Monday, 18 January 2021

আসামে নাগরিকপঞ্জির সাতকাহন - দেবর্ষি দাস

উপনিবেশি আসামে শ্রমজীবীদের প্রব্রজন অনবরত হয়ে চলেছে। মোটের ওপর তিনটে ভাগে ফেলা যায়।

১। সরকার চালানোর জন্য চাই অফিসের বড়বাবু, মেজবাবু, ছোটবাবু, কেরানি, পিওন, আর্দালিদের দঙ্গল। বৃটিশ ফৌজের সাথে আছে নানা স্তরের কলমচি, ছোট সরকারি চাকুরে। বিচারব্যবস্থার সাথে যুক্ত পেশাদারেরা - বিচারক, উকিল, মোক্তার, কেরানি। আছে রসদ যোগানদারেরা, মানে সাপ্লায়ার ও ব্যবসায়ীরা। কলমচি ও ব্যবসায়ীর দল বৃটিশদের পেছন পেছন ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার বসতি পত্তন করে। এর মধ্যে বাঙালি, মারোয়াড়ি বা অন্য ভাষাভাষিরা পড়বেন। বাঙালি বলতে হিন্দু বাঙালি। ইংরেজদের চালু করা শিক্ষা বাকিদের তুলনায় হিন্দু বাঙালিদের মধ্যে বেশি ছড়িয়েছিল। রাজস্বের খাতিরে ১৮৭৪ সালে সিলেট জেলাকে পূর্ববঙ্গ থেকে কেটে আসামের সাথে জুড়ে দেওয়া হয়। লেখাপড়া জানা হিন্দু বাঙালির ঠাটবাট বাড়ে। 

২। দুই নম্বর প্রব্রজন শুরু হয় চা বাগানগুলো ফুলেফেঁপে ওঠার পর। ১৮৩০-এর দশকে প্রথম চা বাগান পত্তন হয়। প্রথম দিকে চা শ্রমিকদের চীন থেকে আনা হত। চা চাষ, চা পাতা থেকে পানীয়যোগ্য চা তৈরি করার কৌশল চীনারাই জানত সে যুগে। উৎপাদন বাড়ার সাথে সাথে শ্রমিকের প্রয়োজন বাড়ে, স্থানীয় শ্রমিকদের নিয়োগ চালু হয়। বোড়ো কসারি জনজাতিদের দিয়ে কাজ করানো হত। কিন্তু বাগান মালিকেরা অচিরেই ফাঁপরে পড়লেন। জনজাতি মানুষেরা স্থায়ী বসবাসে অভ্যস্ত হননি, তাঁদের এক জায়গায় বেশিদিন থাকার অভ্যাস নেই। তার ওপরে জনজাতি মানুষদের জনসংখ্যা অপ্রতুল। বিকল্পের সন্ধান চলল। অবশেষে শ্রমিক আমদানি করা শুরু হল। ১৮৫০-এর দশক থেকে ভিন রাজ্য থেকে ব্যাপক মাত্রায় চুক্তি শ্রমিক আমদানি আরম্ভ হল। ভারত ভূখন্ডের সবচেয়ে গরিব অঞ্চলগুলো থেকে আড়কাঠি লাগিয়ে, ঠকিয়ে, লোভ দেখিয়ে, আগাম ধার দিয়ে, চা-শ্রমিকদের আনা হত। ছোটনাগপুর মালভূমি অঞ্চল থেকে সাঁওতাল, ওঁরাও, গোন্ডদের স্রোত বিশ শতক পর্যন্ত চলেছে।

"চল মিনি আসাম যাব, দেসে বড় দুখ রে..."

কাজের লোভে, রোজগারপাতির প্রতিশ্রুতিতে বহু মিনি-র দরিদ্র প্রেমিক অচেনা 'আসাম দেসের' দিকে পা বাড়িয়েছিল। তারপর কী হল গানে নেই। আছে অন্য এক বাগানিয়া গানে। ১৯৭০-এর দশকে বেরোনো 'চামেলি মেমসাহেব' সিনেমা দেখেছেন? অসমিয়া ও বাংলা দুই ভাষাতে 'চামেলি মেমসাব' বা 'চামেলি মেমসাহেব' বেরিয়েছিল। লোকগানের সুরে ভূপেন হাজরিকা সাজিয়েছিলেন মজদুর চামেলির সাথে বাগানের সাহেবের অসম ভালবাসার গল্প।

"সর্দার বলে কাম কাম 

বাবু বলে ধরি আন

সাহেব বলে লিব পিঠের চাম 

... ফাঁকি দিয়া আনিল আসাম।"

সর্দার জনজাতি। সাহেব, মানে বাগানের মালিক বা ম্যানেজার, গোরা ইউরোপীয়। আর বাবুরা প্রায়ই বাঙালি বা অসমিয়া ভদ্রলোক হত। শোষণের তিন পরতের চাপ একদম নিচের মহলের চা মজদুরেরা পিঠে সইত আর বইত।

অজানা দেশে জঞ্জল কেটে চা বাগানের পত্তন করে, ম্যালেরিয়া কালাজ্বরের সাথে পাঞ্জা লড়ে, মালিকের চাবুক খেয়ে দিন গুজরান সহজ নয়। অনেক শ্রমিক পালিয়ে যেত। বলা ভাল পালানোর চেষ্টা করত, কেননা বিদেশ বিভুঁইয়ে পালিয়ে বেশিদূর যাওয়া শক্ত। ধরা পড়লে কপালে জুটত কড়া সাজা। দ্বিতীয় স্রোতের অভিবাসীদের নাম হালে দেওয়া হয়েছে চা-জনজাতি গোষ্ঠী।

৩। ওপরের দুই ধরণের প্রব্রজনের ঠেলায় ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার জনবিন্যাস বদলে যায়। ১৮৯১ সালের জনগণনাতে দেখা যাচ্ছে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার চারজনের মধ্যে একজন বহিরাগত। তাদের পূর্বপুরুষ বা তারা বাইরে থেকে এসেছে। প্রব্রজনের তিন নম্বর ঢেউ পূর্ববঙ্গ থেকে আসে। চা শ্রমিকদের আনা হয়েছিল চা কোম্পানির মুনাফার স্বার্থে, পূর্ববঙ্গের চাষি প্রব্রজনের পেছনে ছিল সরকারের কর তোলার খাঁই।

প্রথমত, আসামে জমির অভাব ছিল না। অভাব ছিল মানুষের, যারা জমিকে চাষের আওতায় এনে সরকারকে খাজনা দেবে। 'ওয়েস্টল্যান্ড' বা অনাবাদি জমি নিয়ে সরকারের দুশ্চিন্তা প্রথম থেকেই ছিল। জমি এমনি খালি পড়ে আছে, বসতি নেই, সরকারকে খাজনা দেওয়ার লোক নেই, এই ঘটনাটাই বরদাস্ত করা যাচ্ছিল না।

দ্বিতীয়ত, জমির জন্য চাহিদা ছিল। বিশ শতকের শুরুতে বাংলায় দুটো ঘটনা ঘটে যা জমির চাহিদা বাড়িয়ে দেয়। (ক) কলকাতার আশেপাশে চটকল গড়ে ওঠে। আগে বাংলা থেকে, বিশেষত পূর্ববাংলা থেকে, কাঁচা পাট রপ্তানি হত সাগরের ওই পারে বৃটেনের চটকলে। উনিশ শতকের শেষ দিকে ভারতের মাটিতেই চটকল তৈরি হতে থাকে। হুগলী নদীর দুই পারে চটকলগুলো গজিয়ে ওঠে। খালি ইউরোপীয় মালিকানায় নয়, দেশীয় পুঁজিপতিরাও, মারোয়াড়িরা, চটকল স্থাপনে অগ্রণী ভূমিকা নেয়। ভারত থেকে পাটসামগ্রীর রপ্তানি বাড়তে থাকে, ফলে আরো চটকল গড়ে ওঠে, কাঁচামালের চাহিদা তাল মিলিয়ে বাড়তে থাকে। (খ) বিশ শতকের শুরুতে পূর্ববঙ্গের পাট উৎপাদনের জমি শেষ হয়ে আসে। পূর্ববঙ্গ এমনিতেই জনবহুল কৃষিপ্রধান অঞ্চল। এই জমি চটকলগুলোর খিদে মেটাচ্ছিল। জমি শেষ হয়ে আসার ফলে উপনিবেশি প্রভুরা নতুন জমির সন্ধান করতে থাকেন।

আসামের নদী অববাহিকার নিচু, পলিমাটি পাটচাষের জন্য উপযুক্ত। তাই দেখা গেল আসামে অনাবাদি জমির যোগান ও তার জন্য চাহিদা দুটোই ছিল। জমিনের সাথে দরকার ছিল মানবের। এই ঘাটতি পূরণের জন্য পূর্ববঙ্গীয় চাষিদের দিয়ে বসতি পত্তন শুরু হয়। প্রব্রজনকারীরা ছিলেন আর্থিক দিক দিয়ে গরিব, পেশায় ভূমিহীন বা প্রান্তিক চাষি, ধর্মে মুসলমান।

পথ দেখান গোয়ালপাড়ার জমিদারেরা। ব্রহ্মপুত্রের চর ও নদের পাশের নিচু অঞ্চলগুলোকে অসমিয়াতে 'চর-চাপরি' বলে। সাধারণত কেউ সেখানে বসবাস করত না। পূর্ববঙ্গের চাষিদের দিয়ে জমি আবাদ করানোয় গোয়ালপাড়ার জমিদারেরা উৎসাহ দিচ্ছিলেন। বৃটিশ সরকারের আগ্রহে প্রব্রজনের স্রোত উপত্যকার পশ্চিম দিক থেকে পূর্ব দিকে এগোতে থাকে। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ হয়, পূর্ববঙ্গকে কেটে আসামের সাথে জুড়ে দেওয়া হয়। ফলে পূর্ববঙ্গ থেকে প্রব্রজনের ঢেউ আরো জোরদার হয়ে ওঠে। ১৯৩০-৪০-এ একাধিক মুসলিম লীগ সরকার আসামে চলার সময়ে প্রব্রজনের স্রোত বেড়েছিল বলে অনুমান। স্বাধীনতার পর কয়েক দশক ধরে পাকিস্তানে অস্থির রাজনৈতিক অবস্থা চলছিল। অর্থনীতির হালও বলার মত নয়। দরিদ্র শ্রমজীবীদের প্রব্রজন দেশভাগের পরও চলতে থাকে। প্রব্রজনকারীদের প্রধানভাগ মুসলমান, ফলে আসামের জনসংখ্যায় মুসলমান ভাগ বাড়তে থাকে। ১৮৭৪ সালে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার মাত্র ৫.৯% জনসংখ্যা মুসলমান ছিল। ১৯৪১ সালে বেড়ে হয় ২৩%। ২০১১ সালের জনগণনা বলছে আসামের জনসংখ্যার ৩৪% মুসলমান।

১৯০১ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত ফি দশকে আসামের জনসংখ্যার গতি ভারতের থেকে বেশি। শুধু বেশি না, অনেকটাই বেশি। আন্দাজ করা যায়, আসামে ওই সাত দশক জুড়ে প্রব্রজন হয়ে চলেছে। ১৯৭১-এর পর অবশ্য দেখা যায় আসামের জনসংখ্যার গতি কমে গেছে, ভারতের থেকে ঢিমে তালে বেড়েছে।

এখানে দু'টো কথা মনে রাখা ভাল। এক, প্রব্রজন শুধু পূর্ববঙ্গ ও পূর্ব পাকিস্তান থেকে হয়েছে এমন নয়। ভারতের অন্য রাজ্য থেকে প্রব্রজন হলেও আসামের জনসংখ্যা ভারতের থেকে বেশি হারে বাড়বে। দুই, পূর্ববঙ্গ বা পূর্ব পাকিস্তান থেকে যত প্রব্রজন হয়েছে, তার পুরোটা মুসলমান নয়। দেশভাগের সময় হিন্দু উদ্বাস্তুদের স্রোত আসামে এসেছে। দেশভাগের পরে পূর্ব পাকিস্তানে হিন্দুদের ওপর অত্যাচারের ফলে দফায় দফায় মানুষের ঢেউ এপারে এসেছে। পাকিস্তানের গৃহযুদ্ধের সময়ে প্রায় এক কোটি উদ্বাস্তু ভারতে আশ্রয় নেন। ভারতের পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমে পড়ার কাগজেকলমে কারণ উদ্বাস্তু প্রবেশ। বাংলাদেশের জন্মের পর সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার থেমে যায়নি। 'শত্রু সম্পত্তি' বাজেয়াপ্ত করার আইন বাংলাদেশে আছে। হিন্দুদের সম্পত্তি কতখানি সুরক্ষিত তার ওপর প্রশ্নচিহ্ন আছে। সাথে আছে ছুটকো-ছাটকা দাঙ্গা। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের দাঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। সীমানা পেরোনোর সময় দাঙ্গার চরিত্র মুসলমান-বিরোধী থেকে বদলে হিন্দু-বিরোধী হয়ে যায়।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, এক, সাহেবরা আসার আগে আসাম (বিশেষ করে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা) মূল ভূখন্ডের থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন ছিল। আহোম রাজারা বিদেশি মানুষ ও পণ্যের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন। দুই, উপনিবেশি শাসনের সাথে প্রব্রজনের সম্পর্ক রয়েছে। তিন, বিভিন্ন সময়ে নানা কারণে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অভিবাসী মানুষ আসামে এসেছেন। এই স্রোত বহুদিন ধরে চলছে।

