Friday, 26 August 2022

আমি কেন ঈশ্বরে বিশ্বাস করি না - প্রবীর ঘোষ

ষোড়শ শতকে পৃথিবীর প্রতি প্রতিটি মানুষ বিশ্বাস করত, অসুখের কারণ পাপের ফল বা অশুভ শক্তি। ষোড়শ শতকে সুইজারল্যান্ডের বেসেল বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নশাস্ত্র ও ভেষজবিদ্যার অধ্যাপক ডাক্তার ফিলিপ্রাস অ্যাউরেওলাস প্যারাসেলসাস ঘোষণা করলেন - মানুষের অসুস্থতার কারণ  কোনও পাপের ফল বা অশুভ শক্তি নয়, রোগের কারণ জীবাণু। পরজীবী এই জীবাণুদের শেষ করতে পারলেই নিরাময় লাভ করা যাবে।


প্যারাসেলসাসের এমন উদ্ভট ও ধর্মবিরোধী তত্ত্ব শুনে তাবৎ ধর্মের ধারক-বাহকরা 'রে-রে' করে উঠলেন। এ কী কথা! রোগের কারণ হিসেবে ধর্ম আমাদের যুগ যুগ ধরে যা বলে এসেছে, তা সবই কি একজন উন্মাদ অধ্যাপকের কথায় মিথ্যে হয়ে যাবে? শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পবিত্র ধর্মনায়কেরা যা বলে এসেছেন, ধর্মগ্রন্থগুলোতে যা লেখা রয়েছে, যুগ যুগ ধরে কোটি কোটি মানুষ যা বিশ্বাস করে আসছে, সবই মিথ্যে? সত্যি শুধু প্যারাসেলসাসের কথা?


প্যারাসেলসাসকে হাজির করা হল 'বিচার' নামক এক প্রহসনের মুখোমুখি। ধর্মান্ধ বিচারকরা 'রোগের কারণ জীবাণু' বলার অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দিল। প্যারাসেলসাস সেদিন নিজের জীবন বাঁচাতে নিজের দেশ সুইজারল্যান্ড ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন। সেদিনের জনসমর্থন পুষ্ট ধর্মীয় সত্য আজ শুধু সুইজারল্যান্ডবাসীদের মন থেকেই নয়, সারা পৃথিবীর শিক্ষার আলো দেখা মানুষদের মন থেকেই নির্বাসিত।


ইতিহাস বার বার আমাদের এই শিক্ষাই দিয়েছে, যুক্তি ও প্রমাণের কাছে সংখ্যাগুরুর মতামতের দাম এক কানা-কড়িও নয়।

*************************************

আর্য আগমনের পর তারা উপজাতিদের কাছ থেকে গবাদি পশু অপহরণের জন্য আক্রমণ চালাত। আর্যভাষীরা ঘোড়া ব্যবহার করার জন্য যুদ্ধে জিতত। তখন শুধু গবাদি পশু নয়, পরাজিতদের বন্দি করত। এই বন্দিরাই 'দাস' বা 'পনি' বলে সম্বোধিত হত। উপজাতির গায়ের রং ছিল কালো, নাক ভোঁতা। আর আর্যভাষীরা ছিল ফর্সা ও চোখ নাক তীক্ষ্ণ। এই দুই শ্রেণির গাত্রবর্ণ থেকেই বর্ণ প্রথার সূচনা করে আর্যভাষীরা। (ভারতবর্ষের ইতিহাস, রোমিলা থাপার, ওরিয়েন্ট লংম্যান, পৃষ্ঠা ১৮)।


এই দাসপ্রথা চালুর আগেই আর্যভাষীদের মধ্যে শ্রেণিবিভাজন ছিল। তখন ছিল তিনটি শ্রেণি। শীর্ষে ছিল রাজা। তারপর শ্রেণি অনুসারে ক্ষত্রিয় যোদ্ধারা, দ্বিতীয় স্থানে ব্রাহ্মণ বা পুরোহিত। তৃতীয় স্থানে ব্যবসায়ী বা বণিক অথবা বৈশ্যরা।


দাসরা আসার পর তাদের চতুর্থ স্থান বা সর্বনিম্ন স্থান দেওয়া হল। বল হল - এরা 'শূদ্র'।

*************************************

নবি মোহাম্মদের জীবনে নারী 


মোহাম্মদ ও খাদিজার বিবাহিত জীবন ২৫ বছর স্থায়ী হয়েছিল। খাদিজা যখন মারা যান তখন তাঁর বয়স ৬৫ বছর এবং মোহাম্মদের ৫০ বছর। এই দীর্ঘ ২৫ বছরের বিবাহিত জীবনে তিনি ছিলেন একগামী, এক পত্নীব্রত পতি।


খাদিজার মৃত্যুর পর নবি মোহাম্মদ ১৩ বছর বেঁচেছিলেন। এই ১৩ বছরে আরও ১০টি বিয়ে করেছিলেন।


খাদিজা মারা যাওয়ার এক মাসের মধ্যে জাময়াকে বিয়ে করেন। তিনি ছিলেন বিধবা। কয়েক মাসের মধ্যে তিনি তৃতীয় বিয়ে করেন। পাত্রী নবির ঘনিষ্ঠ বন্ধু খলিফার আবুবকরের ৬ বছরের অতি সুন্দরী কন্যা। যৌন মিলন ছাড়া ইসলাম ধর্মে বিয়ে বৈধ নয়। কন্যার নাম আয়েশা। আয়েশার ৯ বছর বয়সে নবি তার সঙ্গে যৌন মিলন ঘটান এবং বিয়ে সিদ্ধ হয়। মোট ১০টি বিয়ে করেছিলেন নবি।


আবার T.P.Huges, 'Dictionary of Islam' পৃষ্ঠা ৪০০ বলা হয়েছে মোহাম্মদের ২২টি পত্নী ছিল। যাক ১০ পত্নী ধরলেও তাঁর দুজন উপপত্নীও ছিল। একজন ইহুদি। নাম রায়হানা। অন্যজন খ্রিস্টান মারিয়া।


মোহাম্মদের একটি বিয়ে নিয়ে বিতর্ক আছে। নীতিবোধ বহির্ভূত কি না - এই নিয়ে বিতর্ক।


জায়েদ ছিলেন মোহাম্মদের পালিত পুত্র। পালিত পুত্র হিসেবে গ্রহণ করার পর জায়েদ পরিচিত হন জায়েদ বিন মোহাম্মদ বলে। জায়েদের বিয়ে হয় জয়নব-এর সঙ্গে। একদিন নবী জয়নবকে দেখে অত্যন্ত কামার্ত হয়ে ওঠেন। জায়েদ পিতার ইচ্ছা পূরণ করতে জয়নবকে তালাক দেন। জয়নবকে বিয়ে করার পক্ষে বাধা ছিল আরবের সামাজিক প্রথা। পালিত পুত্রের বউকেও শ্বশুর বিয়ে করতে পারেন না।


শেষ পর্যন্ত মোহাম্মদ আল্লাহর প্রত্যাদেশ পেলেন। নবির জন্য আল্লাহর প্রত্যাদেশ, প্রাক্তন পুত্রবধূকে বিয়ে করতে পারেন। নবি এবার প্রাক্তন পুত্রবধূকে বিয়ে করে নিলেন।

*************************************

'ঈশ্বরই সব কিছুর নিয়ন্তা' - বলে যারা বিশ্বাস করেন এবং সে কথা প্রচারও করেন, তাঁরা কি সত্যি সত্যিই কথায়-কাজে একাত্ম মানুষ? তাঁরা কি অসুখ হলে ডাক্তারের কাছে যান না?


ঈশ্বরকে সব কিছুর নিয়ন্তা বলে স্বীকার করলে চিকিৎসা শাস্ত্রকে অবশ্যই অস্বীকার করতে হয়! কারণ ঈশ্বরের ইচ্ছেতেই রোগ ও তার মুক্তি হলে চিকিৎসা শাস্ত্রের রোগমুক্তির ক্ষেত্রে কোনও ভূমিকাই থাকতে পারে না।


আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা অবশ্য বড়ই করুণ। বিজ্ঞানাচার্য সত্যেন্দ্রনাথ বসুর সার্টিফিকেট পাওয়া ধর্মগুরু গৌরাঙ্গ ভারতী সবার রোগ গ্যারান্টি দিয়ে সারাবার দাবি করলেও, নিজের হেঁচকি রোগ (সব সময়ই হেঁচকি ওঠা) সারাতে তা'বড় তা'বড় কত যে ডাক্তার দেখিয়েছিলেন তার ইয়ত্তা নেই। জনসিদ্ধ বালক ব্রহ্মচারী দুনিয়ার মানুষের ক্যান্সার থেকে এইডস পর্যন্ত সরিয়ে নিজের অসুখ সারাতে হাজির হয়েছিলেন কোঠারি হসপিটালে। সাঁইবাবা সবার রোগই সারাতেন, নিজের রোগ সারাতে পাড়ি দিতেন বিদেশে। আজ পর্যন্ত যত অবতার দেখেছি, সব অবতারই রোগমুক্তির জন্য রোগীকে ঈশ্বরের ওপর ভরসা রাখতে বললেও নিজেরা ভরসা রাখেন ঈশ্বরের পরিবর্তে ডাক্তারের ওপর। কেন এই দ্বিচারিতা?


ঈশ্বর বিশ্বাসীদের প্রতি অনুরোধ, অসুখ করলে আপনারা আর ডাক্তারের কাছে না গিয়ে ঈশ্বরের ইচ্ছার কাছে নিজেকে সমর্পন করে ঈশ্বরের বিশ্বাসের প্রতি সততা দেখান। তাতে আপনার সততাই শুধু প্রমাণিত হবে না, হাসপাতালগুলোতে ভিড় কমবে, সরকারও হাঁফ ছেঁড়ে বাঁচবেন।

*************************************

ঈশ্বরবাদীদের প্রশ্ন - বহু বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানী ঈশ্বরে বিশ্বাসী করেছিলেন। এঁদের মধ্যে সর্বকালের অন্যতম সেরা বিজ্ঞানী, আইনস্টাইন থেকে প্যালভেন-এর মতো বহু শ্রদ্ধেয় বিজ্ঞানীরা রয়েছেন। তাঁদের এই ঈশ্বরে বিশ্বাসকে উড়িয়ে দেবেন কোন যুক্তিতে?


এটা ঠিক, বিশ্বের বহু বরেণ্য বিজ্ঞানীদের ক্ষেত্রেই তাঁদের নবতম আবিষ্কারকে, তাঁদের দেওয়া নবতম তত্ত্বকে বিজ্ঞানীরাই সবচেয়ে বেশি সন্দেহের চোখে দেখেছেন। শেষ পর্যন্ত সত্যের জয় হয়েছে। সন্দেহ করা, প্রশ্ন তোলা বিজ্ঞানের কাজ। প্রশ্নহীন ভাবে কোনও কিছুকে মেনে নেওয়া স্পষ্টতই বিজ্ঞান-বিরোধী কাজ। সন্দিগ্ধ বিজ্ঞানীরা সন্দেহ নিরসন শেষে ওই সব বরেণ্যদের মতামতকে শেষ পর্যন্ত মেনে নিতে বাধ্য হয়েছেন।


আজ কিছু বিজ্ঞানীদের ঈশ্বরে অস্তিত্বের প্রতি সন্দেহে আদৌ প্রমাণিত হয় না যে, ঈশ্বর-বিশ্বাস ভ্রান্ত এক অন্ধবিশ্বাস। বিজ্ঞানীদের সন্দেহই যদি শেষ কথা হত, তবে নিউটন থেকে শুরু করে ফ্র্যাঙ্ক জে টিপলার পর্যন্ত বহু বিশিষ্ট বিজ্ঞানীই ঈশ্বরে বিশ্বাসী হতেন না। বিজ্ঞানাচার্য সত্যেন্দ্রনাথ বসু থেকে জে. বি. এস. হ্যালডেন পর্যন্ত ঈশ্বরতত্ত্বে, আধ্যাত্মবাদে ও অলৌকিকতায় আস্থাশীল হতেন না। সর্বকালের অন্যতম সেরা বিজ্ঞানী আইনস্টাইন ঈশ্বরে গভীর প্রত্যয় ব্যক্ত করতেন না। এই যুক্তি দেন কিছু ঈশ্বরে বিশ্বাসী অধিক।


বিজ্ঞান যেহেতু পরীক্ষা পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়েই সিদ্ধান্তে পৌঁছয়, তাই প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই আসে পরীক্ষার প্রশ্ন। এসবের পরিবর্তে ব্যক্তি বিশ্বাসকে মর্যাদা দিতে গেলে, ব্যক্তি-বিশ্বাস বা ব্যক্তির দাবিকে বিনা প্রশ্নে মেনে নিলে বিজ্ঞান আর বিজ্ঞান থাকত না। পরীক্ষিত সত্যকে বিজ্ঞান মর্যাদা দেয়। ঈশ্বর বিশ্বাসীরা যেদিন ঈশ্বরের সংজ্ঞা দিতে পারবেন, পারবেন সেই সংজ্ঞায় বাঁধা ঈশ্বরের অস্তিত্বকে প্রমাণ করতে, সেদিন নিশ্চয়ই বিজ্ঞান ঈশ্বরের অস্তিত্বকে মেনে নেবে।


আমরা নিশ্চয়ই এইসব ঈশ্বর-বিশ্বাসী ও আধ্যাত্মবাদে আস্থাশীল বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদদের মূলগতভাবে অশ্রদ্ধেয় মনে করি না, বা আধ্যাত্মবাদী সংস্কৃতি প্রচারের ষড়যন্ত্রের অংশীদার বলেও মনে করি না। বরঞ্চ স্ব-স্ব ক্ষেত্রে তাঁদের কাজকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্বীকার করি ও স্মরণ করি। আমরা জানি তাঁদের এই সীমাবদ্ধতার পেছনে রয়েছে তাঁরা যে সমাজ-সাংস্কৃতিক পরিবেশে বড় হয়ে উঠেছেন, সেই পরিবেশের প্রভাব।


স্বীকার করছি, শুধু এদেশের নয়, পৃথিবী জুড়েই বহু বিজ্ঞান পেশার মানুষই ঈশ্বর-বিশ্বাসী। আবার এ কথাও অস্বীকার করার উপায় নেই, প্রতিটি ক্ষেত্রেই এই সব বিশিষ্ট বিজ্ঞানীদের বিশ্বাসের পেছনে রয়েছে জন্ম থেকে লালিত যুক্তিহীন এক অন্ধ বিশ্বাস। ফলে তাঁরা একই সঙ্গে পেশায় বিজ্ঞানী কিন্তু মানসিকতায় বিজ্ঞান-বিরোধী। এমন স্ববিরোধিতার কারণ, আমাদের সমাজ-সাংস্কৃতিক পরিবেশ।


আপনার আশেপাশে একটু তাকান। দেখতে পাবেন প্রায় প্রতিটি পরিবারের শিশুরাই বেড়ে উঠছে ধর্মীয় ধ্যান-ধারণার মধ্যে, ঈশ্বর-বিশ্বাসের মধ্যে, আত্মার অমরত্বে বিশ্বাসের মধ্যে। শিশুকে পরিবারের মানুষরা শেখান - "ঠাকুর নম কর"। শিশু দেখে 'রোজা' 'নামাজ'। শেখে ফি হপ্তায় গির্জায় যেতে। স্কুলে পড়ে ঠাকুর-দেবতা, আল্লাহ, যিশুর নানা অলৌকিক কাহিনি! সিনেমায়, টিভিতে, যাত্রায় কত না ঈশ্বর-তত্ত্বের, ভুতুড়ে কাহিনির, অলৌকিক ব্যাপার স্যাপারের ছড়াছড়ি। পরিচিত হয়, নানা ধর্মের নানা আচার-আচরণের সঙ্গে। শোনে নানা ভরের কাহিনি। কোথাও ভর করে মনসা-শীতলা-কালী বা মহাদেব, কোথাও বা ভর করে জিন কি ফেরেস্তা। ভরগ্রস্তদের প্রতি বিশ্বাস নিয়ে হাজার হাজার মানুষ ভিড় জমান। তাঁদের বিশ্বাস, তাঁদের মুখের কাহিনি অন্যকেও প্রভাবিত করে। প্রভাবিত করে ধর্মীয় গ্রন্থ, প্রচারমাধ্যম, ধর্মীয় উন্মাদনা। এমনই পরিবেশের মধ্যে প্রায় সকলেই বেড়ে উঠেছে, তা সে ভাল ছাত্রই হোক বা খারাপ ছাত্রই হোক। ফলে লেখাপড়ায় ভাল ছেলেমেয়েরাও যুক্তিহীন ধর্মীয় ধ্যান-ধারণার মধ্যেই পরীক্ষায় ভাল রেজাল্ট করার সুবাদে সাধারণভাবে দৌড়ায় ডাক্তারি, ইঞ্জিনিয়ারিং বা বিজ্ঞান বিভাগে পড়াশুনো শেষ করতে। আমাদের এই অনিশ্চয়তায় ভরা সমাজে ভবিষ্যতে আর্থিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা এখনও এইসব বিজ্ঞান বিষয় নিয়ে পড়াশুনো শেষ করে বেরলে বেশি বলেই, ভাল ছাত্রছাত্রীদের মা-বাবারা তাঁদের এসব লাইনে পড়তে ঠেলে দেন। ফলে এঁরা বিজ্ঞান শিক্ষা শুরু করে ধর্মবিশ্বাসে গা ডুবিয়ে রেখেই যখন সাফল্যের সঙ্গে এঁরা ছাত্রজীবন শেষ করে। কর্মজীবনে প্রবেশ করেন তখন এঁরা - বিজ্ঞানেও থাকেন, ধর্মেও থাকেন। এঁরা জীবনের ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিকে গ্রহণ করেন না। বিজ্ঞান এঁদের অনেকের কাছেই শুধুই একটা পেশা থেকে যায়, যেমন পেশা জমির দালালি বা আলু-পটলের ব্যবসা।


