Wednesday, 8 December 2021

কাশ্মীর যুক্তি তর্ক সত্য - শমীক লাহিড়ী

প্রশ্ন-৫) ভারতবর্ষের সংবিধানে উল্লিখিত ৩৭০নং ধারা কি সাময়িক?

উত্তর) সংবিধানের একবিংশ অংশে দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ হল ৩৭০ নং ধারা। এটা ঠিক এর শিরোনামে লেখা আছে এটা সাময়িক, পরিবর্তন সাপেক্ষ এবং বিশেষ বিধান। তাই অনেকেই ব্যাখ্যা করেন এই ধারাটি সাময়িক সময়ের জন্য রচিত হয়েছিল। জম্মু-কাশ্মীরের গণপরিষদ এবং পরবর্তীতে জম্মু-কাশ্মীর বিধানসভা এই ধারার পরিবর্তন, বিলোপসাধন অথবা একই রূপে রেখে দিতে পারে। জম্মু-কাশ্মীরের বিধানসভা এই ধারাটিকে বজায় রাখার সিদ্ধান্ত নেয়, ফলে এটি সাময়িক নয়। এই নিয়ে স্বাধীনোত্তর ভারতবর্ষে অনেক বিতর্ক দেখা যায়। ১৯৬৯ সালে সম্পৎ প্রকাশ মামলায় সুপ্রিম কোর্ট এই ধারাকে সাময়িক আখ্যা দেওয়ার আবেদনকে সরাসরি নাকচ করে। দিল্লী হাইকোর্টে কুমারী বিজয়লক্ষ্মী একটি মামলায় দাবী করেন ৩৭০নং ধারা সাময়িক এবং এই ধারাটিকে বহাল রাখা আসলে সংবিধানের প্রতি জালিয়াতি। দিল্লী হাইকোর্ট এই মামলাও খারিজ করে দেয়। ২০১৮ সালের ৩রা এপ্রিল সুপ্রিম কোর্ট আর একটি মামলায় সরাসরি জানিয়ে দেয়, শিরোনামে সাময়িক শব্দটি লেখা থাকলেও এই ধারাটি সাময়িক নয়। বিভিন্ন সময় এই রায়গুলিতে আদালত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় এই ধারাটির শিরোনামে 'সাময়িক' শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছিল তৎকালীন গণপরিষদকে প্রস্তাবিত ধারাটি সংশোধনী-সংযোজনী অথবা বিলোপ সাধনের অধিকার দেওয়ার জন্য। কিন্তু তৎকালীন গণপরিষদ এবং পরবর্তীতে বিধানসভা এই ধারাটি বজায় রাখার পক্ষে মত দেয়, ফলে এটি 'সাময়িক' নয়।


প্রশ্ন-৬) সংবিধানের ৩৭০নং ধারাটি কি বিলোপ করা যেতে পারে?

উত্তর) এটা ঠিক উপধারা ৩৭০(৩) অনুযায়ী ৩৭০নং ধারা বিলোপ করা যেতেই পারে রাষ্ট্রপতির আদেশের ভিত্তিতে। তবে এই আদেশের জন্য জম্মু-কাশ্মীরের গণপরিষদের সম্মতি প্রয়োজন। কিন্তু ১৯৫৭ সালের ২৬শে জানুয়ারী সেই গণপরিষদ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তাই সংবিধান বিশেষজ্ঞদের অনেকের মত এই ধারা বিলোপ করা যায় না। আবার একাংশের ব্যাখ্যা এটি বিলোপ করতে হলে রাজ্য বিধানসভার সম্মতি প্রয়োজন। বর্তমান বিজেপি সরকার সংবিধান বিশেষজ্ঞদের এই সব মতামতের তোয়াক্কা না করে, জম্মু-কাশ্মীরের জনসাধারণকে অন্ধকারে রেখে, সমস্ত রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বকে কারাগারে নিক্ষেপ করে, ৭ লক্ষ ৪০ হাজার সৈনিকের বন্দুকের ডগায় সেখানকার মানুষকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে রেখে জবরদস্তি এই আইন পাশ করানোর চেষ্টা করেছে। এটা গণতন্ত্র? দেশের উন্নতির জন্য কি ৩৭০নং ধারা কোন অন্তরায় সৃষ্টি করেছে? দেশজোড়া বেকার, অসংখ্য শ্রমিক ছাঁটাই, আকাশ ছোঁয়া মূল্যবৃদ্ধি এইসব সমস্যার দিকে নজর না দিয়ে বন্দুকের ডগায় জম্মু-কাশ্মীরের মানুষের কোনও মতামত না নিয়ে এই কাজ করার অর্থ কি? এটা দেশের জ্বলন্ত সমস্যাগুলি সমাধানে ব্যর্থ মোদী সরকারের দৃষ্টি ঘোরানোর প্রয়াস মাত্র। দেশের বাকি ১০টি রাজ্য বিশেষ অধিকার নিয়ে চলতে পারে অথচ জম্মু-কাশ্মীরের সাধারণ মানুষের সেই অধিকার কেড়ে নেওয়া হলো কেন? একাজ কি সন্ত্রাসবাদীদের আরো সাহায্য করবে না? পাকিস্তান কাশ্মীর প্রশ্নে বরাবর আন্তর্জাতিক মহল থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল প্রধানত ২টি কারণে - (ক) ভারতবর্ষ জম্মু-কাশ্মীরের মানুষকে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার দিয়েছিল (খ) পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদীদের জম্মু-কাশ্মীরে ব্যবহার করলেও, ভারতবর্ষ কখনও পাক অধিকৃত কাশ্মীরে কোন জঙ্গি-সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপে মদত দেয়নি। ভারতবর্ষ বরাবরই শান্তিপূর্ণ-দ্বিপাক্ষিক আলোচনার ভিত্তিতে সমস্যা সমাধানের পক্ষপাতী। এখন বিজেপির এই পদক্ষেপে জম্মু-কাশ্মীরের মানুষের প্রতি বিশ্বাসঘাতক হিসাবে ভারতবর্ষ চিহ্নিত হবে। ৩৭০নং ধারা বিলোপ করলে ভারতবর্ষের বাকি অংশের কোন মানুষের লাভ হবে? ভারতবর্ষের বেকার যুবক কাজ পাবে? শ্রমিকের মজুরী বাড়বে? জিনিসপত্রের দাম কমবে? দেশে গরীবি কমবে? আসলে সর্বক্ষেত্রে ব্যর্থ মোদী সরকার ধর্মের নামে মানুষকে বিভক্ত করে রাখতে চাইছে, আর এই প্রশ্নে জম্মু-কাশ্মীর, তাঁর হাতের তুরুপের তাস। তাই ভারতবড়হ বা পাকিস্তানের শাসক শ্রেণী আভ্যন্তরীন বিপদে পড়লেই, দৃষ্টি ঘোরানোর জন্য জম্মু-কাশ্মীর সমস্যা পরিকল্পিতভাবে সামনে আনে।

প্রশ্ন-১২) সংবিধানের ৩৭০নং ধারা বিলোপ কি প্রয়াত শ্রী শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের দাবী মেনে?

উত্তর) সংবিধানের ৩৭০নং ধারা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সময় শ্রী শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ছিলেন কংগ্রেস দলের সদস্য, সংসদেরও সদস্য এবং ভারতের সংবিধান রচনার জন্য তৈরী গণপরিষদেরও সদস্য। সংসদে অথবা গণপরিষদের কোনও অধিবেশনে শ্রী মুখার্জী ৩৭০নং ধারা গ্রহণ করার সময়ে আপত্তি জানাননি। সংসদে বিভিন্ন বিষয়ে তিনি অনেক বক্তৃতা করেছিলেন কিন্তু এই বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে তিনি কোন বক্তৃতা সংসদে অথবা গণপরিষদে করেননি। বরং ১৯৫৩ সালের ৯ই জানুয়ারী জওহরলাল নেহেরুকে লেখা একটি চিঠিতে উল্লেখ করেছিলেন - "আমাদের নিঃসঙ্কোচে শেখ আব্দুল্লার নেতৃত্বে বিশেষ সুবিধাসহ কাশ্মীর উপত্যকার অস্তিত্ব মেনে নেওয়া দরকার, যতদিন পর্যন্ত তিনি সেই বিশেষ ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন মনে করবেন"। তবে আশ্চর্যজনকভাবে নেহেরু মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের পর পুরানো অবস্থান থেকে সম্পূর্ণ উল্টো পথে হেঁটে কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদার বিষয়টি ভারতীয় সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার বিরোধীতা শুরু করেন। দেশের শিল্পমন্ত্রী থাকাকালীন শ্রী শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ৩৭০নং ধারার বিরোধিতা করেননি কারণ তিনি জানতেন আরও অনেকগুলি করদ রাজ্যকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য ৩৭১নং ধারা যুক্ত হতে চলেছে, সংবিধানে এদের বিশেষ মর্যাদা দেওয়ার জন্য। ৩৭০নং ধারার বিরুদ্ধে বিদ্বেষকে তাই ব্যবহার করা হয়েছে হিন্দুদের ঐক্যবদ্ধ করবার এবং মুসলমান বিরোধী জিগীর তোলাবার জন্য। এরা ৩৭১নং ধারার বিরোধীতা করে না কারণ এটিকে ব্যবহার করে হিন্দু-মুসলমান জনগণকে বিভক্ত করার সুযোগ নেই।

তৎকালীন কাশ্মীরে প্রবেশ করতে গেলে পারমিট নেওয়ার প্রয়োজন হত। শ্রী মুখার্জী 'এক দেশ, এক বিধান, এক নিশান, এক প্রধান' এই স্লোগানকে সামনে রেখে বিনা পারমিটে আইন ভেঙ্গে কাশ্মীর অভিযানে যান এবং গ্রেপ্তার বরণ করেন। একজন সাংসদ কি উদ্দেশ্যে বিনা পারমিটে গায়ের জোরে প্রবেশ করার চেষ্টা করেছিলেন! সাংসদ হিসাবে অনুমতি চাইলেই তো তিনি পারমিট নিয়েই সেখানে যেতে পারতেন। দুঃখজনকভাবে জেলবন্দী থাকা অবস্থাতেই তাঁর মৃত্যু হয়।

প্রশ্ন-১৩) ভারতীয় জনসংঘের প্রতিষ্ঠাতা শ্রী শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের কি অবদান ছিল ভারত গঠনে?

