Monday, 15 November 2021

সহজ আলোচনায় পার্টি কর্মসূচী - দীপক নাগ

 "...আমাদের শিক্ষা কোনো আপ্তবাক্য নয়, কর্মক্ষেত্রে পথনির্দেশক।" মার্কস ও এঙ্গেলস সবসময়ই একথা বলতেন। যারা কয়েকটি "সূত্র" মুখস্থ করে বারবার আওড়াতো, তাদের তাঁরা বিদ্রুপ করতেন। এই সূত্রগুলি সম্বন্ধে এ পর্যন্ত বলা যায় যে, সেগুলি কেবল সাধারণভাবে কাজের মোটামুটি একটা রূপরেখা দিতে সক্ষম; ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার প্রত্যেকটি পর্যায়ের বাস্তব অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনিবার্যভাবেই এই কাজের পরিবর্তন ঘটায়। ... এই প্রশ্নাতীত সত্য উপলব্ধি করা একান্ত প্রয়োজন যে, মার্কসবাদীকে বাস্তব জীবনের, প্রকৃত তথ্যের অনুশীলন করতে হবে, পুরোনো মতবাদকে আঁকড়ে থাকলে চলবে না।" - লেনিন (লেটার্স অন ট্যাকটিকস; কালেক্টেড ওয়ার্কস)

=============================================================

আজ থেকে প্রায় একশ সত্তর বছর আগে কমিউনিস্ট লিগের কর্মসূচি বা কমিউনিস্ট পার্টির ইস্তাহারে মার্কস-এঙ্গেলস স্পষ্ট কথায় বলেন : "কমিউনিস্টরা নিজেদের মতামত ও লক্ষ্য গোপন করতে ঘৃণা বোধ করে। খোলাখুলিভাবে তাঁরা বলেন যে, তাঁরা যা চান তা পাওয়া যেতে পারে কেবলমাত্র এখনকার সমস্ত সামাজিক অবস্থাকে জোর করে পাল্টে ফেলার মাধ্যমেই।" দুনিয়ায় হাজার হাজার রাজনৈতিক দল বা পার্টি থাকলেও শুধুমাত্র কমিউনিস্ট পার্টিই তার উদ্দেশ্য লিখিতভাবে ঘোষণা করে। বুর্জোয়াদলগুলোর প্রায় কোনোটারই কোনো লিখিত কর্মসূচি নেই। কারণ চলতি সমাজে যে শোষণ, অত্যাচার, অনাহার, বেকারি চলছে তা টিকিয়ে রেখে ধনীদের সেবা করাই তাদের একমাত্র কর্মসূচি।


মার্কসবাদীরা মনে করে বর্তমান সমাজ পরস্পর বিরোধী দুটো শ্রেণিতে বিভক্ত। অল্প কয়েকজন মানুষ সমাজের শতকরা নব্বুইভাগেরও বেশি সম্পত্তির মালিক। তাঁদের সবকিছু আছে। তাঁরা শোষক বা বুর্জোয়া। আর সমাজের নব্বুই ভাগেরও বেশি মানুষের হাতে কোনো সম্পদ নেই। তাঁরা শোষিত বা সর্বহারা। তাই তাঁরা নেই-রাজ্যের বাসিন্দা। মার্কসবাদীরা এই অসম ব্যবস্থার বদল চায়। তারা চায় শ্রেণিহীন সমাজ বা সাম্যবাদ। এই ব্যবস্থায় কোনো শোষক থাকবে না। তাই থাকবে না না-খেতে পাওয়ার ভয়। প্রত্যেকে তার প্রয়োজনমতো পায় বলেই অযথা সম্পদ জমিয়ে রাখার ইচ্ছে থাকে না। কারণ দরকার পড়ে না। অনেকটা মৌমাছির ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করার মতো। কাউকে আঘাত না দিয়ে তার যতখানি প্রয়োজন ততখানিই নেবে। তার বেশি নয়। কিন্তু সাম্যবাদ বা কমিউনিজমের স্তরে আসতে গেলে সমাজকে কয়েকটা স্তর পেরিয়ে আসতে হয়। সামন্ততান্ত্রিক স্তর পেরিয়ে পুঁজিবাদী স্তর তারপর সমাজতান্ত্রিক স্তর আর অবশেষে সাম্যবাদী স্তর। এইসব স্তর পেরোনোর জন্য চাই বিপ্লবী মতবাদ এবং একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক দল বা কমিউনিস্ট পার্টি। যার নেতৃত্বে থাকবে শ্রমিক শ্রেণি। কারণ মার্কসবাদীদের মতে সমাজে শ্রমিকশ্রেণিই একমাত্র বিপ্লবী শ্রেণি। লেনিনের মতে, "বিপ্লবী মতবাদ না থাকলে বিপ্লবী আন্দোলন সম্ভব নয়। ... যে পার্টি সব চাইতে এগিয়ে থাকা মতবাদ দ্বারা পরিচালিত, কেবলমাত্র সেই পার্টিই পারে অগ্রণী সংগ্রামী বাহিনীর ভূমিকা পূরণ করতে।"


কমিউনিস্ট পার্টি বিপ্লবের মাধ্যমে সমাজের আমূল পরিবর্তন ঘটাতে চায়। তারা বিশ্বাস করে শুধুমাত্র ওপর ওপর পরিবর্তন বা এদিক ওদিক সামান্য সংস্কার করেই মানুষের ওপর শোষণ ও মানুষের দুঃখ দূর করা যায় না। বিপ্লব আকাশ থেকে পড়ে না। আবার স্বতঃস্ফূর্ততার দ্বারাও বিপ্লব সম্ভব নয়। এর জন্য চাই একটা পাকাপোক্ত ও সুশৃঙ্খল সংগঠন। আবার বাস্তব পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে একটা সঠিক কর্মসূচি ছাড়া সমাজ পরিবর্তন সম্ভব নয়।

=============================================================

ফিনান্স পুঁজিকে লগ্নি পুঁজি বা মহাজনি পুঁজি বলা যেতে পারে। লেনিনের মতে, "উৎপাদন কেন্দ্রীয়ভাবে বা একসঙ্গে জড়ো হওয়া; তা থেকে একচেটিয়া কারবারের আবির্ভাব; ব্যাঙ্কের সঙ্গে শিল্পের মিশে যাওয়া বা মিলন ঘটা - এই হলো মহাজনি পুঁজি তৈরি হওয়ার ইতিহাস এবং কথাটার সারমর্ম।"

=============================================================

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে দ্বন্দ্ব বেড়ে চলেছে। সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়নের ফলে এখন চারটি দ্বন্দ্ব বা বিরোধ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এই দ্বন্দ্বগুলো হলো :


(ক) সমাজতন্ত্র বনাম সাম্রাজ্যবাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব;

(খ) সাম্রাজ্যবাদ ও তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব;

(গ) সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব;

(ঘ) পুঁজি ও শ্রমের দ্বন্দ্ব।

=============================================================

ভারতে বুর্জোয়া ও জমিদার জোটের নেতৃত্বে রয়েছে বড় বড় বুর্জোয়ারা। ধনতন্ত্রের বিকাশ ঘটানোই এদের লক্ষ্য। এই শ্রেণি জমিদারদের রাষ্ট্রক্ষমতায় রেখেই বা সামন্ততন্ত্রকে ধ্বংস না করেই ধনতান্ত্রিক পথে বিকাশ ঘটাতে চাইছে। এরা বিদেশি মহাজনি পুঁজির সাহায্য নিয়ে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে বা দর কষাকষি করে নিজেদের লাভের পরিমাণ বাড়িয়ে তোলে। ভারতীয় বুর্জোয়ারা এক্ষেত্রেও দুমুখো নীতি নিয়ে চলে। তাই ভারত জাতীয় বুর্জোয়াদের রাষ্ট্র নয়। কারণ সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে তাদের বোঝাপড়া আছে। সি পি আই ভারতকে জাতীয় বুর্জোয়াদের রাষ্ট্র বলে মনে করে। তারা মনে করে ভারতীয় বুর্জোয়ারা পুরোপুরি স্বাধীন। আবার ভারতীয় বুর্জোয়ারা মুৎসুদ্দি বা সাম্রাজ্যবাদের দালাল - নকশালপন্থীদের মতো একথাও আমরা মনে করি না। এখানেই আমাদের সঙ্গে সি পি আই বা নকশালপন্থীদের কর্মসূচির অন্যতম প্রধান ফারাক।  

=============================================================

বর্তমানে বিপ্লবের দুটি স্তরের কথা আমরা বলতে পারি। প্রথমটা বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব এবং আর তারপর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব। আগে বুর্জোয়ারাই নিজেদের স্বার্থে সামন্ততন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করে বুর্জোয়া গণতন্ত্র স্থাপন করতো। কিন্তু বুর্জোয়ারা এখন আর এই ভূমিকা পালন করে না। সর্বহারা শ্রেণিকেই এখন এই দায়িত্ব পালন করতে হবে। এই বিপ্লবকে জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের স্তর বলা যায়। আমরা এখন এই স্তরে আছি। 


আমাদের দেশের বাস্তব পরিস্থিতিতে বিপ্লবের স্তর হিসেবে যে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বন্দ্ব বা বিরোধের কথা উল্লেখ করতেই হয়, তা হলো:

(ক) পুঁজির সাথে শ্রমের দ্বন্দ্ব;

(খ) জমিদার ও কৃষকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব;

(গ) সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে ভারতীয় জনসমাজের দ্বন্দ্ব।

============================================================= 

কৃষি বিপ্লব হলো জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের মূল কথা। জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের মূল শত্রু হলো:

(ক) বড় ধরনের বুর্জোয়া গোষ্ঠী,

(খ) জমিদার বা ধনী কৃষক এবং 

(গ) সাম্রাজ্যবাদ

বড় বড় পুঁজিপতিরা বিদেশি মহাজনি পুঁজির সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে মুনাফা করার চেষ্টা করে। কাজেই বিদেশি লগ্নিপুঁজি বা মহাজনি পুঁজি অন্যতম প্রধান শত্রু। তাই মোটামুটিভাবে জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব হচ্ছে :