এঁদের সকলেই যে বিজ্ঞানকে শুধু একটা 'পেশা' হিসাবে গ্রহণ করে সুখী থাকেন, তেমন নয়। ব্যতিক্রমী কেউ কেউ বিজ্ঞানকে 'জীবনের শ্বাস-প্রশ্বাস', 'বেঁচে থাকার আনন্দ' হিসেবেই গ্রহণ করেন। কিন্তু তাঁদেরও অনেকের মধ্যে থেকে যায় আজন্ম-লালিত ঈশ্বর-বিশ্বাস থেকে শুরু করে অনেক বিষয়েই অন্ধ-বিশ্বাস।


এইসব ঈশ্বর-বিশ্বাসী বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদদের কেউ যেদিন বিশ্বাসের গণ্ডি পেরিয়ে ঈশ্বরের অস্তিত্বের পক্ষে কোনও প্রমাণ হাজির করতে পারবেন, সেদিন তাঁদের মতকে নিশ্চয়ই আমরা মেনে নেব। কিন্তু তার আগে শুধুমাত্র 'বিখ্যাত বিজ্ঞানীর বিশ্বাস' বলে মেনে নিই কী করে? তেমন করতে হলে বহু অস্তিত্বহীন বিষয়কে এক্ষুনি-এক্ষুনি আমাদের মেনে নিতে হয়। বিজ্ঞানাচার্য অলৌকিকের অস্তিত্বে বিশ্বাস করতেন, এই দোহাই দিয়ে কি আমরা তবে অলৌকিকের মতো অলীক, অন্ধ বিশ্বাসকে মেনে নেব? হ্যালডেন টেলিপ্যাথিতে বিশ্বাস করতেন, বিশ্বাস করতেন আত্মার অমরত্বে। তাই বলে কি আমরা তাঁর এইসব অদ্ভুত ছাই-পাঁশ চিন্তায় বিশ্বাস করব? যে কারণে তাঁদের এই অন্ধ-বিশ্বাসকে বিজ্ঞান মানে না, যুক্তি মানে না, আমরা মানি না, সেই একই কারণে তাঁদের ঈশ্বর বিশ্বাসও বিজ্ঞান মানে না, যুক্তি মানে না, আমরা মানি না।


একটি বিখ্যাত বাংলা পত্রিকায় সম্পাদকীয় কলমে ঈশ্বর বিশ্বাসের পক্ষে লেখা হয়েছিল, "চিকিৎসক অস্ত্রোপচারের আগে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা জানান, বিজ্ঞানী রকেটের মহাকাশ যাত্রার সাফল্য কামনায় ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেন এ ঘটনা বিরল নয়।"


কিন্তু এই ধরনের কিছু ঘটনা কখনই ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রমাণ নয়। বড় জোর এটুকুই প্রমাণিত হতে পারে, ওই বিজ্ঞানীরা ঈশ্বরে বিশ্বাসী। কিন্তু তাতে ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণিত হচ্ছে কি?


*************************************

ধর্মের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ কি মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হতে শেখায়?


প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের ধারক-বাহকরা, ধর্মীয়বেত্তারা, বুদ্ধিজীবী ধর্মগুরুরা অধুনা প্রচার শুরু করেছেন - প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মই মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হতে শেখায়। ধনী-দরিদ্রের বিভেদ ভুলিয়ে সকলকে একই গণউপাসনায়, গণপ্রার্থনায় মেলাতে পারে এবং মিলিয়ে থাকে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম বা ধর্মীয় সম্প্রদায়।


কিন্তু, এ তো কোনও কাম্য মিলন হতে পারে না! এ তো ধনী-দরিদ্রের বাস্তব বিভেদ মেটানোর কোনও পথ নয়! শোষক ও শোষিতের সম্পর্ক ভেঙে সাম্য প্রতিষ্ঠার কোনও দিশা নয়? এ তো অলীক বিশ্বাসের, ভ্রান্ত চেতনার ঐক্য! অসাম্যের সমাজ কাঠামোকে টিকিয়ে রাখতে, শোষিতদের ক্ষোভকে বের করে দিতেই এই ঐক্য। শোষিতদের ক্ষোভকে বিস্ফোরিত হতে না দেওয়ার স্বার্থে ঐক্য। এইঐক্য, এই আবেগময় ধর্মীয় গণজমায়েত প্রায়শই গণহিস্টিরিয়া তৈরি করে। এবং এ'জাতীয় গণহিস্টিরিয়া ব্যক্তিমানুষের নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা-সমাজ চেতনা-সামাজিক দায়িত্ববোধকে গুলিয়ে দেয়, ভুল পথে চালিত করে। শেষ পর্যন্ত ধর্মীয় ঐক্য ধনী-দরিদ্র শ্রেণির বৈষম্য বা অনৈক্যকে বাস্তবে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে অবাস্তব এক 'ছেলে-ভোলানো ললিপপ' ছাড়া আর কিছুই হয়ে ওঠে না।


বৈষম্যের অনৈক্যকে টিকিয়ে রেখে কখনই সমস্ত মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করা সম্ভব নয়। এই ধরনের অনৈক্যের মধ্যেও ঐক্যের অলীক চিন্তা অসাম্যের সমাজ ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই উঠে এসেছে।

*************************************

ঈশ্বর অবিশ্বাসী প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের ইতিহাস প্রাচীন। এই ঈশ্বরবাদ দেওয়া ধর্মকেও সমষ্টিগতরূপ দেওয়া হয়েছিল, সংঘের রূপ দেওয়া হয়েছিল বৌদ্ধ ও জৈনধর্ম এমনই দুই ধর্ম যারা নিরীশ্বরবাদী এবং বেদবিরোধী হিসেবে প্রাচীন ভারতে প্রসিদ্ধ ছিল।


এই প্রসঙ্গে এটুকু মনে করিয়ে দিলে বোধ হয় একটা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, চার্বাক দর্শনের নিরীশ্বরবাদী নাস্তিকতাবাদের সঙ্গে বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের নিরীশ্বরবাদী নাস্তিকতাবাদের মৌলিক পার্থক্য ছিল।


বৌদ্ধ ও জৈন ধর্ম নিরীশ্বরবাদী ও বেদবিরোধী হলেও এই ধর্মের প্রবক্তা চিন্তানায়করা মানুষের পার্থিব জীবনের অনিবার্য পরিণতি দুঃখময় বলে মনে করতেন। পীড়া-জরা-মৃত্যু ইত্যাদি দুঃখময় জীবন থেকে নিজেকে বাঁচাতে জীবন বিচ্ছিন্ন এক জীবনকে খুঁজতে চেয়েছিলেন। তাঁদের এমনই ত্যাগ ও তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে জীবনের উদ্দেশ্যকে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা ছিল স্পষ্টতই নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচায়ক।


চার্বাকবাদ নিরীশ্বরবাদী ও বেদবিরোধী অবশ্যই কিন্তু মানুষের পার্থিব জীবনের প্রতি চার্বাক দর্শনের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল যথেষ্ট ইতিবাচক। তাঁদের চিন্তার মধ্যে ছিল যুক্তি ও বিজ্ঞানমনস্কতার বীজ।


এই আলোচনার পর এ'কথা নিশ্চয়ই বলতে পারি, পৃথিবীর সব প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের ঈশ্বর বিশ্বাস ছিল না। পরন্তু কিছু কিছু প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম ঈশ্বর বিশ্বাসকে কুসংস্কার বলে মনে করত।

*************************************

টেলিভিশন, রেডিও, সিনেমা, থিয়েটার, গান, নাচ, বৃহৎ পত্র-পত্রিকাগোষ্ঠী ও প্রকাশকরা বিশালভাবে আমাদের চিন্তাভাবনাকে নিয়ন্ত্রণ করছে। আমরা টেলিভিশনে কতটা মারদাঙ্গা দেখব, কতটা যৌনতা, কতটা ভক্তিরসে আপ্লুত হবে, ধর্মগুরুদের বাণীর দ্বারা কতটা আচ্ছন্ন হব, কতটা ভাগ্য-নির্ভর হব, কতটা ঈশ্বর বিশ্বাসী হব, কতটা ভূতে, "আদর্শ-নারীর গুণ -- পতিসেবা, পতির পরিবারের সেবা, লজ্জা" -- এই ধরণের নীতিবোধ কতটা আমাদের মাথায় ঠাসব -- এ সবই ঠিক করে দিচ্ছে বিভিন্ন ধনকুবের গোষ্ঠী ও রাষ্ট্রশক্তি। আমরা কী ধরণের গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস কবিতা পড়ব -- তা ব্যাপকভাবে নির্ধারিত করে দিচ্ছে বৃহৎ পত্রিকাগোষ্ঠী ও প্রকাশকরা। প্রচারমাধ্যমগুলোর সংবাদ সরবারহের 'নিরপেক্ষ' মোড়কের আড়ালে থাকে একটি একপেশে মূল্যবোধ ও মতাদর্শগত কর্তৃত্বকে সাধারণ মানুষের মগজে ঢুকিয়ে দেওয়ার দৃঢ় প্রচেষ্টা। এই একপেশে মূল্যবোধ কাদের স্বার্থ-রক্ষায় সহায়ক হবে? অর্থাৎ, কোন শ্রেণির স্বার্থরক্ষায় সহায়ক হবে? অবশ্যই প্রচারমাধ্যমের মালিক যে শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করেন, সেই শ্রেণির। কারণ প্রচারমাধ্যমগুলোর নীতি মালিকের শ্রেণিচরিত্রের ওপর নির্ভর করে।

*************************************

মনুর বিধানে নারী-পুরুষ দুই মেরু


এইসব ধর্মগুলো কতটা মানবিক, কতটা মানবতার মূর্ত প্রতীক, তা জানতে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে ধর্মের বিধানগুলোর দিকে।


হিন্দু ধর্মীয় বিধানে নারী জন্ম-পরাধীন, চির-পরাধীন, মনুর বিধানে [৯:৩] আছে :


পিতা রক্ষতি কৌমারে ভর্ত্তা রক্ষতি যৌবনে।

রক্ষন্তি স্থবিরে পুত্রা ন স্ত্রী স্বাতন্ত্র্যমর্হতি।।


অর্থাৎ নারীকে -

পিতা রক্ষা করবে কুমারিকালে, স্বামী রক্ষা করবে যৌবনে।

বার্ধক্যে রক্ষা করবে পুত্ররা, স্ত্রী স্বাধীনতায় যোগ্য নয়।।


হঠাৎ মনুর বিধান টানলাম কেন? মনুর বিধান কি হিন্দু ধর্মীয় বিধান? যেমন মুসলিম ধর্মীয় বিধান কোরআন বা হাদিস? এমন প্রশ্নের উত্তরে বলছি - হ্যাঁ, তাই। মনু কে? হিন্দু ধর্মে বিশ্বাসীরা মনে করেন, মনু কোনও রমণীর গর্ভজাত নন, ব্রহ্মার দেহ থেকে উদ্ভূত। এই হেতু তিনি ব্রহ্মাপুত্র বলে বিবেচিত হওয়ার পাশাপাশি 'স্বয়ম্ভূ' মনু বলেও পরিচিত। মনুর স্ত্রী শতরূপা, ছেলে প্রিয়ব্রত ও উত্তানপাদ। কন্যা - আকুতি, দেবহূতি ও প্রসূতি। এঁদের ছেলেমেয়েদের থেকেই নাকি মানুষ বা মানবজাতির বিস্তার। মনুর বংশধর বলেই নাকি এই প্রাণীদের নাম হয়েছিল 'মানুষ' বা 'মানব'।


মনু স্মৃতিশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন ব্রহ্মার কাছে। এই স্মৃতিশাস্ত্রই ধর্মশাস্ত্র বা প্রাচীন আইনের বিধান। অর্থাৎ হিন্দু আইনের বিধান ছিল সৃষ্টির দেবতা ব্রহ্মারই চিন্তার ফসল।


মনুর বিধানে মানুষ বিভক্ত হয়েছিল সরাসরি দুটি ভাগে - 'পুরুষ' ও 'নারী'। পুরুষকে প্রভুর ভূমিকায় এবং নারীকে ক্রীতদাসীর চেয়েও অধম, ধর্ষিতার চেয়েও অত্যাচারিতা ও গৃহপালিত পশুর চেয়েও হীন ভূমিকায় নামিয়ে এনেছিল মনুর আইন অর্থাৎ হিন্দু ধর্মীয় আইন।


মনুর পদাঙ্ক অনুসরণ করে হিন্দু ধর্মগ্রন্থগুলো একইভাবে নারীকে চূড়ান্তভাবে শোষণ করতে নানা উপদেশ প্রয়োগ করেছে, নানা নীতিকথার নামে দুর্নীতি ছড়াতে চেয়েছে।


শিক্ষা আনে চেতনার মুক্তি, যা দাসত্ব থেকে মুক্ত হতে উদ্বুদ্ধ করতে পারে বিবেচনায় মনুষ্যত্বের ও মানুষের চরম শত্রু মনু বিধান দিলেন তাঁর বিখ্যাত মনুসংহিতায় [২:৬৭]:


বৈবাহিকো বিধিঃ স্ত্রীণাং সংস্কারো বৈদকঃ স্মৃতঃ।

পতিসেবা গুরৌবাসো গৃহার্থোহাগ্নি পরিক্রিয়া।।

...


অর্থাৎ:

বিয়েই নারীর বৈদিক উপনয়ন।

পতিসেবাই গুরুগৃহবাস, গৃহকর্মই হোমস্বরূপ অগ্নিপরিচর্যা।।


বিধানের এখানেই শেষ নয়। মনু আরও বলেছেন [৫:১৫৪], পতি সদাচারহীন, পরস্ত্রীর সঙ্গে যৌন সম্পর্কযুক্ত বা গুণহীন হলেও সতী স্ত্রী সেই পতিকে দেবতার মতোই পুজো করবে।


তাহলে হিন্দু নারীর বিনোদন কি শুধুই নানা ব্রতপালন ও উপবাস ঘিরেই আবর্তিত হবে?


না, ব্রতপালন, উপবাসের স্বাধীনতা নারীকে দেননি মনু। তাঁর বিধানে আছে [৫:১৫৫] স্ত্রী'র স্বামী ছাড়া পৃথক যজ্ঞ নেই, পতির অনুমতি ছাড়া ব্রত বা উপবাস নেই। নারী স্বর্গে যেতে পারে কেবলমাত্র স্বামী-সেবার সাহায্যেই।


হিন্দু সমাজে পুরুষরা এভাবে পুরুষরা এভাবে নিজেদের লাম্পট্য, অসদাচরণ ও অত্যাচারকে নারীদের কাছে শুধুমাত্র প্রতিবাদহীনভাবে গ্রহণীয় করেন, নিজেদের দেবতার আসনে বসিয়েছে ধর্মের বিধান খাড়া করে।


হিন্দুধর্মের বিভিন্ন বিধানে পদে পদে পুরুষের লাম্পট্যকে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে। পুরুষের লাম্পট্যকে নীতিগতভাবেই গ্রহণ করা হয়েছে। তৈত্তিরীয় সংহিতায় [৬/৬/৮৫] বলা হয়েছে, "যজমান, দীক্ষার দিনে গণিকাসাহচর্য বর্জন করবেন, তার পরদিন পরস্ত্রীর সাহচর্য এবং তৃতীয় দিন নিজ স্ত্রীর সাহচর্য বর্জন করবেন।" অর্থাৎ দীক্ষার দিনেও পরস্ত্রীর সাহচর্য বৈধ ছিল। দীক্ষার দিন ছাড়া অন্যান্য দিন গণিকা গমনও বৈধতার ছাড়পত্র পেয়েছিল এবং গণিকাগমন পুরুষের কাছে কখনই দোষণীয় বা লজ্জার বলে চিহ্নিত হয়নি। বরং চিহ্নিত হয়েছিল পৌরুষের প্রতীক হিসেবেই।


মনুসংহিতায়, অর্থাৎ মনুর বিধানে [৯:৪] বলা হয়েছে, নিঃসন্তান স্ত্রীকে বিয়ের দশ বছর পর ত্যাগ করা যায়, যে স্ত্রী শুধুমাত্র কন্যাসন্তানের জন্ম দেয় তাকে ত্যাগ করা যায় বারো বছর পরে, মৃত সন্তানের জন্মদানকারী স্ত্রীকে ত্যাগ করা যায় পনেরো বছর পরে।


সন্তানের জন্ম দেওয়ার অক্ষমতার কারণে স্বামীকে কিন্তু ত্যাগ করার কোনও বিধান নেই হিন্দুশাস্ত্রে।