উত্তর) ১৯৪৭ সালের এপ্রিল মাসে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে রাউ কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী তৎকালীন আইনমন্ত্রী শ্রী যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল হিন্দু কোড বিল সংসদের সামনে পেশ করেন। দেশভাগ এবং স্বাধীনতার পর দেশের প্রথম আইনমন্ত্রী ড. বি.আর.আম্বেদকর নেহেরুর মন্ত্রিসভার সামনে এই বিল পেশ করেন এবং তা সিলেক্ট কমিটির বিবেচনার জন্য পাঠানো হয়। ১৯৪৮ সালের ১২ই আগস্ট সিলেক্ট কমিটির রিপোর্ট ড. আম্বেদকর সংসদে পেশ করেন এবং ৩১শে আগস্ট সংসদের সম্মতির জন্য উত্থাপন করেন। ১৯৪৯ সালে ২৯শে ডিসেম্বর বিলটি পেশ করার কথা থাকলেও হিন্দু মৌলবাদীদের প্রবল বিরোধীতার জন্য সেটি সংসদে পেশ করা হয় ১৯৫১ সালে ৫ই ফেব্রুয়ারী। কিন্তু শ্রী শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় সহ হিন্দুত্ববাদীদের প্রবল বিরোধীতায় নেহেরু সরকার কিছুটা পিছু হঠতে বাধ্য হয়।

কি ছিল এই বিলে - (ক) হিন্দু বিবাহ আইন সংশোধন, (খ) হিন্দু উত্তরাধিকার সম্পত্তি সংক্রান্ত আইন, (গ) হিন্দু নাবালক এবং অভিভাবকত্ব আইন, (ঘ) হিন্দু দত্তক গ্রহন এবং পরিচর্যা সংক্রান্ত আইন। এই আইনগুলির মাধ্যমে হিন্দুদের বহু বিবাহ রদ, হিন্দু মহিলাদের বিবাহ বিচ্ছেদ করবার অধিকার, বাল্যবিবাহ রদ, হিন্দু নারীদের সম্পত্তির অধিকার ইত্যাদি পরিবর্তন আনার চেষ্টা হয়েছিল। শ্রী মুখোপাধ্যায় এই আইনের বিরোধীতা করতে হয়ে সংসদে বলেন - 'কোনভাবেই মহিলাদের বিবাহ বিচ্ছেদের অধিকার দেওয়া যাবে না'। বহু বিবাহের অধিকারের পক্ষে দাঁড়িয়ে তার সওয়াল ছিল কেবলমাত্র হিন্দুদের থেকে এই অধিকার কেড়ে নেওয়া যাবে না। তাঁর সহযোগী মদনমোহন মালব্য ভিন্ন জাতের মধ্যে বিবাহের ক্ষেত্রে প্রবল বিরোধীতা করে বলেছিলেন - 'একই জাতির মধ্যে বিবাহ হওয়া উচিত কারণ একই ধরণের খাদ্যাভ্যাস এবং অন্যান্য অভ্যাস তাদের মধ্যে মেলামেশা করতে সুবিধা দেয় এবং ব্যক্তি ও জাতির স্বাস্থ্য এবং সুখ বজায় রাখে'। এই হিন্দু কোড বলের বিরোধীতা করে তাঁরা আরও বলেছিলেন - 'যেহেতু বিবাহ হিন্দু সমাজে একটি গভীর দর্শনের উপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে এবং এটি মৌলিক এবং পবিত্র অধিকার হিন্দুদের, তাই হিন্দু বিবাহ আইনের সংশোধন কোনভাবেই মেনে নেওয়া যায় না'। অর্থাৎ বহু বিবাহের পক্ষে এরা সওয়াল করেছেন।

শ্রী মুখার্জী উচ্চবর্ণদের এই আইনের আওতার বাইরে রাখার পক্ষে জোরালো সওয়াল করে বলেছিলেন - '(উচ্চবর্ণের) যারা উত্তরাধিকার সূত্রে বহু বৎসর ধরে এই ধারাবাহিকতা মেনে চলছেন তারা কিছু কম দেশপ্রেমিক নন অন্যান্য (নিচু) জাতির তুলনায়। এদের উপর জবরদস্তি নতুন আইন চাপিয়ে দেবেন না'। ড. আম্বেদকরের তীব্র আক্রমণের মুখে দাঁড়িয়ে তিনি শেষ পর্যন্ত বলেন - তাহলে সমগ্র ভারতবাসীর জন্য এই আইন প্রয়োগ করা হোক। শ্রী মুখোপাধ্যায় এই আইনের বিরোধীতা করতে গিয়ে অভিযোগ তুলেছিলেন হিন্দুদের আইনের এই পরিবর্তনে হিন্দু ধর্ম নাকি আক্রান্ত হচ্ছে। জবাবে ড. আম্বেদকর বলেছিলেন - 'আমি ওনাকে জিজ্ঞাসা করতে চাই কেউ স্ত্রীকে মারধর করলে সেটা কি ধর্মীয় পরম্পরার নামে মেনে নেওয়া হবে? একটি আদালতে একজন বিচারক বলেছিলেন - হিন্দুধর্মে এটি গ্রহণযোগ্য। আমি শ্রী মুখোপাধ্যায়কে জিজ্ঞাসা করতে চাই এই ধরণের নিষ্ঠুরতা কি ধর্ম?'

শ্রী শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে হিন্দু মৌলবাদী শক্তির প্রবল আক্রমণের মুখে দাঁড়িয়ে সেদিন আম্বেদকর ক্ষোভে পদত্যাগ করেছিলেন। এদেরই উত্তরাধিকার বিজেপি আজ ড. আম্বেদকরের গলায় মালা দেন কোন অধিকারে? সেদিন যারা সব হিন্দুর জন্য এক আইনের বিরোধীতা করেছিলেন, আজ কিসের ভিত্তিতে তারা গোটা দেশের জন্য একই আইন প্রণয়নের কথা বলেন? আসলে একই আইনের নাম করে প্রগতির জন্য সমাজ সংস্কার নয়, সংখ্যালঘুদের উপর আক্রমণ আনার জন্যই ইউনিফর্ম সিভিল কোডের কথা এরা বলছেন।

প্রশ্ন-১৪) শ্রী শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় কি বাংলাভাগ রুখতে চেয়েছিলেন? তিনি কি দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছিলেন?

উত্তর) শ্রী শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় কংগ্রেসের আহ্বানে ভারত ছাড়ো আন্দোলন সম্পর্কে ১৯৪২ সালের ২৬শে জুলাই তৎকালীন ব্রিটিশ গভর্নর জন হারবার্টকে একটি চিঠিতে লেখেন - 'যে কোন ব্যক্তি যদি বর্তমান যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ) মানুষকে জাগিয়ে তুলে আন্দোলন করবার পরিকল্পনা করেন, যার ফলে আভ্যন্তরীন অস্থিরতা এবং নিরাপত্তাহীনতা তৈরী হতে পারে, সরকারের উচিত তাকে প্রতিহত করা'। তিনি আরও লেখেন - 'আপনার অনুগত একজন মন্ত্রী হিসাবে আমি সম্পূর্ণভাবে আপনার সরকারকে সহযোগীতা করতে চাই এবং আমার রাজ্য ও দেশকে এই সংকটজনক মুহূর্তে সেবা করতে চাই।' প্রসঙ্গত উল্লেখ্য সেই সময় স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশ না নিয়ে ফজুলল হকের নেতৃত্বে মুসলীম লীগের মন্ত্রীসভায় তিনি অর্থমন্ত্রী হিসাবে যোগদান করেছিলেন। যে সময় একদিকে কংগ্রেসের নেতৃত্বে ভারত ছাড়ো আন্দোলন গড়ে উঠছে এবং নেতাজী সুভাষ বসুর নেতৃত্বে আজাদ হিন্দ বাহিনী গঠনের কাজ চলছে তখন মুসলীম লীগের মন্ত্রীসভায় উপমুখ্যমন্ত্রী হিসাবে যোগদান করে তিনি ব্রিটিশ সরকারকে সহযোগীতা করার আশ্বাস দিয়েছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আর.এস.এস. দেশের বিভিন্ন স্থানে ক্যাম্প সংগঠিত করেছিল ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে নাম লেখানোর জন্য।

১৯৪৬ সালের শেষের দিকে শ্রী মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে বাংলা ভাগের দাবীতে গঠিত হয় - 'Bengal Partition League', পরবর্তীতে যা 'Bengal Provincial Conference' নামে পরিচিত হয়। ঐ বছর ফেব্রুয়ারী মাসে হিন্দু মহাসভার বাংলা শাখা হিন্দুদের জন্য পৃথক বাংলা রাজ্য গঠনের জন্য একটি কমিটি তৈরী করে এবং ২৯শে মার্চ এর বার্ষিক সাধারণ সভায় হিন্দুদের জন্য পৃথক রাজ্যের দাবীতে প্রস্তাব পাশ করে। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে শ্রী মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে হুগলী জেলার তারকেশ্বরে বাঙালী হিন্দু সম্মেলন সংগঠিত হয়। এখান থেকেই শ্রী মুখোপাধ্যায় প্রস্তাব দেন 'বাঙলা ভাগই একমাত্র সমস্যা সমাধানের রাস্তা'। এই সম্মেলন থেকে গৃহীত এক প্রস্তাবে তাঁকেই দায়িত্ব দেওয়া হয় - বাঙালি হিন্দুদের জন্য পৃথক রাজ্যের দাবীতে একটি কাউন্সিল গঠন এবং গণপরিষদের কাছে বাংলা ভাগের সীমানা নির্ধারণের আবেদন করার জন্য।

এই প্রসঙ্গে জ্যোতি বসু 'যতদূর মনে পড়ে' এই আত্মকথায় উল্লেখ করেন - 'দেশভাগের প্রশ্নে আমাদের পার্টির কি নীতি ছিল, তা এখানে বলা দরকার। আগেই বলেছি, পার্টি দেশভাগের বিরোধীতা করেছিল - কিন্তু এর প্রতিরোধ করার মত শক্তি ও প্রভাব পার্টির ছিল না। ভারতে তখন আমাদের পার্টি ৩য় বৃহত্তম শক্তি হলেও কংগ্রেস ও মুসলীম লীগের তুলনায় আমাদের শক্তি খুবই দুর্বল ছিল। আমাদের প্রতিবাদ ও বিরোধীতা সত্ত্বেও দেশ যখন সত্য সত্যই বিভক্ত হলো, তখন এই বাস্তবকে স্বীকার করে নেওয়া ছাড়া আমাদের পার্টির সামনে আর কোন বিকল্প ছিল না'।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যখন শ্রী মুখোপাধ্যায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন তখন ব্রিটিশ পতাকাকে অবমাননা করবার জন্য ১ম ছাত্রকে বেত্রাঘাত করার প্রতিবাদ করে ধরিত্রী গাঙ্গুলী এবং উমাপদ মজুমদার এই দুজন ছাত্রকে বরখাস্ত করেছিলেন - এমন অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে আছে। তাই ভারতবর্ষের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির অন্যতম প্রবক্তার স্বাধীনতা আন্দোলন, সমাজসংস্কার এবং বাংলাভাগের ক্ষেত্রে যে নেতিবাচক ভূমিকা ছিল তা সকলের জানা অত্যন্ত জরুরী।