======================================================

ভূমিপুত্ররক্ষার রাজনীতিকে আসাম আন্দোলন প্রতিষ্ঠা করেছিল। এই রাজনীতিই কালে কালে বেড়ে অসমিয়া জাতীয়তাবাদকে দুর্বল করে দিয়েছে। এটা দুই ভাবে হয়েছে। একটা নিচ থেকে। বোড়ো, কার্বি ও অন্য জনজাতিগোষ্ঠীরা অসমিয়া জাতীয়তাবাদের আধিপত্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। জনজাতিরা নিজেদের আলাদা স্বায়ত্বশাসিত অঞ্চল চালাচ্ছে। অন্য রাজ্যের দাবি উঠেছে। দ্বিতীয়টা ওপর থেকে। গত তিরিশ বছরে ভারতীয় রাজনীতিতে ভারতীয় জনতা পার্টি উঠে এসেছে। তিরিশ বছর আগে কে ভাবতে পেরেছিল অগপ বিজেপি-র ছোট শরিক হয়ে আসামে সরকার চালাবে? হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিও এক ধরণের ভূমিপুত্র রাজনীতি। তবে এরা অসমিয়া জাতীয়তাবাদের থেকে অনেক বড় মাঠে খেলাধুলো করে। সর্বভারতীয় বিজেপি-র পেছনে তাবৎ বড় পুঁজির মালিকরা আছেন। সংঘের রাজনীতির উচ্চাকাঙ্খা অসমিয়া জাতীয়তাবাদীদের তুলনায় অনেক বেশি এবং সহিষ্ণুতা কম।

কিন্তু আসাম চুক্তির কী হল? কতজনকে শনাক্ত বা বহিষ্কার করা হল? ২০১২ সালের হিসেব বলছে ২,৪৪২ জন মানুষকে বহিষ্কার করা হয়েছে, আর ৫৪,০০০ মানুষকে বাংলাদেশি হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। অথচ কথা তো হচ্ছিল ৪০ লক্ষ বিদেশির। আসলে বিদেশি ক'জন আছেন আসামে? এই নিয়ে ভাল গবেষণা নেই। লোকে ৪০ লক্ষ, ৫০ লক্ষ যা হোক একটা বলে দিচ্ছে। গত ১০০ বছরের জনসংখ্যা দেখলে বোঝা যায় ১৯৭১ সালের আগে পর্যন্ত আসামের জনসংখ্যা ভারতের থেকে বেশি হারে বেড়েছে। এর জন্য সম্ভবত পূর্ববঙ্গ থেকে, পূর্ব পাকিস্তান থেকে প্রব্রজন দায়ী। ১৯৭১-এর পরে ছবিটা পাল্টে যায়। দেখা যাচ্ছে ভারতের থেকে আসামের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কম। প্রব্রজনের স্রোত একেবারে গায়েব না হলেও নগণ্য হয়েছে অনুমান করা ভুল হবে না।

তাতে অবশ্য রাজনীতির ব্যাপারীদের কিছু এসে যায় না। "কম লোককে বিদেশি শনাক্ত করা হল, এটা কি আসাম চুক্তির বিফলতা নয়? ৮৫৫ শহিদের বলিদান কি জলে যাবে?" জাতীয়তাবাদীরা এই বলে মানুষকে তাতাচ্ছে। তবে জাতীয়তাবাদীদের আজকে অত ক্ষমতা নেই যে ফের রাজ্যজুড়ে আন্দোলন তৈরি করবে। তারা আইনি পথে ঝুঁকে পড়েছে। নাগরিকপঞ্জি এক মরিয়া চেষ্টা। বিদেশিদের বহিষ্কারের দাবি জানিয়ে সুপ্রীম কোর্টে মামলা হয়েছে। কোর্ট ২০১৪ সালে এনআরসি বা নাগরিকপঞ্জি নবীকরণের নির্দেশ দিয়েছে। গোটা রাজ্যের বাসিন্দাদের বৈধ নাগরিক হওয়ার প্রমাণ দিতে হবে। বংশবৃক্ষ দাখিল করে ১৯৫১ সালের নাগরিকপঞ্জিতে অন্তর্ভুক্ত লোকেদের সাথে বা ১৯৭১ সালের আগের ভোটার লিস্টের লোকেদের সাথে নিজের রক্তসম্পর্ক প্রমাণ করতে হবে।

কথা হল, রাজ্যে অবৈধ বিদেশি থাকলে প্রশাসন-পুলিশ-বিচার ব্যবস্থা তাদের ধরুক। নির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে মামলা করুক। সরকারের অপদার্থতার বোঝা সাধারণ মানুষের ঘাড়ে চাপানো হচ্ছে কেন? এরকম প্রশ্ন অনেকের মনেই উঠছে। এ যেন মাছ ধরার জন্য গোটা পুকুরের জল ছেঁচে ফেলার মত হঠকারিতা। রাজ্যে ক'জন বিদেশি বসবাসকারী আছেন তার কোনও বিশ্বাসযোগ্য হিসেব নেই। অন্তত এই কাজটা যদি গত ৩০ বছরে পুলিশ, গোয়েন্দা বিভাগের সাহায্যে মনোযোগ দিয়ে করা হত তাহলে বাংলাদেশি খেদানোর রাজনীতির দোকান এতদিনে বন্ধ হয়ে যেত। যেহেতু প্রামাণ্য তথ্য নেই, নেতারা আজব সব কথা বলে লোক খেপাচ্ছেন। আসামের বিজেপি-র এক সাংসদ বলেছেন গোটা দেশে পাঁচ কোটি বাংলাদেশি আছে, যা আদতে বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ! বিজেপি-র নেতারা গোটা দেশে এনআরসি-র দাবি করেছেন।

NRC - শমীক লাহিড়ী

আসামে নাগরিকপঞ্জী প্রকাশিত হওয়ার পর দেখা যাচ্ছে ১৯ লক্ষ মানুষের মধ্যে ১২ লক্ষ মানুষই হিন্দু ধর্মাবলম্বী। সেই রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের সময় বিজেপি প্রচার করেছিল নাগরিকপঞ্জী হলে কোন হিন্দুর নাম বাদ যাবে না। এমনকি এই ধরণের ঘৃণ্য-বিভেদকামী-জঘন্য প্রচার করেছিল, নাগরিকপঞ্জী তৈরী করে সব মুসলমানকে তাড়ানো হবে এবং সেই মুসলমানদের সম্পত্তি হিন্দুরা দখল করতে পারবে। দুঃখের হলেও এক বিরাট অংশের হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষ প্রলুব্ধ হয়ে বিজেপিকে ভোট দিয়েছিল এবং এর ফলে বিজেপি সরকার গঠন করতে পেরেছিল। কিন্তু নাগরিকপঞ্জীর ফল প্রকাশের পর উল্টো চিত্রই দেখা যাচ্ছে। এখন নিজেদের পিঠ বাঁচানোর জন্য বিজেপি দুটো প্রচার করা শুরু করেছে। (১) সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে নাগরিকপঞ্জী  হচ্ছে, এক্ষেত্রে বিজেপির কোন হাত নেই। (২) ২০১৬ সালের নাগরিকত্ব আইন সংশোধনী বিল (CAB) পাশ করিয়ে হিন্দুদের এদেশে শরণার্থী হিসাবে রেখে দেওয়া হবে, তাই হিন্দুদের দেশ ছাড়া হওয়ার কোন ভয় নেই।

এই দুটি কথাই সর্বৈব অসত্য। প্রথমত - বর্তমানে আসাম বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল সুপ্রিম কোর্টে একটি মামলা করেন এবং তাঁর আবেদনের ভিত্তিতেই সুপ্রিম কোর্ট ২০০৫ সালের ১২ই জুলাই IMDT (Illegal Migrants Determination by Tribunal Act.) আইনের সেই ধারাটি বাতিল বলে ঘোষণা করে, যে আইনে কারোর বিরুদ্ধে বিদেশী অভিযোগ আনলে অভিযোগকারীকে প্রমাণ করতে হবে অভিযোগের সত্যতা। সুপ্রিম কোর্টের এই নির্দেশে এখন যার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাকেই প্রমাণ করতে হবে যে অভিযোগ অসত্য। মানুষকে বিপদে ফেলার কাজ কে শুরু করেছিল এর থেকেই বোঝা যাচ্ছে।

দ্বিতীয়ত - আসাম চুক্তি অনুযায়ী নাগরিকপঞ্জী তৈরীর কাজ হচ্ছে না এই অভিযোগ জানিয়ে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়। সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্র ও আসাম রাজ্যে সরকারের মতামত জানতে চায়। বিজেপি শাসিত কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য সরকার দুজনেই সম্মতি দেয় দ্রুত নাগরিকপঞ্জী তৈরীর কাজকে শেষ করার পক্ষে। তাদের মতামতের ভিত্তিতেই আসামে এই নাগরিকপঞ্জী গঠনের নির্দেশ দেয় সুপ্রিম কোর্ট। এই সত্য বেমালুম গোপন করার চেষ্টা করছে বিজেপি।

তৃতীয়ত - ২০১৬ সালের নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল যা লোকসভায় পাশ হলেও রাজ্যসভায় পাশ হয়নি সংখ্যাগরিষ্ঠতার অভাবে, সেই আইন পাশ হলেও বিদেশী হিসাবে চিহ্নিত হিন্দুধর্মাবলম্বীরা কেবলমাত্র শরণার্থী রূপেই চিহ্নিত হবেন। ৬ বছর এদেশের থাকার সুযোগ পেলেও কোন সরকারী সুযোগ-সুবিধা, ব্যাঙ্ক একাউন্ট খোলা, রেশনকার্ড, সরকারী ভাতা, সরকারী-বেসরকারী চাকুরী, ভোটার তালিকায় নাম তোলা সহ অনেকগুলি গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক সুবিধার থেকে বঞ্চিত থাকবেন। ৬ বছর বাদে তারা নাগরিক হওয়ার জন্য আবেদন করতে পারেন, কিন্তু নাগরিক হতে পারবেন কিনা এমন নিশ্চয়তা প্রস্তাবিত আইনে দেওয়া নেই। তাই ৬ বছর বসবাস করবার পরে এদের ভবিষ্যত কি, এই প্রশ্নের উত্তর নেই।

১০টি মিথ্যা - ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)

 মিথ্যা নং ৩ : নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন অর্থাৎ সিএএ-র জাতীয় নাগরিক নিবন্ধক (এনআরসি)-র সাথে কোনও সম্পর্ক নেই। এটি সম্পূর্ণ পৃথক এবং বিরোধীরা মিথ্যাভাবে দুটিকে যুক্ত করার চেষ্টা করছে।

সত্য : সিএএ এবং এনআরসি একে অপরের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। বিজেপি'র পরিকল্পনা প্রথমে সিএএ বাস্তবায়ন, যা আফগানিস্তান, বাংলাদেশ বা পাকিস্তান এই তিনটি দেশ থেকে আসা সমস্ত অমুসলিমকে নাগরিকত্বের অধিকার দেবে। তারপরে এনআরসি দিয়ে "অনুপ্রবেশকারী" সনাক্ত করবে। অনুপ্রবেশকারী এবং শরণার্থীদের মধ্যে পার্থক্য কী? কেবলমাত্র মুসলমানরা সিএএ-তে শরণার্থী হিসাবে যোগ্যতা অর্জন করে না এবং তাই তারা অনুপ্রবেশকারী। নিম্নলিখিত উদাহরণগুলিতে দেখা যায় যে দুটোর মধ্যে মারাত্মক সংযোগ বিজেপি নিজেই স্পষ্ট করে দিয়েছে :

এপ্রিল ২০১৯-এ অমিত শাহ বলেছিলেন, "প্রথমে সিএবি আসবে। সমস্ত শরণার্থী নাগরিকত্ব পাবেন। তারপরেই এনআরসি আসবে। এ জন্যে শরণার্থীদের দুশ্চিন্তা করা উচিত নয়, অর্থাৎ দুশ্চিন্তার বিষয় কেবল অনুপ্রবেশকারীদের। কালানুক্রম বুঝুন - সিএবি আসবে এবং তারপরে এনআরসি। এনআরসি কেবল বাংলার জন্য নয়, এটি পুরো দেশের জন্য" (বিজেপি'র অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে ভিডিও)।

৯ ডিসেম্বর, ২০১৯ : অমিত শাহ সংসদে বলেছিলেন যে সিএএ পাসের পর একটি দেশব্যাপী এনআরসি হবে। লোকসভায় সিএএ নিয়ে বিতর্ক চলাকালীন তিনি বলেছিলেন, "আমরা দেশজুড়ে এনআরসি নিয়ে আসব। একজনও অনুপ্রবেশকারীকে রেহাই দেওয়া হবে না।"

১৯ ডিসেম্বর, ২০১৯ : বিজেপি'র কার্যনির্বাহী সভাপতি জে পি নাড্ডা জানিয়েছিলেন যে সিএএ বাস্তবায়িত হবে এবং "এগিয়ে গিয়ে এনআরসিও আনা হবে।" তিনি আরও বলেছিলেন, "প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে দেশ এগিয়ে চলেছে এবং চলবে। নাগরিকত্ব (সংশোধন) আইন কার্যকর করা হবে, ভবিষ্যতে এনআরসিও হবে।"

না, বিরোধী দলগুলো সিএএ এবং এনআরসি'কে সংযুক্ত করেনি, বিজেপি'র কলঙ্কিত পরিকল্পনাই এই দুটির যোগসূত্র।