 - সামন্ততন্ত্র বিরোধী,

- সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী,

- একচেটিয়া বিরোধী ও 

- গণতান্ত্রিক। 

=============================================================  

জনগণতান্ত্রিক ফ্রন্টের নেতা হলো শ্রমিকশ্রেণি; দৃঢ় মিত্র হলো কৃষক সমাজ; মধ্যবিত্তশ্রেণি হলো সাধারণ মিত্র; আর দোদুল্যমান ও অস্থিতিশীল মিত্র হলো মাঝারি ও ছোট বুর্জোয়ারা।

============================================================= 

মার্কসবাদীরা পার্লামেন্টারি ব্যবস্থায় অংশগ্রহণের বিরুদ্ধে নয়। তারা পার্লামেন্ট-সর্বস্বতার বিরুদ্ধে। অর্থাৎ পার্লামেন্টই সব বা পার্লামেন্টের মাধ্যমেই সব সমস্যার সমাধান করা বা এই সমাজব্যবস্থার পরিবর্তন করা সম্ভব - আমরা তা বিশ্বাস করি না। লেনিনের কথায়, "শ্রমিকশ্রেণির পার্টিগুলি পার্লামেন্টারি সংগ্রামকে ব্যবহার করার, পার্লামেন্টে অংশগ্রহণ করারই পক্ষে। কিন্তু তারা 'পার্লামেন্টারি ক্রেটিনিজম'-এর অর্থাৎ পার্লামেন্টারি সংগ্রামই হচ্ছে রাজনৈতিক সংগ্রামের একমাত্র বা সবসময়ই প্রধান রূপ - এই বিশ্বাসের স্বরূপ নির্মমভাবে প্রকাশ করে দেয়।" 

=============================================================

সংসদীয় ব্যবস্থার প্রতি অতি-নির্ভরতা আমাদের মধ্যে সংশোধনবাদী বিচ্যুতি নিয়ে আসতে পারে। আবার বুর্জোয়া সংসদীয় ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করলে তা আমাদেরকে সংকীর্ণতাবাদী বা হঠকারী বিচ্যুতির দিকে নিয়ে যেতে পারে।

=============================================================

পার্টি গড়ার কাজে সমস্তরকম অ-মার্কসীয় চিন্তাধারা, কুসংস্কার, ধর্মীয় কূপমুন্ডুকতা, সাম্প্রদায়িকতা, জাতপাত, বুর্জোয়া সংস্কৃতি ও আচারআচরণ, বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদ ও বিচ্ছিন্নতাবাদের বিরুদ্ধে সচেতন সংগ্রাম গড়ে তুলতে হবে।

=============================================================


Wednesday, 10 March 2021

ধর্ম এই সময়ে - সুকুমারী ভট্টাচার্য

বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পরে যে তথ্যচিত্রটি তোলা হয় তাতে মসজিদ ধ্বংসের পরে তথ্যচিত্রী ক্যামেরা নিয়ে এক বুড়ি হিন্দু মহিলাকে জিজ্ঞেস করেন, 'মাতাজি, আজ এই এতক্ষণ ধরে যা ঘটল তাতে আপনার কি মনে হল? বৃদ্ধা সাশ্রুনেত্রে বক্ষে করাঘাত করে বললেন, 'হায় রাম, তোমার শেষে এই দশা হল যে, অন্যের বাড়ি ভেঙে তোমায় বাস করতে হয়?' ওই বৃদ্ধা বিশ্বাসী হিন্দু, তাঁর কাছে তাঁর ইষ্টদেবতা রামের মান গেল ওই সাম্প্রদায়িক বর্বরতায়।

*************************************

যে ধর্ম অসাম্প্রদায়িক, যে ধর্ম মূলত মানবিক তা সত্যকার মানব-অকল্যাণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করবে, যেন করত লিবারেশন থিওলজিস্টরা, প্রধানত দক্ষিণ আমেরিকায়, তবে অন্য বহু দেশেও এঁরা সক্রিয়। এঁরা বামপন্থী খ্রিস্টান, সামাজিক অত্যাচার ও শোষণের বিরুদ্ধে এঁরা নিয়ত সংগ্রাম করেন। 

*************************************

আপনজনকে দূরে ঠেলে দিয়ে পর করে দেওয়া আমরা কম করিনি। এখন বোধ হয় সময় এসেছে যারা নিজেদের মার্কসবাদী বলে এবং কাজে, সাম্যবাদী সংগঠনে, আন্দোলনে সক্রিয় অংশ গ্রহণ করে; তাদের শুধুমাত্র ধর্মে বিশ্বাসী বলেই ঠেলে দূরে না সরাবার। মার্কসের পরে মার্কসবাদ অপরিবর্তিত থাকেনি। ওইসব মত অবলম্বন করে দেশে দেশে বিপ্লবও সংঘটিত হয়েছে, কাজেই মার্কসবাদের মূল তত্ত্বটিকে অবিকৃত রেখে ধর্মের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তা যদি আন্দোলনের দ্বারা বিপ্লবের পথে এগোয়, তাহলে বোধহয় ওই পর্যন্ত ধর্মকে সহ্য করে তেমন মানুষদের সহযোদ্ধা বলে স্বীকার করলে সংগঠনের লাভ ছাড়া ক্ষতি হয় না।

ধর্ম যখন শ্রেণিসংগ্রামকে বাধা দেয়, মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করে তখনই তাকে সহ্য করা অন্যায়। কিন্তু আজকের ভারতবর্ষে ধর্মবিশ্বাসী মাত্রেই শ্রেণিশত্রু বা সংগ্রামের শত্রু নয়। বহু লোকের কাছে ধর্ম একান্ত ব্যক্তিগত কিছু বিশ্বাস ও আচরণ, যার দ্বারা তারা কারও কোনো ক্ষতি করার কথা কল্পনাও করে না। এদের পর করে কী লাভ? এরা নিজেদের ধর্মবিশ্বাসকে যুক্তিবিচারের আওতার বাইরে রাখে ঠিকই, রাখুক না? যদি সে বিশ্বাস অন্য কোনো সম্প্রদায়ের মানুষকে আঘাত না করে, গণসংগ্রামকে ব্যাহত না করে, বরং সংগ্রামীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে এগোয়, তাহলে নাস্তিক মার্কসবাদীর কি সেই সহিষ্ণুতাটুকু থাকবে না তার ওই গোপন ঠাকুরঘরটুকুকে আঘাত না করার? যুক্তিবিচার দিয়ে ধর্মবিশ্বাসকে যাচাই করে না বলেই অনেকসময় নিজের অভিজ্ঞতাই তাদের বিশ্বাসে আঘাত হানে। আর নাও যদি হানে তো, সাম্যবাদী চেতনায় সে আর যাই হোক সাম্প্রদায়িক হয়ে উঠবে না কখনও এবং এই কারণেই আমাদের সহযোদ্ধা থাকবে।

*************************************

সব ধর্মের আদিপর্বে দেখি কোনো সম্প্রদায় ছিল না; কিছু পরে দলীয় স্বার্থ ও প্রাধান্যের লোভে কোনো কোনো ব্যক্তি পৃথক সম্প্রদায় গঠন করে ক্ষমতার জগতে উন্নতি করে নেয়, নিজের ও দলের ... । ইসলাম বাইরের জগতে সৃষ্ট হয়ে ভারতবর্ষে প্রবেশ করে ভিন্নমতাবলম্বী একটি দল হিসাবে। তার আগের ভারতবর্ষ মুখ্যত হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন, আজীবক --- এদের বিভিন্ন শাখা এবং অগণ্য আদিবাসীর দেশ ছিল। ইসলাম এখানে তেমনই একটি সম্প্রদায় হয়ে পাশাপাশি শান্তিতে থাকতে পারত। ছিলও। সিন্ধুপ্রদেশে আসার পর থেকে পাঠান রাজত্বকাল পর্যন্ত। মোগল রাজত্বকালে বিধর্মী হিন্দুকে ধর্মান্তরিত করার চেষ্টার সঙ্গে সঙ্গে হিন্দু-মুসলমানের স্বতন্ত্র সম্প্রদায়চেতনা কতকটা উগ্র হয়ে ওঠে। তখন অন্য সব পরিচয় ছাপিয়ে শুধু সাম্প্রদায়িক পরিচয়ই মুখ্য হয়ে ওঠে। 

*************************************

১. সাম্প্রদায়িক চেতনা ধর্মকে পুষ্ট করে না,
২. ধর্ম থেকে উদ্ভূতও নয়,
৩. মুখ্যত এর যোগ রাষ্ট্রক্ষমতার সঙ্গে এবং 
৪. সেটি করায়ত্ত করার জন্যই এ চেতনা দায়বদ্ধ।

*************************************


Wednesday, 24 February 2021

রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প বাঁচাও ভারত বাঁচাও - ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)

গত তিন বছরে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের শাখাগুলির ধারাবাহিকভাবে হ্রাস এবং বেসরকারি খাতের শাখাগুলির দ্রুত বৃদ্ধি ঘটেছে।

সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে তার শেয়ার হোল্ডিং কমিয়ে ৫২ শতাংশ করার অনুমোদন দিয়েছে। ব্যাঙ্কস বোর্ড ব্যুরো গঠন এবং পরবর্তীকালে একটি হোল্ডিং সংস্থা গঠনের জন্য যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে যেটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলিতে সরকারি বিনিয়োগের বিলিব্যবস্থা করবে। এগুলিই বেসরকারিকরণের দিকে প্রথম পদক্ষেপ।

