Thursday, 7 September 2023

চিঠিপত্র - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর - শান্তিনিকেতনের প্রাক্তন ছাত্র শ্রীঅরবিন্দমোহন বসুকে লিখিত

ধর্ম্মকে দেশে প্রতিষ্ঠা না করে দেশকেই ঈশ্বরের এবং ধর্ম্মের আসনে প্রতিষ্ঠিত করবার যে চেষ্টা তাকে য়ুরোপীয় নজিরের খাতিরে আমরা কখনই শ্রদ্ধা করতে পারবনা। Manlinessএর দোহাই দিয়ে ধর্ম্মকে দুর্ব্বল Sentimentalism বলে উড়িয়ে দেবার একটা প্রথা য়ুরোপে আছে আমরাও তার নকল করতে সুরু করেছি - কিন্তু আমাদের দেশে যাকে মনুষ্যত্ব বলে তা Manlinessএর চেয়ে অনেক বড় - আমরা যেন ঐ য়ুরোপীয় Manlinessএর ধিক্কারে লজ্জিত হয়ে তাড়াতাড়ি ঐ মনুষ্যত্বকে বিসর্জন দিতে প্রস্তুত না হই। আমাদের দেশে বলেচেন, "ভূমাত্বেব বিজিজ্ঞাসিতব্যঃ" ভূমা অর্থাৎ যিনি সকলের চেয়ে বড় তাঁকেই জানতে তাঁকেই লাভ করতে চাইবে - তাঁকে আর কিছুরই কাছে ছোট করতে চাইবেনা - যদি তাঁকে খর্ব্ব করে প্যাট্রিয়টিজ্ম্কেই একটা ঘোরতর অন্ধতা; আমাদের দেশের হাঁচি টিকটিকি, ওলাবিবি ঘেঁটুপুজার মতই অন্ধতা; প্রভেদ এই যে, এই অন্ধতার উপর সভ্যদেশের ছাপ মারা আছে - এই অন্ধতা বড় নাম ধরে আমাদের বড় রকম করে ভোলাতে পারে। একথা নিশ্চয় মনে রাখতে হবে দেশ আমাদের দেবতা নয় - অর্থাৎ ঈশ্বরের পরিবর্তে আমরা দেশকে বরণ করতে পারিনে। ... সংসারের সমস্ত দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে প্রবৃত্তির সমস্ত উত্তেজনার মধ্যে, প্রয়োজনের সমস্ত প্রলোভনের মধ্যে এই একটি হাল অটলভাবে চেপে ধরে থাকতেই হবে যে, লাভই হোক আর ক্ষতিই হোক, বাঁচিই আর মরিই, ধর্ম্মকে, ভূমাকে, অর্থাৎ শ্রেষ্ঠতম সত্যকে মহত্তম মঙ্গলকে সর্ব্বান্তঃকরণে স্বীকার করবই - দুর্ব্বলতাবশত তার থেকে ভ্রষ্ট হতে পারি কিন্তু স্পর্দ্ধা করে কোনোদিন যেন একথা মনে চিন্তাও না করি যে ধর্ম্ম চুলোয় যাক দেশকে আমি বড় করে তুলব দেশের জন্য চুরি করব, ডাকাতি করব, অন্যায় করব। দৈশিকতা (প্যাট্রিয়টিজ্ম্) আমাদের আত্মাকে চরম আশ্রয় দিতে পারবেনা, আমি মনুষ্যত্বকে বরণ করে নিয়েছি - আমি হীরের মূল্যে কাচ কিনব না - দৈশিকতা যে মনুষ্যত্বকে লঙ্ঘন করবে এত আমি আমার জীবনে ঘটতে দিতে পারবনা - সেই পথে দু পা বাড়িয়েই দেখলুম পারলুম না - দেশকে ছাড়িয়ে যদি ধর্ম্মকে যদি বিশ্ব মানবকে না দেখতে পাই, যদি দেশের সংস্কারে আমার ঈশ্বরকে আচ্ছন্ন করে তাহলে আমি আমার আত্মার খাদ্য হতে বঞ্চিত হই।

Wednesday, 21 June 2023

ঝড়ের খেয়া - শ্যামল চক্রবর্তী

কমরেড চিত্তব্রত মজুমদারের সি আই টি ইউ -র পশ্চিমবঙ্গ কমিটির সাধারণ সম্পাদক হিসাবে নির্বাচিত হওয়া এবং ভারতে নয়া উদারনীতিবাদের প্রবর্তন দুটোই সমসাময়িক। চিত্তদার শ্রমিক ফ্রন্টে বড় অবদানই হলো নয়া উদারনীতিবাদের আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের রণকৌশল আয়ত্ত করার জন্য সি আই টি ইউ'র পশ্চিমবঙ্গের সংগঠনকে প্রস্তুত করা। এই কারণেই মতাদর্শগতভাবে এবং ব্যবহারিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে পরিস্থিতির উপযোগী করে সি আই টি ইউ'র রাজ্য কমিটিকে গড়ে তোলার জন্য তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছেন।


১৯৯১ সাল থেকে ভারতে নয়া উদারনীতিবাদের অর্থনীতি প্রচলিত হয়। কিন্তু তার এক দশক আগে থেকেই আমাদের দেশে সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়নের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। রাজ্যের সাধারণ সম্পাদক হওয়ার আগেই পার্টির শ্রমিক ফ্রন্টের নেতা হিসাবে তিনি গোটা শ্রমিক শ্রেণীর প্রস্তুতির জন্য কলম ধরেছিলেন। এই সময়ে মার্কসবাদী পথে এবং অন্যান্য পত্রিকায় তিনি স্পষ্টভাবে নতুন পরিস্থিতির আক্রমণাত্মক ভূমিকা এবং তারই প্রতিরোধে শ্রমিকশ্রেণীর ভূমিকা কী হবে তা নির্দিষ্টভাবে উপস্থিত করেন। বিশ্বের এক তৃতীয়াংশ সমাজতান্ত্রিক দেশ হলেও বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে অর্থাৎ বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে পুঁজিবাদ যে টিকে গেলো এবং পুঁজির স্ফীতি হলো তার অনেক কারণের মধ্যে একটা বড় কারণ হলো প্রযুক্তিবিদ্যার অভাবনীয় উন্নতি। যাকে এককথায় এখন বলা হয় প্রযুক্তি বিপ্লব বা তৃতীয় শিল্প বিপ্লব।


পুঁজিবাদ পুঁজির পিছনে ছোটে এবং প্রযুক্তির অবিরাম বিপ্লবী পরিবর্তন করে, মার্কসের এই বিশ্লেষণ গত শতাব্দীর শেষার্ধে তীব্র এবং প্রকট হয়ে উঠেছে। এই নতুন প্রযুক্তি সম্পর্কে ভারতের মতো দেশে শ্রমিকশ্রেণীর দৃষ্টিভঙ্গি কী হওয়া উচিত এবিষয়ে তিনি পার্টি এবং সি আই টি ইউ'র মধ্যে মতাদর্শগত সংগ্রামের নেতৃত্ব দিতে শুরু করেন। তিনি লেখেন, 'এ প্রসঙ্গে প্রথমেই উল্লেখ করা প্রয়োজন যে সমাজ বিকাশের ধারাকে অনুসরণ করে সামাজিক শ্রমের ফল আধুনিক প্রযুক্তিবিদ্যা। উৎপাদনের কাজে আধুনিক প্রযুক্তিবিদ্যার প্রয়োগের বিরোধিতা করা এ কারণেই শ্রমিকশ্রেণীর সর্বজনীন নীতি হতে পারে না। আধুনিক প্রযুক্তিবিদ্যা নিজে থেকে শ্রমিকশ্রেণী ও জনগণের কখনোই ক্ষতি করে না । বরং তা সামাজিক উৎপাদনের বিকাশ ঘটায় এবং সামাজিক শ্রমের লাঘব ঘটায়।


কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তি বিদ্যার প্রয়োগ কার স্বার্থে এবং কাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে শ্রমিকশ্রেণীর ও জনগণের মুখ্য বিচার্য বিষয় এটাই। কোনও দেশে আধুনিক প্রযুক্তিবিদ্যা যদি পুঁজিপতি শ্রেণীর দ্বারা তাদের স্বার্থে নিয়ন্ত্রিত হয়, সেক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তিবিদ্যা শ্রমিকশ্রেণী ও জনগণের স্বার্থে ভূমিকা পালন করতে পারে না। এক্ষেত্রে সামাজিক পরিবর্তন ঘটিয়ে, উৎপাদনের উপকরণের ওপরে ব্যক্তিগত মালিকানার বিলোপ ঘটিয়ে সামাজিক মালিকানা কায়েমের মাধ্যমেই শ্রমিকশ্রেণী ও জনগণ আধুনিক প্রযুক্তিবিদ্যাকে সামাজিক উৎপাদনের বিকাশ এবং সামাজিক শ্রমের লাঘব করতে ব্যবহার করতে পারেন। সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তন না ঘটালে শ্রমিকশ্রেণী ও জনগণ কখনোই আধুনিক প্রযুক্তিবিদ্যার সুফল ভোগ করতে পারে না' (মার্কসবাদী পথ, সপ্তম বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা, ১৯৯৮)।


এই প্রসঙ্গে তিনি লিখেছিলেন, আমাদের দেশেও উৎপাদনের উপকরণের ওপর এবং প্রযুক্তির মালিকানা দেশী-বিদেশী পুঁজিবাদীদের নিয়ন্ত্রণে, কাজেই সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত উচ্চতর প্রযুক্তিবিদ্যা প্রয়োগের কুফল শ্রমিকশ্রেণী ও জনগণের একটা বড় অংশকে ভোগ করতেই হয়। কাজেই সমাজ পরিবর্তনটাই হবে শ্রমিকশ্রেণীর মূল লক্ষ্য। এতো গেল রণনীতির কথা। কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে জনগণ কী দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করবে? এই প্রসঙ্গে তিনি লিখেছিলেন, 'আধুনিক প্রযুক্তিবিদ্যার প্রয়োগের বিরুদ্ধে সংগ্রাম পরিচালনা করে শিল্পকে ধ্বংস করে দেওয়া ও সংগঠনকে দুর্বল করা শ্রমিকশ্রেণীর লক্ষ্য হতে পারে না। এই কারণেই সংগ্রাম পরিচালনা করতে শ্রমিকশ্রেণীকে অনেক কিছুই বিবেচনার মধ্যে আনতে হয়। আজ যে শিল্প গড়ে উঠেছে, তা আধুনিক প্রযুক্তিবিদ্যাকে ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে। এর পাশাপাশি পুরাতন যে সমস্ত কারখানা একই জিনিস উৎপাদন করছে, তাদের পক্ষে নতুন কারখানার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব তা দেখা দরকার। পশ্চিমবাংলায় এমন বহু পুরাতন শিল্প আছে, আধুনিকীকরণ না হলে যেগুলির টিকে থাকা সম্ভব নয়। এসব ক্ষেত্রে বরং আধুনিকীকরণের দাবিই শ্রমিকশ্রেণী করে থাকেন' (মার্কসবাদী পথ, সপ্তম বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা, ১৯৯৮)।

Monday, 29 May 2023

নেতাজীর সিক্রেট সার্ভিস - ডাঃ পবিত্রমোহন রায়

ডস্টয়েভক্সির 'ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট' পড়ছিলাম। ডস্টয়েভক্সি ছিলেন বিপ্লবী দলে। রাজার বিরুদ্ধে আমাদেরই মতো যুদ্ধ চালানোর অভিযোগে জার সম্রাটের হুকুমে তার ও আরও কুড়িজনের মৃত্যুদন্ডের আদেশ দেওয়া হয়। কনকনে ঠান্ডা এক সকালে তাকে বধ্যভূমিতে নিয়ে গিয়ে লোহার খুঁটিতে বেঁধে দেওয়া হয়। ঘাতকের দল রাইফেল নিয়ে প্রস্তুত। শুধু সংকেতের অপেক্ষা। চোখের নিমেষে তারপর মাথার খুলি চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাবে। মাটিতে লুটিয়ে পড়বে রক্তাক্ত ছিন্নভিন্ন শরীর।   


এমন সময় দূর দিগন্তে দেখা গেল একজন ঘোড়সওয়ার জোর কদমে ছুটে আসছেন। সম্রাট মৃত্যুদন্ড মকুব করে যাবজ্জীবন কারাদন্ডের আদেশ দিয়েছেন। রাশিয়ার পালাবদলের কয়েক বছরের মধ্যেই অবশ্য তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। 'ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট'-এর নায়ক হত্যার অপরাধে অপরাধী। বাঁচার অদম্য আকাঙ্খা তাকে পাগল করে তুলেছিল। কিন্তু মৃত্যু কুঠরিতে বসে আমাদের সেই অনুভূতি নেই কেন? বিশাল সমুদ্রের মধ্যে ছোট্ট একটি দ্বীপে একখন্ড পাথরের ওপর এক পা মাত্র স্পর্শ করে সে বাঁচতে চেয়েছিল। আর আমি? প্রাণ মৃত্যহীন, মরার পরেও আমি আবার নতুন করে বেঁচে উঠব - এই চিন্তা আমাকে আসন্ন মৃত্যু সম্পর্কে উদাসীন করে তুলেছিল। এখন মনে হল, যদি বাঁচতে হয় তাহলে মানুষের মধ্যে মানুষ হয়েই বাঁচব। অত্যাচার ও নিপীড়নের দেশে ঘরকুনো 'ভালো ছেলের' জীবন পরাধীন ভারতবাসীর নয়। 


আজাদ হিন্দ ফৌজের সেনাদের দিল্লীর লাল কেল্লায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। শুনলাম - কয়েক দিনের মধ্যেই তাদের বিচার শুরু হবে। সিমলা বৈঠকের ব্যর্থতার পর এদিকে পন্ডিত জওহরলাল নেহরু এই প্রথম আজাদ হিন্দের কথা জনসাধারণের কাছে বলতে লাগলেন। দেখতে দেখতে কয়েক দিনের মধ্যেই সারা ভারতে আজাদ হিন্দ বাহিনীর বীরত্বগাঁথা ছড়িয়ে পড়ল। ইতিমধ্যে ভারত সরকার দিল্লীর লালকেল্লার শাহনওয়াজ, ধীলন ও সেগলের ঐতিহাসিক বিচার শুরু করলেন। যে আজাদ হিন্দ বাহিনীর কথা ভারতবাসী জানত না, সেই আজাদ হিন্দের লোকদেরই তারা নিজের মানুষ বলে গ্রহণ করেছে। আমরা আমাদের কথা কখনও মানুষকে মুখ ফুটে বলতে পারিনি। ফাঁসির ঘরে এসেই আমরা আমাদের কথা যথাসাধ্য জোর গলায় আশেপাশের বন্দীদের শোনাতে লাগলাম।


