই করে যতোটুকু জিনিস পাওয়া যায় ততোটুকু দিয়ে কোনোমতে সবাইকার প্রাণ বাঁচানো সম্ভব। তাই সবাই গরিব, তবু সবাই সমান। সবাই মিলে যে-কাজটা করে সে-কাজটা সম্বন্ধে উচিত-অনুচিতের কথা, আইন-বেআইনের কথা ওঠে না। কিন্তু তারপর থেকে অন্য কথা - মানুষে মানুষে মারামারি আর কাটাকাটি। এই অবস্থায় কতকগুলো আইন-কানুন যদি না থাকে তাহলে মানুষের দলটা টিকবে কেমন করে?

কিন্তু শুধু কতকগুলো আইন-কানুন তৈরি করলেই তো হলো না, সবাই যাতে সেগুলো মানতে বাধ্য হয় সেই ব্যবস্থাও করা দরকার। সেই ব্যবস্থারই নাম হলো শাসন করবার ব্যবস্থা। আইন-কানুনগুলো সবাই ঠিকমতো মানছে কিনা তারই তদারক করার লোক চাই। আইনগুলো কে মানলো আর কে মানলো না তারই বিচার। তাছাড়া সিপাই চাই, শান্ত্রী চাই, জল্লাদ চাই, কোটাল চাই। যারা আইন মানবে না তাদের তাঁবে রাখার জন্যে। আস্তে আস্তে মানুষের দলের মধ্যে দেখা দিলো কাজির-উজির, জল্লাদ-কোটাল, সিপাই-শান্ত্রী। এরা শাসন করবে মানুষের দলকে, হিসেব করে দেখবে কে আইন মানলো আর কে আইন মানলো না; যে মানলো না তাকে ধরে আনতে হবে, তাকে শাস্তি দিতে হবে। শাসন বলে ব্যবস্থা না থাকলে তখন মানুষের দল টিকতে পারে না, তাই যাদের ওপর শাসনের ভার তাদের খাইয়ে পরিয়ে বাঁচিয়ে রাখবার দায়টা পড়লো বাকি সবাইকার ঘাড়ে। পৃথিবীর সঙ্গে লড়াই করে যে যা-কিছু জোগাড় করবে তার একটা করে অংশ যাবে এই শাসকদের পেট ভরাবার জন্যে। সেই অংশটারই নাম হলো খাজনা। 

প্রথমটায় মনে হতে পারে, খাসা ব্যবস্থা। কেউ যাতে অন্যায় করতে না পারে তাই জন্যে আইন-কানুন। আইন-কানুনগুলো যাতে কেউ না উড়িয়ে দিতে পারে তাই জন্যে শাসনব্যবস্থা। কিন্তু একটু তলিয়ে ভাবলেই বুঝতে পারবে এই ব্যবস্থার মধ্যে ফাঁকিটা ঠিক কোথায়। আইন-কানুনগুলো শুরু হবার সময় থেকে আজ পর্যন্ত কোনোকালেই ওগুলোর উদ্দেশ্য নয় সমস্ত মানুষের যাতে ভালো হয় সেই ব্যবস্থা করা। সভ্যতার শুরু থেকে আজ পর্যন্ত বেশির ভাগ আইনের আদত কথাটা ঠিক কী? একদল মানুষ মুখ বুজে খাটবে, আর তাদের খাটুনি দিয়ে তৈরি জিনিস লুঠ করবে আর একদল মানুষ। যারা মুখ বুজে খাটবে তারা যদি মুখ বুঝে থাকতে রাজি না হয়? যদি রাজি না হয় নিজেদের মেহনত দিয়ে গড়া জিনিস অপরের ভাঁড়ারে তুলে দিতে? তাহলে শাস্তি, শাসন। তাই আইন। ঘাড় গুঁজে কুঁজো হয়ে রাজাকে মানতে হবে, না মানলে দারুণ শাস্তি। বড়োলোককে মানতে হবে, বড়োলোকের ভাঁড়ার থেকে কানাকড়ি সরানো চলবে না। সরাতে গেলে শাস্তি, দারুণ শাস্তি। বেশিরভাগ আইন-কানুনই হলো এই ধরনের আইন-কানুন। শোষণের খাতিরেই শাসন। যদিও অনেক রকম রঙচঙে আর মিষ্টি মিষ্টি কথা দিয়ে এই সত্যি কথাটুকুকে ঢেকে রাখবার চেষ্টা করা হয়েছে, তবুও ভালো করে ভেবে দেখলেই বুঝতে পারবে আইন-কানুন আর সিপাই-শান্ত্রী সব কিছুর পেছনে একটি হিসেব যাতে মেহনতকারীর দল হঠাৎ না বেঁকে দাঁড়ায়, হঠাৎ না রুখে ওঠে। তারই জন্যে এই সব ব্যবস্থা : আইন-কানুন, রাজা-উজির, হরেক রকমের।