পি জে নায়েক কমিটির অংশীদারিত্বকে হ্রাস করে ৪০ শতাংশ করার সুপারিশ সরকার গ্রহণ করেছে। অতীতে সরকারগুলি আইসিআইসিআই-কে বেসরকারিকরণ করে বেসরকারি ব্যাঙ্ক করেছিল, যদিও আইসিআইসিআই শিল্প নির্মাণে উৎসাহ দেবার জন্যে শুরু হয়েছিল। ইউটিআইকে ইউটিআই ব্যাঙ্কে এবং তারপরে অ্যাক্সিস ব্যাঙ্ক হিসাবে রূপান্তরিত করে বেসরকারিকরণ করা হয়েছিল। এইচডিএফসি, যা আবাসন ক্ষেত্রকে উন্নীত করার জন্য চালু করা হয়েছিল তা বেসরকারি সেক্টরে এইচডিএফসি ব্যাঙ্কে পরিণত হয়েছে। এখন সরকার ঘোষণা করেছে আইডিবিআই ব্যাঙ্কের সরকারি অংশীদারিত্ব হ্রাস করে ৪৫ শতাংশে নামিয়ে আনবে।

মেক ইন ইন্ডিয়া, স্বচ্ছ ভারত, ডিজিটাল ইন্ডিয়া পেনশন যোজনা এবং স্টার্ট আপগুলিকে সফল করতে হলে রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের ব্যাঙ্কগুলিকে এদের তহবিল সরবারহ করতে হবে। বেসরকারি ক্ষেত্র কখনই এই প্রকল্পগুলিকে তহবিল দেয় না কারণ এগুলি তাৎক্ষণিক মুনাফা অর্জন করবে না এবং ব্যর্থও হতে পারে। কৃষকদের যদি কৃষি ঋণ পেতে হয়, যদি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগগুলিকে পর্যাপ্ত ঋণ পেতে হয়, আমাদের সন্তানদের যদি শিক্ষা ঋণ নিতে হয় এবং স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলিকে ঋণ পেতে হয়, আমাদের সন্তানদের যদি শিক্ষা ঋণ নিতে হয় এবং স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলিকে ঋণ পেতে হয়, তবে কেবলমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলি তা সরবারহ করতে পারে। সুতরাং আসুন রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের ব্যাঙ্কগুলিকে সমর্থন করি। রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের ব্যাঙ্কগুলি বাঁচান এবং তাদের সুরক্ষার জন্যে এগিয়ে আসুন। উন্নয়ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান স্থাপনের দাবি করুন।

**********************************************

এখন এনডিএ সরকারের দ্বিতীয় অবতার সবকিছুই বেসরকারি করতে চায়, কৃষকদের বীজ বিক্রি করতে বাধ্য করা বা মঙ্গলসূত্র বিক্রি করতে কোনও ভদ্রমহিলাকে বাধ্য করার মতোই সব তারা জ্বলাঞ্জলি দেবে প্রাইভেটের সেবায়। 

দেশের সম্পদ, রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্র সব তুলে দিতে চায় দেশ এবং বিদেশের বৃহদাকার কর্পোরেটদের হাতে। এদের মদতেই এনডিএ ক্ষমতায়।

কয়েকটি সাম্প্রতিক সংবাদ প্রতিবেদনের দিকে তাকান :

* রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড বিমান জ্বালানি বিক্রির জন্য ভারত পেট্রোলিয়ামের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর করছে।

* এনটিপিসি বেসরকারি হতে চলেছে।

* সরকারের বিলগ্নিকরণের তাড়ায় তালিকায় ফিরে এল এলআইসি'র নাম।

* ৪০০০০ ঘর নির্মাণের ভার এনবিসিসি'র কাছে হস্তান্তর করার জন্য সুপ্রিম কোর্টের রায় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের বিশাল অবদানের স্বীকৃতি।

* শীঘ্রই আসছে। দ্য গ্রেট সরকারি সেল - পাওয়ার গ্রিড, গেইল, বিএসএনএল এবং এমটিএনএল, সাথে জমিও পাওয়া যাবে।

* সরকার সম্পূর্ণভাবে এয়ার ইন্ডিয়া থেকে হাত গুটিয়ে নেবার পরিকল্পনা করছে।

* কৃষ্ণপট্টম বন্দরের ৭০ শতাংশ শেয়ার কিনতে প্রস্তুত হয়ে আছে আদানি।

* রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের সেবায় এলআইসি'র ১৭০০০ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে। 

* ভারতীয় নৌসেনার ৪৫০০০ কোটি টাকার সাবমেরিন প্রকল্পের শেষ মুহূর্তের পরীক্ষার জন্যে আদানি গ্রুপের প্রস্তুতি।

* পাবলিক সেক্টর ইউনিটগুলিতে শেয়ারের হোল্ডিং ৫০%-এর নিচে হ্রাস করার পরিকল্পনা নিচ্ছে সরকার।

গোটা দেশটাই কর্পোরেট, ভারতীয় ও বহুজাতিক সংস্থাগুলির কাছে বিক্রি হওয়ার মুখে। এর সাথে সংরক্ষণ নীতিও খতম হবে।

**********************************************

বামপন্থীদের দাবি 
* রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রে বেসরকারিকরণ বন্ধ করো। প্রতিরক্ষা ও কয়লা ক্ষেত্রে ১০০ ভাগ প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ প্রত্যাহার করো। বিএসএনএল, অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি, ভারতীয় রেল, এয়ার ইন্ডিয়া ইত্যাদি বৃহদাকায় বেসরকারিকরণ বন্ধ করো।
* কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে চাই বর্ধিত সরকারি বিনিয়োগ। তা না হওয়া পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সরকারকে বেকার যুবকদের ভাতা দিতে হবে।
* প্রতি মাসে ২১ হাজার টাকা নূন্যতম মজুরি সুনিশ্চিত করতে হবে।
* যে বিরাট সংখ্যক শ্রমিকরা কর্মচ্যূত হয়েছেন তাঁদের জীবনমান রক্ষার মতো মাসিক মজুরি সরকারকে সুনিশ্চিত করতে হবে।
* পুরনো বকেয়া মেটানো, নির্দিষ্ট নূন্যতম মজুরিতে নূন্যতম ২০০ দিনের কাজ দেওয়া সুনিশ্চিত করতে 'রেগা'য় বরাদ্দ বাড়াতে হবে।
* কৃষি সঙ্কটের মোকাবিলায়, ক্রমবর্ধমান কৃষক আত্মহত্যা রুখতে এবং ফসলের উৎপাদন খরচের দেড় গুণেরও বেশি নূন্যতম সহায়ক মূল্য কার্যকর করতে কৃষকদের জন্য একেবারেই ঋণ মকুবের ব্যবস্থা করতে হবে।
* নূন্যতম মাসিক বার্ধক্য ও বিধবা পেনশন ৩ হাজার টাকা করতে হবে।

Thursday, 11 February 2021

ভগৎ সিং শহিদ-এ-আজম - তীর্থঙ্কর চট্টোপাধ্যায়

আসফাকউল্লা ছিলেন ধর্মপ্রাণ মুসলমান। বস্তুবাদী নন, দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী তো কোনোভাবেই না। অথচ তিনি ভবিষ্যতের স্বাধীন ভারতের আর্থ-সামাজিক অবস্থা সম্পর্কে তাঁর ধারণাকে এই ভাষায় প্রকাশ করেছিলেন: "বিদেশি শাসনকে কদর্য মনে করি এবং একই সঙ্গে ঘৃণা করি এমন কোনো ভারতীয় গণতান্ত্রিক শাসনকে, যা দরিদ্র ও দুর্বলের অধিকারকে অস্বীকার করবে, অথবা যদি তা ধনী ও জমিদারদের তৈরি ওই, অথবা যদি তাতে কৃষক ও শ্রমিকের সমান অংশগ্রহণ না থাকে, অথবা যদি সরকারের আইন অসাম্য ও পার্থক্যের ভিত্তিতে রচিত হয়। যদি ভারত স্বাধীন হয় এবং যদি শ্বেতকায় প্রভুদের হাত থেকে দেশ শাসনের বলগা আমার দেশের ভাইরা কেড়ে নেবার পরেও ধনী-দরিদ্রের মধ্যে অসমতা, জমিদার-রায়তের মধ্যে অসমতা রয়ে যায়, তবে আমি আল্লাহ-র কাছে প্রার্থনা করি, যতদিন তাঁর সৃষ্টিতে সাম্য না প্রতিষ্ঠিত হয়, ততদিন আমি স্বাধীনতা চাই না। যদি এই সব ধারণার জন্য লোকে আমায় কমিউনিস্ট বলে তো বলুক। আমার থোড়াই এসে যায়।"

কাকোরি ষড়যন্ত্র মামলার আর একজন অভিযুক্ত মহাবীর সিং-এর যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর হয়েছিল। তিনি তাঁর বাবাকে আন্দামান-যাত্রার ঠিক আগে একটি চিঠি লেখেন। তাতে লিখেছিলেন: "সমাজ বলতে আমি আর্য সমাজ বা অন্য কোনো সংকীর্ণ সমিতি বুঝি না, আমি বুঝি সমস্ত সাধারণ মানুষের সমাজ। তার কারণ, এই ধর্মীয় সমিতিগুলি এত অদূরদর্শী যে আমার কাছে তারা অর্থহীন। উপরন্তু আমি সব ধর্ম থেকেই দূরে  থাকতে চাই, কারণ তারা সংকীর্ণ, আত্মকেন্দ্রিক, অবিচারভিত্তিক। আমি চাই, অন্যেরাও তা থেকে দূরে থাকুক। মানুষ ও সমাজের পক্ষে যা সবচেয়ে মূল্যবান বলে আমি মনে করি, তা হল নিম্নলিখিত আদর্শ। জাতি, গাত্রবর্ণ, ধর্ম বা অর্থের ওপর ভিত্তি করে কোনো মানবিক সম্পর্ক গড়া উচিত নয়।" 