সারা দেশে তখন আজাদ হিন্দের নাম উত্তাল একটা ঢেউ বয়ে যাচ্ছে। সাম্রাজ্যবাদবিরোধী প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক চেতনার ওপর ভিত্তি করে শুরু হয়েছিল অগাস্ট বিপ্লব। আজাদ হিন্দ ফৌজের আদর্শ ও নেতাজীর নেতৃত্ব সারা ভারতের মানুষের মনে একটা নতুন বৈপ্লবিক চেতনার সৃষ্টি করেছিল। জাতি, বর্ণ, ধর্মের ভেদাভেদ ভুলে সবাই ঐক্যবদ্ধ হলেন। আজাদ হিন্দ আন্দোলনের সঙ্গে দেশবাসী একাত্মবোধ করতে লাগলেন। ভারতের আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার হৃদয় তোলপাড় করে তখন ধ্বনিত হচ্ছে একটি নাম - নেতাজী আর তার আজাদ হিন্দ ফৌজ।


সারা ভারতের এই পরিস্থিতির পটভূমিকায় অমিতা মিত্র বোম্বাই ও পুনায় গিয়ে মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে আমাদের বিষয়ে আলোচনা করলেন। যারা অহিংসা মন্ত্রের উপাসক নয়, যারা পরাধীন দেশের মুক্তিসাধনায় নিজের অস্ত্রে শত্রুর রক্তে মায়ের শ্বেত কমল লালে লাল করে তুলেছে, যারা সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে নিজের কাটামুন্ড নিয়ে মরণোৎসবে হোলি খেলেছে, আজ তাদেরই জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠলেন অহিংসা মন্ত্রের ভাবমূর্তি মহাত্মা গান্ধী স্বয়ং।


ইতিমধ্যে আরও প্রায় চার মাস কেটে গেল। তিন তিনবার আমাদের ফাঁসির সব ব্যবস্থা সম্পূর্ণ হল, তিন তিনবারই দিল্লী থেকে তা বন্ধ করা হল। এখানে খাওয়ার অসুবিধা নেই, চিন্তাভাবনার হাত থেকেও মুক্তি পেয়েছি, মেনে নিয়েছি যে, মৃত্যু আমাদের অবধারিত। তবে এ মৃত্যু মহান, এ মৃত্যু কাম্য। কারণ আজ প্রতিটি ভারতবাসী আজাদ হিন্দ আন্দোলনকে বুক দিয়ে ভালবেসেছে, আমাদের জন্য তারা প্রাণ বিসর্জন দিতে প্রস্তুত। আমাদের আদর্শ জয়লাভ করেছে। মৃত্যুর আগে একথা জেনে যাওয়ার মতো আনন্দ, সৌভাগ্য ও কৃতিত্ব আর কী থাকতে পারে।


সে এক দারুন গ্রীষ্মের দুপুরে এই রুদ্ধঘরে প্রবেশ করেছিলাম। এই ঘরে বসে চোখের সামনে নিবিড় বর্ষার ক্লান্ত সন্ধ্যার ঘনায়মান ছায়া দেখলাম, শরৎকালের অসংখ্য তারকাখচিত দিগন্তছোঁয়া নির্মল আকাশ দেখলাম। হেমন্ত শেষ হয়ে এখন শীতের আমেজ পাওয়া যাচ্ছে। ১৯৪৫-এর ৪ নভেম্বর। ঘরে ঘরে কালীপুজো ও দেওয়ালির উৎসব। আজাদ হিন্দের পক্ষ থেকে দেশজোড়া বিপুল আন্দোলনে ও মহাত্মা গান্ধীর অমোঘ প্রভাবে ব্রিটিশ 'সিংহ' মাথা নিচু করল। ভাইসরয় মহাত্মাজীর অকাট্য যুক্তির কাছে হার মেনে আমাদের চারজনের ফাঁসির হুকুম রদ করলেন। যাবজ্জীবন কারাদন্ডের আদেশ হল।


তাঁতের অন্ধকারের আড়ালে এই বদ্ধ প্রকোষ্ঠের লৌহকপাট সশব্দে উন্মুক্ত হল। আমরা ফাঁসির ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। পরস্পরকে আলিঙ্গন করলাম। রাজবন্দীর অভিনন্দন জানালেন।


যাবজ্জীবন কারাদন্ডের পালা শুরু হল। জয়হিন্দ!




 


















   

Sunday, 28 May 2023

জাতীয়তাবাদ - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

 আমি যথেষ্ট নিশ্চিত যে, এই দেশে এমন কিছু লোক আছেন যাঁরা তাঁদের উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত আদর্শের সঙ্গে সহমর্মিতা বোধ করেন না এবং যাদের উদ্দেশ্য হল বিকশিত হওয়ার বদলে কিছু লাভ করা। তাঁরা উচ্চৈস্বরে গর্ববোধ করেন এই ভেবে যে, তাঁরা জাপানকে আধুনিকতার স্তরে উন্নীত করেছেন। আমি তাঁদের সঙ্গে এইটুকু মাত্র সহমত পোষণ করি যে, জাতির মানসিকতা কালের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা উচিত, কিন্তু আমি তাঁদের সাবধান করে বলতে চাই, আধুনিক হয়ে ওঠা আধুনিক মনোবৃত্তির এক ধরণের ভড়ং মাত্র, ঠিক যেভাবে কাব্যপ্রেরণার ভড়ং করার অর্থ হল কবি-কবি ভান করা। এটা অন্যের ভাবভঙ্গি নকল করা ছাড়া আর কিছু নয়। আসলের চেয়ে নকলের ভড়ং আরও বেশি উচ্চগ্রামের এবং তাও আবার আক্ষরিক। একথা মনে রাখতে হবে যে, যাঁদের মধ্যে প্রকৃত আধুনিক মানসিকতা আছে তাঁদের আধুনিক হওয়ার কোন প্রয়োজন হয় না, যেমন যাঁদের মধ্যে প্রকৃত বীরত্ব আছে তাঁদের হামবড়া লোক হওয়ার কোন প্রয়োজন নেই। ইউরোপীয়দের মতো বেশভূষা ধারণ করার মধ্যে কোন আধুনিকতা নেই। ইউরোপীয় শিশুরা যে দৃষ্টিকটু কাঠামোর মধ্যে অন্তরীণ থেকে তাদের পড়াশুনা চালায়, কিম্বা চ্যাপ্টা সোজা দেওয়ালবিশিষ্ট সারি সারি জানালা আছে এমন বর্গক্ষেত্র আকারের বাড়িতে সেখানকার মানুষ সারাজীবন বন্দি হয়ে কাটায় এর মধ্যে কোন আধুনিকতা নেই; কিম্বা সে দেশের মহিলাদের মাথায় যে অসংগতিপূর্ণ গোলাকার টুপি থাকে তার নিশ্চয়ই কোন আধুনিকতা নেই। এ সবকিছু আধুনিক নয়, এগুলি শুধু ইউরোপীয় মাত্র। যথার্থ আধুনিকতা হল মনের মুক্তি, রুচির দাসত্ব নয়। প্রকৃত অর্থে আধুনিকতা হল চিন্তার ও কর্মের স্বাধীনতা, ইউরোপীয় বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অভিভাবকত্বে থাকা নয়। আধুনিকতা হল বিজ্ঞান, জীবনে বিজ্ঞানের ত্রুটিপূর্ণ প্রয়োগকে আধুনিকতা বলা যায় না। বিজ্ঞানের যেসব শিক্ষক বিজ্ঞানকে অন্ধ সংস্কারের পর্যায়ে নামিয়ে আনেন এবং অসম্ভব সব উদ্দেশ্যে অবাস্তবভাবে বিজ্ঞানের সাহায্য নেন তাঁদের কেবল অনুসরণ করার নাম আধুনিকতা নয়।

