Wednesday, 20 March 2019

আর এস এস ও বর্তমান ভারত

নওজোয়ান ভারতসভার পুনর্গঠনের সময়ে ভগৎ সিং দীপ্ত কণ্ঠে বলেন, 'ধর্ম মানুষের ব্যক্তিগত বিষয় আর সাম্প্রদায়িকতা একটা শত্রু - এর বিরুদ্ধে লড়তে হবে।'

===================================================

'৪১ সালের দাঙ্গার পর গান্ধীজির সঙ্গীদের মধ্যে একদল ওয়াগা শিবিরে পাঞ্জাবের শরণার্থীদের জন্যে আরএসএস-এর কাজকর্মের কথা বললে গান্ধীজি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেন, 'কিন্তু ভুলে যেও না যে, হিটলারের নাৎসি এবং মুসোলিনীর ফ্যাসিস্তদেরও একই গুণ ছিল।' গান্ধীজি আরএসএসকে একনায়কতন্ত্রী দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন সাম্প্রদায়িক সংগঠন বলে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, 'জাতীয় আন্দোলনের পথ আখড়ার মধ্যে দিয়ে আসবে না ... এগুলি যদি হিন্দু মুসলমান সংঘর্ষের সময়ে আত্মরক্ষার জন্যে তৈরি হয়ে থাকে তবে তা ব্যর্থ হতে বাধ্য। মুসলমানরা একই খেলা খেলতে পারে। এই ধরনের উন্মুক্ত কিংবা গোপন প্রস্তুতি কেবলমাত্র সন্দেহ আর বিরক্তিরই সৃষ্টি করবে। এর দ্বারা কোনও সমাধানের পথে পৌঁছানো যাবে না।' (মহাত্মা গান্ধী : দ্য লাস্ট ফেজ, পেয়ারেলাল, আমেদাবাদ, পৃ.৪০; মহাত্মা : জি ডি তেনডুলকর, তৃতীয় খন্ড, বম্বে ১৯৪৫, পৃ.১৩০-৩৪)।

===================================================

যে 'রাম'কে কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করে আরএসএস তাদের সামাজিক আগ্রাসনের সূচনা ঘটিয়েছিল এবং যার সুযোগেই তাদের রাজনৈতিক সংগঠন ভারতীয় জনতা পার্টি আজ নানা কৌশলে ভারতের শাসনক্ষমতাকে দখল করে দেশকে একটি অন্ধকার যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে, সেই রামচন্দ্রের জন্মস্থানকে ঘিরে যে তাত্ত্বিক ভণ্ডামি হিন্দুত্ববাদীদের মূলধন যা নানাভাবে গত ষাট/সত্তর বছর ধরে ভারতীয় রাজনীতির পরিমণ্ডলে আবর্তিত হয়ে আসছে তার সূচনা হয় আনেত সুসান বেভরিজকৃত 'বাবরনামা'র ইংরেজি অনুবাদের প্রথম খন্ড 'ফরখনাখন্ত' ১৯১২ সালে প্রকাশ হওয়ার পর; এটির দ্বিতীয় খন্ড 'কাবুল খণ্ড' নামে প্রকাশিত হয় ১৯১৪ সালে, তৃতীয় খণ্ড 'হিন্দুস্তান খণ্ড' নামে ১৯১৭ সালে এবং ১৯২১ সালে সংযোজিত খণ্ড 'ভূমিকা ও বিষয়সূচি' যেখানে কেবলমাত্র অনুমানের উপর ভিত্তি করে অনুবাদিকা লেখেন, Presumably the order for building the mosque was given during Babar’s stay in Oudh in 934 A.H. (1528 AD), at which time he would be impressed by dignity and sanctity at the ancient at the ancient Hindu shrine it (at least in purk) displaced and like the obedient follower of Muhammad he was in intolerance of another faith, would regard the substitution a temple by a mosque as dutiful and worthy। অথচ ঐ মসজিদের গায়ে উৎকীর্ণ শিলালিপিতে ছিল : 'বা ফারমুদা-ই-শাহ বাবার কি আদিলাশ/বানাইসত তা কাখ-ই গর দুন মলাকি বানা কয়দ-ই মুহবিত-ই কুদসিঁয়া/আমির-ই সাআদাত-নিশাঁ মীর বাকি বুঅদ খয়ের বাকি চৌসাল-ই-বানাইশ/ইঁয় ওদ কি গুফতম, বুঅদ খয়ের বাকি', যার অর্থ হল, ''আদিলশাহ বাবরের ইচ্ছানুসারে ফেরেশতার ন্যায় সজ্জন মীর বাকি এই কীর্তি নির্মাণ করেছে, ৯৩৫ হিজরিতে এই নির্মাণ সমাপ্ত হয়েছে, এই কীর্তি তার মাহাত্ম্যের জন্যে চিরকাল অক্ষয় থাকবে"--এখানে কোথাও-ই মন্দির ভেঙে মসজিদের কথা নেই। ব্রিটিশ সরকারের 'ডিভাইড অ্যান্ড রুল' নীতির প্রয়োগের উদ্দেশ্যেই অনুবাদিকা বেভারিজ এই মন্দির ভেঙে মসজিদ নির্মাণের কথাটি লিখেছিলেন, যার উদ্দেশ্য ছিল জাতীয় আন্দোলনকে দুর্বল করা, সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে জিইয়ে রাখা। এটিই ছিল আরএসএসের জন্মের পিছনে ঔপনিবেশিকদের অবদান। এই অবদানকে শ্রদ্ধা জানিয়েই আরএসএস কোনোদিনই সাম্রাজ্যবাদবিরোধী কোনো অবস্থান নেয়নি। হেডগেওয়ার অবশ্য সত্যাগ্রহ আন্দোলনে যোগ দিয়ে সামান্য কিছুদিনের জন্যে কারাবাস করেছিলেন। এটি ছিল একটি কৌশলের অঙ্গ। কারণ '৩০-'৩১ সালের আইন অমান্য আন্দোলনকে আরএসএস তাদের ইতিহাসে একটি অপ্রাসঙ্গিক বিষয় হিসেবেই উল্লেখ করেছে।

===================================================

'৫০ সালে এইসব প্রবল পরস্পর-বিরোধী ভাবনার মধ্যেই যে ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান গৃহীত হয় তার জন্যে প্রায় সবটা কৃতিত্ব দিতে হয় নেহেরুকে। প্রবল চাপ সত্ত্বেও নেহেরুর অনন্যসাধারণ ব্যক্তিত্বের জোরে সংবিধানে কোনও ধর্মীয় গোষ্ঠীর প্রধান্যকে অস্বীকার করতে পেরেছিলেন সংবিধান প্রণেতা আম্বেদকর। নেহেরু এবং আম্বেদকরের যৌথ প্রচেষ্টায় সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদে লেখা হয়, 'freedom of conscience and the right freely to profess, practice and propagate religion.' - এই অনুচ্ছেদ রচনার পিছনে বামপন্থীদের অবদান কম ছিল না। ঘরে-বাইরে হিন্দুত্ববাদীদের প্রবল চাপ নেহেরু অস্বীকার করতে পেরেছিলেন আম্বেদকর এবং বামপন্থীদের ঐকান্তিক সহযোগিতার ফলে (এই বিষয়ে আরও তথ্যের জন্যে দেখুন, 'The limit of accommodation, Nehru, Religion and the State in India' নামক S.Mitra-র প্রবন্ধ, South Asian Research 9(2) 1989, Page 113)। ধর্মকে একান্ত ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে পরিগণিত করবার যে চিন্তাভাবনাকে আধুনিকতার দালাল আখ্যা দিতেও সেদিন হিন্দুত্ববাদী শক্তির দ্বিধা হয়নি। এরপরও ঘরে-বাইরে প্রবল বিরোধিতা সত্ত্বেও হিন্দু কোড বিলের অনুমোদন নেহেরুর হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা এবং আরএসএস-এর বিরুদ্ধে তীব্র লড়াইয়ের একটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য ফলশ্রুতি।

===================================================

হিটলারের সুরে সুর মিলিয়ে গোলওয়ালকার বলেছিলেন 'জার্মানদের জাতিত্বের গর্ব আজ আমাদের মুখ্য আলোচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিজেদের জাতীয় সংস্কৃতিকে কলুষমুক্ত করতে জার্মানি গোটা বিশ্বকে স্তম্ভিত করে সেমেটিক জাতি ইহুদিদের দেশ থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। সেখানে সর্বোচ্চ মহিমা নিয়ে জাতিত্বের গর্বকে তারা সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে। এটাও জার্মান দেশের মানুষ প্রমাণ করেছে যে, নিজস্ব ভিন্ন শিকড় রয়েছে এইরকম জাতি বা সংস্কৃতি একসঙ্গে মিশে একটা পূর্ণাঙ্গ সত্তা কোনও অবস্থাতেই তৈরি করতে পারে না। আমরা আমাদের এই শিক্ষা এই হিন্দুস্তানেও গ্রহণ করব...। প্রাচীন জাতিগুলোর অভিজ্ঞতা অনুমোদিত এই দৃষ্টিভঙ্গি হিন্দুস্তানের সমস্ত অহিন্দু মানুষ হয় হিন্দুদের ভাষা এবং হিন্দুত্বের সংস্কৃতিকে গ্রহণ করবে, হিন্দু ধর্মকে শ্রদ্ধা করবে, তাকে পবিত্র হিসেবে জ্ঞান করবে, হিন্দুদের গৌরব ছাড়া অন্য কোনও ধারণাকে তারা বিন্দুমাত্র প্রশ্রয় দেবে না। অর্থাৎ তারা কেবলমাত্র তাদের অসহিষ্ণুতার মনোভাব এবং এই সুপ্রাচীন দেশ এবং দেশের ঐতিহ্যের প্রতি অবজ্ঞার মনোভাবই ত্যাগ করবে না, এই দেশের প্রতি ভালোবাসা এবং ভক্তির মনোভাব তৈরি করবে। এককথায় হয় তারা আর বিদেশি হয়ে থাকবে না, তা না হলে সম্পূর্ণভাবে হিন্দু জাতির এই দেশে তারা থাকবে অধীনস্থ হয়ে, কোনও প্রকারেরই দাবি তাদের থাকবে না, কোনও সুযোগ-সুবিধা তারা পাবে না, কোনও প্রকারের পক্ষপাতমূলক ব্যবহারও তারা পাবে না। এমনকী নাগরিক অধিকার তাদের থাকবে না।' (উই অর আওয়ার নেশনহুড ডিফাইনড -এম.এস গোলওয়ালকার, নাগপুর ১৯৩৮, পৃ. ২৭,৫২)।

===================================================

আর্য-সমাজীদের শুদ্ধি আন্দোলন গোটা উত্তর ভারত জুড়ে যে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের সূচনা করেছিল তাকে জন্ম থেকেই নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে আরএসএস। সেই বিভাজনকে তারা আরও তীব্র থেকে তীব্রতর করে নিজেদের সাংগঠনিক আগ্রাসন বাড়িয়েছে। লালা মুনশিরাম ওরফে স্বামী শ্রদ্ধানন্দের নিহত হওয়ার পর গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, 'ভারতবর্ষের অধিবাসীদের দুই মোটা ভাগ, হিন্দু ও মুসলমান। যদি ভাবি, মুসলমানদের অস্বীকার করে এক পাশে সরিয়ে দিলেই দেশের সকল মঙ্গলপ্রচেষ্টা সফল হবে, তা হলে বড়োই ভুল করব। ছাদের পাঁচটা কড়িকে মানব, বাকি তিনটে কড়িকে মানবই না, এটা বিরক্তির কথা হতে পারে, কিন্তু ছাদ-রক্ষার পক্ষে সুবুদ্ধির কথা নয়।...এক দেশে পাশাপাশি থাকতে হবে, অথচ পরস্পরের সঙ্গে হৃদ্যতার সম্বন্ধ থাকবে না, হয়তো বা প্রয়োজনের থাকতে পারে-- সেইখানেই যে ছিদ্র-- ছিদ্র নয়, কলির সিংহদ্বার। দুই প্রতিবেশীর মধ্যে যেখানে এতখানি ব্যবধান সেখানেই আকাশ ভেদ করে ওঠে অমঙ্গলের জয়তোরণ।' (রচনাকাল-১৯৩৩)। গুরুদেবের এই মিলন আকাঙ্ক্ষার আমরা শরিক হইনি-এটা আমাদের জাতীয় জীবনের একটা বড় লজ্জা। এই সময়ে বাংলার সাহিত্যিক পরিমণ্ডলের একাংশের পরিবেশ এখানে হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তিকে জোরদার করেছিল। 'আনন্দমঠ'কে ঘিরে তো একটা ভেদরেখা অনেককাল থেকেই তৈরি হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কিছু লেখা এবং কেবলমাত্র হাওড়া জেলা কংগ্রেসের রাজনীতির সঙ্গেই তাঁর সংস্রব একটা বিভাজিকার সৃষ্টি করেছিল। এই সময়ে সংবাদপত্রগুলিও কী ভূমিকা পালন করেছিল তা বোঝবার জন্যে 'কালিকলম' পত্রিকার অন্যতম সম্পাদক হিসেবে প্রেমেন্দ্র মিত্রের শ্রী কৃত্তিবাস ভদ্র ছদ্মনামে ১৯৩৩ সালের মাঘ সংখ্যা থেকে উদ্ধৃত করছি : 'দেশের নেতা উন্মাদের অস্ত্রাঘাতে শহিদের স্বর্গে গেছেন। এই ভয়ংকর হত্যার সংবাদে সারা ভারতবর্ষের গায়ে কাঁটা দিয়েছে কিন্তু খবরের কাগজে মারাত্মক ছাপার ভুল দেখে বিস্মিত হলাম। পড়লাম - মুসলমান হত্যাকারীর দ্বারা হিন্দু নেতা নিহত। তারপর মনে হল এ ছাপার ভুল নয় - এ ভুল সম্পাদকের। শেষে বুঝলাম - এ ভ্রম সর্বসাধারণের এবং এ ভুলই সমস্ত সর্বনাশের মূল। অকারণ বিশেষণের বিষে আমরা জাতিকে বিপন্ন করে তুলেছি। পুলিশ কোর্টের সংবাদ আমরা কখনও লিখি না কর্তাভজা বৈষ্ণব ও হনুমান ভক্ত দারোয়ানের সংখ্যা নগন্য বলেই বোধহয় লিখি না। অথবা সত্যই আমাদের এ জ্ঞানটুকু থাকে যে, ঘটি চুরির কাহিনিতে বৈষ্ণব ধর্ম ও হনুমান ভক্তির কোনও সংস্রব নেই। কিন্তু আমরা ফরমাসী বড় হরফে সংবাদপত্রের সমস্ত ললাট জুড়ে লিখি - মুসলমান গুন্ডার ছুরিতে হিন্দু কুলির মৃত্যু।'

এই সময়ে এক শ্রেণির সংবাদপত্র যে অসাবধানী ভূমিকা পালন করে তা হিন্দুত্ববাদী শক্তিকে যথেষ্ট পরিমাণে সাহায্য করে। লালা মুনশিরাম ওরফে স্বামী শ্রদ্ধানন্দ শুদ্ধির নাম যে আন্দোলন করে গোটা সমাজজীবনকে একটা বড় স্থবিরতার দিকে নিয়ে যাচ্ছিলেন তার অপূর্ব সাহিত্যিক দলিল হল প্রেমেন্দ্র মিত্রের 'মিছিল' নামের উপন্যাস। 'প্রবাসী' সম্পাদক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের মতো মানুষেরও হিন্দু মহাসভা সংস্রবই আতঙ্কিত করেছিল প্রেমেন্দ্র মিত্রকে। শরৎচন্দ্র তাঁর শ্রীকান্তের প্রথমপর্বে লিখছেন, 'সেদিন বাঙালি ও মুসলমান ছেলেদের ফুটবল খেলা কেন্দ্র করে একটি অশান্তি দেখা দিয়েছিল।' এই 'বাঙালি' আর 'মুসলমান' শব্দ দুটির ব্যবহারই একটা দূরত্বের সীমারেখা নির্মাণ করে দিচ্ছে। '২১ সালে সরাসরি রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার আগেকার শরৎচন্দ্রের লেখা আর রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত শরৎচন্দ্রের লেখার মধ্যে একটা বড়রকমের সীমারেখা নির্মিত হয়ে গেছে। রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার ফলে সাম্প্রদায়িকতা শরৎচন্দ্রের শিল্পী সত্তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। শরৎচন্দ্রের মতো এমনটা আরও অনেকের ক্ষেত্রেই ঘটেছিল যা শেষপর্যন্ত লাভবান করে আরএসএস, হিন্দু মহাসভাকে। অনুজাচরণ সেনগুপ্ত সম্পাদিত 'হিন্দু সংঘ' সাপ্তাহিকে শরৎচন্দ্র লিখলেন 'বর্তমান হিন্দু মুসলমান সমস্যা' নামক একটি ঘোরতর সাম্প্রদায়িক নিবন্ধ (সংশ্লিষ্ট সাপ্তাহিকের ১৯ অশ্বিন ১৩৩৩, ৬ অক্টোবর ১৯২৬)। এই নিবন্ধের ফলে সাম্প্রদায়িক পরিবেশ বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় ব্রিটিশ সরকার পত্রিকার সম্পাদককে গ্রেপ্তার করে, সংশ্লিষ্ট পত্রিকাটি বাজেয়াপ্ত করে।