********************************************

জম্মু-কাশ্মীরের ভারত ভুক্তির অন্যতম প্রধান ভিত্তি ৩৭০নং ধারাকে লঘু করার প্রশ্নে কমিউনিস্টরা বরাবর বিরোধীতা করেছে। ২০০১ সালের ১৮ই ডিসেম্বর ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম শীর্ষ নেতা শ্রী জ্যোতি বসু একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন - 'কাশ্মীরীদের স্বশাসন এবং অধিক ক্ষমতা দেওয়ার ক্ষেত্রে ভারত সরকার সঠিক নীতি গ্রহণ করেনি। তাই তারা ধীরে ধীরে ভারত থেকে আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন। ঐ সময় জনসংঘ ও হিন্দুত্ববাদীদের উত্থানেরও প্রভাব পড়েছিল। বিশেষত যখন কাশ্মীরের জনগণের থেকে এই সমস্ত ক্ষমতা নিয়ে নেওয়া হয়, তখন তরুণ কাশ্মীরীরা পাকিস্তানপন্থী ও ভারত বিরোধী হয়ে উঠেছিলেন। এখন অনেকগুলি গোষ্ঠী রয়েছে। শেখ আব্দুল্লার মতো কয়েকজন পাকিস্তানে যোগ দিতে চাননি, চেয়েছিলেন স্বাধীন কাশ্মীর। জেল থেকে মুক্ত হওয়ার পর তিনি যখন আবার মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন, আমি ওনাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম - কেন আপনি এটা চাইছেন? এই ধরণের ছোট রাজ্য নিয়ে আপনি কিভাবে চালাবেন? তিনি আমাকে যুক্তি দিয়েছিলেন - আমি স্বাধীন কাশ্মীর পেলে পাকিস্তান, আমেরিকা ও ভারত আমাকে সমর্থন দেবে। যাই হোক শেষ পর্যন্ত তিনি ভারতবর্ষের সাথেই ছিলেন। আমরা কাশ্মীরকে কখনই পাকিস্তানের হাতে তুলে দিতে পারি না। এ বিষয়টা স্পষ্ট। আমরা কাশ্মীরকে স্বাধীন রাষ্ট্রও হতে দিতে পারি না। কিন্তু আমরা সেই অবস্থানে অনড় আছি যা আগেও বলেছি। জম্মু-কাশ্মীরকে পূর্ণ স্বায়ত্বশাসন দেওয়া প্রয়োজন। শুধু জম্মু-কাশ্মীরে স্বায়ত্বশাসন দিলেই হবে না; কাশ্মীরের মধ্যে জম্মু অন্যান্য অংশেও স্বশাসনের ক্ষমতা দিতে হবে। এভাবেই জম্মু-কাশ্মীরের মানুষের, বিশেষত মুসলমানদের বিশ্বাস আমরা ফিরে পেতে পারি। তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে আছেন; এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। একাজ করতে গেলে তাঁদের অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং আরও বেশ কিছু ক্ষেত্রে প্রকৃত নজর দিতে হবে। এই মুহূর্তে শুধু ৩৭০নং ধারা দিয়ে তাঁদের রাজনৈতিকভাবে খুশি করা যাবে না, যেটা অবশ্য বর্তমান সরকার (বাজপেয়ী সরকার) প্রত্যাহার করতে চায়। কিন্তু এই ধারার পাশাপাশি জওহরলাল নেহেরুর আমলে যেসব ক্ষমতা তাঁদের ছিল সেগুলি ফিরিয়ে দেওয়া উচিত। কিছু ক্ষমতা নিয়ে নেওয়া হয়েছে। এখন যদি তারা নিজস্ব সুপ্রিম কোর্ট চান বা অন্য কিছু চান, প্রতিরক্ষা এবং বিদেশ নীতি ছাড়া সবকিছুই তাদের দেওয়া উচিত। কিন্তু আর্থিক সহায়তা বহন করা উচিত ভারত সরকারের। এভাবেই মানুষের আস্থা অর্জন করা সম্ভব।' - (কমিউনিস্ট স্মৃতিকথা, এ.জি.নূরানী)

Thursday, 18 November 2021

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে শ্রমিকশ্রেণীর ভূমিকা - সুকোমল সেন

আলোচ্য বৎসরগুলিতে শ্রমিকশ্রেণীকে মার্কস-লেনিনের বিপ্লবী শিক্ষায় শিক্ষিত করবার জন্য কমিউনিস্টদের নেতৃত্বে শ্রমিক-সংগঠনগুলির প্রচেষ্টা চলেছিল নিরন্তনভাবে। এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা যে মীরাট মামলা সাজিয়ে কমিউনিস্টদের কঠোর সাজা দেওয়ার ব্যবস্থা করে সাম্রাজ্যবাদী সরকার ভারতের শ্রমিকশ্রেণীর মধ্যে কমিউনিস্ট মতাদর্শের প্রভাব সমূলে উৎপাটন করবার যে চেষ্টা করেছিল কারাগারের বাইরে অবস্থিত তরুণ কমিউনিস্টরা তাঁদের একনিষ্ঠ ও সাহসী কর্মতৎপরতার মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ সরকারের সেই উদ্দেশ্যকে সম্পূর্ণ ব্যর্থ করে দেয়। জেলের মধ্য থেকে কমিউনিস্ট মতবাদকে শ্রমিকশ্রেণীর বিপ্লবী দর্শনকে ভারতের নিপীড়িত জনগণের সামনে বলিষ্ঠভাবে তুলে ধরেন। তেমনি কারাগারের বাইরেও বয়সের দিক থেকে অত্যন্ত তরুণ, অনভিজ্ঞ অথচ বিপ্লবী চেতনায় উদ্বুদ্ধ কমিউনিস্টরা শ্রমিকশ্রেণীকে সরাসরি জঙ্গী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে পরিচালিত করে এবং মার্কস-লেনিনের মতাদর্শের বিপ্লবী তাৎপর্যগুলিকে বিশ্লেষণ করে শ্রমিকদের মধ্যে বিপ্লবী শ্রেণী-চেতনা বিকাশে অপরিসীম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। শ্রমিক-কৃষক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত অনেক কমিউনিস্ট কর্মীও এই সময়ে মার্কসীয় দর্শনের প্রতি আকৃষ্ট হন। সন্ত্রাসবাদী কর্মীদের একটা বিরাট অংশ কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান করেন। ১৯৩৫ সালের মে দিবসে আন্দামান জেলে ভগত সিং-এর সহকর্মীগণ ৩১ জন সন্ত্রাসবাদী কর্মী কমিউনিস্ট কো-অর্ডিনেশন গঠন করেন। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠনের নেতৃবৃন্দ মার্কসীয় দর্শন গ্রহণ করেন। ফলে এই সময়ে মার্কসীয় দর্শনের ব্যাপক প্রসার ঘটে। ব্যাপ্তির দিক থেকে আলোচ্য সময়ে বিভিন্ন কারণে শ্রমিক আন্দোলনের যথেষ্ট ঘাটতি থাকলেও শ্রমিকশ্রেণীর শ্রেণী-চেতনার বিকাশে এই সময়ের অবদান বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।


Monday, 15 November 2021

সহজ আলোচনায় পার্টি কর্মসূচী - দীপক নাগ

 "...আমাদের শিক্ষা কোনো আপ্তবাক্য নয়, কর্মক্ষেত্রে পথনির্দেশক।" মার্কস ও এঙ্গেলস সবসময়ই একথা বলতেন। যারা কয়েকটি "সূত্র" মুখস্থ করে বারবার আওড়াতো, তাদের তাঁরা বিদ্রুপ করতেন। এই সূত্রগুলি সম্বন্ধে এ পর্যন্ত বলা যায় যে, সেগুলি কেবল সাধারণভাবে কাজের মোটামুটি একটা রূপরেখা দিতে সক্ষম; ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার প্রত্যেকটি পর্যায়ের বাস্তব অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনিবার্যভাবেই এই কাজের পরিবর্তন ঘটায়। ... এই প্রশ্নাতীত সত্য উপলব্ধি করা একান্ত প্রয়োজন যে, মার্কসবাদীকে বাস্তব জীবনের, প্রকৃত তথ্যের অনুশীলন করতে হবে, পুরোনো মতবাদকে আঁকড়ে থাকলে চলবে না।" - লেনিন (লেটার্স অন ট্যাকটিকস; কালেক্টেড ওয়ার্কস)

=============================================================

আজ থেকে প্রায় একশ সত্তর বছর আগে কমিউনিস্ট লিগের কর্মসূচি বা কমিউনিস্ট পার্টির ইস্তাহারে মার্কস-এঙ্গেলস স্পষ্ট কথায় বলেন : "কমিউনিস্টরা নিজেদের মতামত ও লক্ষ্য গোপন করতে ঘৃণা বোধ করে। খোলাখুলিভাবে তাঁরা বলেন যে, তাঁরা যা চান তা পাওয়া যেতে পারে কেবলমাত্র এখনকার সমস্ত সামাজিক অবস্থাকে জোর করে পাল্টে ফেলার মাধ্যমেই।" দুনিয়ায় হাজার হাজার রাজনৈতিক দল বা পার্টি থাকলেও শুধুমাত্র কমিউনিস্ট পার্টিই তার উদ্দেশ্য লিখিতভাবে ঘোষণা করে। বুর্জোয়াদলগুলোর প্রায় কোনোটারই কোনো লিখিত কর্মসূচি নেই। কারণ চলতি সমাজে যে শোষণ, অত্যাচার, অনাহার, বেকারি চলছে তা টিকিয়ে রেখে ধনীদের সেবা করাই তাদের একমাত্র কর্মসূচি।