Friday, 6 January 2023

দলিত ভারত - পি সাইনাথ

সিকার শহরের পঁচিশটি বাড়ির প্রতিটি পরিবার থেকে পতাসিবাঈ একটা করে রুটি পায় প্রতিদিন। কেউ কেউ আবার সামান্য কটা পয়সাও দেয়। যদিও সে নিজে পয়সা চায় না, কারোর দয়া ভিক্ষাও করে না পতাসি। যারা তাকে প্রতিদিন রুটি দেয়, পতাসির সঙ্গে একসাথে বসে খাওয়ার কথা কল্পনাও করতে পারে না তারা। যদিও পতাসি কাজ না করলে প্রতিটি বাড়ি আর পরিবারই নরককুণ্ড হয়ে যাবে। পতাসির প্রতিদিনের কাজটা তাদের সুস্থ নাগরিক জীবনের পক্ষে চূড়ান্তভাবে অপরিহার্য, অথচ তারা ভীষণ সতর্ক থাকে যাতে পতাসির ছোঁয়া না লাগে।


পতাসি নিজের হাতে সব ভদ্রজনদের বিষ্ঠা পরিষ্কার করে প্রত্যেকের খাটা পায়খানা থেকে। --"হ্যাঁ, আমি মাথায় করে মানুষের গু-মুত বয়ে নিয়ে যাই। তার বদলে মজুরি হিসাবে প্রতিদিন একটা রুটি কিংবা মাসে দশটা টাকা পাই প্রতি বাড়ি থাকে। আমি দিনে প্রায় পঁচিশটা বাড়ির ময়লা পরিষ্কার করি।" একটা ঝুড়িতে ময়লা তুলে মাথায় করে দূরের আবর্জনা ফেলার জায়গায় তা ফেলতে হয়। পায়খানা থেকে ময়লা ফেলার দূরত্ব প্রায় এক কিলোমিটার।


এই সিকার টাউনে পতাসির মতো কয়েকশো মহিলা আছে, যারা বেঁচে থাকার জন্য একই কাজ করতে বাধ্য হয়। মানুষ হয়ে নিজের হাতে মানুষেরই বর্জ্য, মলমূত্র, ক্লেদ ঘেঁটে নাগরিক জীবনকে পরিচ্ছন্ন রাখে। শহরের ভদ্র মহোদয়গণ চমৎকার ভদ্রজনোচিত একটা নামও দিয়েছেন এই পূতিগন্ধময়, নিজেদের শরীরের বর্জ্য আবর্জনার : 'নাইট সয়েল'। মাথায় করে পতাসিরা তাই বহন করে নিয়ে যায়।


এরা টিনের পাত দিয়ে চেঁছে আর এক হাতে ছোট একটা ঝাঁটা দিয়ে কাঁচিয়ে এই ময়লা ঝুড়িতে তোলে। সরকারি বাবুরা পতাসিদের গায়ে একটা লেবেল সেঁটে দিয়েছেন। তাই সরকারি ভাষ্যে তাদের বলা হয় 'ভাঙ্গি'। ময়লা কুড়োনিদের জাতিগোষ্ঠীর লোক। তো, সে যে নামেই ডাকুক না, পতাসি নিজেকে 'মেথর'ই বলে। এদের মধ্যে কোনো কোনো গোষ্ঠী নিজেদের পরিচয় দিতে শুরু করেছে 'বাল্মীকি' বলে।


এই কাজ করে মাসে আড়াইশো টাকার বেশি আয় হয় না পতাসির। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কমই হয়। কোনো কোনো পরিবার আবার পয়সা দেয় না। মজুরি হিসাবে এদের কাছ থেকে পাওয়া যায় একটা করে রুটি।


আবার যোধপুরে পতাসিদের মতো এই কাজটা যারা করে, তারা আরও কম পায়। মেথর বস্তির গিরজাবাঈ-এর কাছ থেকে জানলাম - প্রতি পরিবার থেকে দিনে একটা রুটি আর মাসে পাঁচ টাকা।


এই বস্তির প্রতি পাঁচজনে একজন মলমূত্র পরিষ্কার করার এই কাজ করে।


ভারতবর্ষে মানুষের মলমূত্র সাফাই করার কাজটা নিজের হাতে করে, সেই মানুষদের সংখ্যা কত?


১৯৭১ সালে সেনসাস পর্যন্ত মানুষের মাথায় মানুষেরই বিষ্ঠা বহন করার কাজটা জীবিকা বা বৃত্তি হিসাবে তালিকাভুক্তই করা হয়নি। কিছু রাজ্য সরকার তাদের রাজ্যে মলমূত্র বহন করার মতো একটা বৃত্তির অস্তিত্ব আছে এটা পর্যন্ত স্বীকার করেন না। তবু ভুলে ভরা, অনুমান-নির্ভর যে তথ্য আছে, তাতে দেখা যাচ্ছে প্রায় দশ লক্ষ দলিত নিজেদের হাতে মানুষের মলমূত্র সাফাই-এর কাজ করে। প্রকৃত সংখ্যাটা সম্ভবত অনেক বেশি। তারা শহুরে ভদ্রলোকদের পায়খানা সাফাই করে, খালি হাতে পচাগলা মৃত জন্তুদের দেহ তুলে নিয়ে যায়।


এই কাজটাই আবার জাতপাতে বিভাজিত ভারতীয় সমাজে আচার-বিচার, সংস্কারের শোচনীয় দূষণকে ডেকে আনে। অস্পৃশ্যতা একটা বৈধ সামাজিক মূল্যবোধের মতোই পতাসিদের অস্তিত্বকে প্রতিটি মুহূর্তে তাড়া করে ফেরে। এমনকী দলিতদের অন্যান্য অংশের কাছেও বাল্মীকিরা অস্পৃশ্য! আচারে-বিচারে-সংস্কারে দলিতরা নিজেরাও এই অভিশাপকে লালন করে নিজেদের মধ্যে। আর বাল্মীকিদের বহন করতে হয় মনুষ্যেতর জীবনের অসহনীয় লাঞ্ছনা। তাদের বস্তিতে এই বিভাজন আরও তীব্র। আর এই নরকের মধ্যে আরও ভয়ঙ্কর মনুষ্যেতর জীবনযাপনের বিচ্ছিন্নতায় বাস করে বাল্মীকিরা।


সিকার বস্তির বংশীলাল গভীর হতাশার সঙ্গে বলল - অবর্ণনীয় দারিদ্রের নিকষ অন্ধকারে ঢাকা পড়ে থাকে বাল্মীকিদের বস্তিগুলি। - "আমাদের চারিদিকে অবদমনের শব্দ, চারিদিকে সর্বগ্রাসী দারিদ্র্যের ক্ষয়।"


জাতপাতের এই নৃশঃস বিভাজন শুধু গ্রামাঞ্চলেই সীমাবদ্ধ নেই। শহরের প্রান্তিক জনজীবনেও আছে। নিজের হাতে এই ক্লেদ পরিষ্কার করার বৃত্তিটা কিছু জাতের জন্যই নির্দিষ্ট। বেশ কিছু পরিবার আবার বংশানুক্রমে এই কাজই করে আসছে। আবার মফঃস্বল টাউনে কিংবা শহরে বাল্মীকিরাই এই কাজ করে থাকে। যেন এটা তাদেরই জাতগত পেশা।


গ্রামাঞ্চলে মানুষ মাঠেই মলমূত্র ত্যাগ করে। সিকার রাজস্থানের প্রায় দু লক্ষ মানুষের এক শহর। তেমনই যোধপুর রাজস্থানের আর এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শহর। জনসংখ্যা পনেরো লক্ষের মতো।


-"আমি যে বাড়িগুলিতে কাজ করি তার পঁচিশটা বাড়ির মধ্যে বারোটায় পাকা পায়খানা আছে।" সিকারের গোমতি তার কাজের কথা জানাল। কিন্তু বড় পরিবারের পক্ষে তাদের পায়খানাগুলি খুবই ছোট। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বড়রা পাকা পায়খানা ব্যবহার করে, ছোটরা কাঁচা পায়খানা। আমাকে কাঁচা পায়খানাগুলি পরিষ্কার করতে হয়। 