*************************************************

নিম্ন আদালতে ভগৎ সিং-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, 'বিপ্লব' বলতে তিনি কী বোঝেন? তাঁর উকিল আসফ আলি এই প্রশ্নে আপত্তি করলে আদালত প্রশ্ন নাকচ করে। কিন্তু দায়রা আদালতে নিজের মতাদর্শ ঘোষণার সুযোগ হিসেবে স্বেচ্ছায় ভগৎ সিং প্রশ্নটির উত্তর দেন। "বিপ্লব সর্বদা রক্তাক্ত সংঘাতে জড়িত নয় এবং তার মধ্যে ব্যক্তিগত প্রতিশোধেরও স্থান নেই। বিপ্লব মানে বোমা-পিস্তলের পূজা নয়। বিপ্লব বলতে আমরা বুঝি যে, বর্তমান ব্যবস্থা যা স্পষ্টতই অন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত, তাকে পাল্টাতে হবে। যদিও যারা স্পষ্টতই উৎপাদক বা শ্রমিক, তারাই সমাজের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় উপাদান, তবু তারা তাদের শ্রমের ফল থেকে শোষকদের দ্বারা বঞ্চিত, তাদের মৌলিক অধিকার থেকে তারা বঞ্চিত। ... অতএব একটা মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন এবং যারা এ কথা উপলব্ধি করেছে তাদেরই দায়িত্ব সমাজকে সমাজতান্ত্রিক ভিত্তির ওপরে পুনর্গঠিত করা। এই কাজ সমাধা না হলে এবং মানুষের দ্বারা মানুষের শোষণ এবং এক দেশ দ্বারা অপর দেশের শোষণ, যা সাম্রাজ্যবাদের মুখোশ পরে আছে, বন্ধ না হলে, সমাজের সামনে আজ যে কষ্টভোগ ও হত্যালীলার  বিপদ, তাকে রোখা যাবে না এবং যুদ্ধের অবসান ও বিশ্বশান্তির যুগ উদ্বোধনের সব কথাই ছদ্মবেশহীন কপটতা বলে বোঝা যাবে। বিপ্লব বলতে আমরা বুঝি শেষ পর্যন্ত এমন একটা সমাজব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা যা এই রকম ধ্বংসের ভয়ে ত্রস্ত নয়, যেখানে সর্বহারার সার্বভৌমত্ব স্বীকৃত যার ফলে আসবে এমন একটা বিশ্ব-ফেডারেশন যা বিশ্বমানবকে উদ্ধার করবে পুঁজিবাদের দাসত্ব থেকে ও সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের দৈন্য থেকে।" পরিশেষে তাঁরা সর্বহারার একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য কঠোর সংগ্রামের কথা বলেছেন এবং বিবৃতি শেষ করছেন 'ইনকিলাব জিন্দাবাদ' লিখে।

*************************************************

১৩ সেপ্টেম্বর সকালে ৬২ দিন অনশনের পর যতীন দাস শহীদের মৃত্যু বরণ করলেন। শেষ অবধি তাঁর মনোবল অটুট ছিল। প্রায় অচৈতন্য অবস্থাতেও তিনি খাদ্য প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। সারা দেশ আগের সাত দিন উৎকণ্ঠায় অপেক্ষা করছিল। চরম মুহূর্তের পর সারা দেশে ক্ষোভ ও শোকের বন্যা বয়ে গেল। তখনকার দিনে টেলিভিশন ছিল না, খুব কম বাড়িতেই রেডিয়ো ছিল, টেলিফোন ব্যবস্থাও দুর্বল ছিল। তবু খবর ছড়িয়ে পড়ল সারা দেশে দুপুরের মধ্যে।

এই মৃত্যুসংবাদ শান্তিনিকেতনে পৌঁছাল সন্ধ্যা নাগাদ। ভাদ্রের শেষ; আসন্ন পুজোর ছুটির ঠিক আগে 'তপতী' নাটকের অভিনয় হবে। রবীন্দ্রনাথ ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে নাটকের মহলা দিচ্ছিলেন। যতীন দাসের খবর আসতে রিহার্সাল বন্ধ হয়ে গেল। যে যার ঘরে ফিরে গেলেন। সেই রাতে রবীন্দ্রনাথ একটি গান লিখলেন। পরের দিন রিহার্সালে এসে বললেন, এই নতুন গানটি সকলকে শিখে নিতে হবে। ওই কোরাস দিয়েই 'তপতী' শুরু হবে।


সর্ব খর্বতারে দহে তব ক্রোধদাহ

হে ভৈরব, শক্তি দাও, ভক্ত-পানে চাহো।

দূর করো মহারুদ্র   যাহা মুগ্ধ, যাহা ক্ষুদ্র

মৃত্যুরে করিবে তুচ্ছ প্রাণের উৎসাহ।

দুঃখের মন্থনবেগে উঠিবে অমৃত,

শঙ্কা হতে রক্ষা পাবে যারা মৃত্যুভীত।

তব দীপ্ত রৌদ্র তেজে   নির্ঝরিয়া গলিবে যে

প্রস্তরশৃঙ্খলোন্মুক্ত ত্যাগের প্রবাহ।

*************************************************

দ্বিতীয় পাঞ্জাব ছাত্র সম্মেলনের মুক্ত অধিবেশন হয়েছিল ১৯ অক্টোবর ১৯২৯। সভাপতিত্ব করেছিলেন সুভাষচন্দ্র বসু। এই সভায় পড়া হয়েছিল ভগৎ সিং এবং বটুকেশ্বর দত্ত-র বার্তা, জেল থেকে পাঠানো।

কমরেডগণ,
আজ আমরা যুবসমাজকে পিস্তল-বোমা হাতে তুলে নিতে বলতে পারি না। আজ ছাত্রদের সামনে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে। আগামী লাহোর অধিবেশনে কংগ্রেস দেশের স্বাধীনতার জন্য কঠোর সংগ্রামের ডাক দেবে। জাতীয় ইতিহাসের এই সংকটকালে যুবসমাজকে এক বিশাল দায়িত্ব নিতে হবে। ... তাদের দায়িত্ব শিল্প এলাকার কোটি কোটি বস্তিবাসী ও কোটি কোটি জীর্ণ কুটিরবাসী গ্রামীণ মানুষকে জাগিয়ে তোলা, যাতে আমরা স্বাধীন হতে পারি, যাতে মানুষের হাতে মানুষের শোষণ হয়ে ওঠে অসম্ভব। ...শহীদ যতীন্দ্রনাথ দাসের কাছ থেকে প্রেরণা নিয়ে, এবং দেশের প্রতি অশেষ ভক্তি নিয়ে, তাদের প্রমাণ করতে হবে যে এই স্বাধীনতা সংগ্রামে তারা অনড় পণ নিয়ে লড়তে সক্ষম।

সভাস্থলে এই বার্তা পরে দেবার পরে সমবেত কণ্ঠে ধ্বনি ওঠে, "ভগৎ সিং জিন্দাবাদ" - সেই সঙ্গে ঘন ঘন হাততালি।

*************************************************

আজ একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে পৌঁছে ভারতে এমনই এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে হিন্দুত্ববাদীদের দাপটে ইতিহাস থেকে আরম্ভ করে গৃহস্থের খাদ্যতালিকা পর্যন্ত পাল্টে দিচ্ছে নয়া-সন্ত্রাসের অঙ্গুলিনির্দেশ। ইতিহাসকে বলা হচ্ছে কল্পনা আর কাল্পনিক কাহিনিকে বলা হচ্ছে ইতিহাস। চেষ্টা চলছে ভগৎ সিং-কে হিন্দু বীর হিসেবে প্রতিপন্ন করার এবং তাঁর আত্মদানকে হিন্দুরাষ্ট্র গড়ার ভিত্তিরূপে স্থাপনের। সযত্নে চাপা দেওয়া হচ্ছে তাঁর লেখা 'কেন আমি নাস্তিক' প্রবন্ধ। অনুল্লিখিত থাকছে আরও দুটি লেখা: "ধর্ম এবং আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম" এবং "সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও তার প্রতিকার"।

শেষোক্ত প্রবন্ধটি ১৯২৮ সালের জুন মাসে 'কীর্তি' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। প্রবন্ধে ভগৎ সিং লক্ষ্য করেছেন, ১৯২০-২১ সালের অসহযোগ আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়ার পর একের পর এক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনা ঘটছে। তাঁর লেখার অব্যবহিত আগের ঘটনা হল কোহাট শহরের ভয়াবহ দাঙ্গা। তিনি লক্ষ্য করেছেন, বর্ণনায় প্রাধান্য পাচ্ছে মুসলমান নৃশংসতা হিন্দুদের ওপর বা শিখদের ওপর, কিংবা মুসলমানের ওপর অন্যদের অত্যাচার। কিন্তু মূল কারণটা সকলেই বাদ দিয়ে যায়। মূল কারণ অর্থনৈতিক। দারিদ্র এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে চার আনা পয়সার জন্যেও অন্যায় কাজে নাম্বার জন্য বহু মানুষ, কী হিন্দু কী শিখ কী মুসলমান প্রস্তুত। এরই সুযোগ পুঁজিবাদীরা নেয়, যাতে সব গরিব মানুষের আন্দোলনের লক্ষ্যবস্তু তারা না হয়। ভগৎ সিং লিখছেন, "দাঙ্গা সর্বদাই হতাশাজনক খবরে ভর্তি, কিন্তু কলকাতার দাঙ্গায় একটা ভালো জিনিসও ঘটেছিল। শ্রমিকরা দাঙ্গায় অংশ নেয়নি, এমনকি ট্রেড ইউনিয়নগুলি চেষ্টা করেছিল মারমুখো জনতাকে শান্ত করতে। এই সব লোক শ্রেণিসচেতন হয়ে উঠেছিল এবং নিজেদের শ্রেণিস্বার্থ খুঁজতে শিখেছিল। শ্রেণিচেতনাই প্রধান হাতিয়ার যা সহায় হতে পারে দাঙ্গা রুখতে।" উপসংহারে বলছেন, "ধর্মকে যদি রাজনীতি থেকে পৃথক করা যায়, তাহলে আমরা সকলে যৌথভাবে সামিল হতে পারি রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায়, ধর্মীয় বিষয়ে যতই তফাত থাকুক না কেন। আমরা অনুভব করছি যে ভারতের প্রকৃত হিতৈষীরা এই নীতিগুলো অনুসরণ করে ভারতকে বাঁচাবেন সেই আত্মহননের পথ থেকে যে পথে আজ সে চলছে।" এর প্রত্যেকটি কথা আজকের ভারতেও প্রযোজ্য। ধর্ম আর রাজনীতির পৃথকীকরণ, যা ধর্মনিরপেক্ষতার সংজ্ঞার্থ, আজকের ভারতে যতটা প্রয়োজন, ততখানি স্বাধীনতার পরে আর কখনও ছিল না।