মার্কসবাদীরা মনে করে বর্তমান সমাজ পরস্পর বিরোধী দুটো শ্রেণিতে বিভক্ত। অল্প কয়েকজন মানুষ সমাজের শতকরা নব্বুইভাগেরও বেশি সম্পত্তির মালিক। তাঁদের সবকিছু আছে। তাঁরা শোষক বা বুর্জোয়া। আর সমাজের নব্বুই ভাগেরও বেশি মানুষের হাতে কোনো সম্পদ নেই। তাঁরা শোষিত বা সর্বহারা। তাই তাঁরা নেই-রাজ্যের বাসিন্দা। মার্কসবাদীরা এই অসম ব্যবস্থার বদল চায়। তারা চায় শ্রেণিহীন সমাজ বা সাম্যবাদ। এই ব্যবস্থায় কোনো শোষক থাকবে না। তাই থাকবে না না-খেতে পাওয়ার ভয়। প্রত্যেকে তার প্রয়োজনমতো পায় বলেই অযথা সম্পদ জমিয়ে রাখার ইচ্ছে থাকে না। কারণ দরকার পড়ে না। অনেকটা মৌমাছির ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করার মতো। কাউকে আঘাত না দিয়ে তার যতখানি প্রয়োজন ততখানিই নেবে। তার বেশি নয়। কিন্তু সাম্যবাদ বা কমিউনিজমের স্তরে আসতে গেলে সমাজকে কয়েকটা স্তর পেরিয়ে আসতে হয়। সামন্ততান্ত্রিক স্তর পেরিয়ে পুঁজিবাদী স্তর তারপর সমাজতান্ত্রিক স্তর আর অবশেষে সাম্যবাদী স্তর। এইসব স্তর পেরোনোর জন্য চাই বিপ্লবী মতবাদ এবং একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক দল বা কমিউনিস্ট পার্টি। যার নেতৃত্বে থাকবে শ্রমিক শ্রেণি। কারণ মার্কসবাদীদের মতে সমাজে শ্রমিকশ্রেণিই একমাত্র বিপ্লবী শ্রেণি। লেনিনের মতে, "বিপ্লবী মতবাদ না থাকলে বিপ্লবী আন্দোলন সম্ভব নয়। ... যে পার্টি সব চাইতে এগিয়ে থাকা মতবাদ দ্বারা পরিচালিত, কেবলমাত্র সেই পার্টিই পারে অগ্রণী সংগ্রামী বাহিনীর ভূমিকা পূরণ করতে।"


কমিউনিস্ট পার্টি বিপ্লবের মাধ্যমে সমাজের আমূল পরিবর্তন ঘটাতে চায়। তারা বিশ্বাস করে শুধুমাত্র ওপর ওপর পরিবর্তন বা এদিক ওদিক সামান্য সংস্কার করেই মানুষের ওপর শোষণ ও মানুষের দুঃখ দূর করা যায় না। বিপ্লব আকাশ থেকে পড়ে না। আবার স্বতঃস্ফূর্ততার দ্বারাও বিপ্লব সম্ভব নয়। এর জন্য চাই একটা পাকাপোক্ত ও সুশৃঙ্খল সংগঠন। আবার বাস্তব পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে একটা সঠিক কর্মসূচি ছাড়া সমাজ পরিবর্তন সম্ভব নয়।

=============================================================

ফিনান্স পুঁজিকে লগ্নি পুঁজি বা মহাজনি পুঁজি বলা যেতে পারে। লেনিনের মতে, "উৎপাদন কেন্দ্রীয়ভাবে বা একসঙ্গে জড়ো হওয়া; তা থেকে একচেটিয়া কারবারের আবির্ভাব; ব্যাঙ্কের সঙ্গে শিল্পের মিশে যাওয়া বা মিলন ঘটা - এই হলো মহাজনি পুঁজি তৈরি হওয়ার ইতিহাস এবং কথাটার সারমর্ম।"

=============================================================

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে দ্বন্দ্ব বেড়ে চলেছে। সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়নের ফলে এখন চারটি দ্বন্দ্ব বা বিরোধ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এই দ্বন্দ্বগুলো হলো :


(ক) সমাজতন্ত্র বনাম সাম্রাজ্যবাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব;

(খ) সাম্রাজ্যবাদ ও তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব;

(গ) সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব;

(ঘ) পুঁজি ও শ্রমের দ্বন্দ্ব।

=============================================================

ভারতে বুর্জোয়া ও জমিদার জোটের নেতৃত্বে রয়েছে বড় বড় বুর্জোয়ারা। ধনতন্ত্রের বিকাশ ঘটানোই এদের লক্ষ্য। এই শ্রেণি জমিদারদের রাষ্ট্রক্ষমতায় রেখেই বা সামন্ততন্ত্রকে ধ্বংস না করেই ধনতান্ত্রিক পথে বিকাশ ঘটাতে চাইছে। এরা বিদেশি মহাজনি পুঁজির সাহায্য নিয়ে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে বা দর কষাকষি করে নিজেদের লাভের পরিমাণ বাড়িয়ে তোলে। ভারতীয় বুর্জোয়ারা এক্ষেত্রেও দুমুখো নীতি নিয়ে চলে। তাই ভারত জাতীয় বুর্জোয়াদের রাষ্ট্র নয়। কারণ সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে তাদের বোঝাপড়া আছে। সি পি আই ভারতকে জাতীয় বুর্জোয়াদের রাষ্ট্র বলে মনে করে। তারা মনে করে ভারতীয় বুর্জোয়ারা পুরোপুরি স্বাধীন। আবার ভারতীয় বুর্জোয়ারা মুৎসুদ্দি বা সাম্রাজ্যবাদের দালাল - নকশালপন্থীদের মতো একথাও আমরা মনে করি না। এখানেই আমাদের সঙ্গে সি পি আই বা নকশালপন্থীদের কর্মসূচির অন্যতম প্রধান ফারাক।  

=============================================================

বর্তমানে বিপ্লবের দুটি স্তরের কথা আমরা বলতে পারি। প্রথমটা বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব এবং আর তারপর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব। আগে বুর্জোয়ারাই নিজেদের স্বার্থে সামন্ততন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করে বুর্জোয়া গণতন্ত্র স্থাপন করতো। কিন্তু বুর্জোয়ারা এখন আর এই ভূমিকা পালন করে না। সর্বহারা শ্রেণিকেই এখন এই দায়িত্ব পালন করতে হবে। এই বিপ্লবকে জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের স্তর বলা যায়। আমরা এখন এই স্তরে আছি। 


আমাদের দেশের বাস্তব পরিস্থিতিতে বিপ্লবের স্তর হিসেবে যে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বন্দ্ব বা বিরোধের কথা উল্লেখ করতেই হয়, তা হলো:

(ক) পুঁজির সাথে শ্রমের দ্বন্দ্ব;

(খ) জমিদার ও কৃষকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব;

(গ) সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে ভারতীয় জনসমাজের দ্বন্দ্ব।

============================================================= 

কৃষি বিপ্লব হলো জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের মূল কথা। জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের মূল শত্রু হলো:

(ক) বড় ধরনের বুর্জোয়া গোষ্ঠী,

(খ) জমিদার বা ধনী কৃষক এবং 

(গ) সাম্রাজ্যবাদ

বড় বড় পুঁজিপতিরা বিদেশি মহাজনি পুঁজির সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে মুনাফা করার চেষ্টা করে। কাজেই বিদেশি লগ্নিপুঁজি বা মহাজনি পুঁজি অন্যতম প্রধান শত্রু। তাই মোটামুটিভাবে জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব হচ্ছে :

 - সামন্ততন্ত্র বিরোধী,

- সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী,

- একচেটিয়া বিরোধী ও 

- গণতান্ত্রিক। 

=============================================================  

জনগণতান্ত্রিক ফ্রন্টের নেতা হলো শ্রমিকশ্রেণি; দৃঢ় মিত্র হলো কৃষক সমাজ; মধ্যবিত্তশ্রেণি হলো সাধারণ মিত্র; আর দোদুল্যমান ও অস্থিতিশীল মিত্র হলো মাঝারি ও ছোট বুর্জোয়ারা।

============================================================= 

মার্কসবাদীরা পার্লামেন্টারি ব্যবস্থায় অংশগ্রহণের বিরুদ্ধে নয়। তারা পার্লামেন্ট-সর্বস্বতার বিরুদ্ধে। অর্থাৎ পার্লামেন্টই সব বা পার্লামেন্টের মাধ্যমেই সব সমস্যার সমাধান করা বা এই সমাজব্যবস্থার পরিবর্তন করা সম্ভব - আমরা তা বিশ্বাস করি না। লেনিনের কথায়, "শ্রমিকশ্রেণির পার্টিগুলি পার্লামেন্টারি সংগ্রামকে ব্যবহার করার, পার্লামেন্টে অংশগ্রহণ করারই পক্ষে। কিন্তু তারা 'পার্লামেন্টারি ক্রেটিনিজম'-এর অর্থাৎ পার্লামেন্টারি সংগ্রামই হচ্ছে রাজনৈতিক সংগ্রামের একমাত্র বা সবসময়ই প্রধান রূপ - এই বিশ্বাসের স্বরূপ নির্মমভাবে প্রকাশ করে দেয়।" 

=============================================================

সংসদীয় ব্যবস্থার প্রতি অতি-নির্ভরতা আমাদের মধ্যে সংশোধনবাদী বিচ্যুতি নিয়ে আসতে পারে। আবার বুর্জোয়া সংসদীয় ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করলে তা আমাদেরকে সংকীর্ণতাবাদী বা হঠকারী বিচ্যুতির দিকে নিয়ে যেতে পারে।

=============================================================

পার্টি গড়ার কাজে সমস্তরকম অ-মার্কসীয় চিন্তাধারা, কুসংস্কার, ধর্মীয় কূপমুন্ডুকতা, সাম্প্রদায়িকতা, জাতপাত, বুর্জোয়া সংস্কৃতি ও আচারআচরণ, বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদ ও বিচ্ছিন্নতাবাদের বিরুদ্ধে সচেতন সংগ্রাম গড়ে তুলতে হবে।

=============================================================


Wednesday, 10 March 2021

ধর্ম এই সময়ে - সুকুমারী ভট্টাচার্য

বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পরে যে তথ্যচিত্রটি তোলা হয় তাতে মসজিদ ধ্বংসের পরে তথ্যচিত্রী ক্যামেরা নিয়ে এক বুড়ি হিন্দু মহিলাকে জিজ্ঞেস করেন, 'মাতাজি, আজ এই এতক্ষণ ধরে যা ঘটল তাতে আপনার কি মনে হল? বৃদ্ধা সাশ্রুনেত্রে বক্ষে করাঘাত করে বললেন, 'হায় রাম, তোমার শেষে এই দশা হল যে, অন্যের বাড়ি ভেঙে তোমায় বাস করতে হয়?' ওই বৃদ্ধা বিশ্বাসী হিন্দু, তাঁর কাছে তাঁর ইষ্টদেবতা রামের মান গেল ওই সাম্প্রদায়িক বর্বরতায়।