গোমতি মাসে নির্দিষ্ট কোনো মজুরি পায় না। শুধু দৈনিক একটা করে রুটি পায়। আর যখন মলমূত্র মাখানো বাচ্চাদের জামাকাপড় পরিষ্কার করায় বাবুরা - তখন মাত্র পাঁচ টাকা পায়। আর কিছু না।


অন্য বহু রাজ্যের মধ্যে রাজস্থান একটা রাজ্য, যেখানে স্বাধীনতা-উত্তর পঞ্চাশ বছরে এদের জন্য প্রায় কিছুই করা হয়নি।


১৯৯৩ সালে কেন্দ্রীয় সরকার দ্য এমপ্লয়মেন্ট অফ ম্যানুয়াল স্ক্যাভেনজারস অ্যান্ড কন্সট্রাকশন অফ ড্ৰাই ল্যাট্রিনস (প্রোহিবিশন) অ্যাক্ট চালু করে। এটা রাজ্য তালিকাভুক্ত বিষয়। কেন্দ্রীয় সরকার তাই পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, কর্ণাটক, মহারাষ্ট্র এবং গোয়া - এই রাজ্যগুলির সমর্থন চায় এবং রাজ্যগুলিও এই আইন প্রণয়নে অকুন্ঠ সমর্থন জানায়। (কেরালায় গণসচেতনতা রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এই বৃত্তির অবসান হয়েছে অনেক আগেই)। কিছু পরে মধ্যপ্রদেশ এবং অন্ধ্রপ্রদেশ তাদের সমর্থন জানায়। কিন্তু রাজস্থানে এই আইন এখনও চালু করা যায়নি।


মানুষের বর্জ্য, মলমূত্র, ক্লেদ মানুষের হাত দিয়ে পরিষ্কার করার এই বৃত্তির সংজ্ঞা নির্ধারণ করাটাও এক সমস্যার ব্যাপার। বেশিরভাগই স্যানিটেশন বা নিকাশির কাজে নিযুক্ত, তারাই এই বৃত্তিতে আসে। এদের পরিবারের অনেক সদস্যই আবার নগর পরিষদে ঝাড়ুদারের কাজ করে। এই সাফাই কর্মচারীরা বহু ধরনের স্যানিটেশন কাজের সঙ্গে যুক্ত।


এই পরিবারের অনেককে পাওয়া যায় যারা নিজেরাই ময়লা পরিষ্কারের কাজ করে। আবার কিছু মহিলা সাফাই কর্মচারী হিসাবে কাজ করেও এই কাজ করে। আবার কিছু মিউনিসিপ্যালিটি বেআইনিভাবে মলমূত্র পরিষ্কার করার জন্য এদের ভাড়া করে গোপনে।


এমনকী মহানগরগুলির ম্যানহোলগুলিতে এদের নামিয়ে ময়লা পরিষ্কার করায়। মাটির তলায় নোংরা কাদায় প্রায় বুজে যাওয়া পয়ঃপ্রণালীর ময়লা তোলার কাজেও তাদের ব্যবহার করা হয়।


সিকারে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কম বয়সি মেয়েরাই বিষ্ঠা পরিষ্কার করার কাজটা করে। এমন অনেক মেয়ের মধ্যে তিনজনের কথা বলি। শকুন্তলা, বয়স ১৬। লাচ্ছি আর রিনা, দু-জনেই ১৪।


-"কয়েকমাস আগে আমরা কাজ বন্ধ করেছিলাম। দু'মাস আমরা এই কাজ করিনি। কিন্তু কোনো কিছুই হয়নি। কাজ বন্ধের দু'মাসে আমরা কারো কাছ থেকে কোনো সাহায্য পাইনি। আমাদের অন্য কোনো উপায়ও ছিল না। তাই বাধ্য হয়ে এই কাজই আবার শুরু করলাম। যদিও নিজেদের ওপরে খুব ঘেন্না হল।"


ভাঙ্গিদের এই মনুষ্যেতর বৃত্তির বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধটা তাদের নিজেদের জাতের মধ্যে থেকেই প্রবলভাবে শুরু হয়েছিল।


মেথর বস্তির ছোট্টুরাম আমাদের জানিয়েছিল যে, "যখন মেয়েরা আর এই কাজ করবে না বলে রুখে দাঁড়াল প্রবল চাপ দেওয়া হয়েছিল তাদের ওপর। অনেককে মারধোরও করা হয়েছিল।"


-"আমাদের ঘরের মরদরাই এ কাজ করতে বাধ্য করত আমাদের। তুমি তাদের সঙ্গে কথা বলে দেখতে পারো।" কমলা এই পরামর্শটা দিয়েছিল আমাকে।


আর আমরা যাদের সঙ্গে কথা বললাম তারা সবাই এই জন্তু-জানোয়ারের মতো নোংরা তোলার বিরুদ্ধে ক্রুদ্ধ জেহাদ ঘোষণা করল। তাদের মধ্যে বিজেপি আর কংগ্রেস(আই)-এর নেতারাও ছিল। এরা সব সাফাই কর্মচারী ইউনিয়নের মাথা।


অথচ কার্যকর এবং প্রামাণ্য কোনো বিরোধিতা তাদের কোনো কর্মসূচির মধ্যে দেখতে পাইনি। এমনকী তাদের ইউনিয়নের দাবিসনদের কোথাও মানুষ মানুষের মলমূত্র মাথায় করে বহন করবে - এর বিরুদ্ধে একটা শব্দও নেই।


পতাসিরাই তাদের কাজের সুবিধার কথা প্রসঙ্গে বলল, "যদি ট্রলি কিংবা চাকা লাগানো ঠেলা গাড়ি পাই তাহলে ময়লা বইতে কিছুটা সুবিধা হয় আমাদের। আমরা যখনই নগরপালিকার কাছে এই গাড়ির কথা বলি, তারা হ্যাঁ বলে।অথচ কখনও কোনো ধরনের গাড়িই দেয় না।"


ইউনিয়নের নেতারাও তাদের অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করে জানাল যে, গাড়ি দিলেই কাজটা নগর পরিষদের পুরুষ-কর্মীদের কাছে চলে যাবে। আর সামান্য যে-কটা ঠেলা গাড়ি দেওয়া হয়েছিল, সেগুলিও চুরি হয়ে গেছে। বাজারে, ভাঙা লোহালক্কড়ের দোকানে বিক্রি হয়েছে স্ক্র্যাপ হিসেবে।


মেয়েরা চেয়েছিল আর একটু লম্বা ঝাঁটা। যাতে বিষ্ঠাটা তাদের হাতে মাখামাখি না হয়।


সিপিআই(এম)-এর গণেশ বেড়ওয়াল ধরিয়ে দিলেন - অন্য জায়গার চাইতে অনেক ছোট ঝাড়ু দেওয়া হয় এদের। তার ফলে অনেকটা ঝুঁকে, বিষ্ঠায় প্রায় নাক ঠেকিয়ে ময়লা তুলতে হয় এদের। ফলে নানা রোগ সংক্রমণের ঝুঁকি তো থেকেই যায়।


এদের সমস্যা নিয়ে গবেষণা করছেন সুসান ই. চ্যাপলিন। তাঁর গবেষণাপত্রে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, মানুষ মানুষের বিষ্ঠা, মূত্র, ক্লেদ হাতে করে কাঁচিয়ে মাথায় বহন করে নিয়ে যাবে, এই মধ্যযুগীয় বর্বর ব্যবস্থা নিষিদ্ধ করার আইনে যে রাজ্যগুলি প্রথমে সমর্থন জানিয়েছিল সেই রাজ্যগুলিতেই শুধু এই আইন কার্যকর হয়েছে। তার মানে, এই মনুষ্যত্বের কাজটা ভারতবর্ষের নানা প্রদেশের কম করে ২৫০০ ছোট আর বড় শহরগুলিতে এখনও এভাবেই চলছে।