কিন্তু শুধু ডাণ্ডা মেরে ঠাণ্ডা রাখাও কঠিন। কেননা, মেহনতকারীদের যে দল সেটাই হলো আসলে প্রকাণ্ড বড়ো দল। রাজা-উজিরই বলো আর বড়োলোকই বলো, গুনে দেখলে দেখা যায় বাকি মানুষদের চেয়ে যারা খেটে মরছে তাদের চেয়ে - দলে ওরা নেহাতই নগণ্য। তাই, শুধু সিপাই-শান্ত্রী আর জল্লাদ-কোটাল দিয়ে চিরকালের মতো এদের দাবিয়ে রাখা যায় না। বনের বাঘকে খাঁচায় পুরে রাখলেও নিশ্চিন্তি নেই, দরকার পড়ে নিয়ম করে বাঘকে আফিম খাওয়াবার। আফিম খেলে বাঘ ঝিমিয়ে থাকবে, মাথা তুলতে পারবে না, তাই কোনোদিন সে-খাঁচা ভেঙে বেরিয়ে পড়তে পারে এ-হেন দুশ্চিন্তার আর কারণ থাকবে না। বাঘের বেলায় যে-রকম ব্যবস্থা, মেহনতকারী মানুষদের বেলাতেও খানিকটা সেই ধরণেরই ব্যবস্থা গড়ে উঠলো। এই ব্যবস্থাটার নাম ধর্ম। ধর্ম বলে ব্যাপারটা অবশ্য নেহাতই জটিল; তাই নিয়ে অনেক কিছু ভাববার আর বোঝবার আছে। তবু আমাদের গল্পের এখানে যেটা বিশেষ করে বোঝা দরকার শুধু সেটুকুই বলবো। যাতে মেহনতকারী মানুষেরা মাথা তুলতে না পারে, যাতে তারা ঝিমিয়ে থাকতে বাধ্য হয়, তারই একটা বড়ো উপায় বলতে ধর্ম। 

