Saturday, 9 March 2024

স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা - তৃতীয় খণ্ড (সমালোচনামূলক লেখা)

১) "আধুনিক বিজ্ঞানের সমুদয় আধুনিকতম আবিষ্ক্রিয়ার সহিত উহাদের সামঞ্জস্য রহিয়াছে; আর যদি কোথাও কিছু অপূর্ণতা থাকে, তাহা আধুনিক বিজ্ঞানের দিকেই।" (পৃষ্ঠা ৮)

মতামত: "প্রায় ১৮ বৎসর পূর্বেকার কথা, আমি তখন প্রথম বিলাত হইতে ফিরিয়াছি। বৈজ্ঞানিক জগতে তখন আমার সামান্য কিছু সুনাম হইছে। ঢাকা শহরনিবাসী (অর্থাৎ আমার স্বদেশবাসী) কোনও লব্ধ প্রতিষ্ঠ উকিল আমি কি বৈজ্ঞানিক কাজ করিয়াছি জানিবার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। আমি প্রথম জীবনের উৎসাহভরে তাহাকে আমার তদানীন্তন গবেষণা সম্বন্ধে (অর্থাৎ, সূর্য ও নক্ষত্রাদির প্রাকৃতিক অবস্থা, যাহা Theory of lonisation of Elements দিয়া সুস্পষ্টরূপে বোঝা যায়) সবিশেষ বর্ণনা দেই। তিনি দুই-এক মিনিট পর পরই বলিয়া উঠিতে লাগিলেন, “এ আর নূতন কি হইল, এ সমস্তই ব্যাদে আছে।” আমি দুইএকবার মৃদু আপত্তি করিবার পর বলিলাম, “মহাশয়, এসব তত্ত্ব বেদের কোন অংশে আছে, অনুগ্রহপূর্বক দেখাইয়া দিবেন কি ? তিনি বলিলেন, “আমি ত কখনও ‘ব্যাদ’ পড়ি নাই, কিন্তু আমার বিশ্বাস, তোমরা নূতন বিজ্ঞানে যাহা করিয়াছ বলিয়া দাবী কর সমস্তই ‘ব্যাদে’ আছে।” অথচ এই ভদ্রলোক বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতম পরীক্ষায় সসম্মানে উত্তীর্ণ হইয়াছিলেন।

বলা বাহুল্য যে, বিগত কুড়ি বৎসরে বেদ, উপনিষদ, পুরাণ ইত্যাদি সমস্ত হিন্দুশাস্ত্র গ্রন্থ এবং হিন্দু জ্যোতিষ ও অপরাপর বিজ্ঞান সম্বন্ধীয় প্রাচীন গ্রন্থাদি তন্ন তন্ন করিয়া খুঁজিয়া আমি কোথাও আবিষ্কার করিতে সক্ষম হই নাই যে, এই সমস্ত প্রাচীন গ্রন্থে বর্তমান বিজ্ঞানের মূলতত্ত্ব নিহিত আছে। সকল প্রাচীন সভ্যদেশের পণ্ডিতগণই বিশ্বজগতে পৃথিবীর স্থান, চন্দ্র, সূর্য, গ্রহাদির গতি, রসায়ন বিদ্যা, প্রাণী বিদ্যা ইত্যাদি সম্বন্ধে নানারূপ কথা বলিয়া গিয়াছেন, কিন্তু তা সত্ত্বেও বাস্তবিক পক্ষে বর্তমান বিজ্ঞান গত তিনশত বৎসরের মধ্যে ইউরোপীয় পণ্ডিতগণের সমবেত গবেষণা, বিচারশক্তি ও অধ্যবসায় প্রসূত। একটা দৃষ্টান্ত দিতেছি, এদেশে অনেকে মনে করেন, ভাস্করাচার্য একাদশ শতাব্দীতে অতি অস্পষ্টভাবে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির উল্লেখ করিয়া গিয়াছেন সুতরাং তিনি নিউটনের সমতুল্য। অর্থাৎ, নিউটন আর নূতন কি করিয়াছে ? কিন্তু এই সমস্ত “অল্পবিদ্যা-ভয়ঙ্করী” শ্রেণীর তার্কিকগণ ভুলিয়া যান যে, ভাস্করাচাৰ্য কোথাও পৃথিবী ও অপরাপর গ্রহসূর্যের চতুর্দিকে বৃত্তাভাস ( elliptical) পথে ভ্রমণ করিতেছে একথা বলেন নাই। তিনি কোথায়ও প্রমাণ করেন নাই যে, মাধ্যাকর্ষণ শক্তি ও গতিবিদ্যার নিয়ম প্রয়োগ করিলে পৃথিবীর ও অপরাপর গ্রহের ভ্রমণ কক্ষ নিরূপণ করা যায়। সুতরাং ভাস্করাচার্য বা কোন  হিন্দু, গ্রীক বা আরবী পণ্ডিত কেপলার-গ্যালিলিও বা নিউটনের বহুপূর্বেই মাধ্যাকর্ষণতত্ত্ব আবিষ্কার করিয়াছেন, এরূপ উক্তি করা পাগলের প্রলাপ বই কিছুই নয়। দুঃখের বিষয়, দেশে এইরূপ অপবিজ্ঞানপ্রচারকের অভাব নাই, তাহারা সত্যের নামে নির্জলা মিথ্যার প্রচার করিতেছেন মাত্র।" (সবই ব্যাদে আছে - লেখক স্বনামধন্য বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা) 

২) "আমরা আধুনিক জ্যোতিষ হইতে জানিতে পারি যে, আমাদের এই পৃথিবী ও সূর্যের সেই অবস্থা-পরিবর্তন চলিয়াছে, শেষে এই কঠিনাকার পৃথিবী গলিয়া গিয়া তরলাকার এবং অবশেষে বাষ্পাকার ধারণ করিবে।" (পৃষ্ঠা ১০)

মতামত: ওপরের বক্তব্য থেকে এটা পরিষ্কার যে স্বামী বিবেকানন্দ জ্যোতির্বিদ্যা আর জ্যোতিষশাস্ত্রের মধ্যে পার্থক্যটা বুঝতেন না। জ্যোতিষশাস্ত্র টলেমির বিতর্কিত ভূকেন্দ্রিক (geocentric) তত্ত্বের ওপর নির্ভরশীল এবং ইহা কখনই বিজ্ঞানসম্মত নয়।

৩) "চক্ষু যদি দেখিত, তবে মানুষের যখন মৃত্যু হয় তখন তো চক্ষু অবিকৃত থাকে, তবে তখনও তাহারা দেখিতে পাইত।" (পৃষ্ঠা ১২)

মতামত: মানুষের মৃত্যুর পর ৪ - ৬ ঘণ্টা পর্যন্ত জীবিত থাকে কর্নিয়ার এন্ডোথেলিয়াম কোষগুলি। ফলে ওই সময়ের মধ্যে তা পুনরুদ্ধার করা গেলে তা সহজেই প্রতিস্থাপন করা সম্ভব। যদিও আমাদের দেশে এই পদ্ধতি ১৯৪৮ সালে শুরু হয়েছিল (স্বামীজীর এই বক্তব্যের অনেক পরে) কিন্তু স্বামীজীর সব ইন্দ্রিয়ের পিছনে অবস্থিত নির্গুণ ব্রহ্মের বুজরুকিগুলো এবার বন্ধ হোক।

https://www.dragarwal.com/blog/general-ophthalmology/eye-donation-facts-and-myths/

৪) "কপিল-দর্শনই পৃথিবীতে যুক্তি-বিচার দ্বারা জগত্তত্ত্ব-ব্যাখ্যার সর্বপ্রথম চেষ্টা। কপিলের প্রতি উপযুক্ত সম্মান প্রদর্শন করা জগতের সকল দার্শনিকেরই উচিত। আমি আপনাদের মনে এইটি বিশেষ করিয়া মুদ্রিত করিয়া দিতে চাই যে, দর্শনশাস্ত্রের জনক বলিয়া আমরা তাঁহার উপদেশ শুনিতে বাধ্য এবং তিনি যাহা বলিয়া গিয়াছেন, তাহা শ্রদ্ধা করা আমাদের কর্তব্য। এমন কি, বেদেও এই অদ্ভুত ব্যক্তির—এই সর্বপ্রাচীন দার্শনিকের উল্লেখ পাওয়া যায়। তাঁহার অনুভূতিসমুদয় কি অপূর্ব! যদি যোগিগণের অতীন্দ্রিয় প্রত্যক্ষশক্তির কোন প্রমাণ প্রয়োগ আবশ্যক হয়, তবে বলিতে হয়, এইরূপ ব্যক্তিগণই তাঁহার প্রমাণ।" (পৃষ্ঠা ১৯)

আবার একটু পরে স্বামীজী নিজেই বলেছেন, "এ কী কুসংস্কার! আর ইহারই ফলে মানুষ তাহার দেব-স্বভাব হইতে পশু-স্বভাবে অবনত হইতেছে। যদি আমাদিগকে সবকিছু অন্ধভাবেই বিশ্বাস করিতে হয়, তবে বিচারবুদ্ধি আমরা লাভ করিয়াছি কেন? যুক্তিবিরোধী কোন কিছু বিশ্বাস করা কি মহাপাপ নয়? ঈশ্বর যে উৎকৃষ্ট সম্পদটি আমাদিগকে দান করিয়াছেন, তাহা যথাযথ-ভাবে ব্যবহার না করিবার কী অধিকার আমাদের আছে? আমার নিশ্চিত বিশ্বাস এই যে, ঈশ্বরদত্ত শক্তির ব্যবহারে অক্ষম অন্ধবিশ্বাসী অপেক্ষা যুক্তিবাদী অবিশ্বাসীকে ভগবান্ সহজে ক্ষমা করিবেন। অন্ধবিশ্বাসী শুধু নিজের প্রকৃতিকে অবনমিত করে এবং পশুস্তরে অধঃপাতিত হয়—বুদ্ধিনাশের ফলে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। যুক্তিবিচারের আশ্রয় আমরা অবশ্য গ্রহণ করিব এবং সকল দেশের প্রাচীন শাস্ত্রে বর্ণিত এই-সকল ঈশ্বরের দূত বা মহাপুরুষের কাহিনীকে যখন যুক্তিসম্মত বলিয়া প্রমাণ করিতে পারিব, তখন আমরা তাঁহাদিগকে বিশ্বাস করিব।" (পৃষ্ঠা ২০৮)

একদিকে স্বামী বিবেকানন্দ নিজেই ফতেয়া জারি করছেন আবার অন্যদিকে বলছেন যুক্তিবিরোধী কোনোকিছু গ্রহণ না করতে - কোনটাকে অভ্রান্ত হিসেবে ধরবো, সেটাই তো বোধগম্য হল না।

৫) "যে-ব্যক্তি বলে, জগৎ রহিয়াছে, কিন্তু ঈশ্বর নাই, সে নির্বোধ; কারণ যদি জগৎ থাকে, তবে জগতের একটা কারণও থাকিবে, আর সেই কারণের নামই ঈশ্বর। কার্য থাকিলেই তাহার কারণ আছে, অবশ্য জানিতে হইবে। যখন জগৎ অন্তর্হিত হইবে, তখনই ঈশ্বরও অন্তর্হিত হইবেন।" (পৃষ্ঠা ৭২)

মতামত: ধর্ম ব্যবসায়ীরা ইচ্ছাকৃতভাবে জগৎ নির্মাণের মধ্যে "কারণ"টাকে ঢোকাতে চান যাতে এর মধ্যে তাঁদের নির্গুণ ব্রহ্মের তত্ত্বটাকে জোরজবরদস্তি ঢুকিয়ে দিতে পারেন। 

https://www.shongshoy.com/%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%97-%e0%a6%ac%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%82-%e0%a6%a5%e0%a7%87%e0%a6%95%e0%a7%87-%e0%a6%ae%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%b6%e0%a7%8d%e0%a6%ac/

৬) "ধর্ম হইতে আমরা যে-সকল তথ্য ও তত্ত্ব শিক্ষা করিতে পারি, যে-সান্ত্বনা পাইতে পারি, তাহা ছাড়িয়া দিলেও ধর্ম অন্যতম বিজ্ঞান অথবা গবেষণার বস্তু হিসাবে মানব-মনের শ্রেষ্ঠ ও সর্বাধিক কল্যাণকর অনুশীলনের বিষয়।" (পৃষ্ঠা ৯১)

মতামত: স্বামীজীর আরেকটি ভ্রান্ত বিশ্বাস। ফিনল্যাণ্ডে প্রায় ২০%-এর ওপর মানুষ কোনো ধর্মে বিশ্বাস করেন না অথচ বিশ্বের সবচেয়ে সুখী দেশের তালিকায় টানা ছয় বছর ধরে শীর্ষে রয়েছে ফিনল্যাণ্ড। 

https://wisevoter.com/country-rankings/least-religious-countries/
https://worldpopulationreview.com/country-rankings/happiest-countries-in-the-world

৭) "মানুষের ইতিহাসে ‘যুক্তি-দেবতার উপাসনা’ ফরাসী-বিপ্লবের সময়েই প্রথম আত্মপ্রকাশ করে নাই; এই জাতীয় ঘটনা পূর্বেও ঘটিয়াছিল, ফরাসী-বিপ্লবের সময় উহার পুনরভিনয় মাত্র হইয়াছে। কিন্তু বর্তমান যুগে উহা অতিমাত্রায় বাড়িয়া উঠিয়াছে। জড়বিজ্ঞানগুলি এখন পূর্বাপেক্ষা আরও ভালভাবে প্রস্তুত হইয়াছে; আর ধর্মের প্রস্তুতি সে-তুলনায় কমিয়া গিয়াছে, ভিত্তিগুলি শিথিল হইয়া গিয়াছে। আর আধুনিক মানুষ প্রকাশ্যে যাহাই বলুক না কেন, তাহার অন্তরের গোপন প্রদেশে এ-বোধ জাগ্রত যে, সে আর ‘বিশ্বাস’ করিতে পারে না। আধুনিক যুগের মানুষ জানে যে, পুরোহিত-সম্প্রদায় তাহাকে বিশ্বাস করিতে বলিতেছে বলিয়াই, কোন শাস্ত্রে লেখা আছে বলিয়াই, কিংবা তাহার স্বজনেরা চাহিতেছে বলিয়াই কিছু বিশ্বাস করা তাহার পক্ষে অসম্ভব। অবশ্য এমন কিছু লোক আছে, যাহারা তথাকথিত জনপ্রিয় বিশ্বাসকে মানিয়া লইতে প্রস্তুত বলিয়া মনে হয়। কিন্তু এ-কথাও আমরা নিশ্চয় জানি যে, তাহারা বিষয়টি সম্বন্ধে চিন্তা করে না। তাহাদের বিশ্বাসের ভাবটিকে ‘চিন্তাহীন অনবধানতা’ আখ্যা দেওয়া চলে। এই সংগ্রাম এভাবে আর বেশীদিন চলিতে পারে না; চলিলে ধর্মের সব সৌধই ভাঙিয়া চুরমার হইয়া যাইবে।" (পৃষ্ঠা ৯৫)

"আমরা সকলেই বাল্যকাল হইতে প্রেম, শান্তি, মৈত্রী, সাম্য, সর্বজনীন ভ্রাতৃভাব প্রভৃতি অনেক কথাই শুনিয়া আসিতেছি। কিন্তু সেগুলি আমাদের কাছে কতকগুলি নিরর্থক শব্দমাত্রে পরিণত হইয়াছে। আমরা সেগুলি তোতাপাখীর মত আওড়াইয়া থাকি এবং উহাই আমাদের স্বভাব হইয়া দাঁড়াইয়াছে। আমরা ঐরূপ না করিয়া পারি না। যে-সকল মহাপুরুষ প্রথমে তাঁহাদের হৃদয়ে এই মহান্ তত্ত্বগুলি উপলব্ধি করিয়াছিলেন, তাঁহারাই এই শব্দগুলি সৃষ্টি করেন। তখন অনেকেই এগুলির অর্থ বুঝিত। পরে অজ্ঞ লোকেরা এই শব্দগুলি লইয়া ছেলেখেলা করিতে থাকে, অবশেষে ধর্ম জিনিষটাকে কেবলমাত্র কথার মারপ্যাঁচে দাঁড় করান হইয়াছে—উহা যে জীবনে পরিণত করিবার জিনিষ, তাহা তাহারা ভুলিয়া গিয়াছে। ইহা এখন ‘পৈত্রিক ধর্ম’, ‘জাতীয় ধর্ম’, ‘দেশীয় ধর্ম’ ইত্যাদিতে পরিণত হইয়াছে। শেষে কোন ধর্মাবলম্বী হওয়াটা স্বদেশপ্রেমের একটা অঙ্গ হইয়া দাঁড়াইয়াছে, আর স্বদেশপ্রেম সর্বদাই একদেশী।" (পৃষ্ঠা ১০৯)

মতামত: অনেকেই স্বামী বিবেকানন্দের মধ্যে সমাজতান্ত্রিক সত্ত্বা খুঁজে বেড়ান কিন্তু ওপরের বক্তব্যগুলি থেকে আমরা বুঝতে পারি যে উনি সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমজীবী মানুষের অধিকারের প্রশ্নে পুরোনো সামন্ততান্ত্রিক শোষণভিত্তিক সমাজ কাঠামোর হয়েই তাঁবেদারি করছেন আর ধর্মের ঠিকাদারেরা বিভিন্নভাবে শ্রমজীবী মানুষদের ধর্মের বিধি, নির্দেশের দোহাই দিয়ে এই সামন্ততন্ত্রের কাঠামোকে টিকিয়ে রাখতে চিরকালই এক অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। এর একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ স্বামীজী নিজে; নিচের বক্তব্যগুলো একটু দেখে নেওয়া যাক -

"বর্তমানে যন্ত্র ও অন্যান্য সরঞ্জাম-নির্মাণ দ্বারা অসাধারণ শক্তি সঞ্চিত হইতেছে এবং এমন সব অধিকার দাবী করা হইতেছে, যাহা পৃথিবীর ইতিহাসে পূর্বে কখনও করা হয় নাই। এই কারণেই বেদান্ত এই অধিকারবাদের বিরুদ্ধে প্রচার করিতে চায়, মানবাত্মার উপর এই উৎপীড়ন চূর্ণ-বিচূর্ণ করিতে চায়।" (পৃষ্ঠা ২৫২)

"বেদান্ত বলেন, আমাদিগকে অধিকারের ভাব ছাড়িয়া দিতে হইবে; ইহা ছাড়িলেই ধর্ম আসিবে। তৎপূর্বে কোন ধর্ম আসে না।" (পৃষ্ঠা ২৫৪)

এরকম আরো উদ্ধৃতি আছে।

৮) "তবু একমাত্র যুক্তিই এই মানব-প্রকৃতির সহিত সরাসরি সংযুক্ত; সেজন্য যতক্ষণ তাহা মানব-প্রকৃতির অনুগামী হয়, ততক্ষণ যুক্তিরই আশ্রয় লওয়া উচিত।" (পৃষ্ঠা ৯৭)

মতামত: স্বামীজীর বহু বক্তব্য এমনই দ্বিচারিতায় পরিপূর্ণ। একটু পরে আবার নিজেই বলেছেন, "বাগাড়ম্বর নয়, তত্ত্বালোচনা নয়, যুক্তিতর্ক নয়, চাই অনুভূতি। ইহাকেই আমি বলি—বাস্তব জীবনে পরিণত ধর্ম।" (পৃষ্ঠা ১৯৬)

বক্তব্য দুটি সম্পূর্ণ পরস্পর বিরোধী।

৯) "আমার মনে হয়, আধুনিক বিজ্ঞান বার বার যাহা প্রমাণ করিয়া চলিয়াছে, তাহা এইঃ আমরা এক; মানসিক, শারীরিক, আধ্যাত্মিক—সব দিক্ দিয়াই আমরা এক। শরীরের দিক্‌ হইতে আমরা পৃথক্‌, এ-কথাও বলা ভুল।" (পৃষ্ঠা ১০০)

স্বামীজীর বহু বক্তব্য এমনই দ্বিচারিতায় পরিপূর্ণ। একটু পরে আবার নিজেই বলেছেন, "আমাদের বুদ্ধিবৃত্তি, আমাদের শক্তি, আমাদের শরীর কি সব সমান? এক ব্যক্তি অপর ব্যক্তি অপেক্ষা বলশালী, একজনের বুদ্ধিবৃত্তি অপরের চেয়ে বেশী। যদি আমরা সকলেই সমান হই, তবে এই অসামঞ্জস্য কেন? কে ইহা করিল? আমরা নিজেরা। আমাদের পরস্পরের মধ্যে ক্ষমতার তারতম্য, বিদ্যাবুদ্ধির তারতম্য এবং শারীরিক বলের তারতম্য আছে বলিয়া আমাদের পরস্পরের মধ্যে নিশ্চয়ই পার্থক্য হইতে বাধ্য।" (পৃষ্ঠা ১১৩)

বক্তব্য দুটি সম্পূর্ণ পরস্পর বিরোধী।

১০) "যদি কলেজ হইতে পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপকগণ আসেন, তাঁহারা যুক্তিবিচার পছন্দ করিবেন। তাঁহারা যত পারেন বিচার করুন। শেষে তাঁহারা এমন একস্থানে পৌঁছিবেন, যেখানে তাঁহাদের মনে হইবে যে, যুক্তিবিচারের ধারা অক্ষুণ্ণ রাখিয়া তাঁহারা আর অগ্রসর হইতে পারেন না। তাঁহারা বলিয়া বসিবেন, ‘ঈশ্বর, মুক্তি প্রভৃতি ভাবগুলি কুসংস্কার মাত্র—উহাদিগকে ছাড়িয়া দাও।’ আমি বলি, ‘হে দার্শনিক প্রবর, তোমার এই পাঞ্চভৌতিক দেহ যে আরও বড় কুসংস্কার, এটিকে পরিত্যাগ কর। আহার করিবার জন্য আর গৃহে বা অধ্যাপনার জন্য তোমার দর্শনবিজ্ঞানের ক্লাসে যাইও না। শরীর ছাড়িয়া দাও এবং যদি না পার, জীবনভিক্ষা চাহিয়া চুপ করিয়া বস।’" (পৃষ্ঠা ১১৮)

আবার স্বামীজী নিজেই বলেছেন, "আমাদের দেশে যিনি বেদপাঠ করেন, তাঁহার সম্মুখে আমরা নতজানু হই। আর যে ব্যক্তি পদার্থবিদ্যা অধ্যয়ন করিতেছে, তাহাকে আমরা গ্রাহ্যের মধ্যে আনি না। এটা কুসংস্কার—মোটেই বেদান্ত মত নয়—এও জঘন্য জড়বাদ। ঈশ্বরের নিকট সকল জ্ঞানই পবিত্র; জ্ঞানই ঈশ্বর।" (পৃষ্ঠা ২৮৭)

বক্তব্য দুটি সম্পূর্ণ পরস্পর বিরোধী।

১১) "ধর্ম অনুভূতির বস্তু—উহা মুখের কথা বা মতবাদ বা যুক্তিমূলক কল্পনা মাত্র নয়—তাহা যতই সুন্দর হউক না কেন। ধর্ম—জীবনে পরিণত করিবার বস্তু, শুনিবার বা মানিয়া লইবার জিনিষ নয়; সমস্ত মনপ্রাণ বিশ্বাসের বস্তুর সহিত এক হইয়া যাইবে। ইহাই ধর্ম।" (পৃষ্ঠা ১২৬)

মতামত: স্বামীজী বোঝাতে চেয়েছেন কোনো ব্যক্তি যেন বেদান্ত, আত্মা বা নির্গুণ ব্রহ্মের বাস্তব অস্তিত্বের উপর প্রশ্ন না করে; আর প্রশ্ন করলে সে উত্তরটা পাবে উপরের বক্তব্যের মতো - কারণ সব প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মই পুরোপুরি বিশ্বাসের ওপর স্থাপিত, এগুলোর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

প্রতিটি ছত্রে ছত্রে স্বামীজী যতই এই বিজ্ঞান অমুক বলেছে, সেই বিজ্ঞান তমুক বলেছে বলে দিস্তা দিস্তা কু-যুক্তি তুলে ধরুন না কেন, "ব্রহ্ম"-এর বাস্তব অস্তিত্বের প্রমাণের দায়িত্ব উনি নিতে চান না। 

১২) "‘যোগ্যতম ব্যক্তি বা বস্তুই বাঁচিয়া থাকিবে’—আধুনিক বৈজ্ঞানিকগণের এই মত যদি সত্য হয়, তাহা হইলে এই-সকল ধর্ম যে এখনও বাঁচিয়া রহিয়াছে, ইহা হইতেই প্রমাণিত হয় যে, এখনও তাহারা কতকগুলি লোকের পক্ষে উপযোগী; তাহারা যে কেন বাঁচিয়া থাকিবে, তাহার কারণ আছে—তাহারা বহু লোকের উপকার করিতেছে।" (পৃষ্ঠা ১২৯)

মতামত: যুক্তিবাদের ভাষায় স্বামীজীর এই বক্তব্য জনপ্রিয়তার কুযুক্তি বা ফ্যালাসি (Argument from popularity/ Argumentum ad populum)।

https://www.shongshoy.com/%e0%a6%95%e0%a7%81%e0%a6%af%e0%a7%81%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%a4%e0%a6%bf-%e0%a6%ac%e0%a6%be-%e0%a6%ab%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%b8%e0%a6%bf/

১৩) "আর যদি আপনার ঈশ্বরের অস্তিত্ব সম্বন্ধে সন্দেহ থাকে, তবে তাঁহাকে দেখিবার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করুন না কেন? কেন আপনি সংসার ত্যাগ করিয়া এই এক উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য সমস্ত জীবন অতিবাহিত করেন না?" (পৃষ্ঠা ১৩৮)

"যেখানে ঈশ্বর আছেন, সেখানে আর কিছু নাই। যেখানে সাংসারিকতা আছে, সেখানে ঈশ্বর নাই।" (পৃষ্ঠা ১৯৪)

মতামত: স্বামীজীর বহু বক্তব্য এমনই দ্বিচারিতায় পরিপূর্ণ। প্রথম খণ্ডে উনি নিজেই বলেছিলেন, "সংসারী অপেক্ষা সংসারত্যাগী মহত্তর, এ-কথা বলা বৃথা। সংসার হইতে স্বতন্ত্র থাকিয়া স্বাধীন সহজ জীবনযাপন অপেক্ষা সংসারে থাকিয়া ঈশ্বরের উপাসনা করা অনেক কঠিন কাজ।" (পৃষ্ঠা ৪৯) 

বক্তব্য দুটি সম্পূর্ণ পরস্পর বিরোধী।

১৪) "মনে রাখিতে হইবে, মানুষ তাহার নিজ কর্মদোষে তাহার শুদ্ধ ভাব হারাইয়াছে। আমরা যে কষ্ট পাই, তাহা আমাদের নিজেদের কর্মফলে। ইহার জন্য ভগবান্ দোষী নন। এই সব ধারণার সহিত পুনর্জন্মবাদের সম্বন্ধ অচ্ছেদ্য। পাশ্চাত্যগণের হস্তে অঙ্গহানি হওয়ার পূর্বে এই মতবাদটি সর্বজনীন ছিল।" (পৃষ্ঠা ১৪৩)

"আমাদের জন্মান্তরবাদের দার্শনিক ভিত্তি এইরূপ। আমরা পূর্বজন্মের অভিজ্ঞতা লইয়া বর্তমান জীবনে প্রবেশ করিয়াছি এবং আমাদের বর্তমান জন্মের সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য সেই পূর্বজন্মের কর্মের ফল; তবে উত্তরোত্তর আমাদের উন্নতিই হইতেছে এবং অবশেষে একদিন আমরা পূর্ণত্ব লাভ করিব।" (পৃষ্ঠা ১৬৫)

"উৎপীড়কদের তুলনায় উৎপীড়িতদের জীবনে বেশী আশা আছে। উৎপীড়কদের পক্ষে মুক্তিলাভ করিতে অনেক বেশী সময় লাগিবে, অন্যের পক্ষে সময় লাগিবে কম।" (পৃষ্ঠা ২৫৪)

মতামত: বেদান্তবাদী স্বামী বিবেকানন্দ "প্রকৃতপক্ষে কেহই জন্মায় না বা মরে না; স্বর্গও নাই, নরকও নাই অথবা ইহলোকও নাই" (পৃষ্ঠা ৫১) বা "মানুষ জন্মায় না বা মরে না বা স্বর্গেও যায় না এবং আত্মার পক্ষে পুনর্জন্ম একটা নিছক কাহিনী মাত্র" (পৃষ্ঠা ২৩৩) মার্কা তত্ত্ব কথা আওড়ানোর পরে পরিশেষে তিনিও সেই জন্মান্তরবাদ আর কর্মফলেরই পক্ষ নিলেন; সাধারণ মানুষের মনে এই কুসংস্কারের বীজ বপন করতে না পারলে যে ধর্ম ব্যবসা লাটে উঠবে!