এন আর সি বিভাজনের রাজনীতি - হরিলাল নাথ

হিন্দু রাষ্ট্রের মৌলিক ভাবনায় নাগরিকত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। হিন্দু রাষ্ট্রের নাগরিকদের দুটি শর্ত পূরণ করতে হবে। ১৯২১ সালে সাভারকার যে হিন্দুত্ববাদের সূচনা করেছেন তাতে এই দুই শর্তের স্পষ্ট ব্যাখ্যা আছে। একটি পিতৃভূমি। কোনো ব্যক্তির পিতৃপুরুষ যে ভৌগোলিক অঞ্চলে জন্মেছেন সেটাই তাঁর পিতৃভূমি। দ্বিতীয়টি দেবভূমি। কোনো ব্যক্তি যে ধর্মের অনুসারি সেই ধর্মের উৎসভূমি হল দেবভূমি। এই সূত্র অনুযায়ী বৈদিকবাদ, সনাতনবাদ, জৈন, বৌদ্ধ, লিঙ্গায়েত, শিখ, আর্য সমাজ, ব্রহ্ম সমাজ, দেব সমাজ, প্রার্থনা সমাজ-সহ অনুরূপ ধর্মমতগুলির উৎস 'হিন্দুস্থান' এবং এগুলি সবই হিন্দু ধর্মের শাখা বা অংশ। এই ধর্মাবলম্বীদের সকলেরই পিতৃভূমি ভারত। কিন্তু ভারতীয় মুসলিম, খ্রিস্টান, ইহুদি, পার্সিদের পিতৃভূমি ভারত হলেও তাদের 'হিন্দুস্থানি' বলে গণ্য করা হবে না। কারণ তাদের দেবভূমি অর্থাৎ ধর্মের উৎসভূমি 'হিন্দুস্থান' নয়। একইভাবে জাপানি চীনা-সহ অন্য অনেক দেশের মানুষ যাদের দেবভূমি ভারত হলেও (বৌদ্ধ ধর্মের সূত্রে) পিতৃভূমি ভারত নয়।

========================================================

এনআরসি-কে কেন্দ্র করে অনেকগুলি গুরুতর প্রশ্ন সামনে এসেছে। তার কোনো সদুত্তর মিলছে না।

১। ১৯৮৫ সালের আসাম চুক্তি অনুযায়ী আসামে এনআরসি হচ্ছে। সেই চুক্তিতে সারা দেশে এনআরসি-র কোনো কথা নেই। তাহলে সারা দেশে এনআরসি-র প্রসঙ্গ উঠছে কেন? তা ছাড়া আসামে প্রথম এনআরসি হয় ১৯৫১ সালে। পরবর্তীকালে নির্দিষ্ট সময় অন্তর তা আপডেট বা সময়োপযোগী করার কথা। অর্থাৎ এখন যে এনআরসি হচ্ছে সেটা আসলে আপডেট হবার কথা।

২। এনআরসি আবেদন ভিত্তিক ব্যবস্থা। দেশের সব অধিবাসীকেই নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে হবে। তার মানে বর্তমানে দেশে একজনও নাগরিক নেই। নাগরিক হবার জন্য তাদের সকলকে আবেদন জানাতে হবে। তবে কি স্বাধীনতার পর ৭০ বছর ধরে ভারত নামক দেশে একজনও নাগরিক ছিল না? নাগরিকহীনভাবেই ৭০ বছর ধরে একটা দেশ চলেছে। যদি এতদিন নাগরিক হিসেবে গণ্য করা হত তাহলে নতুন করে নাগরিকত্ব প্রমাণের প্রশ্ন থাকে না। সকলকে নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য আবেদন করতে বলার অর্থ তাঁরা নাগরিক নন। তবে কি এতদিন অনাগরিকরাই ভোট দিয়ে সরকার গঠন করত, সরকারি সুযোগ সুবিধা ও অধিকার ভোগ করত? এমন আজব কাণ্ড সম্ভবত ভারতেই সম্ভব।

৩। আসামে ১৯ লক্ষ বাংলাদেশি চিহ্নিত। পশ্চিমবঙ্গে নাকি ২ কোটি বাংলাদেশি আছে। সারা দেশে আরও বেশ কয়েক লক্ষ হবে। এঁদের নাকি তাড়ানো হবে। কোথায় তাড়ানো হবে? বাংলাদেশ নেবে না। তাহলে যাবে কোথায়? তাদের ভবিষ্যৎ কি? উত্তর নেই।

৪। আসামে ডিটেনশন কেন্দ্রে আপাতত ৯ হাজার জনের থাকার ব্যবস্থা। বাকি ১৮ লক্ষ ৯৭ হাজারকে কোথায় রাখা হবে? এদিকে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ কাউকে ৩ বছরের বেশি আটক রাখা যাবে না। ছেড়ে দিতে হবে। তাহলে কিভাবে ছাড়া হবে? ছাড়ার পর তাঁরা কি করবেন? চিহ্নিত বিদেশিদের জমিজমা, বাড়িঘর, অর্থ-সম্পদ কারা ভোগ করবে?

৫। প্রথমে ট্রাইবুনাল, তারপর হাইকোর্ট, শেষে সুপ্রিম কোর্ট। বিচার পর্ব শেষ করতে কত বছর সময় লাগবে কেউ জানে না। ততদিন বাতিলদের অবস্থান কি হবে? যে গতিতে ভারতে মামলার নিষ্পত্তি হয় এবং যে বিপুল সংখ্যক মামলা বকেয়া আছে তাতে শুধু আসামের বিদেশি নিশ্চিত করতে এক দশক সময় লেগে যেতে পারে। এরপর পশ্চিমবঙ্গ সহ সারা দেশে এনআরসি হলে তার ধাক্কা সামলাতে আরও কয়েক দশক কেটে যাবে।

৬। সারা দেশে দাবি অনুযায়ী দু কোটি বাংলাদেশি চিহ্নিত হয় তাহলে তাদের ডিটেনশন সেন্টারে রেখে নূন্যতম প্রয়োজনের যোগান দিতে সরকারকে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হবে। অর্থ সঙ্কটের সময় এই বাড়তি দায় বহন করা সরকারের পক্ষে কতটা সম্ভব?

এমন উত্তরহীন প্রশ্ন আরও অনেক আছে। বোঝা যাচ্ছে সরকার চলছে বিভ্রান্তি আর উদ্বেগের ঘোলা জলে হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির লক্ষ্যে।

Wednesday, 13 January 2021

বিপন্ন কৃষি ও কৃষক

 তিনটি আইন আলাদা আলাদাভাবে বলবৎ হলেও তিনটি আইন অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। এই তিনটি আইন কৃষকের স্বার্থে নয়। এমনকী, কৃষি উৎপাদনের যাঁরা চূড়ান্ত ভোক্তা, তাঁদের স্বার্থেও নয়। আইনগুলি খোলা মনে পর্যালোচনা করলেই ধরা পড়ে এই সত্য। তিনটি আইনের মূল বৈশিষ্ট্যগুলি -

১। কৃষকের জন্য নূন্যতম সহায়ক মূল্যের প্রতিশ্রুতি কোথাও নেই।

২। মজুতদারি আর বেআইনি বলে গণ্য হবে না।

৩। চাল, ডাল, আলু, পেঁয়াজ, তৈলবীজ, খাদ্যযোগ্য তেল ইত্যাদি পণ্যগুলির মজুতদারি ও দামে সরকারি তরফে নিয়ন্ত্রণ হবে কেবলমাত্র যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, অন্যান্য সাধারণ দাম বৃদ্ধি এবং মারাত্মক দুর্যোগ ইত্যাদি অনন্য সাধারণ পরিস্থিতিতে।

৪। সেক্ষেত্রেও সবজি ও ফল ইত্যাদির ক্ষেত্রে ১০০% ও অপচনশীল কৃষিজ পণ্য অর্থাৎ তেল, চা, চিনি ইত্যাদির ক্ষেত্রে ৫০% দাম বৃদ্ধি ঘটলে তবেই সরকার পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

৫। সেক্ষেত্রেও মূল্য সংযোগশৃঙ্খলে উৎপাদনের মধ্যবর্তী স্তরে কোনো কারবার বা কারবারির উপর সেই নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্ত হবে না। উদাহরণ, কোনো আলুভাজা প্রস্তুতকারক সংস্থা বাজারে আলুর দাম আগুন হলেও যথেচ্ছ আলু মজুত রাখতে পারবে কিংবা, চিনির দর আকাশ ছুঁলেও চিনি কল আখ মজুত করে চলবে।

৬। রাজ্যের হাত থেকে কৃষি ব্যবস্থা পুরোপুরি কেন্দ্রের অধিকারে চলে যাবে।

৭। রাজ্যের হাতে মান্ডির বাইরে কৃষি থেকে আয়ের কোনো উপায় থাকবে না।

৮। কৃষি পণ্যের কারবারিরা নিজেদের স্বার্থে মান্ডির কমিশন এজেন্ট বা ফড়েদের মাধ্যমে কৃষকের পণ্য মাঠ থেকে সরাসরি হাতিয়ে নেবার উদ্যোগ নেবেন।

৯। এমএসপি নির্ধারিত দাম মান্ডির বাইরে আদায় হওয়ার বাধ্যবাধকতা না থাকায় জবরদস্তি করার সুযোগ থাকবে।

১০। অত্যাবশ্যক নিত্য প্রয়োজনীয় চাল, ডাল, তৈলবীজ, পেঁয়াজ আর আলু অত্যাবশ্যক থাকবে না। রাজ্যের হাতেও বাজারের দাম নিয়ন্ত্রকের কোনো অধিকার থাকবে না। ফলে সমাজের সর্বস্তরের মানুষ সঙ্কটের সম্মুখীন হতে বাধ্য।

১১। বর্তমানে নানান আইন সত্ত্বেও ছোটো কৃষকেরা ফড়েদের হাতের শিকার। যেটুকু আইনি ব্যবস্থা ছিল কৃষক স্বার্থ রক্ষায় তাও তুলে নেওয়া হবে নতুন ব্যবস্থায়। কৃষি পণ্য লেনদেনে কৃষক স্বার্থ দেখার খাতাকলমের ব্যবস্থাটুকুও তুলে নেওয়া হবে এই নতুন ব্যবস্থায়।

১২। তৈরি হবে তিন ধরনের বাজার। মান্ডি, চুক্তি চাষ, মান্ডির বাইরের বাজার। মান্ডি তৈরি হয়েছিল ফড়েরা যাতে কৃষকদের জমি থেকে পণ্য তুলে তাদের অত্যাচার না করতে পারে। নতুন ব্যবস্থায় কৃষকের বাড়ি পর্যন্ত ফড়েদের যাওয়ার রাস্তা আরও প্রশস্ত হবে।

১৩। চুক্তি চাষ হবে। চুক্তি হবে কৃষক ও বাণিজ্য সংস্থার মধ্যে। চুক্তিতে ফসলের পরিমাণ, গুনগত মান, দাম ইত্যাদি সমস্তই আগাম নির্ধারিত থাকবে।

১৪। চুক্তিভঙ্গে সরকার সাধারন কৃষকের পাশে কীভাবে থাকবে অথবা থাকবে কিনা তা অনুচ্চারিত।

১৫। এই চুক্তি সম্পাদিত হবে মহকুমাশাসকের কর্তৃত্বের এক্তিয়ারে।

১৬। এই চুক্তির উপর রাজ্যের নিজস্ব আইন বা আদেশের কোনো প্রভাব থাকবে না।

১৭। চুক্তি খেলাপ করার অভিযোগ উঠলে, তার বিচার দেশের দেওয়ানি আদালতে হবে না।

১৮। চুক্তি সংক্রান্ত যাবতীয় বিবাদের বিচার করবেন মহকুমা শাসক। তাঁর বিচারে সন্তুষ্ট না হলে আপিল করতে হবে জেলা শাসক বা অতিরিক্ত জেলা শাসকের অধীন উত্তর-বিচার কর্তৃপক্ষের কাছে। এক্ষেত্রে মহকুমাশাসক, জেলা শাসক তথা উত্তর-বিচার কর্তৃপক্ষের রায় দেশের দেওয়ানি আদালতের রায়ের সমান মান্যতা পাবে।

১৯। সরকারি তরফে কৃষির বাজার ও বাণিজ্যিকীকরণের ক্ষেত্র সমস্তটাই কুক্ষিগত থাকবে কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে। রাজ্যের আইন এক্ষেত্রে প্রশ্ন তুলতে পারবে না। দেশের আদালত তথা মূল বিচার ব্যবস্থার কোনও ভূমিকাই নেই। কেন্দ্রের সঙ্গে সরাসরি প্রশাসনিক যোগাযোগ থাকবে জেলা শাসক ও মহকুমা শাসকের। রাজ্য প্রশাসন থাকবে নীরব দর্শক। আসলে এই তিনটি কৃষি আইন ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন, স্বেচ্ছাচার, একনায়কতন্ত্র ও কর্পোরেট আনুগত্যের দলিল।

এক দেশ, এক বাজার শ্লোগানকে সামনে রেখে অবাধ বাণিজ্যের বিষয়টিকে মান্যতা দেওয়া হয়েছে। কৃষকের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে কর্পোরেটরা এর ফলে সুবিধা ভোগ করবে। সহায়ক মূল্য ও মূল্য স্হিতিশীল রাখার কোনো ব্যবস্থা না থাকায় কৃষক সমাজকে সার্বিকভাবেই কৃষি ব্যবসার কর্পোরেটদের দয়া দাক্ষিণ্যের উপর নির্ভর করতে হবে। এই তিনটি আইন আগ্রাসী নয়া উদারবাদী ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করবে। অনাহার, দুর্দশা, অসহায় অবস্থার মধ্যে থাকা কৃষক সমাজ ও গ্রামের গরিব মানুষের উপর তীব্র অর্থনৈতিক আক্রমণ নেমে আসবে।