মনু [৯:৪] ঝগড়ুটে স্ত্রীকে তক্ষুনি ত্যাগ করার অধিকার দিয়েছেন। কিন্তু ঝগড়ুটে শুধু নয়, অত্যাচারী স্বামীকে দেবতা জ্ঞানে পুজো করতে বলেছেন এই মনু নামক অমানুষ এক পুরুষ। মানুষের শত্রু, মনুষ্যত্বের শত্রু এই মনুকে দেবত্ব আরোপ করেছে হিন্দু পুরুষ সমাজ। মনুকে ব্রহ্মার অংশ হিসেবে চিত্রিত করে মনুর বিধানকেই আইনের বিধান বলে মেনে নেওয়ার কথা বলেছেন হিন্দু শাস্ত্রকার, যাঁরাও মানুষ ছিলেন না অবশ্যই যাঁরা ছিলেন পুরুষ শ্রেণির প্রতিনিধি, যাদের হাতে ধর্মের আর এক নাম কখনই মনুষ্যত্ব হয়ে ওঠেনি, বরং যাঁদের হাতে মনুষ্যত্ব হয়েছে খণ্ডিত, লাঞ্ছিত, ধর্ষিত। শত সহস্র বছর পরে যখন ধর্মের নামে অধর্মের দিন শেষ হয়ে, মানুষের ধর্ম শুধু 'মনুষ্যত্ব' হওয়ার কথা, আমরা দেখতে পাচ্ছি, পৃথিবী জুড়ে ভোগবাদী তীব্র ক্ষুধা জাগিয়ে তোলার চেষ্টার পাশাপাশি ভাববাদী চিন্তাও মনুষ্যত্বের ধর্ষক ধর্মচিন্তাকে জনপ্রিয় করে তোলার সমস্ত রকম প্রচেষ্টা চলছে শাসক ও শোষক গোষ্ঠীর পৃষ্ঠপোষকতায়।


ইসলামের দৃষ্টিতে নারী 


বৃহত্তর ধর্মগোষ্ঠীর মধ্যে ইসলাম এসেছে সবচেয়ে পরে, অর্থাৎ আধুনিকতম। ইসলাম ধর্ম নারীকে দিয়েছিল কিছু অধিকার যা হিন্দু, খ্রিস্ট বা ইহুদি ধর্ম দেয়নি। তারপর শত শত বসন্ত এসেছে, বিদায় নিয়েছে। ইসলামি পুরুষতন্ত্রের ফাঁস আলগা না হয়ে আরও বেশি করে চেপে বসেছে। নারী আরও বেশি শৃঙ্খলিত হয়েছে। ইসলামি সমাজের বিবর্তনে আমরা দেখতে পাচ্ছি, প্রগতির পরিবর্তে সমাজ তলিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারের আবর্তে।


ইসলাম ধর্মগ্রন্থ কোরআন-এ আছে [সুরা নিসা: ৩৪], "পুরুষ নারীর কর্তা, কারণ আল্লা তাদের এককে অপরের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন ... স্ত্রীদের মধ্যে যাদের অবাধ্যতার আশঙ্কা কর তাদের সদুপদেশ দাও, তারপর তাদের শয্যা বর্জন কর এবং তাদের প্রহার কর।"


কেন প্রহার? স্ত্রী কি পুরুষের ক্রীতদাসী? নারী পুরুষকে সমান চোখে দেখে কোরআন নারীকে একসঙ্গে চারটি পতি গ্রহণের অনুমোদন দিতে পারেনি। অথচ পুরুষদের ক্ষেত্রে কোরআন বলছে [সুরা নিসা: ৩], "বিয়ে করবে নারীদের মধ্যে যাদের ভালো লাগে, দুই, তিন অথবা চার।"


ইসলাম ধর্ম নারীকে দেখেছে পণ্য হিসেবে। ভোগের সামগ্রী হিসেবে। মানুষ হিসেবে নয়। তারই পথ নির্দেশ রয়েছে কোরআন-এ। সেখানে বলা হয়েছে [সুরা বাকারা: ২২৩] "তোমাদের স্ত্রী তোমাদের শস্যক্ষেত্র; তাই তোমরা তোমাদের শস্যক্ষেত্রে যেভাবে খুশি প্রবেশ করতে পার।"


মুসলিম শরীয়াত আইনে নারীকে কিছু আর্থিক ও সম্পত্তির অধিকার দিয়ে কেড়ে নিয়েছে নারীর মানুষ হয়ে ওঠার অধিকার। মুসলমান স্বামী চারটি স্ত্রীর ওপর যখন তখন যৌন অধিকার ফলাতে পারে, যার আর এক নাম অবশ্যই ধর্ষণ। মানবিকতার উপর ধর্ষণ। মুসলমান স্বামীর ধর্মীয় অধিকার রয়েছে কোনও কারণ না দেখিয়ে যে কোনও স্ত্রীকে শুধু তিনবার 'তালাক' নামক শব্দটি উচ্চারণ করে তাড়িয়ে দেওয়ার। মুসলমান স্বামী একসঙ্গে চার স্ত্রীকে নিয়ে ঘর করার অধিকারী। তাই পুরনো এক স্ত্রীকে তালাক দিয়ে নতুন স্ত্রী ঘরে এনে আইনি লাম্পট্য চালাতেই পারে। এমন তালাকের সুযোগে পুরুষ সম্ভোগ করতে পারে বহু নারী। এমন যৌন উচ্ছৃঙ্খলতা ও স্বেচ্ছাচারিতা চালাবার পুরুষ সুলভ অধিকার যে ধর্ম দেয় সে ধর্ম অবশ্যই সুন্দর পৃথিবী গড়ার ধর্ম হতে পারে না।


ধর্মের সূত্র ধরে মরক্কোর সংবিধানে স্ত্রীকে স্বামীর আইনি ক্রীতদাসী করা হয়েছে। ও দেশের সংবিধানে বলা হয়েছে - স্ত্রী বাধ্য বা বিশ্বস্ত থাকবে স্বামীর কাছে, স্বামীর পিতামাতা ও আত্মীয়স্বজনদের সন্মান করবে। স্ত্রী যদি তার মা-বাবাকেও দেখতে চায়, স্বামীর অনুমতি নিতে হবে। [The Sisterhood of Man' by Newland Kathleen: W.W.Norton & Co., New York: 1979, Page-24]


ইসলামে বিয়ে একটি চুক্তি। ইসলামে বিয়েতে পাত্রপাত্রী যে চুক্তিতে আসে, তা পাত্রপাত্রী ঠিক করে না। চুক্তি সম্পাদন করে পাত্রপাত্রীর অভিভাবক। এই চুক্তি একজন মালিকের সঙ্গে একজন গোলামের চুক্তি ভিন্ন যে কিছুই নয়, তা মুসলিম ধর্মীয় অনুশাসনে নারীদের অবস্থান নিয়ে সামান্য যে আলোচনা করেছি তাতেই যথেষ্টর বেশিই বোঝা গেছে। বিয়েতে নারীর সম্মতির কথা বলা হয়েছে বটে, কিন্তু বাস্তবে এই সম্মতি একটি নিয়মরক্ষা বা অভিনয় বই কিছুই নয়। অভিভাবকরা বিয়ে ঠিক করে ফেলার পর আমন্ত্রিতদের সামনে পাত্রীর সম্মতি, একটি আচারের চেয়ে বাড়তি গুরুত্ব পায়নি।


এমন চুক্তি সম্পাদিত হওয়ার পরও মধ্যপ্রাচ্যের ধনীদের মধ্যে ব্যাপকভাবে তালাক দেওয়ার রেওয়াজ চালু রয়েছে। তালাক দিয়ে নিত্য নতুন মনপসন্দ নারীদের চুক্তি করে বিয়ে করেই চলে ধনী লম্পটরা। তারা যে স্ত্রীকে বন্ধুর পরিবর্তে ভোগপণ্য বা রক্ষিতা বই কিছু মনে করে না, এ কঠোর বাস্তব। ইসলামে বিয়ে যেহেতু চুক্তি, তাই তা যে কোনও সময় বাতিল হতে পারে। তবে বাতিল করার একমাত্র অধিকার রয়েছে পুরুষের; নারীর নয়।


আরব অঞ্চলে 'ইদ্দা' নাম একটি ধর্মীয় বিধান রয়েছে। এই বিধান মতো স্বামী তিন মাসের জন্য স্ত্রীকে তালাক দিতে পারে এবং তিন মাস পরে আবার তালাক দেওয়া স্ত্রীকে গ্রহণ করতে পারে। এই মধ্যবর্তী সময়ে স্বামী কোনও নারীকে স্ত্রী করে তার চার স্ত্রীর রাখার ধর্মীয় অধিকার বজায় রাখতে পারে। আরবের অনেক পুরুষ 'ইদ্দা' বিধান মতো চার স্ত্রীকেই মাঝে মাঝে তিন মাসের জন্য বিদায় দিয়ে নতুন চার স্ত্রীকে নিয়ে যৌন উত্তেজনা উপভোগ করে।


মুসলমান পুরুষ যে কোনও ধর্মের নারীকেই বিয়ে করার অধিকারী। কিন্তু মুসলমান নারী বিধর্মীকে বিয়ে করার অধিকারী নয়। সত্যিই কি বিচিত্র সাম্য! যে ধর্ম মানুষকে মানুষের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে, সে ধর্ম কখনই মানুষের ধর্ম হতে পারে না। প্রতিটি অলৌকিক ও অলীক বিশ্বাস নির্ভর ধর্ম নিয়ে সামান্য পড়াশুনো করলেই দেখতে পাবেন এরা কী প্রচণ্ড রকমের মানবিকতার শত্রু। এরা মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করে। সৃষ্টি করে ঘৃণা।


খ্রিস্ট ও ইহুদি ধর্ম একইভাবে নারীকে শয়তানের আসনে বসিয়েছে। আর তাই শোষক শ্রেণির কাছে 'ধর্ম' আজ এক শক্তিশালী অস্ত্র, যার সাহায্যে শোষিতদের ভেঙে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলা যায় পরম নিশ্চিন্তে, অবহেলে, বিনা প্রতিবাদে, বিনা প্রতিরোধে।


মুসলিম দুনিয়ার বহু দেশেই 'নারী-খৎনা' নামের এক বীভৎস, বর্বরোচিত ধর্মীয় প্রথা প্রচলিত রয়েছে। এই প্রথা মানুষ্যসমাজের কলঙ্ক বই কিছু নয়। এই প্রথা পুরুষকে মানুষ থেকে শয়তানে পরিণত করেছে। আর নারীকে পরিণত করেছে পশুতর জীবে।


খৎনা প্রথা আজও প্রচলিত আছে ঘানা, গিনি, সোমালিয়া, কেনিয়া, তাঞ্জানিয়া, নাইজিরিয়া, মিশর, সুদানসহ উপসাগরীয় বিভিন্ন দেশে। এইসব দেশে নারীদের যৌন কামনাকে অবদমিত করে যৌন-আবেগহীন যৌন-যন্ত্র করে রাখতে পুরুষশাসিত সমাজ বালিকাদের ভগাঙ্কুর কেটে ফেলে। নারীর যৌন আবেগ সৃষ্টির ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয় যোনির প্রবেশমুখে পাপড়ির মতো বিকশিত ভগাঙ্কুর। নারীদের খৎনা করা হয় ঋতুস্রাব শুরু হওয়ার আগে অর্থাৎ সাধারণভাবে সাত-আট বছর বয়সে। খৎনা যারা করে তাদের বলা হয় 'হাজামী'। দু'জন নারী শক্ত করে টেনে ধরে বালিকার দুই ঊরু। দুই নারী চেপে ধরে বালিকার দুই হাত। 'হাজামী' ছুরি দিয়ে কেটে ফেলে ভগাঙ্কুর। এই সময় উপস্থিত নারীরা সুর করে গাইতে থাকেন, "আল্লা মহান, মহম্মদ তার নবী; আল্লা আমাদের দূরে রাখুক সমস্ত পাপ থেকে"।


পুরুষশাসিত সমাজ ঐসব অঞ্চলের মস্তিস্ক স্নায়ুকোষের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এই বিশ্বাসের বীজ রোপন করেছে, কাম নারীদের পাপ, পুরুষদের পুণ্য। খৎনার পর সেলাই করে দেওয়া হয় ঋতুস্রাবের জন্য সামান্য ফাঁক রেখে যোনিমুখ। খোলা থাকে মূত্রমুখ। খৎনার পর চল্লিশ দিন পর্যন্ত বালিকার দুই ঊরুকে একত্রিত করে বেঁধে রাখা হয়, যাতে যোনিমুখ ভালমতো জুড়ে যেতে পারে। বিয়ের পর সেলাই কেটে যোনিমুখ ফাঁক করা হয়, স্বামীর কামকে তৃপ্ত করার জন্য। আবারও বলি, স্বামীর কামকে তৃপ্ত করার জন্যই; কারণ নারীর কম তো ওরা পাপ বলে চিহ্নিত করে নারীকে করতে চেয়েছে কাম-গন্ধহীন যৌন-যন্ত্র। সন্তান পেলে বা বিধবা হলে আবার নতুন করে সেলাই পড়ে ঋতুস্রাবের সামান্য ফাঁক রেখে। আবার বিয়ে, আবার কেটে ফাঁক করা হয় যোনি। জন্তুর চেয়েও অবহেলা ও লাঞ্ছনা মানুষকে যে বিধান দেয়, সে বিধান কখনই মানুষের বিধান হতে পারে না। এ তো শুধু নারীর অপমান নয়, এ মনুষ্যত্বের অবমাননা।


ইসলামের বেহেশত শুঁড়িখানা আর বেশ্যাপল্লী বই কিছুই নয়। এখানে যৌন-সুখ ও ইন্দ্রিয়সুখ ভোগ করার অধিকারী পুরুষ। বেহেশতের হুরেরা সৌন্দর্যে সূর্য, চন্দ্রকেও মলিন করে। পুরুষদের জন্যে বেহেশতের সুখ বিষয়ে কোরআন বলছে, "ওদের সঙ্গিনী দেব আয়তনয়না হুর।" [সুরা দুখান: ৫৪]


"সাবধানীদের জন্যে রয়েছে সাফল্য: উদ্যান, দ্রাক্ষা, সমবয়স্কা উদ্ভিন্নযৌবনা তরুণী এবং পূর্ণ পানপাত্র।" [সূরা নাবা: ৩১:৩৪] এই আয়তনয়না অসামান্য সুন্দরী হুরদের সঙ্গে বেহেশতে আসা পৃথিবীর পুরুষদের মিলন ঘটাবার লোভ দেখানো হয়েছে [সূরা তূর: ২০] কোরআনে। এইসব স্বর্গসুন্দরীরা যে হবে অনাঘ্রাত ফুল এবং বেহেশতে আসা পুরুষরাই তাদের জীবনের প্রথম পুরুষ, সে নিশ্চিন্ততার প্রতিশ্রুতিও রয়েছে কোরআনে [সূরা রহমান: ৫৬]।


কল্পিত স্বর্গ বেহেশতে নারীদের কোনও স্থান হয়নি। বরং মুসলিম নীতি নির্দেশক গ্রন্থ হাদিসে বলা হয়েছে, 'নারী শয়তানের রূপে আসে আর শয়তানের রূপে যায়।"

*************************************

'ঈশ্বরের ইচ্ছেতেই সব কিছু হচ্ছে' ধরে নিলে একদিকে সমস্ত রকম প্রচেষ্টাই যেমন নিরর্থক হয়ে যায়, তেমনই কোনও ভাল কাজ বা খারাপ কাজের দায়-দায়িত্বও মানুষের উপর বর্তায় না। এর অবস্থায় পাপ-পুণ্য, স্বর্গ-নরক, সবই অর্থহীন হয়ে যায়। ঈশ্বর তাঁরই খেয়াল খুশি মতো মানুষকে দিয়ে ভাল-খারাপ কাজ করিয়ে নেবেন এবং মৃত্যুর পর মানুষ ঈশ্বরের খেয়াল-খুশির ফল ভোগ করবে, এটা কোনও মতেই ন্যায় বিচার হতে পারে না। বরং এ বিচারের নামে প্রহসন।

*************************************

বৌদ্ধ ও জৈন ধর্ম যদিও 'নিরীশ্বরবাদী' অর্থাৎ ঈশ্বর বা পরমাত্মায় বিশ্বাসী নয়, তবু এই দুই ধর্মকে 'নাস্তিক' বলে চিহ্নিত করলে ভুল করা হবে। কারণ, এই দুই ধর্মই আত্মায় বিশ্বাসী এবং হিন্দু ধর্মের প্রভাবে, জন্মান্তরে বিশ্বাসও প্রবল। বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মে বিশ্বাসীরাও তাঁদের ধর্মের বিধানকে তাঁদের ধর্মীয় সম্প্রদায়ের আচার বা দেশাচার বলে মান্য করে।

*************************************

নাস্তিকতাবাদে যুক্তিহীন আধ্যাত্মবাদী চিন্তাকে বাতিল করার ঝাঁঝ যতখানি উপস্থিত, ততখানিই অনুপস্থিত ভবিষ্যৎমুখী মানবতাবাদী সমাজ সচেতনতা বোধ।

*************************************

এদেশের প্রাচীন ধর্মসূত্রগুলো যেমন পরিপূর্ণভাবে রাজতন্ত্রের সমর্থক ছিল, চার্বাকবাদীরাও ছিল তেমনই সেই সময়কার রাজতন্ত্রকেন্দ্রিক শোষণ কাঠামোর সমর্থক।

*************************************

এক -- দেশপ্রেম মানে দেশের মাটির প্রতি প্রেম নয়, দেশের সংখ্যাগুরু মানুষের প্রতি প্রেম। দুই -- সমাজসেবার মাধ্যমে শোষণমুক্তি ঘটেছে, এমন দৃষ্টান্ত আজ পর্যন্ত কোনও ঐতিহাসিকের জ্ঞানভাণ্ডারে নেই। হাজারটা রামকৃষ্ণ মিশন, হাজারটা ভারত সেবাশ্রম সংঘ, হাজার মাদার টেরিজার সাধ্য নেই ভারতের শোষিত-জনতার শোষণমুক্ত ঘটানোর। তিন -- ঈশ্বর, ভূত, কর্মফল, অদৃষ্টবাদ ও অলৌকিকত্বের বাস্তব কোনও অস্তিত্ব নেই। শোষক ও শাসকশ্রেণি শোষণকে কায়েম রাখতেই শোষিতদের মধ্যে এই ভ্রান্ত চিন্তাগুলোর প্রসারকামী। চার -- দাম্পত্যজীবন গড়ে তোলার প্রথম শর্ত হওয়া উচিত বন্ধুত্ব, যৌন স্বত্বাধিকার নয়...