১৫) "কেনই বা লক্ষ লক্ষ লোক পদদলিত হয়? দুর্ভিক্ষ-সৃষ্টির জন্য যাহারা দায়ী নয়, তাহারা কেন অনাহারে মরে? ইহার জন্য দায়ী কে? ইহাতে মানুষের কোন হাত না থাকিলে ভগবানকেই নিশ্চিতরূপে দায়ী করিতে হয়। সুতরাং ইহার উৎকৃষ্টতর ব্যাখ্যা এই যে, কাহারও ভাগ্যে যে-সকল দুঃখভোগ হয়, তাহার জন্য সে-ই দায়ী। কোন চক্রকে যদি আমি গতিশীল করি, তাহার ফলের জন্য আমিই দায়ী এবং আমি যখন আমার দুঃখ উৎপন্ন করিতে পারি, তখন তাহার নিবৃত্তিও আমিই করিতে পারি।" (পৃষ্ঠা ১৪৩)

মতামত: স্বামীজীর এই ধরণের বহু বক্তব্যই তাঁর সামন্ততান্ত্রিক প্রভুদের খুশি করবার স্বার্থে, যাতে ধর্মের দোহাই দিয়ে শোষণভিত্তিক সমাজ কাঠামোটা ধরে রাখা যায়। 

যদি ওঁর এই বক্তব্য যথার্থ হয় সেক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তির হত্যা করা হলে, সেই ব্যক্তিই দায়ী, হত্যাকারী নয়।

১৬) "আমরা কি ঈশ্বরকে দর্শন করিতে পারি? অবশ্যই পারি না। আমরা কি ঈশ্বরকে জানিতে পারি? নিশ্চয়ই নয়। ঈশ্বর যদি জ্ঞাতই হন, তাহা হইলে তিনি আর ঈশ্বরই থাকিবেন না। জানা মানেই সীমাবদ্ধ করা। কিন্তু ‘আমি ও আমার পিতা এক।’ আত্মাতেই আমি আমার বাস্তব পরিচয় পাই।" (পৃষ্ঠা ১৪৬)

মতামত: স্বামীজীর বহু বক্তব্য এমনই দ্বিচারিতায় পরিপূর্ণ। একটু পরে আবার নিজেই বলেছেন, "আর একটি কথা আপনাদিগকে জানাইতে চাই—ধর্ম-অর্থে কোন মন-গড়া মত বা সিদ্ধান্ত নয়। আপনারা কি অধ্যয়ন করেন অথবা কি মতবাদ বিশ্বাস করেন, তাহাই প্রধান বিচার্য বিষয় নয়, বরং আপনি কি উপলব্ধি করেন, তাহাই জ্ঞাতব্য। ‘পবিত্রাত্মারাই ধন্য, কারণ তাঁহাদের ঈশ্বর-দর্শন হইবে।’—ঠিক কথা, এই জীবনেই দর্শন হইবে; আর ইহাই তো মুক্তি।" (পৃষ্ঠা ১৪৭)

১৭) "ভারতবর্ষই একমাত্র দেশ, যেখানে ধর্মের জন্য কখনই কাহারও উপর নির্যাতন হয় নাই, যেখানে কোন ব্যক্তি কখনও তাহার ধর্মবিশ্বাসের জন্য উত্যক্ত হয় নাই; সেখানে আস্তিক, নাস্তিক, অদ্বৈতবাদী, দ্বৈতবাদী এবং একেশ্বরবাদী সকলেই আছেন এবং কখনও নির্যাতিত না হইয়া বসবাস করিতেছেন।" (পৃষ্ঠা ১৫৪)

"ইহা যথার্থ গৌরবের বিষয় যে, ভারতবর্ষ এমন একটি দেশ, যেখানে কখনও ধর্মের জন্য উৎপীড়ন হয় নাই, যেখানে ধর্ম বিষয়ে মানুষকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়।" (পৃষ্ঠা ২৫১)

মতামত: সর্বৈব মিথ্যা কথা। ভারতবর্ষে সতীদাহ থেকে শুরু করে বাল্যবিবাহ, কুলিন ব্রাহ্মণদের একাধিক স্ত্রী থেকে দেবদাসী বা মহিলাদের ওপর বৈধব্যজনিত বর্বর, অমানবিক শৃঙ্খলার বেড়া হিন্দুদের মধ্যেই প্রচলিত ছিল। 

রামায়ণে মর্যাদাপুরুষোত্তম রাজা রাম বেদ অধ্যয়ন করার অপরাধে এক নিচু জাতের বালক, শম্বুককে হত্যা করেন। দক্ষিণ ভারতে শিব ও বিষ্ণু ভক্তদের মধ্যেও প্রচুর দ্বন্দ্ব বিদ্যমান ছিল। 

https://www.deccanchronicle.com/nation/in-other-news/170416/where-shiva-vishnu-bhakts-clashed.html

১৮) "ফরাসীদেশে দীর্ঘকাল ধরে জাতির মূলমন্ত্র ছিল ‘মানুষের অধিকার’, আমেরিকায় এখনও ‘নারীর অধিকার’ জনসাধারণের কানে আবেদন জানায়; ভারতবর্ষে কিন্তু আমাদের মাথাব্যথা ঈশ্বরের বিভিন্নভাবে প্রকাশের অধিকার নিয়ে।" (পৃষ্ঠা ১৭২)

মতামত: দেশ যখন পরাধীন তখন ওপরের উক্তিটি স্বামী বিবেকানন্দের সামন্ততান্ত্রিক প্রভুদের প্রতি আনুগত্যেরই সাক্ষ্য দেয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, নারী স্বাধীনতা এইসব শব্দ মুখে আনলে তাঁর সামন্তপ্রভুরা ক্ষুব্ধ হতেন বৈকি। এরপরেও কিছু উদারপন্থী বামপন্থীদের কাছে স্বামীজী নাকি সমাজতান্ত্রিক! 

১৯) "হিন্দুদের স্বাতন্ত্র্য এই যে, ধর্মের মধ্যে তারা কোন মতবাদ বা নিয়মাদি আনেনি। তাদের ধর্মের তাই সর্বোচ্চ বিকাশ হয়েছে। এই ধর্মের ক্ষেত্রেই আমরা সবচেয়ে বাস্তবদৃষ্টিসম্পন্ন—আর তোমরা সেখানেই সবচেয়ে বাস্তবদৃষ্টিহীন।" (পৃষ্ঠা ১৭৫)

মতামত: সর্বৈব মিথ্যা কথা। সতীদাহ থেকে শুরু করে বাল্যবিবাহ, কুলিন ব্রাহ্মণদের একাধিক স্ত্রী থেকে দেবদাসী বা বিধবা মহিলাদের পুনরায় বিবাহের অন্তরায় পরিস্থিতি হিন্দুরা ধর্মকে ব্যবহার করেই সৃষ্টি করেছিল।

২০) "প্রকৃতপক্ষে ধর্ম ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ইহলোকের বস্তু নয়; ইহা অতীন্দ্রিয় স্তরের বস্তু। ইহা যুক্তি-বিচারের অতীত, ইহা বুদ্ধিগ্রাহ্য স্তরের অন্তর্ভুক্ত নয়। ইহা এমন একটি প্রত্যক্ষ দর্শন, এমন একটি দৈব-প্রেরণা, অজ্ঞাত ও অজ্ঞেয়ের মধ্যে এমন এক আত্ম-নিমজ্জন যাহার ফলে অজ্ঞেয়কে জ্ঞাত অপেক্ষাও নিবিড়ভাবে জানা যায়; কারণ লৌকিক অর্থে ইহার জ্ঞান সম্ভব নয়।" (পৃষ্ঠা ১৭৬)

মতামত: ভক্তদের যে কোনো উপায়ে যুক্তি, বুদ্ধির পথ থেকে সরিয়ে নির্গুণ ব্রহ্মের খোঁজ নিয়ে ব্যস্ত রাখতে সর্বদা সচেষ্ট স্বয়ং স্বামী বিবেকানন্দ।

২১) "সমগ্র জগতে যে সকল অবতারপুরুষ ও সাধক জন্মগ্রহণ করিয়াছেন, তাঁহাদের কথা স্মরণ করুন; ইহা সর্বজনবিদিত যে, তাঁহাদের জীবনে এমন সব মুহূর্ত আসিয়াছে, যখন আপাতদৃষ্টিতে তাঁহাদিগকে বাহ্যজগৎ সম্পর্কে অচেতন বলিয়া মনে হয়; অতঃপর তাঁহাদের ভিতর হইতে যে জ্ঞানরাশি উৎসারিত হয়, সে সম্বন্ধে তাঁহারা বলেন, উহা তাঁহারা অতিচেতন স্তর হইতে পাইয়াছেন।" (পৃষ্ঠা ১৮৫)

মতামত: এইসব অতিচেতন স্তরের কোনো একটি সাক্ষ্য প্রমাণ আমরা তাঁদের বা তাঁদের ভক্তকুলের বাইরে থেকে পাই না।      

২২) "একটি কথা আপনাদের জানা উচিত, যে-কোন ঘটনাই সম্ভবপর হইতে পারে; এবং ইহাও সম্ভব হইতে পারে যে, লুব্ধক নক্ষত্রের সংস্পর্শে আসিয়া পৃথিবী আগামী বৎসরে বিদীর্ণ হইয়া যাইবে। আমি যদি এইরূপ সম্ভাবনা উপস্থাপিত করি, তবে আপনাদেরও অধিকার আছে যে, আপনারা আমাকে ইহা প্রমাণ করিতে বলিবেন। আইনজ্ঞেরা যাহাকে বলেন, ‘প্রমাণ করার দায়িত্ব’, সে দায়িত্ব তাহার উপরই বর্তাইবে, যে ঐ জাতীয় মতবাদ উপস্থিত করিবে।" (পৃষ্ঠা ১৮৭)

মতামত: আইন ও যুক্তিবাদের দৃষ্টিতে বাস্তব কথা; কিন্তু প্রশ্ন একটাই - স্বামী বিবেকানন্দ নিজে "ধর্ম"কে বিজ্ঞান বলে চালিয়ে দেওয়ার আগে তাঁর বক্তব্যের সপক্ষে কোনো প্রমাণ, সাক্ষ্য বা দলিলের ধার ধারলেন না কেন?

২৩) "যে বৎসরগুলি—যে শত শত বৎসর ধরিয়া আমি শুধু এই ইন্দ্রিয়ভোগে পরিতৃপ্ত মানুষ হইবার জন্য কঠোর সাধনা করিয়াছি, (ঐ দৃষ্টিতে) তাহা বৃথাই গিয়াছে!" (পৃষ্ঠা ১৯০)

মতামত: আবার সেই এক দ্বিচারিতা। দ্বিতীয় খণ্ডে স্বামীজী নিজেই বলেছেন, "এ বিষয়ে আমি নিশ্চয় করিয়া বলিতে পারি যে, আমার জীবনের ভাল-মন্দ কোন ভাবই বৃথা যায় নাই—আমি সেই অতীত শুভাশুভ উভয়বিধ কর্মেরই সমষ্টি-স্বরূপ। আমি জীবনে অনেক ভুল করিয়াছি, কিন্তু ঐগুলির একটিও যদি বাদ পড়িত, তাহা হইলে আমি আজ যাহা হইয়াছি, তাহা হইতাম না। আমার জীবনে আমি বেশ সন্তুষ্ট।" (পৃষ্ঠা ২১৯) 

দুটি বক্তব্য সম্পূর্ণ পরস্পর বিরোধী।

২৪) "তুমি দুই সহস্র আরোগ্য-নিকেতন নির্মাণ করিয়া থাকিবে, কিন্তু তাহাতে কি আসে যায়, যদি না তুমি আত্মানুভূতি লাভ করিয়া থাক? তুমি মরিবে সামান্য কুকুরেরই মত কুকুরের অনুভূতি লইয়া।" (পৃষ্ঠা ১৯৫)

মতামত: পুনঃপুন সেই এক দ্বিচারিতা। একটু পরে আবার স্বামীজী নিজেই বলেছেন, "লাভের বাসনা না রাখিয়া ঐ ধরনের কর্ম অনুষ্ঠান করিলে আত্মার মঙ্গল সাধিত হয় এবং এরূপ ব্যক্তিদেরই স্বর্গরাজ্য লাভ হয়।" (পৃষ্ঠা ১৯৬)

আত্মানুভূতি লাভ করার ইচ্ছাও তো একরকমের বাসনা। দুটি বক্তব্য সম্পূর্ণ পরস্পর বিরোধী।

২৫) "প্রকৃত ধর্ম—কোন মানুষের নিকট হইতে শিক্ষাদ্বারা প্রাপ্য নয়, পুস্তকপাঠের দ্বারাও লভ্য নয়; প্রকৃত ধর্ম হইল অন্তরাত্মার জাগরণ" (পৃষ্ঠা ২১৪)

মতামত: অথচ একটু আগে স্বামীজী নিজেই বললেন, "আধুনিক যুক্তির সম্মুখে যদি কোন ধর্মীয় মতবাদ দাঁড়াইতে পারে, তবে তাহা হইলে একমাত্র অদ্বৈতবাদ" (পৃষ্ঠা ১০২)

আবার অন্য স্থানে উনি নিজেই বলেছেন, "প্রকৃত ধর্মে—অন্ধবিশ্বাসবশতঃ কোন কিছু বিশ্বাস করা বা মানিয়া লওয়ার স্থান নাই। কোন ধর্মপ্রচারক মহাত্মা এরূপ প্রচার করেন নাই। অধঃপতনের সময়ে ইহা আসিয়া জোটে।" (পৃষ্ঠা ১৮৮)

কিন্তু ওপরের বক্তব্যে তো স্বামীজী স্বয়ং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সরাসরি বিরোধিতা করছেন, বিজ্ঞান-নির্ভর শিক্ষা ছাড়া তো যুক্তিবোধ গড়ে ওঠার বিকল্প রাস্তা নাই আবার অন্ধবিশ্বাস তো অশিক্ষারই নামান্তর মাত্র। বাস্তবে এটাও ওঁর আরেকটি দ্বিচারিতা মাত্র।  

আসলে প্রশ্ন করা ধর্ম জগতের সবথেকে বড় পাপ। "ব্রহ্ম সত্য" এটা মেনে নিয়ে প্রশ্ন চলতে পারে। যেমন ব্রহ্ম সাকার না নিরাকার, উনি নকুল দানায় সন্তুষ্ট নাকি কাজু বরফিতে, বেলপাতায় সন্তুষ্ট নাকি ১০ ভরি সোনার হারে। এরকম গুরুগম্ভীর প্রশ্ন চলতেই পারে কিন্তু ব্রহ্মকে মেনে নিয়েই। কিন্তু পড়াশোনা শিখলে বিচার, বুদ্ধি, যুক্তিবোধ তৈরী হলে প্রশ্ন আসবেই তাই এইসব ধর্মব্যবসায়ীদের বিধান আগে ব্রহ্ম লাভ তারপর সবকিছু। 

(আগ্রহী পাঠকেরা শ্রী সুনিত দে মহাশয়ের লেখা "শ্রীরামকৃষ্ণ কিছু অজানা প্রসঙ্গ" পড়ে দেখতে পারেন)।

২৬) "কাজেই পূর্ণসাম্যাবস্থা কখনই লাভ করা যায় না—এ-কথা বলিবার অধিকার আমাদের নাই। সাম্যাবস্থায় কোনরূপ বৈচিত্র্য থাকা অসম্ভব, উহাকে বৈচিত্র্যহীন হইতেই হইবে।" (পৃষ্ঠা ২১৫)

মতামত: পুনঃপুন সেই এক দ্বিচারিতা। একটু পরে স্বামীজী নিজেই বলেছেন, "জোরের সহিত এরূপও বলা হয় যে, জড়দেহে এবং সামাজিক শ্রেণী-বিভাগে সম্পূর্ণ সমতা স্বাভাবিক মৃত্যু আনে এবং সমাজের বিলোপ সাধন করে।" (পৃষ্ঠা ২৫৬)

দুটি বক্তব্য সম্পূর্ণ পরস্পর বিরোধী।

২৭) "এক জাতি বা এক যুগের পক্ষে যাহা পুরাণ, অন্য জাতি বা যুগের নিকট তাহাই ইতিহাস।" (পৃষ্ঠা ২২৩)

মতামত: বিভিন্ন রূপকথার গল্পগাঁথাকেও স্বামী বিবেকানন্দ ইতিহাসের অন্তর্ভুক্ত করে নিলেন, বিজেপি আরএসএস-কে দোষ দিয়ে লাভ কী?

ইতিহাসের সঙ্গে পৌরাণিক কাহিনির বেশ কিছু পার্থক্য লক্ষ করা যায়। এই পার্থক্যগুলি হল - 

চরিত্রগত পার্থক্যঃ পৌরাণিক কাহিনীতে বিভিন্ন ঈশ্বরের কর্মকাণ্ড ও তাঁদের শক্তির ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। পৌরাণিক কাহিনীগুলির নায়ক - নায়িকা হলেন দেবদেবীরা। অন্যদিকে ইতিহাসে গুরুত্ব আরোপ করা হয় মানুষের কর্মকাণ্ড ও শক্তির ওপর, সেই দিক থেকে দেখলে ইতিহাসের নায়ক - নায়িকা হল মানবমানবী, ইতিহাস হল মানুষের কাহিনি। 

ভিত্তিগত পার্থক্যঃ পৌরাণিক কাহিনীগুলি ধর্মভিত্তিক হয়। পৃথিবীর সৃষ্টি, মানুষের সৃষ্টির পৌরাণিক ব্যাখ্যা দেয় কিন্তু ইতিহাসের কর্মকাণ্ড পৃথিবী ও মানুষের সৃষ্টির যুক্তিসম্মত ব্যাখ্যা তুলে ধরে। 

লক্ষণগত পার্থক্যঃ পৌরাণিক কাহিনীর প্রধান লক্ষ্য ঈশ্বরের মাহাত্ম্য প্রচার ও মানুষকে নৈতিক জ্ঞানদান করা কিন্তু ইতিহাসের প্রধান লক্ষ্য সত্যকে প্রতিষ্ঠা করা। 

বাস্তবতার পার্থক্যঃ পৌরাণিক কাহিনীর কল্পনার আধিক্য বেশি, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কোনো বাস্তবতা নেই, নেই কোনো তথ্য বা প্রমাণ কিন্তু ইতিহাসের বাস্তবতা আছে। প্রতিটি ঘটনার তথ্য বা প্রমাণ থাকে। তথ্য বা প্রমাণ ছাড়া ইতিহাস হতে পারে না। 

সময়গতঃ পৌরাণিক কাহিনীগুলির সময়ের ভিত্তিতে কোনো ধারাবাহিকতা বা কালপঞ্জি থাকে না কিন্তু ইতিহাসের সময়ের ভিত্তিতে ধারাবাহিকতা ও সঠিক কালপঞ্জি থাকে।

২৮) "অধিকার-বিলোপ আমরা নিশ্চয়ই ঘটাইতে পারি। সমগ্র জগতের সম্মুখে ইহাই যথার্থ কাজ। প্রত্যেক জাতি ও প্রত্যেক দেশের সামাজিক জীবনে ইহাই একমাত্র সংগ্রাম। এক শ্রেণীর লোক অপর শ্রেণীর লোক অপেক্ষা স্বভাবতই বেশী বুদ্ধিমান—ইহা আমাদের সমস্যা নয়; আমাদের সমস্যা হইল এই যে, বুদ্ধির আধিক্যের সুযোগ লইয়া এই শ্রেণীর লোক অল্পবুদ্ধি লোকেদের নিকট হইতে তাহাদের দৈহিক সুখস্বাচ্ছন্দ্যও কাড়িয়া লইবে কিনা। এই বৈষম্যকে ধ্বংস করিবার জন্যই সংগ্রাম। কেহ কেহ অন্যান্য ব্যক্তি অপেক্ষা অধিকতর দৈহিক বলশালী হইবে এরূপে স্বভাবতই দুর্বল লোকদিগকে দমন বা পরাজয় করিতে সমর্থ হইবে—ইহা তো স্বতঃসিদ্ধ ব্যাপার, কিন্তু এই শারীরিক শক্তির জন্য তাহারা জীবনের যাহা কিছু সুখস্বাচ্ছন্দ্য লাভ করা যায়, তাহাই নিজেদের জন্য কাড়িয়া লইবে—এই প্রকার অধিকার-বোধ তো নীতিসম্মত নয় এবং ইহার বিরুদ্ধেই সংগ্রাম চলিয়া আসিতেছে। একদল লোক স্বভাবসিদ্ধ প্রবণতাবশতঃ অন্যের অপেক্ষা বেশী ধনসঞ্চয় করিতে পারিবে—ইহা তো স্বাভাবিক। কিন্তু ধনসঞ্চয়ের এই সামর্থ্য-হেতু তাহারা অসমর্থ ব্যক্তিদের উৎপীড়ন এবং নিষ্ঠুরভাবে পদদলিত করিবে—ইহা তো নীতিসম্মত নয়; এই অধিকারের বিরুদ্ধেই সংগ্রাম চলিয়া আসিতেছে। অন্যকে বঞ্চিত করিয়া নিজে সুবিধা ভোগ করার নামই অধিকারবাদ এবং যুগযুগান্ত ধরিয়া নীতিধর্মের লক্ষ্য এই অধিকারবাদকে ধ্বংস করা। বৈচিত্র্যকে নষ্ট না করিয়া সাম্য ও ঐক্যের দিকে অগ্রসর হওয়াই একমাত্র কাজ।

এই-সকল বৈচিত্র্য পার্থক্য অনন্তকাল বিরাজ করুক। এই বৈচিত্র্য জীবনের অপরিহার্য সারবস্তু। এভাবেই আমরা অনন্তকাল খেলা করিব। তুমি হইবে ধনী এবং আমি হইব দরিদ্র; তুমি হইবে বলবান্ এবং আমি হইব দুর্বল; তুমি হইবে বিদ্বান্ এবং আমি হইব মূর্খ; তুমি হইবে অত্যন্ত আধ্যাত্মিক-ভাবাপন্ন, আমি হইব অল্প আধ্যাত্মিক। তাহাতে কি আসে যায়? আমাদিগকে এরূপই থাকিতে দাও, কিন্তু তুমি আমা অপেক্ষা শারীরিক ও মানসিক শক্তিতে অধিকতর বলবান্ বলিয়া আমা অপেক্ষা বেশী অধিকার ভোগ করিবে, ইহা হইতে পারে না; আমা অপেক্ষা তোমার ধনৈশ্বর্য বেশী আছে বলিয়া তুমি আমা অপেক্ষা বড় বিবেচিত হইবে, ইহাও হইতে পারে না, কারণ অবস্থার পার্থক্য সত্ত্বেও আমাদের ভিতরে সেই একই সমতা বর্তমান।

বাহ্যজগতে পার্থক্যের বিনাশ এবং সমতার প্রতিষ্ঠা—কখনই নৈতিক আচরণের আদর্শ নয়, এবং কখনও হইবে না। ইহা অসম্ভব, ইহা মৃত্যু ও ধ্বংসের কারণ হইবে।" (পৃষ্ঠা ২৬০)

মতামত: সামন্ততান্ত্রিক প্রভুদের প্রতি নির্লজ্জ অনুগত্য প্রদর্শন। 

যুগ যুগ ধরে ঠিক এইভাবেই ধর্মব্যবসায়ীরা সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের মনে পরজন্ম, কর্মফল, পাপ, পুণ্য নামক কুসংস্কারগুলোকে রোপন করে, সমাজের সামন্ততান্ত্রিক প্রভুদের শ্রমজীবী মানুষকে শোষনের ক্ষেত্রকে প্রস্তুত করেছে। স্বামী বিবেকানন্দের এই বক্তব্য সেই শোষণভিত্তিক কাঠামোকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই।

২৯) "ভারতের যাবতীয় মনোবিজ্ঞান একই প্রকার, উহা প্রাচীন সাংখ্য মনস্তত্ত্বের অনুরূপ।" (পৃষ্ঠা ২৬২)

মতামত: স্বামীজীর জানা ছিল না যে বিজ্ঞান কোনোদিন কোনো দেশের, ধর্মের, বর্ণের বা জাতির হতে পারে না।

৩০) "যাঁহারা উপনিষদ্ পাঠ করিয়াছেন, তাঁহারা জানেন যে, উপনিষদই বারংবার বলিতেছে, ‘শুধু পড়িয়া শুনিয়া কেহ আত্মজ্ঞান লাভ করিতে পারে না।’" (পৃষ্ঠা ২৭৭)

মতামত: স্বামীজী তাঁর ভক্তদের আধুনিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করে নির্গুণ ব্রহ্মের খোঁজ নিয়ে ব্যস্ত রাখতে বিশেষ আগ্রহী।

৩১) "আমরা সকলেই ইন্দ্রিয়ের দাস, নিজেদের চেতন ও অবচেতন মনের দাস। কোন অপরাধী যে স্বেচ্ছায় কোন অপরাধ করে—তাহা নয়, শুধু নিজের মন তাহার আয়ত্তে না থাকাতেই সে ঐরূপ করিয়া থাকে, এবং এইজন্য সে তাহার চেতন ও অবচেতন মনের, এমন কি প্রত্যেকের মনেরও দাস হয়। সে নিজ মনের প্রবলতম সংস্কারবশেই চালিত হয়। সে নিরুপায়। সে নিজ মনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে—বিবেকের কল্যাণকর নির্দেশ এবং নিজের সৎস্বভাবের বিরুদ্ধে চলিতে থাকে। সে তাহার মনের প্রবল নির্দেশ মানিয়া চলিতে বাধ্য হয়। বেচারী মানুষ নিতান্তই অসহায়।" (পৃষ্ঠা ২৯৫)

"দাগী চোর-ডাকাতেরা, মিথ্যাবাদীরা, অন্যায়কারী নর-নারী—সকলেই নিজ নিজ অনিচ্ছা সত্ত্বেও ঐরূপ হইয়া গিয়াছে। ইহা সত্যই মনস্তত্ত্বের একটি বড় সমস্যা। মানুষের বিচার—আমাদিগকে অতি উদার সহৃদয় দৃষ্টি লইয়াই করিতে হইবে।" (পৃষ্ঠা ৩৪৭)

মতামত: ব্যাস আর কী! দেশের সব চোর, ডাকাত, খুনি, ধর্ষক, সাজাপ্রাপ্ত অপরাধীদের জেল থেকে বের করে রামকৃষ্ণ মিশনে পাঠিয়ে দেওয়া হোক।
 
৩২) "তোমাদের নিকট প্রথমে আমার নিজের অভিজ্ঞতালব্ধ কয়েকটি ঘটনারই উল্লেখ করিব। একবার এক ব্যক্তির কথা শুনিয়া-ছিলাম; মনে মনে কোন প্রশ্ন ভাবিয়া তাঁহার কাছে যাওয়া মাত্রই তিনি সেই প্রশ্নের উত্তর দিয়া দিতেন; আরও শুনিয়াছিলাম, তিনি ভবিষ্যদ্বাণীও করেন। মনে কৌতূহল জাগিল; তাই কয়েকজন বন্ধুসঙ্গে তাঁহাকে দেখিতে গেলাম। প্রত্যেকেই মনে মনে কোন-না-কোন প্রশ্ন ঠিক করিয়া রাখিলাম এবং পাছে ভুল হয়, সেজন্য প্রশ্নগুলি এক এক খণ্ড কাগজে লিখিয়া নিজ নিজ জামার পকেটে রাখিয়া দিলাম। আমাদের এক একজনের সঙ্গে তাঁহার যেমনি দেখা হইতে লাগিল, অমনি তিনি তাঁহার প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি করিয়া উত্তর বলিয়া দিতে লাগিলেন। পরে একখণ্ড কাগজে কি লিখিয়া কাগজটি ভাঁজ করিয়া আমার হাতে দিলেন, এবং তাহার অপর পিঠে আমাকে নাম স্বাক্ষর করিতে অনুরোধ করিয়া বলিলেন, ‘এটি দেখিবেন না, পকেটে রাখিয়া দিন; যখন বলিব, তখন বাহির করিবেন।’ আমাদের সকলের সঙ্গেই এই রকম করিলেন। তারপর আমাদের ভবিষ্যৎ জীবনে ঘটিবে, এমন কয়েকটি ঘটনার কথাও বলিলেন। অবশেষে বলিলেন, ‘আপনাদের যে ভাষায় খুশী, কোন শব্দ বা বাক্য চিন্তা করুন।’ আমি সংস্কৃত ভাষায় একটি প্রকাণ্ড বাক্য মনে মনে আওড়াইলাম; সংস্কৃতের বিন্দু-বিসর্গও তিনি জানিতেন না। তিনি বলিলেন, ‘পকেট হইতে কাগজটি বাহির করুন তো!’ দেখি, তাহাতে সেই সংস্কৃত বাক্যটিই লেখা রহিয়াছে! এক ঘণ্টা আগে তিনি এটি লিখিয়াছিলেন, আর নীচে মন্তব্য দিয়াছিলেন, ‘যাহা লিখিয়া রাখিলাম, ইনি পরে সেই বাক্যটিই ভাবিবেন’—ঠিক তাহাই হইল। আমাদের অন্য একজন বন্ধুকেও অনুরূপ একখানি কাগজ দিয়াছিলেন, এবং তিনিও তাহা স্বাক্ষর করিয়া পকেটে রাখিয়াছিলেন। এখন বন্ধুটিকেও একটি বাক্য চিন্তা করিতে বলিলে তিনি কোরানের একাংশ হইতে আরবী ভাষায় একটি বাক্য ভাবিলেন। ঐ ব্যক্তির সে ভাষা জানিবার সম্ভাবনা ছিল আরও কম। বন্ধুটি দেখিলেন, সেই বাক্যটিই কাগজে লেখা আছে।

সঙ্গীদের মধ্যে আর একজন ছিলেন ডাক্তার। তিনি জার্মান ভাষায় লিখিত কোন ডাক্তারি পুস্তক হইতে একটি বাক্য ভাবিলেন। তাঁহার কাগজে তাহাই পাওয়া গেল।

সেদিন হয়তো কোনরূপ প্রতারিত হইয়াছি ভাবিয়া কিছুদিন পরে আমি আবার সেই ব্যক্তির নিকট গেলাম। সেদিন আমার সঙ্গে নূতন আর একদল বন্ধু ছিলেন। সেদিনও তিনি অদ্ভুত সাফল্যের পরিচয় দিয়াছিলেন।" (পৃষ্ঠা ২৯৯)

মতামত: সামন্তবাদী প্রভুদের স্বার্থে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে অন্ধবিশ্বাসের বীজ বপন করতে উদ্যত স্বয়ং স্বামী বিবেকানন্দ। এরকম উদাহরণ আরো আছে।

যদি স্বামীজীর কথা সত্যি হয়, সেক্ষেত্রে এমন একজন সিদ্ধ পুরুষ জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড নিয়ে আমাদের দেশের মানুষকে আগেভাগে সতর্ক করলেন না কেন - সে প্রশ্ন থেকেই যায়! 