একই মাসে (জুন ১৯২৮) প্রকাশিত হয়েছিল "অস্পৃশ্যতার সমস্যা"। সেখানেও তথাকথিত অস্পৃশ্যদের আহ্বান করা হয়েছিল নিজের শ্রেণিসত্তাকে উপলব্ধি করে শ্রেণিসংগ্রামে অংশ নিতে। তাদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, "তোমরাই আসল শ্রমিক শ্রেণি।" ঠিক পরের লাইনে উদ্ধৃত করেছিলেন মার্কস-এঙ্গেলসের অমর পঙক্তি: "দুনিয়ার মজদুর এক হও, শৃঙ্খল ছাড়া আর কিছু তোমাদের হারাবার নেই।" ভগৎ সিং তার সঙ্গে যোগ করেছিলেন, "সামাজিক আন্দোলন থেকে বিপ্লব শুরু করো।" আজকের জাতপাতের উৎপাতে ক্লিষ্ট ভারতে প্রত্যেকটি কথা গুরুত্বপূর্ণ।

ভগৎ সিং আজও যুগোপযোগী। 


Tuesday, 9 February 2021

CAA ও ভারতীয় নাগরিক - গৌতম রায়

রাজীব-মোহন্ত চুক্তির ভিতর দিয়ে আসামের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা হিসেবে নাগরিকত্ব আইনের ৬-এ ধারা তৈরির যে পথ খুলে দেওয়া হয়েছিল, সেটিকেই পরবর্তীকালে কেন্দ্রে এন ডি এ নামক নীতিবিহীন, সুবিধাবাদী জোট সরকারের প্রধান শরিক হিসেবে বিজেপি-র নেতৃত্বাধীন অটলবিহারী সরকারের ২০০৩ সালের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের ১৪-এ ধারা সংযোজনের সুযোগ করে দেয়।

**********************************************************

সাধারণ মানুষ যাতে খাদ্যের দাবিতে সোচ্চার না হয়, শিক্ষার দাবিতে সোচ্চার না হয়, বেকারত্ব নিরসনের দাবি না তোলে, স্বাস্থ্যের অধিকারের দাবি না তোলে, নারীর ক্ষমতায়নের দাবি না তোলে, সংখ্যালঘুর অধিকার ব্রিটিশের হাত থেকে ক্ষমতা হস্তান্তরের কালের চুক্তি অনুযায়ী, সংখ্যালঘুর অধিকারের কথা না তোলে, আদিবাসী, দলিত-তফসিলি জাতি, উপজাতিভুক্ত মানুষ, যাতে তাঁদের অধিকার, কর্মসংস্থান - ইত্যাদির প্রশ্ন না তোলে, একের পর এক রাষ্ট্রায়ত্ত্ব কোম্পানি, কেন্দ্রের শাসক দল বিজেপি ঘনিষ্ঠ শিল্পপতিদের কাছে বেচে দেওয়া নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে কোনো প্রশ্ন যাতে তৈরি না হতে পারে, নতুন কোনো শিল্পের সম্ভাবনা কেন ভারতবর্ষে তৈরি করতে দেশের সরকার যত্নবান নয় - এই প্রশ্ন যাতে মানুষ না করেন - সেই জন্যই কেন্দ্রের শাসক দল বিজেপি এন আর সি-র জুজু সাধারণ মানুষকে দেখিয়ে চলেছেন।

**********************************************************

পোশাক, বেশভূষা, সাজসজ্জার উপর নির্ভর করে যিনি মানুষের ধর্ম নিরূপণ করতে চান, সেই দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভারতবর্ষের সংস্কৃতি, সভ্যতা সম্পর্কে কতখানি অজ্ঞ - তা ভাবলে সত্যিই আশ্চর্য হয়ে যেতে হয়। পবিত্র ইসলামীয় সংস্কৃতি ভারতবর্ষের রীতিনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার আগে পর্যন্ত ভারতীয় সভ্যতা সংস্কৃতিতে সেলাই করে পড়া কাপড়ের কোন প্রচলন ছিল না। দর্জির দ্বারা জামাকাপড় নির্মাণের ধারণাই পবিত্র ইসলামের ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার পর ভারতবর্ষের মানুষ জেনেছেন। তার আগে এদেশের মানুষ কখনো সেলাই করা কাপড় পরতেন না। যে ব্রাহ্মণ্যবাদী - জাতপাতভিত্তিক - বর্ণভিত্তিক সংস্কৃতিকে ভারতবর্ষের ধ্যানজ্ঞান হিসেবে বিকৃতরূপে দেখিয়ে, রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে চায় হিন্দু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী, সন্ত্রাসী শক্তি, সেই প্রাচীন ভারতীয় ধ্যানধারণায় স্টিচ করা কোনো জামাকাপড় পরবার কোন প্রচলনই ছিল না।

**********************************************************

ধর্মবিশ্বাসে ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায় ব্রাহ্ম ছিলেন। প্রফুল্লচন্দ্র সেন হিন্দু ধর্মের প্রচলিত রীতিনীতির প্রতি ছিলেন আস্থাবান। কার্যত প্রফুল্লচন্দ্র সেনের ব্যক্তিগত উদ্যোগে জয়রামবাটিতে শ্রীশ্রী মা সারদা দেবীর জন্মস্থানকে তাঁর পরিবারের লোকজনের নানা আপত্তিকে অতিক্রম করে সম্পূর্ণভাবে রামকৃষ্ণ মিশনের আওতায় আনা সম্ভবপর হয়েছে।

জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের মত মানুষ, তাঁরা ব্যক্তিজীবনে ছিলেন নাস্তিক। তা সত্ত্বেও তাঁরা একটি বারের জন্যেও অপরের ধর্মাচরণ ঘিরে কখনো কোনোরকম বাধা সৃষ্টি করেননি। জ্যোতি বাবু তাঁর ব্যক্তিজীবনে কখনো ধর্মচর্চার ধারপাশ দিয়ে না হাঁটলেও, ইন্দিরা গান্ধীর নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর শিখবিরোধী দাঙ্গা প্রশমনে শিখ সম্প্রদায়ের মানুষদের সব ধরনের নিরাপত্তা প্রদানের উদ্দেশ্যে যখন গুরুদ্বারে গিয়েছেন, তখন শিখ ধর্মের প্রচলিত রীতিনীতিকে মান্যতা দিয়ে মাথায় উষ্ণীষ পড়েই গুরুর দ্বারে প্রবেশ করেছেন।

জ্যোতিবাবুর ব্যক্তিজীবন চর্চাতে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের এতটুকু গুরুত্ব না থাকলেও, শিখ সম্প্রদায়ের মানুষকে বাঁচানোর স্বার্থে, প্রবল বাস্তব জ্ঞানসম্পন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব জ্যোতি বসু যেমন কোনরকম জেদাজেদির মধ্যে যাননি, তেমনই এই বিষয়টিকে তাঁর রাজনৈতিক প্রচারের একটু মাধ্যম হিসেবে একটি বারের জন্যও তুলে ধরেননি।

**********************************************************

 ... তথাকথিত বিশেষজ্ঞরা এটাই বলবার চেষ্টা করছিলেন যে, কেরলে যেহেতু বামপন্থীদের প্রধান শত্রু হচ্ছে কংগ্রেস, তাই কেরলের প্রেক্ষিতকে সামনে রেখে, কোনো অবস্থাতে পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্টভুক্ত দলগুলি কেরালাতে দলের সঙ্গে শত্রুতার সম্পর্ক যে রাজনৈতিক দলের, সেই দলের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের সংগ্রামের ক্ষেত্রে কোনো বোঝাপড়া বা গণআন্দোলনের ক্ষেত্রে কোন বোঝাপড়া করে উঠতে পারেন না।

এই অভিমতটি সম্পূর্ণভাবেই একাংশের তথাকথিত বিশেষজ্ঞদের একান্ত নিজস্ব অভিমত। তা নিয়ে নতুন করে বলবার কোন প্রয়োজন নেই। কারণ গোটা বিষয়টি নিয়ে আলাপ আলোচনার যে নির্যাস বামপন্থী দলগুলোর পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে প্রকাশিত হয়েছে, তাতে কোনো অবস্থাতেই এই তথাকথিত বিশেষজ্ঞদের অভিমতকে সিলমোহর দেওয়া হয়নি।

তবুও রাজনৈতিক বাস্তবতার নিরিখে, কেরলে ক্ষমতাসীন বামপন্থীদের সঙ্গে বিরোধী কংগ্রেসের রাজনৈতিক লড়াইয়ের প্রেক্ষিতে, জাতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে, কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের আনা এন আর সি, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বা তারও আগের প্রেক্ষিতে - সংবিধানের ৩৭০ নম্বর ধারা ও ৩৫এর এ ধারার অবলুপ্তি, ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদের জমি সংক্রান্ত মামলায় সুপ্রিম কোর্টের রায়দানের পর যে পরিবেশ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তার প্রেক্ষিতে, গোটা দেশকে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের হাত থেকে রক্ষা করতে, সংখ্যালঘু মুসলমান সম্প্রদায়কে সামাজিক-অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক-ধর্মীয় নিরাপত্তা দেওয়ার স্বার্থে, সমস্ত রকমের রাজনৈতিক বিরোধকে পাশে রেখে, একযোগে কেন্দ্রের ভারতবর্ষের মানুষকে ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজিত করে, ভারতবর্ষকে রাজনৈতিক হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করবার এই ভয়ঙ্কর চক্রান্তের বিরুদ্ধে, একযোগে আন্দোলন সাম্প্রতিক ভারতের গণআন্দোলনের ইতিহাসের ক্ষেত্রে এক নয়া দিগন্ত উন্মোচিত করেছে।

কেরালাতে সেখানকার শাসক ও বিরোধী দলের কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের এই সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বিরুদ্ধে একযোগে লড়াইকে কেন্দ্র করে কেউ কেউ এই প্রশ্নের অবতারণা করছেন যে, পরস্পর বিরোধী দুটি রাজনৈতিক দল যদি কেরালায় কেন্দ্রের বিরুদ্ধে একত্রে লড়াই করতে পারে, তাহলে কেন, পশ্চিমবঙ্গে, এখানকার শাসক তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিরোধী বামপন্থীরা একযোগে লড়াই করতে পারবে না?