চ্যাপলিন দেখিয়েছেন যে ১৯৫৬-৫৭ সালে এসসি/এসটি কমিশনার এই বর্বর প্রথাটা বন্ধ করতে চেয়েছিলেন। মাথায় করে মানুষের মলমূত্র বহন করার বৃত্তিটার মধ্যেই অস্পৃশ্যতার অভিশাপ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার কারণটা সুপ্ত আছে। আর ময়লানিকাশির এই পদ্ধতিটা চূড়ান্ত অমানবিক, অস্বাস্থ্যকরও বটে।


রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রী অশোক গেহলোট এই সমস্যার সমাধান চাইছেন। জয়পুরে তিনি কথা প্রসঙ্গে আমাদের বলেছিলেন যে, "সরকার খুব তাড়াতাড়ি এই নিষিদ্ধকরণের আইন প্রয়োগ করবে। অন্য রাজ্যগুলি যেভাবে এই সমস্যা মিটিয়েছে, আইনি পথে সেই কাজটাই আমরা শুরু করতে চলেছি।"


এইসব প্রতিশ্রুতির প্রতি মেথররা কিন্তু কঠোর দৃষ্টি রাখবে। বিশেষভাবে যোধপুরে। কেননা যোধপুর গেহলোটের নিজের জায়গা।


যোধপুর বস্তিতে হিসেব মতো শহরের প্রতি চতুর্থ পায়খানাটি কাঁচা। মানে হাত দিয়ে পরিষ্কার করার মতো পায়খানা! এই কাজ তাদের মর্যাদা, সন্মান সব কিছু ধ্বংস করে দিচ্ছে। ফলে এই অসহনীয় বৃত্তির হাত থেকে মুক্তি চাইছে তারা।


সিকারেও মেয়েরা এই 'গান্ধাগি' থেকে রেহাই পেতে উন্মুখ ছিল। মানুষের বিষ্ঠা তাদের তিক্ত ঘৃণার ভাষায় গান্ধাগি ছাড়া আর কী? ভেতরে ভেতরে এই পূতিগন্ধময় জীবিকার বিরুদ্ধে তীব্র অন্তর্মুখী একটা ঐক্য গড়ে উঠছে তাদের মধ্যে।


কিন্তু আর একটা বিষয়েও তারা ঐক্যবদ্ধ ছিল। যদি এই কাজটা সত্যি সত্যি নিষিদ্ধ করা হয়, তাহলে এর থেকে আয় যত সামান্যই হোক না কেন, তার ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থাও করতে হবে।


-"আমাদের আর কী উপায় আছে!" এই তীব্র প্রশ্নটা করল গোমতি। "আমরা মরদ নগর-পরিষদে কাজ করে। আমাদের তিনটে মেয়ে, দুটো ছেলে, তাদের তো মানুষ করতে হবে। আমাদের আয়ও তো খুবই সামান্য।"


পতাসিবাঈ-এর সাতটা ছেলে-মেয়ে। কিশোরী শকুন্তলা আর তার বন্ধুরা জানে যে, এই কাজ করার ফলে তাদের মর্যাদা বলে কিছু থাকছে না। আবার এটাও তারা জানে যে, এই কাজ না করলে তারা ধ্বংস হবে অন্যভাবে। তারা সরকারের কাছে খয়রাতি নয়, পুনর্বাসন চায় - যদিও সেটা পাওয়ার ব্যাপারে বিন্দুমাত্র বিশ্বাস নেই তাদের।


সরকার প্রায়ই খাটা পায়খানাগুলি জলের তোড়ে পরিষ্কার করার পায়খানায় পালটে ফেলার ক্ষেত্রে তহবিলের অপ্রতুলতার কথা বলে। কিন্তু এক বাল্মীকি ধরিয়ে দিল সরকারি এই যুক্তির ফাঁকিটা। - "অন্যান্য ফালতু, অপ্রয়োজনীয় নানা স্কিমের জন্য তো টাকার অভাব হয় না!"


অষ্টম পরিকল্পনায় সাফাই কর্মচারীদের পুনর্বাসনের জন্য ৪৬৪ কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দ ছিল, অথচ তাদের ভাগ্যে ছিটেফোঁটাও জুটল না। একটা ফুটো পয়সাও তারা চোখে দেখতে পেল না। কার্যত এই সব বড় বড় কথার ভণ্ডামি আর প্রতিশ্রুতিভঙ্গের ঘটনা দেখে দেখে তারা এতটাই বীতশ্রদ্ধ যে কোনো কিছুতেই আর তারা বিশ্বাস করে না।


-"এই দেশটা অদ্ভুত মজার।" পরিহাসছলে খুবই গভীর একটা প্রসঙ্গের অবতারণা করল যোধপুর মেথর বস্তির বামপন্থী কর্মী শ্যামজি কাল্লা।


একজন অবসরপ্রাপ্ত নাবিক। ১৯৭১ সালে আইএনএস বিক্রান্তের সঙ্গে লড়াইটা নিজে প্রত্যক্ষ করেছে।


-"যখন রাজন্যভাতা বিলোপ হল তখন যারা শত্রুদের স্বার্থরক্ষা করেছে, তাদেরই পুরস্কৃত করা হয়েছে। অথচ যখন মাথায় করে মানুষের মলমূত্র বহন করার জঘন্য প্রথাটা নিষিদ্ধ করা হল আইন করে, তখন এতদিন যারা একেবারে পূতিগন্ধময় ক্লেদের মধ্যে নেমে এই নাগরিক সমাজটাকে পরিচ্ছন্ন রেখেছে, শুধুমাত্র অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়োজনে তাদের জন্য কিছুই করা হল না। বরঞ্চ যতই নোংরা হোক, নিষিদ্ধ করার আইন যদি জারি করা হয়, একদিক থেকে শাস্তিই দেওয়া হবে তাদের। শ্রেণী শাসনটা এরকমই নির্দয়।"


তার অনুমান আর অবিশ্বাসটা ভুল প্রমাণিত হোক, মনেপ্রাণে সেই নাবিক সেটা চায়। কিন্তু তার কথায় - এটাতো শুধু টাকার প্রশ্ন নয়, এটা ন্যায়েরও প্রশ্ন। এমনকী যেখানে বাল্মীকিরাও নিজেদের আর্থিক অবস্থার কিছু উন্নতি করতে পেরেছে, সেখানে নিজেদের মধ্যে সামাজিক ভারসাম্য বজায় থাকেনি। বহু ছোট শহরে ঝাড়ুদারের কাজে তাদেরই নিরঙ্কুশ আধিপত্য, ফলে স্থায়ী বেতনের কর্মচারী হয়েছে তারা। বেতন তাদের কম হলেও বেশ কয়েক বছর আগে আর্থিক অবস্থা যা ছিল, তার থেকে এখন যথেষ্ট ভালো অবস্থা তাদের।


কিন্তু এমনই একটা কাজে তাদের একাধিপত্য প্রতিষ্ঠিত, যে কাজটা কেউ করতে চায় না। তাই এখনও পর্যন্ত সমাজের পাতালকুঠির সবচেয়ে অন্ধকারে তাদের অবস্থান। যদিও পরিবর্তন হচ্ছে, কিন্তু অতি ধীর বিলম্বিত গতিতে। আর কখনও কখনও তা তীব্র বিড়ম্বনার কারণও ঘটায়। কারণটা, স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গির যুবক কাল্লা জানাল, "এভাবেই তো জাতপাতের ওপর নির্ভরশীল ব্যবস্থাটা টিকে যাক।"