Monday, 16 November 2020

বিবাহ প্রসঙ্গে - সুকুমারী ভট্টাচার্য

'দেখ, বিয়ের পর আশীর্বাদ করবার সময়ে বলি, 'সাবিত্রীসমানা ভব' অর্থাৎ স্বামীকে যমের হাত থেকে ছিনিয়ে এনো। বেমালুম ভুলে যাই, যে ঐ সাবিত্রীই কিন্তু বিয়ের আগে প্রকাশ্যে রাজসভায় নারদের সামনে বাবার সঙ্গে প্রবল তর্ক করেছিল, তার পছন্দের মানুষকে সে বিয়ে করবেই। একবছর পর বিধবা হবে জেনেও তর্ক করেছিল। এবং জিতেছিল। আশীর্বাদ করবার সময়ে সেই সাবিত্রীই সমান হতে বলি কি? নিজের পছন্দের মানুষকে পেয়ে তার প্রাণ ভরে গিয়েছিল, সেই জোরেই না সে যমের সঙ্গে অতক্ষণ লড়াই করেছিল। এবং জিতেছিল। এরা দুই সাবিত্রী নয়রে, একটিই মেয়ে, আশীর্বাদ করতে হলে এই মেয়ের দুটো দিক ভেবেই আশীর্বাদ করতে হবে।'

========================================================================

... আমরা শাস্ত্রের দোহাই পাড়ি তখনই, যখন সে শাস্ত্র আমাদের অভীষ্টের অনুকূল। প্রতিকূল হলে বেমালুম চেপে যাই সে শাস্ত্র।

========================================================================

প্রাচীন শাস্ত্রে বৈধ বিবাহ আটরকমের ছিল (আশ্বলায়ন গৃহ্যসূত্র ১/৬ অংশে এগুলির বিবরণ আছে, অন্যান্য গৃহ্যসূত্রেও আছে): ব্রাহ্ম, দৈব, আর্য, প্রজাপত্য, গান্ধর্ব, রাক্ষস, আসুর ও পৈশাচ। 'ব্রাহ্ম' বিবাহে সবস্ত্রা সালংকারা কন্যাকে পিতা উপযুক্ত পাত্রে দান করতেন। 'দৈব' বিবাহে যজ্ঞ কর্মে রত পুরোহিতকে যজ্ঞকালেই কন্যাদান করতেন কন্যার পিতা। 'আর্য' বিবাহে একটি বলদ ও একটি গাভী কন্যার পিতা দান করতেন বরকে। 'প্রজাপত্য' বিবাহে কন্যার পিতা বর ও কন্যাকে 'উভয়ে একত্রে ধর্মাচরণ কর' এই বলে আশীর্বাদ করে কন্যা দান করতেন। 'আসুর' বিবাহে কন্যার পিতাকে অর্থদানে তুষ্ট করে বর কন্যাকে বিবাহ করতে পারত। 'রাক্ষস' বিবাহে আত্মীয়স্বজনের মধ্যে থেকে রোরুদ্যমানা কন্যাকে বলপূর্বক হরণ করত বর ও তার বন্ধুরা। 'পৈশাচ' বিবাহে ঘুমন্ত অথবা মদমত্ত কন্যাপক্ষীয়দের মধ্যে থেকে ঘুমন্ত কন্যাকে ধর্ষণ করে নিয়ে যেত বর।   

লক্ষ করলে দেখি, আসুর বিবাহে কন্যাপণ চলিত ছিল। মনে হয়, অনেক আগে কন্যাপণই প্রচলিত ছিল। বিবাহের এ নামকরণগুলি পরবর্তী কালে খ্রীষ্ট্রীয় পঞ্চম-ষষ্ঠ শতকের। ততদিনে সমাজে কন্যাপণ উঠে গেছে, বরপণ চলিত হয়েছে। 'আর্য' বিবাহে কন্যার পিতা নিঃসম্বল জামাতাকে তখনকার কালে সংসার পাততে যা অত্যাবশ্যক সেই গাভী-বলদ দিতেন বরকে; পণ হিসাবে ততটা নয়, যতটা সংসারযাত্রায় রওনা করিয়ে দেবার জন্য। 'আসুর' বিবাহে কন্যাপণ স্পষ্টভাবেই অনুষ্ঠিত হত। অনুমান করা যেতে পারে, এটি অন্যান্য বিবাহের সঙ্গেও যুক্ত ছিল। সেই কন্যাপণেরই স্মৃতি আর্য বিবাহে, যেখানে গাভী ও বলদ কন্যার পিতা বরকে দিতেন। (কন্যাপণের কথা পাই ঋগ্বেদে ১/১০৯/২; অথর্ববেদ ১৪/১৩২/৩৩ এবং পরবর্তীকালে কাত্যায়ন গৃহ্যসূত্রে ২/৪/২ এবং আরও অন্য বহু শাস্ত্রাংশে। গোভিল গৃহ্যসূত্রে পড়ি, বরপক্ষ ও কন্যাপক্ষ উভয়ই উভয়কে স্বর্ণদান করত, তবে বরপক্ষ অনেক বেশী সোনা দিত। ২/৩/৪; কাত্যায়ন গৃহ্যসূত্র ২/৪/২ - এতেও কন্যাপণের কথা আছে। এছাড়া পরবর্তী সাহিত্যে বেশ কিছু দৃষ্টান্ত আছে কন্যাপণের) রোমানদের মধ্যেও অর্থ দিয়ে কন্যা বিয়ে করার পদ্ধতি চালু ছিল। পরবর্তীকালে যখন ধীরে ধীরে নারীর সামাজিক অবনমন ঘটে, তখন কন্যাপণও ক্রমে অচলিত হয়ে যায় এবং প্রচুর অর্থের বিনিময়ে বধু লাভ করাটা অসম্মানজনক হয়ে ওঠে বরের পক্ষে। তাই সেদিনের কন্যাপণবিশিষ্ট বিবাহের সংজ্ঞা হল 'আসুর' অর্থাৎ আর্যরীতি-বহির্ভূত। এর সমর্থনে বলা যায়, পরবর্তী কালের বহু পুরানে অনুমাত্র কন্যাপণ গ্রহণ করে যে পিতা, তাঁকে ধিক্কার দিয়ে বলা হয়েছে সে 'কন্যাবিক্রয়ী'। মনে হয় 'কন্যাবিক্রয়ী' সমাজে অপাঙ্‌ক্তেয় হয়ে উঠেছিল। ততদিন বরপণ সমাজে চালু, কিন্তু কোনো শাস্ত্রেই পুত্রের বিবাহে পণ গ্রহণ করেন যে - পিতা, তাঁকে পুত্রবিক্রয়ী বলা হয়নি। যদিও ছেলের বিয়েতে পণ নেওয়া মানেই বাপ ছেলেকে বিক্ৰী করছে, কারণ 'পণ' কথাটির একটাই মানে - দাম। তাই পণ নিয়ে ছেলের বিয়ে দেওয়ার অর্থই হল মেয়ের বাপের কাছে ছেলেটিকে বেচে দিচ্ছে তার বাবা। কিন্তু ততদিনে পুরুষতন্ত্র এত প্রবলভাবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত যে, এ অর্থ এবং এর অন্তর্নিহিত অপমান কোনো ছেলের বাপ ভেবেই দেখেনা, কারণ পুরুষমাত্রই ততদিনে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত; নারী ঊনমানব।   

========================================================================

পণ ছাড়াও নানারকমভাবে টাকা ও ধনরত্ন জড়িত ছিল বিয়ের সঙ্গে। মেয়েটিকে তার বাপের বাড়ির আত্মীয়বন্ধুরা ভালবেসে যা উপহার দিত তা 'স্ত্রীধন'। বরবধূ একসঙ্গে বসে (তাদের তখনকার সংজ্ঞা হল 'যুতক') দুবাড়ির কাছে যা পেত তা হল 'যৌতক' বা 'যৌতুক'। মেয়ের বাবা যে দামে জামাই কেনে তা হল 'পণ'। শ্বশুরবাড়িতে ভালবেসে লোকে বরবধূকে যা দেয় তা হল 'সৌদায়িক'। এর মধ্যে শাস্ত্রমতে স্ত্রীধন হল বধূর একান্ত ব্যক্তিগত সম্পত্তি, যার ওপরে শ্বশুরবাড়ির কোনো অধিকার ছিল না; মেয়েটি তার ইচ্ছামত স্ত্রীধন খরচ ও দান করতে পারত। 

========================================================================

খ্রীস্টপূর্ব সপ্তম খ্রীষ্টাব্দ থেকে প্রায় দেড় বছর পরে পর্যন্ত যেসব শাস্ত্র রচিত হয়েছিল, তাতে নারীকে নিজের দেহের বা সম্পত্তির ওপরে অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। (বারবার বলা হয়েছে, শৈশবে পিতা, যৌবনে স্বামী, বার্ধক্যে পুত্ররা নারী রক্ষাকর্তা, নারী স্বাধীনতার যোগ্য নয়; 'ন স্ত্রী স্বাতন্ত্র্যমর্হতি'।

========================================================================

বৃহদারণ্যক উপনিষৎ, খ্রীষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের কাছাকাছি রচনা বলে অনুমান করা হয়। সেখানে ঋষি যাজ্ঞবল্ক্য দাম্পত্য ব্যাপারে স্বামীকে পরামর্শ দিচ্ছেন: 'স্ত্রী যদি স্বামীর কামনা পূরণ করতে অস্বীকার করে তাহলে প্রথমে তাকে মধুর বাক্যে বশীভূত করবার চেষ্টা করবে। সেটা নিষ্ফল হলে তাকে 'কিনে নেবে'। (অবক্রীণীয়াৎ - অর্থাৎ আভরণ ইত্যাদি দেবার লোভ দেখাবে বা দেবে।) তাতেও যদি সে না রাজি হয় তাহলে লাঠি দিয়ে বা হাত দিয়ে মেরে স্ববশে আনবে।' (আক্ষরিক অনুবাদ। বৃহদারণ্যক উপনিষৎ ৬/৪/৭) এ হল ঋষিবাক্য, এর ভিত্তি আরও দু'শ বছর আগেকার প্রাচীন সংহিতা ও ব্রাহ্মণ সাহিত্যের বচন: ধন বা নিজ দেহের ওপরে নারীর কোনো অধিকার নেই (মৈত্রায়ণী সংহিতা ৩/৬/১; ৪/৬/৭; ৪/৭/৪; ১০/১০/১১। তৈত্তিরীয় সংহিতা ৬/৫/৮/২ ও শতপথ ব্রাহ্মণ ৪/৪/২/১৩ ইত্যাদি_ এ ধরণের শাস্ত্রবাক্যের উদ্দেশ্য বধূর যৌনজীবনের সব স্বাধীনতা হরণ করা; স্বামীই তার যৌনজীবনের নিয়ন্তা হয়ে থাকবে। ... যাজ্ঞবল্ক্য থেকে আজ পর্যন্ত এই অত্যাচার অব্যাহত আছে। নারীর এই অসহায়তার একটা হেতু তার অর্থনৈতিক পরতন্ত্রতা। আর্থিকভাবে ভরণপোষণের জন্যে স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির ওপরে নির্ভরশীল হওয়ার ফলে নিজের শরীরের ওপরেও নারীর কর্তৃত্ব থাকে না। যেসব বিধি বিধান যৌনতার প্রকাশ, বিবাহ ও বিবাহবিচ্ছেদ নিয়ন্ত্রণ করে সেগুলির সাফল্য নারীটির আর্থিক অবস্থারই প্রতিবিম্বন। সংবিধান, তত্ত্ব ও প্রয়োগের মধ্যে বিস্তর অসামঞ্জস্য থাকে; নারীর অধিকার খণ্ডিত হতে পারে সংবিধানবহির্ভূত পক্ষপাতিত্বে। অর্থনৈতিক পরাধীনতা থেকে সার্বিক অধীনতা তাকে মেনে নিতে হয়। আর ঐ পরাধীনতার অন্তরাল থেকে বিবাহকে নিয়ন্ত্রণ করে রাষ্ট্রশক্তি, প্রাচীনকালে শাস্ত্রের মাধ্যমে, পরে আইনের দ্বারা।   

========================================================================

বিবাহ নারীর জীবনের একটা অবস্থামাত্রই নয়। পুরুষের কাছে তা-ই, কিন্তু নারীর কাছে যৌবনোত্তর জীবনের লক্ষ্যই হল বিবাহ। জীবনের পথ নয়, গন্তব্যস্থল। 

========================================================================

স্থিতি-প্রতিস্থিতি-সমন্বয়ের (thesis, antithesis, synthesis) যে নিয়মে সংসার আবর্তিত ও বিবর্তিত হচ্ছে ... 

========================================================================

রাধা ও সরস্বতী বাদে দেবীমূর্তিগুলি সবই মাতৃমূর্তি, এ-যেন মাতৃত্ব সম্বন্ধে এই আতিশয্যেরই এক প্রকাশ। দৈনন্দিন জীবনে নারীর ঊনমানব অবস্থানের প্রায়শ্চিত্ত করবার জন্যই যেমন পূজার কদিন মাটির প্রতিমাকে মাতৃসম্বোধন করে রক্তমাংসের নারীর প্রতি সারাবছরের আচরণের পাপক্ষালন ও ক্ষতিপূরণ করা হয়, এ-ও তারই এক প্রকাশ। শুধু তাই নয়, শাস্ত্রে, পরিবারে সমাজে বরাবর শুনি, নারীর জীবন মাতৃত্বে পূর্ণতা প্রাপ্ত হয়; কখনো কেউ বলে না পুরুষ পিতৃত্বে পূর্ণ হয়। মাতৃত্বের বহু দায় আছে, পিতৃত্ব শুধুই আনন্দের; তাই এই অসম দৃষ্টি। মাতৃত্বে নারী অবশ্যই গৌরবান্বিত হয়, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে পিতৃত্বকেও সন্মান করে' দুটি অবস্থারই দায়িত্ব এবং অধিকার সমানভাবে ভাগ করে নেবার একটা লক্ষ্য থাকা উচিত। কোনো দেবতাই পিতৃত্বের জন্যে মহীয়ান নয়, কিন্তু সর্বদেশে মাতৃদেবী মহীয়সী। ঐ মহিমা বর্তায় মর্তনারীতে, এবং নারীকে কেবলমাত্র মাতৃত্বে আবদ্ধ করে রাখলে তার যৌনতা সম্পর্কে আতঙ্ক থেকে অব্যাহতি পায় পুরুষ সমাজ। তাই বেদ থেকে পুরানে বারবার নারী সম্বন্ধে কামনা ও আশীর্বাদ উচ্চারিত হয়েছে সে যেন 'অশূন্যপস্থা হয়, অর্থাৎ তার কোল যেন কখনো খালি না থাকে, ক্রমান্বয়ে সন্তানজন্ম দিয়ে যেন সে তার নারীজন্ম সার্থক করে। ...

