Wednesday, 20 May 2026

ভাববাদ খণ্ডন - দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়

প্রথমত, এ-সংস্কৃতি একের নয়, দশের; ব্যষ্টির নয়, গোষ্ঠীর। বিদগ্ধ ব্যক্তি বা বিদগ্ধ সমাজ বলে আলাদা কিছু নেই, সংস্কৃতি যতটুকু তাতে সকলেই সমান অংশীদার। দ্বিতীয়ত, এ-সংস্কৃতির প্রধান উদ্দেশ্য প্রয়োগ, কর্ম, প্রকৃতিকে জয় করা। বিশুদ্ধ জ্ঞান চর্চা বা অবসর বিনোদনের তাগিদ নয়, তাগিদ যেটুকু, সেটুকু কাজের তাগিদ। প্রয়োগের খাতিরেই জ্ঞান, আবার জ্ঞানের দরুন প্রয়োগের উন্নতি - জ্ঞান আর কর্ম পৃথক হয়ে পড়েনি, জ্ঞান আর কর্মের প্রাগবিভক্ত সমন্বয়। তৃতীয়ত, চেতনকারণবাদের দিকে, ধর্মের দিকে, বহিঃপ্রকৃতিকে বশ করবার দিকে, বহিঃপ্রকৃতির অমোঘ নিয়মকে আবিষ্কার করবার দিকে, এককথায় বস্তুবাদের দিকেই। তাই বলে সচেতন জড়বাদের উপর ইন্দ্রজালের প্রতিষ্ঠা সত্যিই নয়; তা হবার কথাও নয়। আদিম অসভ্য মানুষ দল বেঁধে প্রকৃতিকে জয় করবার চেষ্টা করত, কিন্তু তখন তার সামর্থ্য অতি ক্ষীণ, তার সার্থকতা নেহাতই সংকীর্ণ। বৃষ্টির নাচ নাচলে সত্যিই এমন কিছু বৃষ্টি পড়ার বাস্তব সমাধা হবার কথা নয়। বাস্তব সাফল্যের সংকীর্ণতাকে কাল্পনিক সাফল্য দিয়ে পূরণ করা। ইন্দ্রজালের তাই অনেকখানিই ইচ্ছাপূরণ। তবুও তখন এই ইচ্ছাপূরণটুকুও জীবনসংগ্রামের অঙ্গ। এ ইচ্ছাপূরণ বাস্তব সংগ্রামে উদ্দীপনা জুগিয়েছে। অনেক মানুষ দল বেঁধে একসঙ্গে নাচছে। বৃষ্টির নাচ, কিংবা ভালুক শিকারের নাচ। নাচছে আর ভাবছে, বৃষ্টিকে জয় করা গিয়েছে, জয় করা গিয়েছে শিকার। বৃষ্টি এবার পড়বেই পড়বে, শিকার এবার জুটবেই জুটবে। তারপর দল বেঁধে একসঙ্গে বেরিয়ে পড়া -  মনের সামনে দুলছে কামনা সফল হবার ছবি, আর সেই ছবির কাছ থেকে পাওয়া প্রেরণার ফসল জোগাড় করা, শিকার সমাধা করা অনেক বেশি সহজ। এই প্রেরণাটুকু বাদ দিলে তখনকার ওই ভোঁতা হাতিয়ার হাতে পৃথিবীর সঙ্গে সংগ্রাম অনেক দুরূহ হয়ে দাঁড়াত। তাই ইন্দ্রজাল তখন প্রকৃতিকে জয় করবার পথে মানুষকে এগিয়ে নিয়ে গেছে অনেক বেশি করে, অনেক ভালো করে।


তারপর প্রকৃতির সঙ্গে দিনের-পর-দিন একটানা সংগ্রামের চেষ্টায় উন্নত হল মানুষের হাতিয়ার, আর তাই উৎপাদনশক্তি। মানুষ উৎপাদন করতে শিখল নিছক বেঁচে থাকবার জন্যে যেটুকু জিনিস  দরকার, তার চেয়ে অনেক বেশি জিনিস প্রকৃতির কাছ থেকে সংগ্রহ করতে, আর তখন থেকেই সম্ভব হল অনেকের শ্রমের উপর নির্ভর করে কয়েক জনের পক্ষে শ্রমজীবনে অংশগ্রহণ না-করেও বেঁচে থাকা। ফলে, সেই আদিম সাম্যবস্থা-বিচ্যুতি। শ্রেণীহীন সমাজ ভেঙে দেখা দিল নতুন সমাজ; সে-সমাজে শ্রেণীবিভাগ, অতএব শ্রেণীসংগ্রামও। আর দেখা দিল ভাববাদ। ইন্দ্রজালের বদলে ধর্ম, আর ধর্মেরই সংস্কৃত সংস্করণ ভাববাদ। প্রয়োগের পরিবর্তে নিছক তত্ত্ব-জিজ্ঞাসার উৎসাহ। অব্যক্ত বস্তুবাদ বা জড়বাদের দিকে ঝোঁক ছেড়ে চেতনকারণবাদের বা ভাববাদের দিকে ঝোঁক। 


শ্রেণীবিভাগের পাশাপাশি ভাববাদের উদয়। একে নিছক ঐতিহাসিক আপতন বলে উড়িয়ে দেওয়া চলে না। শ্রেণীবিভক্ত সমাজকে বদল করার মধ্যেও ভাববাদের চরম অসম্ভবের হাত থেকে প্রকৃতি মুক্তি। একে রাজনৈতিক দল-বিশেষের প্রচারমাত্র বলে ব্যঙ্গ করাও অসম্ভব।


আদিম শ্রেণীহীন সমাজ ভেঙে দেখা দিল নতুন সমাজ - শ্রেণীবিভক্ত সমাজ। একদিকে ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়, অপর দিকে শূদ্র; একদিকে ইসাক-ফেয়ারো-পুরোহিত, অপর দিকে বঞ্চিত লাঞ্ছিত ক্রীতদাস; একদিকে শোষক-শাসকের দল, অপরদিকে শোষিত শ্রমিকের দল। দল বেঁধে সবাই মিলে প্রকৃতিকে জয় করবার চেষ্টা নয় - প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রামের ভার পড়ল শুধু একদল লোকের উপর; তারাই গতর খাটাবে, মাটি চষবে, প্রাসাদ গড়বে, মন্দির গাঁথবে। শ্রমের ভার, কিন্তু শ্রমের ফলভোগের অধিকার নয়। সে-অধিকার অন্য শ্রেণীর, শাসক শ্রেণীর। পরান্নজীবী এই যে নতুন শ্রেণীর মানুষ, এদের পক্ষে গতর খাটাবার তাগিদ নেই একটুও; তাই গতর খাটানোটা নেহাতই ইতরের লক্ষণ - 'শূকর-যোনি, শ্বা-যোনি চণ্ডাল-যোনি বা' (ছান্দোগ্য উপনিষদ)। চণ্ডাল হল শুয়োর আর কুকুরের সমগোত্র। গতর খাটাবার তাগিদ এতটুকুও নেই বলেই মাথা খাটাবার দেদার অবসর। চিন্তা বা বুদ্ধি বা জ্ঞান - বা যে-কোনো নাম দিয়েই এই মাথা খাটানো ব্যাপারটাকে ব্যক্ত করা যাক না কেন - চরম উৎকর্ষ বলে ঘোষিত হল। এই জ্ঞানের উপর শাসকশ্রেণীর একেবারে একচেটিয়া অধিকার, কেননা শোষিত জনগণের উপর গতর খাটাবার ভার, এবং তখন হাতিয়ারের এমন উন্নতি হয়নি যে, জনগণ অল্পমাত্র গতর খাটিয়ে মানবসমাজের মোট অভাব দূর করে বাকি সময়টুকু সংস্কৃতির চর্চা করবে। তাই যাদের উপর গতর খাটানোর দায়, মাথা খাটাবার মতো অবসর তাদের কাছে কল্পনার অতীত।

************************************************

আমাদের দেশে শ্রেণীসমাজে শূদ্র সম্বন্ধে মনোভাব 'মানব' ধর্মে কীভাবে প্রকাশ পেয়েছে; তুলনা করলেই বোঝা যাবে, বিভিন্ন প্রাচীন সভ্যতার খোলসগুলোয় যতই তফাত থাক না কেন, সে-সব খোলস ছাড়ালে সবগুলির চেহারা মোটামুটি এক :