৩৩) "কোন হ্রদের তলদেশ হইতে একটি বুদ‍্বুদ উঠিতেছে; যখন হ্রদের উপরে উঠিয়া উহা ফাটিয়া যায়, তখনই মাত্র উহা আমাদের নজরে পড়ে, তলদেশ হইতে উপরে উঠিয়া আসিবার মধ্যে কোন সময়ই সেটিকে দেখিতে পাই না।" (পৃষ্ঠা ৩০৫)

মতামত: আধুনিক বিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে সাথে এখন বুদবুদের শুরু থেকে শেষ অবধি ক্যামেরা বন্দি করা যায়; আজকের দিনে দাঁড়িয়ে রামকৃষ্ণ মিশন স্বামীজীর এই অবৈজ্ঞানিক বক্তব্যটাকে অসার ও ভিত্তিহীন বলে স্বীকার করবে কী?

৩৪) "অর্থ ও অন্যান্য জাগতিক বস্তু দান করিয়া অপরকে সাহায্য করা বা দৈনন্দিন জীবনে কিভাবে নির্ঝঞ্ঝাটে চলা যায়, তাহা শিক্ষা দেওয়া—এ-সব নিতান্তই তুচ্ছ আনুষঙ্গিক কার্য মাত্র।" (পৃষ্ঠা ৩০৭)

মতামত: রামকৃষ্ণ মিশন তার ভক্তকুলের থেকে আর্থিক দান গ্রহণ করা বন্ধ করলে, ভক্তকুল এইসব তুচ্ছ আনুষঙ্গিক কাজগুলো থেকে মুক্ত হবে।

৩৫) "বৈজ্ঞানিক পরীক্ষণ অর্থে ইহাই বুঝিতে হয় যে, কতগুলি তথ্যকে এমন সাধারণ স্তরে নামাইয়া আনা হইবে যে, ঐগুলি সকল মানুষের পক্ষে সমভাবে গ্রহণীয় হইবে, ঐগুলি সকলের দ্বারা অনুভূত হইবে, তাহা হইলে কোন বিষয়ে যে এইরূপ কোন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষণ সম্ভব—ইহা আমি সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করি।" (পৃষ্ঠা ৩১২)

মতামত: এক মূর্খ চাষার বাড়িতেও একটা সুইচের সাহায্যে আলো জ্বলে - বিজ্ঞান সাধারণ স্তরে গ্রহণীয় ও অনুভূত হওয়া অসম্ভব কিছু নয়!

৩৬) "নিজ মস্তিষ্ক সম্পর্কে কেহই সচেতন নয়। আমি আমার মস্তিষ্ক কখনই দেখি নাই, এবং ইহার সম্পর্কে আমি কোন সময়েই সচেতন নই। তথাপি আমি জানি, মস্তিষ্ক আছে।" (পৃষ্ঠা ৩১৪)

মতামত: বর্তমানে বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব আবিষ্কারের ফলে ইহাও সম্ভব হয়েছে। এগুলো ধর্ম, বেদান্ত দিয়ে সম্ভবপর হয়নি, সম্ভব হয়েছে বিজ্ঞানের অগ্রগতির দ্বারা।

৩৭) "ভারতে কিন্তু এমন লোকও আছে, যে বিশ্বাস করে—মন্ত্রশক্তির দ্বারা অর্থলাভ সম্ভব। তাই সেখানে দেখা যাইবে যে, ধনাকাঙ্ক্ষী হয়তো বৃক্ষতলে বসিয়া মন্ত্রের মাধ্যমে ধন কামনা করিতেছে। (চিন্তার) শক্তিতে সব-কিছু তাহার নিকট আসিতে বাধ্য।" (পৃষ্ঠা ৩২১)

মতামত: এত মন্ত্রোচ্চারণের পরেও এই ধর্মবিশ্বাসীদের দেশে জাতীয় আয়ের ৫৭ শতাংশের মালিক জনসংখ্যার উপরের দিকের ১০ শতাংশ আর সেখানে নীচের ৫০ শতাংশের উপার্জন, জাতীয় আয়ের মাত্র ১৩.১ শতাংশ। সামন্ততন্ত্রের তাঁবেদার স্বামী বিবেকানন্দ এই বৈষম্যের মূলে আঘাত করতে অপারগ।

https://bengali.abplive.com/news/world-inequality-report-2022-india-poor-very-unequal-country-851565

৩৮) "যদি তুমি তোমার দেয় অংশ উঠাইয়া লইতে সমর্থ হও, তবে জলের উপর দিয়াও তুমি হাঁটিতে পারিবে। জল আর তোমাকে ডুবাইবে কেন?" ( পৃষ্ঠা ৩৩২)

"ধ্যানাভ্যাসই জ্ঞানলাভের বিজ্ঞানসম্মত পন্থা। ধ্যানের শক্তি ব্যতীত জ্ঞান হয় না। ধ্যানশক্তির প্রয়োগে অজ্ঞান, কুসংস্কার ইত্যাদি হইতে আমরা সাময়িকভাবে মুক্ত হইতে পারি, ইহার বেশী নয়। মনে কর, এক ব্যক্তি আমাকে বলিয়াছে যে, এই বিষ পান করিলে মৃত্যু হইবে এবং আর এক ব্যক্তি রাত্রে আসিয়া বলিল, ‘যাও, বিষ পান কর!’ এবং বিষ খাইয়াও আমার মৃত্যু হইল না (যাহা ঘটিল তাহা এই)—ধ্যানের ফলে বিষ ও আমার নিজের মধ্যে একত্ববোধ হইতে সাময়িকভাবে আমার মন বিচ্ছিন্ন হইয়াছিল। অপর পক্ষে সাধারণভাবে বিষ পান করিতে গেলে মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী ছিল।

যদি আমি কারণ জানি এবং বৈজ্ঞানিক উপায়ে আমাকে ধ্যানের অবস্থায় উন্নীত করি, তবে যে-কোন লোককেই আমি বাঁচাইতে পারি। এই কথা (যোগ)-গ্রন্থে লিপিবদ্ধ আছে, কিন্তু ইহা কতখানি নির্ভুল, তাহার বিচার তোমরাই করিও।" (পৃষ্ঠা ৩৩৩)

"যোগীদের মধ্যে কেহ কেহ দাবী করেন যে, এই শরীর তরল বাষ্প ইত্যাদিতে পরিণত হইবে। তুমি শরীর দ্বারা যাহা খুশী করিতে পারিবে—ইহাকে ছোট করিতে পার, এমন কি বাষ্পেও পরিণত করিতে পার, এই দেওয়ালের মধ্য দিয়া যাতায়াতও সম্ভব হইতে পারে—এই রকম তাঁহারা দাবী করেন। আমার অবশ্য তাহা জানা নাই। আমি কখনও কাহাকেও এরূপ করিতে দেখি নাই। কিন্তু যোগশাস্ত্রে এই-সব কথা আছে। যোগশাস্ত্রগুলিকে অবিশ্বাস করিবার কোন হেতু নাই।" (পৃষ্ঠা ৩৩৬)

"তোমার নিজের প্রাণকে যেমন তুমি নিয়ন্ত্রিত করিতে পার, তেমনি যথেষ্ট শক্তিমান্ হইলে এখানে বসিয়াই ভারতে অবস্থিত অপর একজনের প্রাণকেও তুমি নিয়ন্ত্রিত করিতে পারিবে। সব প্রাণই এক, মাঝখানে কোন ছেদ নাই; একত্বই সর্বত্র বিদ্যমান।" (পৃষ্ঠা ৩৪৫) 

"শরীরের ভিতরে যে-সব যন্ত্রের কাজকে আমরা স্বয়ংক্রিয় বলিয়া থাকি, যেমন যকৃতের ক্রিয়া, সেগুলিকে পর্যন্ত নিজের ইচ্ছাধীন করা যায়।" (পৃষ্ঠা ৩৪৯)

মতামত: মুখে কুসংস্কার বিরোধিতার বুলি আওড়ে বাস্তবে সাধারণ জনগণের মধ্যে কুসংস্কারের প্রচার।

৩৯) "মানসিক শক্তির দ্বারা লোকের রোগ সারাইতে আমি দেখিয়াছি। উহা ‘অলৌকিক কর্মী’র কাজ। আমরা বলি, তিনি প্রার্থনা করিয়া লোককে নীরোগ করেন। (কিন্তু) কেহ বলিবেন, ‘না, মোটেই না, ইহা কেবল তাঁহার মনের শক্তির ফল। লোকটি বৈজ্ঞানিক। তিনি জানেন, তিনি কি করিতেছেন।’

ধ্যানের শক্তি আমাদিগকে সব কিছু দিতে পারে। যদি তুমি প্রকৃতির উপর আধিপত্য চাও, (ইহা ধ্যানের অনুশীলনেই সম্ভব হইবে)। আজকাল বিজ্ঞানের সকল আবিষ্ক্রিয়াও ধ্যানের দ্বারাই হইতেছে।" (পৃষ্ঠা ৩৩২)

মতামত: সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন মন্তব্য। স্বামী বিবেকানন্দের গুরু রামকৃষ্ণদেবের শরীর খারাপের সময় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় এমডি ডাঃ মহেন্দ্রলাল সরকার দেখতেন, মানসিক শক্তি দিয়ে রোগীকে কিন্তু সারানো যায়নি। এইসব এইসব ধর্মের ঠিকাদাররা ভক্তদের যা জ্ঞান দেন, সেগুলো নিজেদের জীবনে তখনও মানেননি আর এখনও মানেন না।

আজকের দিনে ভারতের যোগগুরু বলে খ্যাতনামা বাবা রামদেবকেও প্রাণে বাঁচতে সেই আধুনিক চিকিৎসা শাস্ত্রের ওপরই নির্ভর করতে হয়।

https://www.bbc.com/bengali/news/2011/06/110606_mb_ramdev_hospital   

ধ্যানের দ্বারাই যদি বাবাজীরা সব রোগ সরিয়ে দিতে পারতেন তাহলে দেশে এত আধুনিক হাসপাতালের প্রয়োজন কী? করোনা পরিস্থিতিতে সব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের দরজা বন্ধ রাখতে হয়েছিল কেন? এই সম্বন্ধে করোনা মহামারীর সময় পড়া চারটে লাইন খুবই গুরুত্বপূর্ণ -

"যদি বেঁচে যাও এবারের মতো
যদি কেটে যায় মৃত্যুর ভয়
জেনো বিজ্ঞান লড়েছিলো একা
মন্দির মসজিদ নয়"

৪০) "মেয়েরাও পুরুষদের মত সমান সাহসী। নিজ নিজ ভাবে প্রত্যেকেই ভাল। নারী যে ধৈর্য, সহিষ্ণুতা ও স্নেহ লইয়া সন্তান পালন করে, কোন্ পুরুষ সেভাবে তাহা করিতে পারে? একজন কর্মশক্তিকে বাড়াইয়া তুলিয়াছে, অপরজন বাড়াইয়াছে সহনশক্তি। যদি বল, মেয়েরা তো শারীরিক শ্রম করিতে পারে না, তবে বলিব, পুরুষরাও তো সহ্য করিতে পারে না। সমগ্র জগৎটি একটি নিখুঁত ভারসাম্যের ব্যাপার।" (পৃষ্ঠা ৩৪১)

মতামত: মনুবাদী মতের সমর্থন। 

মনুসংহিতার ৯/২৬ শ্লোকে আমরা দেখতে পাই - সন্তানের হেতু স্ত্রীলোকেরা বহুকল্যাণভাজন, (বস্ত্রালংকারাদি দ্বারা) পুজনীয়া, গৃহশোভাকারিণী ; গৃহে স্ত্রীলোক ও শ্ৰী (লক্ষ্মী)তে কোন ভেদ নেই।

আর ৯/২৭ শ্লোকে আছে - সন্তানোৎপাদন, জাতসন্তানের প্রতিপালন ও প্রতিদিন (অতিথিসেবাদি) লোক-ব্যবহারের প্রত্যক্ষ কারণ স্ত্রী। (মনুসংহিতা – অনুবাদ : সুরেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়) 

৪১) "পতিতা নারীকে দেখিয়া আমাকে নাসিকা কুঞ্চিত করিতে হয়, কারণ সমাজ তাহাই চায়, যদিও সে আমার ত্রাণকর্ত্রী, যদিও তাহার পতিতাবৃত্তির ফলে অপর স্ত্রীলোকের সতীত্ব রক্ষা পাইতেছে। কথাটি ভাবিয়া দেখ।" (পৃষ্ঠা ৩৪৮)

মতামত: স্বামীজী দ্বিতীয় খণ্ডে নিজেই বলেছিলেন, " জনৈক সাধু বৃক্ষতলে বসিয়া লোককে ধর্মোপদেশ দিতেন। তিনি শুধু দুধ ও ফলমূল আহার করিয়া এবং প্রাণায়ামাদি অভ্যাস করিয়া নিজেকে খুব পবিত্র মনে করিতেন। সেই গ্রামে এক চরিত্রহীনা নারী বাস করিত। দুষ্কার্যের জন্য নরকে যাইতে হইবে—এই বলিয়া সাধু প্রত্যহই ঐ নারীর নিকট গিয়া তাহাকে সাবধান করিয়া দিতেন। হতভাগিনী তাহার জীবিকা উপার্জনের একমাত্র পথ পরিবর্তন করিতে অক্ষম হইয়া সাধু-কথিত ভয়াবহ পরিণামের চিন্তায় শঙ্কিত হইয়া থাকিত। নিরুপায় ঐ নারী কাঁদিয়া, ভগবানের নিকট প্রার্থনা করিয়া ক্ষমা ভিক্ষা করিত। এই সাধু ও ভ্রষ্টা নারীর মৃত্যু হইলে দেবদূতেরা আসিয়া সেই নারীটিকে স্বর্গে লইয়া গেল, আর যমদূতেরা আসিয়া সাধুর আত্মা দাবী করিল। সাধু উচ্চৈঃস্বরে জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘একি? আমি কি কঠোর সাধুজীবন যাপন করিয়া সকলের মধ্যে ধর্ম প্রচার করি নাই? আমি কেন নরকে যাইব, আর এই ভ্রষ্টা নারী স্বর্গে যাইবে?’ যমদূতগণ বলিল, ‘নারীটি দেহ দ্বারা পাপ কাজ করিতে বাধ্য হইলেও তাহার মন সর্বদা ভগবানে নিবিষ্ট ছিল এবং সে মুক্তি কামনা করিয়াছিল। সেই মুক্তি এখন সে লাভ করিয়াছে। আর তুমি বাহিরে ধর্ম-কার্য করিয়াছ, তোমার মন কিন্তু অপরের পাপের দিকেই সর্বদা নিবিষ্ট থাকিত। তুমি পাপই দেখিয়াছ, পাপই চিন্তা করিয়াছ; সুতরাং যেখানে কেবলই পাপ, তোমাকে সেই স্থানেই যাইতে হইবে।’ এই গল্পের শিক্ষণীয় বিষয়টি অতি স্পষ্টঃ বাহ্য জীবন যাপনের দ্বারা কোন ফলই হয় না। হৃদয় পবিত্র হওয়া চাই; পবিত্রহৃদয় ব্যক্তি পাপ না দেখিয়া কেবল পুণ্যই দেখে। মানবজাতির অভিভাবক অথবা পাপীতাপীর উদ্ধারকর্তা সাধুরূপে দাঁড়াইবার চেষ্টা করা আমাদের পক্ষে উচিত নয়। তাহার পরিবর্তে নিজদিগকে পবিত্র করিতে চেষ্টা করিব। ইহার ফলে আমরা অপরের ধর্মলাভেরও সহায় হইতে পারিব।" (পৃষ্ঠা ৩২২)

দুটি বক্তব্য সম্পূর্ণ পরস্পর বিরোধী।

আবার সমাজ সম্বন্ধে স্বামীজীর বক্তব্য হলো, "যে-কোন নীতিশাস্ত্র মানুষকে তাহার নিজ সমাজের গণ্ডীর মধ্যেই আবদ্ধ রাখিতে ইচ্ছা করে, তাহা সমগ্র মানবজাতির পক্ষে প্রযোজ্য নৈতিক বিধি ব্যাখ্যা করিতে অক্ষম।" (পৃষ্ঠা ৮৯)

স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর বক্তব্যে অপরাধীদের জন্যও সমবেদনা প্রকাশ করতে পারেন (দেখুন - ৩১) কিন্তু গতর খাটিয়ে জীবনধারণ করা এক নারীর জন্য তাঁর কোনো সমবেদনা নেই।  

৪২) "ধর্ম হইতে আমরা যে-সকল তথ্য ও তত্ত্ব শিক্ষা করিতে পারি, যে-সান্ত্বনা পাইতে পারি, তাহা ছাড়িয়া দিলেও ধর্ম অন্যতম বিজ্ঞান অথবা গবেষণার বস্তু হিসাবে মানব-মনের শ্রেষ্ঠ ও সর্বাধিক কল্যাণকর অনুশীলনের বিষয়।" (পৃষ্ঠা ৯১)

"বিজ্ঞানগুলির জ্ঞান যেন আমাদের জীবনের একটুখানি অংশ জুড়িয়া আছে। কিন্তু ধর্ম আমাদের কাছে যে জ্ঞান লইয়া আসে, তাহা চিরন্তন; ধর্ম যে সত্যের কথা প্রচার করে, সে সত্যের মত এ জ্ঞানও সীমাহীন।" (পৃষ্ঠা ৯৪)

"পদার্থবিদ্যা বা রসায়নের সিদ্ধান্তগুলি যতখানি বিজ্ঞানসম্মত, ধর্ম যে অন্ততঃ ততখানি বিজ্ঞানসম্মত হইবে শুধু তাহাই নয়, বরং আরও বেশী জোরালো হইবে; কারণ জড়বিজ্ঞানের সত্যগুলির পক্ষে সাক্ষ্য দিবার মত অভ্যন্তরীণ আদেশ বা নির্দেশ কিছু নাই, কিন্তু ধর্মের তাহা আছে।" (পৃষ্ঠা ৯৫)

"উচ্চতম সামান্যীকরণ এবং বিবর্তনবাদের কথা বেদান্তে আছে বলিয়া বেদান্তের ধর্ম বৈজ্ঞানিক জগতের দাবী মিটাইতে পারে।" (পৃষ্ঠা ১০১)

"সমস্ত ধর্ম যে সত্যের সন্ধানে রত, যে সত্যের তুলনায় জড়বিজ্ঞানের সব জ্ঞানই গৌণ মাত্র, আমরা সেই সত্যের সন্ধান পাইয়াছি; ইহাই একমাত্র সত্যজ্ঞান, যাহা আমাদিগকে বিশ্বের এই বিশ্বজনীন ঈশ্বরের সঙ্গে এক করিয়া দেয়।" (পৃষ্ঠা ১০৮)

"প্রত্যেক জড়বিজ্ঞান ঐক্যের সন্ধান পাইলেই শেষ হইবে, কারণ ইহার বেশী আর আমরা যাইতে পারি না। পূর্ণ ঐক্যে পৌঁছিলে তত্ত্বের দিক্ দিয়া বিজ্ঞানের আর বেশী কিছুই বলিবার থাকে না।" (পৃষ্ঠা ২০৬)

"বিভিন্ন প্রকৃতি অনুযায়ী এই রাজযোগ-বিজ্ঞানের প্রয়োগ বিভিন্নভাবে হয়।" (পৃষ্ঠা ২২১) 

"জড়বিজ্ঞানের বিপরীত অধ্যাত্ম বিজ্ঞানের বিরুদ্ধে আজ সারা বিশ্বে এক মহা সোরগোল পড়িয়া গিয়াছে। আমাদের ঐহিক জীবন ও এই পরিদৃশ্যমান জগৎকে দৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করিবার জন্য আমাদের ইন্দ্রিয়জ্ঞানের সীমার বহির্ভূত সকল ভাবের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা অতি দ্রুত একটি ফ্যাশনে পরিণত হইতেছে, এমন কি ধর্মপ্রচারকেরাও একের পর এক এই ফ্যাশনের নিকট আত্মসমর্পণ করিতেছেন। অবশ্য চিন্তাহীন জনসাধারণ সর্বদা সুখাবহ ভাবরাশিই অনুসরণ করে, কিন্তু যাঁহাদের নিকট অধিকতর জ্ঞান আশা করা যায়, তাঁহারা যখন নিজেদের দার্শনিক বলিয়া প্রচার করেন এবংঅর্থহীন ফ্যাশন অনুসরণ করেন, তখন উহা সত্যই শোচনীয়।" (পৃষ্ঠা ২২৫)

"যদি কেহ মনে করে, মানুষের সমগ্র জ্ঞান শুধু ইন্দ্রিয়ের অনুভূতি—আর কিছু নয়, তবে আমরা ঐকথা অস্বীকার করিব। যদি প্রাকৃতিক বিজ্ঞান বলিতে ইন্দ্রিয়লব্ধ জ্ঞানই বুঝায়—তার বেশী আর কিছু নয়, তবে আমরা বলিব, এরূপ বিজ্ঞান কোন দিন ছিল না, কোন দিন হইবেও না। উপরন্তু শুধু ইন্দ্রিয়জ্ঞানের উপর প্রতিষ্ঠিত কোন জ্ঞান কখনও বিজ্ঞান বলিয়া গৃহীত হইতে পারিবে না।" (পৃষ্ঠা ২২৬)

"এখন জড়বস্তু, শক্তি, মন, নিয়ম, কারণ, দেশ, কাল প্রভৃতি ভাবগুলি অতি উচ্চ বিমূর্তনের ফল; কেহই কোনদিন এগুলি ইন্দ্রিয় দ্বারা অনুভব করে নাই; অথবা বলা যায়, এগুলি একেবারে অতিপ্রাকৃতিক বা অতীন্দ্রিয় অনুভূতি। অথচ এগুলি ছাড়া কোন প্রাকৃতিক তথ্য বোঝা যায় না।" (পৃষ্ঠা ২২৬)

"পাশ্চাত্য বৈজ্ঞানিক একমাত্র অণু বা পরমাণুর মধ্যে ঐক্যের সন্ধান করেন। যখন তিনি উহা প্রাপ্ত হন, তখন তাঁহার আর কোন কিছু আবিষ্কার করিবার থাকে না। আর আমরা যখন আত্মার বা স্ব-স্বরূপের ঐক্য দর্শন করি, তখন আর অধিক অগ্রসর হইতে পারি না। আমাদের নিকট তখন ইহা স্পষ্টই প্রতিভাত হয় যে, সেই একমাত্র সত্তাই ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগতের যাবতীয় বস্তুরূপে প্রতীত হইতেছে। অণুর নিজস্ব দৈর্ঘ্য বা বিস্তৃতি না থাকিলেও অণুগুলির মিশ্রণের ফলে দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও বিস্তৃতির উদ্ভব হয়—এইপ্রকার কথা স্বীকার করার সঙ্গে সঙ্গে বৈজ্ঞানিকদিগকে বাধ্য হইয়া অধ্যাত্মশাস্ত্রের সত্যতাও স্বীকার করিতে হয়।" (পৃষ্ঠা ২৩৯)

"এই-সকল বিভিন্ন কেন্দ্রকে নিয়ন্ত্রণ করিতে পারে, এইরূপ কোন একটি বিশেষ কেন্দ্র শারীরবিজ্ঞানে আবিষ্কৃত হয় নাই। সুতরাং ঐ-সকল বিভিন্ন কেন্দ্রের ঐক্য কোথায়, তাহা শারীরবিজ্ঞান আমাদের বলিতে পারে না। এই-সকল কেন্দ্রের ঐক্য কোথায় সংস্থাপিত? মস্তিষ্কস্থ কেন্দ্রগুলি পরস্পর-বিচ্ছিন্ন, এবং সকল কেন্দ্রকে নিয়ন্ত্রণ করিতে পারে—এরূপ কোন কেন্দ্র সেখানে নাই। সুতরাং ভারতীয় মনস্তত্ত্ব যতটুকু তথ্য আবিষ্কার করিয়াছে, তাহার বিরুদ্ধে আপত্তি করা চলে না।" (পৃষ্ঠা ২৬২)

"আমাদের এই শরীর জড়বস্তু নামে পরিচিত কতকগুলি কণিকার সমষ্টি মাত্র। ইহা অনুভূতিহীন ও অচেতন। বৈদান্তিকগণ যাহাকে সূক্ষ্মশরীর বলেন, তাহাও ঐরূপ। তাঁহাদের মতে এই সূক্ষ্মদেহটি স্বচ্ছ হইলেও জড়; ইহা অতি ক্ষুদ্র কণিকাদ্বারা গঠিত; এই কণিকাগুলি এত সূক্ষ্ম যে, অণুবীক্ষণ যন্ত্রসহায়েও সেগুলি দেখা যায় না।" (পৃষ্ঠা ২৬৩)

"নিউটনের জন্মের হাজার বছর আগে ভারতবাসীরা মাধ্যাকর্ষণের কথা জানিত।" (পৃষ্ঠা ৩০৮)

"যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করিলে মনের অসাধ্য কিছুই নাই—এই বিষয়ে ভারতীয় মনে এতখানি দৃঢ়বিশ্বাস আসিয়াছিল যে, মনঃশক্তির গবেষণাই তাহার মহান্ লক্ষ্য হইয়া দাঁড়াইয়াছিল। তাঁহাদের নিকট সম্মোহন, যাদু ও এই জাতীয় অন্যান্য শক্তিগুলির কোনটিই অলৌকিক মনে হয় নাই। ইতঃপূর্বে ভারতীয়েরা যেভাবে যথানিয়মে জড়বিজ্ঞানের শিক্ষা দিতেন, তখন তেমনি যথা নিয়মে এই বিজ্ঞানটিও শিখাইতে লাগিলেন। এ বিষয়ে জাতির এত বেশী দৃঢ়-প্রত্যয় আসিয়াছিল যে, তাহার ফলে জড়বিজ্ঞান প্রায় লুপ্ত হইয়া গেল। তাহাদের দৃষ্টি নিবন্ধ রহিল শুধু এই একটি লক্ষ্যে।" (পৃষ্ঠা ৩০৮)

"সন্দেহাতীত সত্য বলিয়া বৈজ্ঞানিকেরা কিংবা সাধারণে বিশ্বাস করিতে পারেন—এইপ্রকার তত্ত্ব মাত্র দুই-তিনটিই আছে, অবশিষ্ট সবই শূন্যগর্ভ কল্পনা।" (পৃষ্ঠা ৩১৩)

"অনেক ক্ষেত্রেই উপস্থাপিত বিষয় সত্য নাও হইতে পারে, কিন্তু আবার অনেক ক্ষেত্রে আমরা নিজেরা সেই-সব প্রমাণ অনুধাবন করিবার উপযুক্ত কিনা এবং আমরা আমাদের দেহমনকে ঐ-সব আধ্যাত্মিক সত্য আবিষ্কারের উপযুক্ত আধাররূপে প্রস্তুত করিয়াছি কিনা, তাহা বিবেচনা করিতে ভুলিয়া যাই।" (পৃষ্ঠা ৩১৪)

"মুশকিল এই যে, অনেক ক্ষেত্রে যে-সকল অসাধারণ শক্তি তাহার আয়ত্তে আসিয়াছিল, অনুসন্ধান করিলে দেখা যায়, ঐগুলি কোন নিয়মিত বিজ্ঞানসম্মত শিক্ষাপ্রণালীর মাধ্যমে অর্জিত হয় নাই। যাহারা যাদুবলে সর্প বশীভূত করে, তাহাদের প্রাণ যায় সর্পাঘাতেই। ... কেহ যদি কোন অলৌকিক শক্তি লাভ করিয়া থাকে তো সে পরিণামে ঐ শক্তির কবলে পড়িয়াই বিনষ্ট হইবে। ভারতবর্ষে লক্ষ লক্ষ লোক নানাবিধ উপায়ে অলৌকিক শক্তি লাভ করে। তাহাদের অধিকাংশ উন্মাদরোগগ্রস্ত হইয়া মৃত্যুমুখে পতিত হয়। অনেকে আবার অপ্রকৃতিস্থ হইয়া আত্মহত্যা করে।" (পৃষ্ঠা ৩১৭)