সিপাই-শান্ত্রীর সহায় হিসেবে দেখা দিলো পাণ্ডা-পুরুতের দল। মেহনতকারী মানুষ যাতে মাথা তুলতে না পারে, যাতে ঝিমিয়ে থাকতে বাধ্য হয়, সেই জন্যে পাণ্ডা আর পুরুত। সিপাই-শান্ত্রীর হাতে তীর-ধনুক আর বল্লম-বর্শা, পাণ্ডা-পুরুতের ঝুলিতে ধর্মের আফিম। তারা মানুষকে বুঝিয়ে বেড়াতে লাগলো পৃথিবীর সুখ-দুঃখ নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই। মানুষের এই নশ্বর জীবনে যদি সুখ না জোটে, যদি দুঃখ ভোগ করতে হয়, তাহলেও তাই নিয়ে মন-মেজাজ গরম করবার কোনো মানে হয় না। কেননা, করুণাময় ভগবান সৃষ্টি করেছেন এই পৃথিবী, এখানে যা কিছু ঘটছে তা সবই সেই মঙ্গলময়ের ইচ্ছায়। তিনি সব মানুষকেই সমান ভালোবাসেন। তাহলে কারুর কপালে অতো সুখ আর কারুর কপালে অতো দুঃখ কেন? বিশেষ করে আমাদের দেশে যারা ধর্মের প্রচারক তারা বললে : ঐ তো মজা! আসলে যে-লোক আগের জন্মে ভালো কাজ করেছে এ-জন্মে সে সুখভোগ করছে, যে-লোক আগের জন্মে খারাপ কাজ করেছে এ-জন্মে সে দুঃখভোগ করছে। এই হলো ভগবানের নিয়ম। তাই এ-জন্মে সুখ পাচ্ছো, না, দুঃখ পাচ্ছো তাই নিয়ে মাথা ঘামিও না। মুখ বুজে ভগবানের আদেশ হলো রাজাকে ভক্তি করবার আদেশ, পাণ্ডা আর পুরোহিতের কথা মানবার আদেশ। যদি মুখ বুজে এই সব আদেশ পালন করতে পারো তাহলে পরজন্মে বা পরকালে তোমার কপালেও অনেক সুখ জুটবে। এ-জন্মে শাকান্ন পাচ্ছো না বলে ভগবানে ভক্তি হারিও না। আসলে ভগবান তোমাকে দুঃখ দিয়ে পরখ করে নিচ্ছেন। ইহকালে শাকান্নের অভাবটা যদি হাসিমুখে মানতে পারো তাহলে পরকালে তোমার পরমান্ন একেবারে সুনিশ্চিত। জীবনে যে-আনন্দ তুমি পেলে না সে-আনন্দ পাবার আশায় নিজে নিজে কিছু করে বসাটা একেবারে মূর্খতা; মঙ্গলময়ের পায়ে মাথা কোটো, তাঁর মনে করুণার উদ্রেক করো, তিনি তোমার মনস্কামনা পূরণ করবেন। তাঁর ইচ্ছে অনুসারেই পৃথিবী চলে, তাই তাঁর কাছে করুণা ভিক্ষে করা ছাড়া আর কোনো পথ নেই।

অবশ্যই, মেহনতকারী মানুষরা যদি ভগবানের পায়ে শুধু মাথাই কোটে তাহলে পাণ্ডা-পুরুতদের সংসারই বা চলে কেমন করে? তাই ওরা প্রচার করতে শুরু করলো, শুধু কথায় ভগবানের মন ভেজে না। তার পায়ে মাথা কুটতে হবে, কিন্তু সেই সঙ্গেই তাকে চালকলার নৈবেদ্য খাওয়াতে হবে, আর এই ভগবানের সঙ্গে যেহেতু পাণ্ডা-পুরুতদের খুব ভাবসাব সেই হেতু এদের জন্যে কিছু নগদ দক্ষিণা না আনলেই বা চলবে কেন?

প্রার্থনার মাহাত্ম্য। করুণা চাওয়া, ভিক্ষে চাওয়া, মাথা কোটা। মনে রাখতে হবে, মানুষ যতোদিন ছেলেমানুষ ছিলো, ছিলো দল বেঁধে মিলে মিশে সমানে-সমান হয়ে, ততদিন মানুষের মাথায় এই করুণা-চাওয়া, ভিক্ষে চাওয়া প্রার্থনা করবার কথা আসেনি। ততোদিন ছিল ইন্দ্রজাল। ইন্দ্রজালের মধ্যে কল্পনার আর আজগুবি ধারণার দিকটা যতোখানিই থাকুক না কেন, এর আসল ঝোঁক হলো পৃথিবীটাকে জয় করবার দিকে। কিন্তু আগেকার সেই সমানে-সমান জীবন ভেঙে যাবার পর থেকে নষ্ট হলো জয় করবার দিকে ঝোঁকটাও। মানুষ শিখলো মাথা কুটতে, মানুষ ভাবলো বিধাতার কথা। যারা শোষক, পরের মেহনত লুঠ করে বড়োলোক হয়, তারা বাকি সবাইকে শেখাতে লাগলো এই বিধাতার কথাটা : সবই ঘটছে বিধাতার কৃপায়, বড়োলোকদের ওপরে রাগ করে লাভ নেই, লাভ শুধু বিধাতার পায়ে মাথা কুটে।