===================================================

সাম্প্রদায়িকতার এই বাতাবরণ আরএসএস-এর প্রসারের ক্ষেত্রটিকে গোড়া থেকেই অনেক-ই মজবুত করে রেখেছিল। গোটা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এইরকম একটা সাম্প্রদায়িক বাতাবরণ সৃষ্টি করে আরএসএস শুরু করল তাদের সাংগঠনিক প্রশিক্ষণ। আরএসএস-এর সাংগঠনিক স্তরের মূল ভিত্তি 'শাখা'র কাজকর্ম আরএসএস-এর দর্শন অনুযায়ী চরিত্র গঠনের কর্মসূচির ওপরে জোর দেয়। এই প্রশিক্ষণে প্রথমে সকলের জন্যে একই ধরণের আচার-অনুষ্ঠান পালন করা হয় যাতে প্রশিক্ষণরত স্বয়ংসেবকদের মধ্যে একটা জোর করে চাপিয়ে দেওয়া ঐক্যের মনোভাব গড়ে ওঠে। সম্প্রদায়গত বিষয়টিকে কেন্দ্র করে একটা সাধারণ আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে প্রশিক্ষণ নিতে আসা ছেলেদের মগজধোলাইয়ের প্রাথমিক কাজটা যাতে হয় তার ওপরে প্রথম থেকেই নজর দেওয়া হয়। 'শাখা'গুলো অনুষ্ঠিত হয় খোলা মাঠে। মগজধোলাইয়ের উপকরণ হিসেবে শেখানো হয়, 'মুসলমান এবং খ্রিস্টানরা এদেশে জন্মেছে ঠিকই, কিন্তু তারা কি যথার্থ এ-দেশের প্রতি অনুগত?...না। তাদের ধর্মবিশ্বাসের পরিবর্তনের সঙ্গে-সঙ্গে জাতির প্রতি ভালোবাসা ও ভক্তি চলে গেছে।' (উই অর আওয়ার নেশনহুড ডিফাইনড - গোলওয়ালকার, পৃ.১২৭-১২৮)। স্বয়ংসেবকদের শেখানো হয়, মুসলমানরা এদেশের শত্রুদের সঙ্গে নিজেদের একাত্ম করে ফেলেছে। তাদের পুণ্যভূমি বিদেশ। তারা নিজেদের শেখ ও সৈয়দ বলে...তারা এখনও মনে করে যে তারা এদেশ জয় করতে এবং রাজ্য স্থাপন করতে এসেছে। সুতরাং আমরা দেখতে পাচ্ছি যে এটা শুধু ধর্ম বিশ্বাসের পরিবর্তন নয়, এমনকী জাতীয় পরিচয়েরও পরিবর্তন। নিজেদের মাতৃভূমিকে ফেলে রেখে শত্রুশিবিরে যোগ দেওয়াকে দেশদ্রোহ ছাড়া আর কী বলা যায়? (সূত্র ওই পৃ. ১২৮)। এই ধরনের মগজধোলাই সীমান্ত সমস্যা, উত্তেজনা দেখা দিলে খুব বেশিভাবে আরএসএস নিজেদের লোকেদের মধ্যে প্রচার করে। বর্তমান সময়ে কাশ্মীরের সীমান্ত উত্তেজনাকে ঘিরে একইরকমই বীভৎস প্রচার চালাচ্ছে তারা।

===================================================


১৯৩৮ সালের শেষ দিক থেকে গোটা বিশ্ব পরিস্থিতি একটা অদ্ভুত জটিল আকার ধারণ করে। আরএসএস, হিন্দু মহাসভা, ইতালি এবং জার্মানির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখা করে চললেও, এই বছরের ৯ নভেম্বর ভয়াবহ ইহুদি মারণযজ্ঞ, যা ইতিহাসে কুখ্যাত Crystal night নাম অভিহিত, ঘটবার অল্প কয়েকদিন পরেই ১২ ডিসেম্বরের ঘোষণাপত্রে কংগ্রেস জার্মান নীতির তীব্র সমালোচনা করে। ভারতে ইহুদিদের আশ্রয়দানের বিষয়টিকেও কংগ্রেস সমর্থন জানায়। অথচ সাভারকার থানেতে আরএসএস-এর প্রশিক্ষণ শিবিরে বলেন, জার্মানিতে জার্মানরা যে আন্দোলন করছে তা নিঃসন্দেহে জাতীয় আন্দোলন, ইহুদিদের আন্দোলন হল চরম সাম্প্রদায়িক আন্দোলন (MSA, Home Special Dept, GOD (g) ptill 1938, A report on the meeting held on Dec 11, 1938)। একই বক্তব্যের পুনরুক্তি করে পুনেতে ১৯৩৯ সালের ২৯ জুলাই সাভারকার বলেন, 'ভৌগোলিক পরিসীমার ওপরে কোনও অবস্থাতেই জাতিত্ব নির্ভর করে না। সাধারণ ভৌগোলিক পরিসীমার থেকেও ভাব, ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির ঐক্যের ওপরে জাতিত্ব অনেকখানিই নির্ভর করে।ঠিক এই কারণেই কোনও অবস্থাতেই জার্মান এবং ইহুদিকে এক জাতি হিসেবে পরিগণিত করতে পারা যায় না।' এই সময় থেকেই ধীরে ধীরে আরএসএস এবং তাদের রাজনৈতিক সংগঠন হিন্দু মহাসভার মধ্যে হিন্দু এবং মুসলমানকে একই জাতির অংশ হিসেবে পরিগণিত না করবার চিন্তাভাবনা গড়ে উঠতে শুরু করে।


ভারতীয় জাতির যে চিন্তাচেতনার কথা রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন তার সম্পূর্ণ বিপরীত-ধর্মী চিন্তাকে সম্বল করে ভারতীয় সমাজব্যবস্থায় আগ্রাসন শুরু করে দেয় হিন্দু সাম্প্রদায়িক মৌলবাদীশক্তি। এই চিন্তাভাবনাই পরবর্তী সময়ে পরিণতি লাভ করে গোলওয়ালকরের "সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদে"র তত্ত্বে। তিরিশের দশকের শেষ ভাগ থেকেই একযোগে আরএসএস এবং তার শাখা সংগঠনগুলি ও তার রাজনৈতিক সংগঠন হিন্দু মহাসভা বলতে শুরু করে -ভারতবর্ষে সংখ্যালঘুদের অধিকারগুলো নির্ভরশীল থাকবে সংখ্যাগুরুদের মহানুভবতার ওপর। এই ধারণাই এখনও বহন করে আরএসএস এবং তাদের রাজনৈতিক সংগঠন হিন্দু মহাসভার পরিবর্তিত সংস্করণ ভারতীয় জনতা পার্টি। এই চিন্তার জালেই তারা অক্টোপাশের মতো বেঁধে ফেলতে চাইছে গোটা ভারতবর্ষকে, গণহত্যার তান্ডব চালাচ্ছে গুজরাটে। ১৯৩৯ সালে হিন্দু মহাসভার এক অধিবেশনে সাভারকার পরিষ্কারভাবে বলেন যে, ঠিক জার্মানির ইহুদিদের মতোই ভারতবর্ষের মুসলমানরাও সামগ্রিকভাবে তাদের নিকট প্রতিবেশী হিন্দুদের থেকে ভারতবর্ষের বাইরের সঙ্গে নিজেদের স্বার্থকে অভিন্ন করে দেখে (Bombay Chronicle-এ ২৯.১২.১৯৩৯-এ সাভারকারের এই বক্তৃতা প্রকাশিত হয়) এছাড়াও সাভারকার বলেন, ওদের পবিত্রভূমি সুদূর আরব দেশ অথবা প্যালেস্টাইন। ওদের পুরান শাস্ত্র এবং সাধুসন্তরা, ভাবনায়কেরা কেউই আমাদের পবিত্র দেশে জন্মগ্রহণ করেনি। তাই ওদের সব নামধামের মধ্যেও বিদেশি উৎসের পরিষ্কার ছাপ রয়েছে। (Hindutva: Who is Hindu? 4th Edition Bharat Mudranalaya, Pune, 1949, Page-94)।

===================================================

গোলওয়ালকরের 'উই অর আওয়ার নেশনহুড ডিফাইনড' নামক মারাত্মক প্রতিক্রিয়াশীল পুস্তকটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৩৮ সালে নাগপুর থেকে। এই পুস্তকে গোলওয়ালকর বলেন, 'আজকের দিনে সব থেকে আলোচিত বিষয় জার্মান জাত্যাভিমান। নিজেদের জাতি এবং তার সংস্কৃতির কৃত্রিমতাকে অস্বীকার করে তারা দেশ থেকে সেমেটিক জাতি ইহুদিদের বিতাড়নের পথ নিয়েছে। জাতিগত অহংকার এখানে অসাধারণভাবে শীর্ষবিন্দুতে উপনীত হয়েছে। জার্মানি এটা দেখতে সক্ষম হয়েছে যে, ভিন্ন প্রকারের জাতি এবং সংস্কৃতির পক্ষে একটা ঐক্যবদ্ধ সমগ্রের সঙ্গে মিশে যাওয়া সম্ভবপর নয়। হিন্দুস্থানের এই শিক্ষা নেওয়া উচিত এবং এই শিক্ষা অনুযায়ী চলা প্রয়োজন। (গোলওয়ালকরের পুস্তকের '৩৯ সালের সংস্করণ, পৃষ্ঠা ৩৭) গোটা উত্তরভারতের সিংহভাগ জুড়ে আর্য সমাজীদের মদমত্ততা। এক সঙ্গে আরএসএস এবং হিন্দু মহাসভাকে পায়ের তলায় মাটি এনে দিচ্ছে। স্বামী দয়ানন্দের মূর্তিবিরোধী ঐতিহ্যকে ম্লান করে দিয়ে আরএসএস ওইসব অঞ্চলে তখন ধীরে-ধীরে মূর্তিপূজার ব্যাপক প্রচলন শুরু করে, নানা আচার সর্বস্বতাকে একটা অন্যমাত্রায় নিয়ে আসে আরএসএস। মজার বিষয় হল, এই সময়ে আরএসএস-এর মধ্যে হনুমান পুজোর ব্যাপক প্রচলন দেখতে পাওয়া যেত। হেডগেওয়ার কিন্তু এই হনুমান পুজোর বিষয়টিকে ধীরে ধীরে বন্ধ করে দেন। এখন অবশ্য সঙ্ঘ-পরিবারের সদস্য হিসেবে বজরং দল-এর উৎপত্তি এবং ভারতবর্ষের অন্যতম বড় সন্ত্রাসবাদী সংগঠন হিসেবে আত্মপ্রকাশ, বজরংবলী পুজোর নামে বাঁদর পুজোটাকে আবার বড় আকারে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছে। হেডগেওয়ার তাঁর কার্যকালের একদম শেষদিকে আরএসএস-এর উপাসনার ভাষা হিসেবে সংস্কৃত ভাষাকে উপস্থাপিত করেন। প্রভাব বিস্তার, প্রচার ইত্যাদির প্রথম পর্যায়ে আঞ্চলিক ভাষাগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হলেও, বেশকিছুটা প্রভাব প্রতিপত্তি পেয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, উচ্চবর্ণের হিন্দু সম্প্রদায়জাত মানুষদের সংগঠন হিসেবে নিজেদের উপস্থাপিত করবার লক্ষ্যে হেডগেওয়ার আঞ্চলিক ভাষার পরিবর্তে সংস্কৃত ভাষাকে আরএসএস-এর প্রার্থনার ভাষা হিসেবে নির্ধারিত করেন। ১৯৪০ সালে নাগপুরে আরএসএস-এর এক প্রশিক্ষণ শিবিরে হেডগেওয়ার বলেন, 'আমি আমার সামনে হিন্দুরাষ্ট্রের একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ দেখতে পাচ্ছি' এই প্রশিক্ষণ শিবিরে উড়িষ্যা, আসাম, কাশ্মীর ছাড়াও ভারতের প্রায় সব অঞ্চলের প্রতিনিধিরাই যোগ দিয়েছিল। সরসঙ্ঘচালক হিসেবে এটাই ছিল হেডগেওয়ারের শেষ অনুষ্ঠান। এরপর আরএসএস প্রধানের দায়িত্ব নিলেন গোলওয়ালকর, শুরু হয় আরএসএস-এর নতুন পর্যায়, আরও প্রলয়ঙ্কর এক অধ্যায়।

গোলওয়ালকর রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের দায়িত্ব গ্রহণ করেই এই ধারণাটাকে প্রকট করে দিলেন যে, হিন্দু হওয়াটা কেবলমাত্র সংস্কৃতিগত বা কৃষ্টিগত কোনও বিষয় নয়, এর সঙ্গে জাতি এবং রক্তের সম্পর্কের বিষয়টি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। গোলওয়ালকর যে সময়ে আরএসএস প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন ঠিক সেই সময়েই এই সংগঠনটির রাজনৈতিক মুখ হিন্দু মহাসভার সভাপতি সাভারকার বিশ্বযুদ্ধজনিত পরিস্থিতিতে হিন্দুদের কাছে আবেদন জানান, 'ব্রিটিশ সরকারের সব রকমের যুদ্ধ প্রচেষ্টায় অংশগ্রহণ করবার জন্যে। কিছু মূর্খ এই নীতির সমালোচনা করছে, তাদের কথা কানে না তুলে, সরকারের দিকে সংবেদনশীল সহযোগিতার হাত বাড়াতে হবে।' সাভারকার বলেন, 'যুদ্ধের আগে কিংবা সূচনাপর্বে হিন্দু মহাসভার তোলা দাবিগুলো অনেকাংশেই সরকার পূরণ করেছে।' (হিন্দু রাষ্ট্রদর্শন -ভি.ডি.সাভারকার, পৃ. ২০৩) '৩৯ সালে অক্টোবর মাসে সাভারকার গোপনে ভাইসরয়কে বলেছিলেন, হিন্দু এবং ব্রিটিশদের পরস্পর বন্ধু হওয়া প্রয়োজন। তিনি প্রস্তাব করেছিলেন, কংগ্রেস মন্ত্রীসভাগুলি পদত্যাগ করলে কংগ্রেসের বিকল্প হিসেবে হিন্দু মহাসভার থাকা উচিত (জেটল্যান্ড টু লিনলিথগো, ৭ অক্টোবর, ১৯৩৯, জেটল্যান্ড পেপার্স, খন্ড ১৮, রীল নং ৬)। আরএসএস-এর সঙ্গে এই সময়ে ঔপনিবেশিক শাসকদের সম্পর্ক অনেক বেশি পরিমাণে জটিল এবং কৌশলী মাত্রা ধারণ করে। মধ্যশ্রেণীভুক্ত তরুণ স্বেচ্ছাসেবকদের টার্গেট করে আরএসএস তাদের কার্যক্রমকে পরিচালিত করছিল। একটা লোক দেখানো রেডিকাল জাতীয়তাবাদী অবস্থান গ্রহণ করলেও, আরএসএস কিংবা তার রাজনৈতিক সংগঠন হিন্দু মহাসভার রাজনীতি মুসলিম লিগের মতোই ঔপনিবেশিক আওতার মধ্যেই লালিত-পালিত হচ্ছিল। কংগ্রেসকে পয়লা নম্বরের শত্রু হিসেবে পরিগণিত করে, ছলে-বলে-কৌশলে কংগ্রেসকে দুর্বল করা এবং ধ্বংস করে তাদের মূল লক্ষ্য ছিল। অভিন্ন শ্রেণি অবস্থানের কারণে খুব সহজেই ঔপনিবেশিক কর্তাব্যক্তিদের সাহায্য-সহযোগিতা তারা পেয়ে যাচ্ছিল। কংগ্রেস নেতাদের বিশ্বাসঘাতক আখ্যা দিয়ে গোটা জাতীয় আন্দোলনকেই তাচ্ছিল্য করে, গোলওয়ালকর সরাসরি অভিযোগ জানালেন, অদ্ভুত, ভারি অদ্ভুত, বিশ্বাসঘাতকদের জাতীয়বীর হিসেবে সিংহাসনে বসানো হয়, আর দেশপ্রেমিকদের ওপরে কলঙ্ক আরোপ করা হয়।