*************************************

দেকার্তে ঈশ্বরের ও আত্মার অস্তিত্বে বিশ্বাসী ছিলেন। গ্যালিলিও ঈশ্বরের সঙ্গে জ্যোতিষশাস্ত্রেও পরম বিশ্বাসী ছিলেন। স্পিনোজার দর্শনও ছিল ঈশ্বর অস্তিত্বকে সঙ্গী করেই। লিবনিজ তাঁর দর্শনে  জানিয়েছিলেন ঈশ্বর ও আত্মা বিষয়ক ধর্মীয় মতবাদকে। কান্ট ঈশ্বর ও আত্মার সঙ্গে অতীন্দ্রিয় ব্যাপার-স্যাপারে বিশ্বাসী ছিলেন। হেগেলীয় দর্শনের বুনিয়াদও ছিল ভাববাদী বা অলীক কল্পনাবাদী। ভলতেয়ারও স্পষ্টতই ঈশ্বর বিশ্বাসী ছিলেন। এইসব বিশিষ্ট দার্শনিক ও ব্যক্তিত্বরা তাঁদের সময়ে অন্য অনেকের থেকেই চিন্তার ক্ষেত্রে এগিয়ে ছিলেন; ধর্মগ্রন্থের ও ধর্মগুরুদের কিছু কিছু যুক্তি-বিরোধী বক্তব্যের বিরোধিতা করেছিলেন, এক কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেও আমরা বলতে পারি - কিন্তু তাই বলে ওঁদের ভাববাদী প্রবল চিন্তার দিকটাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে 'যুক্তিবাদী' বলে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টাকে কোনওভাবেই সমর্থন করা যায় না। 

*************************************

যে'সব সংগঠন ধর্মের ও ঈশ্বরের অস্তিত্বকে সুরক্ষিত রেখে বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদের জয়গান গাইছে, তাদেরকে 'যুক্তিবাদী' আন্দোলনের শরিক সংগঠন হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। অথচ নিশ্ছিদ্র নিরীশ্বরবাদিতা-বস্তুবাদিতা ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির প্রতি একনিষ্ঠতা, আধুনিক যুক্তিবাদের লক্ষণ। 

************************************* 

তারিখটা ২৬ জুন। সাল ১৯৮৬।  কলকাতার রাজাবাজারে অবস্থিত 'সায়েন্স কলেজ'-এ দীর্ঘ আলোচনার পর ভারতের বিশিষ্ট ১৮ জন বিজ্ঞানী একটি প্রস্তাব গ্রহণ করেছিলেন। প্রস্তাবটি একটি অংশ এখানে তুলে দিচ্ছি :


" আমাদের শরীরে রক্ত আছে। প্রয়োজনে বাহির হইতে সংগ্রহ করিয়া রক্ত দেওয়া হয়। কিন্তু কোনও ব্যক্তি যদি হঠাৎ দাবি করিয়া বসেন - পশু বা মানুষের রক্ত গায়ে মাখিয়াই শরীরের রক্ত-স্বল্পতা দূর করা সম্ভব, তাহা হইলে তাহার মানসিক সুস্থতা সম্পর্কে সন্দেহ জাগে। কেহ যদি প্রশ্ন করিয়া বসেন - রক্ত-স্বল্পতার ক্ষেত্রে চিকিৎসাশাস্ত্রে আয়রন ট্যাবলেট-ক্যাপসুল ইত্যাদির প্রয়োগবিধি আছে, অতএব লৌহ-আংটি ধারণে ওই একই কার্য সমাধা হইবে না কেন? - তবে প্রশ্নকর্তার কাণ্ডজ্ঞান বিষয়ে সন্দিহান হই। এইরূপ প্রশ্নকর্তা তাঁহার নিজের রক্ত-স্বল্পতা দেখা দিলে ভারি লৌহখণ্ড শরীরের সর্বত্র বাঁধিয়া রাখিয়া পরীক্ষা করিলেই তাঁহার প্রশ্ন ও বক্তব্যের অসারতা বুঝিতে পারিবেন।" 

************************************* 



Thursday, 20 January 2022

দর্শন ধর্ম নৈতিকতা - অরুণ চৌধুরী

পরিবর্তনশীলতার প্রক্রিয়া সম্পর্কে এই যে সমস্ত সুনির্দিষ্ট আবিষ্কার তার সবখানি কৃতিত্বই কি কার্ল মার্কস ও ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস-এর প্রাপ্য? না, তা নয়। মার্কস ও এঙ্গেলস-এর পূর্বেই এই দ্বন্দ্বমূলক প্রক্রিয়ার কথা দর্শন জগতে যিনি প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন তিনি হচ্ছেন ভাববাদী জার্মান দার্শনিক হেগেল। কিন্তু হেগেলীয় চিন্তাধারা ছিল ত্রুটিপূর্ণ এবং তা দাঁড়িয়েছিল এক ভাববাদী ধ্যানধারণার ভিত্তির উপরে। মার্কস ও এঙ্গেলস এই ভাববাদী ধ্যানধারণার ভিত্তিকে নস্যাৎ করে দিয়ে দ্বন্দ্বমূলক প্রক্রিয়াকে এক বিজ্ঞানসম্মত বস্তুবাদের ভিত্তির উপরে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। আর তা করতে গিয়ে মার্কস ও এঙ্গেলসকে বস্তুবাদী দার্শনিক ফয়েরবাখ প্রবর্তিত এক যান্ত্রিক ধারণার কবল থেকেও বস্তুবাদকে মুক্ত করে নিয়ে আসতে হয়। এই জন্যই মার্কসীয় দর্শনকে শুধুমাত্র বস্তুবাদ না বলে দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

বস্তুর স্বতন্ত্র সত্তা

ভাববাদের প্রত্যক্ষ বিপরীতটা-ই হচ্ছে বস্তুবাদ।

বস্তুর একটা চৈতন্য নিরপেক্ষ স্বতন্ত্র সত্তা আছে। এই যে সব ধারণা , - 'ব্রহ্ম সত্য', 'জগৎ মিথ্যা' বা 'জগৎ পরমাত্মার প্রকটিত রূপ মাত্র' অথবা 'পার্থিব যা কিছু তা কেবলমাত্র চৈতন্য কর্তৃকই অনুভূত উপলব্ধির সমষ্টি মাত্র', - মার্কসীয় বস্তুবাদ এগুলিকে ভাববাদী ধ্যানধারণা বলে অভিহিত করে ও তাকে বর্জন করে।

এই যে বিশ্বপ্রকৃতি তা ইন্দ্রিয়াতীত কোনও পরমাত্মার প্রকটিত রূপ নয়, নয় কোন মায়া। অপর পক্ষে তা রীতিমত ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ও স্বভাবতই তার মর্ম একেবারেই বস্তুগত। জগৎ সংসারের যা কিছু তা কোনও পরম চৈতন্যের লীলা খেলা নয়। বরঞ্চ তা বস্তুর গতিশীলতার-ই বিচিত্র অভিব্যক্তি মাত্র।

বস্তু মুখ্য, চেতনা গৌণ

বস্তুর সত্তা স্বতন্ত্র এবং তা চৈতন্য নিরপেক্ষ। কিন্তু বস্তুর সাথে চেতনার কোনও সম্পর্ক আছে কি? হ্যাঁ, আছে। বস্তু এবং চেতনার পারস্পরিক সম্পর্ক প্রসঙ্গে কার কি ধারণা সেই কষ্টি পাথর দিয়েই মার্কসীয় বস্তুবাদ বিচার করে থাকে, - কোন ধারণাটা বস্তুবাদী আর কোনটা ভাববাদী। যাঁরা মনে করে থাকেন, চেতনা নিরপেক্ষ বস্তুর স্বাধীন সত্তা আছে, চেতনা বস্তুরই প্রতিফলন মাত্র এবং বস্তু মুখ্য চেতনা গৌণ, তাঁরাই হলেন বস্তুবাদী। অপর পক্ষে যাঁরা মনে করেন চেতনা নিরপেক্ষ কোনও স্বাধীন সত্তা বস্তুর নাই, বস্তু চেতনার-ই নিছক একটা অনুভূতি মাত্র এবং চেতনা মুখ্য বস্তুই গৌণ, তাঁরা সকলেই হলেন কোন না কোন ধরণের ভাববাদী।

মনে করা যাক, চোখের সম্মুখে বাগানে একটা গোলাপ ফুল এবং তার রংটা লাল। ভাববাদীরা বলবেন, ওটাকে গোলাপ ফুল বলে মনে করা হচ্ছে ও তার রংটাকে লাল বলে অনুভূত হচ্ছে বলেই ওটা একটা লাল গোলাপ বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। তাঁদের মতে ঐ লাল গোলাপের চেতনা নিরপেক্ষ কোন স্বতন্ত্র সত্তা নাই। বস্তুবাদীরা বলবেন, ওটা অন্য ফুল না হয়ে গোলাপ বলেই গোলাপ ফুল মনে হচ্ছে এবং সেটা লাল বলেই সকলের অনুভূতিতে তার রক্তিমা সাড়া জাগিয়েছে। চেতনা নিরপেক্ষ ঐ লাল গোলাপটির একটা স্বতন্ত্র অস্তিত্ব না থাকলে রাম, শ্যাম ও যদু - এই তিনটি সুস্থ মানুষই তাকে লাল গোলাপ বলে দেখতো না। কেউ তাকে নীল অপরাজিতা বা সাদা রজনীগন্ধা বলেও দেখতো। প্রকৃতপক্ষে বস্তুর প্রতিফলনেই অনুভূতির সঞ্চার।

মার্কসীয় বস্তুবাদের মতে, যে বস্তু চিন্তা করে তা থেকে চেতনাকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না। কারণ বস্তুর স্বাধীন সত্তার প্রতিফলনে যেখানে চেতনার সঞ্চার ঘটে বা চিন্তার উদয় হয় সে মস্তিস্ক নিজেই মানব দেহের বস্তু বিশিষ্ট অতীব সুসংগঠিত একটা অংশ।

বস্তু সত্তা অজ্ঞেয় নয় 

বস্তুর গতিশীলতার বিচিত্র অভিব্যক্তিতে সমৃদ্ধ এই যে বিশ্বপ্রকৃতি তা ইন্দ্রিয়গোচর এবং অবশ্যই স্বীকার্য যে, ইন্দ্রিয়ানুভূতির মাধ্যমেই তার প্রতিফলন মানব চেতনায় সঞ্চারিত হয়। কিন্তু, এই মানব ইন্দ্রিয়গুলি তো বস্তু সত্তাবিশিষ্ট এবং অবশ্যই বিশ্বাসযোগ্য। সুতরাং বস্তুজগৎ 'স্বয়ং সিদ্ধ সত্তায়' রহস্যাবৃত হয়ে মানুষের কাছে চির অজ্ঞেয় হয়ে থাকতে পারে না। কোনও একটা নির্দিষ্ট সময়ে বস্তুজগতের এই সত্তা বিষয়ে মানুষের জ্ঞান হয়তো অসম্পূর্ণ বা সীমিত থাকতে পারে। কিন্তু ক্রমবর্ধিষ্ণু এই জ্ঞান ভাণ্ডারে আজ যা নাই, তা কালকের সংগ্রহের অপেক্ষায় আছে মাত্র। অতীতে এমন অনেক কিছু ছিল যার বস্তুসত্তা সেই সময়ে মানুষের কাছে দুর্জ্ঞেয় ছিল। কিন্তু কালক্রমে রসায়ন বিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে সাথে মানুষ তার গঠন প্রকৃতি শুধুমাত্র আবিষ্কার করেই ক্ষান্ত হয়নি, নিজ হাতে তাকে তৈরী করে তবে তৃপ্ত হয়েছে। সুতরাং বিশ্বপ্রকৃতির সত্তা অজ্ঞেয় বলে যে প্রচারিত ধারণা তাও এক রকমের ভাববাদ ছাড়া আর কিছু নয়।

  


  

Thursday, 9 December 2021

নবরত্ন - এস.কে.ব্রহ্ম

গান্ধীজি বোম্বাইতে একটি সভায় বক্তৃতা দেওয়ার জন্য আসবার খবর তিনি জানতে পারলেন। তিনি বেশ কিছু পূর্বেই সভাস্থলে উপস্থিত হলেন। সভাস্থলের সামনে কয়েক হাজার শ্রোতা অপেক্ষা করছিল। গান্ধীজি মঞ্চে উঠামাত্রই রণদিভে মঞ্চে চিৎকার করে গান্ধীজিকে বললেন, "আপনি আমাদের সাথে বেইমানী করেছেন কারণ আপনি ভগৎ সিংহের ফাঁসিকে সমর্থন করেছেন আর মীরাট ষড়যন্ত্র মামলায় নেতৃবৃন্দকে গ্রেপ্তার করে অন্তরীন রাখাটাও সমর্থন করেছেন।" এই কথা বলে রণদিভে মঞ্চ থেকে নেমে গেলেন। গান্ধীজি কোন কথা বললেন না। সভাস্থলে একটা নিস্তব্ধতার মধ্যে হাজার হাজার শ্রোতা এটা লক্ষ করলেন।  

*************************************

ইতিমধ্যে অনেকটা আপোষের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন হল। দেশ ভাগও হল। নেহেরু সরকার শ্রমিক-কৃষক-মেহনতী মানুষের ন্যায্য দাবীতে লড়াই সংগ্রামের উপর আক্রমণ নামিয়ে আনল। পার্টি লড়াই সংগ্রামকে জারী রাখার সিদ্ধান্ত নিল। কিন্তু পার্টির সাধারণ সম্পাদক যোশীর বক্তব্য  সময় জঙ্গী আন্দোলন করলে সরকারী আক্রমণ আরও তীব্র হবে। অতএব এটা না করে নেহেরু সরকারকে কাজ করতে দেওয়া উচিৎ। সাম্রাজ্যবাদী শক্তি নেহেরু এবং তাঁর অনুগামীদের অপসারিত করে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও দাঙ্গার মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদের অনুগামী সরকার গঠন করতে তৎপর। অতএব এমতাবস্থায় আমাদের করণীয় হচ্ছে সংযুক্ত গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট গঠন করা যেটা শুধু বামপন্থীদের দ্বারা গঠিত না করে গান্ধী থেকে নেহেরু, সমস্ত সোস্যালিস্ট শক্তি, কমিউনিস্ট পার্টি ও অন্যান্য বামপন্থীদের নিয়ে গঠন করা এবং কাজ করা। যোশীর বক্তব্য নিয়ে পার্টির মধ্যে আলোড়ন শুরু হল। কেন্দ্রীয় কমিটি অবশ্য যোশীর বক্তব্য খারিজ করে দিল। এদিকে রণদিভে এবং ভবানী সেন ভারতের স্বাধীনতার প্রশ্নে ভুল ব্যাখ্যা করে বললেন ভারতের স্বাধীনতা একটা প্রহসন। তাঁরা বললেন যে ভারতের জাতীয় বুর্জোয়ারা সাম্রাজ্যবাদী-জমিদার ও বুর্জোয়া ঐক্যের ছোট শরিক। এঁদের এই ব্যাখ্যা পার্টির মধ্যে আর এক সংকট সৃষ্টি করল।

*************************************    

তিনি ট্রেড ইউনিয়ন কর্মীদের পরামর্শ দিতেন যে ট্রেড ইউনিয়নের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতা, জাত-পাতের কোন প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। সকলকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। তিনি আরও বলতেন যে ট্রেড ইউনিয়নে অথনৈতিক দাবী অবশ্যই স্থান পাবে কিন্তু সেটা যেন একমাত্র দাবী না হয়। ট্রেড ইউনিয়ন কর্মীদের সমাজের সকলের স্বার্থে কর্মকান্ড চালাতে হবে। কৃষকদের স্বার্থে কাজ করতে হবে।  

*************************************    

দেশ স্বাধীন হওয়ার একদিন পূর্বে ১৪ই আগষ্ট, ১৯৪৭ এ নাম্বুদ্রিপাদ সহ অনেক কমিউনিস্টকে জেল থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। মুক্তিপ্রাপ্তদের তালিকায় গোপালনের নাম থাকা সত্ত্বেও তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয় না। গোপালন একটি জাতীয় পতাকা নিয়ে আরও কয়েকজনের সাথে কারাগারের মধ্যে ১৫ই আগষ্ট প্রাতঃকালে পতাকা উত্তোলন করেন। 