উচ্ছিষ্টমন্নং দাতব্যং জীর্ণানি বসনানি চ।

পুলাকাশ্চৈব ধান্যানাং জীর্ণাশ্চৈব পরিচ্ছদাঃ।


- শূদ্রের জন্যে ছেঁড়া মাদুর, জীর্ণ বসন, উচ্ছিষ্ট অন্ন।


নোংরা ছবি সন্দেহ নেই। কিন্তু কোনো আধুনিক রাজনীতিকের কল্পিত প্রচারপত্র নয়।


এ-হেন যে জনগণ এদের পক্ষে মাথা খাটিয়ে বিশুদ্ধ জ্ঞান চর্চার কথা নিশ্চয়ই ওঠে না। ভগবান কীরকমের সুতো দিয়ে স্বর্গ থেকে পৃথিবীকে ঝুলিয়ে রেখেছেন? তিনি কেন সৃষ্টি করলেন মানুষকে, আর মানুষের মধ্যে সেরা মানুষ ফেয়ারোকে? পশ্চিমের কোন পাহাড়ের পিছন দিক মৃত আত্মার জমায়েত? - এসব প্রশ্ন জনগণের মাথায় ওঠেনি। মানুষকে এই জনগণ অমৃতের পুত্র বলে কল্পনা করবে কেমন করে? কখন এরা বসে ভাববে : ওঁ ঊষা বা অশ্বস্য মেধ্যস্য শিরঃ। সোহং ব্রহ্ম বা তত্ত্বমসি শ্বেতকেতু, কিংবা ওই ধরনের কোনো মহাকাব্যও এদের কারুর ঠোঁটে ফুটে ওঠবার কথা নয়। শ্রেণীবিভক্ত সমাজ। প্রকৃতির সঙ্গে সমবেত সংগ্রাম নয় আর। আসলে সংগ্রাম যেটুকু, সেটুকুর দায় লুন্ঠিত শোষিত জনগণের উপর; জীবন তাদের কাছে বোঝামাত্র, চিন্তার জাল বোনা দূরে থাকুক, মরবার ফুরসতটুকুও তাদের যেন নেই। গতর খাটিয়ে শরীর ক্ষয় করার পথই যেন তাদের সামনে একমাত্র পথ। আর অপরদিকে মুষ্টিমেয় শোষকের দল। প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করবার হাতিয়ার তখন যতই অনুন্নত আর স্থূল হোক না কেন, শোষণের পদ্ধতি এত নির্লজ্জ আর অকুন্ঠ যে, শোষকের ঘরে বিলাসের প্রাচুর্য। তাই তাদের কাছে প্রয়োগের তাগিদ, প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রামের তাগিদ এতটুকুও নেই; নিছক চিন্তার জাল বোনাই সহজ আদর্শ। যারা ক্ষেত্রে চষে, কাপড়  বনজ,পাথর কাটে, প্রাসাদ গড়ে, তারা নেহাতই ছোটলোকের দল; গতর খাটানোটা ইতরের লক্ষণ, মাথা খাটানোর মধ্যেই মানবাত্মার চরম উৎকর্ষ।


মিসমার হয়ে গেল মেহনতের মর্যাদা। কেননা, সভ্যতার যেটা সদর মহল, যেখানে মালিকদলের জমকালো দরবার, সেখানে আর মেহনতকারী মানুষের ঠাঁই রইল না। মালিকের পক্ষে দায় নেই মেহনত করবার, গতর খাটাবার। মাথা খাটিয়েই তারা ঠিক করে দেবে, কোনখানে কারা কেমনভাবে মেহনত করবে, - ফসল ফলাবে, কাপড় বুনবে, কাটবে পাথর, গড়বে ইমারত। কিন্তু যে ক্রীতদাসের দল এই মেহনত করবে, তারা রইল চোখের আড়ালেই, পাইক-পেয়াদার চাবুক দিয়ে ঘেরা ছোট্ট গণ্ডিটুকুর মধ্যে। তাই শ্রেণীবিভাগ দেখা দেবার পর থেকে যে-মন দিয়ে, যে-বুদ্ধি দিয়ে মেহনতের পরিকল্পনা, সেই মনের সঙ্গে, সেই বুদ্ধির সঙ্গে মেহনতকারী হাতের সম্পর্ক গেল ঘুচে। রাজদরবারে বসে মিশরের রাজা আর সভাসদেরা মিলে হয়তো পরিকল্পনা করল, মরুভূমির বুকে পাথর দিয়ে গাঁথা হোক বিশাল, বিরাট পিরামিড। কিন্তু শুধু মাথা ঘামিয়ে এই পরিকল্পনাটুকু করেই তো সত্যিকারের পিরামিড গড়া হয় না। তার জন্যে আসলে দরকার লক্ষ মানুষের রক্ত-জল-করা মেহনত, দীর্ঘ মেহনত। কিন্তু এই মেহনতটা সমাজের সদর মহলের আড়ালে, তাই চোখে পড়ে না। এই মেহনতের দায় ক্রীতদাসের উপর, শূদ্রদের উপর, ছোটোলোকদের উপর। তাই এর মর্যাদা নেই। দিনের-পর-দিন মানুষ সভ্যতার কত আশ্চর্য চিহ্নই না গড়ে তুলতে লাগল। কিন্তু সভ্যতার এত আশ্চর্য কীর্তির মূলে আসল অবদান যে মেহনতের, সেই কথাটা আর মনে রইল না। মানুষ মনে করল, এত সব কীর্তির আসল যে-গৌরব, তা হল মানুষের মনের, বুদ্ধির, চেতনার। অথচ, চেতনা বা মন বা বুদ্ধি - সব কিছুই যে শেষ পর্যন্ত মানুষের মেহনতের কাছে ঋণী, এই কথাটুকু ভুলে গেল মানুষ।


মাথা খাটানো আর গতর খাটানো, পৃথিবীকে চেনা আর পৃথিবীকে বদল করা, কর্ম আর জ্ঞান - শ্রেণীবিভাগ দেখা দেবার পর থেকে যেন চিড় খেয়ে দু ভাগে ভাগ হয়ে গেল। যতদিন দল বেঁধে সমানে সমান হয়ে বাঁচা, ততদিন মেহনতের উলটো পিঠেই চেতনা, কর্মের উলটো পিঠেই জ্ঞান, দুয়ের মধ্যে সম্পর্ক বড়ো নিবিড়। অবশ্যই এ-কথায় কোনো সন্দেহ নেই যে, তখন পর্যন্ত মানুষের হাতিয়ার অনেক স্থূল, তাই মেহনতটাও নেহাতই অনুন্নত, পৃথিবীকে বদল করবার চেষ্টায় বাস্তব সাফল্য নেহাতই সংকীর্ণ। তাই তার উলটো পিঠে যে-চেতনা, সেই চেতনাও অনেকখানি স্থূল, অনেকখানিই ভ্রান্ত কল্পনা দিয়ে ভরা। তবু চেতনায় মেহনতে আত্মীয়তা, যে-আত্মীয়তা ঘুচল শ্রেণীসমাজ দেখা দেবার সময় থেকে।

************************************************

সমাজে শ্রেণীবিভাগ দেখা দেবার সময় থেকে মেহনতের দায় আর চেতনার দায়, - গতর খাটাবার দায় আর মাথা খাটাবার দায় - দুয়ের মধ্যে সম্পর্ক ভেঙে গেল। যাদের উপর গতর খাটাবার দায়, তাদের উপর শুধুই গতর খাটাবারই দায়; যাদের উপর মাথা খাটাবার দায়, তাদের উপর শুধুই মাথা খাটাবারই দায়। শুধু তাই নয়। সামাজিক ভাবে মেহনত থেকে বাদ পড়ল মর্যাদা। মেহনতকারীর দল হল নেহাতই অস্পৃশ্য : ওদের মুখ দেখলে পাপ, ওদের ছায়া মাড়ালে পাপ। তাই যারা মাথা খাটায়, তাদের চোখের আড়ালে পড়তে চাইল এই পৃথিবীটা, যে পৃথিবীর সঙ্গে অস্পৃশ্য মেহনতকারীদের অমন নাড়ির সম্পর্ক। ওরা মশগুল হয়ে উঠল শুধু চেতনাকে নিয়ে - সে-চেতনা বুঝি বাস্তব দুনিয়ার চেতনা নয়, - নিছক চেতনা, স্বাধিকার-প্রমত্ত স্বয়ম্ভু, সর্বশক্তিমান। ফলে এই বিশুদ্ধ চেতনাটাই হয়ে দাঁড়াল সত্য, চরম সত্য। চেতনার দাবিই হল চরম দাবি, যে-জিনিস চেতনার দাবি চোকাতে পারবে না, সে-জিনিস সত্যি হতে পারে না।