বস্তুত এই তত্ত্বটি অনেকদিন ধরে সংকীর্ণতাবাদী রাজনীতিক, যারা বামফ্রন্ট সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ক্ষমতাসীন করবার জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে ভূমিকা নিয়েছিল, তারা বাতাসে ভাসিয়ে দিতে শুরু করেছিল। সাম্প্রদায়িক বিজেপিকে রুখতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বামপন্থীদের একযোগে আন্দোলনে নামা উচিত - এমন আজগুবি তত্ত্ব তারা অনেকদিন ধরে নানা পত্র-পত্রিকায় সন্দর্ভের ভিতর দিয়ে, সামাজিক গণমাধ্যমের ভিতর দিয়ে, সাধারণ আলাপচারিতার মধ্যে দিয়ে তুলে আনবার চেষ্টা করছিল।

এই প্রশ্নের প্রথম এবং প্রধান উত্তর হলো এই যে, অর্থনৈতিক প্রশ্ন এবং শ্রেণি অবস্থানের প্রশ্নে কংগ্রেস দলের সম্পর্কে যথেষ্ট প্রশ্ন এবং সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও একথা অত্যন্ত জোর দিয়ে বলতে হয় যে, কংগ্রেস দল নীতিগতভাবে কোনো অবস্থাতেই সাম্প্রদায়িক নয়। আজ পর্যন্ত কি কেন্দ্রে কি কোনো রাজ্যে সরকার গঠনের উদ্দেশ্যে কংগ্রেস দল বামপন্থীদের মতোই, কোনো সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী দলের সঙ্গে আঁতাত করে সরকারে থাকেনি।

অপরপক্ষে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা তাঁর তৃণমূল কংগ্রেস প্রকাশ্যে নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ বলে দাবি করলেও, নয়ের দশকের শেষভাগ থেকে তারা বিজেপির জোটসঙ্গী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে। পরবর্তীকালে অটলবিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বাধীন এন ডি এ নামক নীতিহীন সুবিধাবাদী জোটের শরিক হয়ে একটানা সাড়ে ছয় বছর কেন্দ্রে ক্ষমতার মৌতাত উপভোগ করেছে। এই সময়কালে সর্বনাশা অর্থনৈতিক নানা ধরনের সিদ্ধান্তের পাশাপাশি গোটা দেশজুড়ে বিজেপি এবং তার সঙ্গীসাথীরা ও তাদের মূল মস্তিস্ক আর এস এস যে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক আগ্রাসন চালিয়েছে, সে সম্পর্কে কিন্তু কেন্দ্রে মন্ত্রী থাকাকালীন বা তারপরেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একটি প্রতিবাদসূচক শব্দ আজ পর্যন্ত ব্যবহার করেননি।

এমনকি গুজরাত গণহত্যা যখন সংগঠিত হয় নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে, সেই সময়কালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শরিক থেকেছেন এন ডি এ-র। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা থেকে দেখেছেন সব কিছু। কিন্তু একটিবারের জন্য সেই গণহত্যার এতটুকুও প্রতিবাদ তাঁর কণ্ঠ থেকে উচ্চারিত হয়নি। শুধু তাই নয়, গুজরাট গণহত্যায় হাজার হাজার সংখ্যালঘু মুসলমানের রক্তে হাত লাল করে নরেন্দ্র মোদি যখন বিধানসভা নির্বাচনে আবার জিতে আসেন, তখন এই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই নরেন্দ্র মোদিকে আজকের বিজেপি নেতা মুকুল রায়ের মাধ্যমে ফুল পাঠিয়ে শুভেচ্ছা পর্যন্ত জানিয়েছিলেন।

অস্ট্রেলিয়ার মিশনারী ফাদার গ্রাহাম স্টুয়ার্ট স্টেইন্সকে দুই শিশুপুত্র সহ জিপে আগুন লাগিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে আর এস এসের সহযোগী বজরং দল। গোটা উড়িষ্যা জুড়ে সংখ্যালঘু খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষদের উপরে নানা ধরনের অত্যাচার চালায় আর এস এস ও তার সহযোগী সংগঠনগুলো। বাজপেয়ী জমানাতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় অবস্থান করে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিন্তু একটিবারও সেইসব অপকর্মের কোনরকম বিরোধিতা করেননি।

রাজনৈতিক হিন্দুরাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে বাজপেয়ী সরকারের আমলে যেভাবে এন সি আর টি থেকে শুরু করে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইতিহাস পাঠক্রমকে রাজনৈতিক হিন্দু সাম্প্রদায়িক অভিধারায় বিকৃত করা শুরু হয়েছিল, সে সম্পর্কে কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একটিবারের জন্য কোনো রকম প্রতিবাদ করেননি। পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থীদের ক্ষমতাচ্যুত করতে সেই সময় এ রাজ্যের বুকে বিজেপি এবং তাদের মূল মস্তিস্ক আর এস এসের বিভিন্ন ধরনের তথাকথিত সামাজিক সংগঠনগুলির শ্রীবৃদ্ধিতে সবরকমভাবে সাহায্য করেছিলেন।

বস্তুত পশ্চিমবঙ্গের বুকে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর হিন্দু সাম্প্রদায়িক, রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপিকে সংসদীয় গণতন্ত্রের নিরিখে এবং সামাজিক অবস্থানের নিরিখে পায়ের নিচে জমি করে দেওয়ার ক্ষেত্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের যে ন্যক্কারজনক ভূমিকা, তার প্রেক্ষিতে সেই ব্যক্তির বিজেপি বিরুদ্ধতার মধ্যে আদৌ সততা আছে কিনা - এই প্রশ্নটি প্রথম তোলা দরকার।

Monday, 18 January 2021

আসামে নাগরিকপঞ্জির সাতকাহন - দেবর্ষি দাস

উপনিবেশি আসামে শ্রমজীবীদের প্রব্রজন অনবরত হয়ে চলেছে। মোটের ওপর তিনটে ভাগে ফেলা যায়।

১। সরকার চালানোর জন্য চাই অফিসের বড়বাবু, মেজবাবু, ছোটবাবু, কেরানি, পিওন, আর্দালিদের দঙ্গল। বৃটিশ ফৌজের সাথে আছে নানা স্তরের কলমচি, ছোট সরকারি চাকুরে। বিচারব্যবস্থার সাথে যুক্ত পেশাদারেরা - বিচারক, উকিল, মোক্তার, কেরানি। আছে রসদ যোগানদারেরা, মানে সাপ্লায়ার ও ব্যবসায়ীরা। কলমচি ও ব্যবসায়ীর দল বৃটিশদের পেছন পেছন ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার বসতি পত্তন করে। এর মধ্যে বাঙালি, মারোয়াড়ি বা অন্য ভাষাভাষিরা পড়বেন। বাঙালি বলতে হিন্দু বাঙালি। ইংরেজদের চালু করা শিক্ষা বাকিদের তুলনায় হিন্দু বাঙালিদের মধ্যে বেশি ছড়িয়েছিল। রাজস্বের খাতিরে ১৮৭৪ সালে সিলেট জেলাকে পূর্ববঙ্গ থেকে কেটে আসামের সাথে জুড়ে দেওয়া হয়। লেখাপড়া জানা হিন্দু বাঙালির ঠাটবাট বাড়ে। 

২। দুই নম্বর প্রব্রজন শুরু হয় চা বাগানগুলো ফুলেফেঁপে ওঠার পর। ১৮৩০-এর দশকে প্রথম চা বাগান পত্তন হয়। প্রথম দিকে চা শ্রমিকদের চীন থেকে আনা হত। চা চাষ, চা পাতা থেকে পানীয়যোগ্য চা তৈরি করার কৌশল চীনারাই জানত সে যুগে। উৎপাদন বাড়ার সাথে সাথে শ্রমিকের প্রয়োজন বাড়ে, স্থানীয় শ্রমিকদের নিয়োগ চালু হয়। বোড়ো কসারি জনজাতিদের দিয়ে কাজ করানো হত। কিন্তু বাগান মালিকেরা অচিরেই ফাঁপরে পড়লেন। জনজাতি মানুষেরা স্থায়ী বসবাসে অভ্যস্ত হননি, তাঁদের এক জায়গায় বেশিদিন থাকার অভ্যাস নেই। তার ওপরে জনজাতি মানুষদের জনসংখ্যা অপ্রতুল। বিকল্পের সন্ধান চলল। অবশেষে শ্রমিক আমদানি করা শুরু হল। ১৮৫০-এর দশক থেকে ভিন রাজ্য থেকে ব্যাপক মাত্রায় চুক্তি শ্রমিক আমদানি আরম্ভ হল। ভারত ভূখন্ডের সবচেয়ে গরিব অঞ্চলগুলো থেকে আড়কাঠি লাগিয়ে, ঠকিয়ে, লোভ দেখিয়ে, আগাম ধার দিয়ে, চা-শ্রমিকদের আনা হত। ছোটনাগপুর মালভূমি অঞ্চল থেকে সাঁওতাল, ওঁরাও, গোন্ডদের স্রোত বিশ শতক পর্যন্ত চলেছে।

"চল মিনি আসাম যাব, দেসে বড় দুখ রে..."