*************************************

১৯২৯ সালে পুলিশ 'মেছুয়া বাজার মামলায়" নিরঞ্জন সেন, সতীশ পাকড়াশী, পান্নালাল দাসগুপ্ত, সুধাংশু দাসগুপ্ত এবং আরও অনেককে গ্রেফতার করে। প্রমোদ দাসগুপ্ত গ্রেফতার হননি। এইসব বিপ্লবীদের আর্থিক অবস্থা খুবই সঙ্গীন ছিল। মামলার ব্যয় বহন করা কষ্টসাধ্য হচ্ছিল। বাইরে থেকে প্রমোদ দাসগুপ্ত এ ব্যাপারে যথাসাধ্য করার চেষ্টা করছিলেন। তিনি আর্থিক সাহায্যের জন্য তৎকালীন খ্যাতনামা কংগ্রেস নেতা সুভাষ চন্দ্র বসুর সঙ্গে যোগাযোগ করেন কিন্তু বসু আর্থিক সাহায্যের ব্যাপারে সরাসরি আপত্তি জানান কারণ তিনি সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের বিপক্ষে ছিলেন। 

*************************************

১৯২৭ সালে ভারতে সাইমন কমিশনের প্রতিনিধিরা আগমন করেন। কংগ্রেস সাইমন কমিশনের বিরোধিতা করে। সর্বত্র বিক্ষোভ শুরু হয়। কমিশন বেনারস পৌঁছালে রামমূর্ত্তি অন্যান্য ছাত্রদের সাথে নিয়ে এই কমিশনের বিরোধিতা করে আওয়াজ উঠান "সাইমন কমিশন গো ব্যাক"। রামমূর্ত্তি ভগত সিংয়ের প্রতিষ্ঠিত 'নওজোয়ান ভারত সভাতে' যোগদান করেন এবং তিনি এই সংগঠনে সক্রিয়তার সাথে কর্মকান্ড চালাতে থাকেন। তিনি 'জাতপাত তোড়ো মন্ডলের' সদস্য হন।

*************************************

১৯২০ সালের শেষে লাহোরে কংগ্রেস পার্টির সম্মেলনে রামমূর্ত্তি একজন দর্শক হিসেবে যোগদান করেন। এই সম্মেলনে সিদ্ধান্ত হয় যে প্রতিবছর ২৬শে জানুয়ারী ভারতের স্বাধীনতা দিবস হিসেবে পালন করা হবে। এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রামমূর্ত্তি ও অন্যান্য ছাত্ররা বেনারস বিশ্ববিদ্যালয়ে এই কর্মসূচী নির্দিষ্ট দিনে পালন করেন।        

*************************************

রামমূর্ত্তি শেষ ট্রেড ইউনিয়ন সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন ১৯৮৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কোয়েম্বাটুরে। ১৯৮৭ সালের ১৯শে সেপ্টেম্বর গুরুতর অসুস্থ হয়ে সরকারী জেনারেল হাসপাতালে ভর্ত্তি হন এবং আইসিইউতে রাখা হয়। ৪০ দিন ব্যাপী চিকিৎসার পর একটু সুস্থ হয়ে গৃহে প্রত্যাবর্ত্তন করেন। আবার একই হাসপাতালে ২৪শে নভেম্বর ভর্ত্তি হন। রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী তাঁকে নিয়মিত দেখতে যেতেন। রাষ্ট্রপতি বেঙ্কটরমন তাঁর সুস্থতা কামনা করে পুষ্পস্তবক প্রেরণ করেন। এই সময় কেন্দ্রীয় সরকার হঠাৎ দেশের মহান স্বাধীনতা যোদ্ধা হিসেবে ৯০ জনের নামের তালিকা প্রকাশ করে। যার মধ্যে নাম ছিল নাম্বুদ্রিপাদ, হরকিষেণ সিং সুরজিৎ, রামমূর্ত্তি, বি টি রণদিভে, সমর মুখার্জী, রাষ্ট্রপতি ভেঙ্কটরমন ও প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি জৈল সিং। সরকারী অফিসাররা যখন স্বাধীনতা সংগ্রামী পেনশনের কথা হাসপাতালে রামমূর্ত্তিকে জানাতে যান, অফিসারদের পরিষ্কার জানিয়ে দেওয়া হয় যে পার্টি ইতিমধ্যেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে পার্টির কেউ স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে সরকার থেকে কোন পেনশন গ্রহণ করবে না। অফিসাররা বিফল মনোরথ হয়ে ফিরে যান।

*************************************

সুরজিৎ বিপ্লবী ভগৎ সিং প্রতিষ্ঠিত 'নওজোয়ান ভারত সভা'র সদস্য হন।

*************************************

পূর্ব ইউরোপ এবং সোভিয়েত রাশিয়ার সমাজতন্ত্রের বিপর্যয়ের পর কিউবাতে খাদ্য সংকট দেখা দিল। সুরজিৎ পার্টির মধ্যে একটি প্রস্তাব দিলেন যে সিপিআই(এম) কিউবাতে ভাতৃপ্রতিম সাহায্য হিসাবে গম প্রেরণ করবে। পার্টির মধ্যে অনেকেই সন্দিহান ছিলেন যে এত গম কি করে সংগ্রহ করা যাবে। পার্টি ১০ হাজার টন গম সংগ্রহ করল যাতে সুরজিতের অবদান বিশাল। মোট ৫ কোটি টাকা মূল্যের খাদ্যসামগ্রী নিয়ে জাহাজে করে সুরজিৎ কিউবাতে গেলেন এবং ফিদেল কাস্ত্রো নিজে জাহাজঘাটে উপস্থিত হয়ে সুরজিতের কাছ থেকে খাদ্যসামগ্রী গ্রহণ করলেন।

*************************************

শোকজ্ঞাপন পুস্তকে দেশের রাষ্ট্রপতি কে.আর.নারায়ণন লেখেন - "ই এম এস বিংশ শতাব্দীর এক বিশাল ব্যক্তিত্ব এবং একজন সংগ্রামী জাতীয়তাবাদী যিনি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে বিপ্লবী ধারাকে যুক্ত করেন। তিনি একজন সমৃদ্ধ চিন্তাবিদ যিনি সঠিক রণনীতি এবং কৌশল প্রয়োগ করে ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনকে অগ্রগতির পথে নিয়ে গেছেন। তাঁর নাম ভারতীয় জনগণ চিরকাল স্মরণে রাখবে।"

*************************************

১৯৪৩ সালে বাংলায় এক ভয়ংকর দুর্ভিক্ষ হয়। প্রায় ৪৫ লক্ষ মানুষের এতে মৃত্যু হয়। কমিউনিস্ট পার্টির উদ্যোগে বিভিন্ন অঞ্চলে কয়েকশত খিচুড়ী রান্নাঘর চালু করা হয় এবং সাধ্যমত মানুষকে এই খাদ্য সরবরাহ করা হয়। এছাড়াও Bengal Medical Relief Co-ordination Committee গঠিত হয় যার সভাপতি হন ডাঃ বিধান রায় এবং সম্পাদক হন জ্যোতি বসু।

শহীদ-ই-আজম ভগৎ সিং

 ফাঁসি নয়, গুলি করে আমাদের হত্যা করুন 

(লাহোর ষড়যন্ত্র মামলা ডিফেন্স কমিটি'র আইনবিদদের সিদ্ধান্ত ছিল ফাঁসি থেকে ভগৎ সিং এবং তাঁর দুই সহকর্মীকে বাঁচাতে ব্যাপক চেষ্টা চালাবার জন্য ফাঁসির দিনটি পিছিয়ে দেওয়া। এর একটাই পথ খোলা ছিল, গভর্ণরের কাছে দয়া ভিক্ষা করা। কিন্তু সবাই জানত ভগৎ সিংকে দিয়ে কিছুতেই তা করানো যাবে না। ১৯৩১ সালের ১৯শে মার্চ অ্যাডভোকেট প্রাণনাথ মেহেতা জেলে ওঁদের সঙ্গে দেখা করতে যান। ভগৎ সিং তাঁর কথা শুনতেন। তিনি বারবার মার্সি পিটিশন দেবার কথা বলেন এবং পিটিশনের ভাষা অপমানজনক হবে না বলে আশ্বাস দেন। অবশেষে ভগৎ সিং বলেন, "ঠিক আছে, লিখে আনুন"। পরদিন পিটিশনের খসড়া নিয়ে শ্রী মেহেতা জেলে দেখা করলে ভগৎ সিং বলেন 'মার্সি পিটিশন' তিনি নিজেই পাঠিয়ে দিয়েছেন। এটি ভগৎ সিং-এর সেই ঐতিহাসিক পত্র।)

প্রিয় মহাশয়,

সবিনয় নিবেদন এই যে, লাহোর ষড়যন্ত্র মামলার শুনানির জন্য ভারতে বৃটিশ সরকারের সর্বোচ্চ আধিকারিক ভাইসরয় একটি বিশেষ অর্ডিনান্স বলে এক ট্রাইবুন্যাল গঠন করেছিলেন। এই ট্রাইবুন্যাল ১৯৩০ সালের অক্টোবর মাসে আমাকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করেছে। আমার বিরুদ্ধে আনীত সবচেয়ে বড় অভিযোগ হল আমি সম্রাট পঞ্চম জর্জের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত। ট্রাইবুন্যালের এই সিদ্ধান্ত থেকে দুটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রথমতঃ ইংরেজ জাতি এবং ভারতীয় জনতার মধ্যে যুদ্ধ চলছে এবং দ্বিতীয়তঃ আমি নিশ্চিতভাবে এই যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছি, সুতরাং আমি একজন রাজদ্রোহী যুদ্ধবন্দী। যদিও এই অভিযোগের ব্যাখ্যাকে অতিশয়োক্তির সীমায় টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তবুও আমি একথা না বলে পারি না যে, এর দ্বারা আমায় সম্মানিত করা হয়েছে।

প্রথম বিষয়টির ওপর আমি কিছুটা বিস্তারিতভাবে আলোকপাত করতে চাই। আমার ধারণা প্রত্যক্ষভাবে কোন লড়াই এখনো শুরু হয়নি। যুদ্ধ শুরু হবার ব্যাপারে ট্রাইবুন্যালের মতামত কি, তা আমার জানা নেই। তবু আমি বিষয়টি স্বীকার করে নিচ্ছি এবং সেই সঙ্গে বিষয়টির সম্পর্কে একটি সঠিক ধারণা আমি দিতে চাই।

আমি এই কথা বলতে চাই যে, যুদ্ধ শুরু হয়েছে এবং যতদিন ভারতীয় জনগণ এবং শ্রমিকদের জীবন-জীবিকার উপায়গুলির ওপর ক্ষমতাশালী ব্যক্তির একাধিপত্য কায়েম থাকবে ততদিন পর্যন্ত এ যুদ্ধ চলবে, তা সেই ক্ষমতাশালী ব্যক্তি ইংরেজ পুঁজিপতি, ইংরেজ শাসকই হন অথবা পুরোপুরি ভারতীয়ই হোন। যদি বিশুদ্ধ ভারতীয় পুঁজিপতিদের দ্বারাই কেবল গরীবের রক্ত শোষণ চলতে থাকে, তবুও পরিস্থিতির খুব বেশি পরিবর্তন হবে না। যদি আপনার সরকার কিছু নেতা এবং সমাজের কিছু প্রধান ব্যক্তির ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে, যদি কিছু সুবিধা পাইয়ে দেয় অথবা উভয়পক্ষে একটা সমঝোতা হয়ে যায়, তাতেও পরিস্থিতির কোন পরিবর্তন হতে পারে না। জনগণের ওপর এসব কথার প্রভাব খুবই কম।

দেশের যুবকদের আরেকবার ঠকানো হল, একথা ভেবে আমি দুশ্চিন্তায় আচ্ছন্ন নই। আমাদের রাজনৈতিক নেতারা পথভ্রষ্ট হয়েছেন এবং ইংরেজের সঙ্গে আপোষ আলোচনার সময় সেইসব গৃহহারা, নিরাশ্রয়, নিবেদিত প্রাণ সংগ্রামীদের কথা ভুলে গিয়েছেন যাদের দুর্ভাগ্যক্রমে বিপ্লবী পার্টির সদস্য বলে তাঁরা মনে করেন। একথা ভেবেও আমি ভয় পাই না। আমাদের রাজনৈতিক নেতারা বিপ্লবীদের শত্রু মনে করেন, কারণ তাঁদের বিচারে এরা হিংসায় বিশ্বাসী। আমাদের বীরাঙ্গনারা নিজেদের সব কিছুই বিসর্জন দিয়েছেন। তাঁরা নিজেদের স্বামীদের আত্মদানের বেদীমূলে প্রেরণ করেছেন। তাঁরা নিজেরাই নিজেদের নিঃশেষে বিলিয়ে দিয়েছেন, কিন্তু আপনার সরকার তাঁদের বিদ্রোহী মনে করে। আপনাদের দালালরা মিথ্যা কাহিনী তৈরী করে ওঁদের বদনাম দেয় এবং পার্টির সুনামের হানি ঘটাবার চেষ্টা করে। কিন্তু তবুও যুদ্ধ চলছে।

বিভিন্ন সময় এই যুদ্ধ ভিন্ন ভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করবে। কখনো প্রকাশ্য লড়াই চলবে, কখনো সংগ্রাম চলবে গোপনে। কখনো তা বিক্ষোভের স্তরে থাকবে আবার কখনো মরণপণ সংগ্রাম শুরু হবে। রক্তাক্ত সংগ্রাম হবে, না তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণ পথে লড়াই হবে, তা নির্ভর করছে আপনি কোন পথে চলবেন তার ওপর। কাজের পথ আপনিই বেছে নিন। কিন্তু সংগ্রাম চলবেই, তুচ্ছ বিষয়গুলি অবহেলা করে, অর্থহীন নীতিবাগীশ আদর্শবাদকে উপেক্ষা করে নিরবিচ্ছিন্ন লড়াই চলবে। নবীন উদ্যম, অপরিসীম দৃঢ়তা, অপ্রতিরোধ্য সংকল্প নিয়ে সংগ্রাম চলবে যতদিন না সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়, যতদিন না বর্তমান সমাজব্যবস্থাকে উৎখাত করে সমাজের অবাধ সমৃদ্ধির ভিত্তিতে নতুন সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করা যায় এবং এই পথে সমস্ত ধরণের শোষণের অবসান ঘটানো যায়। এই পথেই মানব সভ্যতা এগিয়ে যাবে স্থায়ী শান্তির এক নতুন যুগে। অচিরেই শুরু হবে আখেরি লড়াই এবং চূড়ান্ত ফয়সালা হয়ে যাবে।

পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী শোষণের দিন ফুরিয়ে আসছে। এ সংগ্রাম আমরা শুরু করিনি, আমাদের জীবনাবসানের সঙ্গে সঙ্গে এ সংগ্রাম শেষ হয়ে যাবে না। ইতিহাসের অমোঘ নিয়মে,বর্তমান বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এই সংগ্রাম অনিবার্যভাবে গড়ে উঠেছে। আমাদের মৃত্যুতে আত্মদানের পুষ্পমাল্যে আর একটি নতুন ফুল গাঁথা হবে। যতীন দাসের অতুলনীয় আত্মদান, ভগবতীচরণের হৃদয়বিদারক অথচ মহান আত্মদান এবং আমাদের প্রিয় সংগ্রামী সাথী আজাদের গৌরবময় আত্মদান ইতিমধ্যেই আত্মদানের সেই পুষ্পমাল্যটিকে বর্ণোজ্জ্বল করেছে।

আমাদের ভবিষ্যত সম্পর্কে একথা বললে বোধ হয় আপনি দ্বিমত হবেন না যে, আপনি আমাকে ফাঁসি দিতে কৃতসংকল্প এবং আপনি তা করবেনই। আপনার হাতে ক্ষমতা আছে এবং আপনারা মনে করেন ক্ষমতার জোরেই কৃতকর্মের যৌক্তিকতা প্রমাণ করা যায়। আমরা জানি, 'জোর যার, মুলুক তার' - এই নীতি নিয়েই আপনি চলেন। আমাদের বিচারের প্রহসন এর জ্বলন্ত প্রমাণ।

আমরা বলতে চাই, আপনার আদালতের সিদ্ধান্ত হল আমরা যুদ্ধ ঘোষণা করেছি অর্থাৎ আমরা যুদ্ধবন্দী। আমরা তাই যুদ্ধবন্দীসুলভ ব্যবহার চাই। আমরা বলতে চাই, ফাঁসি নয়, আমাদের গুলি করে হত্যা করা হোক। আপনার আদালতের বক্তব্যকে আপনি মূল্য দেন একথা প্রমাণের দায়িত্ব আপনার।

আমাদের অনুরোধ এবং আশা, আপনি অনুগ্রহ করে সেনাদপ্তরে আদেশ দিন, তারা যেন সৈন্যবাহিনী পাঠিয়ে আমাদের হত্যা করে।