*************************************

যে ধর্ম অসাম্প্রদায়িক, যে ধর্ম মূলত মানবিক তা সত্যকার মানব-অকল্যাণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করবে, যেন করত লিবারেশন থিওলজিস্টরা, প্রধানত দক্ষিণ আমেরিকায়, তবে অন্য বহু দেশেও এঁরা সক্রিয়। এঁরা বামপন্থী খ্রিস্টান, সামাজিক অত্যাচার ও শোষণের বিরুদ্ধে এঁরা নিয়ত সংগ্রাম করেন। 

*************************************

আপনজনকে দূরে ঠেলে দিয়ে পর করে দেওয়া আমরা কম করিনি। এখন বোধ হয় সময় এসেছে যারা নিজেদের মার্কসবাদী বলে এবং কাজে, সাম্যবাদী সংগঠনে, আন্দোলনে সক্রিয় অংশ গ্রহণ করে; তাদের শুধুমাত্র ধর্মে বিশ্বাসী বলেই ঠেলে দূরে না সরাবার। মার্কসের পরে মার্কসবাদ অপরিবর্তিত থাকেনি। ওইসব মত অবলম্বন করে দেশে দেশে বিপ্লবও সংঘটিত হয়েছে, কাজেই মার্কসবাদের মূল তত্ত্বটিকে অবিকৃত রেখে ধর্মের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তা যদি আন্দোলনের দ্বারা বিপ্লবের পথে এগোয়, তাহলে বোধহয় ওই পর্যন্ত ধর্মকে সহ্য করে তেমন মানুষদের সহযোদ্ধা বলে স্বীকার করলে সংগঠনের লাভ ছাড়া ক্ষতি হয় না।

ধর্ম যখন শ্রেণিসংগ্রামকে বাধা দেয়, মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করে তখনই তাকে সহ্য করা অন্যায়। কিন্তু আজকের ভারতবর্ষে ধর্মবিশ্বাসী মাত্রেই শ্রেণিশত্রু বা সংগ্রামের শত্রু নয়। বহু লোকের কাছে ধর্ম একান্ত ব্যক্তিগত কিছু বিশ্বাস ও আচরণ, যার দ্বারা তারা কারও কোনো ক্ষতি করার কথা কল্পনাও করে না। এদের পর করে কী লাভ? এরা নিজেদের ধর্মবিশ্বাসকে যুক্তিবিচারের আওতার বাইরে রাখে ঠিকই, রাখুক না? যদি সে বিশ্বাস অন্য কোনো সম্প্রদায়ের মানুষকে আঘাত না করে, গণসংগ্রামকে ব্যাহত না করে, বরং সংগ্রামীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে এগোয়, তাহলে নাস্তিক মার্কসবাদীর কি সেই সহিষ্ণুতাটুকু থাকবে না তার ওই গোপন ঠাকুরঘরটুকুকে আঘাত না করার? যুক্তিবিচার দিয়ে ধর্মবিশ্বাসকে যাচাই করে না বলেই অনেকসময় নিজের অভিজ্ঞতাই তাদের বিশ্বাসে আঘাত হানে। আর নাও যদি হানে তো, সাম্যবাদী চেতনায় সে আর যাই হোক সাম্প্রদায়িক হয়ে উঠবে না কখনও এবং এই কারণেই আমাদের সহযোদ্ধা থাকবে।

*************************************

সব ধর্মের আদিপর্বে দেখি কোনো সম্প্রদায় ছিল না; কিছু পরে দলীয় স্বার্থ ও প্রাধান্যের লোভে কোনো কোনো ব্যক্তি পৃথক সম্প্রদায় গঠন করে ক্ষমতার জগতে উন্নতি করে নেয়, নিজের ও দলের ... । ইসলাম বাইরের জগতে সৃষ্ট হয়ে ভারতবর্ষে প্রবেশ করে ভিন্নমতাবলম্বী একটি দল হিসাবে। তার আগের ভারতবর্ষ মুখ্যত হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন, আজীবক --- এদের বিভিন্ন শাখা এবং অগণ্য আদিবাসীর দেশ ছিল। ইসলাম এখানে তেমনই একটি সম্প্রদায় হয়ে পাশাপাশি শান্তিতে থাকতে পারত। ছিলও। সিন্ধুপ্রদেশে আসার পর থেকে পাঠান রাজত্বকাল পর্যন্ত। মোগল রাজত্বকালে বিধর্মী হিন্দুকে ধর্মান্তরিত করার চেষ্টার সঙ্গে সঙ্গে হিন্দু-মুসলমানের স্বতন্ত্র সম্প্রদায়চেতনা কতকটা উগ্র হয়ে ওঠে। তখন অন্য সব পরিচয় ছাপিয়ে শুধু সাম্প্রদায়িক পরিচয়ই মুখ্য হয়ে ওঠে। 

*************************************

১. সাম্প্রদায়িক চেতনা ধর্মকে পুষ্ট করে না,
২. ধর্ম থেকে উদ্ভূতও নয়,
৩. মুখ্যত এর যোগ রাষ্ট্রক্ষমতার সঙ্গে এবং 
৪. সেটি করায়ত্ত করার জন্যই এ চেতনা দায়বদ্ধ।

*************************************


Wednesday, 24 February 2021

রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প বাঁচাও ভারত বাঁচাও - ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)

গত তিন বছরে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের শাখাগুলির ধারাবাহিকভাবে হ্রাস এবং বেসরকারি খাতের শাখাগুলির দ্রুত বৃদ্ধি ঘটেছে।

সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে তার শেয়ার হোল্ডিং কমিয়ে ৫২ শতাংশ করার অনুমোদন দিয়েছে। ব্যাঙ্কস বোর্ড ব্যুরো গঠন এবং পরবর্তীকালে একটি হোল্ডিং সংস্থা গঠনের জন্য যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে যেটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলিতে সরকারি বিনিয়োগের বিলিব্যবস্থা করবে। এগুলিই বেসরকারিকরণের দিকে প্রথম পদক্ষেপ।

পি জে নায়েক কমিটির অংশীদারিত্বকে হ্রাস করে ৪০ শতাংশ করার সুপারিশ সরকার গ্রহণ করেছে। অতীতে সরকারগুলি আইসিআইসিআই-কে বেসরকারিকরণ করে বেসরকারি ব্যাঙ্ক করেছিল, যদিও আইসিআইসিআই শিল্প নির্মাণে উৎসাহ দেবার জন্যে শুরু হয়েছিল। ইউটিআইকে ইউটিআই ব্যাঙ্কে এবং তারপরে অ্যাক্সিস ব্যাঙ্ক হিসাবে রূপান্তরিত করে বেসরকারিকরণ করা হয়েছিল। এইচডিএফসি, যা আবাসন ক্ষেত্রকে উন্নীত করার জন্য চালু করা হয়েছিল তা বেসরকারি সেক্টরে এইচডিএফসি ব্যাঙ্কে পরিণত হয়েছে। এখন সরকার ঘোষণা করেছে আইডিবিআই ব্যাঙ্কের সরকারি অংশীদারিত্ব হ্রাস করে ৪৫ শতাংশে নামিয়ে আনবে।

মেক ইন ইন্ডিয়া, স্বচ্ছ ভারত, ডিজিটাল ইন্ডিয়া পেনশন যোজনা এবং স্টার্ট আপগুলিকে সফল করতে হলে রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের ব্যাঙ্কগুলিকে এদের তহবিল সরবারহ করতে হবে। বেসরকারি ক্ষেত্র কখনই এই প্রকল্পগুলিকে তহবিল দেয় না কারণ এগুলি তাৎক্ষণিক মুনাফা অর্জন করবে না এবং ব্যর্থও হতে পারে। কৃষকদের যদি কৃষি ঋণ পেতে হয়, যদি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগগুলিকে পর্যাপ্ত ঋণ পেতে হয়, আমাদের সন্তানদের যদি শিক্ষা ঋণ নিতে হয় এবং স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলিকে ঋণ পেতে হয়, আমাদের সন্তানদের যদি শিক্ষা ঋণ নিতে হয় এবং স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলিকে ঋণ পেতে হয়, তবে কেবলমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলি তা সরবারহ করতে পারে। সুতরাং আসুন রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের ব্যাঙ্কগুলিকে সমর্থন করি। রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের ব্যাঙ্কগুলি বাঁচান এবং তাদের সুরক্ষার জন্যে এগিয়ে আসুন। উন্নয়ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান স্থাপনের দাবি করুন।

**********************************************

এখন এনডিএ সরকারের দ্বিতীয় অবতার সবকিছুই বেসরকারি করতে চায়, কৃষকদের বীজ বিক্রি করতে বাধ্য করা বা মঙ্গলসূত্র বিক্রি করতে কোনও ভদ্রমহিলাকে বাধ্য করার মতোই সব তারা জ্বলাঞ্জলি দেবে প্রাইভেটের সেবায়। 

দেশের সম্পদ, রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্র সব তুলে দিতে চায় দেশ এবং বিদেশের বৃহদাকার কর্পোরেটদের হাতে। এদের মদতেই এনডিএ ক্ষমতায়।

কয়েকটি সাম্প্রতিক সংবাদ প্রতিবেদনের দিকে তাকান :

* রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড বিমান জ্বালানি বিক্রির জন্য ভারত পেট্রোলিয়ামের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর করছে।

* এনটিপিসি বেসরকারি হতে চলেছে।

* সরকারের বিলগ্নিকরণের তাড়ায় তালিকায় ফিরে এল এলআইসি'র নাম।

* ৪০০০০ ঘর নির্মাণের ভার এনবিসিসি'র কাছে হস্তান্তর করার জন্য সুপ্রিম কোর্টের রায় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের বিশাল অবদানের স্বীকৃতি।

* শীঘ্রই আসছে। দ্য গ্রেট সরকারি সেল - পাওয়ার গ্রিড, গেইল, বিএসএনএল এবং এমটিএনএল, সাথে জমিও পাওয়া যাবে।

* সরকার সম্পূর্ণভাবে এয়ার ইন্ডিয়া থেকে হাত গুটিয়ে নেবার পরিকল্পনা করছে।

* কৃষ্ণপট্টম বন্দরের ৭০ শতাংশ শেয়ার কিনতে প্রস্তুত হয়ে আছে আদানি।

* রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের সেবায় এলআইসি'র ১৭০০০ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে। 

* ভারতীয় নৌসেনার ৪৫০০০ কোটি টাকার সাবমেরিন প্রকল্পের শেষ মুহূর্তের পরীক্ষার জন্যে আদানি গ্রুপের প্রস্তুতি।

* পাবলিক সেক্টর ইউনিটগুলিতে শেয়ারের হোল্ডিং ৫০%-এর নিচে হ্রাস করার পরিকল্পনা নিচ্ছে সরকার।