... পুরুষতান্ত্রিক সমাজে উৎপাদন -- সে শস্যই হোক, শিল্পই হোক, সন্তানই হোক -- ঘটবে পুরুষের ইচ্ছায়। এর পিছনে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ ও প্রবর্তন প্রচ্ছন্ন থাকে। সন্তান উৎপাদনের সফলতার ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার জন্য এবং সমকালীন অর্থনীতির বিধানের কাছে এই উৎপাদনব্যবস্থা সমর্পন করবার জন্য নারীর নিজদেহের ওপরে তার (রাষ্ট্রের) নিয়ন্ত্রণ প্রসারিত করতে রাষ্ট্র বাধ্য হয়েছে। কাজেই নারী নিজদেহের ওপরে নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। নারীকে 'মহাভাগা পূজার্হা গৃহদীপ্তি' বলেছেন মনু কিন্তু তার ঠিক আগে এসব বিশেষণের হেতুটিও উল্লেখ করেছেন: 'প্রজনার্থা'; সন্তানের জন্ম দেয় বলেই সে মহনীয়া পূজনীয়া এবং গৃহের দীপ্তিস্বরূপিণী। (মনু ৯/২৬)   

========================================================================

বিয়ের অনুষ্ঠানের মধ্যে একটা অদ্ভুত জগাখিচুড়ি আছে। কিছু কিছু বৈদিক অনুষ্ঠান -- বৈদিক যুগের শেষাংশের  -- রয়ে গেছে, সঙ্গে কিছু বৈদিক মন্ত্রও। কিন্তু তার সঙ্গে এসে জুড়েছে বিস্তর লৌকিক অনুষ্ঠান, শুধু স্ত্রী-আচারে নয়, বিয়ের অপরিহার্য অঙ্গ হিসাবেও এগুলি যথেষ্ট গুরুত্ব পায়! যুগে যুগে বিকশিত হয়ে পরিবর্ধিত আকারে এখন যা দাঁড়িয়েছে তার মধ্যে আছে বরকে আসনে বসিয়ে সবস্ত্রা সালংকারা কন্যা দান করা হয়। হোম হয়, আবার বহু পরবর্তী যুগের সংযোজন শালগ্রাম শিলা বিষ্ণুর প্রতীক হয়ে সাক্ষী থাকে, অগ্নির মত। বৈদিক যুগের মত পাণিগ্রহণ ও সপ্তপদী গমন হয়। যোক্তবন্ধন অর্থাৎ বরকনের কাপড়ের শেষ প্রান্তে গিঁট বাঁধা হয়। মালাবদল অর্বাচীন কালের সংযোজন। পুরানো কতকগুলো গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান সংক্ষিপ্ত আকারে রয়ে গেছে, যেমন অশ্বারোহন। এটি বৈদিক; বর একখণ্ড পাথর বধূর সামনে রাখলে সে তার ওপরে দাঁড়ায়, তখন বর বলে, ঐ পাথরের মত স্থির হয়ো (এহি অশ্মানমতিষ্ঠ অশ্বেব ত্বং স্থিরা ভব -- কৌশিকসূত্র ১০/৭৭)। তেমনই বহু প্রাচীনকালের রীতি অনুসারে ধ্রুবনক্ষত্র ও অরুন্ধতী দর্শনের স্মৃতিমাত্রই অবশিষ্ঠ আছে, সত্যিকার নক্ষত্রদুটিকে এখন বেশি কেউ চেনেও না। দেখেও না। কিন্তু মন্ত্রটি জরুরি, সেটি বর বলে: আকাশ ধ্রুব, পৃথিবী ধ্রুবা, এই জগৎ ধ্রুব, ধ্রুব এই পর্বতরা, এই স্ত্রী পতিকূলে ধ্রুবা (আশ্বলায়ন গৃহ্যসূত্র ১/৭/২২)। লক্ষণীয়, ধ্রুবত্ব, স্থিরত্ব শুধু বধূটির কাছেই অপেক্ষিত। সে-ই প্রতিজ্ঞা করবে আমি পতিকূলে ধ্রুবা হব, অরুন্ধতীর দ্বারা আমি অবরুদ্ধ। অর্থাৎ প্রাচীন পতিব্রতা ঋষিপত্নী আমাকে পতিকূলে স্থির থাকবার জন্যে অবরুদ্ধ করেছেন। পাণিগ্রহণের পরে বধূর শুদ্ধির জন্যে বর কিছু মন্ত্র পড়ত -- ছটি আহুতি দিত বিনা মন্ত্রে এবং বলে যেত, 'এই নারীর চোখের পাতার চুল, মাথার চুল, চরিত্র, কথা, হাসি, দেহ ও বস্ত্রের রন্ধ্র থেকে নিঃসৃত রশ্মিকণা (আরোক), দন্ত, হস্ত, পদ, ঊরু, উপস্থ, জঙ্ঘাসন্ধিতে, যা কিছু ঘোর ও অশুচি আছে তার সর্বাঙ্গে, তা শুদ্ধ হোক, আপনিই মনে আসে, পুরুষ কি স্বতই শুচি, আর যত অশুচিতা তা শুধু নারীর দেহে মনে আচরণে? তা শোধন করার দায় বা অধিকার কোথা থেকে পায় পুরুষ? আসলে তার চাই একটা শুচি কুমারী কন্যা এবং সম্ভাব্য অশুচিতার প্রতিকার করার স্পর্ধা শাস্ত্র জুগিয়েছে পুরুষকে। পুরুষের অশুচিতার সম্ভাবনা পর্যন্ত শাস্ত্রে স্বীকৃত নয়। এই বৈষম্যের ভিত্তিতেই শাস্ত্রে নিষ্পন্ন হয় বিবাহ এবং অনুষ্ঠানের পদে পদে এই বৈষম্য প্রকট হয়ে ওঠে। কন্যার পিতা ভাবী জামাতাকে আসন দিয়ে অভ্যর্থনা করে বলেন 'আপনাকে অর্চনা করছি' [অর্চয়িষ্যামো ভবন্তম্] এবং জামাতা অনুমতি দেয় 'হ্যাঁ, অর্চনা করুন' [ওম্ অৰ্চয়]। সম্প্রদানের মধ্যেও কন্যা ব্যক্তি থেকে বস্তু হয়ে ওঠে: যে বস্তুর তৎকালীন মালিক পিতা ভাবী জামাতার কাছে কন্যারূপ বস্তুটিকে দান করেন। সবস্ত্রা, সালংকারা এবং পণযৌতুক সহ। এর মধ্যেও প্রচ্ছন্ন থাকে বধূটির সামাজিক সত্তার অবমাননা, তাকে বস্তু রূপে হস্তান্তরিত হয়। বিয়ের প্রায় প্রতি পর্বে এই ধরনের অবমাননা অন্তর্নিহিত ছিল। একটিমাত্র মন্ত্রে কন্যার দীর্ঘ আয়ু কামনা করে বলা হয়েছে, তুমি সম্পদ্ ধারণ কোরো। বলাবাহুল্য, এ সম্পদ তার পতিকূলেরই, কোনো সম্পত্তিতে কন্যার তো স্বতন্ত্র কোনো অধিকার ছিল না। একটি অনুষ্ঠানে কন্যা মাদুরে পা রাখবে, তখন উচ্চারিত হবে 'পতি দেবতা' এবং 'পতিযান কামনীয়' অর্থাৎ কন্যা কামনা করছে যেন সে পতিলোকে যেতে পারে। যেটা লক্ষণীয়, তা হল শাস্ত্রে অন্য দুটি যান আছে 'দেবযান' ও 'পিতৃযাণ' অর্থাৎ দেবলোক থেকে মোক্ষ ও পিতৃলোক থেকে পুনর্জন্মের পথ। দেবতা ও পিতৃগণের মত উচ্চ আসন সৃষ্টি হল পতির এবং পত্নীর কামনা হল: যেন সে পতিলোকে ঠাঁই পায়। লাজহোম (আগুনে খই দিয়ে হোম) অনুষ্ঠানে পতির দীর্ঘায়ু, শতবর্ষ পরমায়ু কামনা করে বধূ, আর বলে, তার শ্বশুরবাড়ির সকলের যেন শ্রীবৃদ্ধি হয়। [দীর্ঘায়ুরস্তু মে পতিঃ শতং বর্ষাণি জীবত্বেধন্তাং জ্ঞাতয়ো মম] সপ্তপদীগমনের মন্ত্রগুলিতে উভয়ের মিলিত জীবনের শ্রীবৃদ্ধির কামনা আছে। পাণিগ্রহণের মন্ত্রে বর বধূকে বলে: 'আমার ব্রতে তুমি তোমার হৃদয় ধারণ কর, তোমার চিত্ত আমার চিত্তের অনুগামী হোক। বৃহস্পতি তোমাকে আমার জন্য নিযুক্ত করুন।' [... - মানব গৃহ্যসূত্র ১/১০/১৩] লক্ষণীয়, বধূটিরও যে চিত্ত আছে, আগামী বিবাহিত জীবন সম্বন্ধে যে তারও কিছু স্বপ্ন, কিছু কামনা থাকতে পারে সে বিষয়ে শাস্ত্র ও সমাজ সম্পূর্ণ উদাসীন। এক সময়ে বর বধূ সম্বন্ধে প্রার্থনা করে, এর যে পতিঘাতিকা তনু তাকে ধ্বংস কর, এর যে পুত্রহীনা তনু, পশুহীনা তনু তা দূর হোক।' [...]

এই অনুষ্ঠান ও মন্ত্রগুলির মধ্যে নারীর, বিশেষত বধূর সম্বন্ধে যে মনোভাব বিবৃত আছে তা হল: প্রথমত প্রকৃতির সৃষ্টি যে নারী যে স্বভাবত অশুচি, অকল্যানী, পুরুষপরতন্ত্র, হীন এবং কতকটা যেন ঊনমানব। বিয়ের অনুষ্ঠানের ও মন্ত্রের মধ্যে দিয়ে তার শুচিতা সম্পাদন করে' বর তাকে নিজের, পরিবারের ও সমাজের জীবনে গ্রহনযোগ্য করে তোলে। নইলে সে সংসার ও সমাজে অকল্যাণ আনবে; স্বামীকে হত্যা করবে, পুত্রদের হারাবে ও পশুর বিনাশের কারণ হবে। দ্বিতীয়ত, তার স্বতন্ত্র চিত্ত বলে কিছুই নেই বা থাকলেও না থাকাই বাঞ্চনীয়, তার সে স্বতন্ত্র চিত্তের অবনমন ঘটিয়ে সম্পূর্ণ স্বামীর চিত্তের অনুগামী, স্বামীর ব্রতের অনুব্রতা হওয়াই তার চূড়ান্ত কর্তব্য। তৃতীয়ত, স্বামী এবং শ্বশুরবাড়ির কল্যাণসাধনে সে আত্মনিয়োগ করবে। এতে দোষের কিছু থাকত না যদি তার আপন বাপের বাড়ির প্রতি কোনো কর্তব্য করবার কোনো সুযোগ বা অধিকার তাকে দেওয়া হত, অথবা তার স্বামীও তার শ্বশুরবাড়ি, অর্থাৎ বধূটির বাপের বাড়ির সম্বন্ধে কোনো কর্তব্য সাধনের কোনো দায়িত্ব বোধ করত। বিবাহ অনুষ্ঠানে বধূর গোত্রান্তর এমনই আমূল এবং সর্বাত্মক, এমনই আত্যন্তিক যে তার পূর্বসত্তার প্রায় পূর্ণ বিলোপ ঘটিয়ে তাকে -- শুধু তাকেই -- তার শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে একাত্ম হতে হত। চতুর্থত, স্বামীর জীবনে সে ধ্রুবা হবে। যেমন ধ্রুবা অরুন্ধতী, পাথরের ওপরে দাঁড়িয়ে, বধূ প্রতিজ্ঞা করবে স্বামীর জীবনে এবং শ্বশুরকুলে সে থাকবে পাথরের মত স্থির অটল। লক্ষণীয়, অনুরূপ কোনো প্রত্যাশা বরের সম্বন্ধে কোনো অনুষ্ঠানেই উচ্চারিত হয়নি। [এ পর্যন্ত বিয়ের যে মন্ত্র ও অনুষ্ঠানগুলির উদ্ধৃতি দেওয়া হল সেগুলি দশকর্মের জন্য নির্দিষ্ট বাঙালির, ধর্মজীবনে সুপ্রচলিত 'পুরোহিতদর্পন' গ্রন্থ থেকে উৎকলিত। ঈষৎ পরিবর্তিত ক্রম ও আকারে এগুলিই ভারতীয় হিন্দু বিবাহের বিভিন্ন পর্যায়ে ও অনুষ্ঠানে আচরিত হয়।] 