***************************************************

আরো একটুখানি তলিয়ে দেখা যাক, দেখা যাক ঠিক কোন ধরনের কথাগুলো শাসকদের মনের মতো কথা। খুব মোটামুটি বললে বলতে হবে, এই ধরনের কথা আছে দুটো। এক হলো, এই যে দুনিয়া এটা আসলে সত্যি জিনিস নয়। আর দু-নম্বরের কথা হলো, এই দুনিয়াতে আসলে কোনো অদলবদল নেই, যা সত্য তা চিরকাল একই রকম, তা বদলায় না। কথা দুটোকে ভালো করে বোঝবার দরকার আছে।

প্রথমত, দুনিয়াটাকে আমরা যেভাবে দেখি সেইভাবে দেখাটা ঠিক দেখা নয়। আমরা দেখি, এই দুনিয়ায় মাটি আছে, মাটির বুকে ফসল ফলায় মানুষ আর সেই ফসল খেয়ে পেট ভরে মানুষের। শাসকদের মনের কথা হলো, এই সবই ভুল দেখা। যেমন, ভুল করে মানুষ অনেক সময় দড়িতে সাপ দেখে সেইরকম। আসলে ওখানে আছে দড়ি, সাপ নয়। তবু অন্ধকার আর অজ্ঞানের ঘোরে ভুল করে কেউবা ভাবলো সাপই। এও তেমনি। আছে অন্য রকমের জিনিস, সাধারণ মানুষ ভুল করে দেখছে মাটির পৃথিবী, রক্তমাংসে গড়া মানুষ, এই রকম কতোই না!

কিন্তু এই ধরনের কথাটাই শাসকদের মনের কথা কেন? কেননা, সাধারণ মানুষকে যদি কোনোমতে বুঝিয়ে দেওয়া যায় যে এই মাটির পৃথিবীটা সত্যি নয়, রক্ত-মাংস দিয়ে গড়া মানুষগুলোও সত্যি নয়, সত্যি নয় মানুষের পেটের জ্বালা, সত্যি নয় অন্ন-বস্ত্র যা দিয়ে পেটের জ্বালা মেটানো যায়, শীতের হাত থেকে শরীরকে বাঁচানো যায় - তাহলে সাধারণ মানুষের মনটা অন্য দিকে যাবে, মাটির পৃথিবীর কাছ থেকে আদায় করা জিনিসপত্তরগুলোকে আর তারা অতো দামী মনে করবে না। আর সাধারণ মানুষের মন যদি সত্যিই অন্যদিকে যায় তাহলে শোষকরা তো দিব্বি নিশ্চিন্তি।

ভেবে দেখো একবার। যারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে মাটির বুকে ফসল ফলায় তারা যদি বলতে শুরু করে: 'ওই ফসলটা হলো সত্যি, ওই ফসল দিয়ে পেট ভরানোটাই হলো সত্যি; আমি চাই ওই ফসল, যতোটা আমার মেহনত দিয়ে তৈরি ততোটারই ওপর দখল শুধু আমার, আর কারুর নয়' তাহলে? যদি সমস্ত মেহনতকারী মানুষ মাটির পৃথিবীটাকে এইভাবে সত্যি বলে চিনতে শুরু করে, তাহলে শাসকদের মন ভয়ে কেঁপে উঠবে না কি? তাই শাসকদের মনের কথাটা উলটো ধরনের কথা। মাটির পৃথিবীটা সত্যি জিনিস নয়, এর পেছনে অন্য কিছু আছে, যা সত্যি, যা বাস্তব।

আর অদল-বদল। পৃথিবীটা কি সত্যিই বদলে যায়? আজ তার চেহারাটা যে-রকম আগামীকাল কি সেই রকম আর থাকবে না? বদলে গিয়ে অন্য রকম হয়ে যাবে? শাসকের দল নিশ্চয়ই আর্তনাদ করে বলবে : না না, তা কিছুতেই নয়, তা কখনো হতেই পারে না। আজকের দিনে পরের মেহনত দিয়ে গড়া জিনিস লুঠ করে যে-রকম মজায় দিন কাটছে বরাবরই যেন সেইরকম ভাবে দিন কাটে। পৃথিবী বদলে গিয়ে অন্যরকম হয়ে গেলে চলবে কেন? আসলে, পৃথিবীতে অদল-বদল বলে আমরা যা কিছু দেখি তার সবটুকুই হলো দেখার ভুল। বদল আসলে নেই, ভুল করে মনে করছি বদল দেখছি বুঝি। এও ওই দড়িতে সাপ দেখার মতো। শোষকের দল এই কথাটাও সাধারণ মানুষকে বিশ্বাস করাতে চায়। বলতে চায়, পৃথিবীটা চিরন্তন, অদল-বদল বলে বাস্তবিকই কিছু নেই পৃথিবীতে।