"আমরা দার্শনিক দৃষ্টিতে দেখিয়াছি যে, আত্মা মন ভূত (জড় পদার্থ) প্রভৃতি নানা বৈচিত্র্যের (বাস্তব সত্তা কিছু নাই)। ... যাহা আছে, তাহা ‘একমেবাদ্বিতীয়ম্’। বহু কিছু থাকিতে পারে না। জ্ঞান এবং বিজ্ঞানের অর্থ ইহাই। অজ্ঞানের জন্যই বহু দেখি। জ্ঞানে একত্বের উপলব্ধি ...। বহুকে একে পরিণত করাই বিজ্ঞান ...। সমগ্র বিশ্বের একত্ব প্রমাণিত হইয়াছে। এই বিজ্ঞানের নাম বেদান্ত-বিদ্যা। সমগ্র জগৎ এক। আপাত প্রতীয়মান বৈচিত্র্যের মধ্যে সেই ‘এক’ অনুস্যূত হইয়া রহিয়াছে।" (পৃষ্ঠা ৩৩৫)

"কিন্তু একটি কথা তোমাদের স্মরণ রাখিতেই হইবে। ধর্মবিষয়ক কুসংস্কার যেমন আছে; বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও সেইরূপ কুসংস্কার আছে। এমন অনেক পুরোহিত আছেন, যাঁহারা ধর্মানুষ্ঠানকে নিজ জীবনের বৈশিষ্ট্যরূপে গ্রহণ করেন; তেমনি বৈজ্ঞানিক নামধেয় এমন অনেক আছেন, যাঁহারা প্রাকৃতিক নিয়মের পূজারী। ডারউইন বা হাক্সলির মত বড় বড় বৈজ্ঞানিকদের নাম করা মাত্র আমরা অন্ধভাবে তাঁহাদের অনুসরণ করি। এইটি আজকালকার চলিত প্রথা। যাহাকে আমরা বিজ্ঞানসম্মত জ্ঞান বলি, তাহার ভিতর শতকরা নিরানব্বই ভাগই হইতেছে নিছক মতবাদ। ইহাদের অনেকগুলি আবার প্রাচীনকালের বহু-মস্তক ও বহু-হস্তবিশিষ্ট ভূতে অন্ধ বিশ্বাস অপেক্ষা কোন অংশে উৎকৃষ্ট নয়; তবে পার্থক্য এইটুকু যে, কুসংস্কার হইলেও উহাতে মানুষকে গাছপাথর প্রভৃতি অচেতন পদার্থ হইতে অন্ততঃ খানিকটা আলাদা বলিয়া ভাবা হইত। যথার্থ বিজ্ঞান আমাদের সাবধানে চলিতে বলে। পুরোহিতদের সঙ্গে ব্যবহারে যেমন সতর্ক হইয়া চলিতে হয়, বিজ্ঞানীদের বেলায়ও তেমনি সতর্কতা আবশ্যক। অবিশ্বাস লইয়া শুরু কর। বিশ্লেষণ করিয়া পরীক্ষা করিয়া, সব প্রমাণ পাইয়া তবে বিশ্বাস কর। আধুনিক বিজ্ঞানের অতিপ্রচলিত বিশ্বাস এখনও প্রমাণোত্তীর্ণ হয় নাই। অঙ্কশাস্ত্রের মত বিজ্ঞানের ভিতরেও অনেকগুলি মতবাদই শুধু কাজ চালাইয়া যাইবার উপযুক্ত সাময়িক সিদ্ধান্ত হিসাবে গৃহীত হইয়াছে। উচ্চতর জ্ঞানের উন্মেষের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলি বাতিল হইয়া যাইবে।" (পৃষ্ঠা ৩৪৩)

মতামত: প্রতিটি অবান্তর যুক্তি-বিবর্জিত মন্তব্য। যে কোনো উপায়ে, বিভিন্নরকম কু-যুক্তির উপস্থাপনা করে বিজ্ঞানের ওপর ধর্মের জয়যাত্রা সুনিশ্চিত করতে উদ্যত স্বয়ং স্বামী বিবেকানন্দ।

ধর্মবিশ্বাসীরা আমাদের আশেপাশের কতিপয় বিজ্ঞান শিক্ষক, বিজ্ঞানী বা চিকিৎসকদের স্বামী বিবেকানন্দের প্রতি অনুরাগকে সম্বল করে ওঁকে অভ্রান্ত হিসেবে তুলে ধরতে চান কিন্তু বাস্তবে এই মানুষগুলোও স্বামী বিবেকানন্দকে নিয়ে প্রচারের শিকার। 

এঁরা সামাজিক বা পারিবারিক ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণেই স্বামীজীর প্রতি অনুরক্ত, তার বেশি কিছু নয় (এরকম মনে করার কোনো কারণ নেই যে এঁরা স্বামীজীর প্রতিটি লেখা খুব খুঁটিয়ে পড়ে তারপর তাঁর প্রতি অনুরক্ত হয়েছেন) আর স্বামীজীর এই বক্তব্যগুলো ওঁদের সামনে রাখলে ওঁরাও এইসব আজগুবি, অবান্তর, কাঁঠালের আমসত্ত্ব মার্কা কথাবার্তাগুলোকে মান্যতা দিতে পারবেন না।

Saturday, 2 March 2024

স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা - দ্বিতীয় খণ্ড (সমালোচনামূলক লেখা)

 ১) "বেদ যাঁহাদের হৃদয়নিঃসৃত, তাঁহাদের চিন্তাশক্তি মূলতত্ত্বের অনুধাবন ও আবিষ্কারেই অভিনিবিষ্ট ছিল। তাঁহারা যেন এই-সকল তত্ত্বের বিস্তারিত অনুশীলন করিবার অবসর পান নাই এবং সেজন্য অপেক্ষাও করেন নাই। তাঁহারা বস্তুর গভীরতম প্রদেশে উপনীত হইতে ব্যগ্র ছিলেন। এই জগতের অতীত কিছু যেন তাঁহাদিগকে আকর্ষণ করিতেছিল, তাঁহারা যেন আর অপেক্ষা করিতে পারিতেছিলেন না। বস্তুতঃ উপনিষদের মধ্যে ইতস্ততোবিক্ষিপ্ত, আধুনিক বিজ্ঞানে আলোচিত বিশেষ সিদ্ধান্তগুলি অনেক সময়ে ভ্রমাত্মক হইলেও উহাদের মূলতত্ত্বগুলির সহিত বিজ্ঞানের মূলতত্ত্বের কোন প্রভেদ নাই।" (পৃষ্ঠা ২)

"খ্রীষ্টজন্মের বহু পূর্বেই ক্রমবিকাশবাদ বেদে স্থান পাইয়াছে, কিন্তু ডারুইন এই মতবাদটি সত্য বলিয়া স্বীকার না করা পর্যন্ত, ইহা হিন্দুদিগের একটি কুসংস্কাররূপে পরিগণিত হইত।" (পৃষ্ঠা ৩২৭)

"আর সর্বশাস্ত্রেই যে-সকল অলৌকিক ব্যাপারের উল্লেখ আছে, এই যোগীরা সেইগুলি বৈজ্ঞানিকভাবে ব্যাখ্যা করিয়া থাকেন। প্রশ্ন এইঃ প্রত্যেক জাতির ভিতর এই-সব অলৌকিক কার্যের বিবরণ প্রবেশ করিল কিরূপে? যে বলে—এ সমুদয় মিথ্যা, এগুলির ব্যাখ্যার কোন প্রয়োজন নাই, তাহাকে যুক্তিবাদী বা বিচারপরায়ণ বলিতে পারা যায় না।" (পৃষ্ঠা ৩৫৫)

মতামত: ধার্মিকদের এরূপ অবান্তর ধারণার বিরুদ্ধেই প্রখ্যাত বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা লিখেছিলেন "সবই ব্যাদে আছে"। এই ধর্মযাজকগণ তাঁদের এরূপ বক্তব্যের সত্যতা প্রমাণের জন্য কোনোদিনই কোনো প্রমাণ, সাক্ষ্য বা দলিলের ধার ধারেন না। 

২) "এই প্রসঙ্গে আপনাদের মধ্যে কাহারও কাহারও হয়তো জানিয়া আনন্দ হইতে পারে যে, আধুনিক ইওরোপীয় বৈজ্ঞানিকদিগের মতানুযায়ী এই পৃথিবীতে যেভাবে জীব-সৃষ্টি হইল, তাহা বৈদিকদর্শনেও পাওয়া যায়। আপনারা সকলেই নিশ্চয় জানেন যে, জীব অন্য গ্রহাদি হইতে পৃথিবীতে আসিয়াছে—এইরূপ একটি মত প্রচলিত আছে। জীব চন্দ্রলোক হইতে পৃথিবীতে আসে—কোন কোন বৈদিক দার্শনিকের ইহাই স্থির বিশ্বাস।" (পৃষ্ঠা ২)

মতামত: পৃথিবীতে জীব চাঁদ বা অন্য গ্রহ থেকে এসেছে, এমন কোনো মত বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করতে পারেননি কিন্তু তাতে ধর্মের ঠিকাদারদের কীই বা যায় আসে?

৩) "ভারতীয় নারীগণের বাধ্যতামূলক বৈধব্যজনিত দুঃখ প্রতিকারের জন্য আমাদের সংস্কারকগণ প্রচার করিতেছেন। পাশ্চাত্যে বিবাহের পাত্র পাওয়া যায় না, ইহাই বি‎ষম সমস্যা। একস্থানে কুমারীদের সাহায্য করিতে হইবে, তাহারা দু্ঃখ পাইতেছে; অন্যস্থানে বিধবাদের সাহায্য করিতে হইবে, তাহারা কষ্ট পাইতেছে। দেহের পুরাতন বাতব্যাধির মত মাথা হইতে তাড়িত হইয়া ইহা শরীরের অন্য স্থান আশ্রয় করিতেছে; আবার সেখান হইতে পাদদেশ আক্রমণ করিতেছে। সংস্কারক আসিয়া সাধারণের মধ্যে প্রচার করিলেন—বিদ্যা ধন সংস্কৃতি কয়েকজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকিবে না, তাঁহারা এগুলি সকলের আয়ত্তের মধ্যে আনিবার চেষ্টা করিলেন। ইহাতে কেহ কেহ এক হিসাবে কতকটা সুখী হইল বটে, কিন্তু সংস্কৃতি যতই বাড়িতে লাগিল, শারীরিক সুখ হয়তো ততই কমিতে লাগিল। সুখের জ্ঞানের সঙ্গে সঙ্গে দুঃখের জ্ঞানও আসিতেছে! কোন্ পথে যাইব? আমরা যে সামান্য সুখ ভোগ করিতেছি, তাহাই হয়তো অন্য কোথাও সমপরিমাণ দুঃখ উৎপন্ন করিতেছে। ইহাই নিয়ম। যুবকেরা হয়তো ইহা স্পষ্ট বুঝিতে পারিবে না। কিন্তু যাঁহারা দীর্ঘদিন জীবিত আছেন, অনেক যন্ত্রণা ভোগ করিয়াছেন, তাঁহারা ইহা উপলব্ধি করিতে পারিবেন। ইহাই মায়া।" (পৃষ্ঠা ৬)

মতামত: ১৯০১ সালের জনগণনা অনুযায়ী ভারতবর্ষে প্রতি পুরুষ ও নারীর অনুপাত ১০০০:৯৭২, উনি যেটাকে পাশ্চাত্যের সমস্যা বলে আখ্যা দিলেন, সেটা প্রাচ্যেরও সমস্যা ছিল।

স্বামী বিবেকানন্দ ছিলেন বিধবা বিবাহ সংস্কারের বিরোধী তাই তিনি তাঁর এই বক্তব্যে অবান্তর কিছু উদাহরণ ব্যবহার করে পরিশেষে "মায়া" নামক একটি অশ্বডিম্ব প্রসব করলেন। 

৪) "সকল সমাজেই অহরহঃ দেখা যাইতেছে—মূর্খ সাধারণ মানুষ তিরস্কৃত হইলে বেশী দুঃখ অনুভব করে না, কিন্তু প্রহারের আতিশয্য হইলে ক্লিষ্ট হইয়া থাকে। শিক্ষিত ভদ্রলোক কিন্তু একটি কথার তিরস্কারও সহ্য করিতে পারেন না, তাঁহার স্নায়ুমণ্ডল এত সূক্ষ্ম হইয়াছে! তাঁহার সুখানুভূতি সহজ হইয়াছে বলিয়া তাঁহার দুঃখও বাড়িয়াছে। দার্শনিক পণ্ডিতগণের—ক্রমবিকাশবাদীদের মতটি ইহার দ্বারা বিশেষ প্রমাণিত হয় না।" (পৃষ্ঠা ৮) 

মতামত: উপরের উদাহরণের সাথে ক্রমবিকাশবাদ বা ডারউইনের বিবর্তনবাদ তত্ত্বের সম্বন্ধ খুঁজে পাওয়াকেই বলে কাঁঠালের আমসত্ত্ব।

৫) "এ-কথাও আমি অস্বীকার করিতে পারি না যে, বাল্যবিবাহ হিন্দুজাতিকে পবিত্রতায় ভূষিত করিয়াছে।" (পৃষ্ঠা ১১)

মতামত: বাল্যবিবাহ নামক একটি অতি প্রাচীন, বর্বর, অমানবিক প্রথাকে নির্লজ্জ সমর্থন। 

৬) "যখন যৌন অপবিত্রতা কোন জাতির মধ্যে প্রবেশ করে, তখনই বুঝিতে হইবে উহার বিনাশ আসন্ন। এই-সকল দুঃখজনক সমস্যার মীমাংসা কোথায়? যদি পিতা-মাতা নিজ সন্তানের জন্য পাত্র বা পাত্রী নির্বাচন করেন, তাহা হইলে এই দোষ অনেকটা নিবারিত হয়। ভারতের কন্যাগণ যতটা ভাবপ্রবণ তদপেক্ষা অধিক বাস্তববাদী, কিন্তু তাহাদের জীবনে কবিত্বের বিশেষ অবকাশ থাকে না। আবার যদি লোকে নিজেরাই স্বামী ও স্ত্রী নির্বাচন করে, তাহাতেও অধিক সুখ হয় না।" (পৃষ্ঠা ১২)

মতামত: মনুবাদী মতের সমর্থন। 

মনু সংহিতার ৯/৩ শ্লোকে আমরা দেখতে পাই - বিবাহের পূর্ব্বে কন্যাবস্থায় স্ত্রীলোককে পিতা রক্ষা করিবেন, বিবাহিতা স্ত্রীকে যৌবনাবস্থায় ভর্ত্তা রক্ষা করিবেন, বৃদ্ধাবস্থায় পুত্রেরা রক্ষা করিবে, পতি-পুত্র-বিহীনা স্ত্রীকেও সন্নিহিত পিত্রাদিরা রক্ষা করিবে, কোন অবস্থায় স্ত্রীলোক স্বাধীন থাকিবে না। (মনুসংহিতা, সম্পাদনা ও অনুবাদ ডঃ মানবেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় শাস্ত্রী, পৃষ্ঠা ৭৫৬)  

৭) "‘অমুক ঋষি বা মহাপুরুষ বলিয়াছেন, অতএব ইহা বিশ্বাস কর’—এইরূপ বলাতে যদি ধর্মগুলি উপহাসের যোগ্য হয়, তবে আধুনিকগণ অধিকতর উপহাসের পাত্র। এখনকার কালে যদি কেহ মুশা, বুদ্ধ বা ঈশার উক্তি উদ্ধৃত করে, সে হাস্যাস্পদ হয়; কিন্তু হাক্সলি, টিণ্ডাল বা ডারুইনের নাম করিলেই লোকে সে কথা একেবারে নির্বিচারে গলাধঃকরণ করে।"  (পৃষ্ঠা ১৯)

মতামত: অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের ধর্মপ্রবক্তাদের মতোই ডারউইনের বিবর্তনবাদ মানতে নারাজ স্বামী বিবেকানন্দ অথচ বর্তমানে প্রায় ৯৭ শতাংশ বিজ্ঞানী ডারউইনের বিবর্তনবাদকে মান্যতা দিয়েছেন। বাস্তবে সকল ধর্মব্যবসায়ীরা বিজ্ঞানের পরীক্ষিত সত্যকে মানতে নারাজ।

https://www.pewresearch.org/politics/2009/07/09/section-5-evolution-climate-change-and-other-issues/

৮) "আগে ছিল ধর্মের কুসংস্কার, এখন হইয়াছে বিজ্ঞানের কুসংস্কার; আগেকার কুসংস্কারের ভিতর দিয়া জীবনপ্রদ আধ্যাত্মিক ভাব আসিত; আধুনিক কুসংস্কারের ভিতর দিয়া কেবল কাম ও লোভ আসিতেছে।" (পৃষ্ঠা ১৯)

মতামত: অন্যান্য ধর্মযাজকগণের মতোই স্বামীজী তাঁর বক্তব্যে সত্যতা প্রমাণের জন্য কোনো প্রমাণ, সাক্ষ্য বা দলিলের ধার ধারলেন না।

https://www.shongshoy.com/%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%AC%E0%A6%B2%E0%A7%8B%E0%A6%95%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%AF%E0%A7%8C%E0%A6%A8%E0%A6%9C%E0%A7%80%E0%A6%AC%E0%A6%A8/

৯) "ক্রমবিকাশবাদী পণ্ডিতগণ মনে করেন, তাঁহারা যেন এই সিদ্ধান্ত একেবারে খণ্ডন করিয়াছেন। তাঁহাদের মতে মানুষ ক্ষুদ্র মাংসল প্রাণী-বিশেষের (mollusc) ক্রমবিকাশমাত্র, অতএব পূর্বোক্ত পৌরাণিক সিদ্ধান্ত সত্য হইতে পারে না। ভারতীয় পুরাণ কিন্তু উভয় মতেরই সমন্বয় করিতে সমর্থ।" (পৃষ্ঠা ১৯)

মতামত: কেবলমাত্র "উপনিষদ" নামক একটি ধার্মিক বইয়ের বিভিন্ন গাঁজাখুরি গপ্পোকথার ওপর ভিত্তি করে বিজ্ঞানের ওপর ধর্মকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য সচেষ্ট স্বয়ং স্বামী বিবেকানন্দ।

১০) "পরীক্ষা দ্বারা বরং ইহা প্রদর্শন করা সম্ভব—যাহাকে আমরা জড় বলি, তাহার অস্তিত্ব নাই, উহা কেবল শক্তির এক বিশেষ অবস্থামাত্র।" (পৃষ্ঠা ২০)

মতামত: কোন পরীক্ষা দ্বারা জড় পদার্থ অস্তিত্ববিহীন প্রমাণ করা যায়? স্বামীজীর কাছে উত্তর আশা করাও বৃথা কারণ উনি অন্যসব ধর্মের ঠিকাদারদের মতোই কোনোদিনই কোনো প্রমাণ, সাক্ষ্য বা দলিলের ধার ধারেননি।  

১১) "যদি আজ মনুষ্যজাতির খুব সামান্য অংশও স্বার্থপরতা সঙ্কীর্ণতা ক্ষুদ্রত্ব ত্যাগ করিতে পারে তবে কালই এই জগৎ স্বর্গে পরিণত হইবে—নানাবিধ যন্ত্রপাতি এবং বাহ্য-জগৎ-সম্বন্ধীয় জ্ঞানের উন্নতিতে তাহা কখনও হইবে না। যেমন অগ্নিতে ঘৃত নিক্ষেপ করিলে অগ্নিশিখা আরও বর্ধিত হয়, তেমনি এগুলি দুঃখই বৃদ্ধি করে। আত্মজ্ঞান ব্যতীত যাবতীয় জড়ের জ্ঞান অগ্নিতে ঘৃতাহুতি মাত্র। জড়বিজ্ঞান—স্বার্থপর লোকের হাতে পরস্ব কাড়িয়া লইবার এবং পরার্থে জীবন উৎসর্গ না করিয়া অপরকে শোষণ করিবার আর একটি যন্ত্র তুলিয়া দেয় মাত্র।" (পৃষ্ঠা ২৭)

মতামত: বিজ্ঞান শিক্ষা বা বিজ্ঞান সচেতন মনন গড়ে তোলার ব্যাপারে তীব্র আপত্তি স্বামীজীর।

১২) "যাঁহারা সকামভাবে সৎকার্য করেন, তাঁহারা মৃত্যুর পর চন্দ্রলোকে গমন করেন। এখানে নানাবিধ স্বর্গ আছে। তাঁহারা এখানে সূক্ষ্ম- শরীর—দেবশরীর লাভ করেন। তাঁহারা দেবতা হইয়া এখানে বাস করেন ও দীর্ঘকাল ধরিয়া স্বর্গসুখ উপভোগ করেন। এই ভোগের অবসানে আবার তাঁহাদের পুরাতন কর্ম বলবান হয়, সুতরাং পুনরায় তাঁহাদের মর্ত্যলোকে জন্ম হয়। তাঁহারা বায়ুলোক, মেঘলোক প্রভৃতি লোকের ভিতর দিয়া আসিয়া অবশেষে বৃষ্টিধারার সহিত পৃথিবীতে পতিত হন। বৃষ্টির সহিত পতিত হইয়া তাঁহারা কোন শস্যকে আশ্রয় করিয়া থাকেন। তৎপরে সেই শস্য কোন ব্যক্তি ভোজন করিলে তাহার ঔরসে সেই জীবাত্মা পুনরায় দেহ পরিগ্রহ করে।" (পৃষ্ঠা ৩৫)

মতামত: ইহা দ্বৈতবাদীদের মত; তথাপি স্বামীজী বুঝতে পারছেন না যে ধর্মগুলি কেন উপহাসের যোগ্য হয়ে উঠেছে! (দেখুন - ৭)

১৩) "বেদান্তদর্শনের মতে মানুষই জগতের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাণী আর এই পৃথিবীই সর্বশ্রেষ্ঠ স্থান, কারণ এইখানেই মুক্ত হইবার সম্ভাবনা। দেবতা প্রভৃতিকেও মুক্ত হইতে হইলে মানবজন্ম গ্রহণ করিতে হইবে। এই মানবজন্মেই মুক্তির সর্বাপেক্ষা অধিক সুবিধা।" (পৃষ্ঠা ৩৬)

মতামত: অন্য কোন গ্রহে প্রাণ আছে কিনা সে নিয়ে বিজ্ঞানীরা এখনও পরীক্ষানিরীক্ষা চালাচ্ছেন, তাঁরা আজও  কোনও চূড়ান্ত ফলাফলে পৌঁছাতে পারেননি কিন্তু স্বামীজী ও তাঁর মতো অন্য বাবাজীরা কোনো পরীক্ষা নিরীক্ষার পরোয়া না করেই বাতলে দিলেন - পৃথিবী থেকেই মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা, আসলে ওঁরা তো পৃথিবীতেই পসার জমাতে এসেছেন, বিশেষ করে ভারতবর্ষে।

১৪) "বাস্তবিক নিজের মস্তিষ্ক তো কেহ কখনও দেখে নাই।" (পৃষ্ঠা ৫৪)

মতামত: বর্তমানে বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব আবিষ্কারের ফলে ইহাও সম্ভব হয়েছে।

১৫) "আমরা ধর্মবিষয়ে স্বাধীনতা দিয়াছিলাম, তাহার ফলস্বরূপ এখনও আমরা ধর্মজগতে মহাশক্তির অধিকারী। তোমরা সামাজিক বিষয়ে সেই স্বাধীনতা দিয়াছ, তাহার ফলে তোমাদের অতি সুন্দর সামাজিক প্রণালী। আমরা সামাজিক উন্নতি-বিষয়ে কিছু স্বাধীনতা দিই নাই, তাই আমাদের সমাজ সঙ্কীর্ণ। তোমরা ধর্ম সম্বন্ধে স্বাধীনতা দাও নাই, ধর্ম-বিষয়ে প্রচলিত মতের ব্যতিক্রম করিলেই অমনি বন্দুক, তরবারি বাহির হইত! তাহার ফল—ইওরোপে ধর্মভাব সঙ্কীর্ণ।" (পৃষ্ঠা ৫৭)

মতামত: সর্বৈব মিথ্যা কথা। রামায়ণে মর্যাদাপুরুষোত্তম রাজা রাম বেদ অধ্যয়ন করার অপরাধে এক নিচু জাতের বালক, শম্বুককে হত্যা করেন। দক্ষিণ ভারতে শিব ও বিষ্ণু ভক্তদের মধ্যেও প্রচুর দ্বন্দ্ব বিদ্যমান ছিল। তাই, এই বক্তব্য পুরোপুরি ভ্রান্ত।

https://www.deccanchronicle.com/nation/in-other-news/170416/where-shiva-vishnu-bhakts-clashed.html

১৬) "বেদান্তের আলোকে তোমরা বুঝিবে—সব বিজ্ঞান কেবল ধর্মেরই বিভিন্ন বিকাশ মাত্র, জগতের আর সব জিনিষও ঐরূপ।" (পৃষ্ঠা ৫৭)

মতামত: আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় বলেছিলেন : 'বিশ্বাস' আর যা-ই দিক, বিজ্ঞান দিতে পারে না।

১৭) "সকল সমাজেই দুইটি বিভিন্ন দল দেখিতে পাওয়া যায়। একদল জড়বাদী, বিরুদ্ধবাদী, আর একদল নিশ্চিতবাদী সংগঠনকারী। মনে কর—সমাজে কোন দোষ আছে, অমনি একদল উঠিয়া গালাগালি করিতে আরম্ভ করিল। ইহারা অনেক সময় গোঁড়া হইয়া দাঁড়ায়। সকল সমাজেই ইহাদিগকে দেখিতে পাইবে; আর মেয়েরা প্রায়ই এই চীৎকারে যোগ দিয়া থাকেন, কারণ তাঁহারা স্বভাবতই ভাবপ্রবণ।" (পৃষ্ঠা ৫৭)

মতামত: সকল সমাজে মেয়েদের বিরুদ্ধবাদী, জড়বাদীদের সাথে যোগ দেওয়ার কারণ প্রতিটি ধর্মগ্রন্থ পুরুষদের দ্বারা রচিত আর কোনো সংগঠিত ধর্মই নারীদের পূর্ণমানবের সন্মান দেয় না। 

১৮) "সাদা কথায় ইহার অর্থ এই, দিবারাত্র ভণ্ডামি, মিথ্যাচার ও প্রতারণার জীবন যাপন কর—তোমার ক্ষতগুলি যতদূর পার ঢাকিয়া রাখ। তালির উপর তালি দাও, শেষে প্রকৃত জিনিষটিই যেন নষ্ট হইয়া যায়, আর তুমি কেবল একটি জোড়াতালির সমষ্টিতে পরিণত হও। ইহাকেই বলে—সাংসারিক জীবন। যাহারা এইরূপ জোড়াতালি লইয়া সন্তুষ্ট, তাহারা কখনও ধর্মলাভ করিতে পারিবে না!" (পৃষ্ঠা ৬৪)

"সত্য জানিব অথবা এই চেষ্টায় প্রাণ দিব; কারণ সংসারের দিকে তো আর কিছু পাইবার আশা নাই, ইহা শূন্য—ইহা প্রতিদিন লয় পাইতেছে।" (পৃষ্ঠা ৬৪)

"সকল ধর্মই জগৎ হইতে বাহিরে যাইবার অর্থাৎ মুক্তির উপদেশ দিতেছে। এই সকল বিভিন্ন ধর্মের উদ্দেশ্য—সংসার ও ধর্মের মধ্যে একটা আপস করিয়া লওয়া নহে, বরং ধর্মকে নিজ আদর্শে দৃঢ়প্রতিষ্ঠিত করা, সংসারের সঙ্গে আপস করিয়া ঐ আদর্শকে ছোট করিয়া ফেলা নহে।" (পৃষ্ঠা ৬৫)

মতামত: স্বামীজীর বহু বক্তব্য দ্বিচারিতায় পরিপূর্ণ। প্রথম খণ্ডে নিজেই বলেছিলেন "সংসারী অপেক্ষা সংসারত্যাগী মহত্তর, এ-কথা বলা বৃথা। সংসার হইতে স্বতন্ত্র থাকিয়া স্বাধীন সহজ জীবনযাপন অপেক্ষা সংসারে থাকিয়া ঈশ্বরের উপাসনা করা অনেক কঠিন কাজ।" (পৃষ্ঠা ৪৯) 

কোনটাকে সত্যি বলে স্বীকার করব?