.... নারীর এই হীনতার বোধ যেহেতু সমাজে বহুকাল ধরে পরিব্যাপ্ত সেইজন্যেই বিবাহের অনুষ্ঠানে ও মন্ত্রে এই প্রতিফলন। অতএব দুটি অসম মানুষের মধ্যে বিবাহ অনুষ্ঠিত হয়: উৎকর্ষ পুরুষের, ন্যূনতা নারীর। দাম্পত্যেও এর দীর্ঘ ছায়া পড়ে। লোকাচারেও এরই প্রতিবিম্ব। বিয়ে করতে যাবার আগে বর ও তার মায়ের মধ্যে একটি সংলাপ প্রচলিত। বরসাজে সজ্জিত, যাত্রায় উদ্যত ছেলেকে মায়ের প্রশ্ন: 'কোথায় যাচ্ছ বাবা?' বর: 'মা, তোমার দাসী আনতে যাচ্ছি।' তিনবার এই নাট্যাংশ অভিনীত হয়। শুধু যে বর, তার মা ও বাড়ির লোকেরা এটা বিশ্বাস করে তা-ই নয়, বধূ ও তার বাড়ির লোকেরাও এটা বিশ্বাস করে অর্থাৎ বধূটি যে শ্বশুরবাড়ির দাসী এবিশ্বাস বিবাহ অনুষ্ঠানের একটি দৃঢ়ভিত্তি। আগেই বলেছি, অন্নবস্ত্রের জন্যে বধূ স্বামীর ওপরে নির্ভরশীল তাই দাসী-ভৃত্যের মতই সে ভরণীয়া ভার্যা, তাকে খাওয়াতে হবে। [মধ্যযুগ পর্যন্ত ইংল্যাণ্ডে স্ত্রী স্বামীকে 'লর্ড' বলে সম্বোধন করত, এবং ভৃত্যও প্রভুকে ঐ সম্বোধনই করত। এই 'লর্ড' শব্দটির বুৎপত্তি হল, half-ward; half অর্থাৎ loaf বা রুটির জন্যে যে নির্ভরশীল। স্ত্রী এবং ভৃত্য ও ব্যাপারে একই পর্যায়ে পড়ে। সংস্কৃতেও 'ভৃত্য' শব্দ নিষ্পন্ন 'ভৃ' ধাতুর উত্তরে 'ক্যপ' প্রত্যয় দিয়ে, 'ভার্যা' হয় ভৃধাতুতে 'ন্যৎ' প্রত্যয় দিয়ে। অর্থ একই, ভরণীয়]

বধূটির কন্যা অবস্থায় এই অন্নঋণ ছিল পিতার কাছে, ঋণী ব্যক্তি বন্ধকরাখা বস্তুর মতই স্বাধীন নয়; তাকে দান করা যায় না। তাই বিয়ের আগে বাপের সঙ্গে মেয়েকে কনকাঞ্জলি নামে একটি নির্মম নাট্যাংশ অভিনয় করতে হয়। একমুঠো ধুলো বাপের হাতে দিয়ে মেয়ে বলে: 'সোনামুঠি নিয়েছিলাম, ধুলোমুঠি দিয়ে শোধ করলাম।' এ অনুষ্ঠান রূপকাশ্রিত, কারণ পিতার কাছে কন্যা ঋণমুক্ত না হলে তাকে সম্প্রদান করা যাবে না, তাই পিতৃকুলের ঋণ সে প্রতীকী ভাবে শোধ করে এমন মর্মান্তিক উচ্চারণে। এর মধ্যে নিহিত থাকে পিতৃকুল সম্বন্ধে তার সব দায়িত্বের অস্বীকৃতি। তিনদিন অশৌচ মেনে, চতুর্থীশ্রাদ্ধ করেই পাত্রান্তরিত বধূটি মৃত পিতা বা মাতার সম্বন্ধে সব কর্তব্য সমাধা করে। 

========================================================================

বিবাহ মানে এখন আমরা বুঝি ঐক্যদাম্পত্য (monogamy) এক স্বামী, এক স্ত্রী। কিন্তু বহুপতিকতা আঞ্চলিকভাবে এখনো আছে, প্রাচীন কালেও ছিল। আর বহুপত্নীকতা তো সেদিন অবধি বেশ জমাট ভাবেই ছিল, আইন করে বন্ধ করা হল। প্রাচীনকালে বিত্তবান ব্যক্তির বিজ্ঞাপন ছিল পশুসম্পদ আর পত্নীসংখ্যা। শাস্ত্রে যখন বলে, সেই ব্যক্তিই ভাগ্যবান যার পশুর সংখ্যা তার স্ত্রীর সংখ্যার চেয়ে বেশী। [সমৃদ্ধং যস্য কনীয়াংসো ভার্যা আসন ভূয়াংসঃ পশবঃ --- শতপথব্রাহ্মণ ২/৩/২/৮] তখন সহজেই বোঝা যায় স্ত্রীর সংখ্যা কত ছিল। সাম্প্রদায়িকতার ঝাঁঝে আজ বলা হয়ে থাকে মুসলমানের দুর্নীতির একটা প্রমান হল, সে চারটে বিয়ে করতে পারবে, যদিও বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখি, খুব কম মুসলমানই চারটি স্ত্রীর স্বামী। এই সাম্প্রদায়িকতা-দুষ্ট উক্তি শুনল প্রথমেই মনে হয়: আর কুলীন ব্রাহ্মণের তো চার স্ত্রীতে কুলোতই না। বাঁধানো খাতা তল্পিবাহকের হাতে দিয়ে ঠিকানা খুঁজে খুঁজে ভিন্ন ভিন্ন স্ত্রীর বাড়িতে একরাত্রির অতিথি হয়ে শ্বশুরবাড়ির আতিথ্য, স্ত্রী-সম্ভোগ এবং যথাসম্ভব দক্ষিণা আদায় করে পরবর্তী স্ত্রীর ঠিকানা খুঁজে সেখানে হাজির হওয়া -- এই ছিল কুলীন ব্রাহ্মণের জীবিকা। এ সমাজের মানুষের মুসলমানের বহুপত্নীকতা নিয়ে বক্রোক্তি করবার কোনো অধিকার নেই। আইনের বলে এবং আর্থিক কারণে ঐক্যদাম্পত্যই এখন সমাজে বিবাহের একমাত্র রূপ।

গোষ্ঠী ও কৌম ভেঙে এল 'কুল' অর্থাৎ বৃহৎ যৌথ পরিবার, যেখানে একটি বিস্তৃত গৃহে বেশ কয়েক পুরুষ একত্র বাস করত, মনে হয় তখনই ঐক্যবিবাহ প্রবর্তিত হয়। তার বহু আগে বহু পুরুষ ও বহু নারী একত্র বাস করত, দাম্পত্য ছিল ক্ষণস্থায়ী সকল পুরুষেরই অধিকার ছিল কৌমের সকল নারীতে। পিতৃপরিচয় নিয়ে কোনো মাথাব্যথা ছিল না; এমনকি প্রাচীন প্রাগৈতিহাসিক যুগে যৌনমিলনের সঙ্গে সন্তান-জন্মের বৈজ্ঞানিক সম্পর্কটাই জানা ছিল না। এরই একটা রেশ থেকে গেছে মাতৃ-ধারায় প্রবাহিত পরিবারের গঠনতন্ত্রে, যেখানে সন্তান মাতৃপরিচয়ে অভিহিত হত, যেমন মহাভারতের যুগেও দেখি কৌন্তেয়, মাদ্রেয়, গাঙ্গেয়, রাধেয় ইত্যাদির মধ্যে। মানুষ যখন সন্তান-উৎপত্তির বৈজ্ঞানিক কারণটা জানত না তখন যেটা চোখে দেখতে পেত সেটা হল মায়ের গর্ভ থেকেই সন্তান আসে। কাজেই পিতৃপরিচয় তখন ছিল অনুমানসাপেক্ষ, মাতৃপরিচয় একেবারেই স্পষ্ট, তাই মাতার পরিচয়ে পুত্রের অভিহিত হওয়া খুবই স্বাভাবিক ছিল। তার অনেক পরে, সমাজে ব্যক্তিগত সম্পত্তি দেখা দিল, মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে কৃষিবাণিজ্যজাত সম্পত্তি সঞ্চিত হতে লাগল। তখন সম্পত্তিমান পিতার পরিচয়ে পুত্রের পক্ষে অন্য একটি তাৎপর্য বহন করতে শুরু করল।

ঐতিহাসিকভাবে আদিম সমাজে নারী-পুরুষ সম্পর্ক ছিল যৌথ: একটি প্রজন্মের সব নারী ও পুরুষেরই অধিকার ছিল সেই প্রজন্মের সব নারীর ও পুরুষের সঙ্গে যৌন সম্পর্কে সম্পৃক্ত হবার। পরের ধাপে বাদ যায় ভাই বোনের যৌন মিলন। [সম্ভবত ঋগ্বেদের যম-যমী সংলাপের মধ্যে এই নিষেধের একটি ইঙ্গিত বিধৃত আছে -- ঋগ্বেদ ১০/১০] তার পরে, অনেক পরে এল ঐক্যদাম্পত্য; অন্য স্তরগুলির মত এই স্তরেও সম্পর্কের নির্ণায়ক ছিল অর্থনীতি। সাধারণ যৌথ গোষ্ঠী কৌমের সমবেত পশুধনে গোষ্ঠী এবং/বা কৌমের সাধারণ অধিকারের স্তরে এক প্রজন্মের নারী পুরুষের সাধারণ সম্পর্কে ছিল। পরে ভ্রাতা ভগিনীর যৌন সম্পর্ক নিষিদ্ধ হয়। তারপরে যখন ব্যক্তিগত সম্পত্তি দেখা দিল সমাজে, তখন ধীরে ধীরে 'কুল' ভেঙে ঐক্যদাম্পত্য দেখা দেয়। এক স্বামী ও এক বা বহু স্ত্রীর সংসার। এর পেছনে ক্রীতদাস বা দাসদের ভূমিকাও সক্রিয়। শ্রমসাধ্য কাজের ভার নারীর বদলে এসে পড়ল দাসের ওপরে। এতে নারী উৎপাদন ব্যবস্থা থেকে সরে এসে পরিবারে ক্রীতদাসীর ভূমিকা নিতে বাধ্য হল। মিল্ বলেন 'কোনো ক্রীতদাসই ততদূর পর্যন্ত এবং সম্পূর্ণভাবে ঠিক সেই ভাবে ক্রীতদাস নয় যেমনটা স্ত্রী'। অন্যত্রও এমন কথা পাই; একশো বছরেরও বেশি আগে এঙ্গেলস বলেছিলেন 'সমবেত উৎপাদন ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করা থেকে বিতাড়িত হয়ে স্ত্রী প্রথমে গৃহদাসীতে পরিণত হল। গার্হস্থ্য প্রকাশ্যে বা ছদ্মভাবে নারীকে দাসীতে পরিণত করার ওপরেই বর্তমান ক্ষুদ্র পরিবার প্রতিষ্ঠিত'।

ব্যক্তিগত সম্পত্তির আবির্ভাবের পরে সমাজে যে সব গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটতে লাগল তার মধ্যে একটা হল যে, সম্পত্তিমানের নতুন একটা শিরঃপীড়া দেখা দিল; তার সঞ্চিত সম্পত্তি সে তার বৈধ উত্তরাধিকারীর জন্যে রেখে যাবে। বৈধ মানে ঔরস পুত্র। অবস্থার বিপাকে অন্য নানারকম পুত্রও সম্পত্তিতে কমবেশী অধিকার অবশ্য পেত। [মহাভারত ১/১১১/২৮-২৯] দেখি পুত্র নানারকম হতে পারে: প্রধানত শুনি ঔরস, পিতার বীর্যে মাতার গর্ভে জাত। 'কানীন', কন্যাটির প্রাকবিবাহ জীবনের সন্তান, যেমন কর্ণ। 'সহোঢ়', যে সন্তানকে গর্ভে নিয়ে কন্যার বিবাহ হল। 'গৃঢ়োৎপন্ন' বিবাহের পরে গোপনে অন্যপুরুষের দ্বারা সঞ্জাত সন্তান। 'পুত্রিকাপুত্র' অপুত্রক পিতা এই শর্তে কন্যার বিবাহ দিতেন যে প্রথম পুত্রটিকে কন্যার পিতা আপন পুত্র বলে গ্রহণ করবেন। 'ক্রীত', অর্থ দিয়ে অন্যের যে সন্তানকে ক্রয় করা হয়েছে। 'দত্তক', অন্যের সন্তানকে তার অনুমতিক্রমে আপন সন্তানের পরিচয়ে তার স্থলাভিষিক্ত করা। 'স্বয়মুপাগত' যে বালক নিজেকে অন্যের কাছে বিক্রয় করে। 'পৌনর্ভব' হল নিয়োগের দ্বারা জাত বিধবার বা নিষ্প্রজ স্বামীর স্ত্রীর সন্তান -- এত রকমের সন্তানকে সমাজ স্বীকার করেছিল কারণ সমাজ চাক বা না চাক, এ সব সন্তান ছিল।       

========================================================================

দাম্পত্য জীবন যদি যৌথ পরিবারে কাটাতে হয় তাহলে পরিবারে দৈনন্দিন জীবনের খুঁটিনাটি ও শ্বশুরবাড়ির লোকেদের মন্তব্য নিয়ে অশান্তি দাম্পত্য সুখশান্তি নষ্ট করে। যদি শ্বশুরবাড়িতে বধূটি মানবিক ব্যবহার পায়, তাহলে, দম্পতিটির পরস্পরের মধ্যে সম্পর্ক ভাল থাকলে, শান্তি থাকে। কিন্তু প্রতিবেশীদের প্রতিক্রিয়া বিরূপ হলে তার প্রভাবও দম্পতির জীবনে প্রতিঘাত সৃষ্টি করে। প্রতিবেশীদের মারফতে সামাজিক প্রতিক্রিয়াও এসে পৌঁছয় এবং তার প্রতিকূল হলে শান্তি নষ্ট হয়। প্রতিবেশীরা সমাজের প্রতীক, যে সমাজ অদৃশ্য থেকে অন্তরাল থেকে নিয়ন্ত্রণ করছে রাষ্ট্র। রাষ্ট্র বিত্তকৌলীন্য, পুরুষতন্ত্র, বর্ণবৈষম্যের মূল্য বোধে নির্মিত; এবং এইসব যেন কায়েম থাকে সে ব্যবস্থা নেপথ্য থেকে আইন, সাহিত্য, গণমাধ্যম সব দিয়েই প্রতিষ্ঠা করে।

========================================================================

সমস্যার মৌলিক উৎপত্তিস্থল দম্পতির একান্ত ব্যক্তিগত মানসিক সম্পর্কে। দুজনের শিক্ষাদীক্ষার মান -- প্রাতিষ্ঠানিক নয় -- যথার্থ শিক্ষার মানে যদি দুস্তর ব্যবধান থাকে তবে তা মানসিক সাহচর্যের পথে অন্তরায় হতে পারে। তেমনি অথবা হয়ত তার চেয়েও বেশি দুরতিক্রম্য হল রুচির ব্যবধান। ... কার্পণ্য ও উদারতার সংঘাত খুবই মর্মান্তিক। ... এছাড়াও আছে আদর্শগত ব্যবধান।  একজন হয়ত কোনো রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাসী, অন্যজন তার বিপরীত পন্থার অনুগামী, কিংবা দেশ বা সমাজে কল্যাণ সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসীন। এ অবস্থার একের ঔদাসীন্য অপরকে তার সত্তার খুব গভীর স্তরেই আঘাত করে, কিংবা দুই বিরুদ্ধ রাজনৈতিক মতবাদের সংঘাত দুজনকেই করে। এ ধরনের বৈষম্য উপেক্ষণীয় নয়, বিশেষত যদি দুজনের বা একজনেরও আদর্শে বিশ্বস্ত আন্তরিক হয় তার জীবনের তাৎপর্যবোধের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী হয়ে জড়িয়ে থাকে। এগুলো বেশিরভাগই ঘটে সম্বন্ধ করা বিয়েতে। ...