কাজের লোভে, রোজগারপাতির প্রতিশ্রুতিতে বহু মিনি-র দরিদ্র প্রেমিক অচেনা 'আসাম দেসের' দিকে পা বাড়িয়েছিল। তারপর কী হল গানে নেই। আছে অন্য এক বাগানিয়া গানে। ১৯৭০-এর দশকে বেরোনো 'চামেলি মেমসাহেব' সিনেমা দেখেছেন? অসমিয়া ও বাংলা দুই ভাষাতে 'চামেলি মেমসাব' বা 'চামেলি মেমসাহেব' বেরিয়েছিল। লোকগানের সুরে ভূপেন হাজরিকা সাজিয়েছিলেন মজদুর চামেলির সাথে বাগানের সাহেবের অসম ভালবাসার গল্প।

"সর্দার বলে কাম কাম 

বাবু বলে ধরি আন

সাহেব বলে লিব পিঠের চাম 

... ফাঁকি দিয়া আনিল আসাম।"

সর্দার জনজাতি। সাহেব, মানে বাগানের মালিক বা ম্যানেজার, গোরা ইউরোপীয়। আর বাবুরা প্রায়ই বাঙালি বা অসমিয়া ভদ্রলোক হত। শোষণের তিন পরতের চাপ একদম নিচের মহলের চা মজদুরেরা পিঠে সইত আর বইত।

অজানা দেশে জঞ্জল কেটে চা বাগানের পত্তন করে, ম্যালেরিয়া কালাজ্বরের সাথে পাঞ্জা লড়ে, মালিকের চাবুক খেয়ে দিন গুজরান সহজ নয়। অনেক শ্রমিক পালিয়ে যেত। বলা ভাল পালানোর চেষ্টা করত, কেননা বিদেশ বিভুঁইয়ে পালিয়ে বেশিদূর যাওয়া শক্ত। ধরা পড়লে কপালে জুটত কড়া সাজা। দ্বিতীয় স্রোতের অভিবাসীদের নাম হালে দেওয়া হয়েছে চা-জনজাতি গোষ্ঠী।

৩। ওপরের দুই ধরণের প্রব্রজনের ঠেলায় ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার জনবিন্যাস বদলে যায়। ১৮৯১ সালের জনগণনাতে দেখা যাচ্ছে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার চারজনের মধ্যে একজন বহিরাগত। তাদের পূর্বপুরুষ বা তারা বাইরে থেকে এসেছে। প্রব্রজনের তিন নম্বর ঢেউ পূর্ববঙ্গ থেকে আসে। চা শ্রমিকদের আনা হয়েছিল চা কোম্পানির মুনাফার স্বার্থে, পূর্ববঙ্গের চাষি প্রব্রজনের পেছনে ছিল সরকারের কর তোলার খাঁই।

প্রথমত, আসামে জমির অভাব ছিল না। অভাব ছিল মানুষের, যারা জমিকে চাষের আওতায় এনে সরকারকে খাজনা দেবে। 'ওয়েস্টল্যান্ড' বা অনাবাদি জমি নিয়ে সরকারের দুশ্চিন্তা প্রথম থেকেই ছিল। জমি এমনি খালি পড়ে আছে, বসতি নেই, সরকারকে খাজনা দেওয়ার লোক নেই, এই ঘটনাটাই বরদাস্ত করা যাচ্ছিল না।

দ্বিতীয়ত, জমির জন্য চাহিদা ছিল। বিশ শতকের শুরুতে বাংলায় দুটো ঘটনা ঘটে যা জমির চাহিদা বাড়িয়ে দেয়। (ক) কলকাতার আশেপাশে চটকল গড়ে ওঠে। আগে বাংলা থেকে, বিশেষত পূর্ববাংলা থেকে, কাঁচা পাট রপ্তানি হত সাগরের ওই পারে বৃটেনের চটকলে। উনিশ শতকের শেষ দিকে ভারতের মাটিতেই চটকল তৈরি হতে থাকে। হুগলী নদীর দুই পারে চটকলগুলো গজিয়ে ওঠে। খালি ইউরোপীয় মালিকানায় নয়, দেশীয় পুঁজিপতিরাও, মারোয়াড়িরা, চটকল স্থাপনে অগ্রণী ভূমিকা নেয়। ভারত থেকে পাটসামগ্রীর রপ্তানি বাড়তে থাকে, ফলে আরো চটকল গড়ে ওঠে, কাঁচামালের চাহিদা তাল মিলিয়ে বাড়তে থাকে। (খ) বিশ শতকের শুরুতে পূর্ববঙ্গের পাট উৎপাদনের জমি শেষ হয়ে আসে। পূর্ববঙ্গ এমনিতেই জনবহুল কৃষিপ্রধান অঞ্চল। এই জমি চটকলগুলোর খিদে মেটাচ্ছিল। জমি শেষ হয়ে আসার ফলে উপনিবেশি প্রভুরা নতুন জমির সন্ধান করতে থাকেন।

আসামের নদী অববাহিকার নিচু, পলিমাটি পাটচাষের জন্য উপযুক্ত। তাই দেখা গেল আসামে অনাবাদি জমির যোগান ও তার জন্য চাহিদা দুটোই ছিল। জমিনের সাথে দরকার ছিল মানবের। এই ঘাটতি পূরণের জন্য পূর্ববঙ্গীয় চাষিদের দিয়ে বসতি পত্তন শুরু হয়। প্রব্রজনকারীরা ছিলেন আর্থিক দিক দিয়ে গরিব, পেশায় ভূমিহীন বা প্রান্তিক চাষি, ধর্মে মুসলমান।

পথ দেখান গোয়ালপাড়ার জমিদারেরা। ব্রহ্মপুত্রের চর ও নদের পাশের নিচু অঞ্চলগুলোকে অসমিয়াতে 'চর-চাপরি' বলে। সাধারণত কেউ সেখানে বসবাস করত না। পূর্ববঙ্গের চাষিদের দিয়ে জমি আবাদ করানোয় গোয়ালপাড়ার জমিদারেরা উৎসাহ দিচ্ছিলেন। বৃটিশ সরকারের আগ্রহে প্রব্রজনের স্রোত উপত্যকার পশ্চিম দিক থেকে পূর্ব দিকে এগোতে থাকে। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ হয়, পূর্ববঙ্গকে কেটে আসামের সাথে জুড়ে দেওয়া হয়। ফলে পূর্ববঙ্গ থেকে প্রব্রজনের ঢেউ আরো জোরদার হয়ে ওঠে। ১৯৩০-৪০-এ একাধিক মুসলিম লীগ সরকার আসামে চলার সময়ে প্রব্রজনের স্রোত বেড়েছিল বলে অনুমান। স্বাধীনতার পর কয়েক দশক ধরে পাকিস্তানে অস্থির রাজনৈতিক অবস্থা চলছিল। অর্থনীতির হালও বলার মত নয়। দরিদ্র শ্রমজীবীদের প্রব্রজন দেশভাগের পরও চলতে থাকে। প্রব্রজনকারীদের প্রধানভাগ মুসলমান, ফলে আসামের জনসংখ্যায় মুসলমান ভাগ বাড়তে থাকে। ১৮৭৪ সালে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার মাত্র ৫.৯% জনসংখ্যা মুসলমান ছিল। ১৯৪১ সালে বেড়ে হয় ২৩%। ২০১১ সালের জনগণনা বলছে আসামের জনসংখ্যার ৩৪% মুসলমান।

১৯০১ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত ফি দশকে আসামের জনসংখ্যার গতি ভারতের থেকে বেশি। শুধু বেশি না, অনেকটাই বেশি। আন্দাজ করা যায়, আসামে ওই সাত দশক জুড়ে প্রব্রজন হয়ে চলেছে। ১৯৭১-এর পর অবশ্য দেখা যায় আসামের জনসংখ্যার গতি কমে গেছে, ভারতের থেকে ঢিমে তালে বেড়েছে।

এখানে দু'টো কথা মনে রাখা ভাল। এক, প্রব্রজন শুধু পূর্ববঙ্গ ও পূর্ব পাকিস্তান থেকে হয়েছে এমন নয়। ভারতের অন্য রাজ্য থেকে প্রব্রজন হলেও আসামের জনসংখ্যা ভারতের থেকে বেশি হারে বাড়বে। দুই, পূর্ববঙ্গ বা পূর্ব পাকিস্তান থেকে যত প্রব্রজন হয়েছে, তার পুরোটা মুসলমান নয়। দেশভাগের সময় হিন্দু উদ্বাস্তুদের স্রোত আসামে এসেছে। দেশভাগের পরে পূর্ব পাকিস্তানে হিন্দুদের ওপর অত্যাচারের ফলে দফায় দফায় মানুষের ঢেউ এপারে এসেছে। পাকিস্তানের গৃহযুদ্ধের সময়ে প্রায় এক কোটি উদ্বাস্তু ভারতে আশ্রয় নেন। ভারতের পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমে পড়ার কাগজেকলমে কারণ উদ্বাস্তু প্রবেশ। বাংলাদেশের জন্মের পর সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার থেমে যায়নি। 'শত্রু সম্পত্তি' বাজেয়াপ্ত করার আইন বাংলাদেশে আছে। হিন্দুদের সম্পত্তি কতখানি সুরক্ষিত তার ওপর প্রশ্নচিহ্ন আছে। সাথে আছে ছুটকো-ছাটকা দাঙ্গা। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের দাঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। সীমানা পেরোনোর সময় দাঙ্গার চরিত্র মুসলমান-বিরোধী থেকে বদলে হিন্দু-বিরোধী হয়ে যায়।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, এক, সাহেবরা আসার আগে আসাম (বিশেষ করে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা) মূল ভূখন্ডের থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন ছিল। আহোম রাজারা বিদেশি মানুষ ও পণ্যের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন। দুই, উপনিবেশি শাসনের সাথে প্রব্রজনের সম্পর্ক রয়েছে। তিন, বিভিন্ন সময়ে নানা কারণে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অভিবাসী মানুষ আসামে এসেছেন। এই স্রোত বহুদিন ধরে চলছে।