নিবেদক 

ভগৎ সিং, রাজগুরু, শুকদেব

কীভাবে পশ্চিমবঙ্গে এই পরিবর্তন হলো - দীপক নাগ

গত শতকের ষাটের দশক থেকেই পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থীদের বিরুদ্ধে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্র চলছে। বামপন্থীরা যাতে নির্বাচনের মাধ্যমেও ক্ষমতার কাছাকাছি না আসতে পারে তার জন্য মার্কিনিরা দেদার টাকা খরচ করা সহ সমস্ত রকম চেষ্টা চালিয়েছে। ভারতে নিযুক্ত আমেরিকার প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত ডেনিয়াল প্যাট্রিক ময়নিহান ১৯৭৮ সালে 'এ ডেঞ্জারাস প্লেস' নাম একটি বই প্রকাশ করেন। বইটিতে তিনি বলেন, 'আমরা দুবার - মাত্র দুবার, ভারতের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করেছি। এজন্য আমরা একটা রাজনৈতিক দলকে টাকা দিয়েছিলাম। দুবারই রাজ্য (বিধানসভা) নির্বাচনের আগে কমিউনিস্টদের সম্ভাব্য বিজয় ঠেকানোর জন্যই আমরা এটা করেছিলাম। একবার কেরালা আর একবার পশ্চিমবঙ্গে - যেখানে কলকাতা অবস্থিত - আমরা টাকা দিয়েছিলাম" (পৃ: ৪১)। ১৯৫৭ সালে কেরালা বিধানসভা নির্বাচনে যাতে বামপন্থীরা সরকার গঠন করতে না পারে, তার জন্যই ময়নিহান টাকা দিয়েছিলেন। আর ১৯৬৭ সালে পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থীদের সম্ভাব্য বিজয় ঠেকানোর জন্যই আমেরিকা টাকা ঢেলেছিল। শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধি ১৯৫৭ সালে ছিলেন কংগ্রেসের সভানেত্রী, আর ১৯৬৭ সালে ছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। বহুল প্রচারিত ময়নিহানের এই বক্তব্যের বিরুদ্ধে কংগ্রেস কিন্তু কোনো আপত্তি জানায়নি। স্বাধীনতার পর থেকেই কমিউনিস্টরা যাতে ভারতের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা না নিতে পারে, তার জন্য প্রত্যেক নির্বাচনের আগে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি টাকা খরচ করেছে। দিব্যি কেটে ময়নিহান দুবার ভারতের নির্বাচনে আমেরিকার হস্তক্ষেপের কথা বললেও ব্যাপারটা যে সেখানেই থেমে থাকেনি, পরবর্তী অনেক ঘটনাতেই তার প্রমাণ মেলে।

ইন্দিরা গান্ধি হত্যার পর ১৯৮৫ সালে ভারতে মধ্যবর্তী নির্বাচন হয়। এই নির্বাচনেই তখন পর্যন্ত রাজ্য রাজনীতিতে সম্পূর্ণ অপরিচিত মমতা ব্যানার্জি বামপন্থীদের দুর্গ বলে পরিচিত যাদবপুর কেন্দ্র থেকে সবাইকে অবাক করে দিয়ে জয়লাভ করেন। এই নির্বাচনের আগে কী ঘটেছিলো রুস্তেম গ্যালুইলিন-এর ' দ্য সি আই এ ইন এশিয়া' (১৯৮৮) থেকে স্পষ্ট হয়ে যায়। তিনি উল্লেখ করেন : "অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর উপ-সেনাপ্রধান এস কে সিং পশ্চিমবঙ্গে সিবিআই-র কাছে এক বিবৃতি দেন। সিং স্বীকার করেন যে, আমেরিকার রাষ্ট্রদূত জর্জ শেরম্যান একজন মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির ছদ্মবেশে তাঁর কাছে এক প্রস্তাব নিয়ে কলকাতায় আসেন। মার্কিন রাষ্ট্রদূত তাঁকে ১৯৮৫ সালের জানুয়ারির মাঝামাঝি সাধারণ নির্বাচনের আগে নিজস্ব কর্মসূচি অনুযায়ী একটা আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল গড়ে তোলার কথা বলেন। রাজনৈতিক দলটি মার্কিন দূতাবাসের ছত্রছায়ায় কাজ করবে। এই দলটিকে সমস্ত বামপন্থী রাজনৈতিক দলের এবং ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিপক্ষ শক্তি হিসেবে কাজ করতে হবে। মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেনারেলকে জানান, দল গড়ার জন্য সমস্ত টাকা তিনিই খরচ করবেন। এই ঘটনার কথা উল্লেখ করে 'দ্য হিন্দুস্তান টাইমস' পত্রিকা বিষয়টিকে রাজনৈতিক উপায়ে হোয়াইট হাউসের নির্দেশ জারির চেষ্টা বলে উল্লেখ করে"। এর আগে ১৯৮০ সালের ১৮ ডিসেম্বর 'পিপলস ডেমোক্রেসি' পত্রিকায় ভারতের রাজনীতিতে সিআইএ-র হস্তক্ষেপ সম্বন্ধে একটা বেশ বড় প্রবন্ধ ছাপা হয়। মার্কিন রাষ্ট্রদূতের প্রস্তাব শেষ পর্যন্ত কার মাধ্যমে এবং কীভাবে কার্যকর করা হয়, তা নিয়ে নানা কথা বাজারে চালু আছে। তবে মার্কিন দূতাবাসের তরফ থেকে যে বিভিন্ন সময়ে মেদিনীপুর, বীরভূম, দার্জিলিঙ, কলকাতা, নন্দীগ্রাম প্রভৃতি অঞ্চলে মাওবাদী-তৃণমূলসহ বিভিন্ন মৌলবাদী শক্তির সঙ্গে একাধিক সভা করা হয়েছে তা নিয়ে অনেক লেখালিখি হয়েছে। মার্কিনিরা পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে যে কতখানি উৎসাহী উইকিলিকসের ফাঁস করা তথ্য থেকেই তা স্পষ্ট হয়। রাজ্যের নির্বাচনের মাসখানেক আগেই 'দ্য হিন্দু' পত্রিকায় ২১ এপ্রিল, ২০১১ প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায় যে, ২০০৯ সালের মে মাসে লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের কিছু আসন বেড়ে যাওয়ার পর ২০ অক্টোবর কেবল ২৩০৩৫৩ মারফত আমেরিকার কনসাল জেনারেল বেথ এ পেইন তাঁর সরকারকে পশ্চিমবঙ্গের আগামী বিধানসভা নির্বাচনে আমেরিকার করণীয় কাজ সম্বন্ধে কিছু পরামর্শ দেন। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তিনি কতখানি সফল হবেন, তা নিয়ে সন্দেহ থাকা সত্ত্বেও পেইন জানান, "মমতা ব্যানার্জি বর্তমানে রেল দপ্তরের মন্ত্রী হিসেবে এখনও আমেরিকা সফরে না গেলেও মার্কিন সরকারের উচিত পশ্চিমবাংলার "ভাবী মুখ্যমন্ত্রী" হিসেবে তাঁকে মদত দেওয়া চালিয়ে যাওয়া। তাঁর দল তৃণমূল কনফারেস প্রকাশ্যে কখনও আমেরিকার বিরোধিতা করেনি। খোঁজখবর নিয়ে জানা গেছে যে, ব্যানার্জি পরিচালিত পশ্চিমবঙ্গ সরকার বর্তমান সিপিআই(এম) পরিচালিত সরকারের চাইতে আমেরিকার প্রতি বেশি বন্ধুত্বপূর্ণ হবে।" পশ্চিমবাংলা বিধানসভা নির্বাচন হয়েছে ২০১১ সালের মে মাসে আর ২০০৯ সালেই কলকাতার মার্কিন কনসাল জেনারেল মমতা ব্যানার্জিকে রাজ্যের "ভাবী মুখ্যমন্ত্রী" হিসেবে চিহ্নিত করে আমেরিকায় বার্তা পাঠাচ্ছেন এবং মদত চালিয়ে যাওয়ার কথা বলছেন। ব্যাপারটা কী আমাদের একটুও ভাবায় না? তারপর মার্কিন বিদেশ সচিব হিলারি ক্লিন্টন ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের নজিরবিহীনভাবে ভারতের কোন একটা রাজ্য সরকারের মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে একান্তে সাক্ষাৎকার কী নিছকই একটা সহজ-সরল ব্যাপার?

আচ্ছা, কোন বামপন্থী মুখ্যমন্ত্রী যদি জাল 'ডক্টরেট' ডিগ্রিধারী হতেন কিংবা সংবিধান হাতে 'বাপের জমিদারি' বলে চিৎকার করে কোনো বামপন্থী মুখ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাম এমএলএ-রা যদি অশ্লীল ভাষায় গালাগাল করতে করতে বিধানসভা ভাঙচুর করতেন - তাহলে বাংলার কথা বাদ দিন, সারা দুনিয়াতেই বামপন্থীদের কী বলে ডাকা হতো? তাছাড়া গত আড়াই বছরে রাজ্যে যা ঘটেছে যেমন, পার্ক স্ট্রিট, রায়গঞ্জ, ভাঙড়, কামদুনি, ফেসবুক, সারদা, মগরাহাট, কালীঘাট থানা, প্রেসিডেন্সি কলেজ, স্কুল, সার্ভিস কমিশন, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের পদত্যাগ, ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল, পঞ্চায়েত নির্বাচনসহ বিভিন্ন নির্বাচনে ছাপ্পা ভোট, স্কুল-কলেজের নির্বাচনে দুষ্কৃতী হামলা, পুলিস হেপাজতে সুদীপ্ত গুপ্তের হত্যা, ১৪২ জনের মতো বামপন্থী কর্মী হত্যা, হাজার হাজার কর্মী-নেতার ঘরবাড়ি ছাড়া, মিথ্যে মামলা ইত্যাদি - এর দশ ভাগের এক ভাগ ঘটনাও যদি বামপন্থী মুখ্যমন্ত্রীর আমলে ঘটতো - তাহলে অবস্থাটা কী দাঁড়াতো, একবার কেউ কল্পনা করতে পারেন? কী হতো তাহলে সংবাদ মাধ্যমগুলোর ভূমিকা? এখন প্রতিদিন গণতন্ত্র-জবাই চলছে। বামপন্থীদের প্রতিবাদ, আন্দোলন - কোন কিছুকেই দাগ কাটতে দেওয়া হচ্ছে না। একটা ঘটনাকে অন্য ঘটনা দিয়ে চাপা দেওয়া হচ্ছে। বিধানসভা তার গুরুত্ব হারিয়ে ফেলেছে। তথাকথিত গণতন্ত্রপ্রেমীরা নীরব। কিন্তু কেন? বুর্জোয়া গণতন্ত্রে সরকারের পৰিৱৰ্তন কোন বড় ঘটনা নয়। এর আগেও দুবার বামপন্থীদের সরকার থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আর একবার সরকার গঠন করতেই দেওয়া হয়নি। কিন্তু যে প্রশ্নটা সামনে আসছে তা হলো, কীভাবে এই পরিবতন হলো? ২০০৬ সালে রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে মোট ১৯৪৫৬৭৭৬ বৈধ ভোটের মধ্যে বামফ্রন্ট পায় ১৯৮০০৪২৫ ভোট। শতকরা ৫০.১৮ জন ভোটার বামফ্রন্টের কাজে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। তৃণমূল-বিজেপি জোট পায় শতকরা মাত্র ২৮.৭৭ ভোট। এই নির্বাচনে বিপুল সংখ্যক মানুষের সমর্থনে বামফ্রন্ট জয়লাভ করার ঠিক পরেই রাজ্যে কী এমন ঘটলো? ২০০৬ - ২০১১ সালের মধ্যে বামফ্রন্ট সরকার রাজ্যের লক্ষ লক্ষ বেকারের কাজের ব্যবস্থার জন্য সিঙ্গুর, শালবনী, নয়াচর প্রভৃতি জায়গায় মৌলিক শিল্প গড়ে তোলার প্রাণপণ চেষ্টা করে সফলতার দোরগোড়ায় প্রায় পৌঁছে যায়। এটা যদি কোনো 'ভুল' বা 'অন্যায়' হয়, তা হলে অবশ্য আলাদা কথা। সমস্ত ক্ষেত্রেই বাধা দিয়ে মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বে লক্ষ লক্ষ মানুষের পেটের ভাত কেড়ে নেবার ব্যবস্থা করা হলো। বাংলার মানুষের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা এবং যুব সমাজের চরম সর্বনাশ করেও তৃণমূল ২০০৬-এর চাইতে ৮০ লক্ষের কিছু বেশি ভোট বাড়িয়ে ফেললো। কিন্তু কীভাবে? বিশেষ কোনো শক্তির মদত বা বিশেষ কোনো কৌশল গ্রহণ না করে যে একাজ করা সম্ভব নয়, পৃথিবীর সব চাইতে বোকা মানুষটিও তা বুঝতে পারে।

*****************************************************

এনজিও বা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলোর প্রকৃত উদ্দেশ্য ও ভূমিকা নিয়ে সারা পৃথিবীতে বরাবরই একটা সন্দেহ রয়ে গেছে। সমাজবদ্ধ প্রাণী হিসেবে মানুষ মানুষের জন্য ভাববে বা সমাজটাকে সঠিক পথে পরিচালনা করতে সাহায্য করবে - এটাই তো স্বাভাবিক। কারণ এই শ্রেণিবিভক্ত সমাজব্যবস্থায় মুষ্টিমেয় কয়েকজন মানুষ সমাজের প্রায় সমস্ত সম্পত্তির মালিক। আর সম্পত্তি বলতে যা বোঝায়, বেশিরভাগ মানুষেরই তা নেই। তাই ব্যবস্থার পরিবর্তন চাই। ১৮৪৫ সালে সমাজবিজ্ঞানী কার্ল মার্কস তাঁর বিখ্যাত রচনা 'থিসিস অন ফয়েরবাখ'-এ প্রথম উল্লেখ করেন : 'দার্শনিকেরা কেবল নানাভাবে জগৎকে ব্যাখ্যা করেছেন, কিন্তু আসল কথা হলো সেটাকে পরিবর্তন করা'। কমিউনিস্টরাই প্রথম সমাজ পরিবর্তনের কথা বলে এবং তা করে দেখায়। জন্মলগ্ন থেকেই পুঁজিপতিরা মুনাফার জন্য মানুষের সঙ্গে মানুষের বিভেদ তৈরি করার চেষ্টা করে চলেছে। তারা সঙ্ঘবদ্ধ শ্রমিক, কৃষক ও সাধারণ মানুষের ওপর নানা ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করে। এনজিও-দের টাকার মূল উৎস সাম্রাজ্যবাদী তহবিল। সাম্রাজ্যবাদীরা অন্য দেশের শ্রমিক কৃষক ও সাধারণ গরিব মানুষের মঙ্গলের কথা ভাববে, তা কুমীরের মার পুত্রশোকের মতোই অবিশ্বাস্য। আশির দশক থেকেই তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে এই 'ভাড়াটে সমাজসেবার ব্যবসার' রমরমা বাজার হলেও এর সূচনা কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই। ঐ বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়েই লেনিন 'সাম্রাজ্যবাদ - পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ স্তর' নামক তাঁর বিখ্যাত বইটি প্রকাশ করেন। মহাজনী পুঁজি বৃদ্ধি ও পুঁজি রপ্তানি - এই দুটো হলো সাম্রাজ্যবাদের মূল বিষয়। পুঁজি রপ্তানি বা বাজার দখলের জন্য অন্য দেশের সরকার এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সাম্রাজ্যবাদী দেশের একটা সুন্দর ভাবমূর্তি তৈরি করা প্রয়োজন। কমিউনিস্টরা সাম্রাজ্যবাদের শত্রু। তারা শ্রমিক, কৃষক ও সাধারণ মানুষের সুখে দুঃখে সবসময়ই পাশে থাকে। কমিউনিস্টরাই এই শোষণমূলক সমাজব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়ে সাধারণ মানুষকে নতুন সমাজ গোড়ার স্বপ্ন দেখায়। বিপ্লবের মাধ্যমে সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতন্ত্র গঠিত হওয়ার পর থেকেই পুঁজিবাদ প্রমাদ গুণতে শুরু করে।