'৩৭-এর নির্বাচনের ফলে বিভিন্ন প্রদেশে কংগ্রেস কর্তৃক মন্ত্রিসভা গঠনের পরে ক্ষমতালোভী হিন্দু সাম্প্রদায়িক নেতৃত্ব কার্যত মাত্রাজ্ঞানহীন হয়ে পড়ে। সীমিত পরিসরে দেশীয় ব্যক্তিদের দ্বারা পরিচালিত জাতীয়তাবাদী সরকারের কার্যক্রম জনমানসে তাঁদের আরও জনপ্রিয় করে তোলে। জাতীয় আন্দোলনও নতুনভাবে সঞ্জীবিত হয়। স্বভাবতই এসবই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কাছে বড় রকমের অপছন্দের বিষয় হয়ে দেখা দেয়। এইরকম পরিস্থিতিতে জার্মান আইনজীবী Jaham Kasper Bulntschil-র কাছ থেকে জাতি এবং জাতীয়তাবাদের ধারণা ধার করে আসরে নেমে পড়েন তথাকথিত গুরুজি গোলওয়ালকর। উগ্রতায় তিনি সাভারকারকেও ছাড়িয়ে যান। মুসলিম সম্প্রদায়জাত মানুষের সম্পর্কে গোলওয়ালকর বলেন, আমাদের পরিষ্কার কথা, ওরা বিদেশি হয়ে থাকাটা ছেড়ে দিক, তা না হলে ওরা হিন্দুজাতির অধীনস্থ হিসেবেই থাকুক। এভাবে তারা আমাদের দেশে থাকতে পারে। কোনও কিছু দাবি তাদের করা চলবে না। কোনও বিশেষ সুযোগ-সুবিধাও তারা কোনও অবস্থাতেই পাবে না। পক্ষপাতিত্বমূলক কোনও ব্যবহারের আশা ওরা যেন না করে\ মুসলমানদের নাগরিক অধিকারও থাকা উচিত নয়। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, সাভারকর এবং তার সমমনোভাবাপন্ন চরমপন্থী হিন্দু সাম্প্রদায়িক মানুষেরা মুসলিমদের দুই ভাগে ভাগ করত, হয় তারা মোগল আক্রমণকারীদের বংশধর নতুবা ধর্মান্তরিত হিন্দু। ভারতীয় মুসলিমসমাজের প্রধান আকর্ষণ নাকি ভারতবর্ষের মূল্যবোধ, যে মূল্যবোধকে হিন্দু সাম্প্রদায়িকরা হিন্দু মূল্যবোধ হিসেবেই দেখতে অভ্যস্ত। মুসলিমরা তার বাইরে বলে আরএসএস নেতৃত্ব প্রথম থেকেই মনে করত। সাভারকর এবং তাঁর সহযোগীরা কেবলমাত্র এটাই মনে করত না যে, ইসলাম একটি বিদেশ থেকে আনা ধর্মমত এবং এই ধর্মমতের প্রধান প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের বাইরে রয়েছে। একই সঙ্গে তারা মনে করত যে, ভারতীয় মুসলিমসমাজ একটা পৃথক জাতিসত্তা তৈরিতেই সব থেকে বেশিরকমে আগ্রহী, ভারতবর্ষকে তারা তাদের স্বদেশভূমি বলে মনে করে না। কোনও অবস্থাতেই এটা ভারতীয় মুসলিমদের স্বাধীনতার আগে বা পরবর্তী সময়ের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের অভিমত নয়। এগুলি উগ্র হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তির অতিরঞ্জিত অভিমত। ভারতীয় মুসলিমরা সব সময়েই মনে করত তারা প্রথমে ভারতীয় তার পরে মুসলিম। ভারতীয় মুসলিমসমাজের এই অভিমত সম্পর্কে হিন্দু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদীশক্তি অবহিত থাকলেও, তাদের দাবি ছিল ভারতীয় মুসলিমরা মেনে চলুক হিন্দু মূল্যবোধ। এটা তো স্বাভাবিক অবস্থাতে কোনওমতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। 

===================================================

১৯৪০ সালের জুন মাসে সাভারকরের সঙ্গে সুভাষচন্দ্র বসুর একটি সাক্ষাৎকারের কথাও এই সময়ে আরএসএস-এর পক্ষ থেকে ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়। আজও বর্বর হিন্দু সাম্প্রদায়িক মৌলবাদীশক্তি গান্ধীজি-হেডগেওয়ারের তথাকথিত সাক্ষাৎকারের মতোই সুভাষচন্দ্র বসু এবং সাভারকরের   সাক্ষাৎকারের ঘটনাকে নগ্নভাবে প্রচার করে থাকে। আরএসএস-এর স্বেচ্ছাসেবকের স্মৃতিচারণ : 'এই সময়ে সমস্তকিছু সম্পর্কে নেতৃত্বের দৃষ্টিভঙ্গি যাই হোক না কেন, যুবকেরা দলে-দলে আরএসএস-এ যোগ দিয়েছিল। এই যোগদানের সাধারণ সংগ্রামী আবহাওয়া নিয়েও তারা এই গর্ববোধ করত। স্বেচ্ছাসেবকদের আরএসএস-এর পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল যে, আমাদের অপেক্ষা করতে করতে হবে। সুযোগ একদিন অবশ্যই আসবে। আমাদের উচিত সেই সময়ের জন্যে শক্তি সঞ্চয় করে রাখা (রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ - ডি আর গয়াল, পৃ. ৮৭)। গয়াল আরও লিখেছেন, আরএসএস-এর মূল কাজ হল যুব সমাজের মধ্যে যে ব্রিটিশবিরোধী মনোভাব জেগে উঠেছে, সেই মনোভাবকে ভোঁতা করে দেওয়া। যুবসমাজের মধ্যেকার এই ব্রিটিশবিরোধী মনোভাবকে মুসলিমবিরোধী মনোভাবের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হল আরএসএস-এর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এই নীতি গ্রহণের ফলেই ব্রিটিশ সরকার আরএসএস-এর বিরুদ্ধে কোনও প্রকারেরই বড় পদক্ষেপ কখনওই নেয়নি। কারণ, আরএসএস-এর শিক্ষাশিবিরগুলোতেও নেতাদের বক্তৃতার মূল বিষয়ই ছিল মুসলিম বিরোধিতা (ওই, পৃ. ৬৭)।

সুভাষচন্দ্র বসুর সঙ্গে সাভারকরের যে সাক্ষাৎকারের কথা আজও আরএসএস-এর পক্ষ থেকে প্রচার করা হয়, সেই সাক্ষাৎকারটি কিন্তু সত্যিই ঘটেছিল। এই সাক্ষাৎকারের ঘটনা '৯৭ সালের মার্চ মাসে সাভারকরের পুত্র বিক্রম সাভারকর বম্বেতে জানিয়েছিলেন। তাছাড়াও, বিলওয়াস সাভারকরের 'Veer Savarkar-INA'S Source of inspiration' Commemoration Volume -এর ১৪৭ থেকে ১৫১ পৃষ্ঠায় এ সম্পর্কে বহু তথ্যপ্রমাণ রয়েছে। বম্বের সাভারকর দর্শন প্রতিষ্ঠান থেকে ১৯৮৯ সালে এই গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। এই গ্রন্থের 'Savarkar's Role in the British Quitting India'-তে পৃষ্ঠা ১৮০ থেকে ১৮৮-এ সম্পর্কে তথ্য রয়েছে। এই সাক্ষাৎকারের ঘটনাটি আরএসএস-এর পক্ষ থেকে বিকৃতভাবে পরিবেশন করা হয়। তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়, এই সাক্ষাৎকারের সময়ে সাভারকরই নাকি সুভাষচন্দ্রকে ইউরোপ গিয়ে একনায়কদের সাহায্য প্রার্থনা করবার জন্যে বুদ্ধি-পরামর্শ দিয়েছিলেন। সাভারকর এবং সুভাষচন্দ্রের মধ্যে সাক্ষাৎকারের যেসব তথ্যপ্রমাণ আরএসএস-এর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, সেইসব তথ্যপ্রমাণের মধ্যেও সাভারকরের এই ধরনের পরামর্শ বিষয়ক কোনও তথ্যই নেই। Times of India ১৯৪০ সালের ২৪ জুন লিখছে, 'শনিবার সন্ধেবেলায় দাদারে সাভারকরের বাসভবনে সুভাষচন্দ্র বসু এবং সাভারকরের মধ্যে আলোচনা হয়। আলোচনার বিষয়বস্তু হিসেবে মনে করা হচ্ছে যে, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং এই পরিস্থিতিতে হিন্দু মহাসভা, ফরওয়ার্ড ব্লক এবং সমমনোভাবাপন্ন রাজনৈতিক শক্তিগুলি পারস্পরিক সহযোগিতায় কী করতে পারে, তা নিয়ে উভয় নেতা কথাবার্তা বলেন। তবে যতদূর জানতে পারা গেছে, এই আলাপ-আলোচনা বিশেষ আশাপ্রদ হয়নি। লক্ষণীয়, সাভারকর এবং সুভাষচন্দ্র বসুর এই সাক্ষাৎকারটি কোনও অবস্থাতেই ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের নজর এড়িয়ে যায়নি। গোয়েন্দা বিবরণীতে বলা হচ্ছে, সুভাষচন্দ্র বসু বম্বেতে আসেন ২২ জুন। তিনি এখানে এসে এম এ জিন্নাহ এবং সাভারকরের সঙ্গে আলোচনায় বসেছিলেন। ফরওয়ার্ড ব্লক এবং হিন্দু মহাসভার মধ্যে সম্ভাব্য সহযোগিতা নিয়ে আলাপ আলোচনা হলেও, শেষপর্যন্ত এই আলোচনা কোনও শীর্ষবিন্দুতে পৌঁছতে পারেনি। ২৩ জুন বম্বেতে একটি সভার আয়োজনের পরিকল্পনা সুভাষচন্দ্র এবং তাঁর দু-একজন সহযোগীর পক্ষ থেকে চালানো হলেও, এই প্রচেষ্টাও শেষপর্যন্ত সফল হয়নি (MSA, Home Special Dept, 1023, 1939-40, SA dated June 29, 1940, FORWARD BLOCK)।

===================================================

আরএসএস-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা যখন বাংলার বিপ্লবী আন্দোলনের মধ্যে ফাটল ধরিয়ে সাম্রাজ্যবাদকে সাহায্য করবার তাগিদ নিয়ে কলকাতায় এসেছিলেন, তখন তিনি এই উদ্দেশ্য নিয়ে অনুশীলন সমিতির মধ্যে প্রবেশের চেষ্টা করেন। সেই সময়েই বিপ্লবী সংগঠনগুলি প্রশিক্ষণের কর্মকাণ্ডের আরএসএস-এর মধ্যে প্রয়োগ ঘটাতে হেডগেওয়ার প্রথম থেকেই সচেষ্ট ছিলেন। আরএসএস-এর প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে তার কিছু অন্ধ অনুকরণের চেষ্টা প্রথম থেকেই ছিল। পরবর্তী সময়ে সেই প্রচেষ্টা আরও প্রসারিত হয় এবং নিত্যনতুন কৌশল তাতে সংযুক্ত হয়। তবে স্বভাবসুলভ ভাবেই বাংলার বিপ্লবী আন্দোলনের সঙ্গে যোগাযোগের কথা বলে আরএসএস তাদের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হেডগেওয়ারকে স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে উপস্থাপিত করবার সবরকম প্রচেষ্টা চালালেও, অনুশীলন সমিতির নেতা, কর্মীরা কোনও অবস্থাতেই হেডগেওয়ারের দ্বারা বিন্দুমাত্র প্রভাবিত হননি। এই সাক্ষাৎকারকে ঘিরেও যথেষ্ট মিথ্যে প্রচার চালায় চরম প্রতিক্রিয়াশীল হিন্দুত্ববাদীরা। ত্রৈলোক্য মহারাজ জীবনের শেষদিকে যেভাবে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের মতো ভাবধারার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেছিলেন, বামপন্থীদের সঙ্গে তাঁর যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে, তার দ্বারাই পরিষ্কারভাবে প্রমাণ হয়ে যায় তিনি হেডগেওয়ারের দ্বারা কোনওভাবেই প্রভাবিত হননি।

===================================================

১৮৯০ সালে বিবেকানন্দ যখন পরবর্তী পর্যায়ের ভারত পরিক্রমা করছেন, আলমোড়ার পথে একদিন সহায় সম্বলহীন অবস্থায় ক্ষুধা, তৃষ্নায় অত্যন্ত কাতর হয়ে পড়েন। কাছাকাছি কোন বাড়ি নেই সেখানে আতিথ্য নেবেন। একমাত্র রয়েছে একটি পীরের মাজার। সেই মাজারে রয়েছেন এক বৃদ্ধ ফকির। বিবেকানন্দ অবলীলার সেই ফকিরের কাছে ভিক্ষা চাইলেন। ফকির সাহেবেরও যথার্থই কেবল অতিথিকে দেওয়ার মতো সম্বল বলতে মাত্র একটি শসা তাঁর কাছে রয়েছে। তিনি পরম আগ্রহভোরে সেই শশাটি বিবেকানন্দের হাতে তুলে দিলেন। বিবেকানন্দও পরম তৃপ্তিভরে শশাটি খেলেন।


প্রাণরক্ষাকারী সেই ফকির সাহেবকে কিন্তু বিবেকানন্দ কোনোদিন ভোলেননি। তখন তিনি শিকাগো জয় করে বিশ্ব বিখ্যাত। এসেছেন আবার আলমোড়ায়। গেলেন সেই ফকির সাহেবের কাছে। পরম কৃতজ্ঞতায় নিজের সম্বল থেকে কিছু অর্থও তুলে দিলেন সেই মহৎ-প্রাণ মানুষটির হাতে। সেই ফকির সাহেব প্রসঙ্গে বিবেকানন্দ সেদিন বলেন, উনি বাস্তবিক সেদিন আমার প্রাণরক্ষা করেছিলেন, কারণ আমি আর কখনো ক্ষুধায় অমন কাতর হইনি। এই ঘটনার সাক্ষী ছিলেন স্বামী অখণ্ডানন্দ। যাঁকে নিজের গুরু বলে দাবি করেন গোলওয়ালকর। যদিও এই দাবির পক্ষে কোনো তথ্য প্রমাণ তারা দিতে পারেনা।   

===================================================

বিবেকানন্দের অকপট স্বীকারোক্তি : "আমরা মানবজাতিকে সেখানে নিয়ে যেতে চাই যেখানে বেদও নেই, বাইবেলও নেই, কোরানও নেই।" এই ভারত পথিক বিবেকানন্দ ভারতাত্মার উন্মীলনে মাত্র ৩৯ বছরের জীবনে সর্বশক্তি নিয়োগ করে দিয়েছেন। ধর্মের নাম ধর্মান্ধতা, জাতপাতের নামে মনুষ্যত্বের অপমান, অন্ধ কুসংস্কার-এ সবের মূর্ত প্রতিবাদ ছিলেন বিবেকানন্দ। যুক্তির বাইরে জীবনে একটিও কথা বলেননি, পদক্ষেপ নেননি। সন্ন্যাসী হয়েও একদিনের তরেও অস্বীকার করেননি গর্ভধারিনী ভুবনেশ্বরীর প্রতি তাঁর সন্তানসুলভ দায়িত্ব। নিজের মৃত্যু আসন্ন বুঝতে পেরে জননীর অন্নসংস্থানের জন্যেই হাত পেতেছিলেন খেতাবি, রাজের কাছে। নিছক আচার আচরণের জালে আবদ্ধ না থেকে, কেবলমাত্র দেশমাতৃকার শৃঙ্খলমোচনে আত্মনিবেদিত যুবকদের অনুপ্রাণিত করেই নিজের কর্তব্য সমাধা করেননি। অনুরাগী দেশিয় রাজন্যদের কাছ থেকে অর্থসংগ্রহ করে, বিদেশি ভক্ত মিস ম্যাকলাউডের কাছ থেকে বিদেশ থেকে অস্ত্র আনার পরিকল্পনা করেছিলেন ব্রিটিশকে এদেশ থেকে তাড়াতে। চন্দননগরের ভিতর দিয়ে ভারতে অস্ত্র নিয়ে আসার ক্ষেত্রেও যে বিবেকানন্দের যে ঐতিহাসিক ভূমিকা ছিল তা জানা যায় মিস ম্যাকলাউডের কাছে থাকা বিবেকানন্দের কতকগুলি ঐতিহাসিক চিঠির মাধ্যমে। সেই চিঠিগুলি পরবর্তী সময়ে নানা ঐতিহাসিক পটভূমিকায় ম্যাকলাউড নষ্ট করে ফেলেন। এই ঘটনার সাক্ষী ছিলেন মিস ম্যাকলাউড ঘনিষ্ট লিজেল রেমঁ। বিবেকানন্দ নিবেদিত প্রাণ গবেষক শঙ্করীপ্রসাদ বসুকে এই ঘটনাবলী লিজেল রেমঁ লিখিতভাবে জানিয়েছিলেন।


আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে বুকের মাঝে বিশ্বলোকের যে সন্ধান বিবেকানন্দ করে গেছেন তাকে স্বার্থান্বেষীরা প্রতিষ্ঠানিক ধর্ম, রাজনৈতিক, সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী প্রবণতায় বিকৃত করছে। এই প্রবণতাকে পরাজিত করে বিশ্বলোকের সন্ধানী বিবেকানন্দকে উদ্ভাসিত করতে হবে মানুষের কল্যাণে।

===================================================


সহিষ্ণুতা থেকে রোহিত ভেমুলা নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার এবং দেশের শাসক দল বিজেপি এবং তার চালিকা শক্তি আরএসএস'র ভূমিকা দেখে মনে পড়ে যায় জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর সম্পাদিত 'বালা' পত্রিকায় ১২৯২ বঙ্গাব্দের আষাঢ় (১৮৮৫) সংখ্যায় 'আকবর শাহের উদাহরণা' শীর্ষক রবীন্দ্রনাথের একটি নিবন্ধ। ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ, অসহিষ্ণুতা, চরম দলিত বিরোধিতায় মোদি জামানায় দীর্ণ ভারতে রবীন্দ্রনাথের ওই নিবন্ধ আজও সমান প্রাসঙ্গিক। তিনি লিখছেন :

"একজন প্রাচীন ইংরাজ ভ্রমণকারী আকবর বাদশাহের উদারতা সম্বন্ধে একটি গল্প করিয়াছেন তাহা নিম্নে লিখিতেছি।

আকবর শাহের মাতৃভক্তি অত্যন্ত প্রবল ছিল। এমন-কি, এক সময়ে যখন তাঁহার মা পালকি চড়িয়া লাহোর হইতে আগ্রায় যাইতেছিলেন, তখন আকবর এবং তাঁহার দেখাদেখি অন্যান্য বড়ো বড়ো ওমরাওগণ নিজের কাঁধে পালকি লইয়া তাঁহাকে নদী পার করিয়াছিলেন। সম্রাটের মা সম্রাটকে যাহা বলিতেন তিনি তাহাই পালন করিতেন। কেবল আকবর শা মায়ের একটি আজ্ঞা পালন করেন নাই। সম্রাটের মা সংবাদ পাইয়াছিলেন যে পর্টুগিজ নাবিকগণ একটি মুসলমান জাহাজ লুঠ করিয়া একখণ্ড কোরান গ্রন্থ পাইয়াছিল, তাহারা সেই গ্রন্থ একটি কুকুরের গলায় বাঁধিয়া বাজনা বাজাইয়া অর্মজ শহর প্রদক্ষিণ করিয়াছিল। এই সংবাদে ক্রুদ্ধ হইয়া সম্রাটমাতা আকবরকে অনুরোধ করিয়াছিলেন যে একখণ্ড বাইবেল গাধার গলায় বাঁধিয়া আগ্রা শহর ঘোরানো হউক। সম্রাট তাহার উত্তরে বলিয়াছিলেন-- "যে কার্য একদল পর্টুগালবাসীর পক্ষেই নিন্দনীয় সে কার্য একজন সম্রাটের পক্ষে অত্যন্ত গর্হিত সন্দেহ নাই। কোনো ধর্মের প্রতি ঘৃণা প্রদর্শন করিলে ঈশ্বরের প্রতি ঘৃণা প্রদর্শন করা হয়। অতএব আমি একখানা নিরীহ গ্রন্থের উপর দিয়া প্রতিশোধস্পৃহা চরিতার্থ করিতে পারিব না।"


গোবিন্দ পানসারে থেকে কালবুর্গি বা দাদরির শেখ আখলাক থেকে রোহিত ভেমুলাসহ জানা অজানা যে সব মানুষ আজ অসভ্য বর্বর হিন্দু সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী শক্তির অসহিষ্ণুতা নামক প্রতিহিংসার শিকার তাদের উদ্দেশ্যে রবীন্দ্রনাথের এই পংক্তিগুলি মনে হয় যথার্থ শ্রদ্ধাঞ্জলি। 

===================================================

Thursday, 18 January 2018

ভারতীয় সভ্যতার বিকাশের ধারা

প্রসঙ্গ : ধর্ম 
ভারতীয় ইতিহাসে, সামাজিক বিবর্তনে ধর্মের গুরুত্ব রয়েছে । সেই কারণেই ধর্মের স্বরূপ সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা যেতে পারে । কিন্তু আদিম মানুষ থেকে ক্রমবিবর্তন হতে হতে আজকের মানুষের মধ্যে লক্ষ লক্ষ বছর পার হয়ে গেছে । মানুষ যখন আদিম গুহার যুগে বাস করত - তখন দল বেঁধে থাকত, গাছের ফল-মূল খেত, পশুপাখির কাঁচা মাংস খেত । তখন প্রকৃতি বনজঙ্গলে ঘেরা ছিল । নদী, সাগর তো ছিলই, ঝড়, বৃষ্টি হত, জঙ্গলে দাবানল হত, বাজ পড়ে পুড়ে যেত গাছ । বন্যা ভাসিয়ে নিয়ে যেত, ধস নামত পাহাড়ে । তখন সে অসহায় বোধ করত । কেন ঝড় হয়, কেন বৃষ্টি হয়, কেন বন্যা হয়, কেন ভূমিকম্প হয়, কেন দাবানল জ্বলে জঙ্গলে - এই সম্পর্কে মানুষের কোনো নির্দিষ্ট যুক্তিসঙ্গত ধারণা ছিল না । তখন মানুষ এইসব প্রাকৃতিক ঘটনাকে অতিপ্রাকৃত বলে ভয় পেত । মানুষ এইসব প্রাকৃতিক ঘটনার পিছনে যে কার্যকারণ আছে তা বুঝতে পারত না । তারা মনে করত কোনও শক্তি এর জন্য দায়ী । এই শক্তিই কালক্রমে দেবত্ব পায় । যেমন বাতাসের দেবতা, বৃষ্টির দেবতা, আগুনের দেবতা, জঙ্গলের দেবী বা দেবতা । মানুষ মনে করত ঐ দেবতাদের তুষ্ট করতে পারলেই প্রকৃতির আক্রমণ থেকে তারা রক্ষা পাবে । মার্কস একে বলেছেন, ওলটানো জগৎ চেতনা । পৃথিবীকে সোজাসুজি কারণ-সহ না বুঝতে পারা । ঘটনাকেই বড় করে দেখা । শুকনো কাঠে কাঠ ঘষে দাবানল হয় । ওরা মনে করত বাইরের কোনও অতিপ্রাকৃত শক্তি দাবানল তৈরি করেছে । এটাই হল জগৎকে উল্টো করে দেখা । এই বিপরীত চিন্তা এবং অসহায়তা থেকেই ধর্মের জন্ম । এটা হচ্ছে ধর্ম সম্পর্কে সাধারণ ধারণা ।

লক্ষ লক্ষ বছর আগে হিন্দু, ইসলাম, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ ধর্ম ছিল না । গত দু'তিন হাজার বছরে এইসব ধর্মমত তৈরি করল মানুষ । মার্কস বলেছিলেন, যে মানুষ নিজের মুক্তির পথ খুঁজে পায়নি বা নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে ধর্ম হল তার আত্মচেতনা । ধর্ম হল বাস্তব জগতের যে কষ্ট সে ভোগ করছে তার বিরুদ্ধে তার প্রতিবাদ । এর মানে হল মানুষের নিজের শক্তি সম্পর্কে আস্থা নেই অথবা সত্যি সত্যিই শক্তি নেই । মানুষ তো এসবের প্রতিকার করতে পারছে না । তা হলে আস্থা থাকবে কি করে ? যদিও এখন বিজ্ঞানের নতুন নতুন আবিষ্কারের ফলে তার শক্তির উপর আস্থা বাড়ার অনেক কারণ হয়েছে । কিন্তু শক্তি যতটা বেড়েছে সেই পরিমাণে আস্থা বাড়েনি । এই জন্য ধর্ম হল অসহায় নিপীড়িত মানুষের আশ্রয় । ধর্ম হল নিপীড়িত মানুষের দীর্ঘশ্বাস । ধর্ম হল হৃদয়হীন জগতের হৃদয় । কার্ল মার্কস এসব বলে বলেছেন যে, প্রতিকারের পথ না পেয়ে মানুষ ধর্মের মধ্যেই তার পরিত্রানের উপায় খোঁজে ।

তিনি বলেছেন যে, মানুষ তখন যেন আফিমের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকে । মানুষ নিজের যন্ত্রনা, কষ্ট, দারিদ্র থেকে মুক্তি পাবার কোনও পথই যখন দেখতে পায় না - তখন ভগবানই তার একমাত্র আশ্রয় । ঈশ্বরের কাছে সে নিরাপত্তা খোঁজে । অসহায়তা থেকেই তার আত্মসমর্পণ । ঈশ্বরের কাছেই  সে প্রতিকার চায়, মাথা ঠোকে, দীর্ঘশ্বাস আর চোখের জল ফেলে । মানুষ যে দুঃখ, কষ্ট সহ্য করছে তার মধ্যে যে অসহায়তা বোধ তৈরি হয়েছে তার প্রকাশ পাচ্ছে ধর্মকে আশ্রয় করার মধ্য দিয়ে । এটাই তার মনের যন্ত্রণার প্রকাশ । আবার সে এটা মেনেও নিচ্ছে না । সে তার ধর্মীয় আবেদনের মধ্যে দিয়ে বলছে, এটা তুমি বদলে দাও । এটা আবার তার প্রতিবাদও । কিন্তু প্রতিবাদের ভাষা আলাদা, ভঙ্গি আলাদা । নেশার বস্তুর মতো, তাই মার্কস তাকে বলছেন আফিম ।

মার্কস বলতেন যে যারা সারা জীবন খাটে আর অভাবে নিমজ্জিত থাকে ধর্ম তাকে এ জীবনে তার অবস্থা মেনে নিতে পরামর্শ দেয় - যাতে সে প্রতিবাদ করতে না পারে সেই শিক্ষা দেয় - যাতে সে প্রতিবাদ করতে না পারে সেই শিক্ষা দেয় । তাদের স্বর্গীয় পুরস্কারের সান্ত্বনা দেয় বা পরের জন্মে পরলোক বা স্বর্গে গিয়ে ভালো থাকবে - সেই সান্ত্বনা দেয় । কিন্তু আবার যারা অন্যের শ্রম শোষণ করে তাদের পার্থিব জীবনে বদান্যতা অনুশীলনের নির্দেশ দেয় ।

প্রাচীন ভারতেও ধর্ম ব্যবহৃত হয়েছে শ্রেণী ও শক্তিশালীর শাসন রক্ষায় । ধর্মকে কেন্দ্রে রেখে রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনের সঙ্গে সঙ্গেই ধর্মীয় অনুশাসনের বেশে নিম্নবর্গকে বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করার বিধি রচিত হয়েছে । তা জ্ঞানের বিকাশকেও ব্যাহত করেছে । প্রাচীন ভারতে শল্য চিকিৎসা হতো । কিন্তু ব্রাহ্মণেরা এই চিকিৎসা শাস্ত্রকে এগোতে দিল না । বিজ্ঞানকে এগোতে দিল না । বস্তুবাদী বা লোকায়ত দর্শনের যেসব ধারায় বলা হত এ জগতে যা কিছু ভাল তাতে মানুষের অধিকার আছে তাকে ভোগ করতে দিতে হবে, সে অর্জন করুক, সব মানুষই সমান, তাদেরকে একঘরে করা হল । তাদের বইপত্র পুড়িয়ে দেওয়া হল । ফলে ভারতবর্ষের জ্ঞান ভান্ডার যথেষ্ট এগোতে পারল না ।


=============================================================


বুদ্ধদেবের মতাদর্শে একটা অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব ছিল । তিনি হিন্দু সমাজের চতুর্বর্ণ প্রথার বিরোধিতা করেননি বরং তাকে স্বীকারই করেছিলেন । আবার তিনিই সমাজের বর্ণভেদ ভিত্তিক সামাজিক অসাম্যকে স্বীকার করেননি ।


=============================================================

ইদানিং হিন্দুত্ববাদীরা দাবি করছেন ভারতবর্ষ একটি রাষ্ট্র হিসাবে গড়ে উঠেছিল প্রাচীন যুগে, যাকে তারা হিন্দু যুগ আখ্যা দিয়েছেন । অথচ আধুনিক গবেষকরা প্রমাণ করেছেন যে হিন্দু শব্দ ও সংজ্ঞার প্রচলনই ঘটে মধ্য যুগে । ইরানীয় হ্-র যোগ 'ইন্দো'র সঙ্গে । এর সঙ্গে পারসিক স্তান যোগ করে নামকরণ করা হয় হিন্দুস্তান - যার মানে হিন্দুদের বাস । হিন্দুস্তান - বা হিন্দু ধর্মের উপাসকদের দেশ এই ব্যাখ্যা সম্পূর্ণই হিন্দুত্ববাদীদের নির্মাণ । 

সমকালীন সূত্রে এই দুই ব্যাখ্যার তারতম্য বোঝা যায় । রাণা কুম্ভকে ১৪৩৮-৩৯ সালে জৈন লিপিতে উল্লেখ করা হচ্ছে হিন্দু সুররত্ন - বা হিন্দু সুলতান নামে । তারও আগে আমীর খুসরু ১৩২৪ সালে নিজের পরিচয় দিচ্ছেন হিন্দুস্তানী তুর্কী । 


=============================================================


স্বাধীন ভারতবর্ষে সাম্প্রদায়িকতা এতটা শিকড় গাড়তে পেরেছে তার অন্যতম প্রধান কারণ ধর্ম ও রাষ্ট্রের পরিধির নির্দিষ্ট পৃথকীকরণ করা হয়নি । যখনই দেশে ধর্মীয় মৌলবাদ মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে, তখন সর্বদাই আমাদের দেশের শাসকগোষ্ঠী সাম্প্রদায়িক আক্রমণের মুখে বলিষ্ঠ নীতি প্রয়োগ করতে ব্যর্থ হয়েছে ।

যেমন বর্তমান অযোধ্যা সঙ্কট এক অর্থে এই ব্যর্থতার ফল । বিতর্কিত সৌধের দ্বার উন্মুক্ত করা, রামমন্দিরের শিলান্যাসের অনুমতি, ভারতীয় সংহতি পরিষদে করসেবকদের শক্ত হাতে মোকাবিলার সর্বসম্মত সিদ্ধান্তকে অবজ্ঞা করা, সাধু-সন্ত ও সেইসব গোষ্ঠী যারা নিজেদের আইনের ঊর্ধ্বে থাকার মতো দুঃসাহসী বলে ঘোষণা করে, তাদের সাথে অপ্রয়োজনীয় পরামর্শ - সবই রাষ্ট্রের মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক শক্তিকে দৃঢ় হাতে মোকাবিলার অসমর্থতার প্রকাশ । তার ফলে দেশের রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক দলগুলির প্রভাব বৃদ্ধি পায় ।