======================================================

ভূমিপুত্ররক্ষার রাজনীতিকে আসাম আন্দোলন প্রতিষ্ঠা করেছিল। এই রাজনীতিই কালে কালে বেড়ে অসমিয়া জাতীয়তাবাদকে দুর্বল করে দিয়েছে। এটা দুই ভাবে হয়েছে। একটা নিচ থেকে। বোড়ো, কার্বি ও অন্য জনজাতিগোষ্ঠীরা অসমিয়া জাতীয়তাবাদের আধিপত্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। জনজাতিরা নিজেদের আলাদা স্বায়ত্বশাসিত অঞ্চল চালাচ্ছে। অন্য রাজ্যের দাবি উঠেছে। দ্বিতীয়টা ওপর থেকে। গত তিরিশ বছরে ভারতীয় রাজনীতিতে ভারতীয় জনতা পার্টি উঠে এসেছে। তিরিশ বছর আগে কে ভাবতে পেরেছিল অগপ বিজেপি-র ছোট শরিক হয়ে আসামে সরকার চালাবে? হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিও এক ধরণের ভূমিপুত্র রাজনীতি। তবে এরা অসমিয়া জাতীয়তাবাদের থেকে অনেক বড় মাঠে খেলাধুলো করে। সর্বভারতীয় বিজেপি-র পেছনে তাবৎ বড় পুঁজির মালিকরা আছেন। সংঘের রাজনীতির উচ্চাকাঙ্খা অসমিয়া জাতীয়তাবাদীদের তুলনায় অনেক বেশি এবং সহিষ্ণুতা কম।

কিন্তু আসাম চুক্তির কী হল? কতজনকে শনাক্ত বা বহিষ্কার করা হল? ২০১২ সালের হিসেব বলছে ২,৪৪২ জন মানুষকে বহিষ্কার করা হয়েছে, আর ৫৪,০০০ মানুষকে বাংলাদেশি হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। অথচ কথা তো হচ্ছিল ৪০ লক্ষ বিদেশির। আসলে বিদেশি ক'জন আছেন আসামে? এই নিয়ে ভাল গবেষণা নেই। লোকে ৪০ লক্ষ, ৫০ লক্ষ যা হোক একটা বলে দিচ্ছে। গত ১০০ বছরের জনসংখ্যা দেখলে বোঝা যায় ১৯৭১ সালের আগে পর্যন্ত আসামের জনসংখ্যা ভারতের থেকে বেশি হারে বেড়েছে। এর জন্য সম্ভবত পূর্ববঙ্গ থেকে, পূর্ব পাকিস্তান থেকে প্রব্রজন দায়ী। ১৯৭১-এর পরে ছবিটা পাল্টে যায়। দেখা যাচ্ছে ভারতের থেকে আসামের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কম। প্রব্রজনের স্রোত একেবারে গায়েব না হলেও নগণ্য হয়েছে অনুমান করা ভুল হবে না।

তাতে অবশ্য রাজনীতির ব্যাপারীদের কিছু এসে যায় না। "কম লোককে বিদেশি শনাক্ত করা হল, এটা কি আসাম চুক্তির বিফলতা নয়? ৮৫৫ শহিদের বলিদান কি জলে যাবে?" জাতীয়তাবাদীরা এই বলে মানুষকে তাতাচ্ছে। তবে জাতীয়তাবাদীদের আজকে অত ক্ষমতা নেই যে ফের রাজ্যজুড়ে আন্দোলন তৈরি করবে। তারা আইনি পথে ঝুঁকে পড়েছে। নাগরিকপঞ্জি এক মরিয়া চেষ্টা। বিদেশিদের বহিষ্কারের দাবি জানিয়ে সুপ্রীম কোর্টে মামলা হয়েছে। কোর্ট ২০১৪ সালে এনআরসি বা নাগরিকপঞ্জি নবীকরণের নির্দেশ দিয়েছে। গোটা রাজ্যের বাসিন্দাদের বৈধ নাগরিক হওয়ার প্রমাণ দিতে হবে। বংশবৃক্ষ দাখিল করে ১৯৫১ সালের নাগরিকপঞ্জিতে অন্তর্ভুক্ত লোকেদের সাথে বা ১৯৭১ সালের আগের ভোটার লিস্টের লোকেদের সাথে নিজের রক্তসম্পর্ক প্রমাণ করতে হবে।

কথা হল, রাজ্যে অবৈধ বিদেশি থাকলে প্রশাসন-পুলিশ-বিচার ব্যবস্থা তাদের ধরুক। নির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে মামলা করুক। সরকারের অপদার্থতার বোঝা সাধারণ মানুষের ঘাড়ে চাপানো হচ্ছে কেন? এরকম প্রশ্ন অনেকের মনেই উঠছে। এ যেন মাছ ধরার জন্য গোটা পুকুরের জল ছেঁচে ফেলার মত হঠকারিতা। রাজ্যে ক'জন বিদেশি বসবাসকারী আছেন তার কোনও বিশ্বাসযোগ্য হিসেব নেই। অন্তত এই কাজটা যদি গত ৩০ বছরে পুলিশ, গোয়েন্দা বিভাগের সাহায্যে মনোযোগ দিয়ে করা হত তাহলে বাংলাদেশি খেদানোর রাজনীতির দোকান এতদিনে বন্ধ হয়ে যেত। যেহেতু প্রামাণ্য তথ্য নেই, নেতারা আজব সব কথা বলে লোক খেপাচ্ছেন। আসামের বিজেপি-র এক সাংসদ বলেছেন গোটা দেশে পাঁচ কোটি বাংলাদেশি আছে, যা আদতে বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ! বিজেপি-র নেতারা গোটা দেশে এনআরসি-র দাবি করেছেন।

NRC - শমীক লাহিড়ী

আসামে নাগরিকপঞ্জী প্রকাশিত হওয়ার পর দেখা যাচ্ছে ১৯ লক্ষ মানুষের মধ্যে ১২ লক্ষ মানুষই হিন্দু ধর্মাবলম্বী। সেই রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের সময় বিজেপি প্রচার করেছিল নাগরিকপঞ্জী হলে কোন হিন্দুর নাম বাদ যাবে না। এমনকি এই ধরণের ঘৃণ্য-বিভেদকামী-জঘন্য প্রচার করেছিল, নাগরিকপঞ্জী তৈরী করে সব মুসলমানকে তাড়ানো হবে এবং সেই মুসলমানদের সম্পত্তি হিন্দুরা দখল করতে পারবে। দুঃখের হলেও এক বিরাট অংশের হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষ প্রলুব্ধ হয়ে বিজেপিকে ভোট দিয়েছিল এবং এর ফলে বিজেপি সরকার গঠন করতে পেরেছিল। কিন্তু নাগরিকপঞ্জীর ফল প্রকাশের পর উল্টো চিত্রই দেখা যাচ্ছে। এখন নিজেদের পিঠ বাঁচানোর জন্য বিজেপি দুটো প্রচার করা শুরু করেছে। (১) সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে নাগরিকপঞ্জী  হচ্ছে, এক্ষেত্রে বিজেপির কোন হাত নেই। (২) ২০১৬ সালের নাগরিকত্ব আইন সংশোধনী বিল (CAB) পাশ করিয়ে হিন্দুদের এদেশে শরণার্থী হিসাবে রেখে দেওয়া হবে, তাই হিন্দুদের দেশ ছাড়া হওয়ার কোন ভয় নেই।

এই দুটি কথাই সর্বৈব অসত্য। প্রথমত - বর্তমানে আসাম বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল সুপ্রিম কোর্টে একটি মামলা করেন এবং তাঁর আবেদনের ভিত্তিতেই সুপ্রিম কোর্ট ২০০৫ সালের ১২ই জুলাই IMDT (Illegal Migrants Determination by Tribunal Act.) আইনের সেই ধারাটি বাতিল বলে ঘোষণা করে, যে আইনে কারোর বিরুদ্ধে বিদেশী অভিযোগ আনলে অভিযোগকারীকে প্রমাণ করতে হবে অভিযোগের সত্যতা। সুপ্রিম কোর্টের এই নির্দেশে এখন যার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাকেই প্রমাণ করতে হবে যে অভিযোগ অসত্য। মানুষকে বিপদে ফেলার কাজ কে শুরু করেছিল এর থেকেই বোঝা যাচ্ছে।

দ্বিতীয়ত - আসাম চুক্তি অনুযায়ী নাগরিকপঞ্জী তৈরীর কাজ হচ্ছে না এই অভিযোগ জানিয়ে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়। সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্র ও আসাম রাজ্যে সরকারের মতামত জানতে চায়। বিজেপি শাসিত কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য সরকার দুজনেই সম্মতি দেয় দ্রুত নাগরিকপঞ্জী তৈরীর কাজকে শেষ করার পক্ষে। তাদের মতামতের ভিত্তিতেই আসামে এই নাগরিকপঞ্জী গঠনের নির্দেশ দেয় সুপ্রিম কোর্ট। এই সত্য বেমালুম গোপন করার চেষ্টা করছে বিজেপি।

তৃতীয়ত - ২০১৬ সালের নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল যা লোকসভায় পাশ হলেও রাজ্যসভায় পাশ হয়নি সংখ্যাগরিষ্ঠতার অভাবে, সেই আইন পাশ হলেও বিদেশী হিসাবে চিহ্নিত হিন্দুধর্মাবলম্বীরা কেবলমাত্র শরণার্থী রূপেই চিহ্নিত হবেন। ৬ বছর এদেশের থাকার সুযোগ পেলেও কোন সরকারী সুযোগ-সুবিধা, ব্যাঙ্ক একাউন্ট খোলা, রেশনকার্ড, সরকারী ভাতা, সরকারী-বেসরকারী চাকুরী, ভোটার তালিকায় নাম তোলা সহ অনেকগুলি গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক সুবিধার থেকে বঞ্চিত থাকবেন। ৬ বছর বাদে তারা নাগরিক হওয়ার জন্য আবেদন করতে পারেন, কিন্তু নাগরিক হতে পারবেন কিনা এমন নিশ্চয়তা প্রস্তাবিত আইনে দেওয়া নেই। তাই ৬ বছর বসবাস করবার পরে এদের ভবিষ্যত কি, এই প্রশ্নের উত্তর নেই।