১৯) "অদ্বৈতবাদই একমাত্র ধর্ম, যাহা আধুনিক বৈজ্ঞানিকগণের সিদ্ধান্তসমূহের সহিত ভৌতিক ও আধ্যাত্মিক উভয় দিকেই যে শুধু মেলে তাহা নয়, বরং ঐ-সকল সিদ্ধান্ত অপেক্ষাও উচ্চতর সিদ্ধান্ত স্থাপন করে, আর এইজন্যই ইহা আধুনিক বৈজ্ঞানিকগণের অন্তর এতখানি স্পর্শ করিয়াছে। তাঁহারা দেখিতেছেন, প্রাচীন দ্বৈতবাদাত্মক ধর্মসমূহ তাঁহাদের পক্ষে পর্যাপ্ত নহে, উহাতে তাঁহাদের জ্ঞানের ক্ষুধা মিটিতেছে না। কিন্তু এই অদ্বৈতবাদে তাঁহাদের জ্ঞানের ক্ষুধা মিটিতেছে। মানুষের শুধু বিশ্বাস থাকিলে চলিবে না, এমন বিশ্বাস থাকা চাই, যাহাতে তাহার জ্ঞানবৃত্তি চরিতার্থ হয়। যদি মানুষকে বলা হয়—যাহা দেখিবে, তাহাই বিশ্বাস কর, তবে শীঘ্রই তাহাকে উন্মাদাগারে যাইতে হইবে।" (পৃষ্ঠা ৭৬)

মতামত: দ্বৈতবাদকে খণ্ডন করার জন্য স্বামীজী বিজ্ঞানীদের নিজের পক্ষে টেনে নিলেন; যদিও বিজ্ঞান পরীক্ষা, নিরীক্ষা, প্রমাণের ওপর প্রতিষ্ঠিত; কারো বিশ্বাসের ওপর নয়, কারো কথার ওপর নয়। 

২০) "কুসংস্কারের এমনি প্রভাব যে, যাহারা এই পুনর্জন্মবাদ অস্বীকার করে, তাহারাই আবার বিশ্বাস করে, এক সময়ে আমরা বানর ছিলাম; কিন্তু তাহাদের বানর-জন্ম কেন স্মরণ হয় না—এ বিষয়ে অনুসন্ধান করিতেও ভরসা করে না।" (পৃষ্ঠা ৯৬)

"পুনর্জন্মবাদ ব্যতীত জ্ঞান অসম্ভব। মনে কর, আমি রাস্তায় গিয়া একটা কুকুর দেখিলাম। উহাকে কুকুর বলিয়া জানিলাম কিরূপে? যখনই উহার ছাপ আমার মনের উপর পড়িল, উহার সহিত মনের ভিতরকার পূর্বসংস্কারগুলি মিলাইতে লাগিলাম। দেখিলাম—আমার যাবতীয় পূর্বসংস্কার স্তরে স্তরে সাজানো রহিয়াছে। নূতন কোন বিষয় আসিবামাত্র আমি সেটিকেই প্রাচীন সংস্কারগুলির সহিত মিলাইয়া দেখি। যখনই দেখি, সেই ভাবের আর কতকগুলি সংস্কার রহিয়াছে, অমনি আমি ঐগুলিকে সেগুলির সহিত মিলাই, তখনই আমার তৃপ্তি আসে। আমি তখন উহাকে কুকুর বলিয়া জানিতে পারি, কারণ উহা পূর্বাবস্থিত কতকগুলি সংস্কারের সহিত মেলে।" (পৃষ্ঠা ৯৭)

মতামত: পুরো বক্তব্যটাই কাঁঠালের আমসত্ত্ব।

২১) "যদিও দেখিয়াছি, পুনর্জন্মবাদ প্রমাণ করিতে হইলে তাহার সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতিও থাকিবে—ইহা প্রমাণ করার কোন প্রয়োজন নাই, তথাপি আমরা ইহা দৃঢ়ভাবে বলিতে পারি যে, অনেকের এরূপ স্মৃতি দেখা যায়, আর তোমরাও সকলে যে-জন্মে মুক্তিলাভ করিবে, সেই জন্মে এই স্মৃতি লাভ করিবে। কেবল তখনই জানিতে পারিবে—জগৎ স্বপ্নমাত্র, তখনই অন্তরের অন্তরে বুঝিবে যে, আমরা এই জগতে অভিনেতামাত্র, আর এই জগৎ রঙ্গভূমি, তখনই প্রবলবেগে অনাসক্তির ভাব তোমাদের ভিতর আসিবে, তখনই যত কিছু ভোগতৃষ্ণা—জীবনের উপর এই তীব্র আগ্রহ—এই ‘সংসার’ চিরকালের জন্য চলিয়া যাইবে। তখন তুমি স্পষ্টই দেখিবে, তুমি জগতে কতবার আসিয়াছ, কত লক্ষ লক্ষ বার তুমি পিতা-মাতা পুত্র-কন্যা স্বামী-স্ত্রী বন্ধু ঐশ্বর্য শক্তি লইয়া কাটাইয়াছ। কতবার এই-সকল আসিয়াছে, কতবার চলিয়া গিয়াছে। কতবার তুমি সংসার-তরঙ্গের উচ্চ চূড়ায় উঠিয়াছ, আবার কতবার তুমি নৈরাশ্যের গভীর গহ্বরে নিমজ্জিত হইয়াছ। যখন স্মৃতি তোমার নিকট এইসকল আনিয়া দিবে, তখনই কেবল তুমি বীরের ন্যায় দাঁড়াইবে, এবং জগৎ তোমায় ভ্রূভঙ্গী করিলে তুমি শুধু হাসিবে। তখনই তুমি বীরের মত দাঁড়াইয়া বলিতে পারিবে—‘মৃত্যু, তোমাকেও আমি গ্রাহ্য করি না, তুমি আমাকে কি ভয় দেখাও?’ যখন তুমি জানিতে পারিবে, তোমার উপর মৃত্যুর কোন শক্তি নাই, তখনই তুমি মৃত্যুকে জয় করিতে পারিবে। আর সকলেই কালে এই অবস্থা লাভ করিবে।" (পৃষ্ঠা ৯৬)

মতামত: গল্পের গোরুকে গাছে তোলা।

২২) "আমরা আমাদের পূর্বকর্মের দ্বারা শরীর-বিশেষ আশ্রয় করিয়া থাকি, আর যে-সকল পিতা-মাতা তাঁহাদের কর্মের গুণে ঐ আত্মাকে সন্তানরূপে পাইবার উপযুক্ত হইয়াছেন, তাঁহাদের নিকট হইতেই নূতন শরীরের উপাদান সংগৃহীত হয়।" (পৃষ্ঠা ৯৯)

মতামত: স্বামীজী বর্ণিত এই প্রক্রিয়ায় পিতামাতার সহবাসের বিশেষ কোনো প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না! 

২৩) "বল, আমি যে কষ্ট ভোগ করিতেছি, তাহা আমারই কৃতকর্মের ফল। ইহা দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, আমার দ্বারাই এই দুঃখকষ্ট দূরীভূত হইবে।" (পৃষ্ঠা ১০২)

"লক্ষ লক্ষ প্রজার শাসক সার্বভৌম রাজা অপেক্ষা অধিকতর কর্ম-ব্যস্ত মানুষ আর কল্পনা করা যায় না, তথাপি এই রাজারা গভীর চিন্তাশীল ছিলেন।" (পৃষ্ঠা ১৬৮)

মতামত: স্বামীজীর এই ধরণের বহু বক্তব্যই তাঁর সামন্ততান্ত্রিক প্রভুদের খুশি করবার স্বার্থে।

২৪) "এই সঙ্গে আর একটি প্রশ্ন আসে—ভবিষ্যৎ জানা সম্ভব কিনা? আপনারা অনেকে হয়তো এমন লোক দেখিয়াছেন, যিনি কোন ব্যক্তির ভূত-ভবিষ্যৎ সব বলিয়া দিতে পারেন। যদি ভবিষ্যৎ কোন নিয়মের অধীন না হয়, তবে ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে বলা কিরূপে সম্ভব? কিন্তু আমরা পূর্বেই দেখিয়াছি, অতীত ঘটনারই ভবিষ্যতে পুনরাবৃত্তি হইয়া থাকে।" (পৃষ্ঠা ১০৬)

মতামত: অসাধারণ দক্ষতার সাথে স্বামীজী আরেকটি কুসংস্কারকে অভ্রান্ত প্রমাণ করে দিলেন!

২৫) "প্রকৃতির ভূত ও ভবিষ্যৎ গণিতের মত সঠিকভাবে বলা সম্ভব।" (পৃষ্ঠা ১০৭)

মতামত: স্বামীজী এই গণিতটা বোধ হয় ওঁর গুরুভাইদের শেখাতে ভুলে গিয়েছিলেন নয়তো প্রতিটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের আগেই ওঁরা আমাদের সতর্ক করে দিতে পারতেন। 

২৬) "জগতে এমন অবস্থা কখনও আসিতে পারে না, যখন সবই ভাল হইয়া যাইবে, মন্দ কিছুই থাকিবে না। ইহাতে অনেকের চিরপোষিত আশা চূর্ণ হইতে পারে বটে, অনেকে ইহাতে ভয়ও পাইতে পারেন বটে, কিন্তু ইহা স্বীকার করা ব্যতীত আমি অন্য উপায় দেখিতেছি না।" (পৃষ্ঠা ১১৫)

আবার একটু আগেই তিনি নিজেই বলেছেন "যখনই আমি নিজেকে একটি ক্ষুদ্র দেহ বলিয়া মনে করি, তখনই জগতের অন্যান্য শরীরের সুখদুঃখের দিকে না চাহিয়া আমি দেহটিকে রক্ষা করিতে এবং উহার সৌন্দর্য সম্পাদন করিতে ইচ্ছা করি। তখন তুমি ও আমি ভিন্ন হইয়া যাই। যখনই এই ভেদজ্ঞান দেখা দেয়, তখনই উহা সর্বপ্রকার অমঙ্গলের দ্বার খুলিয়া দেয় এবং সর্বপ্রকার দুঃখ সৃষ্টি করে। সুতরাং পূর্বোক্ত জ্ঞানলাভে এই উপকার হইবে যে, যদি আজ মনুষ্যজাতির খুব সামান্য অংশও স্বার্থপরতা সঙ্কীর্ণতা ক্ষুদ্রত্ব ত্যাগ করিতে পারে তবে কালই এই জগৎ স্বর্গে পরিণত হইবে" (পৃষ্ঠা ২৭)

এবার তো বুঝতে পারছি না, জগতের কী হবে? ওঁর দুটো বক্তব্য তো পরস্পর বিরোধী।

২৭) "পাশ্চাত্যদিগের ন্যায় হিন্দুরাও সব হাতে-কলমে করিতে চান; তবে জীবন সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গী পৃথক‍্। পাশ্চাত্যগণ বলেনঃ বেশ ভাল একখানি বাড়ী কর, উত্তম খাদ্য ও পরিচ্ছদ সংগ্রহ কর, বিজ্ঞানের চর্চা কর, বুদ্ধিবৃত্তির উন্নতি কর। এইগুলি করিবার সময় তাঁহারা খুব কাজের লোক। কিন্তু হিন্দুরা বলেন, জ্ঞান-অর্থে আত্মজ্ঞান—তাঁহারা সেই আত্মজ্ঞানের আনন্দে বিভোর হইয়া থাকিতে চাহেন।" (পৃষ্ঠা ১২৩)

মতামত: ঠিকই তো বিজ্ঞান, বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা করে কী হবে? এই আত্মজ্ঞানে বলীয়ান হয়ে যে দেশে ৯৭ কোটি নরনারী ঠিক করে খেতে পান না, সে দেশে আমরা ১,৮০০ কোটি টাকার রাম মন্দির বানিয়ে গর্ববোধ করছি।  

https://bangla.hindustantimes.com/lifestyle/in-india-almost-97-crore-people-do-not-get-enough-to-eat-says-a-united-nations-report-31657435461727.html

২৮) "আপেল ভূমিতে কিরূপে পড়ে, অথবা বৈদ্যুতিক প্রবাহ কিরূপে স্নায়ুকে উত্তেজিত করে, যদি কেবল এইটুকু জানাই জীবনের একমাত্র কাজ হয়, তবে তো আমি এখনই আত্মহত্যা করি। আমার সংকল্প—সর্বকিছুর মর্মস্থল অনুসন্ধান করিব—জীবনের প্রকৃত রহস্য কি, তাহা জানিব। তোমরা প্রাণের ভিন্ন ভিন্ন বিকাশের আলোচনা কর, আমি প্রাণের স্বরূপ জানিতে চাই; আমার ‘দর্শন’ বলে—জগৎ ও জীবনের সমুদয় রহস্যই জানিতে হইবে—স্বর্গ নরক প্রভৃতি কুসংস্কার দূর করিয়া দিতে হইবে, যদিও এই পৃথিবীর মত ঐগুলির ব্যাবহারিক সত্তা আছে। আমি এই আত্মার অন্তরাত্মাকে জানিব—উহার প্রকৃত স্বরূপ জানিব—উহা কি, তাহা জানিব; শুধু উহা কিভাবে কাজ করিতেছে এবং উহার প্রকাশ কি, সেটুকু জানিলেই আমার তৃপ্তি হইবে না। আমি সকল জিনিষের ‘কেন’ জানিতে চাই; ‘কেমন করিয়া হয়’—এ অনুসন্ধান বালকেরা করুক।" (পৃষ্ঠা ১২৪)

মতামত: বিজ্ঞান শিক্ষা বা বিজ্ঞান সচেতন মনন গড়ে তোলার বিরুদ্ধে তীব্র আপত্তি স্বামীজীর। 

সত্যিই তো বিজ্ঞান আর কী পারে? একটা মারণ রোগের ওষুধ আবিষ্কার করে কোটি কোটি মানুষকে বাঁচাতে পারে কিন্তু এসব নিয়ে কোনো সদর্থক চিন্তাভাবনা নেই স্বামীজীর।

২৯) "তোমরা দেখিয়াছ, ক্রমবিকাশবাদের প্রমাণ কেবল এইঃ নিম্নতম হইতে উচ্চতম প্রাণী পর্যন্ত সকল দেহই পরস্পর সদৃশ; কিন্তু উহা হইতে তুমি কি করিয়া সিদ্ধান্ত কর যে, নিম্নতম প্রাণী হইতে ক্রমশঃ উচ্চতর প্রাণী জন্মিয়াছে এবং উচ্চতম হইতে ক্রমশঃ নিম্নতর জন্মে নাই? দুদিকেই যুক্তি সমান—আর যদি এই মতবাদে বাস্তবিক কিছু সত্য থাকে, তবে আমার বিশ্বাস এই যে, একবার নিম্ন হইতে উচ্চে, আবার উচ্চ হইতে নিম্নে যাইতেছে—ক্রমাগত এই দেহশ্রেণীর আবর্তন হইতেছে।" (পৃষ্ঠা ১৫৩)

মতামত: বক্তব্যটা পুরোপুরি অবৈজ্ঞানিক আর স্বামীজীর বিশ্বাসের ওপর বিজ্ঞান নির্ভর করে না।

৩০) "প্রাচীন ঋষিগণের নিকট বিশ্বপ্রকৃতি কথা বলিত; পশুপক্ষী—চন্দ্রসূর্য তাঁহাদের সহিত কথা বলিত। তাঁহারা একটু একটু করিয়া সকল জিনিষ অনুভব করিতে লাগিলেন, প্রকৃতির অন্তস্তলে প্রবেশ করিতে লাগিলেন। তাঁহারা চিন্তা দ্বারা বা বিচার দ্বারা উহা লাভ করেন নাই, কিংবা আধুনিক কালের প্রথা অনুযায়ী অপরের মস্তিষ্কপ্রসূত কতকগুলি বিষয় সংগ্রহ করিয়া একখানি গ্রন্থ প্রণয়ন করেন নাই, অথবা আমি যেমন তাঁহাদেরই একখানি গ্রন্থ লইয়া সুদীর্ঘ বক্তৃতা করিয়া থাকি, তাহাও করেন নাই; তাঁহাদিগকে সত্য আবিষ্কার করিতে হইয়াছিল।" (পৃষ্ঠা ১৮৮)

মতামত: গল্পের গোরুকে গাছে তুলতে গিয়ে স্বামীজী পশু, পক্ষী, চাঁদ, সূর্যের ভোকাল কর্ড (স্বরতন্ত্রী) পর্যন্ত বানিয়ে ফেললেন।

৩১) "ভগবানকে ‘পিতা’ বলা অপেক্ষা উচ্চতর ভাব আছে; সাধকেরা তাঁহাকে ‘মাতা’ বলিয়া থাকেন। তাহা অপেক্ষাও উচ্চতর ভাব আছে—তাঁহাকে ‘প্রিয়সখা’ বলা। সর্বাপেক্ষা উচ্চ ভাব—তাঁহাকে ‘আমার প্রেমাস্পদ’ বলা।" (পৃষ্ঠা ১৯৬)

একটু আগেই আবার স্বামীজী বললেন "ভগবানকে পিতা মাতা ভ্রাতা বা প্রিয় বন্ধু বলিলে তাঁহাকে ‘বিষয়ীভূত’ করিতে হয়—তাঁহাকে বাহিরে আনিয়া দেখিতে হয়, তাহা তো কখনও হইতে পারে না। তিনি সকল বিষয়ের (object) অনন্ত বিষয়ী (subject)।" (পৃষ্ঠা ৭৩)

দুটি কথা সম্পূর্ণভাবে পরস্পর বিরোধী।

৩২) "অনেক লোক হয়তো এক সময়ে ভাবিত, মাটিতে যাহা কিছু পড়ে, তাহা ভূতেই ফেলিতেছে, কিন্তু মাধ্যাকর্ষণই ইহার যথার্থ ব্যাখ্যা; আর যদিও আমরা জানি, ইহা সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা নহে, তথাপি ইহা অপর ব্যাখ্যা হইতে যে অনেক ভাল তাহা নিশ্চয়; কারণ একটি ব্যাখ্যা বস্তুর বহিঃস্থ কারণ হইতে, অন্যটি বস্তুর স্বভাব হইতে লব্ধ। এইরূপ আমাদের সমুদয় জ্ঞানের সম্বন্ধেই। যে-কোন ব্যাখ্যা বস্তুর প্রকৃতি হইতে লব্ধ, তাহা বৈজ্ঞানিক; আর যে-কোন ব্যাখ্যা বস্তুর বহির্দেশ হইতে লব্ধ, তাহা অবৈজ্ঞানিক।" (পৃষ্ঠা ১৯৯)

মতামত: প্রতিবারের মতোই স্বামীজী কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাকে ভুল প্রমাণ করার আগে কোনো প্রমাণ, সাক্ষ্য বা দলিলকে সামনে রাখার প্রয়োজনীয়তা বোধ করলেন না।

৩৩) "বাইবেল ও কোরানে যখন বিবাদ, তখন উভয়ের মধ্যে কেহই মধ্যস্থ হইতে পারে না। কোন স্বতন্ত্র ব্যক্তি মীমাংসক হইলেই ভাল হয়। কোন গ্রন্থ মীমাংসক হইতে পারে না, সার্বভৌম কোন-কিছুর দ্বারাই মীমাংসা হওয়া চাই। যুক্তি অপেক্ষা সার্বভৌম আর কি আছে? কেহ কেহ বলেন, যুক্তি সকল সময়ে সত্যানুসন্ধানে সমর্থ নহে। অনেক সময় যুক্তি ভুল করে বলিয়া এই সিদ্ধান্ত করা হইয়াছে যে, কোন পুরোহিত-সম্প্রদায়ের শাসনে বিশ্বাস করিতে হইবে। ... আমি কিন্তু বলি, যুক্তি যদি দুর্বল হয়, তবে পুরোহিত-সম্প্রদায় আরও দুর্বল, আমি তাঁহাদের কথা না শুনিয়া যুক্তিই শুনিব, কারণ যুক্তিতে যতই দোষ থাকুক, উহাতে কিছু সত্য পাইবার সম্ভাবনা আছে, কিন্তু অন্য উপায়ে সত্যলাভের কোন আশা নাই।" (পৃষ্ঠা ২০৪)

অথচ উনি নিজেই বলেছেন "মনকে আবার বৃথা তর্কের দ্বারা চঞ্চল করা উচিত নহে। কারণ পরমার্থতত্ত্ব তর্কের বিষয় নহে, প্রত্যক্ষের বিষয়। আমরা বরাবর শুনিয়া আসিতেছি, প্রত্যেক ধর্মই বিশ্বাসের উপর খুব জোর দেয়। আমরা অন্ধবিশ্বাস করিতে শিক্ষা পাইয়াছি। অবশ্য এই অন্ধবিশ্বাস যে মন্দ জিনিষ, তাহাতে কোন সংশয় নাই, কিন্তু এই অন্ধবিশ্বাস ব্যাপারটিকে একটু তলাইয়া দেখিলে বুঝিব, ইহার পশ্চাতে একটি মহান‍্ সত্য আছে। যাহারা অন্ধবিশ্বাসের কথা বলে, তাহাদের বাস্তবিক উদ্দেশ্য এই ‘অপরোক্ষানুভুতি’—আমরা এখন ইহার আলোচনা করিতেছি। মনকে বৃথা তর্কের দ্বারা চঞ্চল করিলে চলিবে না, কারণ তর্কদ্বারা কখনও ঈশ্বরলাভ হয় না। ঈশ্বর প্রত্যক্ষের বিষয়, তর্কের বিষয় নহেন। সমুদয় যুক্তি ও তর্কই কতকগুলি অনুভূতির উপর স্থাপিত। এইগুলি ব্যতীত তর্ক হইতেই পারে না।" (পৃষ্ঠা ১৪২)

দুটি বক্তব্য সম্পূর্ণভাবে পরস্পর বিরোধী। তর্ক করবো নাকি করবো না, সেটাই তো বুঝতে পারছি না।

৩৪) "আমরা সকলেই একটি জীবাণুকোষ হইতে উৎপন্ন হইয়াছি, আর আমাদের যাহা কিছু শক্তি আছে, তাহা ঐ জীবাণুকোষেই কুণ্ডলীকৃত হইয়া ছিল। তোমরা বলিতে পার না, উহা খাদ্য হইতে প্রাপ্ত; রাশীকৃত খাদ্য লইয়া খাদ্যের এক পর্বত প্রস্তুত কর, দেখ তাহা হইতে কি শক্তি বাহির হয়! আমাদের ভিতর শক্তি পূর্ব হইতেই নিহিত ছিল—অব্যক্তভাবে, কিন্তু ছিল নিশ্চয়ই।" (পৃষ্ঠা ২০৭)

মতামত: আরো একবার নিজের মনগড়া কু-যুক্তি দিয়ে ক্রমবিকাশবাদের সমালোচনা কারণ ক্রমবিকাশবাদকে মান্যতা দিলে ওঁর অভ্রান্ত "বেদান্তবাদ" তাসের ঘরের মতো লুটিয়ে পড়ত।

৩৫) "পূর্ববর্তী মতবাদগুলির সমন্বয়-সাধন করাই অদ্বৈতবেদান্তের অন্যতম বিশেষত্ব। অনেক সময় এই সমন্বয় দ্বারা এই দর্শনের অনেক উপকার হইয়াছিল, কোন কোন ক্ষেত্রে ক্ষতিও হইয়াছে। বর্তমান কালে ক্রমবিকাশবাদীদের যে মত, আমাদের প্রাচীন দার্শনিকগণ তাহা জানিতেন, তাঁহারা বুঝিতেন, দর্শন-চিন্তাও ধীরে ধীরে গড়িয়া ওঠে। এই কারণেই পূর্ব পূর্ব দর্শনপ্রণালীর মধ্যে একটি সামঞ্জস্য বিধান করা তাঁহাদের পক্ষে সহজ হইয়াছিল। কোন ভাবই পরিত্যক্ত হয় নাই।" (পৃষ্ঠা ২১২)

মতামত: যে কোনো উপায়ে বিজ্ঞানের ওপর অদ্বৈতবাদকে চাপিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা।

৩৬) "এক ব্যক্তি যে অপর ব্যক্তিকে হত্যা করে, তাহাও হয়তো নিজের সন্তানের প্রতি স্নেহের প্রেরণায়—তাহাদিগকে ভরণপোষণ করিবে বলিয়া। তাহার প্রেম অন্য লক্ষ লক্ষ ব্যক্তি হইতে প্রত্যাহৃত হইয়া ঐ একটি শিশু-সন্তানের উপর পড়িয়া সসীম ভাব ধারণ করিয়াছে। কিন্তু সীমাবদ্ধই হউক, অসীমই হউক, ভালবাসা সেই ভগবান্‌, অন্য কিছুই নহে।" (পৃষ্ঠা ২১৮)

মতামত: ভাগ্যিস ভারতীয় সংবিধান ধর্মনিরপেক্ষ, নয়তো স্বামীজীর যুক্তি অনুযায়ী সব খুনি, ধর্ষকরা নিজেদের বেদান্তবাদী আর বাড়িতে সন্তান আছে এই অজুহাত দেখিয়ে আইনের হাত থেকে মুক্ত হয়ে ঘুরে বেড়াত।

৩৭) "জ্ঞানই উপাসনা। আমরা যতই জ্ঞানলাভ করিতে পারি, ততই আমাদের মঙ্গল।" (পৃষ্ঠা ২১৯)

আবার একটু আগে নিজেই বললেন "তুমি কি অপরের জন্য প্রাণে প্রাণে অনুভব করিতেছ? যদি কর, তবে তোমার হৃদয়ে একত্বের ভাব বর্ধিত হইতেছে। যদি না কর, তবে তুমি একজন বড় বুদ্ধিজীবী হইতে পার, কিন্তু তোমার কিছুই হইবে না—কেবল শুষ্ক বুদ্ধিবাদী হইয়াই থাকিবে। আর যদি তোমার হৃদয় থাকে, তবে একখানি বই পড়িতে না পারিলেও, কোন ভাষা না জানিলেও তুমি ঠিক পথে চলিতেছ। ঈশ্বর তোমার সহায় হইবেন।" (পৃষ্ঠা ১৮০)

দুটি বক্তব্য সম্পূর্ণভাবে পরস্পর বিরোধী। কোনটা মেনে চলবো? 

৩৮) "সত্যই সকল আত্মার যথার্থ স্বরূপ। সত্যের উপর কে বিশেষ দাবী করিতে পারে? কিন্তু উহাকে কার্যে পরিণত করিতে হইবে, সরলভাবে উহা প্রচার করিতে হইবে, কারণ তোমরা দেখিবে—উচ্চতম সত্য অতি সহজ ও সরল। খুব সহজ ও সরলভাবে উহা প্রচার করিতে হইবে, যাহাতে ঐ ভাব সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অনুপ্রবিষ্ট হয়, যাহাতে উহা উচ্চতম মস্তিষ্ক হইতে আরম্ভ করিয়া অতি সাধারণ মনেরও অধিকারের বিষয় হইতে পারে, যাহাতে আবালবৃদ্ধবনিতা একই কালে উহা বুঝিতে পারে। এই-সকল ন্যায়ের কূটবিচার, দার্শনিক মতবাদ, এই-সকল দেবতাতত্ত্ব ও ক্রিয়াকাণ্ড একসময়ে উপকার করিয়া থাকিতে পারে, কিন্তু এস আমরা একমনে ধর্মকে সহজ করিবার চেষ্টা করি, আর সেই সত্যযুগ আনিবার সহায়তা করি, যখন প্রত্যেকটি মানুষ উপাসক হইবে, আর প্রত্যেক মানুষের অন্তর্নিহিত প্রকৃত সত্তা—সেই সৎস্বরূপই উপাস্য হইবেন।" (পৃষ্ঠা ২২১)

মতামত: স্বামীজী একটু আগেই বলেছেন "সত্যযুগ বলিয়া যে-যুগের বর্ণনা করিয়াছেন—যখন মানুষের ইচ্ছামৃত্যু ছিল, তখন মানুষ যতদিন ইচ্ছা শরীর রক্ষা করিতে পারিত" (পৃষ্ঠা ১৭)

সামনে সত্যযুগ, ইচ্ছামৃত্যুর গাজর ঝুলিয়ে ধর্মপ্রচার করার আবেদন; ভাগ্যিস লণ্ডনবাসী এসবে বিশেষ গুরুত্ব দেননি তাই ওই দেশ জ্ঞান বিজ্ঞানে বহু অংশে এগিয়ে গেছে। 

আর আজকের দিনের ফেসবুক বা ইউটিউব কনটেন্ট ক্রিয়েটররা যেভাবে শেয়ার করতে বলেন, তাঁদের সাথে স্বামীজীর এই বক্তব্যের কোনো পার্থক্য দেখি না।

৩৯) "জ্যোতির্বিদ্যা পাঠের সুবিধার জন্য তোমাদের মনে করিতে বলা হয়, সূর্য পৃথিবীর চারিদিকে ঘুরিতেছে, যদিও তাহা সত্য নহে।" (পৃষ্ঠা ২৪০)

মতামত: স্বামীজী জ্যোতির্বিদ্যা আর জ্যোতিষশাস্ত্রের মধ্যে পার্থক্যটা বুঝতেন না। জ্যোতির্বিদ্যাতে সূর্য পৃথিবীর চারিদিকে ঘুরছে, এমন মনে করতে বলা হবে কেন? 