গোটা দেশটাই কর্পোরেট, ভারতীয় ও বহুজাতিক সংস্থাগুলির কাছে বিক্রি হওয়ার মুখে। এর সাথে সংরক্ষণ নীতিও খতম হবে।

**********************************************

বামপন্থীদের দাবি 
* রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রে বেসরকারিকরণ বন্ধ করো। প্রতিরক্ষা ও কয়লা ক্ষেত্রে ১০০ ভাগ প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ প্রত্যাহার করো। বিএসএনএল, অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি, ভারতীয় রেল, এয়ার ইন্ডিয়া ইত্যাদি বৃহদাকায় বেসরকারিকরণ বন্ধ করো।
* কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে চাই বর্ধিত সরকারি বিনিয়োগ। তা না হওয়া পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সরকারকে বেকার যুবকদের ভাতা দিতে হবে।
* প্রতি মাসে ২১ হাজার টাকা নূন্যতম মজুরি সুনিশ্চিত করতে হবে।
* যে বিরাট সংখ্যক শ্রমিকরা কর্মচ্যূত হয়েছেন তাঁদের জীবনমান রক্ষার মতো মাসিক মজুরি সরকারকে সুনিশ্চিত করতে হবে।
* পুরনো বকেয়া মেটানো, নির্দিষ্ট নূন্যতম মজুরিতে নূন্যতম ২০০ দিনের কাজ দেওয়া সুনিশ্চিত করতে 'রেগা'য় বরাদ্দ বাড়াতে হবে।
* কৃষি সঙ্কটের মোকাবিলায়, ক্রমবর্ধমান কৃষক আত্মহত্যা রুখতে এবং ফসলের উৎপাদন খরচের দেড় গুণেরও বেশি নূন্যতম সহায়ক মূল্য কার্যকর করতে কৃষকদের জন্য একেবারেই ঋণ মকুবের ব্যবস্থা করতে হবে।
* নূন্যতম মাসিক বার্ধক্য ও বিধবা পেনশন ৩ হাজার টাকা করতে হবে।

Thursday, 11 February 2021

ভগৎ সিং শহিদ-এ-আজম - তীর্থঙ্কর চট্টোপাধ্যায়

আসফাকউল্লা ছিলেন ধর্মপ্রাণ মুসলমান। বস্তুবাদী নন, দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী তো কোনোভাবেই না। অথচ তিনি ভবিষ্যতের স্বাধীন ভারতের আর্থ-সামাজিক অবস্থা সম্পর্কে তাঁর ধারণাকে এই ভাষায় প্রকাশ করেছিলেন: "বিদেশি শাসনকে কদর্য মনে করি এবং একই সঙ্গে ঘৃণা করি এমন কোনো ভারতীয় গণতান্ত্রিক শাসনকে, যা দরিদ্র ও দুর্বলের অধিকারকে অস্বীকার করবে, অথবা যদি তা ধনী ও জমিদারদের তৈরি ওই, অথবা যদি তাতে কৃষক ও শ্রমিকের সমান অংশগ্রহণ না থাকে, অথবা যদি সরকারের আইন অসাম্য ও পার্থক্যের ভিত্তিতে রচিত হয়। যদি ভারত স্বাধীন হয় এবং যদি শ্বেতকায় প্রভুদের হাত থেকে দেশ শাসনের বলগা আমার দেশের ভাইরা কেড়ে নেবার পরেও ধনী-দরিদ্রের মধ্যে অসমতা, জমিদার-রায়তের মধ্যে অসমতা রয়ে যায়, তবে আমি আল্লাহ-র কাছে প্রার্থনা করি, যতদিন তাঁর সৃষ্টিতে সাম্য না প্রতিষ্ঠিত হয়, ততদিন আমি স্বাধীনতা চাই না। যদি এই সব ধারণার জন্য লোকে আমায় কমিউনিস্ট বলে তো বলুক। আমার থোড়াই এসে যায়।"

কাকোরি ষড়যন্ত্র মামলার আর একজন অভিযুক্ত মহাবীর সিং-এর যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর হয়েছিল। তিনি তাঁর বাবাকে আন্দামান-যাত্রার ঠিক আগে একটি চিঠি লেখেন। তাতে লিখেছিলেন: "সমাজ বলতে আমি আর্য সমাজ বা অন্য কোনো সংকীর্ণ সমিতি বুঝি না, আমি বুঝি সমস্ত সাধারণ মানুষের সমাজ। তার কারণ, এই ধর্মীয় সমিতিগুলি এত অদূরদর্শী যে আমার কাছে তারা অর্থহীন। উপরন্তু আমি সব ধর্ম থেকেই দূরে  থাকতে চাই, কারণ তারা সংকীর্ণ, আত্মকেন্দ্রিক, অবিচারভিত্তিক। আমি চাই, অন্যেরাও তা থেকে দূরে থাকুক। মানুষ ও সমাজের পক্ষে যা সবচেয়ে মূল্যবান বলে আমি মনে করি, তা হল নিম্নলিখিত আদর্শ। জাতি, গাত্রবর্ণ, ধর্ম বা অর্থের ওপর ভিত্তি করে কোনো মানবিক সম্পর্ক গড়া উচিত নয়।" 

*************************************************

নিম্ন আদালতে ভগৎ সিং-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, 'বিপ্লব' বলতে তিনি কী বোঝেন? তাঁর উকিল আসফ আলি এই প্রশ্নে আপত্তি করলে আদালত প্রশ্ন নাকচ করে। কিন্তু দায়রা আদালতে নিজের মতাদর্শ ঘোষণার সুযোগ হিসেবে স্বেচ্ছায় ভগৎ সিং প্রশ্নটির উত্তর দেন। "বিপ্লব সর্বদা রক্তাক্ত সংঘাতে জড়িত নয় এবং তার মধ্যে ব্যক্তিগত প্রতিশোধেরও স্থান নেই। বিপ্লব মানে বোমা-পিস্তলের পূজা নয়। বিপ্লব বলতে আমরা বুঝি যে, বর্তমান ব্যবস্থা যা স্পষ্টতই অন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত, তাকে পাল্টাতে হবে। যদিও যারা স্পষ্টতই উৎপাদক বা শ্রমিক, তারাই সমাজের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় উপাদান, তবু তারা তাদের শ্রমের ফল থেকে শোষকদের দ্বারা বঞ্চিত, তাদের মৌলিক অধিকার থেকে তারা বঞ্চিত। ... অতএব একটা মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন এবং যারা এ কথা উপলব্ধি করেছে তাদেরই দায়িত্ব সমাজকে সমাজতান্ত্রিক ভিত্তির ওপরে পুনর্গঠিত করা। এই কাজ সমাধা না হলে এবং মানুষের দ্বারা মানুষের শোষণ এবং এক দেশ দ্বারা অপর দেশের শোষণ, যা সাম্রাজ্যবাদের মুখোশ পরে আছে, বন্ধ না হলে, সমাজের সামনে আজ যে কষ্টভোগ ও হত্যালীলার  বিপদ, তাকে রোখা যাবে না এবং যুদ্ধের অবসান ও বিশ্বশান্তির যুগ উদ্বোধনের সব কথাই ছদ্মবেশহীন কপটতা বলে বোঝা যাবে। বিপ্লব বলতে আমরা বুঝি শেষ পর্যন্ত এমন একটা সমাজব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা যা এই রকম ধ্বংসের ভয়ে ত্রস্ত নয়, যেখানে সর্বহারার সার্বভৌমত্ব স্বীকৃত যার ফলে আসবে এমন একটা বিশ্ব-ফেডারেশন যা বিশ্বমানবকে উদ্ধার করবে পুঁজিবাদের দাসত্ব থেকে ও সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের দৈন্য থেকে।" পরিশেষে তাঁরা সর্বহারার একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য কঠোর সংগ্রামের কথা বলেছেন এবং বিবৃতি শেষ করছেন 'ইনকিলাব জিন্দাবাদ' লিখে।

*************************************************

১৩ সেপ্টেম্বর সকালে ৬২ দিন অনশনের পর যতীন দাস শহীদের মৃত্যু বরণ করলেন। শেষ অবধি তাঁর মনোবল অটুট ছিল। প্রায় অচৈতন্য অবস্থাতেও তিনি খাদ্য প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। সারা দেশ আগের সাত দিন উৎকণ্ঠায় অপেক্ষা করছিল। চরম মুহূর্তের পর সারা দেশে ক্ষোভ ও শোকের বন্যা বয়ে গেল। তখনকার দিনে টেলিভিশন ছিল না, খুব কম বাড়িতেই রেডিয়ো ছিল, টেলিফোন ব্যবস্থাও দুর্বল ছিল। তবু খবর ছড়িয়ে পড়ল সারা দেশে দুপুরের মধ্যে।

এই মৃত্যুসংবাদ শান্তিনিকেতনে পৌঁছাল সন্ধ্যা নাগাদ। ভাদ্রের শেষ; আসন্ন পুজোর ছুটির ঠিক আগে 'তপতী' নাটকের অভিনয় হবে। রবীন্দ্রনাথ ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে নাটকের মহলা দিচ্ছিলেন। যতীন দাসের খবর আসতে রিহার্সাল বন্ধ হয়ে গেল। যে যার ঘরে ফিরে গেলেন। সেই রাতে রবীন্দ্রনাথ একটি গান লিখলেন। পরের দিন রিহার্সালে এসে বললেন, এই নতুন গানটি সকলকে শিখে নিতে হবে। ওই কোরাস দিয়েই 'তপতী' শুরু হবে।


সর্ব খর্বতারে দহে তব ক্রোধদাহ

হে ভৈরব, শক্তি দাও, ভক্ত-পানে চাহো।

দূর করো মহারুদ্র   যাহা মুগ্ধ, যাহা ক্ষুদ্র

মৃত্যুরে করিবে তুচ্ছ প্রাণের উৎসাহ।

দুঃখের মন্থনবেগে উঠিবে অমৃত,

শঙ্কা হতে রক্ষা পাবে যারা মৃত্যুভীত।

তব দীপ্ত রৌদ্র তেজে   নির্ঝরিয়া গলিবে যে

প্রস্তরশৃঙ্খলোন্মুক্ত ত্যাগের প্রবাহ।

*************************************************

দ্বিতীয় পাঞ্জাব ছাত্র সম্মেলনের মুক্ত অধিবেশন হয়েছিল ১৯ অক্টোবর ১৯২৯। সভাপতিত্ব করেছিলেন সুভাষচন্দ্র বসু। এই সভায় পড়া হয়েছিল ভগৎ সিং এবং বটুকেশ্বর দত্ত-র বার্তা, জেল থেকে পাঠানো।