=============================================================


সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের সাম্প্রদায়িকতা সংখ্যালঘু সাম্প্রদায়িকতার থেকে অনেক বেশি বিপজ্জনক, কারণ সংখ্যাগুরু সাম্প্রদায়িকতা রূপান্তরিত হয় ধর্মীয় ফ্যাসিবাদে ।


=============================================================

Thursday, 7 September 2017

মনুসংহিতা এবং নারী

মনুর চোখে শূদ্র যেমন অপূর্ণ মানব, নারীও তাই । মনুসংহিতার বহু শ্লোকে নারী ও শূদ্র একই সাথে উচ্চারিত । যা শূদ্রের জন্যে নিষেধ তা নারীর জন্যেও নিষেধ । তাদের জন্যে একই বিধি-বিধান ।

মনুর ধর্মশাস্ত্রের তাত্ত্বিক ভিত্তি ছিল কর্মবাদ ও জন্মান্তরবাদ । মনুর কালের আগেই কর্মবাদ বৈধতা পেয়ে গিয়েছিল । পরে তার সাথে যুক্ত করা হয় জন্মান্তরবাদের তত্ত্বকে । মনুর ধর্মশাস্ত্র এই দুই মতবাদকে আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করে । এই জন্মে দেবতারূপ দ্বিজ ও পতির সেবায় ত্রুটি ঘটলে পরজন্মে শুভ্রও নারীকে আরও হীনপশুযোনিতে জন্ম নিতে হবে । ব্রাহ্মণ্যধর্মের কুটিল উদ্ভাবনে কর্মবাদ ও জন্মান্তরবাদের গোলকধাঁধা থেকে শূদ্র যেমন মুক্তি পায়নি, নারীও পায়নি ।

মনুসংহিতার মূল উদ্দেশ্য ছিল ব্রাহ্মণের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিপাদন । সেই শ্রেষ্ঠত্ব প্রায় দেবত্বের সমপর্যায়ের । কিন্তু এখানে একটা প্রশ্ন থেকে যায় । নিজেরা ভূতলস্থ দেবতার মর্যাদা গ্রহণ করেও, কেন তারা নিজেদের জননী-জায়া-ভগ্নী-কন্যা-বধূদের দেবীর মর্যাদায় ওপরে তুললেন না ? কেন তাদের নামিয়ে দিলেন দাসীর সমপর্যায়ে ? মনু ব্রাহ্মণ নারী ও শূদ্রা নারীর মধ্যে কোনও পার্থক্য রাখেননি । মনু সব বর্ণের নারীর জন্যে একই বিধান রেখে গেছেন । মনু নিজেদের পরিবারের নারীদেরও হীন অবস্থানে নামিয়ে দিয়েছিলেন অন্য বর্ণের নারীদের সাথে । এতটাই ছিল মনুর নারী বিদ্বেষ । মনু শুধু ব্রাহ্মণ্য আধিপত্য নয়, পুরুষতন্ত্রও সুপ্রতিষ্ঠিত করে গেছেন । তাঁর ধর্মশাস্ত্র সেই আধিপত্যবাদের তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা ।

==================================================================
"মানবধর্মশাস্ত্র" মনুসংহিতা 

মনুসংহিতা সম্পূর্ণরূপে আচরণগত বিধি নির্দেশক শাস্ত্রগ্রন্থ । মনুসংহিতাকে বলা হয়েছে মানবধর্মশাস্ত্র । ভারতীয় সমাজ সংগঠনভুক্ত মানবসমষ্টির সব নরনারী জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত কীভাবে চলবে, কোন পরিস্থিতিতে নর-নারীর কী করণীয় আর কী বর্জনীয়, তাদের মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারীরাই বা তাদের জন্যে কী করবেন, কোন স্খলন বা অপরাধের জন্যে কোন শাস্তি বা প্রায়শ্চিত্ত, সব ব্যাপারেই বিশদ বিধি-বিধান দিয়ে গেছেন মনু ।

==================================================================
মনুসংহিতা মানবীশাস্ত্র নয় 

বর্ণবাদে বিভক্ত ভারতীয় সমাজব্যবস্থায় নারীর সামাজিক অবস্থান কখনও মর্যাদার ছিল না । সব ধর্মশাস্ত্র, স্মৃতি পুরাণেই নারীকে দেখানো হয়েছে হীনজন্মারূপে । নারীকে স্থান দেওয়া হয়েছে শূদ্র ও পশুর সাথে । মনুসংহিতার বহু শ্লোকে নারী ও শূদ্র একইসাথে উচ্চারিত ।

সুঙ্গযুগ থেকে গুপ্তযুগ-এর কালে রাষ্ট্রশক্তির সহায়তায় প্রাচীনতর বেদ ও বেদোত্তর অনুশাসনগুলির নতুনভাবে বিন্যাসের প্রয়োজন দেখা দেয় । এই উদ্দেশ্যেই আনুমানিক এই কালপর্বে মনুসংহিতা সংকলিত হয় । কল্যাণী বন্দোপাধ্যায় মনে করেন, "এই সময় বিভিন্ন বিধর্মী গোষ্ঠীর আগ্রাসন এবং বেদবিরোধী বৌদ্ধধর্মের ব্যাপক প্রসারের ফলে হিন্দুধর্মের এক সংকটকাল উপস্থিত হয় । তাই হিন্দুধর্মকে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্দেশ্যে রচিত হয় স্মৃতিশাস্ত্র অথবা ধর্মশাস্ত্র । যার অনুশাসন ছিল অপেক্ষাকৃত কঠোর এবং অনেক সময় নিষ্ঠুর ।"

কল্যাণী বন্দোপাধ্যায় মনে করেন মানবধর্মশাস্ত্র "মনুসংহিতার যুগেই নারীকে সামগ্রিকভাবে পুরুষের পদানত করে প্রায় পশুতে পরিণত করার কাজটি সম্পূর্ণ হয় । যদিও এর প্রেক্ষাপট আগেই কিছুটা তৈরী হয়েছিল ।"

অন্য একটি গ্রন্থে তিনি দেখিয়েছেন, "প্রাচীনকাল থেকে হিন্দুশাস্ত্রের অনুশাসন অনুযায়ী ভারতীয় আর্থসামাজিক কাঠামোতে সর্বত্র সাধারণভাবে নারীকে শূদ্রের এবং পশুর সাথে একাসনে বসানো হয়েছে । বৈদিক যুগেও এর কোন ব্যতিক্রম ছিল না । শতপথ ব্রাহ্মণে নারীকে শুধু শূদ্র নয়, কুকুর এবং কালো পাখির (কাক) সঙ্গে তুলনা করে সবাইকে "অনৃত" বা "মিথ্যা" বলে ঘোষণা করা হয়েছে । স্মৃতিশাস্ত্রের প্রধান প্রবক্তা মনুও নারীকে "মিথ্যার মতই অপবিত্র" আখ্যা দিয়েছিলেন । ভগবদগীতায় শ্রীকৃষ্ণ নিজেই যে চাতুর্বর্ণ্য সৃষ্টি করেছেন এ কথা বলার সময় প্রসঙ্গত আরও বলেছেন যে বৈশ্য, শূদ্র এবং নারী প্রভৃতি "পাপযোনি"রা তাঁকে আশ্রয় করেই পরমগতি লাভ করে । অর্থাৎ বৈশ্য, শূদ্র এবং নারী সবাই এক স্থানীয় এবং পাপী । পরবর্তীকালে অনেক পুরাণেও প্রায় একই কথা শোনা যায় । উদাহরণস্বরূপ আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতক থেকে খ্রিস্ট পরবর্তী পঞ্চম শতকের মধ্যে রচিত বায়ু পুরাণে বলা হয়েছে যে পাপী, বৈশ্য, স্ত্রী (নারী) ও শূদ্র যদি একটি "গোপন স্তব" শোনে, তবে তারা রুদ্রলোকে (স্বর্গে) যায় । অর্থাৎ  বৈশ্য, শূদ্র, নারী এবং পাপী সবাই পরস্পরের সাথে তুলনীয় এবং নিম্নস্তরের জীব (যারা সাধারণভাবে স্বর্গে যাবার অধিকারী নয়) ।

কল্যাণী বন্দোপাধ্যায় আরো দেখিয়েছেন, যে উপনিষদে শুধু দার্শনিক তত্ত্বই রয়েছে বলে মনে করা হয়, সেখানে আবার স্ত্রীর প্রতি স্বামীর সামাজিক অনুশাসন আছে যার সাথে তাত্ত্বিক দর্শনের প্রায় কোন মিল নেই । তিনি বৃহদারণ্যক উপনিষদের একটি শ্লোক তুলে ধরেছেন । "(প্রয়োজনে) স্ত্রীকে লাঠি বা হাত দিয়ে মারবে, " (৬।৪।৭) দেখা যাচ্ছে উপনিষদ শুধু দার্শনিক তত্ত্বের আকরই নয়, নারীর প্রতি অবমাননাকর বিধানও এতে আছে ।

======================

বেদ-উপনিষদে এত যে সব স্ততি নারীর, তার অবির্ভাবের, তার আত্মার, মনুসংহিতার কোথাও তার প্রভাব নেই । সেখানে নারী সম্পূর্ণরূপেই পুরুষের অধীন । তিনি পুরুষের অংশ নন । তার অবস্থান পুরুষের পদতলে । নারীকে মনুসংহিতা পাঠ করবার কিংবা শ্রবণের অধিকার পর্যন্ত দেননি মনু,

২/১৬ যার গর্ভাধান থেকে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া পর্যন্ত বিধি মন্ত্র সহকারে উক্ত হয়েছে, এই শাস্ত্রে তার অধিকার জ্ঞাতব্য, অন্য কারও নয় ।

সুরেশচন্দ্র বন্দোপাধ্যায় 'যার' শব্দের ব্যাখ্যা দিয়েছেন 'দ্বিজ' বলে । আর 'অধিকার' বলতে তিনি অধ্যয়ন ও শ্রবণের অধিকার বলেছেন । পঞ্চানন্দ তর্করত্নের অনুবাদেও একই কথা লা হয়েছে । ব্রাহ্মণ্য সমাজসংগঠনে তারাই শুধু দ্বিজ যাদের জন্যে উপনয়নের বিধান রয়েছে । তারা শুধু পুরুষ, নারী নন । ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয় কন্যা হলেও নয় ।

==================================================================
নারীর শিক্ষার অধিকার শাস্ত্রসম্মত নয় 

মনু বেদকে অতিক্রম করেননি । মনুসংহিতায় বারংবার তা উচ্চারিত । মনু বেদমন্ত্রের রচয়িতা বেদকন্যাদের জানতেন না তা তো নয় । কিন্তু মনুসংহিতায় তিনি সেই বেদকন্যাদেরও বেদপাঠের অধিকার পর্যন্ত নেই বলে বিধান দিয়ে গেছেন ।

মনু মানবধর্মশাস্ত্রে নারীর জ্ঞানার্জন ও শিক্ষার অধিকারই তুলে দিলেন । তাদের জন্য কোনওরূপ সংস্কারের বিধান পর্যন্ত থাকল না । মনুর বিধান নারীকে সম্পূর্ণরূপে গৃহের অভ্যন্তরে ঢুকিয়ে দিল । নারীর বিবাহকে করা হল বাধ্যতামূলক ।নারীর জন্যে সব ধরনের শিক্ষা-দীক্ষা নিষিদ্ধ করে দেওয়া হল । তাকে বাধ্য করা হল স্বামী পুত্রের সেবা করে জীবনদান করতে । মনু বিধান দিলেন,

২/৬৭ স্ত্রীলোকদের বিবাহবিধি বৈদিক সংস্কার বলে কথিত, পতিসেবা গুরুগৃহে বাস এবং গৃহকর্ম তাদের (হোমরূপ) অগ্নিপরিচর্যা ।

নারীর জন্যে বিবাহ-ই হয়ে গেল সবচেয়ে বড় সংস্কার । পতিসেবা তুলনীয় হয়ে গেল গুরুগৃহ বাসের সাথে । আর গৃহকর্ম হল হোমরূপ অগ্নিপরিচর্যা । নারীর জন্যে আর কি প্রয়োজন ? মনু কিন্তু পুরুষদের জন্যে উপনয়ন ছাড়াও অন্যান্য জাতকর্মের বিধান রেখেছেন,

২/৬৫ ব্রাহ্মণের কেশান্ত সংস্কার ষোলো বৎসর বয়সে, ক্ষত্রিয়ের বাইশ বছর বৎসরে এবং বৈশ্যের চব্বিশ বৎসরে করণীয় ।

এখানে শূদ্র পুরুষের কথা নেই । মনুর কাছে শূদ্র কখনো পূর্ণমানব ছিল না । ... মনু যাদের কথা বললেন তারা সব দ্বিজপুত্র । কিন্তু দ্বিজপুত্রদের জন্যে যে সংস্কার ছিল বৈদিক উচ্চারণে ঋদ্ধ, দ্বিজকন্যাদের জন্যে তা ছিল অমন্ত্রক ।

২/৬৬ এক সকল সংস্কার স্ত্রীলোকের শরীর সংস্কারের জন্য যথাকালে ও যথাক্রমে অমন্ত্রক করণীয় ।

======================

মনুর আগে বেদ অধ্যায়ন ছিল শিক্ষার প্রথম পাঠ । মনুর বিধানে মনুসংহিতায় বেদপাঠের অধিকার নিষিদ্ধ হয়ে যায় । মনু বললেন,

৯/১৮ স্ত্রীলোকদের মন্ত্রসহকারে (জাতকর্মাদি) সংস্কার নেই --- এই ধর্মবিহিত । এরা (ধর্মের প্রমান রূপ শ্রূতি স্মৃতিরহিতত্ব হেতু) ধর্মজ্ঞ নয়, (পাপনাশক মন্ত্র জপ রহিতত্ব হেতু) মন্ত্রহীন এবং মিথ্যার ন্যায় (অশুভ) --- এই শাস্ত্রীয় নিয়ম ।

মনু নারীকে মিথ্যার ন্যায় অশুভ এবং অধর্মজ্ঞ মন্ত্রহীন বলে চিহ্নিত করলেন । শুধু বেদপাঠ নয়, অন্যান্য সব ধর্মশাস্ত্র পাঠও নারীর জন্যে নিষিদ্ধ করে তার প্রথাগত সব শিক্ষার পথ বন্ধ করার বিধান দিলেন । তাতে নারীর মানবিক বিকাশের পথ চিরদিনের জন্যে বন্ধ হয়ে যায় । মনু চেয়েছিলেন নারীর ওপর পুরুষের নিরংকুশ আধিপত্য । সে জন্যে অনেক কঠোর বিধানও তাই যুক্ত করতে হয়েছে মনুসংহিতায়, এর সৃষ্টিকর্তাকে ।

যে নারী বেদের যুগে বেপারংগমা ব্রহ্মবাদিনী হতে পারতেন, হোমে যার ছিল সহজ অধিকার পুরুষের অনুরূপ, মনুসংহিতায় তা নিষিদ্ধ হয়ে যায় । হোমে নারীর অধিকার স্বীকার করতে চাননি মনু,

১১/৩৬ কন্যা, যুবতী, অল্পবিদ্যাসম্পন্ন ব্যক্তি, মূর্খ, রোগাদি পীড়িত ব্যক্তি ও অনুপনীত ব্যক্তি হোম করবে না ।
১১/৩৭ এই (উক্ত) ব্যক্তিরা হোম করলে তারা এবং যার জন্য করে সে নরকে পতিত হয় । সুতরাং, হোতা হবেন শ্রৌতকর্মে প্রবীণ ও বেদে পারদর্শী ।

কন্যা ও যুব-নারীকে এখানে পংক্তিভুক্ত করা হয়েছে অল্পবিদ্যাসম্পন্ন ও অসুস্থ পুরুষদের সাথে । এতে অবশ্য কোনও অসংগতি নেই । মনু তা করতেই পারেন । কন্যাদের শিক্ষাই তো শাস্ত্রসম্মত ছিল না মনুর কাছে । তাদের তো মূর্খ হয়ে থাকা ছাড়া কোনও বিকল্প ছিল না । কন্যাদের কুমারী হয়ে থাকারও কোন বিধান নেই মনুসংহিতায় । বিবাহ-ই কন্যার পরমাগতি ।

==================================================================
বিবাহ প্রসঙ্গে মনুসংহিতা