৪০) "ন্যায়দর্শন-প্রণেতারা পুনর্জন্ম-তত্ত্বের সমর্থনে যে-যুক্তিটি বহুবার উপস্থিত করিয়াছেন এবং যাহা আমাদের দৃষ্টিতে এই প্রসঙ্গের সিদ্ধান্ত বলিয়া মনে হয়, তাহা হইল এই যে, আমাদের অভিজ্ঞতা কখনও সম্পূর্ণ বিলীন হয় না। আমাদের কার্যকলাপ (কর্ম) যদিও বাহ্যতঃ বিলুপ্ত হয়, তথাপি ‘অদৃষ্ট’রূপে বর্তমান থাকে, এবং পুনর্বার কার্যের মধ্যে প্রবৃত্তির আকারে আবির্ভূত হয়, এমন কি ছোট শিশুরাও কতকগুলি প্রবৃত্তি লইয়া জন্মগ্রহণ করে, যথা মৃত্যুভয়।" (পৃষ্ঠা ২৫৬)

মতামত: অবশ্যই শিশুরা কিছু স্বাভাবিক প্রবৃত্তি নিয়ে জন্মগ্রহণ করে কিন্তু ছোট শিশুদের মধ্যে মৃত্যুভয় থাকে না।

https://www.stanfordchildrens.org/en/topic/default?id=a-childs-concept-of-death-90-P03044

৪১) "পুনর্জন্মবাদ আমাদের নিকট অসীম গুরুত্ব লইয়া উপস্থিত হয়, কারণ আত্মার পুনর্জন্ম ও দেহ-কোষ অবলম্বনে প্রবৃত্তির সঞ্চারণ-বিষয়ে যে বিবাদ চলিতেছে, তাহা প্রকৃতপক্ষে অধ্যাত্মবাদ ও জড়বাদের সংগ্রাম। যদি কোষের মাধ্যমে সঞ্চারণই সন্তোষজনক ব্যাখ্যা হয়, তাহা হইলে জড়বাদ অনিবার্য, এবং তখন আত্মতত্ত্বের কোন প্রয়োজন থাকে না। ইহা যদি সন্তোষজনক ব্যাখ্যা না হয়, তাহা হইলে প্রত্যেক আত্মার একটি নিজস্ব সত্তা আছে এবং আত্মা তাহার বর্তমান জীবনে অতীতের অভিজ্ঞতা বহন করিয়া আনে—এই মতটি সম্পূর্ণ সত্য। এই দুই বিকল্প—পুনর্জন্মবাদ ও জড়বাদ; এই উভয়ের মধ্যে আর কোন কিছুর স্থান নাই। ইহার কোন্‌টি আমরা গ্রহণ করিব?" (পৃষ্ঠা ২৫৭)

এটা পড়ে আমরা বুঝতে পারছি বংশাণুবিজ্ঞান (Genetics) নিয়ে স্বামীজীর কোনো ধারণা ছিল না, যদিও উনি যে সময় দাঁড়িয়ে এটা বলেছিলেন, তখন সবে এই বিজ্ঞান নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে; তাই ওঁর এই বিষয়ে অজ্ঞতা নিয়ে কারো কোনো সমালোচনা থাকা উচিত নয় কিন্তু সব সমস্যার একটাই সমাধান "বেদান্তবাদ" - স্বামীজীর এই চিন্তাটাও প্রচণ্ড রক্ষণশীল এবং অবৈজ্ঞানিক। এটা সম্বন্ধে উনি আগেও একটা মতামত রেখেছেন "যতদিন না এই জড়বাদীরা প্রমাণ করিতে পারেন, কি করিয়া ঐ সংস্কার ঐ কোষে থাকিতে পারে, আর কোথায়ই বা থাকিতে পারে, যতদিন না তাঁহারা বুঝাইতে পারেন, এবং ‘মনোবৃত্তি শরীর-কোষে নিদ্রিত থাকে’, এই বাক্যেরই বা অর্থ কি, ততদিন তাঁহাদের সিদ্ধান্ত স্বীকার করিয়া লওয়া যাইতে পারে না। এ পর্যন্ত বেশ স্পষ্ট বুঝা গেল যে, এই সংস্কার মনেরই মধ্যে বাস করে, মনই জন্মজন্মান্তর গ্রহণ করিতে আসে; মনই আপন উপযোগী উপাদান গ্রহণ করে, আর যে মন বিশেষ প্রকার শরীর ধারণ করিবার উপযুক্ত কর্ম করিয়াছে, যতদিন পর্যন্ত না সে তাহা নির্মাণ করিবার উপযোগী উপাদান পাইতেছে, ততদিন তাহাকে অপেক্ষা করিতে হইবে। ইহা আমরা বুঝিতে পারি। অতএব আত্মার দেহ-গঠনের উপযোগী উপাদান প্রস্তুত করা পর্যন্তই বংশানুক্রমিক সঞ্চারবাদ স্বীকার করা যাইতে পারে। আত্মা কিন্তু জন্মান্তর গ্রহণ করেন—শরীরের পর শরীর নির্মাণ করেন; আর আমরা যে-কোন চিন্তা করি, যে-কোন কার্য করি, তাহাই সূক্ষ্মভাবে থাকিয়া যায়, আবার সময় হইলেই উহারা স্থূল ব্যক্তভাব ধারণ করিতে উন্মুখ হয়।" (পৃষ্ঠা ১০০)

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে রামকৃষ্ণ মিশন তাঁর এই অবৈজ্ঞানিক বক্তব্যটাকে অসার ও ভিত্তিহীন বলে স্বীকার করবে কী?

৪২) "বিজ্ঞানের কর্তব্য হইল উচ্চতর সামান্যীকরণের সাহায্যে জাগতিক ঘটনাগুলি ব্যাখ্যা করা। সুতরাং কোন ব্যাখ্যা-কালে যদি অপরাপর তথ্যের সহিত সামঞ্জস্য রক্ষার উদ্দেশ্যে ব্যাখ্যার জন্য উপস্থাপিত নূতন তথ্যের কিয়দংশ নষ্ট করিয়া ফেলা হয়, তবে ঐ ব্যাখ্যা আর যাহা কিছুই হউক, বিজ্ঞান-নামধেয় হইতে পারে না।

অতএব যে ব্যাখ্যায় এই সদা-বিদ্যমান এবং সর্বদা-আবশ্যক মুক্তির ধারণাকে উপেক্ষা করা হয়, তাহা উপরি-উক্ত প্রকারে ভ্রান্ত, অর্থাৎ অপর তথ্যগুলি ব্যাখ্যা করিবার উদ্দেশ্যে উহা নূতন তথ্যের একাংশ অস্বীকার করে, সুতরাং উহা ভ্রান্ত। অতএব আমাদের প্রকৃতির সহিত সামঞ্জস্য রাখিয়া একমাত্র অপর বিকল্পটি স্বীকার করা চলে, তাহা এই যে—আমাদের মধ্যে এমন কিছু আছে, যাহা মুক্ত এবং নিত্য।" (পৃষ্ঠা ২৬০)

মতামত: স্বামীজী দ্বৈতবাদ, বিশিষ্টাদ্বৈতবাদকেও স্বীকৃতি দিতে রাজি কিন্তু বিজ্ঞানকে নয় কারণ এই দুটি মতবাদ অদ্বৈতবাদের সাথে একটা ব্যাপারে একমত আর সেটা হলো "আত্মা"-র অস্তিত্ব। যুক্তিবাদের দৃষ্টিতে স্বামীজীর এই বক্তব্য পুরোপুরিভাবে লজিক্যাল ফ্যালাসি।

৪৩) "এই বিশ্ব যেমন অনাদি এবং অনন্ত, ঈশ্বরও তাই। তাহাই হওয়া উচিত, কারণ আমরা যদি বলি যে, এমন এক সময় ছিল, যখন স্থূল বা সূক্ষ্ম কোন আকারেই কোন সৃষ্টি ছিল না। তাহা হইলে বলিতে হয়, তখন কোন ঈশ্বরও ছিল না, কারণ ঈশ্বর আমাদের নিকট এই বিশ্বের সাক্ষিরূপেই বিদিত। কাজেই বিশ্ব যখন ছিল না, তখন তিনিও ছিলেন না। একটি ধারণা হইতেই অপরটি আসে। কার্যের ধারণা হইতেই আমরা কারণের ধারণা লাভ করি। কার্য যদি না থাকে, তাহা হইলে কারণও থাকিতে পারে না। কাজেই ইহা স্বভাবতই ধারণা করা যায়—বিশ্ব যেহেতু শাশ্বত, ঈশ্বরও শাশ্বত।" (পৃষ্ঠা ২৬৫)

মতামত: আধুনিক বিজ্ঞান প্রমাণ করে দিয়েছে এই বিশ্ব শাশ্বত নয়, বিশ্বের বয়স ৪৫৪.৩ কোটি বছর। তাহলে স্বামীজীর শাশ্বত ঈশ্বরের দাবীটা এখন বৈধ নয়।

https://education.nationalgeographic.org/resource/resource-library-age-earth/

https://www.shongshoy.com/%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%97-%e0%a6%ac%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%82-%e0%a6%a5%e0%a7%87%e0%a6%95%e0%a7%87-%e0%a6%ae%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%b6%e0%a7%8d%e0%a6%ac/#i-6

৪৪) "মন জড়ে রূপান্তরিত হয়, আবার জড়ও মনে রূপান্তরিত হয়, ইহা শুধু কম্পনের তারতম্য।

একটি ইস্পাতের পাত লও, উহাকে কম্পিত করিতে পারে—এইরূপ একটি শক্তি ইহাতে প্রয়োগ কর; তারপর কি ঘটিবে? যদি একটি অন্ধকার ঘরে এই পরীক্ষাটি করা হয়, তবে প্রথম তুমি শুনিতে পাইবে একটি শব্দ—একটি গুনগুন শব্দ। শক্তিপ্রবাহ বর্ধিত কর, দেখিবে ইস্পাতের পাতটি আলোকময় হইয়া উঠিয়াছে। শক্তি আরও বর্ধিত কর, ইস্পাতের দণ্ডটি আলোকময় হইয়া উঠিয়াছে। শক্তি আরও বর্ধিত কর, ইস্পাতটি একেবারে অদৃশ্য হইয়া যাইবে। উহা মনে রূপান্তরিত হইয়া গিয়াছে।" (পৃষ্ঠা ২৬৮)

মতামত: অন্ধকার ঘরে ইস্পাত দণ্ডটি আলোকময় হলো আবার অদৃশ্যও হয়ে গেল আর তার থেকে মন জড়ে রূপান্তরিত হয়, সেটাও প্রমাণ হয়ে গেল? আসলে ওঁর লেখাগুলো মুক্তমনে যদি খুঁটিয়ে পড়া যায় তাহলে ওঁর প্রতিটি বিজ্ঞান ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে থাকবে। বাস্তবে প্রতিটি ধর্ম ব্যবসায়ী এভাবেই কিছু বিজ্ঞান বিষয়ক শব্দাবলী ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে বোকা বানায়, এটাকে pseudoscience বলে।

ছদ্মবিজ্ঞান বা pseudoscience এমনই একটি দাবি, বিশ্বাস বা অনুশীলন যা বিজ্ঞান হিসাবে উপস্থাপিত হয় কিন্তু বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করে না। যদি গবেষণার কোনও বিষয়কে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির মানদণ্ড অনুসারে উপস্থাপন করা হয় তবে এটি এই মানদণ্ডগুলি অনুসরণ করে না।

৪৫) "আর একটি উদাহরণ লওঃ দশদিন আহার না করিলে আমি কোনপ্রকার চিন্তা করিতে পারি না। শুধু কয়েকটি এলোমেলো চিন্তা আমার মনে থাকিবে। আমি অত্যন্ত দুর্বল হইয়া পড়িব এবং সম্ভবতঃ আমার নামও ভুলিয়া যাইব। তারপর কিছু খাদ্য গ্রহণ করিলাম এবং কিছুক্ষণের মধ্যে চিন্তা করিতে আরম্ভ করিব; আমার মনের শক্তি ফিরিয়া আসিয়াছে। খাদ্যই মনে রূপান্তরিত হইয়াছে।" (পৃষ্ঠা ২৬৯)

মতামত: প্রতিটি ছত্রে ছত্রে অবৈজ্ঞানিক চিন্তাধারা; খাদ্য শক্তিতে রূপান্তরিত হলো না, খাদ্য সরাসরি মনে রূপান্তরিত হয়ে গেল।

https://www.ncbi.nlm.nih.gov/books/NBK26882/

৪৬) "তাহা হইলে ঈশ্বর, পূজা-অর্চনা প্রভৃতির কি হইবে? এগুলিরও প্রয়োজন আছে। আমি নিজেকে ঈশ্বর ও আমি—এই দুই অংশে ভাগ করিয়াছি; আমিই পূজিত হই এবং নিজেকে পূজা করি। কেন করিব না? ঈশ্বরই তো আমি। আমার আত্মাকে কেন পূজা করিব না? সর্বেশ্বর ভগবান্‌ যিনি, তিনি তো আমার আত্মাও। সবই খেলা, সবই কৌতুক; আর কোন উদ্দেশ্য নাই।

জীবনের পরিণাম ও লক্ষ্য কি? কিছুই না, কারণ আমি জানি—আমিই সেই অসীম। তোমরা যদি ভিক্ষুক হও, তোমাদের লক্ষ্য থাকিতে পারে। আমার কোন লক্ষ্য নাই, কোন অভাব নাই, কোন উদ্দেশ্য নাই। আমি তোমাদের দেশে আসিয়াছি, বক্তৃতা করিতেছি—নিছক মজার খেলা, আর কোন অর্থ নাই। কি অর্থই বা থাকিতে পারে?" (পৃষ্ঠা ২৮৪)

মতামত: দ্বৈতবাদের এত সমালোচনা করেও অবশেষে আমাদের দেশের পুরুতমশাইদের পেট চালানোর ব্যবস্থাটাকেও রেখে দিয়ে গেলেন। এর চেয়ে বড় দ্বিচারিতা আর কী হতে পারে?

স্বামীজী ঠিকই বলেছেন ভিক্ষুক হলে দিনের শেষে একটু খাবারের লক্ষ্য থাকবে বৈকি; একজন শ্রমিক সারাদিন হাড়ভাঙ্গা খাটুনির পরও পরিবারের মুখে দু'বেলা পেট ভর্তি খাবার তুলে দিতে পারেন না কিন্তু ওঁর জীবনের দিকে তাকালেই বোঝা যায় কোনো কাজ না করে, কোনোরকম পরিশ্রম না করে কী সুন্দর "ঠাকুর খেলা" নিয়ে শান্তিতে দিন কাটিয়েছেন, এমনকি ভক্তদের টাকায় একাধিকবার বিদেশেও গেছেন আর ওঁর দেখানো পথে ওঁর গুরুভাইয়েরা আজও সেই একই পদ্ধতি অনুসরণ করে চলেছেন।  

আসলে এই পোড়া দেশে একমাত্র এই বাবাজীরাই কোনোরকম কাজ না করে ভক্তদের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে বেশ সুখে শান্তিতে নির্গুণ ব্রহ্ম নিয়ে দিন কাটানোর সুযোগ পান।

৪৭) "একজন শিক্ষিত লোকের অবস্থা দেখ।

‘লোকে বলে এরূপ, লোকে বলে ওরূপ। ...’

‘বন্ধু, আপনি কি বলেন?’

‘আমি কিছুই বলি না।’

তিনি শুধু উদ্ধৃত করেন অন্যের চিন্তা; কিন্তু নিজে কিছুই করেন না। এই যদি শিক্ষা হয়, তাহা হইলে পাগলামি আর কাহাকে বলে? যাঁহারা গ্রন্থ লিখিয়াছিলেন, তাঁহাদের দিকে চাও! ... এই-সব আধুনিক লেখকগণ—দুইটি বাক্যও তাঁহাদের নিজেদের নয়! সবই উদ্ধৃতি! ..." (পৃষ্ঠা ২৮৬)

মতামত: স্বামীজী তাঁর ভক্তদের আধুনিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করে নির্গুণ ব্রহ্মের খোঁজ নিয়ে ব্যস্ত রাখতে বিশেষ আগ্রহী।    

৪৮) "সে এক মুঠা অন্ন, একটু শ্বাস-প্রশ্বাস, পোষাক-পরিচ্ছদ, দেশপ্রেম, দেশ, নাম ও যশের দাস। এই ভাবে সে দাসত্বের মধ্যে বাস করে এবং দাসত্ব-হেতু তাহার প্রকৃত স্বরূপ চাপা পড়িয়া যায়। তুমি যাহাকে মানুষ বল, সে একটি ক্রীতদাস।" (পৃষ্ঠা ৩০০)

"যোগীরা বলেন, যোগী ব্যতীত আর সকলেই দাসবৎ—খাদ্যের দাস, বায়ুর দাস, নিজ স্ত্রীর দাস, নিজ পুত্রকন্যার দাস, টাকার দাস, স্বদেশীয়দের দাস, নামযশের দাস, এবং এই জগতের সহস্র সহস্র বিষয়ের দাস! যে ব্যক্তি এইসব বন্ধনের কোনটিতে আবদ্ধ নন, তিনিই যথার্থ মানুষ, যথার্থ যোগী।(পৃষ্ঠা ৩৫৬)

মতামত: দেশপ্রেম, স্বদেশী আন্দোলনকেকেও ক্রীতদাসের স্বরূপ বলে চিহ্নিত করেছেন স্বয়ং স্বামীজী। এরপরেও বহু বামপন্থী আজও স্বামীজীর মধ্যে দেশপ্রেমী সত্ত্বা খুঁজে পান!

৪৯) "পক্ষান্তরে শুধু বুদ্ধিবৃত্তির চরম অনুশীলনের ফলে কত ধর্মহীন জীবন গড়িয়া উঠিয়াছে, তাহা কি তোমরা লক্ষ্য কর নাই? ইহা তোমাদের পাশ্চাত্য সভ্যতার একটি দোষ যে, তোমরা কেবল বুদ্ধির উন্মেষকারী শিক্ষার পশ্চাতে ধাবিত; হৃদয়বৃত্তির দিকে তোমরা তাকাও না। শুধু বুদ্ধিবৃত্তি মানুষকে দশগুণ অধিক স্বার্থপর করিয়া তোলে; এবং এইরূপেই তোমাদের ধ্বংস হইবে।" (পৃষ্ঠা ৩০১)

মতামত: জ্ঞান, বুদ্ধিবৃত্তির চর্চার ফলেই আমেরিকা আজ প্রথম বিশ্বের দেশ হিসেবে পরিগণিত হয় আর আমরা মন দিয়ে বেদান্ত চর্চার ফলে সেই তৃতীয় বিশ্বের দেশ হয়েই রয়ে গেলাম। 

স্বামীজীর ভবিষ্যৎবাণী এখন অবধি বাস্তবে রূপায়িত হয়নি, অদূর ভবিষ্যতে তা বাস্তবায়িত হওয়ার সম্ভাবনা এখনও দেখা যাচ্ছে না।

৫০) "যাঁহারা কখনও দূরবীক্ষণযন্ত্র অণুবীক্ষণযন্ত্র অথবা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষাগার দেখেন নাই, তাঁহারাই যুগ-যুগান্তর পূর্বে পরমাণু সম্বন্ধে, অতীন্দ্রিয় তত্ত্ব সম্বন্ধে এবং মানুষের অতি সূক্ষ্ম অনুভূতি সম্বন্ধে মহাসত্যসমূহ আবিষ্কার করিয়াছিলেন। তাঁহারা এই-সকল বিষয় কিরূপে জানিয়াছিলেন? হৃদয়বৃত্তির সাহায্যেই জানিয়াছিলেন। তাঁহারা হৃদয়কে নির্মল করিয়াছিলেন। বর্তমানেও আমরা ইহা করিতে পারি—পথ আমাদের জন্য প্রশস্তই রহিয়াছে। প্রকৃতপক্ষে বুদ্ধিবৃত্তির অনুশীলন নয়, হৃদয়বৃত্তির অনুশীলনই বিশ্বের দুঃখ-দৈন্য হ্রাস করিতে পারে।

বুদ্ধিবৃত্তির অনুশীলনের দ্বারা শত শত বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব আবিষ্কৃত হইয়াছে; ইহার পরিমাণ এই যে, মুষ্টিমেয় লোক বহু লোককে ক্রীতদাসে পরিণত করিয়াছে।" (পৃষ্ঠা ৩০৩)

"এই-সব কলকারখানা ও জড়বিজ্ঞানের মূল্য কি? উহাদের একটি মাত্র ফল এই যে, উহারা জ্ঞান বিস্তার করিয়া থাকে। আপনারা অভাব বা দারিদ্র্য-সমস্যা পূরণ করিতে পারেন নাই, বরং অভাবের মাত্রা আরও বাড়াইয়াছেন। কলকব্জা দ্বারা কখনও দারিদ্র্য-সমস্যার সমাধান হইতে পারে না।(পৃষ্ঠা ৩৫৯)

মতামত: বিশ্বের সার্বিক উন্নয়নে বিজ্ঞানের ভূমিকা অপরিসীম, এই বিজ্ঞানকে হাতিয়ার করে মানুষকে কৃষি বিপ্লব, শিল্প বিপ্লব সংঘটিত করেছে; মহাকাশে পাড়ি দিয়েছে; চিকিৎসা বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব উন্নতির ফলে মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি পেয়েছে, মানুষ মারণ রোগ থেকে নিষ্কৃতি পেয়েছে কিন্তু এই জ্ঞান বিজ্ঞান যে ধর্ম বিষয়ক অবান্তর চিন্তাভাবনাকে বিশেষ পাত্তা দেয় না, তাই বুদ্ধিবৃত্তির ওপর এত ক্ষোভ!

এরপরেও রামকৃষ্ণ মিশনে যে কেন বিজ্ঞান পড়ানো হয়, সেটাই বোধগম্য হয় না।

৫১) "আমরা ঈশ্বরকে ইন্দ্রিয় দ্বারা অনুভব করিতে পারি না। কেহই চক্ষুর দ্বারা ঈশ্বর দর্শন করে নাই, কখনও করিবেও না।" (পৃষ্ঠা ৩০৩)

মতামত: তাহলে অবশ্যই রামকৃষ্ণদেবও দেখেননি। স্বামীজী নিজেই মেনে নিলেন যে রামকৃষ্ণ মিশনে পাঠ্য "শিশুদের রামকৃষ্ণ" বইতে মিথ্যা কথা লেখা আছে!

https://www.youtube.com/watch?v=2sr8X5bQQ8o

৫২) "চরম একত্বকে পূর্ণভাবে উপলব্ধি করিতে পারিলেই জড়বিজ্ঞান লক্ষ্যে উপনীত হয়। একত্বে পৌঁছিলেই আমাদের বিশ্রাম। জ্ঞানই চরম অবস্থা।

সকল বিজ্ঞানের শ্রেষ্ঠ ধর্মবিজ্ঞান বহুপূর্বেই সেই একত্ব আবিষ্কার করিয়াছে, সেই একত্বে—অদ্বৈত-তত্ত্বে উপনীত হওয়াই জ্ঞানযোগের লক্ষ্য।" (পৃষ্ঠা ৩১৬)

মতামত: এতক্ষণ বিজ্ঞানের সব আবিষ্কারকে বেদ, বেদান্ত, প্রাচীন ঋষিদের আবিষ্কার বলে চালানো হচ্ছিল, হঠাৎ করে ধর্মই বিজ্ঞান হয়ে গেল! 

উনি পরেও বলেছেন "যে-বিজ্ঞান মানুষের অতীন্দ্রিয় সত্তার মধ্য দিয়া প্রকৃতির অতীত সত্তাকে বুঝিতে চায়, তাহাকেই ‘ধর্ম’ বলে।" (পৃষ্ঠা ৩২৩) 

আসলে এগুলোকেই বলে ছদ্মবিজ্ঞান বা pseudoscience (দেখুন ৪৪)।

৫৩) "পদার্থবিজ্ঞান উভয় দিকেই অতীন্দ্রিয়বিদ্যা দ্বারা সীমাবদ্ধ। যুক্তি সম্বন্ধেও ঠিক তাই—ইহার আরম্ভ অ-যুক্তিতে, সমাপ্তিও অ-যুক্তিতে।" (পৃষ্ঠা ৩২৩)

মতামত: আসলে এইসব "অতীন্দ্রিয়বিদ্যা", "ধর্মবিজ্ঞান" এগুলো সবটাই বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল, আজও সেভাবেই আছে, এর সাথে প্রকৃত বিজ্ঞানের কোনো সম্পর্ক নেই সেজন্যই বারংবার কিছু বিজ্ঞানে ব্যবহৃত শব্দাবলীর সাহায্য নিয়ে মানুষের যুক্তিবোধ ও বিজ্ঞান সচেতনাকে কঠোর ভাষায় আক্রমণ করেছেন।

এটাকে ছদ্মবিজ্ঞান বা pseudoscience বলে।

৫৪) "ভারতে সঙ্কীর্ণতা ছিল—সামাজিক প্রণালীতে। এখানে (ইংলণ্ডে) সমাজ খুব স্বাধীন। ভারতে সামাজিক বিষয়ে স্বাধীনতা ছিল না, কিন্তু ধর্মমত সম্বন্ধে ছিল। এখানে লোকে পোষাক যেরূপ পরুক না কেন, কিংবা যাহা ইচ্ছা করুক না কেন, কেহ কিছু বলে না বা আপত্তি করে না; কিন্তু চার্চে একদিন যাওয়া বন্ধ হইলেই নানা কথা উঠে। এখানে সত্য চিন্তা করিবার সময় মানুষকে হাজার বার ভাবিতে হয়, সমাজ কি বলে। অপর পক্ষে ভারতবর্ষে যদি একজন অপর জাতির হাতে খায়, অমনি সমাজ তাহাকে জাতিচ্যুত করিতে অগ্রসর হয়।" (পৃষ্ঠা ৫৬)

"এরূপ হওয়া খুব সম্ভব যে, আমি হয়তো দ্বৈতবাদী, আমার স্ত্রী অদ্বৈতবাদী। আমার কোন পুত্র ইচ্ছা করিলে খ্রীষ্ট, বুদ্ধ বা মহম্মদের উপাসক হইতে পারে, তিনিই তাহার ইষ্ট। অবশ্য তাহাকে জাতিগত সামাজিক নিয়ম প্রতিপালন করিতেই হইবে।" (পৃষ্ঠা ৩৫২)

"প্র। যোগীরা কি জাতিভেদকে একটা বিশেষ প্রয়োজনীয় বিষয় বলিয়া স্বীকার করিয়া থাকেন?
উ। না; জাতিভেদ অপরিণত মনের শিক্ষালয়-মাত্র।" (পৃষ্ঠা ৩৫৬)

ওপরের উদ্ধৃতিগুলো পড়ে যাদের মনে হবে স্বামীজী কখনই "জাতিভেদ" প্রথার সমর্থক ছিলেন না, তাঁদের স্বামীজীর নিচের বক্তব্যটাকেও একটু খুঁটিয়ে পড়ার অনুরোধ করবো। বাস্তবে উনি সমাজের চিরাচরিত "জাতিভেদ" প্রথাকে সযত্নে বাঁচিয়ে রাখার ব্যাপারেই সচেষ্ট ছিলেন। 

"আমরাই কেবল একটা স্থায়ী জাতিবিভাগ গঠন করিতে সমর্থ হইয়াছি। অপরে উহার জন্য চেষ্টা করিতেছে, কিন্ত এখনও সফল হয় নাই। আমাদের সমাজে অবশ্য যথেষ্ট কুসংস্কার ও মন্দ জিনিষ আছে। আপনাদের দেশের কুসংস্কার ও মন্দ জিনিষগুলি আমাদের দেশে চালাইয়া দিতে পারিলেই কি সব ঠিক হইয়া যাইবে? জাতিভেদ আছে বলিয়াই এই ত্রিশ-কোটি লোক এখনও খাইবার জন্য এক টুকরা রুটি পাইতেছে। অবশ্য রীতিনীতি হিসাবে ইহা যে অসম্পূর্ণ, তাহাতে কোন সন্দেহ নাই। কিন্তু এই জাতিবিভাগ না থাকিলে আজ আপনারা পড়িবার জন্য একখানিও সংস্কৃত বই পাইতেন না। এই জাতিবিভাগের দ্বারা এমন একটি দৃঢ় প্রাচীরের সৃষ্টি হইয়াছিল যে, জাতির উপর বহিরাক্রমণের শত প্রকার তরঙ্গাঘাত আসিয়া পড়িয়াছে, অথচ কোনমতেই উহাকে ভাঙিতে পারে নাই। এখনও সেই প্রয়োজন দূর হয় নাই, সেজন্য জাতিভেদ এখনও রহিয়াছে।" (পৃষ্ঠা ৩৫৮)

এখনও রামকৃষ্ণ মিশনে কুমারী পুজোর আবশ্যিক শর্ত হিসাবে ব্রাহ্মণ বাড়ির অনধিক ষোলো বছরের অরজঃস্বলা মেয়েকে পুজো করা হয়, যেটা আপাদমস্তক একটা বর্ণবাদী, পুরুষতান্ত্রিক প্রথা। 