Saturday, 17 December 2022

অবরোধ প্রতিরোধে প্যালেস্তাইন

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মদত ছাড়া ইজরায়েল এই আগ্রাসী মনোভাব নিয়ে চলতে পারত না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই আরব দুনিয়ায় মার্কিন শিখণ্ডী হিসাবে ইজরায়েল ভূমিকা পালন করেছে।


১৯৪৯ থেকে ২০০০ পর্যন্ত আমেরিকা প্রতিরক্ষা বাদ দিয়েই ৯১০০ কোটি ডলার সাহায্য করেছে ইজরায়েলকে। এর প্রায় তিন চতুর্থাংশ পরিমাণ দেওয়া হয়েছে গত ১৪ বছরে। ইজরায়েলকে প্রতিরক্ষা বহির্ভূত খাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে অর্থ বা ঋণ দেয় তার একটি বিস্ময়কর নিয়মও চালু আছে ১৯৮৪ থেকে। প্রতি বছর আমেরিকাকে যে টাকা ফেরত দেবার কথা তার থেকে বেশি টাকা ইজরায়েলকে দিয়ে দেওয়া হয় বছরের শুরুতেই। ইজরায়েলকে আমেরিকা সবচেয়ে বেশি অর্থ দেয়। আমেরিকার মোট বিদেশের জন্য বরাদ্দ অর্থের এক-তৃতীয়াংশই পায় ইজরায়েল। যদিও ইজরায়েলের জনসংখ্যা হলো পৃথিবীর ০.০০১ শতাংশ। ইজরায়েল মাথাপিছু আয়ের দিক থেকে বিশ্বের ষোড়শ স্থানে, ইউরোপের অনেক দেশের চেয়েই ওপরে। এতদসত্ত্বেও ইজরায়েলকে এভাবে অর্থসাহায্য করার কারণ নিশ্চয়ই অর্থনৈতিক নয়। ইজরায়েলকে শক্তিশালী করা মার্কিন রণনীতিরই অঙ্গ।


আরব দুনিয়ায় জাতীয়তাবাদী এবং প্রগতিশীল আন্দোলনের ঢেউ উঠেছিল গত শতাব্দীর ছয় ও সাতের দশকে। আরব দুনিয়ার অভ্যন্তরে শাসকরা যেমন সেই প্রবণতা রুখতে চেষ্টা করেছে, ইজরায়েলকে কাজে লাগানো হয়েছে আরব দুনিয়াকে শাসনে রাখতে। ১৯৬৭ সালে আরব-ইজরায়েল যুদ্ধের পর থেকে ইজরায়েল আমেরিকার 'দৃঢ় রাজনৈতিক ও সামরিক মিত্র' হিসেবে ওয়াশিংটনের নীতিপ্রণেতাদের কাছে বিবেচিত হয়েছে।


ইজরায়েল আমেরিকার অস্ত্র পেয়েছে, ইজরায়েলের সেনাবাহিনী প্রায় পুরোপুরিই আমেরিকার অস্ত্রে সজ্জিত শুধু তা-ই নয়, তৃতীয় দেশকে মার্কিন অস্ত্র সরবরাহ করা হয়েছে ইজরায়েলের মাধ্যমে। যেমন দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবিদ্বেষী শাসকদের, লাতিন আমেরিকায়। ইজরায়েলের মধ্যেও আমেরিকার এই ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ইজরায়েলী সংবাদপত্র ইয়েদিয়ত আহারোনোতের ভাষায়, 'ইজরায়েল হলো এক গডফাদারের বার্তাবাহক, তার নোংরা কাজগুলি করে দেবার লোক'। এই 'নোংরা কাজের' মধ্যে পড়ে প্যালেস্তাইনের আধিপত্য বজায় রাখা, সিরিয়া থেকে ইরান মধ্য প্রাচ্যকে সামরিক হুমকির মধ্যে রাখা, দুনিয়ার দেশে দেশে মার্কিনী অস্ত্রনির্মাতাদের অস্ত্র নাম-বেনামে চালান করা এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে আমেরিকার যাবতীয় কুকীর্তির পাশে দাঁড়ানো।


প্যালেস্তাইন সমস্যার সমাধানে আমেরিকার তথাকথিত উদ্যোগগুলি আসলে ইজরায়েলের অবস্থান শক্তিশালী করার জন্যই। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক রশিদ খালিদির একটি বইয়ের নামই হলো 'প্রতারণার দালালি'। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে শান্তি প্রক্রিয়ার নামে প্যালেস্তাইনের সমস্যাকে জীইয়ে রাখছে, তার বিবরণ রয়েছে এই বইয়ে। এর একটি বড় কারণ আমেরিকার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে জায়নবাদীদের বিপুল প্রভাব। তারা মার্কিন নীতিকে ইজরায়েলমুখী করে তোলে। আমেরিকার মধ্যে নয়া রক্ষণশীল বা 'নিও কন' বলে পরিচিত যে কট্টর গোষ্ঠী রয়েছে, যারা বিশ্বজুড়ে সামরিক আগ্রাসনের পক্ষে সওয়াল চালিয়েছে, তাদের অনেকেই জায়নবাদী বা তাদের ঘনিষ্ঠ।


******************************************************************


গাজায় ইজরায়েলী আগ্রাসন নিয়ে ভারত সরকারের অবস্থান দেশের মধ্যে ও আন্তর্জাতিক স্তরে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। বিজেপি সরকার এমনকি সংসদে গাজার ঘটনা নিয়ে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা করতে দিতেও রাজি হয়নি। সরকারের নিজের স্পষ্ট অবস্থান তো দূরের কথা। বিদেশমন্ত্রী-সহ মন্ত্রীরা যুক্তি দিচ্ছেন, ইজরায়েল ও প্যালেস্তাইন উভয়েই ভারতের 'বন্ধু', গাজার ঘটনা 'স্পর্শকাতর'। রাষ্ট্রসঙ্ঘের মানবাধিকার সংস্থার প্রস্তাবে ইজরায়েল-বিরোধী অবস্থানে সম্মত হলেও এর বাইরে এক ইঞ্চিও নড়েনি নরেন্দ্র মোদীর সরকার। ইজরায়েলী হামলার কোনো নিন্দা করেনি ভারত সরকার।