মানবধর্মশাস্ত্র মনুসংহিতায় কন্যা-শিশুর জন্য বিবাহ-ই ছিল প্রথম উল্লেখযোগ্য সংস্কার । পুত্রের উপনয়ন না হলে তার দ্বিজত্বে উত্তরণ হত না । কন্যার জন্যে উপনয়ন ছিল বিবাহ । মনু ২/৬৬ । মনুর ধর্মশাস্ত্রে নারীর জন্যে বিবাহ ছিল বাধ্যতামূলক ।

======================

বেদ রচনাকালের যুগে আমরা ব্রাহ্মবাদিনী বিশ্ববারা, অপালা, বাক, লোপামুদ্রাদের দেখেছি, তাঁরা অবিবাহিতই ছিলেন । পতিলোক নামে স্বর্গলাভের জন্যে বিবাহ নামক অনুষ্ঠানের সাথে জড়িত হয়ে তাঁদের পুরুষের অধীনতাকে স্বীকার করে নিতে হয়নি । সংখ্যায় অল্প হলেও বেদের যুগে চিরকুমারীদের অস্তিত্ব ছিল । কিন্তু মানবধর্মশাস্ত্র মনুসংহিতা সেই পথ রুদ্ধ করে দিয়েছিল । তাই ধর্মশাস্ত্রের যুগে আমরা অপালা-বিশ্ববারা-বাককে খুঁজে পাইনি । কোনও ধর্মশাস্ত্রের সাথেই নারীর নাম যুক্ত নয় । মনু নারীর বিবাহ অত্যাবশ্যক বলেই নির্দেশ দিয়েছিলেন । মনু নারীর বিবাহের বয়স পর্যন্ত নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন,


৯/৯৪ ত্রিশ বৎসর বয়স্ক পুরুষ মনোরমা দ্বাদশবর্ষীয়া কন্যাকে বিবাহ করবে অথবা চব্বিশ বৎসর বয়স্ক পুরুষ আট বৎসর বয়স্ক কন্যাকে বিবাহ করবে । ত্বরাবান্ ব্যক্তি (অর্থাৎ যে এই বয়স সীমার কম বয়সে বিবাহ করে সে) গার্হস্থ্যধর্মে অবসাদ প্রাপ্ত হয় ।

======================

মনুর মনোগত বাসনা ছিল কন্যা ঋতুমতী হওয়ার পূর্বেই তাকে সম্প্রদান করা । কন্যা ছিল জনকের কাছে বস্তু সমতুল । যেমন ভূমি, পশু ও বস্তু দান করা যায় । কন্যা বস্তু বলেই বিবাহ নামক অনুষ্ঠানে তাকে সম্প্রদান করা হয় । বর বস্তু নয় বলেই তাকে সম্প্রদান করা চলে না । মনু কন্যার নিম্নতম বিবাহ বয়স আট বছরের কম হলেও তাকে সম্প্রদান করার বিধান দিয়ে গেছেন,

৮/৮৮ কন্যা বিবাহযোগ্যা না হলেও তাকে উৎকৃষ্ট, সুরূপ ও সবর্ণ বরের কাছে বিধি অনুসারে সম্প্রদান করবে ।

কোন কন্যাকে বিবাহ করা যাবে মনুসংহিতায় তার বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে,

৩/৮, ৩/৯ কপিলাবর্ণ, অধিকাঙ্গবিশিষ্টা, রোগগ্রস্তা, লোমহীনা, অধিকলোমবিশিষ্টা, বাচাল, পিঙ্গ লবর্ণা, নক্ষত্র, বৃক্ষ, নদী, পর্বত, পক্ষী, সর্প, দাস --- এইগুলির নামধারিণী এবং ভীতিজনক নামযুক্তা কন্যাকে বিবাহ করবে না ।

৩/১০ যে অঙ্গহীন নয়, যার নাম সুখে উচ্চার্য, হে হংসগতি বা গজগামিনী, যার লোম ও কেশ কোমল, দন্ত ক্ষুদ্র, অঙ্গ মৃদু , সেই স্ত্রীলোককে বিবাহ করবে ।

৩/১১ যে কন্যার ভ্রাতা নেই বা পিতা অজ্ঞাত, বিজ্ঞব্যক্তি পুত্রিকা ধর্মশঙ্কায় তাকে বিবাহ করবে না ।

======================

মনুসংহিতায় নারীর নাম কীধরণের হবে তারও নির্দেশ দেওয়া রয়েছে,

২/৩৩ স্ত্রীলোকের নাম হবে সহজে উচ্চার্য, অনিষ্ঠুরতাবাচক, অনায়াসবোধ্য, সুন্দর, শুভসূচক, অন্তে দীর্ঘবর্ণযুক্ত এবং আশীর্বাদবোধক ।

এই নির্দেশ লঙ্ঘন করলে সেই কন্যা বিবাহ করার যোগ্যা বলে বিবেচিত হবে না - এই ছিল মনুর বিধান ।

মনুসংহিতার অন্য একটি শ্লোকে "বিবাহযোগ্যা কন্যার উপযুক্ত পাত্র পাওয়া না গেলে মৃত্যপর্যন্ত পিতৃগৃহে রেখে দেওয়া উচিত" বলে বিধান দিয়েছেন মনু,

৯/৮৯ বরং কন্যা ঋতুমতী হয়েও আমরণ (পিতৃগৃহে) থাকবে, তথাপি কখনও তাকে নির্গুণ বরের হাতে দিবে না ।

======================

মনু তো কন্যার বিবাহের বয়স পর্যন্ত নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন (৯/৯৪) । এমনকি 'উৎকৃষ্ট সুরূপ ও সবর্ণ বর পেলে কন্যা বিবাহ-যোগ্যা না হলেও তাকে সম্প্রদান করতে বলেছেন (৯/৮৮) । অর্থাৎ বরের বয়স যাই হোক, 'সগুণ' হলে, আট বছরের কম হলেও কন্যাকে বিবাহ দেওয়া চলে । অন্য একটি শ্লোকে (৫/১৫৪) মনু বিধান দিয়েছেন পতি দুশ্চরিত্র, কামুক ও গুণহীন হলেও তাকে লঙ্ঘন করা যাবে না । তাকে দেবতার ন্যায় সেবা করে যেতে হবে । কোনও নারী সেই কালেও দুশ্চরিত্র কামুক গুণহীন বরকে স্বেচ্ছায় বরণ করে নিত না । তাকে তুলে দেওয়া হত তার হাতে । নির্গুণ বরের হাতে সম্প্রদান করা হলে কন্যা যাতে স্ত্রীধর্মপালনে অবাধ্য না হয়, তাই মনুর এই বিধান । নির্গুণ বরের হাতে বিবাহযোগ্যা কন্যাকে সম্প্রদান না করে তাকে আজীবন পিতৃগৃহে রেখে দেওয়ার মনু-উপদেশ তাই আমাদের বিভ্রান্ত করে ।

======================

মনুর অনিন্দনীয় বিবাহ পদ্ধতি হচ্ছে মূলত দানাত্মক বিবাহ । দানাত্মক বিবাহে কন্যা যেন প্রাণহীন বস্তু, সম্পত্তির সমতুল, অথবা পালিত পশু । তাই দানের বিষয় কন্যাদান হল শ্রেষ্ঠ দান, 'মহাদান' । দানের শাস্ত্রীয় পরিচয় হল দেয় বস্তুতে নিজের স্বত্বের অবসান ঘটিয়ে পরের স্বত্ব উৎপন্ন করা ... । তাই বিবাহে কন্যার পিতৃস্বত্ব বিলুপ্ত হয়ে যায় । নারীর গোত্রান্তর হয় । 

কোনও শাস্ত্রীয় বিধানেই নারীর স্বতন্ত্র সত্বা স্বীকৃত নয় । মনুর শাস্ত্রেও সেই স্বীকৃতি নেই । শুধুমাত্র বিবাহের পর সন্তান জন্মদান করার জন্যেই নারীকে সৃষ্টি করা হয়েছে । সেই তার একমাত্র কাজ ।(৯/৯৬) 

==================================================================
নারীর ধর্ম : মনুর বিধান

মনু নারীকে কোনও রূপেই স্বাধীনতা দিতে চাননি । নারী সারাজীবন পুরুষের অধীনতা স্বীকার করে বেঁচে থাকবে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত । কোনও রাখ-ঢাক না করেই মনু বলেছেন,

৯/২ স্ত্রীলোকদের (স্বামী প্রভৃতি) ব্যক্তিগণ তাদের দিনরাত পরাধীন রাখবেন, (অনিষিদ্ধ) রূপাদিবিষয়াসক্ত স্ত্রীলোকদেরও নিজের বশে রাখতে হবে ।

৯/৩ স্ত্রীলোককে পিতা কুমারী জীবনে, স্বামী যৌবনে ও পুত্র বার্ধক্যে রক্ষা করে; (কখনও) স্ত্রীলোক স্বাধীনতার যোগ্য নয় ।

৯/২ এরা রূপ বিচার করে না, (যৌবনাদি) বয়সে এদের আদর নেই, রূপবান বা কুরূপ পুরুষ মাত্রেই তার সঙ্গে সম্ভোগ করে ।

৯/৩ শয়ন, উপবেশন, অলংকার, কাম, ক্রোধ, কুটিলতা, পরহিংসা, মন্দ আচরণ -- এইগুলি স্ত্রীলোকের (স্বভাবগত করে) মনু সৃষ্টি করেছিলেন ।

২/২১৩ নারীদের স্বভাবই হল পুরুষদের দূষিত করা । অতএব পন্ডিতগণ স্ত্রীলোক সম্বন্ধে অনবহিত হন না ।

২/২১৪ সংসারে কাম ও ক্রোধের বশবর্তী বিদ্বান বা অবিদ্বান ব্যক্তিকে স্ত্রীলোক বিপথে নিতে পারে ।

মনু নারীদের এতটাই অবিশ্বাস করেছেন যে, জননী, ভগ্নী ও কন্যার সাথেও একাকী নির্জনগৃহে বাস করতে নিষেধ  করে গেছেন ঠিক পরবর্তী শ্লোকে,

২/২১৫ মা, বোন বা মেয়ের সঙ্গে শূন্যগৃহাদিতে পুরুষ থাকবে না । শক্তিশালী ইন্দ্রিয়সমূহ বিদ্বান লোককেও বশীভূত করে ।







Wednesday, 2 August 2017

নোট বাতিলের পরিণতি

পুঁজিবাদই কালো টাকার লাইফ লাইন - হরিলাল নাথ 

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের আবির্ভাব এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ফ্যাসিবাদের পরাজয়ের পর বিশ্বের দেশে দেশে মুক্তিসংগ্রাম দুর্বার হয়ে ওঠে এবং একে একে উপনিবেশগুলি স্বাধীন হতে শুরু করে । ফলে আগের মতো বিনা বাধায় অঢেল শ্রম ও সম্পদ শোষণ অসম্ভব হয়ে পড়ে । অবশিষ্ট বিশ্ব থেকে উন্নত পুঁজিবাদে শ্রম ও সম্পদের শোষণ নিয়ন্ত্রিত বা বাধাপ্রাপ্ত হবার ফলে পুঁজিবাদের বিকাশের গতি মন্থর হতে থাকে । বস্তুত ১৯৬০-র দশকের শেষ দিক থেকেই পুঁজিবাদী বিকাশের সংকট নতুন করে অনুভূত হতে থাকে ।

তখন পুঁজিবাদের ক্রমবর্ধমান সংকট থেকে মুক্তির পথ হিসেবে হাজির করা হয় নব্য উদারনীতিকে । অর্থাৎ পুঁজিকে বন্ধনহীন-বাধাহীন করতে হবে । একাজ অতীতের ঔপনিবেশিক শোষণের মাধ্যমে আর সম্ভব নয় । তাই প্রয়োগ শুরু হয় নব্য সাম্রাজ্যবাদী কৌশলে নয়া-উপনিবেশবাদের প্রয়োগ । জাতি রাষ্ট্র বা জনকল্যাণকামী রাষ্ট্রের ধারণাকে ভেঙে ফেলতে হবে । এক একটি দেশে খন্ড পুঁজির খন্ড শোষণ নয় । দেশের সীমান্ত তুলে দিয়ে পুঁজি-পণ্য-পরিষেবার অবাধ বিচরণের ব্যবস্থা করতে হবে সারাবিশ্বে । এভাবে 'আইনি' বা 'স্বীকৃতি' পথে পশ্চিমী পুঁজি নতুন করে বিশ্বজুড়ে দখলদারি কায়েম করতে পারবে । পশ্চিমী পুঁজি সারা বিশ্ব থেকে সস্তায় উপকরণ সংগ্রহ ও শ্রম শোষণ করে মুনাফার হার বাড়িয়ে নিতে পারবে । নব্য-উদারনীতি উন্নত পুঁজিবাদেরই সংকট মুক্তির নব্য ব্যবস্থা । বিশ্বব্যাঙ্ক, আই এম এফ, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাসহ পশ্চিমী নিয়ন্ত্রিত আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির মাধ্যমে এই ব্যবস্থাকে সর্বত্র ছড়িয়ে দেবার প্রক্রিয়াই চলছে ।

নয়া-উদারনীতি পুঁজিবাদের ক্রমাগত ও ক্রমঘনীভূত সংকটজনিত বন্ধদশা থেকে মুক্তির নতুন দিশা । বিশ্বায়নের নাম নতুন মোড়কে শোষণের তীব্রতা ও ব্যাপ্তি বৃদ্ধির নতুন অভিমুখই উদারনীতি । এই ব্যবস্থা যথারীতি জাতি রাষ্ট্র ও কল্যাণকামী রাষ্ট্রের ধারণার পরিপন্থী । এই ব্যবস্থায় উৎপাদনে সরকারি হস্তক্ষেপ বা নিয়ন্ত্রণ চলে না । পুঁজি ও পুঁজিপতিদের অবাধ ও পূর্ণ স্বাধীনতার কথা বলে এই ব্যবস্থা । গোটা বিশ্বের সর্বত্র সব দেশে পুঁজির বন্ধনহীন প্রতিবন্ধকতাহীন অবাধ বিচরণ চায় এই ব্যবস্থা । সামাজিক নিরাপত্তা, জনকল্যাণ ইত্যাদি তুলে দিয়ে সমস্ত মানুষকে এবং গোটা সমাজকে পুঁজির সর্বগ্রাসী শোষণের মুখে ঠেলে দেওয়া হয় । জনস্বার্থে বা সমাজের স্বার্থে যেহেতু সরকারের দায়বদ্ধতা প্রত্যাহৃত হয়, তাই কর সংগ্রহের আর কোনো প্রয়োজন থাকে না । তখন কর হার কমা, কর ছাড়, কর বিধি শিথিল এই ব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়ায় ।

মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা হয়, নব্য উদারনীতির নব্য ব্যবস্থায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আয় বৃদ্ধি এবং উন্নয়নে রাষ্ট্র বা সরকারের আর তেমন কোনো ভূমিকা নেই । সেই দায়িত্ব পালন করবে ব্যক্তিগত পুঁজি বা বেসরকারি পুঁজি । যত বেশি পরিমাণে দেশি ও বিদেশি বেসরকারি পুঁজি বিনিয়োগ হবে, ততই কাজের সুযোগ বাড়বে, মজুরি বাড়বে এবং উন্নয়ন হবে । সরকারের প্রধান কাজ হবে বেসরকারি মালিকের হাতে পুঁজির পরিমাণ বৃদ্ধিতে সব রকমের সাহায্য করা । একাজে সরকার পাঁচ রকমভাবে সাহায্য করতে পারে । (১) বিত্তবান ও কর্পোরেটের কাছ থেকে কর বাবদ আয় যথাসম্ভব কমিয়ে । মুনাফা বা আয়ের ওপর কর কমলে তাদের উদ্বৃত্ত আয়ের পরিমাণ অনেক বেড়ে যাবে এবং সেটা ফের বিনিয়োগ করে আরও বেশি মুনাফা করতে পারবে । (২) জমি-খনিজ-বনজ ইত্যাদি জাতীয় তথা প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর জাতীয় মালিকানা পরিবর্তন করে বেসরকারি মালিকানায় রূপান্তর । এর ফলে অমূল্য জাতীয় সম্পদ লুট করে যথেচ্ছ মুনাফা বাড়ানো যায় । (৩) শ্রমিকদের নিয়োগ, ছাঁটাই, মজুরির হার ইত্যাদির দায়িত্ব পুরোপুরি মালিকদের হাতে ছেড়ে দিতে হবে শ্রম আইন সংশোধন করে । একইভাবে প্রত্যাহার করে নিতে হবে যাবতীয় সামাজিক নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা । অর্থাৎ শ্রমিকদের কাজের ও আয়ের নিরাপত্তা যত অনিশ্চিত করা যাবে, ততই তাদের বেশি বেশি করে শোষণ করা সম্ভব হবে । (৪) সরকারের যাবতীয় সমাজকল্যাণমূলক প্রকল্প গুটিয়ে ফেলতে হবে । সরকার যদি শ্রমজীবী মানুষের মৌলিক চাহিদার কিছুটা সরবারহ করে সামাজিক প্রকল্পের মাধ্যমে, তাহলে শ্রমের বাজারে চাহিদা কিছু হ্রাস পাবে । তখন  বেসরকারি পুঁজির সস্তায় শ্রম পাওয়ায় ব্যাঘাত ঘটবে । অর্থাৎ সরকারকে হাত গুটিয়ে বসে থাকতে হবে, যাতে কোনো অবস্থাতেই শ্রমজীবীদের বেঁচে থাকার উপকরণ সরকারের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্যে না পায় । তাদের সেটা জোগাড় করতে হবে শ্রমের বাজারে প্রতিযোগিতায় নেমে । অর্থাৎ যে যত সস্তায় যত বেশি শ্রম দিতে পারবে, তারই কর্মসংস্থান হবে । পুঁজি চায় শ্রমের বিপুল মজুটবাহিনী (বেকার) যাতে যেকোনো শর্তে তাদের শ্রম নিঙড়ে নেওয়া সহজ হয় । (৫) সব দেশের সীমান্ত উন্মুক্ত করে দিতে হবে, যাতে পুঁজি-পণ্য-পরিষেবা সর্বত্র বাজার দখল করতে পারে । এইভাবে জনগণের স্বার্থরক্ষার বদলে পুঁজির স্বার্থরক্ষার দিকে সরকারকে নিয়ে যেতে তবে । এটাই উদারনীতি । এ যুগের পুঁজিবাদের সংকটমোচনের একমাত্র দাওয়াই । পুঁজি ও শ্রমজীবীর স্বার্থ যেহেতু পরস্পর বিরোধী, তাই পুঁজির সঙ্কটমোচনের মানে শ্রমজীবীর সংকটবৃদ্ধি । বর্তমান পুঁজিবাদী বিশ্বের এটাই নির্মম বাস্তবতা ।

আজ উদারনীতির নামে বিনিয়োগ বৃদ্ধির নামে, জি ডি পি বৃদ্ধির নামে, কর্মসংস্থান বৃদ্ধির নামে দেশে দেশে উদারনৈতিক সংস্কারের কাজ ঢালাওভাবে চলছে । তারই পরিণতিতে ধনবৈষম্য ও সম্পদ-বৈষম্য হু হু করে বাড়ছে । প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সমাজতন্ত্রের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে পুঁজিবাদের আধারে আবির্ভূত জাতি রাষ্ট্র ও কল্যাণকামী রাষ্ট্রের বিকাশ ধন-বৈষম্য বৃদ্ধিতে কিছুটা লাগাম টানতে সক্ষম হলেও, এখন তা ফের তীব্র গতি পেয়েছে । বিশেষ করে সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক বিপর্যয়ের পর ধন-বৈষম্য অতীতের সব রেকর্ডকে অতিক্রম করে গেছে । সত্যিই এই বৈষম্য অভূতপূর্ব ও অভাবনীয় ।

সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপর্যয় ও সমাজতন্ত্রের আপৎকালীন পশ্চাদপসারণের ফলে পুঁজিবাদের সামনে সবচেয়ে বড় ও কঠিন প্রতিবন্ধকতাটি দুর্বল হয়ে পড়ে । সেই সুযোগে পুঁজিবাদ তার মানবিক মুখোশটি খুলে ফেলে নতুন করে আগ্রাসী চেহারা নিয়ে আত্মপ্রকাশ করতে থাকে । দ্রুত ফিকে হতে থাকে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক মূল্যবোধও । বুর্জোয়া গণতন্ত্রে বৃহৎ ও একচেটিয়া পুঁজির দাপট বাড়তে থাকে । স্বাভাবিকভাবেই তখন জাতি রাষ্ট্র বা জনকল্যাণকামী রাষ্ট্র গুরুত্ব হারায় । সামগ্রিক উন্নয়নে বা জনকল্যাণে অথবা সম্পদের পুনর্বণ্টনে রাষ্ট্র বা সরকারের দায় ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে যায় ।

আমরা জানি, পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থা শ্রমশোষণ ও উদ্বৃত্ত মূল্য আত্মসাৎ-র মাধ্যমে মুষ্টিমেয় বিত্তবানের হাতে পুঁজি ও সম্পদের কেন্দ্রীভবন ঘটায় । কিন্তু এই প্রক্রিয়া পুঁজিবাদী গণতন্ত্রের আধারে জনকল্যাণকামী ও জাতি রাষ্ট্রের আইন ও বিধি মেনে চললে পুঁজির কেন্দ্রীভবনের গতি খানিকটা হলেও নিয়ন্ত্রিত হয় । পুঁজির মালিকরা এই বিলম্বিত লয়ে সম্পদ বৃদ্ধিতে তুষ্ট নয় । তাই তারা আইন ও বিধি লঙ্ঘন করে অর্থাৎ কর ফাঁকি দিয়ে সম্পদ বৃদ্ধির গতি বাড়ায় ।

আধুনিক পুঁজিবাদের এই ব্যবস্থা কর ফাঁকি দেবার পথকে ক্রমাগত সুগম ও প্রসারিত করে চলেছে । নব্য পুঁজিবাদের অনুসারী সরকারগুলিও আইনকানুন ও কর আদায় ব্যবস্থাকে এমনভাবে পুনর্গঠিত ও শিথিল করছে, যাতে বিত্তবানদের ওপর করের বোঝা কমে, কর ফাঁকি দেওয়া সহজতর হয় এবং কর ফাঁকি দেবার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ দুর্বল হয় । বস্তুত অনেক ফাঁকফোকর রেখেই তৈরি বা সংশোধন করা হয় কর আইন ও কর আদায় ব্যবস্থা । যাতে কর ফাঁকির বিরুদ্ধে সাজা দেবার সুযোগ বিশেষ না থাকে ।

Saturday, 24 June 2017

বিবেকানন্দ ভারতীয় নব জাগরণের দার্শনিক - শ্যামল চক্রবর্তী

বিবেকানন্দের ভাবনায় সমাজভাবনা ও সমাজতন্ত্র 

স্বামী বিবেকানন্দের চিন্তায় স্বদেশচেতনা এবং শ্রমিকস্বার্থবোধ একাত্মতা লাভ করেছিল । তিনি শিকাগো থেকে দেওয়ান হরিদাস বিহারীদাস দেশাইকে লিখেছেন (নভেম্বর, ১৮৯৪), "কোথায় ইতিহাসের কোন যুগে ধনী ও অভিজাত সম্প্রদায়, পুরোহিত ও ধর্মধ্বজিগণ দীনদুঃখীদের জন্য চিন্তা করিয়াছে ? অথচ ইহাদের নিষ্পেষণ করাতেই তাহাদের ক্ষমতার প্রাণশক্তি । ... দরিদ্রগণের মধ্যে মুসলমানদের সংখ্যা এত বেশী কেন ? একথা বলা মূর্খতা যে তরবারির সাহায্যে তাহাদিগকে ধর্মান্তরগ্রহণে বাধ্য করা হইয়াছিল । ... বস্তুত জমিদার ও পুরোহিতবর্গের হস্ত হইতে নিষ্কৃতিলাভের জন্যই উহারা ধর্মান্তর গ্রহণ করিয়াছিল । আর সেইজন্য বাংলাদেশ, যেখানে জমিদারের বিশেষ সংখ্যাধিক্য, সেখানে কৃষক সম্প্রদায়ের মধ্যে হিন্দু অপেক্ষা মুসলমানেরই সংখ্যা বেশী ।"

ভারতে অনেকরকম সাধু-সন্ন্যাসী দেখা যায় । তাঁরা সমাজ ও জনজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান । কিন্তু বিবেকানন্দ ছিলেন সম্পূর্ণ অন্য ধরণের মানুষ । তিনি সারা ভারত পদব্রজে পর্যটন করেন এবং ধনি-গরিব নির্বিশেষে নানাধরণের মানুষের সঙ্গে পরিচয় ঘটে । তিনি ইউরোপ-আমেরিকা পর্যটন করে ধনতান্ত্রিক ও বিভিন্ন ধরনের সমাজতান্ত্রিক ভাবধারার সঙ্গে পরিচিত হন । এই প্রক্রিয়ার মধ্য থেকেই সমাজতান্ত্রিক ভাবধারার সঙ্গে তার চিন্তার মিশ্রণ ঘটে । তাঁর ধর্মচেতনা মানুষকে ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছিল ।

নতুন সমাজ গড়ে তোলার স্বপ্ন ছিল তাঁর চোখে । বিবেকানন্দের সমসাময়িক চিন্তাবিদদের সঙ্গে বিবেকানন্দের পার্থক্য ছিল এই যে, অন্য চিন্তাবিদরা শুধু সমাজ সংস্কারের কথা বলতেন । বিবেকানন্দ আমূল পরিবর্তনের কথা ভাবতেন । উগ্র জাতীয়তাবাদী ও হিন্দুত্ববাদীরা ভারতকে  পুরোনো দিনে ফিরে যাবার কথা বলতেন । কিন্তু বিবেকানন্দ তাঁদের সঙ্গে আদৌ একমত ছিলেন না । তিনি নতুন ভারতের কথা বলতেন । যে ভারতের শাসকরা হবেন সমাজের একেবারে নীচের তোলার মানুষ অর্থাৎ শূদ্র । তিনি নতুন সমাজের যে কল্পনা করেছিলেন তা হল বৈদান্তিক মস্তিষ্ক ও ইসলামিক দেহ ।

শূদ্র জাগরণ সম্পর্কে বিবেকানন্দ বলেছিলেন : 'আর যাহাদের শারীরিক পরিশ্রমে ব্রাহ্মণের আধিপত্য, ক্ষত্রিয়ের ঐশ্বর্য, বৈশ্যের ধনধান্য সম্ভব, তাহারা কোথায়? সমাজের যাহারা সর্বাঙ্গ হইয়াও সর্ব দেশে সর্বকালে ... ভারবাহী পশু, সে শূদ্রজাতির কি গতি?' এই যে অপরিসীম বেদনাবোধের সঙ্গে তিনি শূদ্রদের সম্বন্ধে ভেবেছেন এবং সঙ্গে সঙ্গে তাঁর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে তিনি বুঝেছেন বৈশ্য সভ্যতাই মানুষের ইতিহাসে সবটুকু নয়, তার একটা ধারা থাকতে পারে । এ বিষয়টি স্বামীজীর চোখে ধরা পড়েছিল বলেই বৈশ্য সভ্যতার ভালো দিকটি বলবার সঙ্গে শূদ্র জাগরণের অনিবার্য ভবিষ্যতের প্রতিও ইঙ্গিত দিয়েছেন তাঁর পত্রাবলীতে ।

বিবেকানন্দ ভারত ইতিহাসে কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনীয় তথ্য তুলে ধরে আমাদের জানিয়েছেন শাসক শ্রেণী সব সময় শোষিতদের অগ্রসর অংশের প্রতিনিধিদের কিনে এবং তাদেরই ব্যবহার করে নীচেকার মানুষকে পদদলিত করবার জন্যে । তিনি উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছেন - 'বশিষ্ঠ, নারদ, জাবাল, সত্যকাম, ব্যাস, কৃপ, দ্রোণ এবং কর্ণ । শ্রেণী আভিজাত্যের দিক থেকে এদের প্রত্যেকেরই জন্মকাহিনী, পিতৃপরিচয় বা মাতৃপরিচয় সন্দিগ্ধ রহস্যে আবৃত ' । 'জ্ঞান ও বীরত্বের পুরস্কারস্বরূপ এঁরা কেউবা ব্রাহ্মণ সমাজে কেউবা ক্ষত্রিয় সমাজে উন্নীত হলেন ।' বিবেকানন্দ মন্তব্য করেছেন - 'এঁদের এই সামাজিক ঊর্দ্ধগতির ফলে গণিকা, দাসী, মৎস্যজীবি বা শকটচালক সম্প্রদায়ের কি যে উপকার হল তা বোঝা দুষ্কর ।

স্বামীজী বলেছেন, ভারতবর্ষের প্রকৃত শাসনক্ষমতা জনসাধারণের হাতে ছিল না । যারা ক্ষুধিত বঞ্চিত, যারা নিচুরতলার মানুষ, মার-খাওয়া মানুষ, যারা ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্তভাবে সংগ্রাম করছে, তারা কোনো সময়ে এমনভাবে দানা বাঁধতে পারেনি, যাতে ক্ষমতাটা তাদের হাতে আসতে পারে । পারস্পরিক স্বার্থের খাতিরে ব্রাহ্মণ এবং ক্ষত্রিয়েরা একত্র হয়েছে । কিন্তু গণশোষণের বন্যার গতিটি কোনো সময়ে স্তিমিত হয়নি, বরং ক্ষুরধার হয়েছে । স্বামীজীর বিশ্লেষণ অনুযায়ী পশ্চিমী মুসলমানেরা যখন আমাদের দেশ বিজয় করতে এলো, তাদের হাতে আমরা মার খেয়েছি, তাদের বুকের সাহস এবং বীর্যবত্তায় ভারতবর্ষ পরাভূত হয়েছে । পৃথিবীর ইতিহাসে দেখা গিয়েছে, Royal Power-এর হাত থেকে শূদ্র শ্রেণী কোনোদিন রক্ষা পায়নি । (অনেক পরে পৃথিবীর ইতিহাসে, ১৯১৭ সালে অক্টোবর বিপ্লবের মাধ্যমে, প্রথম শূদ্রের বিপ্লব ঘটেছে রুশ দেশে - লেখক)।

 স্বামীজী তাঁর সন্ধানী দৃষ্টিতে নূতন সমাজের যে চেহারা দেখেছিলেন পশ্চিমী সমাজ তাতে বিস্মিত হয়, তার কারণ এই যে আসন্ন শূদ্ররাজত্ব সম্পর্কে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ নিঃসংশয় । 'বর্তমান ভারত' -এ তিনি বলেছেন "সোশ্যালিজম, অ্যানার্কিজম, নিহিলিজম এবং এ-জাতীয় মতবাদগুলি আসন্ন সমাজ-বিপ্লবের অগ্রদূত ।" অ্যানার্কিজম, নিহিলিজম দিয়ে সমাজ বিপ্লব করা যাবে কিনা আমরা এ নিয়ে তর্কের ঝড় তুলতে পারি, কিন্তু এ মতবাদগুলো যে প্রচলিত সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদস্বরূপ, একথাটা যদি আমরা বুঝতে চেষ্টা করি তা হলে স্বামীজীর বক্তব্যের মর্মবাণীর দিকে আমরা বোধ হয় দৃষ্টি ফেরাতে পারি । বিনা দ্বিধায় অবিকম্পিত স্বরে তিনি ঘোষণা করেছেন শূদ্রের আধিপত্য অবশ্যম্ভাবী, কেউ একে ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না । "... Time will come when there will be the rising of the Sudra class and their Sudrahood"

তিনি আরও বলেছিলেন, "নতুন ভারত বেরুক কারখানা থেকে, হাট থেকে, বাজার থেকে, ঝোপ-জঙ্গল-পাহাড়-পর্বত থেকে" । তাঁর ভরসার স্থল ছিল সাধারণ মানুষ । কেন তাঁর ধারণা ছিল মধ্যবিত্ত এবং অভিজাতরা শরীর এবং মনে একেবারে মরে গেছে । তিনি আরও বলেছিলেন ধনীরা কারও কোন উপকার করেনি । শোষিতদের জন্য সংগঠনের অভাব তিনি খুব অনুভব করেছিলেন । শূদ্রদের আত্মশক্তি প্রয়োগের পথে ঐক্য এবং সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা তিনি দৃঢ়ভাবে অনুভব করেছিলেন ।