Monday, 19 February 2024

বিজ্ঞান কল্পনা ও অহিংষ্ণু ভারত - শ্যামল চক্রবর্তী

 ১৯৪৭ সালের ৩-৮ জানুয়ারী দিল্লিতে বিজ্ঞান কংগ্রেসের চোত্রিশতম অধিবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। দেশ সে বছর স্বাধীনতা পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু জনজীবনে বিজ্ঞান মানসিকতা প্রসারে আন্তরিকভাবে আগ্রহী ছিলেন। তাঁকেই সে বছর মূল সভাপতি করা হয়। একথা বলতে কোনো দ্বিধা নেই, বিজ্ঞান কংগ্রেস তার অভীষ্ট লক্ষ্য পূর্ণ করুক, প্রধানমন্ত্রী নেহরু তা সকল সময় চেয়েছেন। আর একটি বিষয়েও বিজ্ঞান কংগ্রেস নতুন চরিত্র অর্জন করেছিল। পৃথিবীর নানা দেশের বিজ্ঞান সোসাইটির কাছে আমন্ত্রণ গেল, তাঁরা যেন ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসে প্রতিনিধি পাঠান। বিজ্ঞান চরিত্রে আন্তর্জাতিক। পৃথিবীর নানা দেশের নানা জল-হাওয়ায় কেমন গড়ে উঠছে বিজ্ঞান, সদ্য স্বাধীন দেশের বিজ্ঞানী ও বিজ্ঞান পরিকল্পনাকারদের অবহিত হওয়া প্রয়োজন বই কি।

১৯৪৭ সালে নেহরু তাঁর বক্তৃতা শুরু করেছিলেন এই বলে : '...বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় ও মানবিকতা প্রসারে আমাদের বিজ্ঞানীরা কাজ করবেন ... যুদ্ধের কোনো কাজে আমরা সহযোগিতা করব না।'

নেহরু বলেছিলেন : ভারতকে আমরা 'More and more scientifically minded' করতে চাইব। কথাটা যে আজও কেমন জরুরি, বিজ্ঞান কংগ্রেসের ১০২তম অধিবেশন দেখে আমাদের বুঝতে অসুবিধে হয়নি। সে কথায় আমরা পরে যাব। তাঁর ভাষণের প্রধান তিনটি উপশিরোনাম ছিল, 'বৈজ্ঞানিক বিকাশ', 'হিরোশিমায় বোমাবর্ষণ' ও 'সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা'। বিজ্ঞানের হাত না ধরলে কোনো দেশেরই অর্থনৈতিক অগ্রগতি সম্ভব নয়। হিরোশিমার ক্ষত, সত্যি বলতে কী, আজও শুকোয়নি। ১৯৪৭ সালে স্বভাবতই তা ভয়ঙ্কর ছিল। 'সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা' নিয়ে তিনি সেদিন যে উদ্বেগের বার্তা দিয়েছিলেন আজ প্রতিটি সুস্থ বুদ্ধিসম্পন্ন ভারতীয় হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করছেন। তাঁর কথার মানে ছিল একটাই। বিজ্ঞান মনন সম্প্রসারিত হলে, ভারত 'More and more scientifically minded' হলে, সাম্প্রদায়িকতার ভেদবুদ্ধিকে আমরা বিনাশ করতে সমর্থ হব।

১০২ তম বিজ্ঞান কংগ্রেস আমাদের এক বৈপরীত্যের বার্তা শেখালো। এ এমন এক বৈপরীত্য যা সর্বতোপরিত্যাজ্য। রবীন্দ্রনাথের কথা মমনে পড়ে। দুরকম সংস্কৃতির কথা বলেছিলেন তিনি। মোহমুগ্ধতার সংস্কৃতি ও মোহমুক্ততার সংস্কৃতি। প্রথম সংস্কৃতি বিজ্ঞান মননকে আচ্ছন্ন করে। দ্বিতীয় সংস্কৃতি মানুষকে বিজ্ঞান মননশীলতায় উজ্জীবিত করে। এবারে বিজ্ঞান কংগ্রেস দেখে মনে হল, ভারত যেন 'less and less scientifically minded' হচ্ছে।

**************************************************
আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র বলেছিলেন : 'বিশ্বাস' আর যা-ই দিক, বিজ্ঞান দিতে পারে না।
**************************************************
বিজ্ঞানের ডিগ্রি থেকে বিজ্ঞান সংস্কৃতি গড়ে উঠে না। যিনি দিল্লি থেকে দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্যোতিষশাস্ত্র পড়ানোর ফতোয়া জারি করেছিলেন, তিনি তো এককালে এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যা পড়াতেন। চারপাশে তাকালেও দেখা যায়, বিজ্ঞান, ইঞ্জিনিয়ারিং এমনকি ডাক্তারি ডিগ্রি নিয়েও অনেকে অপবিজ্ঞানের ফুলঝুড়ি হয়ে বেঁচে আছেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর 'তিন সঙ্গী' বইয়ের তিনটি গল্পে আমাদের কী বলতে চাইলেন? বিজ্ঞান যাদের জীবিকা তারাও অপবিজ্ঞান আর কুসংস্কারের আবর্তে নিজের ঠিকানা গড়তে পারে। বিজ্ঞান তো আর 'বিষয়' নয়, বিজ্ঞান হল 'পদ্ধতি'। 
**************************************************
ধর্মের দাপটে সর্বনাশ হয়েছে পৃথিবীর নানা সভ্যতায় অনেক বিজ্ঞানীর। এই সর্বনাশের তালিকায় রয়েছে সার্ভেটাস, আব্দুল লতিফ, চার্বাক। রয়েছেন গ্যালিলিও, ব্রাহে, ব্রুনো। গ্যালিলিওকে নিয়ে চর্চা হয়েছে অনেক। বেশ কয়েক বছর আগে পোপ বললেন, গ্যালিলিওকে শাস্তি দেওয়া অন্যায় হয়েছে আমাদের। দিনকয় আগে পোপ ফ্র্যান্সিস যা বললেন, পৃথিবী চমকে উঠেছে। তিনি ডারউইনের বিবর্তন তত্ত্বকে সমর্থন করলেন। স্টিফেন হকিংয়ের বিগ ব্যাং তত্ত্ব মেনে নিলেন। সব চেয়ে বড়ো কথা, বললেন ফ্র্যান্সিস, 'ঈশ্বর জাদুকর নন'। মনে পড়ে আমাদের, অনেকদিন আগে আইনস্টাইনের একটি কথা আমাদের বুকে আলোড়ন তুলেছিল। 'ঈশ্বর দাবা খেলোয়াড় নন।' তবে আইনস্টাইন আর পোপ ফ্র্যান্সিস কি একই কথা বললেন?

বছর কয় আগের কথা। ভ্যাটিকান থেকে বলা হয়, বিজ্ঞানের সত্য যাচাই করার নিয়ম বিজ্ঞানেই রয়েছে। ধর্মকে সেখানে মাথা ঘামাবার প্রয়োজন নেই। ধর্মের কাজ কি তবে? বিজ্ঞান যখন মানুষের কল্যাণের সত্য আবিষ্কার করে, সেই সত্য কেমন করে মানুষের জীবনে আরও বেশি কল্যাণে কাজে লাগানো যায়, ধর্মকে সেই পথ আবিষ্কার করতে হবে।

ডারউইনের লাঞ্ছনার কথা আমাদের অজানা নয়। বিবর্তনের কথা বলেছিলেন ডারউইন। ডারউইনের আগে বিবর্তনের কথা কি আর কেউ বলেননি? বলেছেন বই কি। ডারউইনের দাদু এরাসমাস ডারউইন বলেছেন। লামার্ক বলেছেন। আরও কেউ কেউ বলেছেন। তবে ডারউইন এমনভাবে আক্রান্ত হলেন কেন? কারণ সহজ। ডারউইনের আগে বিবর্তন নিয়ে যাঁরা বলেছেন, তাঁরা প্রশ্ন তুলেছেন, বিবর্তন 'কেমন' করে হয়? ভ্যাটিকানের অভিমত, এতে আমাদের আপত্তি নেই। বিবর্তনের পথ আবিষ্কার করুন বিজ্ঞানীরা, আমাদের এতে ঝগড়া করার কিছু নেই। ডারউইন যে ভিন্ন কথা বলছেন। তাঁর প্রশ্ন, 'কেন' বিবর্তন হয়? কিভাবে হয়, বললে পোপের আপত্তি নেই। কেন হয়, বললে আপত্তি আছে। ঈশ্বরের ক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছেন ডারউইন? একথা ভ্যাটিকান মানবে কেন? ঈশ্বরই তো তাঁর অভিলাষ পূরণে নানা জীব প্রজাতিকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন।

একই কাণ্ড হকিং-র বেলায়। বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির দুটি তত্ত্ব। ফ্রেড হয়েলের 'স্টিডি স্টেট থিওরি'। স্থির দশা তত্ত্ব। হকিং-এর 'বিগ ব্যাং তত্ত্ব'। হয়েল বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির মুহূর্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলেননি। সৃষ্টির পর কী ঘটছে হয়েল বুঝতে চাইছেন। ভ্যাটিকানের আপত্তি নেই। হকিং যে বেয়াড়াপনা করছেন। বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির মুহূর্ত বুঝতে চাইছেন। এত স্পর্ধা মেনে নেওয়া যায় না। বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ঈশ্বরের সৃষ্টি। সৃষ্টির সত্য মেনে নিয়ে যে বিজ্ঞানী যে কাজই করুন না কেন, পোপের কোনো আপত্তি নেই। হকিং যা বলছেন, বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির মুলে ঈশ্বরের ভূমিকাকে নস্যাৎ করতে চাইছেন। এমন বেয়াদপি মানা যায় না। অথচ আজ ফ্র্যান্সিস তাই মেনে নিলেন। তিনি ডারউইন ও তাঁর বিবর্তন তত্ত্বকে মেনে নিলেন। হকিং ও তাঁর বিগ ব্যাং তত্ত্ব মেনে নিলেন। বিজ্ঞানের সত্যকে পোপ অবজ্ঞা করতে পারছেন না। বিজ্ঞানের জয়যাত্রাকে একবিংশ শতাব্দীতে মানতে হচ্ছে।

আমরা যারা বিজ্ঞান সংস্কৃতির কথা বলি, আমাদের কাছে এ পরম সুখবর। তবে হালে দিল্লিতে যারা ক্ষমতায় এসেছেন তাদের কাছে সুখবর নয়। সঙ্কীর্ণ ধর্মীয় ভাবনায় পরিচালিত হয় যারা, অন্য ধর্মে ঔদার্যের বিকাশ দেখলে গায়ে জ্বালা ধরে। লড়াইটা তাহলে জমবে কেমন করে? লজ্জা হয় আমাদের ভাবতে। ২০১৩ সালের ২০ আগস্ট পুনে শহরে দিনের আলোয় খুন হলেন ডাঃ নরেন্দ্র দাভোলকার। রাজনীতির কর্তারা ছুটে গেলেন। একজন তো বলেই ফেললেন, গান্ধীজীর হত্যাকান্ডের চেয়েও এই হত্যাকান্ড ভয়ঙ্কর। কিন্তু ঘটনা এই, খুনিদের কেউ আজও ধরা পড়েনি। একুশ শতকে বিজ্ঞানের কোনো সত্য আবিষ্কার হলেই কোনো কোনো মহল প্রতিক্রিয়া জ্ঞাপন করেন, 'এ আর এমন নতুন কথা কী। ভারতে পুরানো আমলেই এই সত্য আবিষ্কার হয়েছে।' এমন উন্মাদ দর্শন কত কাল চলবে এ দেশে? কত কাল চলবে এমন উন্মাদের পাঠক্রম?
**************************************************
সুদর্শনজি, আপনি ভারতীয় ঐতিহাসিকদের মার্কসবাদের প্রতি পক্ষপাতিত্বের 'অভিযোগ' করেছেন। ইতিহাস চর্চার তাই 'ভারতীয়করণ' চাইছেন। আপনার মনে পড়বে নিশ্চয়ই বার্ট্রান্ড রাসেলের কথা। 'পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাস' বইয়ে কার্ল মার্কসকে নিয়ে লিখেছেন রাসেল। রাসেল কোনোকালেই মার্কসপন্থী নন। অথচ তাঁর রচনায় সেই সমালোচনার ধারা রয়েছে। শেষে তিনি কি লিখলেন? নিবন্ধ রচনায় তাঁর বিশ্লেষণভঙ্গি মার্কস অনুসৃত পথই অনুসরণ করেছে। আমরা বলি, বিজ্ঞান কোনো 'বিষয়' নয় বিজ্ঞান হলো 'পদ্ধতি'। মানতেই হবে। নইলে জ্ঞানচর্চার মণিমাণিক্য তৈরি হয় না। তৈরি হয় সভ্যতার জঞ্জাল।
**************************************************
আধুনিক ভারতের অন্যতম বিশিষ্ট বিজ্ঞানী পুষ্প ভার্গব। হায়দ্রাবাদের 'সেন্টার ফর সেলুলার অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি'-র তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা অধিকর্তা। ওরিয়েন্ট লংম্যান থেকে ২০০৩ সালে প্রকাশিত তাঁর লেখা একটি বইয়ে আমরা দেখতে পাই তিনি লিখছেন, 'বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বহু বিষয়ে আমাদের সাফল্য রয়েছে। গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, রসায়ন, মেডিসিন, শল্যবিদ্যা, উদ্ভিদবিদ্যা, ভূবিদ্যা, ধাতুবিদ্যা, সুগন্ধিবিদ্যা-র নাম অবশ্যই করা যায়। কিন্তু অসংখ্য পৌরাণিক আখ্যান আজও এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে। সিংহভাগ আখ্যানের কোনো যুক্তি ও সারবত্তা নেই। অথচ শুধুমাত্র বিশাল সংখ্যক সাধারণ নাগরিক নন, বিজ্ঞানীদের কেউ কেউ এমন বার্তা বহন করে চলেছেন।'
**************************************************
বিজ্ঞানীরা ভারতের তেরোটি জেলা থেকে পঁচিশ রকমের মানুষ মোট একশো বত্রিশ জনকে বেঁচে নিলেন। এদের ভাষা ছ-রকমের। কেউ তথাকথিত উচ্চবর্ণের। কেউ তথাকথিত নিম্নবর্ণের। বেশ ক'রকমের আদিবাসী মানুষও ছিলেন। বাইরে থেকে দেখলে এদের ভেতর কোনো মিল নেই। বাইরের এই মিল-অমিল বিজ্ঞানের আলোয় যাচাই করব আমরা। বিজ্ঞানীরা তাই সকলের 'জিন মানচিত্র' বার করলেন। দেখা গেল ভাষা-জাতি-বর্ণ যতই আলাদা হোক, জিন মানচিত্রের বিচারে এরা সকলেই এক।

অতীত খুঁজতে গেলে দু-রকমের বংশানুক্রম জিন দেখা যায় ভারতে। উত্তর ভারতীয় বংশানুক্রম জিন আর দক্ষিণ ভারতীয় বংশানুক্রম জিন। 'সেন্টার ফর সেলুলার অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি'-র বিজ্ঞানী কুমারস্বামী থঙ্গরাজন ওই সাংবাদিক সম্মেলনে বললেন: 'পঁয়ষট্টি হাজার বছর আগে আন্দামান দ্বীপপুঞ্জ ও দক্ষিণ ভারতের কিছু এলাকায় প্রথম বসতি গড়ে উঠেছিল। তেমনি চল্লিশ হাজার বছর আগে উত্তর ভারতের কিছু এলাকায় প্রথম বসতি গড়ে উঠেছে। একটা সময়ের পর দুই বসতির মানুষের মিশ্রণ ঘটেছে। এখন তাই সারা দেশ জুড়ে আমরা যে জনবসতি দেখতে পাই, সেই মানুষদের জিন মানচিত্র উত্তর আর দক্ষিণের এক মিশ্রিত মানচিত্র হিসেবে গড়ে উঠেছে।'

... বিজ্ঞানীরা আরও কয়েকটি আকর্ষণীয় তথ্য ওই সাংবাদিক সম্মেলনে জানিয়েছিল। পশ্চিম ইয়োরেশিয়ার মানুষের সঙ্গে উত্তর ভারতের মানুষের জিনগত মিল খুঁজে পাওয়া গিয়েছে। তবে বিজ্ঞানীরা এখনও বলতে পারছেন না, এই মিলের কারণ কী। উত্তর ভারত থেকে জনবসতি ইউরোপে গিয়েছিল? ইউরোপ থেকে জনবসতি উত্তর ভারতে এসেছিল? এর নির্ভুল উত্তর উদ্ধার খুব সহজ নয়। তবে বিজ্ঞানীরা থেমে নেই।

ইতিহাস আমাদের বলছে, এক লক্ষ পঁয়ত্রিশ হাজার বছর ও পঁচাত্তর হাজার বছরের মাঝামাঝি কোনো এক সময়ে পূর্ব আফ্রিকায় জলাশয়ের জল শতকরা পঁচানব্বই ভাগ শুকিয়ে যায়। আফ্রিকার মানুষ দলে দলে তখন আশ্রয়ের খোঁজে বেরিয়ে পড়ে। কোন পথে কোথায় এসেছে ওই মানুষ? এই গবেষণায় বিজ্ঞানীরা সবচেয়ে বেশি ভরসা করেন, কোষের মাইটোকনড্রিয়া ডি এন এ-র সজ্জাক্রমের উপর। কেন এই ডি এন এ? এই ডি এন এ সবচেয়ে বেশি ঝড়ঝাপটা সামনে অক্ষত থাকতে পারে। কাজেরই গোয়েন্দাগিরির কাজ এই ডি এন এ দিয়েই সবথেকে ভালো হয়। প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছে, পূর্ব আফ্রিকায় অধিবাসীরা অতকাল আগে ভারতের দক্ষিণ উপকূলের পথ ধরেই এগিয়েছিল। যদি শেষ পর্যন্ত এ কথা সত্যি হয়, ইতিহাসের এক প্রচলিত আখ্যান বাতিল হয়ে যাবে। কী সেই আখ্যান? মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার পথ ধরে এককালে জনবসতি ভারতে এসেছিল। ভারতের জনবসতি উত্তরবাহী নাকি দক্ষিণবাহী - এই বিতর্ক প্রবল বিক্রমে চলেছে। সে যে 'বাহী'ই হোক না কেন, ভারতের এখনকার জনবসতি যে দুই মিশ্রণের ফসল, এ নিয়ে দ্বিধা নেই কোনো। বংশাণুক্রমিকতার বিচারে ভারতের সব মানুষ সমান, এ কথা অবশ্যই জোর গলায় বলা যায়।

২০০৯ সালের পর ২০১১ সাল। লালজি সিং ও একাধিক দেশের বিজ্ঞানীরা ২০১১ সালের ৯ ডিসেম্বর 'আমেরিকান জার্নাল অফ হিউম্যান জেনেটিকস'-এ একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। লালজি সিং তখন বারাণসী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। তিনিই বললেন, 'ভারতীয় উপমহাদেশে আর্য বা দ্রাবিড় বলে কেউ নেই। এই বিভাজনে যারা বিশ্বাস করেন তারা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য করেন।' এস্তোনিয়া বায়োসেন্টারের বিজ্ঞানী জ্ঞানেশ্বর চৌবে সেসময় বলেছিলেন, 'আমরা পরীক্ষা করে দেখিয়েছি যে সারা ভারতে একইরকম ডি এন এ-র গঠন রয়েছে এমন লোকেরাই বাস করে। গত ষাট হাজার বছর ধরে ভারতীয়দের ডি এন এ বিশুদ্ধ থেকে গিয়েছে। বাইরে থেকে কোনো 'জিন' বা 'ডি এন এ' যোগ হয়নি। আরও এক ধাপ এগিয়ে বিজ্ঞানীরা বললেন, 'আর্য আগ্রাসনের কোনো চিহ্নই নেই। ভারতীয়রা বরং ইউরোপে গিয়েছে।' মজা হল এই, দ্রাবিড় সংস্কৃতির প্রতিনিধিরা বিজ্ঞানীদের এই গবেষণার ফল মানতে রাজি নন। জ্ঞানী শংকরণ তামিলনাড়ুর এক পরিচিত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। নিয়মিত তিনি ব্রেখট, বিজয় তেন্ডুলকার ও বাদল সরকারের নাটক করেন। নিজে তিরিশটিরও বেশি নাটক লিখেছেন। ধারালো তাঁর লেখনশৈলী। রাজনীতির কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'এখনকার সব রাজনীতিই খারাপ। তুমি যদি এর থেকে দূরে থাকো তবে তা আরও খারাপ হয়ে যাবে।' বিজ্ঞানীদের কাজ দেখে তিনি বলেছিলেন, 'ওই গবেষণাপত্র যারা লিখেছেন তারা কেমন মাপের বিজ্ঞানী, সেকথা আগে জানতে হবে। তাদের কোনো গোপন অভিসন্ধি আছে কিনা দেখতে হবে। তামিলনাড়ুতে একথা সকলেই জানে যে আর্য সমাজের লোকেরা দ্রাবিড় ব্রাহ্মণদের দলিত হতে বাধ্য করেছিল।'
**************************************************
বিজ্ঞান সংস্কৃতির অবমাননার নিদর্শন এখন যেন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পৃথিবীর কোথাও কোনো বিজ্ঞানের উদ্ভাবনা হলেই একদল ভারতীয় বলতে শুরু করেন, এর সবকিছুই তো আমাদের দেশে ছিল। তেমন উদ্ভাবনাকে এরা কখনও 'বৈদিক বিজ্ঞান', কখনও 'হিন্দু বিজ্ঞান' -এর শিরোনামে চিহ্নিত করতে শুরু করেন। জার্মানিতে হিটলারের সময় 'আর্য বিজ্ঞান'-এর শোরগোল উঠেছিল। কোথাও কোথাও আজকাল 'ইসলাম বিজ্ঞান'-এর কথাও শুনতে পাওয়া যায়। এই শব্দোচ্চারণের লোকেরা সকলেই উগ্র জাত্যাভিমানের দর্শনে বিশ্বাস করেন। বিজ্ঞানের নিজের জগতে যে ইতিহাস ও দর্শন আছে সে বিষয়ে এদের বিন্দুমাত্র আস্থা ও আগ্রহ নেই।

... ১৯২০ সালে নাগপুর শহরে ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসের অধিবেশনে সভাপতি ছিলেন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র। সভাপতির ভাষণে তিনি বলেছিলেন :

'ইউরোপ, আমেরিকা ও জাপান বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে যে প্রাণশক্তি ও সক্রিয়তা দেখায়, সেখানে আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি? পরিস্থিতির দিকে তাকালে লজ্জা ও বিষন্নতা আমাদের গ্রাস করে। ... অনন্তকাল ধরে ভারতীয় সংস্কৃতি এক অদ্ভুত ছাঁচে গড়া। একথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে হিন্দুজাতি প্রকৃতপক্ষে এক অধিবিদ্যানির্ভর জাতি। প্রাচীন ভারতে ভৌত বিজ্ঞানের চর্চা যে পুরোপুরি উপেক্ষিত হয়েছে এমনটা নয়, তবে তা অধিবিদ্যা ও ধর্মের অনুসারী বিষয় হিসেবে অগ্রসর হয়েছে। বৌদ্ধধর্মের পতনের পর ভারতের অন্ধকার যুগ শুরু হয়। গত এক হাজার বছর বা তার বেশি বছর ধরে ভৌত বিজ্ঞান চর্চার কথা বলতে গেলে আমাদের বলতে হবে, আমরা এক অভিনব চিন্তার জগতে আছি।'

আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র ওই দীর্ঘ ভাষণে তিনি আরও বলেছিলেন, ইউরোপে বিজ্ঞানের এল প্যারাসেলসাসের সময় থেকেই আরম্ভ হয়েছে। তারপর গ্যালিলিও, নিউটন ও বয়েল এসেছেন। অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতাব্দীতে অনেক প্রতিভাবান বিজ্ঞানীদের দেখা গিয়েছে। 

প্রফুল্লচন্দ্রের কথায়, প্রাচ্য দেশে আমরা তখন নীরব ও ভাবালুতায় ধ্যানমগ্ন। হিন্দুজাতি বেদান্ত অনুসরণ করে চলছে। বাস্তব জগতের অস্তিত্বকেই এরা স্বীকার করে না। বেদান্ত দর্শনের প্রণেতা শঙ্করাচার্য পরমাণুবাদের সমালোচনায় মুখর। বৈশেষিক দর্শনের বার্তা তখন চরম নিন্দনীয়।

আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের এই ক্ষোভ হতাশার উচ্চারণ থেকে আমরা একটা কথাই বুঝতে পারি। ভারতীয় বিজ্ঞান সংস্কৃতির প্রবাহ তখন ক্ষীণকায় এক স্রোতস্বিনীর মতো।

প্রফুল্লচন্দ্রের সাত বছর পরে ১৯২৭ সালে বিজ্ঞান কংগ্রেসের লাহোর অধিবেশনে সভাপতি ছিলেন আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু। তিনি এক ভিন্ন বিষয়ে ভারতবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইলেন। বিজ্ঞানের কোনো উদ্ভাবনা কখনও জাতি-বর্ণ-ধর্ম ও বিশেষ ভূ-খণ্ডের সম্পত্তি হতে পারে না। তাঁর কথায় :

'কোনো বিশেষ জাতির উপর জ্ঞানের অগ্রগতি নির্ভর করছে, এমন মূর্খ অভিভাষণের চেয়ে বড়ো অসত্য আর কিছু হতে পারে না। সমগ্র জগত পরস্পর নির্ভরশীল। যুগ থেকে যুগান্তরে নিরবিচ্ছিন্ন চিন্তার স্রোতধারা মানবজাতির সর্বজনীন ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছে।'

জগদীশচন্দ্রের এমন অভিমত কি 'হিন্দু বিজ্ঞান', 'বৈদিক বিজ্ঞান', 'আর্য বিজ্ঞান','ইসলাম বিজ্ঞান' প্রভৃতির ধারণাকে হাস্যকর ও অর্থহীন করে তুলছে না?
**************************************************
মেঘনাদ সবে তখন বিলেত থেকে গবেষণার কাজ সেরে ফিরেছেন। ঢাকা শহরের এক খ্যাতনামা আইনজীবী মেঘনাদ বিজ্ঞানের কী কাজ করেছেন জানতে চাইলেন। উৎসাহ নিয়ে মেঘনাদ যখন বলছিলেন, সামান্য সময় অন্তর অন্তর ওই আইনজীবী বলতে থাকলেন, 'এ আর নতুন কি হইল, এ সমস্তই ব্যাদে আছে।' মেঘনাদ শেষ পর্যন্ত লিখলেন, '...বিগত কুড়ি বৎসরে বেদ, উপনিষদ, পুরাণ ইত্যাদি সমস্ত হিন্দুশাস্ত্রগ্রন্থ এবং হিন্দু জ্যোতিষ খুঁজিয়া আমি কোথাও আবিষ্কার করিতে সক্ষম হই নাই যে, এই সমস্ত প্রাচীন গ্রন্থে বর্তমান বিজ্ঞানের মূলতত্ত্ব নিহিত আছে।'