এই ঘটনা ভারতের বিদেশনীতিতে বড় রকমের পরিবর্তন। ভারত বরাবর প্যালেস্তাইনের পাশে থেকেছে। গান্ধীজীও প্যালেস্তাইনের মানুষের পূর্ণ স্বাধীন রাষ্ট্র ও ভূখণ্ডের পক্ষে সওয়াল করেছিলেন। ১৯৪৬-র মে মাসে গান্ধীজী বলেছিলেন, আমেরিকা ও ব্রিটেনের সাহায্য নিয়ে এবং এখন খোলাখুলি সন্ত্রাসবাদের সাহায্য নিয়ে প্যালেস্তাইনের ওপরে চেপে বসা অত্যন্ত খারাপ কাজ হচ্ছে। নেহরু থেকে ইন্দিরা গান্ধীর সরকার আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্যালেস্তাইনের পক্ষে দাঁড়িয়েছে বরাবর। কিছুদিন আগেও প্যালেস্তাইনের অধিকারের সপক্ষে আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারত সওয়াল করেছে। এমনকি ভারতের ডাকটিকিটে প্যালেস্তাইনের অধিকারের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, ১৯৪৮ থেকে ১৯৯১ ইজরায়েলের সঙ্গে ভারতের পূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিল না। ১৯৫০-এ ভারত ইজরায়েলকে স্বীকৃতি দিলেও ১৯৯২-এ এসে ভারতে ইজরায়েলী রাষ্ট্রদূত পূর্ণ দূতাবাস তৈরি করতে পারেন। এই সময় থেকেই ইজরায়েলের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কেও পরিবর্তন আসতে থাকে। তার একটি কারণ ভারত সরকার নয়া উদারনীতির রাস্তা নেয়, যে পথে পশ্চিমী পুঁজির দাপটই মুখ্য উপাদান হয়ে যেতে থাকে। আন্তর্জাতিক ভারসাম্যের পরিবর্তনে ভারতের বিদেশনীতিতেও মার্কিনমুখী প্রবণতা বাড়তে থাকে। আমেরিকার দৌত্যেই ইজরায়েলের সঙ্গেও ভারতের সম্পর্ক তৈরি হতে থাকে। তবে, ভারতের সঙ্গে ইজরায়েলের সম্পর্ক নতুন দিকে মোড় নেয় অটলবিহারী সরকারের আমলে। ২০০২-এ ইজরায়েলের বিদেশমন্ত্রী সাইমন পেরেজ নয়াদিল্লি সফরে আসেন। এই সফরকে উভয় দেশই অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। ভারতের তদানীন্তন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ব্রজেশ মিশ্র তত্ত্ব হাজির করেন: সন্ত্রাসবাদের হাতে অভিন্ন ভাবে আক্রান্ত আমেরিকা, ইজরায়েল ও ভারত, সুতরাং এই তিন দেশের একসঙ্গে লড়াই করা উচিত। এই সূত্রায়ণ থেকেই ইজরায়েল-ভারত সম্পর্কের বিন্যাস বদলে যেতে থাকে। প্যালেস্তাইন প্রশ্নকে সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে এক করে ফেলে ইজরায়েলের যাবতীয় অমানবিক কুকীর্তিকে প্রশ্রয় দেবার একটি প্রবণতা ভারতের সরকারী নীতিনির্ধারণের জগতেও জায়গা পেতে থাকে।


এই ভারসাম্য বদলের পিছনে একটি উপাদান সামরিক। ইজরায়েলের অর্থনীতির একটি বড় অংশই অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদন ও রপ্তানির। ভারত ক্রমশ ইজরায়েলের সামরিক সরঞ্জামের বড় ক্রেতা হয়ে ওঠে। ইজরায়েলের বৃহত্তম তিন অস্ত্র উৎপাদক - ইজরায়েলী আর্মস ইন্ডাস্ট্রি, ইজরায়েল মিলিটারি ইন্ডাস্ট্রিজ এবং রাফায়েল - ভারতে বড় বরাত পেয়েছে। গত দশ বছরে ভারত ইজরায়েল থেকেই সবচেয়ে বেশি সামরিক সরঞ্জাম কিনেছে। এই সংস্থাগুলি বরাত পেতে উৎকোচ দেওয়ায় কালো তালিকাভুক্তও হয়েছে। প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত এই সম্পর্ক ইজরায়েলের সঙ্গে ভারত সরকারের সম্পর্ক পরিবর্তনের অন্যতম বড় উপাদান।


মতাদর্শ উপাদানকে মোটেই অবহেলা করা চলে না। হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শের সঙ্গে উগ্র জায়নবাদী মতাদর্শের নৈকট্য চোখে না পড়ে পারে না। আরএসএস-র মতবাদিক গুরু গোলওয়ালকার লিখেছিলেন ইহুদীরা তাদের জাতি, ধর্ম, সংস্কৃতি, ভাষা সবই রক্ষা করতে সমর্থ হয়েছে; তাদের জাতীয়তা সম্পূর্ণ করতে শুধু দরকার একটি স্বাভাবিক ভূখণ্ড। প্যালেস্তাইনের জমি দখল করে এই তথাকথিত 'ভূখণ্ড'-ই ইজরায়েল। গোলওয়ালকার যেমন হিটলার অনুরাগী ছিলেন তেমনই জায়নবাদী মতাদর্শকেও সম্ভ্রম করতেন। অভিন্ন সূত্রটি হলো মুসলিম-বিদ্বেষ। গোলওয়ালকার ভারতে 'হিন্দু রাষ্ট্র' প্রতিষ্ঠা করে মুসলিমদের যেভাবে দেখতে চাইতেন, ঠিক সেভাবেই আরব ও প্যালেস্তিনীয়দের দেখে থাকে ইজরায়েল। এই মতাদর্শকে ভারতের সরকারী নীতি নির্ধারণের জগতে নিয়ে আসা হচ্ছে।


গাজায় সাম্প্রতিক আক্রমণের সময়ে নজিরবিহীন ভাবে ভারতের সংবাদমাধ্যমে, সোস্যাল মিডিয়ায় ইজরায়েলের হয়ে সাফাই গাওয়া হচ্ছে। স্তম্ভলেখকদের কেউ কেউ এমনও লিখছেন, পশ্চিম এশিয়ায় ইজরায়েল একমাত্র 'গণতান্ত্রিক' দেশ, নিরাপত্তার প্রশ্নে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখাই ভারতের পক্ষে উচিত হবে। ইতিহাসের পুরো কাহিনী, ঘটনাপরম্পরা, ইজরায়েলের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা, ইজরায়েলের সন্ত্রাসবাদী নেটওয়ার্কের সমস্ত বিষয়কে আড়ালে রেখে জায়নবাদের পক্ষে ভারতের জনমতকে টেনে আনার চেষ্টা চলছে। প্যালেস্তাইনের প্রশ্নকে 'মুসলিম প্রশ্ন' হিসেবে দেখানোর চেষ্টাও চলছে। তবে, প্যালেস্তাইন প্রশ্নে ভারতের এই অবস্থান বদলের পিছনে সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। সাম্রাজ্যবাদের রণনীতিগত পরিকল্পনার অংশ হিসাবেই ইজরায়েল কাজ করছে। এই একই রণনীতিতে ভারতকে টেনে নেবার উদ্যোগ চলছে। ভারত সরকারও ক্রমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে 'স্ট্র্যাটেজিক সম্পর্ক' গড়ে তুলে নিজের স্বাধীন অবস্থানকে দুর্বল করছে।


প্যালেস্তাইনের জনগণের অধিকারের সপক্ষে ভারতে সবচেয়ে সোচ্চার বামপন্থীরা। বরাবর প্যালেস্তাইনের প্রতি সংহতি আন্দোলনের সামনের সারিতে ছিলো ভারতের বামপন্থীরা। এবারেও সংসদে ভারত সরকারকে কাঠগড়ায় তুলেছেন বামপন্থী সাংসদরা। দেশজুড়ে অসংখ্য মিছিল, বিক্ষোভ, সভায় জনগণকে সমবেত করেছেন বামপন্থীরা।


বিপদের বার্তাই স্পষ্টই। প্যালেস্তাইনের পাশে দাঁড়াতে গেলে এখন ভারতেও কঠিন লড়াই হবে। তা-ই যদি হয়, তাহলে ইতিহাসের ডাক, মানবতার আহবান হলো সেই কঠিন সংগ্রামেই পা মেলাতে হবে।

Friday, 16 December 2022

ছাত্র-যুব-মহিলা ফ্রন্ট সম্পর্কে সিপিআই(এম)

ভারতে, স্বাধীনতা সংগ্রামে ছাত্রসমাজ এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। ১৯৩৬ সালের ১২ই আগস্ট লক্ষ্ণৌতে, সারা ভারত ছাত্র-ফেডারেশনের প্রথম সম্মেলনের প্রারম্ভে সভাপতির আসন গ্রহণ করেন মহম্মদ আলি জিন্নাহ্ এবং জওহরলাল নেহরু সম্মেলন উদ্বোধন করেন।