বেশ বেশি সংখ্যায় বিয়ে ভাঙে আর্থিক কারণে। অভাবে। অথবা প্রত্যাশিত সচ্ছলতার অভাবে। আজকের দিনে আয় সে অনুপাতে বাড়ছে না এবং সন্তানসন্ততি এলে প্রত্যাশিত ভাবে পারিবারিক ব্যয়ভার দুর্বহ বোধ হচ্ছে, তখন দেখা দেয় পরস্পরকে দোষ দেওয়ার প্রবণতা। প্রথমে আয় বাড়াবার চেষ্টা, তা ব্যর্থ হলে ব্যয়সংকোচের প্রয়াস এবং বর্তমান পৃথিবীতে যেহেতু সমস্ত গণমাধ্যমই ব্যয়সংকোচের পথটা বাৎলে চলেছে, তাই অচিরেই দুপক্ষই যেন দেখতে পায় ব্যয়সংকোচের পথটা একটা কানাগলিতে গিয়ে ঠেকেছে। এর ওপরে আছে, প্রতিবেশী ও পরিচিত পরিবারগুলির জীবনযাত্রার মানের সঙ্গে, চেতনে অথবা অবচেতনে, নিজেদের অবস্থার একটা তুলনার প্রয়াস যা প্রায়শই নিজেদের জীবনযাত্রার মান, অত্যন্ত উচ্চবিত্ত বাদে আর সকলের ক্ষেত্রেই যে ক্রমাগতই নেমে যাবে এই বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক প্রক্রিয়াটিকে স্বরূপে বোঝবার মত মুক্ত দৃষ্টি বেশিজনের থাকে না। ... আদর্শগত কোনো স্থৈর্য বা স্বল্পে সন্তুষ্ট হবার সহজাত, বা সাধনায় আয়ত্ত-করা ক্ষমতা যার নেই, এই পরিবেশে তার মর্মপীড়া বাড়বেই।

========================================================================

উচ্চবিত্ত মধ্যবিত্ত সমাজে নারী সম্পদ উৎপাদন ব্যবস্থার শ্রম থেকে অব্যাহতি পেয়েছে। এখন তার ওপর বর্তেছে সম্পদের উত্তরাধিকারী ভোক্তা উৎপাদন করার দায়িত্বটি।

========================================================================

১৭৯২ সালে মেরি হ্বলস্টনক্রাফট লিখেছিলেন 'আমি বিশ্বাস করি যে, পুরুষের একচ্ছত্র অধিকারের দাপট থেকেই নারীর স্বভাবে বহু ভ্রমপ্রমাদ জন্ম নেয়। ... স্বাধীনতা পেলে তার চরিত্র অনেক বেশি পরিপূর্ণতা পাবে।' এ অবজ্ঞা নানা প্রসঙ্গে বিয়ে করে, এবং দুঃখের বিষয়, নারী নিজেও এই বোধবিশ্বাসের পরিবেশেই লালিত হয়। বারেবারে শোনা যায় তাচ্ছিল্যের সঙ্গে উচ্চারিত 'মেয়েমানুষ' এবং গর্ব ও দম্ভের সঙ্গে উচ্চারিত 'পুরুষ'। ... কাজেই শুধুমাত্র অর্থনৈতিক স্বাতন্ত্র্য নারীকে এই বোধ দিতে পারছে না যে সে সংসারে পুরুষের সমকক্ষ। এর জন্যে চাই চেতনার মুক্তি। ... মহাভারতের বনপর্বে দ্রৌপদী সত্যভামাকে বলেছিলেন যে প্রত্যূষে উঠেই সারাদিন তিনি অবিশ্রাম গৃহকর্ম করে চলেন; তাঁর মধ্যরাতের বিশ্রাম পর্যন্ত দায়িত্বের যে ফিরিস্তি তিনি দেন, তার সঙ্গে মেলে তাবৎ ধর্মশাস্ত্রে গৃহিণীর দিনচর্যার নির্দেশ। এমন কথাও আছে যে নারী সর্বদাই গৃহকর্মে ব্যাপৃত থাকলে সে অন্যায়কর্ম থেকে নিরস্ত থাকে। তবে এমন ফিরিস্তি বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্টে ও ইসমালিক শাস্ত্রেও ঠিক একই রকমের। এর মুলে সব প্রাচীন সমাজেই বিশ্বাস ছিল, যে নিরন্তন কাজের মধ্যে না থাকলে নারী দুশ্চরিত্র হয়ে যাবে, তাকে সে সুযোগ না দেওয়া তার চরিত্র-রক্ষারই একটা উপায়। কিন্তু দাম্পত্যে কাজের ভারের এই অসম বন্টন নারীকে শরীরে মনে পীড়িত করে এবং এর ফলে যে অশান্তির সৃষ্টি হয় তার কোনো প্রতিকার থেকে না। আরও ক্ষতি হয়: পুত্রকন্যারা বুঝে যায় গৃহকর্ম নারীরই এলাকা, অর্থাৎ ঐ অসাম্যের বিষয়টা সঞ্চারিত হয় পরবর্তী প্রজন্মেও।    

========================================================================

একটা বিকল্প হচ্ছে, শিশুটি যাতে বেড়ে ওঠার পথে মোটামুটি অনুকূল একটা পরিবেশ পায় তার ব্যবস্থা করে দুজনের বিচ্ছিন্ন হওয়া। এখানে অন্য একটি প্রশ্নও থাকে ঐ দুটি নরনারী প্রথম বিবাহে সুখ পায়নি, যে কোনো কারণেই হোক বিয়েটা ভেতর থেকে যখন ভেঙে গেছে তখন কৃত্ৰিম অভিনয়ে সেটাকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা না করে সরাসরি প্রকাশ্যে ভেঙে দেওয়া এবং দুজনে সম্ভব হলে অন্য সঙ্গী বেছে নিয়ে দ্বিতীয়বার সুখ পাবার চেষ্টা করা। এখনো সমাজ একে ঐ দুটি মানুষের স্বার্থপরতার প্রমাণ হিসেবেই দেখে। সে দেখাটা ভুল। যখন বিধবাবিবাহ আন্দোলন হয় তখন তাঁর মূল মানবিক প্রেরণার উত্স কী ছিল? একটি নিরপরাধ নারীর জীবন যাতে পুনর্বার সুখের সন্ধান পায় তা-ই ত? সে নারীর বয়স চোদ্দ না চব্বিশ না চল্লিশ তা তো আলোচ্য ছিল না। সে সন্তানবতী না নিঃসন্তান তা-ও ত ভাবা হয়নি? তার জীবনটা যেন অকালে শুকিয়ে না যায় সে যেন দাম্পত্যসুখের সন্ধান পায় এই ছিল সে আন্দোলনের মূল প্রেরণা। অপরপক্ষে, কোনো বিপত্নীকের দ্বিতীয়বার বিবাহ করা নিয়ে সমাজ কখনোই কোনো মন্তব্য করেনি; বরং একথা বলেছে, স্ত্রীর মৃত্যুর পরদিনই তার কথা প্রশস্ত এবং বিধেয়। লোকে পোষা কুকুর বেড়ালের মৃত্যুতেও কয়েকদিন মুষড়ে থাকে, এ সমাজে স্ত্রীর স্থান গৃহপালিত জন্তুরও নীচে! কাজেই একবার নির্বাচনে ভুল হলে পুনর্বার নির্বাচন করার অধিকার থাকাই উচিত, প্রথমত এখনো অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রথমবার সঙ্গীকে নির্বাচন করে দেয় পরিবার, সেখানে পাত্র পাত্রীর, বিশেষত কন্যার মত প্রায় উপেক্ষিত। ফলে অন্তত মেয়েদের জন্যে ঐ দ্বিতীয়বার সুখের সন্ধান করার পথটা খোলা রাখা বিশেষ প্রয়োজন। মেয়েদের জন্যে বিশেষ করে বলছি এই কারণে যে, পুরুষের পক্ষে সে পথ বরাবরই খোলা থেকেছে। বিধিমতে বিবাহিত স্ত্রী সীতাকে রামচন্দ্র বলেছিলেন 'তোমাকে আমার আর প্রয়োজন নেই, তুমি যাও'। এখনো বাড়িবাড়ি বহু মেয়ে বাসন মাজতে আসে কারণ 'স্বামী নেয়না'। স্বামী না নেবার অধিকারটি পেয়েছে আমাদের 'মর্যাদা পুরুষোত্তম' রামের কাছেই। কারণ বলাই আছে, রামের মত আচরণ করবে, রাবণের মত নয়। [রামাদিবৎ প্রবর্তিতব্যং ন রাবণাদিবৎ] কাজেই স্বামীরা নিরপরাধ স্ত্রীকে মিথ্যে সন্দেহে ত্যাগ করার পরোয়ানা পেয়েছে খোদ রামচন্দ্রের কাছে; এবং অন্তত এব্যাপারে অসংখ্য পুরুষ রামের মতই আচরণ করে। এই পরিত্যক্তা স্ত্রীর দ্বিতীয়বার নতুন জীবনে সুখী হবার মৌলিক অধিকার আছে। বিশেষত, পুরুষ যেখানে হামেশা এক বউ ছেড়ে আবার বিয়ে কিংবা বিয়ে না করেই সংসার পাতে।

প্রায়ই প্রশ্ন ওঠে, বিয়ে ভেঙে যদি দ্বিতীয় সংসারেও সুখ না আসে তাহলে তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম এইভাবেই কি চলবে? এর উত্তরে বলা যায় আইন যখন বিচ্ছেদের পরে পুনর্বার বিয়ের অধিকার দিয়েছে এবং ক'বার বিয়ে করা চলবে তার কোন সংখ্যা নির্দেশ করেনি, তখনই তো বারেবারে সুখের সন্ধান করার অধিকার কায়েম হয়েছে। মুশকিল হল, এমন বহু নজির আছে যেখানে দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুরবারে সঙ্গী নির্বাচনটি পাকাপাকি সুখের সন্ধান দিয়েছে এবং তার পরের যুগ্মজীবন তিরিশ চল্লিশ বছর অব্যাহত সুখে কেটেছে। এই নির্বাচনের মূল অধিকারটি সংখ্যাসীমা দিয়ে বাঁধতে গেলে এটা সম্ভব হত না। কেউ কেউ বলেন, আরও অনেক নজির আছে যারা বারেবারে পরীক্ষা নিরীক্ষা করেও কোথাও স্থিতিলাভ করেনি। তেমন অনেক নারী বহু পরীক্ষা নিরীক্ষায় ক্লান্ত হয়ে শেষ জীবনে কখনো বিষণ্ণ, কখনো প্রসন্ন মনে একক জীবনকেই মেনে নিয়েছে। এদের সমাজের বিরুদ্ধে কোনো নালিশ নেই, কারণ নিজের জীবন নিজের মত পরিচালনা করার স্বাধীনতা এরা সমাজের কাছে পেয়েছিল। সে পরিচালনায় সুখ হয়ত আসেনি, কিন্তু ঐ স্বাধীনতাটা ছিল তার মৌলিক অধিকার। 

========================================================================

... ইদানীং বহু সংসারে দাম্পত্য কলহ বাড়ছে, সেটা হল সংসারে গৃহকর্ম একা মেয়েটিকেই সামলাতে হয়। উচ্চবিত্ত পরিবারের পক্ষে অত্যধিক পারিশ্রমিক দিয়ে লোক নিযুক্ত করে এবং গৃহকর্ম নির্বাহ করা সম্ভব। নিম্নবিত্ত পরিবারে ধরে নেওয়াই হয় যে বাইরে কাজ করলেও আর্থিক অসঙ্গতির জন্যে গৃহকর্মে বাইরের লোকের সাহায্য পাওয়া সম্ভব নয়; তাই সমস্ত চাপই বধূটির এবং একটু বড় ছেলেমেয়ের ওপরে পড়ে। ইদানীং বাড়িতে কাজের লোক পাওয়া প্রায় অসম্ভব। মধ্যবিত্ত যে টাকা দিতে পারে তাতে তো বটেই। অথচ মধ্যবিত্ত মানসিকতা ভৃত্যনির্ভর, কাজেই এখন বাইরে চাকরি করে যে বধূটি সে জানে বাড়ি ফিরে অধিকাংশ গৃহকর্ম তাকেই সমাধা করতে হবে। ... যত্রতত্র ভুল ইংরিজি বলে, বুঝে না বুঝে ইংরিজি ছবি দেখে, 'মামি ড্যাডি'র বকুনিতে বিগলিত যে অপসংস্কৃতিতে পুষ্ট আজকের মধ্যবিত্ত মানস, তার মধ্যে পাশ্চাত্য প্রভাবের সুস্থ দিকগুলি এখনো পৌঁছল না।