কমিউনিস্টদের পালের হাওয়া কেড়ে নেওয়ার জন্য সাম্রাজ্যবাদীরা নতুন কৌশল নেয়। মার্কিনি তেল সাম্রাজ্যের অন্যতম কর্ণধার জন রকফেলার এবং ইস্পাত শিল্পের একচেটিয়া কারবারি অ্যান্ডু কার্নেগি কমিউনিস্টদের বিকল্প হিসাবে জনসেবামূলক কাজের জন্য যথাক্রমে রকফেলার ফাউন্ডেশন এবং কার্নেগি ফাউন্ডেশন তৈরি করেন। উদ্দেশ্য : সমাজসেবার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মন থেকে সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী ঘৃণা কমিয়ে দিয়ে কমিউনিস্ট-বিরোধী ঘৃণা জাগিয়ে তোলা। তাই প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পরপরই কয়েকশো ফাউন্ডেশন গড়ে ওঠে। ১৯৩৬ সালে আমেরিকার বিখ্যাত ফোর্ড মোটর কোম্পানির উদ্যোগে গড়ে ওঠে ফোর্ড ফাউন্ডেশন। একইভাবে কেলগ ফাউন্ডেশন, গ্রান্ট ফাউন্ডেশন, ফ্রিডম রিসার্চ ফাউন্ডেশন, ব্রাদার্স ব্রাদার ফাউন্ডেশন, আফ্রিকান ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন, এশিয়া ফাউন্ডেশন ইত্যাদি তৈরি করা হয়। ভারতসহ তৃতীয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে 'ফেলোশিপের' নামে সম্ভাবনাময় শিল্পী, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী প্রভৃতি বুদ্ধিজীবীদের মগজ ধোলাইয়ের জন্য আমেরিকায় নিয়ে যাওয়া ছিল এইসব ফাউন্ডেশনের অন্যতম কাজ। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর চীনে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়। তৃতীয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তিলাভ করে। ফলে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি আশঙ্কিত হয়ে পড়ে। শুরু হয় কমিউনিস্ট বিরোধী নানা ষড়যন্ত্র। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলোকে বাঁচাতে আমেরিকার স্বরাষ্ট্রসচিব জর্জ মার্শাল এক পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। এটাই মার্শাল প্ল্যান নামে পরিচিত। এরই অঙ্গ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয় 'কেয়ার' বা কো-অপারেটিভ ফর আমেরিকান রিলিফ এভরিহোয়ার। এই সংস্থার মাধ্যমেই আমেরিকা তার উদ্বৃত্ত গম বা খাদ্যদ্রব্য সারা পৃথিবীতে বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে পাঠাতে শুরু করে। পি এল ৪৮০-র কথা এখনও অনেকের মনে আছে। ভারতসহ ভূখা-মানুষের দেশগুলোতে এই সাহায্য টোপ হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। কমিউনিস্ট মতাদর্শের অগ্রগতি রোধ করে তার মূল লক্ষ্য।

*****************************************************

ভিয়েতনাম যুদ্ধের খলনায়ক মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব রবার্ট ম্যাকনামারা বিশ্বব্যাঙ্কের সভাপতির দায়িত্ব নেবার পর থেকেই ভারতসহ তৃতীয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দান বা সেবার মাধ্যমে 'স্বেচ্ছামূলক সেবা প্রতিষ্ঠানগুলির আন্দোলন' গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন।

*****************************************************

বিশিষ্ট মার্কিন-রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মাইনর উইনার বিভিন্ন দেশের বুদ্ধিজীবীগোষ্ঠীর মধ্যে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মার্কিন অনুচর নিয়োগ করার দায়িত্ব পালন করেন। এইসব বুদ্ধিজীবীদের কাজের সুবিধার জন্য 'পার্টিবিহীন রাজনৈতিক সংগঠন' বা 'পার্টিবিহীন রাজনৈতিক আন্দোলন' গড়ে রোলার কথা বলা হলো।

*****************************************************
ম্যাকনামারা বা মাইরন উইনারের অ্যাকশন গ্রুপের তত্ত্বকে ভারতের মাটিতে বাস্তবায়িত করার ক্ষেত্রে বিশিষ্ট ভারতীয় রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রজনী কোঠারী বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন।
*****************************************************
পরমাণু চুক্তি নিয়ে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির তীব্ৰ বিরোধিতা করার পর থেকেই পশ্চিমবঙ্গে নৈরাজ্য সৃষ্টির চেষ্টা চালানো হচ্ছে। আদিবাসীদের স্বার্থ দেখার নাম করে গরিব, নিরপরাধ আদিবাসীদের খুন করা হচ্ছে। আর সবই হচ্ছে মাওবাদীদের নাম করে। এ এক অদ্ভুত সমীকরণ। লালঝাণ্ডাকে যারা ঘৃণা করে, লালঝাণ্ডায় যাদের এলার্জি আছে, তাদের সঙ্গে তথাকথিত মার্কসবাদীদের আঁতাত। ম্যাকানমারা, মাইরন উইনার ও রজনী কোঠারীর সেই বিখ্যাত তত্ত্ব - হতাশাগ্রস্ত কমিউনিস্টদের সঙ্গে নিয়েই কমিউনিস্টদের ওপর আক্রমণ সংগঠিত করতে হবে। বামপন্থীদের স্লোগানসহ রাজ্যের বর্তমান বিরোধীদের প্রায় সব কিছুই ধার করা। তৃণমূল নামটাও ম্যাকানমারার 'গ্রাসরুট'-এর বাংলা অনুবাদ। পরিবর্তন-এর স্লোগানটিও তাঁর। আশ্চর্যজনকভাবে উগ্রবামপন্থী ও উগ্রদক্ষিনপন্থী সবাই এসে বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে জড়ো হলেন সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম-লালগড় ষড়যন্ত্রের অংশীদার হিসাবে।
*****************************************************
তথাকথিত মাওবাদী সংগঠনের জন্মও কিন্তু আমেরিকায়। ১৯৭৯ সালে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান দেঙ জিয়াও পিঙ আমেরিকা সফরে এলে তাঁর বিরুদ্ধে মাওবাদীদের নেতা বব অ্যাডকিয়ান হোয়াইট হাউসের সামনে বিক্ষোভ দেখান। শোনা যায় তাঁকে গ্রেফতার করে পরে ছেড়ে দেওয়া হয়। তারপর থেকে দীর্ঘ ২৫ বছর তাঁর কোন হদিস পাওয়া যায়নি। তাঁর বিদেশে আত্মগোপন করার কথা শোনা যায়। কিছুদিন আগে তাঁর বক্তৃতার চার-ডিস্কের এক সিডি-র হদিশ মিলেছে। মাওবাদীদের উদ্যোগেই 'রেভোলিউশনারি ইন্টারন্যাশনাল মুভমেন্ট (রিম) গঠিত হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গোরিলা বাহিনী তৈরি করে সশস্ত্র অভ্যুত্থান করাই এর উদ্দেশ্য বলে জানানো হয়েছে। ভারতের মাওবাদীরাও সেই অর্থে আমেরিকার মাওবাদীদের মতোই মাও-জে দঙ-এর নামে তাঁর চিন্তাধারার বিরোধী কাজকর্ম চালাচ্ছে। বিপ্লবের নামে প্রতিবিপ্লবীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে চলছে সর্বহারাদের বিরুদ্ধে আক্রমণ।
*****************************************************

Wednesday, 8 December 2021

কাশ্মীর যুক্তি তর্ক সত্য - শমীক লাহিড়ী

প্রশ্ন-৫) ভারতবর্ষের সংবিধানে উল্লিখিত ৩৭০নং ধারা কি সাময়িক?

উত্তর) সংবিধানের একবিংশ অংশে দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ হল ৩৭০ নং ধারা। এটা ঠিক এর শিরোনামে লেখা আছে এটা সাময়িক, পরিবর্তন সাপেক্ষ এবং বিশেষ বিধান। তাই অনেকেই ব্যাখ্যা করেন এই ধারাটি সাময়িক সময়ের জন্য রচিত হয়েছিল। জম্মু-কাশ্মীরের গণপরিষদ এবং পরবর্তীতে জম্মু-কাশ্মীর বিধানসভা এই ধারার পরিবর্তন, বিলোপসাধন অথবা একই রূপে রেখে দিতে পারে। জম্মু-কাশ্মীরের বিধানসভা এই ধারাটিকে বজায় রাখার সিদ্ধান্ত নেয়, ফলে এটি সাময়িক নয়। এই নিয়ে স্বাধীনোত্তর ভারতবর্ষে অনেক বিতর্ক দেখা যায়। ১৯৬৯ সালে সম্পৎ প্রকাশ মামলায় সুপ্রিম কোর্ট এই ধারাকে সাময়িক আখ্যা দেওয়ার আবেদনকে সরাসরি নাকচ করে। দিল্লী হাইকোর্টে কুমারী বিজয়লক্ষ্মী একটি মামলায় দাবী করেন ৩৭০নং ধারা সাময়িক এবং এই ধারাটিকে বহাল রাখা আসলে সংবিধানের প্রতি জালিয়াতি। দিল্লী হাইকোর্ট এই মামলাও খারিজ করে দেয়। ২০১৮ সালের ৩রা এপ্রিল সুপ্রিম কোর্ট আর একটি মামলায় সরাসরি জানিয়ে দেয়, শিরোনামে সাময়িক শব্দটি লেখা থাকলেও এই ধারাটি সাময়িক নয়। বিভিন্ন সময় এই রায়গুলিতে আদালত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় এই ধারাটির শিরোনামে 'সাময়িক' শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছিল তৎকালীন গণপরিষদকে প্রস্তাবিত ধারাটি সংশোধনী-সংযোজনী অথবা বিলোপ সাধনের অধিকার দেওয়ার জন্য। কিন্তু তৎকালীন গণপরিষদ এবং পরবর্তীতে বিধানসভা এই ধারাটি বজায় রাখার পক্ষে মত দেয়, ফলে এটি 'সাময়িক' নয়।


প্রশ্ন-৬) সংবিধানের ৩৭০নং ধারাটি কি বিলোপ করা যেতে পারে?

উত্তর) এটা ঠিক উপধারা ৩৭০(৩) অনুযায়ী ৩৭০নং ধারা বিলোপ করা যেতেই পারে রাষ্ট্রপতির আদেশের ভিত্তিতে। তবে এই আদেশের জন্য জম্মু-কাশ্মীরের গণপরিষদের সম্মতি প্রয়োজন। কিন্তু ১৯৫৭ সালের ২৬শে জানুয়ারী সেই গণপরিষদ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তাই সংবিধান বিশেষজ্ঞদের অনেকের মত এই ধারা বিলোপ করা যায় না। আবার একাংশের ব্যাখ্যা এটি বিলোপ করতে হলে রাজ্য বিধানসভার সম্মতি প্রয়োজন। বর্তমান বিজেপি সরকার সংবিধান বিশেষজ্ঞদের এই সব মতামতের তোয়াক্কা না করে, জম্মু-কাশ্মীরের জনসাধারণকে অন্ধকারে রেখে, সমস্ত রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বকে কারাগারে নিক্ষেপ করে, ৭ লক্ষ ৪০ হাজার সৈনিকের বন্দুকের ডগায় সেখানকার মানুষকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে রেখে জবরদস্তি এই আইন পাশ করানোর চেষ্টা করেছে। এটা গণতন্ত্র? দেশের উন্নতির জন্য কি ৩৭০নং ধারা কোন অন্তরায় সৃষ্টি করেছে? দেশজোড়া বেকার, অসংখ্য শ্রমিক ছাঁটাই, আকাশ ছোঁয়া মূল্যবৃদ্ধি এইসব সমস্যার দিকে নজর না দিয়ে বন্দুকের ডগায় জম্মু-কাশ্মীরের মানুষের কোনও মতামত না নিয়ে এই কাজ করার অর্থ কি? এটা দেশের জ্বলন্ত সমস্যাগুলি সমাধানে ব্যর্থ মোদী সরকারের দৃষ্টি ঘোরানোর প্রয়াস মাত্র। দেশের বাকি ১০টি রাজ্য বিশেষ অধিকার নিয়ে চলতে পারে অথচ জম্মু-কাশ্মীরের সাধারণ মানুষের সেই অধিকার কেড়ে নেওয়া হলো কেন? একাজ কি সন্ত্রাসবাদীদের আরো সাহায্য করবে না? পাকিস্তান কাশ্মীর প্রশ্নে বরাবর আন্তর্জাতিক মহল থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল প্রধানত ২টি কারণে - (ক) ভারতবর্ষ জম্মু-কাশ্মীরের মানুষকে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার দিয়েছিল (খ) পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদীদের জম্মু-কাশ্মীরে ব্যবহার করলেও, ভারতবর্ষ কখনও পাক অধিকৃত কাশ্মীরে কোন জঙ্গি-সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপে মদত দেয়নি। ভারতবর্ষ বরাবরই শান্তিপূর্ণ-দ্বিপাক্ষিক আলোচনার ভিত্তিতে সমস্যা সমাধানের পক্ষপাতী। এখন বিজেপির এই পদক্ষেপে জম্মু-কাশ্মীরের মানুষের প্রতি বিশ্বাসঘাতক হিসাবে ভারতবর্ষ চিহ্নিত হবে। ৩৭০নং ধারা বিলোপ করলে ভারতবর্ষের বাকি অংশের কোন মানুষের লাভ হবে? ভারতবর্ষের বেকার যুবক কাজ পাবে? শ্রমিকের মজুরী বাড়বে? জিনিসপত্রের দাম কমবে? দেশে গরীবি কমবে? আসলে সর্বক্ষেত্রে ব্যর্থ মোদী সরকার ধর্মের নামে মানুষকে বিভক্ত করে রাখতে চাইছে, আর এই প্রশ্নে জম্মু-কাশ্মীর, তাঁর হাতের তুরুপের তাস। তাই ভারতবড়হ বা পাকিস্তানের শাসক শ্রেণী আভ্যন্তরীন বিপদে পড়লেই, দৃষ্টি ঘোরানোর জন্য জম্মু-কাশ্মীর সমস্যা পরিকল্পিতভাবে সামনে আনে।

প্রশ্ন-১২) সংবিধানের ৩৭০নং ধারা বিলোপ কি প্রয়াত শ্রী শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের দাবী মেনে?

উত্তর) সংবিধানের ৩৭০নং ধারা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সময় শ্রী শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ছিলেন কংগ্রেস দলের সদস্য, সংসদেরও সদস্য এবং ভারতের সংবিধান রচনার জন্য তৈরী গণপরিষদেরও সদস্য। সংসদে অথবা গণপরিষদের কোনও অধিবেশনে শ্রী মুখার্জী ৩৭০নং ধারা গ্রহণ করার সময়ে আপত্তি জানাননি। সংসদে বিভিন্ন বিষয়ে তিনি অনেক বক্তৃতা করেছিলেন কিন্তু এই বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে তিনি কোন বক্তৃতা সংসদে অথবা গণপরিষদে করেননি। বরং ১৯৫৩ সালের ৯ই জানুয়ারী জওহরলাল নেহেরুকে লেখা একটি চিঠিতে উল্লেখ করেছিলেন - "আমাদের নিঃসঙ্কোচে শেখ আব্দুল্লার নেতৃত্বে বিশেষ সুবিধাসহ কাশ্মীর উপত্যকার অস্তিত্ব মেনে নেওয়া দরকার, যতদিন পর্যন্ত তিনি সেই বিশেষ ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন মনে করবেন"। তবে আশ্চর্যজনকভাবে নেহেরু মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের পর পুরানো অবস্থান থেকে সম্পূর্ণ উল্টো পথে হেঁটে কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদার বিষয়টি ভারতীয় সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার বিরোধীতা শুরু করেন। দেশের শিল্পমন্ত্রী থাকাকালীন শ্রী শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ৩৭০নং ধারার বিরোধিতা করেননি কারণ তিনি জানতেন আরও অনেকগুলি করদ রাজ্যকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য ৩৭১নং ধারা যুক্ত হতে চলেছে, সংবিধানে এদের বিশেষ মর্যাদা দেওয়ার জন্য। ৩৭০নং ধারার বিরুদ্ধে বিদ্বেষকে তাই ব্যবহার করা হয়েছে হিন্দুদের ঐক্যবদ্ধ করবার এবং মুসলমান বিরোধী জিগীর তোলাবার জন্য। এরা ৩৭১নং ধারার বিরোধীতা করে না কারণ এটিকে ব্যবহার করে হিন্দু-মুসলমান জনগণকে বিভক্ত করার সুযোগ নেই।

তৎকালীন কাশ্মীরে প্রবেশ করতে গেলে পারমিট নেওয়ার প্রয়োজন হত। শ্রী মুখার্জী 'এক দেশ, এক বিধান, এক নিশান, এক প্রধান' এই স্লোগানকে সামনে রেখে বিনা পারমিটে আইন ভেঙ্গে কাশ্মীর অভিযানে যান এবং গ্রেপ্তার বরণ করেন। একজন সাংসদ কি উদ্দেশ্যে বিনা পারমিটে গায়ের জোরে প্রবেশ করার চেষ্টা করেছিলেন! সাংসদ হিসাবে অনুমতি চাইলেই তো তিনি পারমিট নিয়েই সেখানে যেতে পারতেন। দুঃখজনকভাবে জেলবন্দী থাকা অবস্থাতেই তাঁর মৃত্যু হয়।

প্রশ্ন-১৩) ভারতীয় জনসংঘের প্রতিষ্ঠাতা শ্রী শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের কি অবদান ছিল ভারত গঠনে?