এ-কথা অবশ্যই শাসকরাও বুঝেছিল যে, অন্নের উৎপাদন না হলে শেষ পর্যন্ত কিছুই টেকে না; কিন্তু তাই বলে অন্নের এই উৎপাদনকেই ধ্রুব আদর্শ বলে মনে করা নেহাতই স্থূল দৃষ্টির পরিচয়। উপনিষদের ভৃগুবরণ সংবাদ-এ এই মনোবৃত্তিরই স্বাক্ষর। বরুণের ছেলে ভৃগু-র ইচ্ছে হল সবচেয়ে চরম সত্যকে জানবার, তাই বাবার কাছে গিয়ে ভৃগু বললেন : ব্রহ্ম কী, সে-বিষয়ে আমাকে উপদেশ দিন। বরুণ বললেন : ব্রহ্ম সম্বন্ধে একটা বর্ণনা শুনলেই ব্রহ্মকে তুমি যে জানতে পারবে, এমন আশা নেই; তুমি তপস্যা করো, তপস্যা করলেই ব্রহ্মকে জানতে পারবে ('তপস্যা' - দৈনন্দিন প্রয়োগ থেকে অনেক দূরের কথা, বিশুদ্ধ চেতনায় আশ্রয় নেবার কথাই)। তবে একটা মূলসূত্র পেলে তপস্যা করবার সুবিধে হয়। বরুণ তাই মূলসূত্র হিসেবে ছেলেকে বলে দিলেন - যতো বা ইমানি ভূতানি জায়ন্তে, ইত্যাদি। অর্থাৎ, যার থেকে এই সমস্ত জিনিস জন্মেছে, জন্মাবার পর যার উপর নির্ভর করছে এবং শেষ পর্যন্ত যার মধ্যেই তা বিলীন হয়ে যাবে, তাই হল ব্রহ্ম। এই মূলসূত্রকে অবলম্বন করে ভৃগু তপস্যায় বসলেন, আর তপস্যা করে এসে বললেন : বাবা বুঝেছি, অন্নই হল ব্রহ্ম। কেননা অন্ন থেকেই এই সমস্ত উৎপন্ন, ইত্যাদি। বরুণ বললেন : হল না। কেননা, এ যে নেহাতই স্থূল দৃষ্টির কথা। ভৃগু আবার তপস্যা করতে গেলেন, আর তারপর ফিরে এসে বলেন : বুঝেছি বাবা, অন্ন নয় প্রাণ। বরুণ বললেন : হল না, আবার তপস্যা করো। তৃতীয়বারের তপস্যায় ভৃগু বললেন :মনই হল ব্রহ্ম। চতুর্থবারের তপস্যায় তাঁর মনে হল : বিজ্ঞানই ব্রহ্ম। কিন্তু বরুণ বললেন : এখনো হয়নি, আরো তপস্যা করতে হবে। শেষবার চরম তপস্যা করে ভৃগু বুঝতে  পারলেন,আসলে অন্ন নয়, প্রাণ নয়, মন নয়, বিজ্ঞান নয়, -- আনন্দই হল ব্রহ্ম। আনন্দ থেকেই সব কিছুর জন্ম, ইত্যাদি। শ্রেণীবিভক্ত সমাজে শাসকশ্রেণীর ভঙ্গি এই উপাখ্যানের ব্যঞ্জনা হয়ে রয়েছে। শুরুতে অন্ন, অন্ন না হলে সমাজের ভিতই যে গাঁথা হয় না। কিন্তু তাই বলে অন্নকে চরম সত্য হিসেবে স্বীকার করা নেহাতই ছোটোলোকোমির পরিচয়। স্থূলদৃষ্টির অল্পবুদ্ধি মানুষ অন্নকে স্বীকার করুক, নুয়ে পড়ুক অন্ন উৎপাদনের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে। অবশ্যই, শুধু অন্ন উৎপাদনের দায়িত্বই, শুধু কর্মের দায়িত্বই; তাই বলে কর্মফলে অধিকার তো নয়। যারা উচ্চস্তরের মানুষ, কর্মফলের অধিকার তাদের বলেই কর্মজীবনের দায়িত্ব থেকে তারা মুক্ত। তাই তারা ওই ছোটলোকদের মতো অন্ন উৎপাদনের দায় নেবে কেন? তারা এগিয়ে চলুক ধাপে ধাপে অধ্যাত্ম সত্য আবিষ্কারের পথে। ক্রমশ সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর সত্যের আবিষ্কার - শেষ ধাপে আনন্দ, শুধু বিশুদ্ধ চৈতন্যের আনন্দ, আনন্দই ব্রহ্ম।


সমাজের এক-প্রান্তে একদল নির্বোধ মানুষ শুধু অন্নের উৎপাদনে নিজেদের শরীর-মন ক্ষয় করে ফেলুক। সমাজের আর-এক প্রান্তে বিশুদ্ধ নিস্কলুষ চিন্তায় মগ্ন আর-একদল মানুষ সূক্ষ্মতম আধ্যাত্মিক সত্য আবিষ্কারই তাদের জীবনে পরম পুরুষার্থ হয়ে থাকুক, আধ্যাত্মিক চেতনার চরমে পৌঁছে তারা হৃদয়ঙ্গম করুক, আনন্দই ব্রহ্ম। বিশুদ্ধ আনন্দই হল বিশ্বরহস্যের চাবিকাঠি।


তাই মার্কস বলেছেন: আধ্যাত্মিক কাজ আর বাস্তব কাজ, এই দুয়ের মধ্যে বিভাগ দেখা দেবার আগে পর্যন্ত শ্রমবিভাগ প্রকৃত বিভাগে পরিণত হয়নি। সেই সময় থেকে মনে হতে পারে যে, চেতনাটা বাস্তব জগতের চেতনা ছাড়া বুঝি অন্য কিছু। চেতনা যখন থেকে সত্যিই এমন একটা কিছুকে বোঝাতে চায়, যা বাস্তব কিছু নয়, তখন থেকেই আমরা দেখতে পাই সর্ব-সম্পর্ক বিরহিত হয়ে এই চেতনা বিশুদ্ধ মতবাদ, ঈশ্বরতত্ত্ব, দর্শন, নীতিশাস্ত্র প্রভৃতি নিয়ে একটা ধর্মমত০জাতীয় কিছুতে পরিণত হয়।


অবশ্য এ-কথা ঠিক যে, ইন্দ্রজাল ছেড়ে মানুষের তত্ত্বজিজ্ঞাসা একেবারে এক ধাপে বিশুদ্ধ দার্শনিক ভাববাদে পৌঁছায়নি; ইন্দ্রজালের পর ধর্ম, ধর্মেরই বিদগ্ধতম সংস্করণ ভাববাদ। যতদিন শ্রেণীবিভক্ত সমাজ, ততদিনই এই কথা, - ঘুরে ফিরে নানান ভাবে নানান পথ দিয়ে যুগে যুগে ভাববাদেই তত্ত্বজিজ্ঞাসার পরিসমাপ্তি। তাই, শ্রেণীবিভক্ত সমাজের উচ্ছেদের মধ্যেই ভাববাদ খণ্ডনের মূলসূত্র। তাই মার্কস বলছেন : এতদিন ধরে দার্শনিকেরা নানানভাবে দুনিয়াকে শুধু ব্যাখ্যা করবারই চেষ্টা করেছেন, কিন্তু আসল কথা হল একে বদল করা।

************************************************













 

Thursday, 29 January 2026

আত্মজীবনী - সুভাষচন্দ্র বসু

এক সময়ে ব্রাহ্মসমাজই যে দেশের সব রকম প্রগতিশীল আন্দোলনের কর্ণধার ছিল যে কথা সকলেই স্বীকার করবে। প্রথম থেকেই ব্রাহ্মসমাজের দৃষ্টিভঙ্গীতে পাশ্চাত্য বিজ্ঞান ও দর্শনের প্রভাব পড়েছিল এবং সদ্যপ্রতিষ্ঠিত ব্রিটিশ সরকার যখন স্থির করে উঠতে পারছিলেন না যে এদেশে তাঁরা সম্পূর্ণ দেশীয় শিক্ষাব্যবস্থাই সমর্থন করবেন, না পাশ্চাত্য সংস্কৃতি প্রচার করবেন, তখন রাজা রামমোহন রায় মুক্তকণ্ঠে পাশ্চাত্য সভ্যতার স্বপক্ষে রায় দেন। তাঁর আদর্শ টমাস ব্যাবিংটন মেকলেকে কতখানি প্রভাবান্বিত করেছিল মেকলের বিখ্যাত 'মিনিট অন এডুকেশন'এ তার পরিচয় পাওয়া যায়। রামমোহন রায়ের আদর্শকেই সরকারের পক্ষ থেকে গ্রহণ করা হয়। রামমোহন তাঁর গভীর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে বহুদিন আগেই বুঝেছিলেন পাশ্চাত্য বিজ্ঞান ও দর্শনকে গ্রহণ না করলে দেশের উন্নতি অসম্ভব।


অবশ্য এই সাংস্কৃতিক বিপ্লব শুধু যে ব্রাহ্মসমাজেই নিবদ্ধ ছিল তা নয়। যাঁরা ব্রাহ্মদের সমাজদ্রোহী ও ধর্মবিরোধী বলে মনে করতেন তাঁরাও স্বদেশের প্রাচীন সংস্কৃতিকে পুনরুজ্জীবিত করবার জন্য উৎসুক হয়ে উঠেছিলেন। পাশ্চাত্য সংস্কৃতির সঙ্গে সমতালে চলবার জন্য ব্রাহ্ম এবং অন্যান্য প্রগতিপন্থী সম্প্রদায় যখন পাশ্চাত্য সভ্যতার সার জিনিসগুলি আহরণ করতে ব্যস্ত তখন অধিকতর গোঁড়া সম্প্রদায়ের লোকেরা হিন্দুসমাজের মহিমা কীর্তন করতে ব্যগ্র হয়ে পড়লেন এবং প্রচার করতে লাগলেন হিন্দুসমাজে সবই অভ্রান্ত। এমন কি তাঁরা এও দাবি করলেন যে পাশ্চাত্য সভ্যতা যেসব নতুন নতুন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার নিয়ে আজ গর্ব করছে সেসবই ভারতের প্রাচীন মুনিঋষিরা বহুদিন আগেই আবিষ্কার করে গেছেন। এইভাবে পাশ্চাত্য সভ্যতার সঙ্গে সংঘর্ষের ফলে অত্যন্ত গোঁড়া সম্প্রদায়ও কর্মতৎপর হয়ে উঠেছিল।