কমরেডগণ,
আজ আমরা যুবসমাজকে পিস্তল-বোমা হাতে তুলে নিতে বলতে পারি না। আজ ছাত্রদের সামনে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে। আগামী লাহোর অধিবেশনে কংগ্রেস দেশের স্বাধীনতার জন্য কঠোর সংগ্রামের ডাক দেবে। জাতীয় ইতিহাসের এই সংকটকালে যুবসমাজকে এক বিশাল দায়িত্ব নিতে হবে। ... তাদের দায়িত্ব শিল্প এলাকার কোটি কোটি বস্তিবাসী ও কোটি কোটি জীর্ণ কুটিরবাসী গ্রামীণ মানুষকে জাগিয়ে তোলা, যাতে আমরা স্বাধীন হতে পারি, যাতে মানুষের হাতে মানুষের শোষণ হয়ে ওঠে অসম্ভব। ...শহীদ যতীন্দ্রনাথ দাসের কাছ থেকে প্রেরণা নিয়ে, এবং দেশের প্রতি অশেষ ভক্তি নিয়ে, তাদের প্রমাণ করতে হবে যে এই স্বাধীনতা সংগ্রামে তারা অনড় পণ নিয়ে লড়তে সক্ষম।

সভাস্থলে এই বার্তা পরে দেবার পরে সমবেত কণ্ঠে ধ্বনি ওঠে, "ভগৎ সিং জিন্দাবাদ" - সেই সঙ্গে ঘন ঘন হাততালি।

*************************************************

আজ একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে পৌঁছে ভারতে এমনই এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে হিন্দুত্ববাদীদের দাপটে ইতিহাস থেকে আরম্ভ করে গৃহস্থের খাদ্যতালিকা পর্যন্ত পাল্টে দিচ্ছে নয়া-সন্ত্রাসের অঙ্গুলিনির্দেশ। ইতিহাসকে বলা হচ্ছে কল্পনা আর কাল্পনিক কাহিনিকে বলা হচ্ছে ইতিহাস। চেষ্টা চলছে ভগৎ সিং-কে হিন্দু বীর হিসেবে প্রতিপন্ন করার এবং তাঁর আত্মদানকে হিন্দুরাষ্ট্র গড়ার ভিত্তিরূপে স্থাপনের। সযত্নে চাপা দেওয়া হচ্ছে তাঁর লেখা 'কেন আমি নাস্তিক' প্রবন্ধ। অনুল্লিখিত থাকছে আরও দুটি লেখা: "ধর্ম এবং আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম" এবং "সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও তার প্রতিকার"।

শেষোক্ত প্রবন্ধটি ১৯২৮ সালের জুন মাসে 'কীর্তি' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। প্রবন্ধে ভগৎ সিং লক্ষ্য করেছেন, ১৯২০-২১ সালের অসহযোগ আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়ার পর একের পর এক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনা ঘটছে। তাঁর লেখার অব্যবহিত আগের ঘটনা হল কোহাট শহরের ভয়াবহ দাঙ্গা। তিনি লক্ষ্য করেছেন, বর্ণনায় প্রাধান্য পাচ্ছে মুসলমান নৃশংসতা হিন্দুদের ওপর বা শিখদের ওপর, কিংবা মুসলমানের ওপর অন্যদের অত্যাচার। কিন্তু মূল কারণটা সকলেই বাদ দিয়ে যায়। মূল কারণ অর্থনৈতিক। দারিদ্র এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে চার আনা পয়সার জন্যেও অন্যায় কাজে নাম্বার জন্য বহু মানুষ, কী হিন্দু কী শিখ কী মুসলমান প্রস্তুত। এরই সুযোগ পুঁজিবাদীরা নেয়, যাতে সব গরিব মানুষের আন্দোলনের লক্ষ্যবস্তু তারা না হয়। ভগৎ সিং লিখছেন, "দাঙ্গা সর্বদাই হতাশাজনক খবরে ভর্তি, কিন্তু কলকাতার দাঙ্গায় একটা ভালো জিনিসও ঘটেছিল। শ্রমিকরা দাঙ্গায় অংশ নেয়নি, এমনকি ট্রেড ইউনিয়নগুলি চেষ্টা করেছিল মারমুখো জনতাকে শান্ত করতে। এই সব লোক শ্রেণিসচেতন হয়ে উঠেছিল এবং নিজেদের শ্রেণিস্বার্থ খুঁজতে শিখেছিল। শ্রেণিচেতনাই প্রধান হাতিয়ার যা সহায় হতে পারে দাঙ্গা রুখতে।" উপসংহারে বলছেন, "ধর্মকে যদি রাজনীতি থেকে পৃথক করা যায়, তাহলে আমরা সকলে যৌথভাবে সামিল হতে পারি রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায়, ধর্মীয় বিষয়ে যতই তফাত থাকুক না কেন। আমরা অনুভব করছি যে ভারতের প্রকৃত হিতৈষীরা এই নীতিগুলো অনুসরণ করে ভারতকে বাঁচাবেন সেই আত্মহননের পথ থেকে যে পথে আজ সে চলছে।" এর প্রত্যেকটি কথা আজকের ভারতেও প্রযোজ্য। ধর্ম আর রাজনীতির পৃথকীকরণ, যা ধর্মনিরপেক্ষতার সংজ্ঞার্থ, আজকের ভারতে যতটা প্রয়োজন, ততখানি স্বাধীনতার পরে আর কখনও ছিল না।

একই মাসে (জুন ১৯২৮) প্রকাশিত হয়েছিল "অস্পৃশ্যতার সমস্যা"। সেখানেও তথাকথিত অস্পৃশ্যদের আহ্বান করা হয়েছিল নিজের শ্রেণিসত্তাকে উপলব্ধি করে শ্রেণিসংগ্রামে অংশ নিতে। তাদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, "তোমরাই আসল শ্রমিক শ্রেণি।" ঠিক পরের লাইনে উদ্ধৃত করেছিলেন মার্কস-এঙ্গেলসের অমর পঙক্তি: "দুনিয়ার মজদুর এক হও, শৃঙ্খল ছাড়া আর কিছু তোমাদের হারাবার নেই।" ভগৎ সিং তার সঙ্গে যোগ করেছিলেন, "সামাজিক আন্দোলন থেকে বিপ্লব শুরু করো।" আজকের জাতপাতের উৎপাতে ক্লিষ্ট ভারতে প্রত্যেকটি কথা গুরুত্বপূর্ণ।

ভগৎ সিং আজও যুগোপযোগী। 


Tuesday, 9 February 2021

CAA ও ভারতীয় নাগরিক - গৌতম রায়

রাজীব-মোহন্ত চুক্তির ভিতর দিয়ে আসামের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা হিসেবে নাগরিকত্ব আইনের ৬-এ ধারা তৈরির যে পথ খুলে দেওয়া হয়েছিল, সেটিকেই পরবর্তীকালে কেন্দ্রে এন ডি এ নামক নীতিবিহীন, সুবিধাবাদী জোট সরকারের প্রধান শরিক হিসেবে বিজেপি-র নেতৃত্বাধীন অটলবিহারী সরকারের ২০০৩ সালের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের ১৪-এ ধারা সংযোজনের সুযোগ করে দেয়।

**********************************************************

সাধারণ মানুষ যাতে খাদ্যের দাবিতে সোচ্চার না হয়, শিক্ষার দাবিতে সোচ্চার না হয়, বেকারত্ব নিরসনের দাবি না তোলে, স্বাস্থ্যের অধিকারের দাবি না তোলে, নারীর ক্ষমতায়নের দাবি না তোলে, সংখ্যালঘুর অধিকার ব্রিটিশের হাত থেকে ক্ষমতা হস্তান্তরের কালের চুক্তি অনুযায়ী, সংখ্যালঘুর অধিকারের কথা না তোলে, আদিবাসী, দলিত-তফসিলি জাতি, উপজাতিভুক্ত মানুষ, যাতে তাঁদের অধিকার, কর্মসংস্থান - ইত্যাদির প্রশ্ন না তোলে, একের পর এক রাষ্ট্রায়ত্ত্ব কোম্পানি, কেন্দ্রের শাসক দল বিজেপি ঘনিষ্ঠ শিল্পপতিদের কাছে বেচে দেওয়া নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে কোনো প্রশ্ন যাতে তৈরি না হতে পারে, নতুন কোনো শিল্পের সম্ভাবনা কেন ভারতবর্ষে তৈরি করতে দেশের সরকার যত্নবান নয় - এই প্রশ্ন যাতে মানুষ না করেন - সেই জন্যই কেন্দ্রের শাসক দল বিজেপি এন আর সি-র জুজু সাধারণ মানুষকে দেখিয়ে চলেছেন।

**********************************************************

পোশাক, বেশভূষা, সাজসজ্জার উপর নির্ভর করে যিনি মানুষের ধর্ম নিরূপণ করতে চান, সেই দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভারতবর্ষের সংস্কৃতি, সভ্যতা সম্পর্কে কতখানি অজ্ঞ - তা ভাবলে সত্যিই আশ্চর্য হয়ে যেতে হয়। পবিত্র ইসলামীয় সংস্কৃতি ভারতবর্ষের রীতিনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার আগে পর্যন্ত ভারতীয় সভ্যতা সংস্কৃতিতে সেলাই করে পড়া কাপড়ের কোন প্রচলন ছিল না। দর্জির দ্বারা জামাকাপড় নির্মাণের ধারণাই পবিত্র ইসলামের ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার পর ভারতবর্ষের মানুষ জেনেছেন। তার আগে এদেশের মানুষ কখনো সেলাই করা কাপড় পরতেন না। যে ব্রাহ্মণ্যবাদী - জাতপাতভিত্তিক - বর্ণভিত্তিক সংস্কৃতিকে ভারতবর্ষের ধ্যানজ্ঞান হিসেবে বিকৃতরূপে দেখিয়ে, রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে চায় হিন্দু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী, সন্ত্রাসী শক্তি, সেই প্রাচীন ভারতীয় ধ্যানধারণায় স্টিচ করা কোনো জামাকাপড় পরবার কোন প্রচলনই ছিল না।

**********************************************************

ধর্মবিশ্বাসে ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায় ব্রাহ্ম ছিলেন। প্রফুল্লচন্দ্র সেন হিন্দু ধর্মের প্রচলিত রীতিনীতির প্রতি ছিলেন আস্থাবান। কার্যত প্রফুল্লচন্দ্র সেনের ব্যক্তিগত উদ্যোগে জয়রামবাটিতে শ্রীশ্রী মা সারদা দেবীর জন্মস্থানকে তাঁর পরিবারের লোকজনের নানা আপত্তিকে অতিক্রম করে সম্পূর্ণভাবে রামকৃষ্ণ মিশনের আওতায় আনা সম্ভবপর হয়েছে।

জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের মত মানুষ, তাঁরা ব্যক্তিজীবনে ছিলেন নাস্তিক। তা সত্ত্বেও তাঁরা একটি বারের জন্যেও অপরের ধর্মাচরণ ঘিরে কখনো কোনোরকম বাধা সৃষ্টি করেননি। জ্যোতি বাবু তাঁর ব্যক্তিজীবনে কখনো ধর্মচর্চার ধারপাশ দিয়ে না হাঁটলেও, ইন্দিরা গান্ধীর নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর শিখবিরোধী দাঙ্গা প্রশমনে শিখ সম্প্রদায়ের মানুষদের সব ধরনের নিরাপত্তা প্রদানের উদ্দেশ্যে যখন গুরুদ্বারে গিয়েছেন, তখন শিখ ধর্মের প্রচলিত রীতিনীতিকে মান্যতা দিয়ে মাথায় উষ্ণীষ পড়েই গুরুর দ্বারে প্রবেশ করেছেন।

জ্যোতিবাবুর ব্যক্তিজীবন চর্চাতে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের এতটুকু গুরুত্ব না থাকলেও, শিখ সম্প্রদায়ের মানুষকে বাঁচানোর স্বার্থে, প্রবল বাস্তব জ্ঞানসম্পন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব জ্যোতি বসু যেমন কোনরকম জেদাজেদির মধ্যে যাননি, তেমনই এই বিষয়টিকে তাঁর রাজনৈতিক প্রচারের একটু মাধ্যম হিসেবে একটি বারের জন্যও তুলে ধরেননি।

**********************************************************

 ... তথাকথিত বিশেষজ্ঞরা এটাই বলবার চেষ্টা করছিলেন যে, কেরলে যেহেতু বামপন্থীদের প্রধান শত্রু হচ্ছে কংগ্রেস, তাই কেরলের প্রেক্ষিতকে সামনে রেখে, কোনো অবস্থাতে পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্টভুক্ত দলগুলি কেরালাতে দলের সঙ্গে শত্রুতার সম্পর্ক যে রাজনৈতিক দলের, সেই দলের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের সংগ্রামের ক্ষেত্রে কোনো বোঝাপড়া বা গণআন্দোলনের ক্ষেত্রে কোন বোঝাপড়া করে উঠতে পারেন না।

এই অভিমতটি সম্পূর্ণভাবেই একাংশের তথাকথিত বিশেষজ্ঞদের একান্ত নিজস্ব অভিমত। তা নিয়ে নতুন করে বলবার কোন প্রয়োজন নেই। কারণ গোটা বিষয়টি নিয়ে আলাপ আলোচনার যে নির্যাস বামপন্থী দলগুলোর পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে প্রকাশিত হয়েছে, তাতে কোনো অবস্থাতেই এই তথাকথিত বিশেষজ্ঞদের অভিমতকে সিলমোহর দেওয়া হয়নি।

তবুও রাজনৈতিক বাস্তবতার নিরিখে, কেরলে ক্ষমতাসীন বামপন্থীদের সঙ্গে বিরোধী কংগ্রেসের রাজনৈতিক লড়াইয়ের প্রেক্ষিতে, জাতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে, কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের আনা এন আর সি, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বা তারও আগের প্রেক্ষিতে - সংবিধানের ৩৭০ নম্বর ধারা ও ৩৫এর এ ধারার অবলুপ্তি, ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদের জমি সংক্রান্ত মামলায় সুপ্রিম কোর্টের রায়দানের পর যে পরিবেশ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তার প্রেক্ষিতে, গোটা দেশকে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের হাত থেকে রক্ষা করতে, সংখ্যালঘু মুসলমান সম্প্রদায়কে সামাজিক-অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক-ধর্মীয় নিরাপত্তা দেওয়ার স্বার্থে, সমস্ত রকমের রাজনৈতিক বিরোধকে পাশে রেখে, একযোগে কেন্দ্রের ভারতবর্ষের মানুষকে ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজিত করে, ভারতবর্ষকে রাজনৈতিক হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করবার এই ভয়ঙ্কর চক্রান্তের বিরুদ্ধে, একযোগে আন্দোলন সাম্প্রতিক ভারতের গণআন্দোলনের ইতিহাসের ক্ষেত্রে এক নয়া দিগন্ত উন্মোচিত করেছে।

কেরালাতে সেখানকার শাসক ও বিরোধী দলের কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের এই সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বিরুদ্ধে একযোগে লড়াইকে কেন্দ্র করে কেউ কেউ এই প্রশ্নের অবতারণা করছেন যে, পরস্পর বিরোধী দুটি রাজনৈতিক দল যদি কেরালায় কেন্দ্রের বিরুদ্ধে একত্রে লড়াই করতে পারে, তাহলে কেন, পশ্চিমবঙ্গে, এখানকার শাসক তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিরোধী বামপন্থীরা একযোগে লড়াই করতে পারবে না?

বস্তুত এই তত্ত্বটি অনেকদিন ধরে সংকীর্ণতাবাদী রাজনীতিক, যারা বামফ্রন্ট সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ক্ষমতাসীন করবার জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে ভূমিকা নিয়েছিল, তারা বাতাসে ভাসিয়ে দিতে শুরু করেছিল। সাম্প্রদায়িক বিজেপিকে রুখতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বামপন্থীদের একযোগে আন্দোলনে নামা উচিত - এমন আজগুবি তত্ত্ব তারা অনেকদিন ধরে নানা পত্র-পত্রিকায় সন্দর্ভের ভিতর দিয়ে, সামাজিক গণমাধ্যমের ভিতর দিয়ে, সাধারণ আলাপচারিতার মধ্যে দিয়ে তুলে আনবার চেষ্টা করছিল।

এই প্রশ্নের প্রথম এবং প্রধান উত্তর হলো এই যে, অর্থনৈতিক প্রশ্ন এবং শ্রেণি অবস্থানের প্রশ্নে কংগ্রেস দলের সম্পর্কে যথেষ্ট প্রশ্ন এবং সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও একথা অত্যন্ত জোর দিয়ে বলতে হয় যে, কংগ্রেস দল নীতিগতভাবে কোনো অবস্থাতেই সাম্প্রদায়িক নয়। আজ পর্যন্ত কি কেন্দ্রে কি কোনো রাজ্যে সরকার গঠনের উদ্দেশ্যে কংগ্রেস দল বামপন্থীদের মতোই, কোনো সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী দলের সঙ্গে আঁতাত করে সরকারে থাকেনি।

অপরপক্ষে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা তাঁর তৃণমূল কংগ্রেস প্রকাশ্যে নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ বলে দাবি করলেও, নয়ের দশকের শেষভাগ থেকে তারা বিজেপির জোটসঙ্গী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে। পরবর্তীকালে অটলবিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বাধীন এন ডি এ নামক নীতিহীন সুবিধাবাদী জোটের শরিক হয়ে একটানা সাড়ে ছয় বছর কেন্দ্রে ক্ষমতার মৌতাত উপভোগ করেছে। এই সময়কালে সর্বনাশা অর্থনৈতিক নানা ধরনের সিদ্ধান্তের পাশাপাশি গোটা দেশজুড়ে বিজেপি এবং তার সঙ্গীসাথীরা ও তাদের মূল মস্তিস্ক আর এস এস যে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক আগ্রাসন চালিয়েছে, সে সম্পর্কে কিন্তু কেন্দ্রে মন্ত্রী থাকাকালীন বা তারপরেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একটি প্রতিবাদসূচক শব্দ আজ পর্যন্ত ব্যবহার করেননি।

এমনকি গুজরাত গণহত্যা যখন সংগঠিত হয় নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে, সেই সময়কালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শরিক থেকেছেন এন ডি এ-র। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা থেকে দেখেছেন সব কিছু। কিন্তু একটিবারের জন্য সেই গণহত্যার এতটুকুও প্রতিবাদ তাঁর কণ্ঠ থেকে উচ্চারিত হয়নি। শুধু তাই নয়, গুজরাট গণহত্যায় হাজার হাজার সংখ্যালঘু মুসলমানের রক্তে হাত লাল করে নরেন্দ্র মোদি যখন বিধানসভা নির্বাচনে আবার জিতে আসেন, তখন এই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই নরেন্দ্র মোদিকে আজকের বিজেপি নেতা মুকুল রায়ের মাধ্যমে ফুল পাঠিয়ে শুভেচ্ছা পর্যন্ত জানিয়েছিলেন।

অস্ট্রেলিয়ার মিশনারী ফাদার গ্রাহাম স্টুয়ার্ট স্টেইন্সকে দুই শিশুপুত্র সহ জিপে আগুন লাগিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে আর এস এসের সহযোগী বজরং দল। গোটা উড়িষ্যা জুড়ে সংখ্যালঘু খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষদের উপরে নানা ধরনের অত্যাচার চালায় আর এস এস ও তার সহযোগী সংগঠনগুলো। বাজপেয়ী জমানাতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় অবস্থান করে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিন্তু একটিবারও সেইসব অপকর্মের কোনরকম বিরোধিতা করেননি।

রাজনৈতিক হিন্দুরাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে বাজপেয়ী সরকারের আমলে যেভাবে এন সি আর টি থেকে শুরু করে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইতিহাস পাঠক্রমকে রাজনৈতিক হিন্দু সাম্প্রদায়িক অভিধারায় বিকৃত করা শুরু হয়েছিল, সে সম্পর্কে কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একটিবারের জন্য কোনো রকম প্রতিবাদ করেননি। পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থীদের ক্ষমতাচ্যুত করতে সেই সময় এ রাজ্যের বুকে বিজেপি এবং তাদের মূল মস্তিস্ক আর এস এসের বিভিন্ন ধরনের তথাকথিত সামাজিক সংগঠনগুলির শ্রীবৃদ্ধিতে সবরকমভাবে সাহায্য করেছিলেন।

বস্তুত পশ্চিমবঙ্গের বুকে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর হিন্দু সাম্প্রদায়িক, রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপিকে সংসদীয় গণতন্ত্রের নিরিখে এবং সামাজিক অবস্থানের নিরিখে পায়ের নিচে জমি করে দেওয়ার ক্ষেত্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের যে ন্যক্কারজনক ভূমিকা, তার প্রেক্ষিতে সেই ব্যক্তির বিজেপি বিরুদ্ধতার মধ্যে আদৌ সততা আছে কিনা - এই প্রশ্নটি প্রথম তোলা দরকার।