উত্তর) ১৯৪৭ সালের এপ্রিল মাসে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে রাউ কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী তৎকালীন আইনমন্ত্রী শ্রী যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল হিন্দু কোড বিল সংসদের সামনে পেশ করেন। দেশভাগ এবং স্বাধীনতার পর দেশের প্রথম আইনমন্ত্রী ড. বি.আর.আম্বেদকর নেহেরুর মন্ত্রিসভার সামনে এই বিল পেশ করেন এবং তা সিলেক্ট কমিটির বিবেচনার জন্য পাঠানো হয়। ১৯৪৮ সালের ১২ই আগস্ট সিলেক্ট কমিটির রিপোর্ট ড. আম্বেদকর সংসদে পেশ করেন এবং ৩১শে আগস্ট সংসদের সম্মতির জন্য উত্থাপন করেন। ১৯৪৯ সালে ২৯শে ডিসেম্বর বিলটি পেশ করার কথা থাকলেও হিন্দু মৌলবাদীদের প্রবল বিরোধীতার জন্য সেটি সংসদে পেশ করা হয় ১৯৫১ সালে ৫ই ফেব্রুয়ারী। কিন্তু শ্রী শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় সহ হিন্দুত্ববাদীদের প্রবল বিরোধীতায় নেহেরু সরকার কিছুটা পিছু হঠতে বাধ্য হয়।

কি ছিল এই বিলে - (ক) হিন্দু বিবাহ আইন সংশোধন, (খ) হিন্দু উত্তরাধিকার সম্পত্তি সংক্রান্ত আইন, (গ) হিন্দু নাবালক এবং অভিভাবকত্ব আইন, (ঘ) হিন্দু দত্তক গ্রহন এবং পরিচর্যা সংক্রান্ত আইন। এই আইনগুলির মাধ্যমে হিন্দুদের বহু বিবাহ রদ, হিন্দু মহিলাদের বিবাহ বিচ্ছেদ করবার অধিকার, বাল্যবিবাহ রদ, হিন্দু নারীদের সম্পত্তির অধিকার ইত্যাদি পরিবর্তন আনার চেষ্টা হয়েছিল। শ্রী মুখোপাধ্যায় এই আইনের বিরোধীতা করতে হয়ে সংসদে বলেন - 'কোনভাবেই মহিলাদের বিবাহ বিচ্ছেদের অধিকার দেওয়া যাবে না'। বহু বিবাহের অধিকারের পক্ষে দাঁড়িয়ে তার সওয়াল ছিল কেবলমাত্র হিন্দুদের থেকে এই অধিকার কেড়ে নেওয়া যাবে না। তাঁর সহযোগী মদনমোহন মালব্য ভিন্ন জাতের মধ্যে বিবাহের ক্ষেত্রে প্রবল বিরোধীতা করে বলেছিলেন - 'একই জাতির মধ্যে বিবাহ হওয়া উচিত কারণ একই ধরণের খাদ্যাভ্যাস এবং অন্যান্য অভ্যাস তাদের মধ্যে মেলামেশা করতে সুবিধা দেয় এবং ব্যক্তি ও জাতির স্বাস্থ্য এবং সুখ বজায় রাখে'। এই হিন্দু কোড বলের বিরোধীতা করে তাঁরা আরও বলেছিলেন - 'যেহেতু বিবাহ হিন্দু সমাজে একটি গভীর দর্শনের উপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে এবং এটি মৌলিক এবং পবিত্র অধিকার হিন্দুদের, তাই হিন্দু বিবাহ আইনের সংশোধন কোনভাবেই মেনে নেওয়া যায় না'। অর্থাৎ বহু বিবাহের পক্ষে এরা সওয়াল করেছেন।

শ্রী মুখার্জী উচ্চবর্ণদের এই আইনের আওতার বাইরে রাখার পক্ষে জোরালো সওয়াল করে বলেছিলেন - '(উচ্চবর্ণের) যারা উত্তরাধিকার সূত্রে বহু বৎসর ধরে এই ধারাবাহিকতা মেনে চলছেন তারা কিছু কম দেশপ্রেমিক নন অন্যান্য (নিচু) জাতির তুলনায়। এদের উপর জবরদস্তি নতুন আইন চাপিয়ে দেবেন না'। ড. আম্বেদকরের তীব্র আক্রমণের মুখে দাঁড়িয়ে তিনি শেষ পর্যন্ত বলেন - তাহলে সমগ্র ভারতবাসীর জন্য এই আইন প্রয়োগ করা হোক। শ্রী মুখোপাধ্যায় এই আইনের বিরোধীতা করতে গিয়ে অভিযোগ তুলেছিলেন হিন্দুদের আইনের এই পরিবর্তনে হিন্দু ধর্ম নাকি আক্রান্ত হচ্ছে। জবাবে ড. আম্বেদকর বলেছিলেন - 'আমি ওনাকে জিজ্ঞাসা করতে চাই কেউ স্ত্রীকে মারধর করলে সেটা কি ধর্মীয় পরম্পরার নামে মেনে নেওয়া হবে? একটি আদালতে একজন বিচারক বলেছিলেন - হিন্দুধর্মে এটি গ্রহণযোগ্য। আমি শ্রী মুখোপাধ্যায়কে জিজ্ঞাসা করতে চাই এই ধরণের নিষ্ঠুরতা কি ধর্ম?'

শ্রী শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে হিন্দু মৌলবাদী শক্তির প্রবল আক্রমণের মুখে দাঁড়িয়ে সেদিন আম্বেদকর ক্ষোভে পদত্যাগ করেছিলেন। এদেরই উত্তরাধিকার বিজেপি আজ ড. আম্বেদকরের গলায় মালা দেন কোন অধিকারে? সেদিন যারা সব হিন্দুর জন্য এক আইনের বিরোধীতা করেছিলেন, আজ কিসের ভিত্তিতে তারা গোটা দেশের জন্য একই আইন প্রণয়নের কথা বলেন? আসলে একই আইনের নাম করে প্রগতির জন্য সমাজ সংস্কার নয়, সংখ্যালঘুদের উপর আক্রমণ আনার জন্যই ইউনিফর্ম সিভিল কোডের কথা এরা বলছেন।

প্রশ্ন-১৪) শ্রী শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় কি বাংলাভাগ রুখতে চেয়েছিলেন? তিনি কি দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছিলেন?

উত্তর) শ্রী শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় কংগ্রেসের আহ্বানে ভারত ছাড়ো আন্দোলন সম্পর্কে ১৯৪২ সালের ২৬শে জুলাই তৎকালীন ব্রিটিশ গভর্নর জন হারবার্টকে একটি চিঠিতে লেখেন - 'যে কোন ব্যক্তি যদি বর্তমান যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ) মানুষকে জাগিয়ে তুলে আন্দোলন করবার পরিকল্পনা করেন, যার ফলে আভ্যন্তরীন অস্থিরতা এবং নিরাপত্তাহীনতা তৈরী হতে পারে, সরকারের উচিত তাকে প্রতিহত করা'। তিনি আরও লেখেন - 'আপনার অনুগত একজন মন্ত্রী হিসাবে আমি সম্পূর্ণভাবে আপনার সরকারকে সহযোগীতা করতে চাই এবং আমার রাজ্য ও দেশকে এই সংকটজনক মুহূর্তে সেবা করতে চাই।' প্রসঙ্গত উল্লেখ্য সেই সময় স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশ না নিয়ে ফজুলল হকের নেতৃত্বে মুসলীম লীগের মন্ত্রীসভায় তিনি অর্থমন্ত্রী হিসাবে যোগদান করেছিলেন। যে সময় একদিকে কংগ্রেসের নেতৃত্বে ভারত ছাড়ো আন্দোলন গড়ে উঠছে এবং নেতাজী সুভাষ বসুর নেতৃত্বে আজাদ হিন্দ বাহিনী গঠনের কাজ চলছে তখন মুসলীম লীগের মন্ত্রীসভায় উপমুখ্যমন্ত্রী হিসাবে যোগদান করে তিনি ব্রিটিশ সরকারকে সহযোগীতা করার আশ্বাস দিয়েছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আর.এস.এস. দেশের বিভিন্ন স্থানে ক্যাম্প সংগঠিত করেছিল ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে নাম লেখানোর জন্য।

১৯৪৬ সালের শেষের দিকে শ্রী মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে বাংলা ভাগের দাবীতে গঠিত হয় - 'Bengal Partition League', পরবর্তীতে যা 'Bengal Provincial Conference' নামে পরিচিত হয়। ঐ বছর ফেব্রুয়ারী মাসে হিন্দু মহাসভার বাংলা শাখা হিন্দুদের জন্য পৃথক বাংলা রাজ্য গঠনের জন্য একটি কমিটি তৈরী করে এবং ২৯শে মার্চ এর বার্ষিক সাধারণ সভায় হিন্দুদের জন্য পৃথক রাজ্যের দাবীতে প্রস্তাব পাশ করে। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে শ্রী মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে হুগলী জেলার তারকেশ্বরে বাঙালী হিন্দু সম্মেলন সংগঠিত হয়। এখান থেকেই শ্রী মুখোপাধ্যায় প্রস্তাব দেন 'বাঙলা ভাগই একমাত্র সমস্যা সমাধানের রাস্তা'। এই সম্মেলন থেকে গৃহীত এক প্রস্তাবে তাঁকেই দায়িত্ব দেওয়া হয় - বাঙালি হিন্দুদের জন্য পৃথক রাজ্যের দাবীতে একটি কাউন্সিল গঠন এবং গণপরিষদের কাছে বাংলা ভাগের সীমানা নির্ধারণের আবেদন করার জন্য।

এই প্রসঙ্গে জ্যোতি বসু 'যতদূর মনে পড়ে' এই আত্মকথায় উল্লেখ করেন - 'দেশভাগের প্রশ্নে আমাদের পার্টির কি নীতি ছিল, তা এখানে বলা দরকার। আগেই বলেছি, পার্টি দেশভাগের বিরোধীতা করেছিল - কিন্তু এর প্রতিরোধ করার মত শক্তি ও প্রভাব পার্টির ছিল না। ভারতে তখন আমাদের পার্টি ৩য় বৃহত্তম শক্তি হলেও কংগ্রেস ও মুসলীম লীগের তুলনায় আমাদের শক্তি খুবই দুর্বল ছিল। আমাদের প্রতিবাদ ও বিরোধীতা সত্ত্বেও দেশ যখন সত্য সত্যই বিভক্ত হলো, তখন এই বাস্তবকে স্বীকার করে নেওয়া ছাড়া আমাদের পার্টির সামনে আর কোন বিকল্প ছিল না'।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যখন শ্রী মুখোপাধ্যায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন তখন ব্রিটিশ পতাকাকে অবমাননা করবার জন্য ১ম ছাত্রকে বেত্রাঘাত করার প্রতিবাদ করে ধরিত্রী গাঙ্গুলী এবং উমাপদ মজুমদার এই দুজন ছাত্রকে বরখাস্ত করেছিলেন - এমন অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে আছে। তাই ভারতবর্ষের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির অন্যতম প্রবক্তার স্বাধীনতা আন্দোলন, সমাজসংস্কার এবং বাংলাভাগের ক্ষেত্রে যে নেতিবাচক ভূমিকা ছিল তা সকলের জানা অত্যন্ত জরুরী।

********************************************

জম্মু-কাশ্মীরের ভারত ভুক্তির অন্যতম প্রধান ভিত্তি ৩৭০নং ধারাকে লঘু করার প্রশ্নে কমিউনিস্টরা বরাবর বিরোধীতা করেছে। ২০০১ সালের ১৮ই ডিসেম্বর ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম শীর্ষ নেতা শ্রী জ্যোতি বসু একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন - 'কাশ্মীরীদের স্বশাসন এবং অধিক ক্ষমতা দেওয়ার ক্ষেত্রে ভারত সরকার সঠিক নীতি গ্রহণ করেনি। তাই তারা ধীরে ধীরে ভারত থেকে আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন। ঐ সময় জনসংঘ ও হিন্দুত্ববাদীদের উত্থানেরও প্রভাব পড়েছিল। বিশেষত যখন কাশ্মীরের জনগণের থেকে এই সমস্ত ক্ষমতা নিয়ে নেওয়া হয়, তখন তরুণ কাশ্মীরীরা পাকিস্তানপন্থী ও ভারত বিরোধী হয়ে উঠেছিলেন। এখন অনেকগুলি গোষ্ঠী রয়েছে। শেখ আব্দুল্লার মতো কয়েকজন পাকিস্তানে যোগ দিতে চাননি, চেয়েছিলেন স্বাধীন কাশ্মীর। জেল থেকে মুক্ত হওয়ার পর তিনি যখন আবার মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন, আমি ওনাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম - কেন আপনি এটা চাইছেন? এই ধরণের ছোট রাজ্য নিয়ে আপনি কিভাবে চালাবেন? তিনি আমাকে যুক্তি দিয়েছিলেন - আমি স্বাধীন কাশ্মীর পেলে পাকিস্তান, আমেরিকা ও ভারত আমাকে সমর্থন দেবে। যাই হোক শেষ পর্যন্ত তিনি ভারতবর্ষের সাথেই ছিলেন। আমরা কাশ্মীরকে কখনই পাকিস্তানের হাতে তুলে দিতে পারি না। এ বিষয়টা স্পষ্ট। আমরা কাশ্মীরকে স্বাধীন রাষ্ট্রও হতে দিতে পারি না। কিন্তু আমরা সেই অবস্থানে অনড় আছি যা আগেও বলেছি। জম্মু-কাশ্মীরকে পূর্ণ স্বায়ত্বশাসন দেওয়া প্রয়োজন। শুধু জম্মু-কাশ্মীরে স্বায়ত্বশাসন দিলেই হবে না; কাশ্মীরের মধ্যে জম্মু অন্যান্য অংশেও স্বশাসনের ক্ষমতা দিতে হবে। এভাবেই জম্মু-কাশ্মীরের মানুষের, বিশেষত মুসলমানদের বিশ্বাস আমরা ফিরে পেতে পারি। তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে আছেন; এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। একাজ করতে গেলে তাঁদের অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং আরও বেশ কিছু ক্ষেত্রে প্রকৃত নজর দিতে হবে। এই মুহূর্তে শুধু ৩৭০নং ধারা দিয়ে তাঁদের রাজনৈতিকভাবে খুশি করা যাবে না, যেটা অবশ্য বর্তমান সরকার (বাজপেয়ী সরকার) প্রত্যাহার করতে চায়। কিন্তু এই ধারার পাশাপাশি জওহরলাল নেহেরুর আমলে যেসব ক্ষমতা তাঁদের ছিল সেগুলি ফিরিয়ে দেওয়া উচিত। কিছু ক্ষমতা নিয়ে নেওয়া হয়েছে। এখন যদি তারা নিজস্ব সুপ্রিম কোর্ট চান বা অন্য কিছু চান, প্রতিরক্ষা এবং বিদেশ নীতি ছাড়া সবকিছুই তাদের দেওয়া উচিত। কিন্তু আর্থিক সহায়তা বহন করা উচিত ভারত সরকারের। এভাবেই মানুষের আস্থা অর্জন করা সম্ভব।' - (কমিউনিস্ট স্মৃতিকথা, এ.জি.নূরানী)

Thursday, 18 November 2021

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে শ্রমিকশ্রেণীর ভূমিকা - সুকোমল সেন

আলোচ্য বৎসরগুলিতে শ্রমিকশ্রেণীকে মার্কস-লেনিনের বিপ্লবী শিক্ষায় শিক্ষিত করবার জন্য কমিউনিস্টদের নেতৃত্বে শ্রমিক-সংগঠনগুলির প্রচেষ্টা চলেছিল নিরন্তনভাবে। এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা যে মীরাট মামলা সাজিয়ে কমিউনিস্টদের কঠোর সাজা দেওয়ার ব্যবস্থা করে সাম্রাজ্যবাদী সরকার ভারতের শ্রমিকশ্রেণীর মধ্যে কমিউনিস্ট মতাদর্শের প্রভাব সমূলে উৎপাটন করবার যে চেষ্টা করেছিল কারাগারের বাইরে অবস্থিত তরুণ কমিউনিস্টরা তাঁদের একনিষ্ঠ ও সাহসী কর্মতৎপরতার মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ সরকারের সেই উদ্দেশ্যকে সম্পূর্ণ ব্যর্থ করে দেয়। জেলের মধ্য থেকে কমিউনিস্ট মতবাদকে শ্রমিকশ্রেণীর বিপ্লবী দর্শনকে ভারতের নিপীড়িত জনগণের সামনে বলিষ্ঠভাবে তুলে ধরেন। তেমনি কারাগারের বাইরেও বয়সের দিক থেকে অত্যন্ত তরুণ, অনভিজ্ঞ অথচ বিপ্লবী চেতনায় উদ্বুদ্ধ কমিউনিস্টরা শ্রমিকশ্রেণীকে সরাসরি জঙ্গী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে পরিচালিত করে এবং মার্কস-লেনিনের মতাদর্শের বিপ্লবী তাৎপর্যগুলিকে বিশ্লেষণ করে শ্রমিকদের মধ্যে বিপ্লবী শ্রেণী-চেতনা বিকাশে অপরিসীম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। শ্রমিক-কৃষক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত অনেক কমিউনিস্ট কর্মীও এই সময়ে মার্কসীয় দর্শনের প্রতি আকৃষ্ট হন। সন্ত্রাসবাদী কর্মীদের একটা বিরাট অংশ কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান করেন। ১৯৩৫ সালের মে দিবসে আন্দামান জেলে ভগত সিং-এর সহকর্মীগণ ৩১ জন সন্ত্রাসবাদী কর্মী কমিউনিস্ট কো-অর্ডিনেশন গঠন করেন। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠনের নেতৃবৃন্দ মার্কসীয় দর্শন গ্রহণ করেন। ফলে এই সময়ে মার্কসীয় দর্শনের ব্যাপক প্রসার ঘটে। ব্যাপ্তির দিক থেকে আলোচ্য সময়ে বিভিন্ন কারণে শ্রমিক আন্দোলনের যথেষ্ট ঘাটতি থাকলেও শ্রমিকশ্রেণীর শ্রেণী-চেতনার বিকাশে এই সময়ের অবদান বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।