***************************************************

সব দিক বিচার করে আজকের দিনে এই ধরনের স্কুলে ভারতীয় ছেলেমেয়েদের শিক্ষালাভের আমি পক্ষপাতী নই। বিদেশী আবহাওয়ার সঙ্গে তারা কখনোই খাপ খাবে না, পদে পদে অশান্তি ভোগ করবে; বিশেষ করে যদি কেউ একটু চিন্তাশীল হয় তবে তো কথাই নেই। অনেক অভিজাত পরিবারে ছেলেদের বিলেতে পাবলিক স্কুলে রেখে শিক্ষা দেবার রীতি আজও চলে আসছে। এ ব্যবস্থাও আমার মোটেই ভালো মনে হয় নি। একই কারণে বিলিতী ছাঁচে গড়া এবং ইংরেজ শিক্ষক পরিচালিত ভারতীয় স্কুলের পরিকল্পনাও আমি অনুমোদন করি না। অনেক ছেলে হয়তো এই বিজাতীয় পরিবেশের সঙ্গে নিজেদের বেশ মানিয়ে নিতে পারে, কিন্তু যারা একটু চিন্তাশীল তাদের পক্ষে এখানকার পরিবেশ মোটেই অনুকূল নয়, একদিন না একদিন তাদের মন বিদ্রোহী হয়ে উঠবেই। এসব কথা ছেড়ে দিলেও এই শিক্ষাব্যবস্থার বিরুদ্ধে আরো বড় আপত্তি এই যে এতে ভারতীয় পরিবেশ, ভারতীয় বৈশিষ্ট্য এবং ভারতীয় ঐতিহ্য ও সমাজনীতিকে সম্পূর্ণ অবহেলা করা হত। অল্পবয়সের ছেলেদের উপর জোর করে ইংরিজি শিক্ষা চাপালেই প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সভ্যতার সমন্বয় হয় না। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে ভালোমন্দ বিচার করবার জ্ঞান হলে পর ছেলেদের পাশ্চাত্য দেশে খাঁটি পাশ্চাত্য আবহাওয়ায় কিছুদিন রাখলে তবে তারা পাশ্চাত্য সভ্যতার ভালো জিনিসটুকু গ্রহণ করতে পারবে।

***************************************************

পার্থিব ভোগসুখ বর্জন করে কোনো মহৎ উদ্দেশ্যে জীবন উৎসর্গ করার সিদ্ধান্তে পৌঁছতে আমাকে মোটেই বেগ পেতে হয়নি। এই রকম জীবনের উপযুক্ত করে শরীর মনকে গড়ে তুলতেও আমাকে খুব বেশি কষ্ট করতে হয়নি। কিন্তু গোলমাল বেধেছিল যৌনপ্রবৃত্তি দমন করার বেলায় - মানুষের স্বাভাবিক একটি প্রবৃত্তিকে দমন করার বেলায় - মানুষের স্বাভাবিক একটি প্রবৃত্তিকে দমন করা কি মুখের কথা! কী প্রাণান্তকর দ্বন্দ্ব যে আমার সারাজীবন ধরে চলেছে তা বোঝানো যায় না।


যৌনসম্ভোগ বর্জন তো বটেই, যৌনকামনা দমন করাও আমার মতে তেমন দুঃসাধ্য নয়। কিন্তু আমাদের দেশের যোগী ঋষিদের মত আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য শুধু এই যথেষ্ট নয়। যে মানসিক আবেগ এবং সহজপ্রবৃত্তি থেকে যৌনকামনার উদ্ভব তাদের এমনভাবে নিয়ন্ত্রিত করতে হবে যাতে সবরকম যৌন আকর্ষণের বিলুপ্তি ঘটে - শরীর মন যৌনচেতনার ঊর্দ্ধে ওঠে। কিন্তু এ কি কখনো সম্ভব, না এ শুধু কষ্টকল্পনা? রামকৃষ্ণ বলে গেছে, এ সম্ভব, এবং শরীর মনকে এভাবে পবিত্র না করলে আধ্যাত্মিক উন্নতির চরমে পৌঁছান যায় না। শোনা যায় অনেকেই রামকৃষ্ণের চরিত্রবল এবং আধ্যাত্মিক সিদ্ধি নানাভাবে পরীক্ষা করবার চেষ্টা করেছিলেন - কিন্তু যতবারই তাঁকে সুন্দরী স্ত্রীলোকদের মাঝখানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে দেখা গেছে নিষ্পাপ শিশুর মতোই তিনি তাদের প্রতি নির্বিকার, নিরাসক্ত ব্যবহার করেছেন। এসব ক্ষেত্রে তাঁর মনে সম্পূর্ণ অযৌনপ্রকৃতির প্রতিক্রিয়া দেখা যেত। রামকৃষ্ণ সর্বদা বলতেন সাধনার পথে সবচেয়ে বড় বিঘ্ন হচ্ছে কামিনী এবং কাঞ্চন। রামকৃষ্ণের এই বাণী আমি ধ্রুবসত্য বলে মেনে নিয়েছিলাম।


গোড়ার দিকে রামকৃষ্ণের উপদেশ অনুযায়ী চলতে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল - যৌনপ্রবৃত্তি দমন করবার জন্য আমি যত বেশি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হতাম প্রবৃত্তির তীব্রতাও যেন ততই বেড়ে যেত। কতকগুলি যোগাসন এবং বিশেষ প্রক্রিয়ার ধ্যানের সাহায্যে যৌনসংগম আমার কাছে সহজসাধ্য হয়ে এসেছিল এবং আমি নিজেকে বেশ নিরাসক্ত করে এনেছিলাম। কিন্তু নিরাসক্তি বলতে রামকৃষ্ণ যাতে বিশ্বাস করতেন সে আমার কাছে একেবারে অসম্ভব বলে মনে হত। যাই হোক, হাল না ছেড়ে অসম্ভবকে সম্ভব করবার চেষ্টা করেছিলাম। কখনো আসত হতাশা, কখনো অনুশোচনা। সে সময়ে একবারও মনে হয়নি যে যৌনপ্রবৃত্তিটা মানুষের পক্ষে কতখানি স্বাভাবিক। রামকৃষ্ণের আদর্শকে জীবনের মূলমন্ত্র হিসেবে গ্রহণ করে তখন আমি আজীবন ব্রহ্মচারী থাকবার সাধনায় রত।


মানুষের স্বাভাবিক যৌনপ্রবৃত্তিকে দমন করবার জন্য এত সময় ও শক্তির অপচয়ের কোনো সার্থকতা আছে কি না এ সম্বন্ধে আজকের দিনে স্বভাবতই প্রশ্ন উঠেছে। কৈশোর এবং যৌবনে ব্রহ্মচর্য পালনের অবশ্যই প্রয়োজন আছে, কিন্তু রামকৃষ্ণ ও বিবেকানন্দের মতে যৌনচেতনাকে চিরকালের মতন সম্পূর্ণভাবে দমন করা উচিত। আমাদের শরীর ও মনের বল তো আর অপর্যাপ্ত নয়! এক্ষেত্রে যৌনপ্রবৃত্তি দমনের অসাধ্যসাধনে সময় ও শক্তির এত অপচয় সত্যিই কি সমর্থনযোগ্য? আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য যৌনপ্রবৃত্তি দমন কি একান্তই অপরিহার্য? দ্বিতীয়ত, আধ্যাত্মিক উন্নতির চাইতে জনসেবাই যার জীবনে বড় স্থান অধিকার করেছে তার পক্ষে ব্রহ্মচর্যের প্রয়োজনীয়তা কতখানি? এই দুটি প্রশ্নের জবাব যাই হোক না কেন, ১৯১৩ সালে আমি যখন কলেজে ঢুকলাম তখন আমার মনে এই ধারণা বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছিল যে আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য যৌনপ্রবৃত্তি দমন একান্ত প্রয়োজন এবং আধ্যাত্মিক সাধনায় সিদ্ধিলাভ না করলে বেঁচে থাকারই কোনো অর্থ হয় না। কিন্তু মনে মনে এই সংকল্প থাকলেও তাকে কার্যে পরিণত করা আমার পক্ষে তখনো সুদূরপরাহত ছিল।