মোটামুটি এই দুটো কথাই হলো শাসকদের মনের মতো কথা। এই দুটো কথা যদি সাধারণ মানুষের মনে খুব গভীরভাবে গেঁথে দেওয়া যায় তাহলে তার মন একেবারে চিরকালের মতো পঙ্গু হয়ে থাকবে, শোষণের বিরুদ্ধে, শাসনের বিরুদ্ধে, অত্যাচারের বিরুদ্ধে, এই মন কোনোদিন আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না। আর মন যদি না ওঠে তাহলে হাতও উঠবে না। হাত না উঠলে নিশ্চিন্তি।

তাই ধর্ম ছাড়াও শাসকদের তরফ থেকে অন্য রকম ব্যবস্থার বন্দোবস্ত আছে। মস্ত বড় বড় পণ্ডিতদের মুখ দিয়ে এই কথাগুলো প্রচার করানো। তারা সব এমনটাই ডাকসাইটে পণ্ডিত যে তর্ক করে দিনকে রাত বলে প্রমাণ দিতে পারেন। তুমি হয়তো স্পষ্টই বুঝছো যে তোমার দারুণ খিদে পেয়েছে, এক দলা ভাত গিললেই তোমার পেটের জ্বালা জুড়োবে। কিন্তু ওই সব বড়ো বড়ো পণ্ডিতেরা এমন সব তর্কের মারপ্যাঁচ শুরু করবে যে তোমার কাছে সব কিছু গোলমাল হয়ে যাবে, আর তুমি শেষ পর্যন্ত মানতে বাধ্য হবে যে তোমার কথাটাই ভুল, ওদের কথাটাই সত্যি। মেহনত করবার সময়, গতর খাটাবার সময়, মানুষ স্পষ্টই দেখছে যে তার হাতের কোদালটা সত্যিকারের কোদাল, যে-ফসলটা ফলছে সেটাও নেহাতই সত্যিকারের ফসল। কিন্তু মেহনতের কথাটা, গতর খাটাবার কথাটা আলাদা কথা। যখন থেকে মানুষের সমাজ চিড় খেয়ে দু-ভাগে ভেঙে গিয়েছে তখন থেকেই গতর খাটানো আর মাথা খাটানোর মধ্যে মুখ দেখাদেখি নেই, গতর খাটাবার সময় যে-কথাটাকে স্পষ্ট আর সত্যি বলে মনে হয় মাথা খাটিয়ে সেই কথাটাকেই একেবারে ভুল আর বাজে কথা বলে প্রমাণ করে দেওয়া।

যতো দিন কেটেছে ততোই ধারালো হয়েছে, শাণিত হয়েছে শাসকদলের পণ্ডিতদের এই সব যুক্তি-তর্কগুলো। দিনের পর দিন ধরে তারা দিনকে রাত করে চলেছে, আর সবাই মুগ্ধ হয়ে বলেছে : কী অসাধারণ পণ্ডিত! কী বিদ্যা! কী বুদ্ধি! শোষকরা খাতির করে সভায় ডেকে এনেছে এই সব পণ্ডিতদের।

এমন কি আজকের পৃথিবীতেও এই ধরণের ব্যাপারে শেষ নেই। তার কারণ আজকের পৃথিবীতেও একদিকে শোষক আর একদিকে মেহনতকারী মানুষ, যাদের ভুল বোঝানো দরকার। তারা হয়তো ক্ষেপে উঠবে, বলবে : 'পৃথিবীকে বদল করবো আমরা! শেষ হবে শোষণ, পৃথিবীতে নতুন পৃথিবী আসবে।'