মেঘনাদ-সত্যেন্দ্রনাথ এঁরা কয়েকজন একসঙ্গে প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়েছেন। তখন তাঁদের পদার্থবিদ্যা পড়াতেন আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু। রসায়নবিদ্যা পড়াতেন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়। 
**************************************************
ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর 'রাজনীতি' নিয়ে তর্ক বিতর্ক চলতেই পারে। কিন্তু তাঁর 'বিজ্ঞান মানসিকতা' নিয়ে বিন্দুমাত্র দ্বিধা নেই। ২০১৫ সালের মে মাসে ব্যাঙ্গালোরে অনুষ্ঠিত এক বিজ্ঞান সম্মেলনে প্রসিদ্ধ ভারতীয় বিজ্ঞানী ডি বালসুব্রামানিয়ান (তিনিও একসময় 'সেন্টার ফর সেলুলার অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি'র অধিকর্তা ছিলেন) এক বক্তৃতায় জানান, নেহরুর সময়ে তাঁর যে উপদেষ্টামন্ডলী ছিল সেখানকার পঞ্চাশ ভাগ ছিলেন বিজ্ঞানী। এলাহাবাদের 'আনন্দভবন' থেকে সংগৃহীত একটি নথি আমাদের হাতে এসেছে। সেখানে নেহরু দেশবাসীকে জানাচ্ছেন,তাঁর প্রয়াণের পর যেন কোনো ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের আয়োজন না করা হয়। সুযোগ হলে গঙ্গার বুকে এক মুঠো চিতাভস্ম দিলে ভালো হয়। এ কথায় চমক জাগে। তবে যে তিনি কোনো আচার অনুষ্ঠান না করে বলেছিলেন? পরের লাইনে এ কথার উত্তর নেহরু নিজেই দিয়েছেন। একেবারে শৈশব থেকে গঙ্গার কোলেপিঠে মানুষ হয়েছেন তিনি। ক মুঠো চিতাভস্ম ছাড়া গঙ্গাকে আর কোনো কিছু দেওয়ার কথা তিনি ভাবতে পারছেন না। নিজেই বলেছেন, এ থেকে যেন কেউ তাঁর ভাবনায় ধর্মীয় আচ্ছন্নতার অনুসন্ধান না করেন। যারা মুখে সুমহান ঐতিহ্যের কথা বলেন, তারা এই রাষ্ট্রীয় ঐতিহ্য মানতে রাজি আছেন তো? মননে বিজ্ঞান সংস্কৃতির বীজ বপন হলে যুক্তি-কুযুক্তির ফারাক বোঝেন একজন মানুষ। যারা পরিকল্পিতভাবেই যুক্তির মুক্ত হাওয়া সরিয়ে দূষিত হাওয়া ছড়িয়ে দিতে চান, তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের লড়াই হবে দীর্ঘতর। আসুন, সেই দীর্ঘতর লড়াইয়ের এক সেনানী হিসাবে আমরা সকলে সামিল হই। রবীন্দ্রনাথের স্বপ্নের 'মোহমুক্ত' স্বদেশ গড়ে তুলি।
**************************************************
যুক্তি বুদ্ধি বিসর্জন দিলে পৃথিবীতে কিছু বিষয় হয়তো বা চর্চিত হতে পারে। বিজ্ঞান চর্চা প্রশ্ন উঠে না। ভারতে যে মানুষদের হাতে অহঙ্কারের ঐতিহ্য তৈরি হয়েছে, গভীর মনন দিয়ে তাঁদের দিকে নজর দিই কি আমরা? কতোকাল আগে চরকসংহিতা ও সুশ্রুতসংহিতা লেখা হয়েছিল। ১৮৩৬ সালে পন্ডিত মদুসূদন গুপ্ত কলিকাতা মেডিক্যাল কলেজে মৃতদেহ ব্যবচ্ছেদ সম্পাদনের অপরাধে সনাতনী হিন্দু সমাজ থেকে বহিস্কৃত হলেন। তাঁকে তখন সুশ্রুতসংহিতার শ্লোক উদ্ধৃত করে গোঁড়া হিন্দু পন্ডিতদের বলতে হয়েছে, কতোকাল আগে সুশ্রুত শবদেহ ব্যবচ্ছেদের প্রক্রিয়া সমর্থন করেছিলেন। তাই তিনি প্রকৃত প্রস্তাবে কোনো অপরাধ করেননি। একশো বছরেরও বেশি আগে মাইকেল মধুসূদন দত্ত 'মেঘনাদ বধ' কাব্য লিখেছিলেন। রাবণের মানবিক মুখ এঁকেছিলেন তিনি। এখন প্রতিদিন চলচ্চিত্র, সাহিত্য, নাটক ও চিত্রশিল্প যে হিংস্রতার সুর ও স্বরে আক্রান্ত হচ্ছে, মেঘনাদবধ কাব্য রচনার সমকালে আমরা সেই দৃশ্য দেখতে পাইনি। ভিন্ন চিন্তারও এক ধরনের সামাজিক অনুমোদন ছিল। সেই চিন্তাকে আতুড়ঘরে গলা টিপে মেরে ফেলবার এমন অভিপ্রায় দেখা যায়নি। বাংলাদেশের বিশিষ্ট চিত্র পরিচালক তানভীর মোকাম্মেল সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে (প্রতিদি, ২২ মার্চ ২০১৪) জানিয়েছেন, তিনি যখন সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ-র 'লালসালু' চলচ্চিত্রায়িত করেন, মৌলবাদীদের চাপে সিলেট ও খুলনায় সে ছবি দেখানো যায়নি। তারপর বলেন, '...উপন্যাসটি ১৯৪৮ সালে লেখা। তৎকালীন মুসলমান সমাজ কিন্তু উপন্যাসটিকে মেনে নিয়েছিল। আজ পঞ্চাশ-ষাট বছর পর দেখা যাচ্ছে, 'লালসালু' চলচ্চিত্রটিকে তারা তেমন সহ্য করতে পারছে না। গত কয়েক দশকে মুসলমান সমাজে ইসলামি মৌলবাদীদের প্রভাব বৃদ্ধিই হয়তো এর কারণ। ধর্মীয় উদারতার দিক থেকে বাঙালি, মুসলমান সমাজ মনে হচ্ছে আরও পিছিয়েছে।' ভারতের ইতিহাসে একদিন সেই কলঙ্কিত পরিচ্ছেদ লিখিত হবে, সমকালের সর্বোত্তম চিত্রশিল্পী মকবুল ফিদা হুসেইনকে স্বভূমি পরিত্যাগ করে ভিন্নভূমে জীবন যাপন করতে হয়েছে ও সে মাটিতেই তাঁর জীবনদীপ নির্বাপিত হয়েছে। কন্নড় সাহিত্যের সর্বকালের সেরা স্রষ্টাদের অন্যতম ও সাহিত্য একাডেমির ভূতপূর্ব অধ্যাপক ইউ আর অনন্তমূর্তি উগ্র ধর্মীয় আচরণের বিরুদ্ধে অভিমত দিয়েছিলেন বলে নিজের বাসগৃহেই আক্রান্ত হয়েছিলেন।

শিক্ষিত মানুষ মাত্রই জানেন, বিজ্ঞান সচেতনতা মানে বিজ্ঞানের ডিগ্রির সমাবেশ নয়। রবীন্দ্রনাথ আমাদের বলেছিলেন, বিজ্ঞানের চর্চা এই কারণে জরুরি যে বিজ্ঞান আমাদের মোহমুক্ত ও সতর্ক করে। মোহাবরণের পলেস্তারা খসে পড়বে, সেখানে নতুন প্রলেপ পড়বে মোহমুক্ততার, এই তো ছিল বিশ্বকবির চাওয়া। 'তিন সঙ্গী'-র তিনটি গল্পেই রবীন্দ্রনাথ বিজ্ঞানজীবীদের সতর্ক করেছেন, অন্ধবিশ্বাস ও কুযুক্তির  আত্মসমর্পণ করতে পারেন বিজ্ঞানজীবীরা। কী প্রত্যক্ষভাবে আমরা কিছুকাল আগে সেই দৃশ্য অনুভব করেছি। মাথাপিছু মাত্র চারটাকার মতো খরচ করে আমাদের দেশ একবারের চেষ্টাতেই মঙ্গলের কক্ষপথে মঙ্গলযান পাঠিয়ে দিল। আমাদের দেশের বিজ্ঞানীরা সারা পৃথিবীর অভিনন্দন কুড়োলেন। অথচ সেই সময় দেখা গেল, ইসরোর অধিকর্তা ত্রিভুবনের সবচেয়ে ধনাঢ্য ঈশ্বর তিরুপতির কাছে গিয়ে প্রার্থণা করছেন, 'হে ঈশ্বর, আমাদের মঙ্গলযানকে মঙ্গলের কক্ষপথে বসিয়ে দাও।' মঙ্গলযানের একটি ছোটো মডেল নিয়ে ঈশ্বরের পদপ্রান্তে সমর্পিত করা হল। কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারিকা পর্যন্ত যে মানুষেরা এই দৃশ্য দেখেছেন, কী শিক্ষা গ্রহণ করেছেন তারা? প্রশ্ন তো জাগতেই পারে মনে, কার প্রতিভার জোরে মঙ্গলযান মঙ্গলের কক্ষপথে পৌঁছুল? ঈশ্বর তিরুপতির নাকি একদল বিজ্ঞানীর দিন রাতের শ্রম আর নিষ্ঠার ফসল এই সার্থক অভিযান? স্বদেশের মাটিতে প্রবহমান জীর্ণ বিজ্ঞান সংস্কৃতিকে জীর্ণতর করে তোলা হল। বলতে দ্বিধা নেই, ভারতের বিজ্ঞানী সমাজ থেকে প্রত্যাশিত প্রতিবাদ দেখা যায়নি। কয়েকজন নিশ্চয়ই প্রতিবাদ জানিয়েছেন। এই দৃশ্য থেকে আমাদের মনে পড়ছিল অনেককাল আগে লেখা অক্ষয়কুমার দত্তের একটি রচনার কথা। অক্ষয়কুমার তাঁর লেখায় একটি গাণিতিক (নাকি সামাজিক?) সমীকরণ যোগ করেছিলেন। পরিশ্রম = শস্য। পরিশ্রম + প্রার্থনা = শস্য। অতএব, প্রার্থনা = শূন্য।

শোনা যায়, হিন্দু হস্টেলের কয়েকজন ছাত্র অক্ষয়কুমারকে প্রার্থনার উপযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন করেছিল। অক্ষয় দত্ত তখন ছাত্রদের কাছে জানতে চাইলেন, কৃষকেরা পরিশ্রম করে কী পায়? ছাত্ররাই উত্তরে বলল, শস্য। অক্ষয়কুমার তখন আবার জিজ্ঞেস করলে, পরিশ্রমের পাশাপাশি কৃষকেরা যদি প্রার্থনা করে, তবে কী পায়? এবারও ছাত্রদের একযোগে উত্তর, 'শস্য'। অক্ষয়কুমার তখন বললেন, তোমরাই তো তাহলে বুঝতে পারছ, প্রার্থনার দাম শূন্য।

একথাও শোনা যায়, এই নিয়ে সেসময় বাংলার সমাজে হই চই পড়েছিল। অনেকেই ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। বাবু নীলমাধব মুখোপাধ্যায় যখন অক্ষয়কুমারকে বলেছিলেন যে তিনি একথা বলে শহরে চাঞ্চল্য ঘটিয়ে দিয়েছেন, অক্ষয়কুমার উত্তরে বলেছিলেন, 'বিশুদ্ধবুদ্ধি বিজ্ঞানবিৎ লোকের পক্ষে যাহা অতি বোধ-সুলভ, তাহা এদেশীয় লোকদের নূতন বোধ হইল এইটি বড় দুঃখের বিষয়।' অক্ষয়কুমার আর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের একই বছরে (১৮২০) জন্ম। ব্রাহ্ম সমাজের একটি প্রার্থনা সভার বিবরণ মুদ্রণে রাজি হননি বলে 'তত্ত্ববোধিনী' পত্রিকার সম্পাদক পদ অক্ষয়কুমারকে ছাড়তে হয়েছিল। অক্ষয়কুমারের সেই প্রতিবাদী আখ্যান একুশ শতকের ভারতে নিছক 'উপহাস' বলেই মনে হয়। কোনো শিক্ষা স্বদেশ তা থেকে অর্জন করেনি।
**************************************************
ভারতের এই ত্রয়ী বিজ্ঞান ব্যক্তিত্বের (সতীশ ধাওয়ান, আবদুর রহমান ও পুষ্প এম ভার্গব) আবেদনে সেদিন ভারতে খুব বেশি বিজ্ঞানজীবী মানুষ এগিয়ে আসেননি। ওই সোসাইটির (সায়েন্টিফিক ওয়ার্কার্স অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়া) যিনি সদস্য হবেন, তাঁকে একটি অঙ্গীকার পত্রে সই করতে হত। কী ছিল সেই অঙ্গীকার পত্র?

'I believe that knowledge can be acquired only through human endeavour and not through revelation, and that all problems can and must be faced in terms of man's moral and intellectual resources without invoking supernatural powers.'

'আমি বিশ্বাস করি যে কোনো দৈববলে নয়, মানব প্রচেষ্টা থেকেই জ্ঞান অর্জিত হয়। কোনো অতিপ্রাকৃত শক্তিকে আহ্বান জানিয়ে নয়, মানুষের নৈতিক ও বৌদ্ধিক সম্পদের উপর নির্ভর করেই সকল সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে।'

পুষ্প ভার্গব লিখেছেন, বিজ্ঞানীদের কাছে যখন এই অঙ্গীকার পত্র নিয়ে যাওয়া হয়েছে, একের পর এক অনেকেই এই অঙ্গীকার পত্রে স্বাক্ষর দিতে অস্বীকার করেন। সেসময় ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন অধ্যাপক নুরুল হাসান। তাঁর কাছে আবেদন করা হয়, সংবিধানে বিজ্ঞান সচেতনার কথা যোগ করা হোক। ১৯৭৬ সালে ৪২ তম সংবিধান সংশোধন হল। তখ '৫১ এ' ধারাটি যোগ হয়। সেই ধারায় লিখিত রয়েছে, ভারতের প্রতিটি নাগরিকের কর্তব্য হবে 'to develop the scientific temper, humanism and the spirit of enquiry and reform.'
**************************************************
বিজ্ঞানী পুষ্প ভার্গবের লড়াইয়ের কথা আমরা জানি। ভারতীয় জনতা দলের আগের মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রী (তিনি এককালে ছিলেন পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক) যখন কলেজে কলেজে জ্যোতিষশাস্ত্র পড়ানোর ফতোয়া জারি করেছিলেন, সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেছিলেন এই বিজ্ঞানী। তাঁর যথার্থ ক্ষোভ, কোনো বিজ্ঞানী বা দেশের কোনো বিজ্ঞান অ্যাকাডেমি তাঁর সপক্ষে সেদিন এগিয়ে আসেননি। যাঁরা এসেছিলেন, বেশির ভাগ-ই বিজ্ঞানজীবী নন। প্রতিবাদে তিনি ভারতের সব কয়টি বিজ্ঞান অ্যাকাডেমির সদস্যপদ বর্জন করেন। সামাজিক সংকটে বিজ্ঞানীদের সংগঠন মতামত জানায়, এম উদাহরণ পশ্চিমের দেশে খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। পশ্চিমের দেশে না গেলে যে বিজ্ঞানীদের 'পরিশুদ্ধি' ঘটে না, তারা সাংস্কৃতিক ভাবনায় ওই সব সংগঠনের কর্মকান্ড থেকে প্রভাবিত হন না। নিজস্ব জীবনবোধে কারও কারও হয়তো কুসংস্কার দেখা যায় না। জনসাধারণের অর্থে উচ্চশিক্ষা ও বিজ্ঞানশিক্ষা গ্রহণ করে বিজ্ঞানমনন প্রসারে জনৈক বিজ্ঞানী কি পুরোপুরি নিশ্চেষ্ট থাকবেন? অধ্যয়ন ও গবেষণা নিশ্চয়ই তার প্রধান কাজ হবে। তার 'অপ্রধান' কাজের তালিকাতে কি বিজ্ঞান মনন প্রসারের কাজ জায়গা পেতে পারে না? অপ্রধান ভাবনার অনেক মানুষ একসঙ্গে কথা বললে তার সামাজিক প্রভাব উপেক্ষা করা যায় না।
**************************************************
আমাদের  ঐতিহাসিক ও প্রত্নতত্ত্ববিদেরা এখন পর্যন্ত প্রাচীনতম যে সভ্যতার সন্ধান পেয়েছেন তার নাম মহেঞ্জোদারো হরপ্পা সভ্যতা। কম বেশি এর বয়স সাড়ে চার হাজার বছর।
**************************************************
ভারতেও কি নিশ্চিত আছি আমরা? তিন বছরে খুন হলেন তিনজন। ডা. নরেন্দ্র দাভোলকার, গোবিন্দ পানসারে ও অধ্যাপক এম এম কালবুর্গি। আরও কম সময়ে বাংলাদেশে খুন হয়ে গেলেন অভিজিৎ রায়, অনন্তবিজয় দাস, ওয়াশিকুর রহমান, নিলয় চক্রবর্তী। পাকিস্তানে ফুলের কুঁড়ির মতো শিশুদের খুন করল সভ্যতার শত্রুবাহিনী।

ভারতীয় উপমহাদেশে দাপিয়ে বেড়াতে চাইছে এই শত্রুদল। জাত, ধর্ম ও বর্ণের বাইরে মিলিত হতে হবে আমাদের সবাইকে। আমাদের পরিচয় থাকবে একটাই। আমরা মানুষ। বিজ্ঞান তো মানুষকে নানা নামে ডাকে না। একটা নামেই ডাকে। হোমো স্যাপিয়েন্স স্যাপিয়েন্স। প্রকৃত বিজ্ঞান ভাবনাই মানুষকে সংঘবদ্ধ করতে পারে। লড়াই হোক মানুষের সামাজিক শোষণ ও অনাচারের বিরুদ্ধে। জাত-বর্ণ-ধর্মের পরিচয় মানুষের শুভবুদ্ধিকে যেন গ্রাস না করে।
**************************************************
দেশ ও সমাজের যে সকল ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান তাঁদের অবস্থান স্পষ্ট করেন না, ইতিহাসের আলোচনায় তাঁদের কখনও বড়ো রকমের জায়গা হয় না। আইনস্টাইনের বিজ্ঞানের কাজ বিজ্ঞানে প্রশিক্ষিত মানুষও কি সব কিছু বুঝতে পারেন? তবু বেশিরভাগ ঘরে তিনি পরিচিত কেন? দেশ ও সমাজের সংকটে স্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ করেছেন।
**************************************************
১৯৭৬ সালে সংবিধান সংশোধনের সময় সংবিধানে 'Scientific temper' শব্দটি সংযোজনের ক্ষেত্রে যে চারজন মানুষের বড়ো অবদান ছিল তাঁরা হলেন মহাকাশ বিজ্ঞানী সতীশ ধাওয়ান, অধ্যাপক ও ঐতিহাসিক সৈয়দ নুরুল হাসান, বিজ্ঞান ঐতিহাসিক আবদুর রহমান ও বিজ্ঞানী পুষ্প এম ভার্গব।
**************************************************
রবীন্দ্রনাথ 'নাইটহুড' উপাধি পেয়েছিলেন ১৯১৫ সালে। ১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের পর তিনি 'নাইটহুড' পরিত্যাগ করেন। ওরা সেদিন থাকলে প্রশ্ন তুলতেন নিশ্চয়ই, ১৯১৫ থেকে ১৯১৯ সালের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ এই উপাধি ত্যাগ করেননি কেন? ওই চার বছরের ব্যবধানে ইংরেজ শাসকেরা কি কোনো রকমের নিপীড়ন রচনা করেনি?
**************************************************







Saturday, 17 February 2024

বিপ্লবের বলি - সম্পাদনা পবিত্রকুমার গুপ্ত

কবি রবীন্দ্রনাথ বড় দুঃখের সহিত লিখিয়াছিলেন "পিতামহের বিরুদ্ধে আমাদের এইটেই সব চেয়ে বড়ো অভিযোগ। সেই তো আজ তাঁহারা নাই, তবে ভালো মন্দ কোনো-একটা অবসরে তাঁহারা রীতিমত মরিলেন  না কেন। তাঁহারা যদি মরিতেন তবে উত্তরাধিকারসূত্রে আমরা নিজেদের মরিবার শক্তি সম্বন্ধে আস্থা রাখিতে পারিতাম। তাঁহারাও নিজে না খাইয়াও ছেলেদের অন্নের সংগতি রাখিয়া গেছেন, শুধু মৃত্যুর সংগতি রাখিয়া যান নাই। এত বড়ো দুর্ভাগ্য, এত বড়ো দীনতা আর কী হইতে পারে।"

কবি আবার লিখিয়াছেন "বাঙালী আজকাল লোকসমাজে বাহির হইয়াছে। মুশকিল এই যে, জগতের মৃত্যুশালা হইতে তাহার কোনো পাস নাই। সুতরাং তাহার কথাবার্তা যতই বড়ো হোক, কাহারও কাছে সে খাতির দাবি করিতে পারে না। এইজন্য তাহার আস্ফালনের কথায় অত্যন্ত বেসুর এবং নাকিসুর লাগে। না মরিলে সেটার সংশোধন হওয়া শক্ত।"
********************************************************
ক্ষাত্রবীর্য্যহীন ভীরু বলিয়া নূতন রাজা ইংরাজ তাহার সামরিক খাতায় বাঙ্গালীর নাম কাটিয়া দিয়াছিল। ইংরাজী শিক্ষিত বাবুর দল, সাহেব মুখনিঃসৃত অপবাদ নীরবে সহ্য করিয়াছে, এমন কি নির্লজ্জের মত তাহা সমর্থনও করিয়াছে। বিজয়ী ইংরাজ কখনো বাঙ্গালীর মুখে অভিনেতাসুলভ অপরিমিত স্পর্দ্ধাবাক্য শুনিয়া চিন্তিত বা চঞ্চল হয় নাই, - কার্য্যে যে বাঙ্গালী কিছুই করিতে পারে না, এই সিদ্ধান্ত সকলেরই মনে বদ্ধমূল হইয়া গিয়াছিল। কিন্তু বাঙ্গালী চরিত্রের মধ্যেও যে প্রচণ্ড দুঃসাহসিকতার বীজ লুক্কায়িত আছে, - যাহা সমস্ত পারিপার্শ্বিক অসহায় অবস্থাকে উপেক্ষা করিয়া অসাধ্য সাধনের জন্য তেজোদৃপ্ত মস্তক দাঁড়াইতে পারে, যাহা অত্যাচার, শাসন, পীড়নের ভয়কে তুচ্ছ করিয়া মরণরঙ্গে মাতিতে পারে, নিশ্চিত মৃত্যু বা ততোধিক ভয়ঙ্কর কঠোর শাস্তির সম্মুখে দাঁড়াইয়া যাহা ব্যাঙ্গহাস্যে আত্মগৌরব রাখিতে পারে - সেই অপ্রেমেয় সাহস ও শৌর্য্য প্রকাশ করিয়া বিংশ শতাব্দীর প্রথম প্রভাতেই যাহারা বাঙ্গালীর দীর্ঘ দুই শতাব্দীর কলঙ্ক স্খলন করিয়াছেন, এমনকি রাজপুরুষগণেরও বিস্মিত শ্রদ্ধা আকর্ষণ করিয়াছিলেন, -- যতীন্দ্রনাথ তাঁহাদেরই মুকুটমণি।


Monday, 12 February 2024

জ্যোতিষশাস্ত্র ও জ্যোতির্বিজ্ঞান - ডঃ শ্যামল চক্রবর্তী

 আমাদের যে চারটি 'বেদ' রয়েছে তার কোনটিতেই 'জ্যোতিষী'র কথা লেখা নেই। চারটে 'বেদ' বাদ দিয়ে 'বেদাঙ্গ' রয়েছে। দর্শন রয়েছে। 'ব্রাহ্মণ' ও 'সংহিতা'র কথাও আমরা জানি। এসবই খ্রিস্ট ধর্ম দু'হাজার থেকে পাঁচশো বছর আগের কথা। বেদসাহিত্যের কোথাও আপনি জ্যোতিষী, কোষ্ঠি, ঠিকুজি এসব কথা পাবেন না। সার্কুলার দাতারা বলেছেন, পুরোনো ভারত জানতে 'বৈদিক জ্যোতিষ' পড়ুন। আমরা বলছি, বেদসাহিত্যে জ্যোতিষীর ব্যাপার স্যাপার নেই বলেই ভারতীয় হিসেবে আমরা গর্বিত। আমাদের একটি বেদাঙ্গের নাম 'জ্যোতিষাম অয়নম'। পাতা খুলে দেখবেন। খ-গোলের কথা আছে। জ্যোতিষ্কদের চলাফেরার কথা আছে। খ-গোল মানে 'পৃথিবী' অনেকেই জানেন। গ্রহ, ভাগ্য, হস্তরেখা এসব কথার চিহ্নমাত্র নেই।

হ্যাঁ, ভারতীয় হিসেবে গর্ব হয় যখন দেখি চীন মিশর গ্রিস সকল সভ্যতায় 'জ্যোতিষী'র কথাবার্তা থাকলেও ভারতীয় সভ্যতায় তার ছায়া মাত্র নেই। গ্রিক সভ্যতা বাদ দিলে বাকি সব সভ্যতায় এই জ্যোতিষচর্চা রাজা রাজড়াদের বাড়ির বিষয় ছিল। সব রাজাই একজন বা একের বেশি রাজজ্যোতিষী রাখতেন। কখন যুদ্ধে যেতে পারলে জয় হবে, কখন সিংহাসনে রাজপুত্রের অভিষেক হবে, কখন রাজকন্যার বিয়ে দিলে ভালো হয় - এসব কথা রাজজ্যোতিষীদের গোনা গুনতি করে বলতে হত। সাধারণ মানুষ 'রাজাউজির'দের ব্যাপার স্যাপার নিয়ে মাথা ঘামাতেন না। গ্রিক সভ্যতায় এসে আমরা দেখতে পেলাম 'জ্যোতিষ' বিষয়টা একরকমের আটপৌরে চরিত্র অর্জন করেছে। সাদামাটা মানুষেরাও 'জ্যোতিষ' নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছেন। ভালোমন্দ জানতে জ্যোতিষীদের কাছে যাচ্ছেন। নিশ্চয়ই সেই যুগে কোন কারসাজি ছিল। রাজার বাড়ির আচার বাইরে ছড়াতে পারলে ব্যবসা বাড়ে অনেক। বুদ্ধি খাটিয়ে একদল মানুষকে এই কাজ করতে হয়েছে। যেখানে মানুষের বসতি সেখানেই জ্যোতিষের আলোচনা শুরু করতে হয়েছে। বিজ্ঞানের ইতিহাস পড়লে আমরা দেখি, গ্রিস দেশের পণ্ডিতেরা একটা বিষয়ে খুব অহঙ্কার করেন। কি বিষয়? গ্রিক সভ্যতার আগে নাকি পৃথিবীর কোথাও 'বিজ্ঞান' ছিল না। কি ছিল তবে? ওঁরা বলেন, 'জ্ঞান' ছিল, 'বিজ্ঞান' ছিল না। আমরা জানি, কথা দুটোর মানে আলাদা। 'জ্ঞান' বলতে কত কি হতে পারে। 'বিজ্ঞান' বললে যা খুশি হয় না। নিয়মকানুন মেনে কথা বলতে হয়। আমরা এখানে কথাটার সত্যি-মিথ্যে যাচাই করছি না। তবে বলতে চাইছি, গ্রিক সভ্যতার শেষ দিকে ছিল ব্যাবিলন সভ্যতা। ব্যাবিলন শহরকে মাঝে রেখে গড়ে উঠেছিল। সেই সভ্যতারই একজন রাজা ছিলেন আলেকজাণ্ডার। আলেকজাণ্ডার খ্রিস্টপূর্ব ৪০০ সালের কাছাকাছি আমাদের দেশ আক্রমণ করেন। তখনই ওঁদের দেশ থেকে এই দেশে 'জ্যোতিষবিদ্যা'র আমদানি ঘটে। আগে বলেছি আমরা, গ্রিক সভ্যতার আমলে জ্যোতিষচর্চা ঘরে ঘরে ঢুকে পড়ে। কোষ্ঠি তৈরি শুরু হয়।

বাইরে থেকে কোন কিছু এলেই তা বেঁচে থাকে না। তাকে বাঁচিয়ে রাখতে হয়। আমরা দেখছি, প্রথম যে নামকরা মানুষ 'জ্যোতিষ' বাঁচিয়ে রাখতে উদ্যোগী হয়েছেন তিনি বরাহমিহির। ছয় শতকের চরিত্র বরাহমিহির। পণ্ডিত মানুষ। নানা বিষয়ে তাঁর বই রয়েছে। গণিত, জ্যোতিষ, ভূগোল এমনকি প্রাণিবিদ্যাতেও তাঁর খুব উঁচুমানের বই ছিল। তাঁর জীবনের কথা বলতে গেলে দুটো বইয়ের নাম করতে হয়। 'পঞ্চসিদ্ধান্তিকা' আর 'বৃহৎসংহিতা'। প্রথম বইটিতে হিন্দু জ্যোতির্বিদ্যার নানা ভাবনা চিন্তা রয়েছে। হিন্দু জ্যোতির্বিদ্যার পাঁচটি শাখা। পৌলিশা, রোমক, বশিষ্ঠ, সূর্য আর পৈতামহ। এদের এক একটিকে আমরা 'সিদ্ধান্ত' বলি। তাই একসাথে বরাহমিহির নাম দিয়েছিলেন 'পঞ্চসিদ্ধান্তিকা'। তবে একটা কথা বলা দরকার। পৌলিশা ও রোমক সিদ্ধান্তে গ্রিক ভাবনার যথেষ্ট প্রভাব দেখা যায়। এমন কথা বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহাও বলেছেন। বরাহমিহির তাঁর লেখায় আমাদের দেশের আর্যভট্ট ছাড়াও লাটদের সিংহাচার্য, প্রদ্যুম্ন ও বিজয়নন্দীর কথা বলেছেন।

আমাদের দেশের বিশিষ্ট জ্যোতির্বিজ্ঞানী জয়ন্ত বিষ্ণু নারলিকার ১৬ই জুন ২০০১ তারিখের 'ইকোনমিক অ্যান্ড পলিটিকাল উইকলি' পত্রিকায় পরিষ্কার লিখেছেন, 'বৈদিক জ্যোতিষবিদ্যা 'বৈদিক' নয়, 'বিজ্ঞান'ও নয়। আমাদের বেদের কোথাও এই বিষয়ে কথা নেই। বরং বলা যায় আর্যভট্ট প্রথম (পঞ্চম শতাব্দ) থেকে শুরু করে ভাস্কর দ্বিতীয় (দ্বাদশ শতাব্দ) পর্যন্ত আমাদের জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চা ঈর্ষণীয় মৌলিকত্বের সাক্ষর রেখেছে।

দ্বিতীয় যে বইটির কথা আমরা বলব, বোধ হয় বরাহমিহির সেই বই না লিখলে আরও ভালো করতেন। দুর্বলতাহীন একজন বড়ো মাপের বিজ্ঞানী হিসেবেই তাঁর নাম আলোচনা হত। যাই হোক, বইটির নাম আমরা বলেছি। 'বৃহৎসংহিতা'। ফলিত জ্যোতিষের বই। গ্রহের ফেরে মানুষের নানা রকমের ক্ষতি হয়। ক্ষতি এড়াতে গ্রহরত্ন ধারণ করতে হয়। বরাহমিহির কথাটা মানেন। তাই 'বৃহৎসংহিতা'য় নানা গ্রহরত্নের গুণাগুণের কথা ফলাও করে লিখলেন।