জীবনটাকে গোড়ার থেকে যদি আবার শুরু করা যেত তবে বোধ হয় আমি কখনোই যৌনপ্রবৃত্তি দমনের প্রয়োজনীয়তাকে এতখানি বড় করে দেখতাম না। অবশ্য তাই বলে ভাববেন না আমি যা করেছিলাম তার জন্য অনুশোচনা করছি। যৌনপ্রবৃত্তি দমন করা নিয়ে বাড়াবাড়ি করে যদি আমি ভুল করেও থাকি তবে সে আমার পক্ষে শাপে বর হয়ে দাঁড়িয়েছিল, কারণ এই কৃচ্ছ্রসাধনের ফলে জীবনের সবরকম বাধাবিঘ্ন, দুঃখকষ্টের জন্য নিজেকে আমি প্রস্তুত করে তুলতে পেরেছিলাম।

***************************************************

তীর্থ দর্শনের ফাঁকে আমরা দিল্লী, আগ্রা প্রভৃতি ঐতিহাসিক জায়গাগুলিও দেখে নিয়েছিলাম। সব জায়গাতেই সাধুসন্ন্যাসী যতজনের সঙ্গে পেরেছি দেখা করেছি। এ ছাড়া কয়েকটি আশ্রম এবং গুরুকুল ও ঋষিকুল বিদ্যায়তনও পরিদর্শন করেছিলাম। শেষোক্ত বিদ্যায়তন দুটি প্রাচীন ভারতীয় আদর্শে পরিকল্পিত। এদের মধ্যে গুরুকুলই একটু সংস্কারপন্থী, বিশেষ করে জাতিভেদের ক্ষেত্রে। হরিদ্বারের একটি আশ্রমে আমাদের বেশ মুশকিলে পড়তে হয়েছিল। আশ্রমবাসীরা আমাদের সহজভাবে গ্রহণ করতে ইতস্তত করছিলেন, কারণ তাঁরা বুঝতে পারছিলেন না আমরা বাস্তবিকই ধর্মভাবাপন্ন, না ধর্মের ছদ্মবেশে একদল বিপ্লববাদী বাঙালী যুবক। দুমাস ধরে এইভাবে তীর্থে তীর্থে ঘুরে অনেক ধার্মিক পুরুষের দেখা পেয়েছিলাম সত্যি, কিন্তু সেই সঙ্গে হিন্দু সমাজব্যবস্থার মূল গলদগুলিও আমার কাছে ধরা পড়েছিল। সাধুসন্ন্যাসীদের সম্বন্ধে আমার ধারণা একেবারে বদলে গিয়েছিল। প্রথম আমার চোখ খোলে যেবার হরিদ্বারের একটি ভোজনালয়ে আমাদের খেতে দিতে আপত্তি জানালো। বাঙালীরা মাছ খায়, কাজেই তারা খৃস্টানদের মতোই অপবিত্র - অতএব ভোজনালয়ে আর সকলের সঙ্গে বসে খাবার অধিকার তাদের নেই। আমাদের নিজের নিজের বাসনে ভোজনালয় থেকে খাবার নিয়ে এসে নিজেদের ঘরে বসে খেতে হত। আমাদের বন্ধুদের মধ্যে একজন ছিল ব্রাহ্মণ, কিন্তু সেও এই ব্যবস্থা থেকে নিষ্কৃতি পায়নি। বুদ্ধগয়ায় একই ব্যাপার। বারাণসীর রামকৃষ্ণ মিশনের অধ্যক্ষের পরিচয়পত্র নিয়ে আমরা একটি মঠে আতিথ্য গ্রহণ করেছিলাম। খাওয়ার সময়ে আমাদের জিজ্ঞাসা করা হল আমরা আলাদা আলাদা বসে খাবো কি না, কারণ আমরা সকলে একজাতের ছিলাম না। প্রশ্ন শুনে আমি তো অবাক, কারণ এরা সকলেই ছিল শঙ্করাচার্যের ভক্ত। আমি চট করে শঙ্করাচার্যের একটি শ্লোক আউড়ে তাদের বুঝিয়ে দিলাম শঙ্করাচার্য নিজে সবরকম ভেদাভেদের একান্ত বিপক্ষে ছিলেন। হাতে হাতে যুক্তি পেয়ে আমার কথায় তারা প্রতিবাদ করতে পারল না। কিন্তু পরের দিন যখন আমরা কুয়োর ধারে স্নান করতে গিয়েছি, কয়েকটি লোক এসে বলে গেল আমরা কুয়ো থেকে জল তুলতে পারবো না, কারণ আমরা ব্রাহ্মণ নই। সৌভাগ্যক্রমে আমাদের ব্রাহ্মণ বন্ধুটির গলায় সেই পৈতে বের করে তাদের দেখিয়ে জল তুলে এক এক করে আমাদের দিতে শুরু করে দিল। বেচারাদের তখন যা অবস্থা!

***************************************************

প্রতিদিন কলেজে যেতে এবং কলেজ থেকে ফিরতে সাহেবপাড়ার মধ্য দিয়ে আমাকে যাতায়াত করতে হত। ট্রামগাড়িতে প্রায়ই নানারকম অপ্রিয় ব্যাপার ঘটত। ইংরেজরা ভারতীয়দের সঙ্গে অত্যন্ত খারাপ ব্যবহার করত। কখনো কখনো দেখা যেত ইংরেজযাত্রীদের সামনের সীটে ভারতীয় বসে থাকলে নির্বিকারচিত্তে তারা সেই সীটে জুতো শুদ্ধু পা তুলে দিয়েছে, ভারতীয় যাত্রীটির গায়ে হয়তো জুতো ঠেকত, কিন্তু তাতে ইংরেজদের কোনো ভ্রূক্ষেপই ছিল না। অনেক ভারতীয় বিশেষ করে গরিব কেরানীর দল এসব অত্যাচার মুখ বুজে সহ্য করে যেত, কিন্তু সকলের পক্ষে তা সম্ভব হত না। আমি তো এসব একেবারেই সহ্য করতে পারতাম না। ট্রামে যেতে প্রায়ই ইংরেজদের সঙ্গে আমার বচসা লাগত। ক্কচিৎ কখনো সাহেবদের সঙ্গে ভারতীয়দের মারামারি করতে দেখা যেত। রাস্তায়ও একই ব্যাপার ঘটত। ইংরেজরা চাইত তাদের দেখলেই ভারতীয়রা যেন পথ ছেড়ে দেয়, না ছাড়লে ধাক্কা দিয়ে, ঘুষি মেরে তাদের পথ থেকে সরিয়ে দিত। ইংরেজ সৈন্যগুলি ছিল আর এক কাঠি সরেস - বিশেষ করে গর্ডন হাইল্যান্ডারগুলির তো কথাই নেই। আত্মসম্মান বজায় রেখে রেলে যাতায়াত করাও ভারতীয়দের পক্ষে বেশ কঠিন ছিল। রেলকর্তৃপক্ষ বা পুলিশ এসব ক্ষেত্রে ভারতীয়দের কোনোরকম সাহায্যই করত না, কারণ, দেখা যেত তারা নিজেরাই হয়তো ইংরেজ কিংবা অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান ভারতীয় কর্মচারীরা আবার উপরওয়ালার কাছে ইংরেজদের বিরুদ্ধে নালিশ করতে ভয় পেত। কটকের একটি ঘটনা মনে পড়ে। আমি তখন খুব ছোটো। আমার এক কাকার কোথায় যাবার কথা ছিল, কিন্তু তিনি স্টেশন থেকে ফিরে এলেন, কারণ উঁচু শ্রেণীর কামরাগুলিতে কতকগুলি ইংরেজ ছিল, তারা ভারতীয়দের কোনোমতেই সেই কামরায় ঢুকতে দিতে রাজী হয়নি। রেলে এই ধরনের ব্যাপারে ইংরেজদের সঙ্গে উচ্চপদস্থ ভারতীয়দের প্রায়ই ঝগড়া লাগত বলে শোনা যেত। এইসব কাহিনি স্বভাবতই লোকের মুখে মুখে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ত।


যখনই এই জাতীয় কোনো ঘটনা ঘটত, আমার স্বপ্ন যেত ভেঙে, শঙ্করাচার্যের মায়াবাদে তখন আর সান্ত্বনা খুঁজে পেতাম না। বিদেশীর হাতে অপমানিত হয়ে তাকে মায়া বলে উড়িয়ে দেওয়া আমার পক্ষে কোনোমতেই সম্ভব হয়নি। কলেজে কোনো ইংরেজ অধ্যাপক যদি আমাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করতেন আমার মেজাজ সাংঘাতিক বিগড়ে যেত। দুঃখের বিষয় এ রকম ব্যাপার প্রায়ই ঘটত। আমাদের আগের যুগে অনেক ইংরেজ অধ্যাপককেই এজন্য ছাত্রদের হাতে মার খেতে হয়েছে। কলেজে প্রথম বছর আমারও এই জাতীয় অভিজ্ঞতা কয়েকবার হয়েছিল, তবে সে তেমন গুরুতর নয়। অবশ্য মেজাজ বিগড়ে দেবার পক্ষে তাই যথেষ্ট ছিল।