========================================================================

বিবাহ যদিও দুটি মানুষের ব্যক্তিগত সম্পর্ক, তবুও রাষ্ট্রও এতে সক্রিয় ভূমিকা নেয়। বিবাহ হল পরিবার সৃষ্টির সুস্পষ্ট উদ্দেশ্যে নারী ও পুরুষের মধ্যে একটি সংবিধান-সম্মত মিলন। এই কারণেই রাষ্ট্র এই মিলনে উৎসাহী এবং এটিকে নিয়ন্ত্রণ করার কর্তব্য নিজে স্বীকার করে নেয়। .... বিবাহ অর্থাৎ রাষ্ট্রসমর্থিত নারীপুরুষের মিলন থেকে সন্তান এলে একটি পরিবারের সূচনা হয়, যা ধীরে ধীরে পল্লবিত হয়ে বৃদ্ধিলাভ করে। অর্থনৈতিক, রাষ্ট্রনৈতিক ও সামাজিক একক সেই পরিবার; কাজেই তা যেন সমাজের নির্দিষ্ট ছকের মধ্যে প্রবর্তিত হয় সে স্বার্থ সমাজ তথা রাষ্ট্রেরই। বিবাহ রাষ্ট্রের পক্ষে প্রয়োজনীয়। 

========================================================================

ফরাসী বিপ্লবের পরে যে সংবিধান রচিত হয় তার সম্বন্ধে এমন কথাও বলা হয়েছে যে সংবিধান কিছু ব্যক্তিকে অন্যদের চেয়ে বেশি অধিকার দিয়েছে, কিন্তু নারীকে কিছুই দেয়নি। .... এই ধরণের বৈষম্য পৃথিবীর সকল দেশে বহু জগ ধরে চলিত আছে অথচ রাষ্ট্র-সঙ্ঘের সমীক্ষা বলে 'পৃথিবীর জনসংখ্যার অর্ধেক নারী, এরা পৃথিবীর মোট শ্রম-প্রহরের দুই তৃতীয়াংশ পরিশ্রম সে-ই করে থাকে, পৃথিবীর উপার্জনের এক দশমাংশ ভোগ করে এবং পৃথিবীর সম্পত্তির এক শতাংশেরও কমের অধিকারিণী।'

========================================================================

সিমোন দ বোভোয়া এই প্রসঙ্গে চূড়ান্ত অত্যুক্তি করেছেন এই বলে যে, 'বলা হয় বিবাহ পুরুষকে খর্ব করে। এ কথা প্রায়শই সত্য, কিন্তু প্রায় সর্বদাই বিবাহ নারীকে ধ্বংস করে।'

========================================================================

... বহু বিকৃতিতে, স্বার্থসংকীর্ণ, অহমিকানিষ্ঠ সংঘাতে যুগে যুগে দাম্পত্য থেকে প্রেম অন্তর্নিহিত হয়েছে। পড়ে থেকেছে শুধু বন্ধনটি। যে হতে পারতো সহচর বা সহচরী সে হয়ে ওঠে কারা-প্রহরী।

========================================================================

... সমস্ত দাম্পত্যে নিষ্ঠা একনিষ্ঠতা ও দৃঢ়তার দায়টা দেওয়া হত বধূটির ওপরে, তার পাতিব্রত্য ছিল অপরিহার্য। তাকে সতী বধূ হতে হবে অথচ ঐ সতীর কোনো পুংলিঙ্গ প্রতিশব্দই নেই।

========================================================================

শরীর ও মন সমান প্রাধান্য পেলে তবেই দাম্পত্য সত্যিকার একটি দৃঢ় ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে, এবং এ ভিত্তির কোনো বিকল্প নেই।

========================================================================

অতিভোগ যে দাম্পত্যকে বিপথে নিয়ে যায়, সুখের বদলে দেয় সম্ভোগ, এ আজ ঘরে ঘরেই দেখা যাচ্ছে। প্রায়ই শোনা যায় জীবন যখন একটাই, তখন যতটা ভোগ করে নেওয়া যায় তার চেষ্টা করতে দোষ কী? দোষ প্রথমত, ঐ নগ্ন অতিলুব্ধতা মানুষের কুৎসিত একটি রিপু, যা অশুভ ও অশুচি। দ্বিতীয়ত, এই লোভের ভোগের আতিশয্যে মানুষ সেই সব কিছুকে হারাতে বসেছে যা জীবনকে অর্থপূর্ণ করে তোলে। প্রেম, আদর্শ, মানবিক মূল্যবোধ, সাধারণ মানুষের কল্যাণের জন্য তৎপরতা, নতুন সুন্দর এক পৃথিবী রচনার স্বপ্ন। কুবেরের সাধনা শ্রীকে পরাহত করছে, অতিভোগের লালসা দাম্পত্যকে কলুষিত করছে। 

========================================================================




  

Tuesday, 11 August 2020

প্রেম, বিবাহ ও অন্যান্য - প্রবীর ঘোষ

নারীরা যতই নারী স্বাধীনতা ও পুরুষের সমান অধিকার দাবি করুন না কেন, বেকার ছেলে বিয়ে করতে তো কখনওই বিজ্ঞাপন দেন না! তবে বেকার মেয়েরা কি করে প্রত্যাশা করেন রাজপুত্তুররা তাঁদের বিয়ে করবেন? আসলে মেয়েদের চেতনার অণুতে সংস্কারের মজ্জায়-মজ্জায় ঢুকে গেছে স্বামীকে আভিজাত্যের নিদর্শন একটি বস্তু হিসেবে পরিমাপ করা, স্বামীকে নিজের চেয়ে অনেক বড় মাপের হিসেবে চাওয়া, নিজের ওপর স্বামীর স্বত্বাধিকার মেনে নেওয়া।

***********************************************************

স্ত্রীর উপর স্বামীর এমন স্বত্বাধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কারণ অনেক ক্ষেত্রেই স্বামীর উপর স্ত্রীর অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা। অনেক সময় সামাজিক পরিবেশগত কারণে অনেক নারী ধরেই নেন, স্বামী-পুত্র-কন্যার সেবায় জীবন উৎসর্গ করার মধ্যেই নারী জীবনের সার্থকতা। এরা অবশ্যই মধ্যবিত্ত মানসিকতার মানুষ। আপনি যখন মা হিসেবে ছেলের জামা-প্যান্ট ধোয়া, ইস্ত্রি করা, স্কুলের টিফিন তৈরি করে গুছিয়ে দেওয়া, জুতোর পালিশ ঠিক রাখা ইত্যাদি কাজগুলো করেন স্নেহময়ী জননীর মহান কর্তব্য হিসেবে, তখন একবারের জন্যেও কি ভেবেছেন আপনার এমনতর কাজ-কর্মের ফলে যৌবনে পৌঁছে আপনার ছেলে প্রত্যাশা করবে তার স্ত্রীও এমনি করে গৃহকর্ম ও শিশুপালনের কাজগুলো একা হাতেই সামলাক? সে তখন নিশ্চয়ই স্ত্রীকে গৃহকর্ম, শিশুপালন ইত্যাদি বিষয়ে পরিপূর্ণ সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসবে না। আপনার মেয়ে যৌবনে পৌঁছে আপনার প্রভাবে এটাই ধরে নেবে এসব কাজ করার একক দায়িত্ব একজন আদর্শ স্ত্রী ও মা হিসেবে তারই। এখনও আমাদের সমাজে সাধারণভাবে প্রচলিত স্ত্রী চাকুরিরতা হলেও তার উপরই বর্তায় গৃহকর্ম ও শিশুপালনের ঝক্কি। এমন এক অবস্থা সৃষ্টির জন্য দায়ভাগ পুরুষশাসিত সমাজ ব্যবস্থায় যেমন পুরুষের ওপর বর্তায়, তেমনই কিছুটা দায়ভাগ অবশ্যই নারীদের, যাঁরা এই ধারাকে স্থায়ী রাখার মানসিকতা সন্তানদের মধ্যে তৈরি করে চলেছেন।

***********************************************************

যৌন-মুক্তির বা যৌন স্বাধীনতার দাবি যদিও ধনতান্ত্রিক সভ্যতারই দাবি, তবু এই দাবি প্রতিষ্ঠার মধ্যেই রয়েছে ধনতন্ত্রের ধ্বংসের বীজ। কারণ, যৌন স্বাধীনতার একান্ত অনিবার্য শর্ত - সাম্য, নারী-পুরুষে সাম্য, মানুষে মানুষে সাম্য, মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা। আর এই সাম্য ধনতান্ত্রিক সমাজ কাঠামোর ধ্বংস ছাড়া সম্ভব নয়। মুক্ত যৌন-প্রণয়ের আবশ্যিক শর্ত হওয়া উচিত অবদমনহীন, শোষণহীন, বন্ধুত্ব ও বিশ্বাস দ্বারা প্রতিষ্ঠিত মানবীয় সম্পর্ক।

***********************************************************

একগামী মানে অবশ্য আজীবন একজনের সঙ্গেই যৌননিষ্ঠ থাকবে - এমনটি অবশ্যই নয়। যে মানুষের জীবন বেশি গতিময়, জীবনে উত্থান-পতন বেশি, তাদের বন্ধুরাও পরিবর্তিত হতে থাকে। প্রেমিকা বা প্রেমিক একজন 'বিশেষ বন্ধু'। এই 'বিশেষ বন্ধুত্ব'ও পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে পাল্টাতে পারে। জীবনে যেমন পুরনো বন্ধুদের কেউ কেউ বিদায় নেয়, কেউ কেউ আসে -- তেমন কোনও 'বিশেষ বন্ধু' জীবনে এলে স্বাগত জানানোই উচিত।

***********************************************************

প্রেম বা দাম্পত্য জীবনের আদর্শ সম্পর্ক গড়ে ওঠার প্রাথমিক ও আবশ্যিক শর্ত যৌনতা নয়। নাহলে গণিকা ও লম্পটরাই হত সেরা প্রেমিকা ও প্রেমিকের উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্ত। .... প্রেম বা দাম্পত্য জীবনের প্রাথমিক ও আবশ্যিক শর্তই হলো বন্ধুত্ব, বিশ্বাস, শ্রদ্ধা এবং মতাদর্শগত মিল।

***********************************************************

রাজনীতি সচেতন, আদর্শ সচেতন, মূল্যবোধ সচেতন, আত্মমর্যাদা সচেতন, স্বাধীন মানসিকতাসম্পন্ন দম্পতিদের বিচ্ছেদ তুলনামূলকভাবে অসচেতন ও স্বল্পসচেতন দম্পতিদের চেয়ে অনেক বেশি ঘটে। দু'জনেই যখন আদর্শ-সচেতন, মূল্যবোধ-সচেতন, আত্মমর্যাদা সম্পন্ন, রাজনীতি ও সমাজনীতি সম্পর্কে সচেতন তখন আদর্শগত দ্বন্দ্ব দেখা দিতেই পারে - সেটা একপক্ষের আদর্শচ্যুতির জন্যে যেমন হতে পারে, তেমনই আদর্শগত মতপার্থক্য থেকেও হতে পারে। এই দ্বন্দ্ব নিয়ে 'প্রেমিক-প্রেমিকা' অথবা 'স্বামী-স্ত্রী'র সম্পর্ক অটুট রাখা অবাঞ্ছিত মনে হওয়াটা অস্বাভাবিক কি?

***********************************************************

কোনটা সত্যি? হিন্দুদের ঈশ্বর-বিশ্বাস, নাকি মুসলিমদের আল্লা-বিশ্বাস? আমি যদি হিন্দু থেকে মুসলিম হয়ে যাই, তবে কি আমার ঈশ্বর সাকার থেকে নিরাকার হয়ে যাবেন? আমি ইসলাম ধর্ম ছেড়ে হিন্দু হলে আমার ঈশ্বর নিরাকার থেকে আবার বিশিষ্ট হতে বাধ্য হবে?

আমার ইচ্ছেতেই যদি আমার ঈশ্বরের রূপ সাকার বা নিরাকার হতে বাধ্য হন, তবে তো আমি আমার ঈশ্বরের চেয়েও বেশি শক্তিমান।

***********************************************************

কেউ কেউ মনে করেন, ঈশ্বর জগতের স্রষ্টা, যেমন কুম্ভকার মৃৎপাত্রের স্রষ্টা। ঈশ্বর সর্বব্যাপী। ঈশ্বর স্রষ্টা হলে তিনি কুম্ভকারের মত মাটি ও মৃৎপাত্র হতে পৃথক। ঈশ্বর যদি তাঁর সৃষ্টি থেকে পৃথক হন, তবে সর্বব্যাপ্ত হতে পারেন না।
ঈশ্বর যদি সর্বশক্তিমান হন, তাঁর ইচ্ছাতেই যদি মানুষের কাজ-কর্ম নির্ধারিত হয়, তবে অসৎ কাজের জন্য মানুষ কেন দায়ী হবে?
মনুষ্য জগতের বাইরের অন্যান্য প্রাণী, যাদের ভাল-মন্দ বিচার-বোধ নেই, তাদের কাজ-কর্মের জন্য ঈশ্বর কী ভাবে তাদের দায়ী করবে?
পৃথিবীতে সুখের চেয়ে দুঃখের পরিমাণ বেশি। তবে কি ঈশ্বর যতটা দয়ালু, তারচেয়ে বেশি নিষ্ঠুর?

***********************************************************