ইংরেজ ও ভারতীয়দের মধ্যে সংঘর্ষ লাগলে আইনের দিক থেকে ভারতীয়রা কখনো সুবিচার পেত না। এর ফলে শেষটায় অন্য কোনো উপায় না দেখে তারাও পাল্টা আক্রমণ শুরু করে দিল। রাস্তায়, ট্রামে, রেলে তারা ইংরেজদের অত্যাচার অবিচার আর মুখ বুঝে সহ্য করত না। মনে পড়ে আমাদের কলেজের একটি ছেলে ভালো বক্সিং জানত, সে সেধে সেধে সাহেবপাড়ায় গিয়ে টমিদের সঙ্গে মারামারি করে আসত। ভারতীয়দের এই পরিবর্তিত মনোভাবের ফল হাতে হাতে পাওয়া গেল। ইংরেজরা ভারতীয়দের সমীহ করে চলতে শুরু করল। লোকে বলাবলি করতে লাগল ইংরেজরা শক্তের ভক্ত, নরমের যম। এই মনোভাবই বাঙলাদেশে সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের ভিত্তি। উপরোক্ত ঘটনাগুলি স্বভাবতই আমার রাজনৈতিক চেতনাকে জাগিয়ে তুলেছিল, কিন্তু তখনো আমার মনে সঠিক কোনো মত গড়ে ওঠেনি।

***************************************************

বি.এ.তে দর্শনে অনার্স নিলাম - আমার বহুকালের ইচ্ছা এইবার পূর্ণ হল। লেখাপড়ায় এবার সত্যিই খুব মনোযোগ দিলাম। আমার কলেজ-জীবনে এই বোধ হয় প্রথম পড়ায় রস পেলাম। দর্শন পড়ে আমি যা লাভ করলাম তার সঙ্গে দর্শন সম্বন্ধে আমার ছোটোবেলার ধারণার কোনো মিল ছিল না। স্কুলে পড়বার সময়ে ভাবতাম দর্শন পড়লে জীবনের মূল সমস্যাগুলির সমাধান খুঁজে পাওয়া যাবে। দর্শন অধ্যয়নকে সে সময়ে আমার কাছে এক ধরনের যৌগিক প্রক্রিয়া বলেই মনে হত। দর্শন পড়ার ফলে কোনোরকম তত্ত্বজ্ঞান লাভ না করলেও আমার মনন-ক্ষমতা আগের চাইতে বেড়ে গেল, সব কিছুই বিচার করে দেখতে শুরু করলাম। পাশ্চাত্য দর্শনের গোড়ার কথাই সংশয়বাদ - কেউ কেউ বলেন এর শেষও সংশয়ে। পাশ্চাত্য দর্শন কোনো কিছুকেই নির্বিবাদে গ্রহণ করতে রাজী নয় - যুক্তিতর্কের সাহায্যে তার দোষগুণ বিচার করে তবে গ্রহণ করে - এক কথায়, মনকে সংস্কারমুক্ত করে। এতকাল বেদান্তকে অভ্রান্ত বলে মেনে এসেছি, এখন মনে প্রশ্ন জাগল, বাস্তবিকই বেদান্ত অভ্রান্ত কি না। মননচর্চার খাতিরে জড়বাদের স্বপক্ষে প্রবন্ধ লিখতে শুরু করলাম। কিছুদিনের মধ্যেই দলের অন্য সকলের সঙ্গে আমার বিরোধ লাগল। এই প্রথম আমার খেয়াল হল ওরা কতখানি গোঁড়া ও সংস্কারাচ্ছন্ন। অনেক জিনিসই ওরা নির্বিবাদে মেনে নেয় - কিন্তু যে সত্যিকারের সংস্কারমুক্ত সে কখনোই ভালো করে যাচাই না করে কোনো জিনিসকে সত্য বলে মানবে না।

***************************************************

মাসখানেক পরে আবার ওইরকম একটি ব্যাপার ঘটল। খবর পাওয়া গেল - মিঃ ওটেন আবার একটি ছেলের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছেন, এবারকার ছেলেটি প্রথম বার্ষিকের ছাত্র। ছাত্ররা চট করে বুঝে উঠতে পারল না, এ অবস্থায় কী করা দরকার। আইনসম্মতভাবে ধর্মঘট ইত্যাদি করলে কর্তৃপক্ষ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা অবলম্বন করবেন, আর অধ্যক্ষের কাছে নালিশ কোনো ফলই হবে না। অগত্যা কয়েকজন ছেলে স্থির করল তারা নিজেরাই এর ব্যবস্থা করবে। ফলে মিঃ ওটেন ছাত্রদের হাতে বেদম মার খেলেন। খবর পেয়ে খবরের কাগজের অফিস থেকে শুরু করে লাটভবন পর্যন্ত সর্বত্র ভীষণ উত্তেজনা দেখা দিল।


ছাত্রদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল তারা নাকি মিঃ ওটেনকে পেছন থেকে ধাক্কা মেরে সিঁড়ি দিয়ে ফেলে দিয়েছে। এ অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। পেছন থেকে একবারই মাত্র তাঁকে আঘাত করা হয়েছিল, কিন্তু সেও এমন কিছু মারাত্মকভাবে নয়। তাঁকে যারা ঘায়েল করেছিল তারা সকলেই ছিল তাঁর সামনে। ব্যাপারটা আমি স্বচক্ষে দেখেছিলাম, কাজেই ছাত্রদের বিরুদ্ধে যে মিথ্যা অপবাদ দেওয়া হয়েছিল জোর গলায় তার প্রতিবাদ করছি।


এই ঘটনার পরেই বাঙলা সরকার এক বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে আমাদের কলেজ সে সম্বন্ধে তদন্ত করবার জন্য একটি তদন্ত-কমিটি গঠনেরও নির্দেশ দিলেন। সরকারপক্ষ স্বভাবতই সাংঘাতিক খেপে গিয়েছিল, এবং এমনও শোনা গেল প্রয়োজন বোধ করলে চিরকালের জন্য কলেজ বন্ধ করে দিতেও তারা পেছপা হবে না। বলা বাহুল্য, সরকারের তরফ থেকে কলেজ-কর্তৃপক্ষ সবরকম সাহায্যই পেতে পারতেন, কিন্তু একটা গোলমাল হয়ে গেল। সরকারি বিজ্ঞপ্তি নিয়ে আমাদের অধ্যক্ষের সঙ্গে সরকারপক্ষের বিরোধ দেখা দিল। অধ্যক্ষ মনে করলেন কলেজ বন্ধ রাখবার আদেশ জারি করবার আগে তাঁর সঙ্গে পরামর্শ না করে সরকার তাঁর আত্মসম্মানে ঘা দিয়েছেন। এ নিয়ে তিনি শিক্ষাবিভাগের মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে এক হুলস্থূল কাণ্ড বাধিয়ে দিলেন। পরের দিনই আর একটি সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে প্রকাশ পেল - মান্যবর মন্ত্রী মহোদয়ের সঙ্গে অত্যন্ত অভদ্র ব্যবহারের অভিযোগে আমাদের অধ্যক্ষকে অনির্দিষ্টকালের জন্য 'সাসপেন্ড' করা হয়েছে। এদিকে অধ্যক্ষমহাশয় ক্ষমতা হস্তান্তরিত হবার আগেই তাঁর যথাকর্তব্য সেরে ফেললেন। যেসব ছেলে তাঁর কুনজরে ছিল সবাইকে তিনি ডেকে পাঠালেন। এদের মধ্যে আমিও ছিলাম। দাঁতমুখ খিঁচিয়ে আমাকে তিনি বললেন - "বোস, তোমার মতো বেয়াড়া ছেলে কলেজে আর নেই, তোমাকে আমি সাসপেন্ড করলাম।" কথাগুলো আজও স্পষ্ট মনে আছে। জবাবে আমি শুধু বলেছিলাম, "ধন্যবাদ!" তারপর বাড়ি চলে এলাম। শঙ্করাচার্যের মায়াবাদের ঘোর মন থেকে কেটে গেল।


এর কয়েকদিন পরেই কলেজের পরিচালক-সমিতির একটি অধিবেশনে অধ্যক্ষ মহাশয়ের নির্দেশকে সমর্থন জানানো হল। ফলে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে আমি বিতাড়িত হলাম। অগত্যা, অন্য কোনো কলেজে ভরতি হবার অধিকার দাবি করে বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করলাম। কিন্তু আমার আবেদন অগ্রাহ্য হল। দেখা গেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই আমি বিতাড়িত হয়েছি।

***************************************************

Tuesday, 27 January 2026

বাবরনামা

ফারগানা আর কাসঘরের মাঝখানে পর্বতশ্রেণীতে আন্দেজানের জঙ্গল অঞ্চলে এক উপজাতিদল থাকে। তারা 'জাগ্রে' সম্প্রদায়ের লোক। দুর্গম অঞ্চলে থাকে বলে তারা রাজস্ব দিতে চায় না। কাশিম বেগের নেতৃত্বে একদল সৈন্যকে সেখানে পাঠালাম। জাগ্রেরা এক ধরণের পাহাড়ি ষাঁড় পালন করে। তাছাড়া প্রচুর ভেড়া এবং প্রচুর দুরন্ত ঘোড়া আছে তাদের। উদ্দেশ্য - যদি কিছু লুঠ করে আনা যায়। কাশেম বেগ প্রায় কুড়ি হাজার ভেড়া আর পনের হাজার ঘোড়া লুঠ করে নিয়ে এল। সেগুলো আমার সৈন্যদের মধ্যে বিলিয়ে দিলাম। 

**************************************************************

সুলতান আহমেদের মেয়ে আইষা বেগমের সঙ্গে আমার নিকাহর কথা আব্বা ও চাচার উপস্থিতিতেই ঠিক করা হয়েছিল। খোজেন্দে পৌঁছে শাবান মাসে তাকে বিয়ে করি। বিবাহিত জীবনের প্রথমদিকে তার প্রতি আমার ভালোবাসা খুব গভীর হলেও লজ্জায় তার কাছে সবসময় যেতে পারিনি। পনের-বিশ দিন পরপর তার কাছে যেতাম। পরে অবশ্য আমার ভালোবাসায় মন্দা পড়ে গেল। ফলে আম্মি রেগে গিয়ে বকাবকি করে জোর করে আমাকে তার কাছে পাঠাতে লাগলেন। আমিও অপরাধীর মতো ত্রিশ-চল্লিশ দিন পরপরে তার কাছে যেতাম।


প্রায় এই রকম সময়ে শিবিরের বাজারের একটি ছেলের সঙ্গে আমার আলাপ হয়। তার নামও বাবুরি। আমার নামের সঙ্গে অদ্ভুত মিল ছিল। তার প্রতি আমি অদ্ভুত আকর্ষণ অনুভব করি। এর আগে আমি কারো প্রতি উগ্র আকর্ষণ অনুভব করিনি। বলতে গেলে, এরকম উগ্র কামনার অভিজ্ঞতা আমার আগে কখনো হয়নি, এমনকী কারো কাছে শুনিওনি। এই রকম অবস্থায় পড়ে ফারসিতে কয়েকটি কবিতা লিখি, তার মধ্যে একটি -


'আমার মতো মুগ্ধ প্রেমিক কে আছে আর 

প্রেমের আগুনে জ্বলে যায় যার হৃদয় ভার

আমার মতো কে বয় এত অপমান-দায়

নেই কোনো মায়া, শুধু আছে ঘৃণা, প্রাণ যে যায়!' 

**************************************************************

সকালবেলাই সৈন্যদের অস্ত্রশস্ত্রে সাজিয়ে দেওয়া হলো, ঘোড়াদের জিন-বলগা চাপিয়ে তৈরি করা হলো। তারপর সামনে-পিছনে-ডাইনে-বাঁয়ে সৈন্য সাজিয়ে যুদ্ধের জন্য বেরিয়ে পড়লাম। শেয়বানি খাঁর সৈন্যও তৈরি ছিল। তারাও এগিয়ে এল। আমরা যখন সামনাসামনি হলাম, তখন শত্রুপক্ষের সৈন্যরা আমাদের বাঁদিক দিয়ে পাশ কাটিয়ে গিয়ে পিছন দিয়ে ঘিরে ফেলে। আমি তাদের সামনা সামনি হওয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়াতে নির্দেশ দিই। কিন্তু হঠাৎ এভাবে দিক পরিবর্তনের ফলে আমার সামনের দিকের সেরা সৈন্যরা পিছনে পড়ে যায় এবং তারা কেউই আমার সঙ্গে আসতে পারে না। তবুও আমার সৈন্যরা এমন বীরের মতো যুদ্ধ করে যে শত্রুপক্ষের সৈন্যরা বিপর্যস্ত হয়ে পিছিয়ে যায়। এমনকী শেয়বানি খাঁর একজন অভিজ্ঞ সেনাপতি তাকে গিয়ে জানায় যে তখনি পিছিয়ে না গেলে সবই শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু সে তাতে সম্মত না হয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যায়। শত্রুপক্ষের ডান সারির সৈন্যরা আমাদের বামদিকের সৈন্যদের পর্যুদস্ত করে পিছন থেকে আক্রমণ করে। আমাদের সামনের সারির সৈন্যরা যেহেতু একদিকে পড়ে যায়, শত্রুপক্ষের সৈন্যরা তীর ছুঁড়ে আমাদের ব্যতিব্যস্ত করে তুলল। যে সব মোগল সৈন্য আমাদের সাহায্য করার জন্য আনা হয়েছিল তারা যুদ্ধ না করে ঘোড়া থেকে নেমে আমাদের লোকদেরই লুঠপাঠ করতে শুরু করল। এই প্রথম যে তারা এরকম করল তা নয়, এটা তাদের স্বভাব। যদি তারা কোনো যুদ্ধে যেতে, সঙ্গে সঙ্গে তারা শত্রুপক্ষের সৈন্যদের লুঠ করতে শুরু করে। আর যদি হারে, তবে নিজেদের পক্ষের সৈন্যদের জিনিসপত্র লুঠ করে যা পারে তাই নিয়ে পালায়।

**************************************************************

সর্বশক্তিমান আল্লা আমাদের ইচ্ছা পূরণ করলেন। আফগানরা আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বার জন্য পর্বত ছেড়ে বিচ্ছিন্ন পাহাড়ে জমায়েত হলো। আমার এক সৈন্যদলকে পর্বত এবং ছোট পাহাড়ের মধ্যে যে জমি আছে, সেইটা দখল করতে আগেভাগেই পাঠিয়ে দিলাম। অবশিষ্ট সৈন্যদলকে পাহাড়ে আক্রমণ চালিয়ে এগিয়ে গিয়ে আফগানদের ঔদ্ধত্যের শাস্তি দেওয়ার জন্য নির্দেশ দিলাম।


আমার সৈন্যরা এগিয়ে যেতেই আফগানরা প্রমাদ গুনল। তারা যে যুদ্ধে এঁটে উঠতে পারবে না এটা বেশ বুঝতে পারল। ত্বরিৎগতিতে সৈন্যরা তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের এক শ কি দেড় শ জনকে ধরাশায়ী করে ফেলল। এদের মধ্যে কয়েকজনকে জীবন্তই আমার কাছে ধরে নিয়ে এল, কিন্তু বেশির ভাগেরই কাটা মুন্ডু আমার সামনে হাজির করা হলো। যুদ্ধে পরাস্ত হলে আফগানরা তাদের বিজয়ী শত্রুর সামনে দাঁতে ঘাস নিয়ে এসে দাঁড়ায়। বোধ হয় তারা বলতে চায় যে আমি তোমার আশ্রিত ষাঁড়। আফগানদের এই রীতি আমি প্রথম দেখলাম। আফগানরা যখন দেখল যে আর সংঘর্ষ চালানো সম্ভব হবে না - তখন তারা দাঁতে ঘাস নিয়ে আমাদের দিকে এগিয়ে এল। যে সব আফগানকে জীবন্ত ধরে আনা হয় তাদের শিরচ্ছেদ করার আদেশ দিলাম। আমাদের পরবর্তী বিশ্রামের জায়গায় ওই সব ছিন্ন মুণ্ড দিয়ে একটা চূড়া করা হলো।


পরদিন সকালে এগিয়ে গিয়ে হাঙ্গুতে শিবির ফেলা হলো। সেদিককার আফগানরা একটা পাহাড়কে সুরক্ষিত করে একটা 'সাঙ্গরে' রূপান্তরিত করে ফেলেছে। আমি কাবুলে এসেই প্রথমে এই 'সাঙ্গর' কথাটা শুনি। একটা বিচ্ছিন্ন পাহাড়কে কোনো আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য যদি সুরক্ষিত করা হয় - সেটাকেই সাঙ্গর বলে। আমার সৈন্যরা এই 'সাঙ্গরের' কাছে আসা মাত্র আক্রমণ চালায়। সাঙ্গরটিকে বিধ্বস্ত করে তা অধিকার করবার পর তারা দু' শ অবাধ্য আফগানকে ধরে এনে তাদের শিরচ্ছেদ করে। এখানেও নরমুণ্ডের আর একটা চূড়া তৈরি করা হয়।


বানু প্রদেশে অবতরণ করে সংবাদ পাওয়া গেল যে সমতলবাসী উপজাতিরা উত্তর দিকের পাহাড়গুলোতে সাঙ্গর গড়ে তুলেছে। জাহাঙ্গীর মির্জার অধীনে একদল সৈন্য সেই দিকে পাঠাই। যে 'সাঙ্গর'এর বিরুদ্ধে অভিযান চালায় সেটা 'কিভি' উপজাতিদের। মুহূর্তের মধ্যে সেটা অধিকার করা হলো। তারপর শুরু হলো হত্যাকাণ্ড। অনেকগুলো কাটা মুন্ডু আমার শিবিরে নিয়ে এলো। সৈন্যরা এই অভিযানে নানা রকমের অনেক কাপড় লুঠ করে নেয়। বানুতে মাথার খুলি স্তূপ করে সাজিয়ে রাখা হয়।

**************************************************************
মাইল খানেক দূর থেকে বোঝা গেল যে কালো ছায়ার মতো যেটা দেখাচ্ছিল, সেটা আফগানদের তাঁবুগুলো একজোট হয়েছিল বলে ওই রকম লাগছিল। একদলকে সেদিকে পাঠানো হলো। অনেকগুলো ভেড়া লাভ হলো। একসঙ্গে এতগুলো ভেড়া এর আগে কোনোবারই পাওয়া যায়নি। যখন আমরা ঘোড়া থেকে নেমে লুঠের মাল সংগ্রহ করতে ব্যস্ত ছিলাম, শত্রুপক্ষ একত্রিত হয়ে সমতলভূমিতে নেমে এসে যুদ্ধের জন্য প্ররোচনা দিচ্ছিল। আমাদের দলের কয়েকজন বেগ ও কিছু সৈন্য তাদের দলকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে প্রত্যেককে তলোয়ার দিয়ে হত্যা করে। নাসির মির্জাও এমনি একটি দলকে পেয়ে তাদের প্রত্যেককে কেটে ফেলে। আফগানদের মাথার খুলি দিয়ে একটা স্তম্ভ খাড়া করা হয়।  
**************************************************************
আমাদের দলের আরো অনেকে শত্রুপক্ষের বাধা দেওয়ার শত চেষ্টা সত্ত্বেও তাদের তীর-ধনুকের পরোয়া না করে দুর্গ-প্রাচীরে গর্ত করে ওদের প্রতিরোধ ভেঙে ফেলতে থাকে।

দুপুরের খাওয়ার সময় দোস্ত বেগের লোকেরা উত্তর-পূর্ব কেল্লার যে অংশে গর্ত খুঁড়ছিল সেখানে একটা ভাঙনের সৃষ্টি করল। এই ভাঙনের ভিতর দিয়ে তারা কেল্লার মধ্যে ঢুকে পড়ে শত্রুদের তাড়িয়ে নিয়ে গেল। প্রধান সেনাদলও সেই সময় মই দিয়ে প্রাচীর ডিঙিয়ে দুর্গের মধ্যে ঢুকে পড়ল। আল্লার অনুগ্রহে আমরা দুই-তিন ঘন্টার মধ্যেই এই সুরক্ষিত দুর্গ দখল করে ফেলি। আমার সব অনুচরই খুব সাহস ও সহনশীলতা দেখিয়ে, তারা যে সত্যিই বীর এই সুখ্যাতি লাভ করেছে।

বাজুরের অধিবাসীরা শুধু বিদ্রোহী নয় তারা ইসলাম ধর্মাবলম্বীদেরও বিরোধী। তাদের এই বিদ্রোহ এবং শত্রুতার জন্য তারা শাস্তি পাওয়ার যোগ্য। এ ছাড়াও, তারা বিধর্মী কাফেরের রীতিনীতি পালন করে। তাদের মধ্য থেকে ইসলাম ধর্মকে একেবারে নির্মূল করে ফেলায় তাদের তলোয়ার দিয়ে মাথা কেটে দেওয়া হয় এবং তাদের স্ত্রী ও পরিবার-পরিজনকে বন্দি করা হয়। তিন হাজারের ওপর লোককে এইভাবে হত্যা করা হয়।

বাজুরের বিরুদ্ধে অভিযান এইরকম সন্তোষজনক শেষ হওয়ায় একটি উঁচু মাটির ঢিপির ওপর নরমুণ্ড সাজিয়ে একটি বিজয়স্তম্ভ নির্মাণ করতে আদেশ দিই।
**************************************************************
ত্রিশ-চল্লিশ বছরের মধ্যে শাহাবাজ কালেন্দার নামে একজন আল্লায় অবিশ্বাসী অসাধু লোক ইউসুফজাই ও দিলজাক উপজাতিদের ধর্মে অবিশ্বাসী করে তুলেছিল। মকাম পাহাড় হঠাৎ শেষ হওয়ার পর একটা ছোট পাহাড় দেখা যায় - যেন চারিপাশের সমতলভূমি তার দিকে তাকিয়ে আছে। দৃশ্যটা অতি সুন্দর। নিচু জমি থেকে এই পাহাড়টা মনোরম দেখায়। এই পাহাড়ের ওপর শাহাবাজ কালেন্দারের কবর আছে। আমরা মনে হলো - এমন সুন্দর নয়নাভিরাম জায়গায় একজন অবিশ্বাসীর কবর থাকবে - এটা অন্যায়। সেইজন্য আমি আদেশ দিলাম - কবরটা ভেঙে ফেলে মাটির ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া হোক। এই জায়গাটা আবহাওয়া ও দৃশ্যের দিক দিয়ে খুব সুন্দর হওয়ায় আমার মন ভালো হয়ে গেল। আমি কিছুদিন এখানেই থেকে যাই এবং মদের আসর জমাই।   
**************************************************************
হিন্দুস্তানের লোকেরা বিশেষ করে আফগানরা এক অদ্ভূত নির্বোধ জাত। তাদের না আছে কোনো চিন্তাশক্তি, না আছে দূরদৃষ্টি। তারা রোখ করে বীরের মতো যুদ্ধও চালাতে পারে না, অথচ বন্ধুত্ব ও সৌহার্দ্যের মধ্যেও থাকতে চায় না। 
**************************************************************
আমার সঙ্গী ছয় জন প্রধান আফগান সর্দারকে হিন্দুস্তানের লুঠের মাল থেকে প্রত্যেককে একশ রৌপ্য মুদ্রা, একটা কোর্তা, তিনটে বলদ এবং একটা করে মোষ দিই। আর সকলকেও মুদ্রা, কাপড়, বলদ এবং মোষ তাদের মর্যাদা অনুসারে দিয়েছিলাম।
**************************************************************

একদল সৈন্যকে গাজি খাঁকে অনুসরণ করে বন্দি করার জন্য পাঠিয়ে আমি নিশ্চিত হয়ে রেকাবে পা দিয়ে এবং বলগা হাতে নিয়ে লোদি আফগান বংশের সুলতান বাহলুলের নাতি এবং সুলতান সিকান্দরের ছেলে সুলতান ইব্রাহিমের বিরুদ্ধে যুদ্ধের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ি। এই সময়ে হিন্দুস্তান সাম্রাজ্য ও দিল্লীর সিংহাসন সুলতান ইব্রাহিমের দখলে ছিল। তাঁর অধীনে এক লক্ষ সৈন্য এবং তাঁর ও তাঁর আমিরদের মোট এক হাজার হাতি ছিল। মিলওয়াত দুর্গ থেকে যে সোনা এবং মূল্যবান জিনিসপত্র পাওয়া গিয়েছিল তার অধিকাংশই বাল্খ ও কাবুলে আমার আত্মীয়, বন্ধু-বান্ধব, ছেলে-মেয়ে এবং আমার ওপর নির্ভরশীলদের কাছে উপহার হিসাবে পাঠিয়ে দিই।

**************************************************************

গোয়ালিয়রের রাজা বিক্রমজিৎ একজন হিন্দু। হিন্দু রাজারা এই রাজ্যে একশ বছরের ওপর শাসন করে এসেছে। যে যুদ্ধে সুলতান ইব্রাহিম পরাজিত হয় সেই যুদ্ধেই বিক্রমজিৎকেও নরকে পাঠানো হয়। বিক্রমজিতের পরিবারবর্গ এবং তার গোষ্ঠীর সর্দাররা তখন আগ্রাতেই ছিল। হুমায়ূন আগ্রায় পৌঁছানোর পরই বিক্রমজিতের লোকজন পালাবার চেষ্টা করে, কিন্তু হুমায়ূন যে সব লোককে সতর্ক নজর রাখার জন্য নিযুক্ত করেছিল তারা তাদের আটক করে। কিন্তু হুমায়ুন তাদের ধনরত্ন লুঠ করার আদেশ দেয়নি। তারা স্বেচ্ছায় হুমায়ূনকে সৌহার্দ্যের প্রস্তাব জানিয়ে অনেকগুলো রত্ন ও দামি পাথর উপহার দেয়। এই সব রত্নের মধ্যে একটি প্রসিদ্ধ হীরক ছিল - যার নাম কোহিনূর। সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি বহুমূল্য হীরক সংগ্রহ করেছিলেন। এটা এমন মূল্যবান যে একজন হীরার জহুরি এর দাম ঠিক করেছিলেন - পৃথিবীতে দৈনিক যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়, তার অর্ধেক পরিমাণ অর্থ। এর ওজন প্রায় তিনশ কুড়ি রতি। আমি আগ্রায় পৌঁছালে হুমায়ুন আমাকে সেই হীরক উপঢৌকন দেয় এবং আমিও আবার সেটাকে উপহার হিসাবে তাকে ফিরিয়ে দিই।

**************************************************************