স্বামী বিবেকানন্দের সমকালীন সময় ছিল ভারতের নব জাগরণের যুগ । কিন্তু ইউরোপে নবজাগরণ তার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল এবং পুরোনো সমাজের গর্ভে নতুন সমাজের আবির্ভাবের দার্শনিক, অর্থনৈতিক ও সমাজতন্ত্রের তাত্ত্বিক ভিত্তি সূচিত করেছিল । একদিকে বুর্জোয়া গণতন্ত্রে পতাকা উড়ছে, পুঁজিবাদ পোক্ত হচ্ছে । পুঁজিবাদের স্থায়িত্বের দর্শন প্রভাব বিস্তার করেছে । অপরদিকে প্রকৃতি বিজ্ঞানের বিকাশ ভাববাদী দর্শনের ভিত্তিমূলকে নাড়িয়ে দিচ্ছে । মার্কস-এঙ্গেলেসের হাত ধরে উন্নত হচ্ছে । শক্তিশালী হচ্ছে বস্তুবাদী দর্শন, সমাজতান্ত্রিক দর্শনের ভিত্তি গঠনের তত্ত্ব । ইংল্যান্ডে ছিলেন 'ওয়েল' পন্থীরা এবং ফ্রান্সে ছিলেন ফুলিয়ের অনুগামী সমর্থকরা । এরা ছাড়া ছিলেন ইউটোপিয়া সমাজতন্ত্রের পক্ষে সরব । আরও ছিলেন পুঁজি বা মুনাফার ক্ষতি হবে না অথচ সামাজিক ন্যায় বিচারও থাকবে, এমন অদ্ভুত তত্ত্বের প্রবর্তকেরা । এর বিপরীতে চুল মার্কস ও এঙ্গেলস, তাঁরা ঐ দু-ধরনের সমাজতন্ত্রীদের মতবাদের ত্রুটিগুলি ধরিয়ে দেন এবং সমাজ পরিবর্তনের গতিধারা এবং তার অন্তর্নিহিত বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া উদঘাটন করেন । এই সময় আট ঘন্টার কাজের দাবিও শুরু হয়ে যায় ।

যে মতবাদেরই হোন না কেন - সমাজতন্ত্রীরা চার্চদের ভূমিকার বিরুদ্ধে ছিলেন । তারা ধর্মের সমালোচনা করতেন এবং সমাজের ঘটতে থাকা ঘটনাগুলির মধ্যে চার্চের হস্তক্ষেপের নিন্দা করতেন । এই অংশটার সঙ্গে বিবেকানন্দের যোগাযোগ হয়েছিল । কিন্তু মার্কস-এঞ্জেলেসের ধারণার সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়েছিল -- এমন কোন তথ্য পাওয়া যায়নি ।

ভারতে এই ভাবধারা প্রবেশ করলেও কোন তত্ত্বগত এবং সংগঠিত রূপ প্রকাশ পায়নি । স্বামী বিবেকানন্দ ছাত্র অবস্থাতেই ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক ভাবধারার সঙ্গে ভালোভাবেই পরিচিত হয়েছিলেন । তিনি পাশ্চাত্য জ্ঞান-বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন । ঐ সময় বিদেশে সম্ভবত স্বামী বিবেকানন্দ সমাজতান্ত্রিক ভাবধারার সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন । পরবর্তীকালে আমেরিকা ও ইউরোপ পর্যটনের সময় তিনি বিভিন্ন ধরনের সমাজতন্ত্র সম্বন্ধে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন ।

বিবেকানন্দ মনে করতেন ভারতবর্ষের ইতিহাস হল - শ্রেণী শাসনের ইতিহাস (তৎকালীন সময়ে মার্কসবাদরা ছাড়া একমাত্র বিবেকানন্দই একথা ভাবতে পেরেছিলেন)। তিনি ব্যাখ্যা করেছিলেন যে, ইতিহাসের আদি অধ্যায় ছিল ব্রাহ্মণ শাসন, তারপর ক্ষত্রিয় শাসন, তারপরে বৈশ্য শাসন (বিবেকানন্দের কথায় তা তখনও চলছে) তার পরেই মুদির দোকানের মত জায়গাগুলো থেকে বের করে ভারতকে শূদ্র শাসনের অধীনে নিয়ে আসার কথা বলেছিলেন ।

ভারতের বৈশ্য শাসন সম্পর্কে তিনি যে মন্তব্য করেছেন তা প্রকৃতপক্ষে বৈশ্য শাসনকে পুঁজিবাদী শোষণের সমগোত্রীয় বলে চিহ্নিত করা । বৈশ্য শাসন সম্পর্কে তিনি বলেছেন এটা হচ্ছে 'রক্ত পিপাসু ক্ষমতা' । পুঁজিবাদী শাসন যে নিঃসন্দেহে শোষণ করে তা বিবেকানন্দের চিন্তাকে এড়িয়ে যেতে পারেনি । তবে বিবেকানন্দ শুধু বৈশ্য সভ্যতার সমালোচনাই করেননি, একই সঙ্গে বৈশ্য সভ্যতা যে জ্ঞান, বিজ্ঞান, কৃষি এবং প্রযুক্তির অভাবনীয় সম্পদ সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিয়েছে তারও তিনি সোচ্চার প্রশংসা করেছেন । বৈশ্যদের এই বিষয়ে প্রশংসা করলেও তিনি বলেছিলেন এই শূদ্রের শ্রমের ওপরেই নির্ভর করে ব্রাহ্মণের প্রভাব ক্ষত্রিয়ের ক্ষমতা এবং বৈশ্যের সম্পদ সম্ভব হয়েছে । যাদের নাম দেওয়া হয়েছে নীচু জাতি অন্ত্যজ তারাই হল আসলে সমাজের শরিক, কিন্তু তাদের ইতিহাস কোথায় ? তারা লেখাপড়া শিখলে তাদের জিভ ও মাংস উপড়ে দেওয়া হতো । বিবেকানন্দ আর-একটি কথা বলেছেন যা মার্কসবাদী হিসেবে আমাদের কাছে প্রণিধানযোগ্য । ক্ষত্রিয়ের হাত থেকে ক্ষমতা নেওয়ার সময় বৈশ্যদের এমন কোনো সদিচ্ছা ছিল না যে, ক্ষমতা শূদ্রদের হাতে গিয়ে পড়ুক । মার্কসবাদীরা মিলিয়ে নিতে পারবেন সামন্ততন্ত্রের হাত থেকে পুঁজিবাদী যখন ক্ষমতা দখল করল তারাও শ্রমিক শ্রেণীর হাত থেকে নিজেদের ক্ষমতা বাঁচাতে চাইছিল । বিবেকানন্দ বলেছিলেন, 'সোসালিজম, অ্যানার্কিজম অ্যান্ড নিহিলিজম এই জাতীয় অন্যান্য মতামতগুলি আসন্ন সমাজ বিপ্লবের অগ্রদূত' (বিবেকানন্দ মডার্ন ইন্ডিয়া) 'শূদ্রের আধিপত্য অবশ্যম্ভাবি কেউ একে ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না ।'

শূদ্র শাসন কী হিংসার পথে হাঁটবে, না অহিংসার পথে হাঁটবে এ ক্ষেত্রে বিবেকানন্দের স্পষ্ট মত ছিল অহিংসার পথেই হাঁটা উচিত । কিন্তু বাস্তবে কি তা সম্ভব ? কারণ বলবানরা সবসময় দুর্বলদের ওপর অত্যাচার করে । এইজন্য তিনি শূদ্রদেড় উদ্দেশ্যে বলেছিলেন 'বিদ্রোহে তোমার চির অধিকার ।' তিনি আরো বলেছিলেন, সন্ন্যাসীদের পক্ষে অহিংসা সম্ভব কিন্তু ওটা সাধারণ মানুষের জন্য সম্ভব নয় । উচ্চ-জাতির উচিত হচ্ছে নিম্ন জাতিদের ন্যায্য অধিকার পেতে সাহায্য করা, তা না করে তাদের অবনমিত করতে চাইলে তারা নিজেরাই ধ্বংস হয়ে যাবে, নিজেদের সমাধি নিজেদেরই খুঁড়তে হবে । যত বিলম্ব বাড়বে তত মার খাবে । কোনো দেশে সাধারণ মানুষের যদি অধিকার না থাকে তাহলে জাতি সংগঠিত হতে পারে না ।

বিবেকানন্দ বলেছিলেন 'আমি সমাজতন্ত্রী তার মানে এই নয় যে, সমাজতন্ত্রকে আমি একটা পরিপূর্ণ বিশুদ্ধ সমাজব্যবস্থা বলে মনে করি, কারণটা এই যে উপবাস করার চেয়ে আধখানা রুটি খাওয়া ভালো ।' স্বামী বিবেকানন্দের এই উক্তি থেকে বোঝা যায় সমাজতন্ত্র সম্পর্কে তাঁর কিছু ধারণা হয়েছিল । যদিও তিনি ইউটোপিও সমাজব্যবস্থার কথা শুনেছিলেন সেটাই তাঁর প্রেরণার উৎস স্থল ছিল । কিন্তু তাঁর ধারণার মধ্যে কী ভুল ছিল ? ধারণার মধ্যে ভুল ছিল সেটা বলা যাবে না, আমরা যারা মার্কসবাদী তারা জানি সমাজতন্ত্র সাম্যবাদের আগের ধাপ । আবার সমাজতন্ত্রকে বহু পর্যায়ের মধ্যে দিয়ে অতিক্রম করতে হয় । সমাজতন্ত্র যত অগ্রসর হয় তত প্রাচুর্য বাড়ে । একবিংশ শতাব্দীর চিন, এ বিষয়ে আমাদের কাছে একটা জ্বলন্ত উদাহরণ । স্বামী বিবেকানন্দের এই উক্তি ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ প্রান্তে এসে তৎকালীন ভারতীয় সাধক-সন্ন্যাসীদের ও মনীষীদের মধ্যে সর্বপ্রথম শ্রেণীস্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে সমাজবিবর্তনের ধারা অনুধাবন করার মতো বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দেয় ।

বিবেকানন্দ কেন প্রত্যক্ষভাবে সমাজ সংস্কারের পথে অগ্রসর না হয়ে ধর্ম সংস্কার ও ধর্ম প্রচারের পথে অগ্রসর হয়েছিলেন ? বিবেকানন্দ ধর্মের মাধ্যমে সমাজতন্ত্র ও মানবতন্ত্রের কথাই বেশি বলেছেন । ভারতে তিনিই সর্বপ্রথম সমাজতন্ত্রের আদর্শ প্রচার করেছেন, সেকথা ভুলে গিয়ে তাকে যদি শুধু ধর্ম সংস্কারক বা ধর্মের বিচারক বলে প্রচার করা হয় তবে তাঁর আদর্শকে ও জীবনের ব্রতকে বিকৃত ও খণ্ডিত করা হবে ।

বিশিষ্ট সমাজতাত্ত্বিক লেখক বিনয় ঘোষের মতে প্রত্যক্ষভাবে সমাজ সংস্কারের পথে না গিয়ে বিবেকানন্দ ধর্মসংস্কারের ওপর জোর দিয়েছেন কেন ? বিবেকানন্দের কাছে ধর্ম মানে কতকগুলি মন্ত্র বা আচার ছিল না । তাঁর কাছে ধর্ম ছিল কতকগুলি প্রত্যয়, বিশ্বাস, ধ্যানধারণা, ন্যায়-অন্যায়, নীতিবোধ ইত্যাদি । সমগ্র জাতির মানস সত্তার মূল ভিত্তিটিকে তিনি সবার আগে শক্ত করতে চেয়েছিলেন । দ্বিতীয়ত তিনি মনে করেছিলেন বৃহত্তর হিন্দু সমাজের কল্যাণের জন্য কিছু করতে হলে প্রথমেই হিন্দু ধর্মকে অপবাদ ও কুসংস্কারের পঙ্ককুন্ড থেকে উদ্ধার করা দরকার । তৃতীয়ত ব্রাহ্ম সমাজের জটিল তত্ত্ব জনসাধারণের কাছে বোধগম্য ছিল না তা ছিল উচ্চশিক্ষিত, উচ্চবিত্তদের মধ্যে আবদ্ধ ব্রাহ্মবাদীরা জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন । চতুর্থত, সনাতন পন্থী ও হিন্দু জাতীয়তাবাদ মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছিল । বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার রামকৃষ্ণ ও বিবেকানন্দ কখনই সংকীর্ণ সনাতনপন্থী ছিলেন না । বিবেকানন্দ ধর্মের মাধ্যমে সমাজতত্ত্ব ও মানবতত্ত্বের কথা বলেছেন । আমাদের দেশে সমাজতন্ত্রের আদর্শ সম্ভবত সর্বপ্রথম বিবেকানন্দই স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন । সুতরাং তাকে শুধু ধর্মসংস্কারক বা ধর্মপ্রচারক বললে ভুল হবে । তাঁর জীবনের ব্রতকেও যথোচিত মর্যাদা দেওয়া হবে না ।

================================================================

আমাদের দেশে যদি আধুনিক রাষ্ট্র চিন্তা ও সমাজচিন্তার ইতিহাস কোনোদিন লেখা হয় তবে স্বামী বিবেকানন্দ যে সেখানে কেবল স্বাদেশিকতা ও স্বাজাত্যবোধের অন্যতম উদ্বোধক বলে স্থান পাবেন তা নয়, তার সঙ্গে সমানাধিকার ও সমাজতন্ত্রের আদর্শের প্রথম প্রবক্তার কৃতিত্বও তিনি দাবি করবেন এবং সে-দাবি ঐতিহাসিক বা সমাজবিজ্ঞানীর পক্ষে অস্বীকার করাও সম্ভব হবে না । তাঁর কালে এই আদর্শের কথা নির্ভীককণ্ঠে প্রচার করতে যে কি প্রচন্ড পৌরুষের প্রয়োজন হয়েছিল তা আজ আমরা কল্পনাও করতে পারব না । কল্পনা করুন আজ থেকে ৭০/৮০ বছর আগে - বিদেশি ব্রিটিশরাজের একচ্ছত্র রাজত্বের যুগে -- কেবল স্বদেশপ্রেমের কথা নয় -- তিনি দেশের উচ্চশ্রেণী ও উচ্চসমাজের মুখের উপর বলেছেন -- 'তোমরা শূন্যে বিলীন হও, নূতন ভারত বেরুক, বেরুক চাষার কুটির ভেদ করে, জেলে, মালো, মেথরের ঝুপড়ির মধ্য থেকে ।'

সর্ব নিম্নস্তরের মানুষের কাছেও প্রাণের অভিনন্দন পাওয়া যায় - এ তিনি জানতেন । কিন্তু বৈরাগ্যের বাণী বা ধর্মতত্ত্বের কথা তিনি মানুষের কাছে প্রচার করেননি । প্রচার করেছেন ঐতিহ্যের কথা, দেশাত্মবোধের কথা এবং জাতিভেদহীন শ্রেণীভেদহীন সমাজগঠনের কথা । আজকের জাতীয় সংকটের দিনে বিশেষ করে স্বামী বিবেকানন্দের দেশাত্মবোধ ও দেশীয় ঐতিহ্যবোধের আদর্শ এবং তাঁর ভেদবৈষম্যহীন ভারতীয় সমাজগঠনের আদর্শ থেকে আমরা খানিকটা প্রেরণা পেতে পারি । 

Thursday, 15 June 2017

ভারতে সাম্প্রদায়িকতা স্বরূপ-সন্ধান ও আশুবিপদ - একটি নোট - বিজয় পাল

ধর্ম ও মৌলবাদ

বিবেকানন্দ হিন্দু ধর্ম সবন্ধে বলছেন, " হিন্দু ধর্মের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হইল অন্যান্য ধর্ম ও বিশ্বাস সমূহের প্রতি সহিষ্ণুতা । ... যদি কেউ মনে করে থাকেন যে, ঐক্য আসবে কোন একটি ধর্মের জয়ের ও অন্য সব ধর্মের ধ্বংসের মধ্য দিয়ে, তাকে আমি বলব : হে আমার ভাই, এটা তোমার ভ্রান্ত আশা । আমি কি চাইব যে, খ্রিস্টানরা হিন্দুধর্ম গ্রহণ করুক ? ঈশ্বর করুন, কখনই না । ... খ্রিস্টান হিন্দু বা বৌদ্ধ হবে না অথবা হিন্দুও বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান হবে না । কিন্তু প্রত্যেককেই অপরের আদর্শ থেকে তার মর্মকথা আত্মস্থ করতে হবে ।"

=========================================================

আদিম মানুষের প্রকৃতির কাছে অসহায়তা থেকে উদ্ভূত অলৌকিক ধারণা পরবর্তীকালে সমাজে আধিপত্য সৃষ্টিকারী শক্তির হাতে ধর্ম বিশ্বাসের মাধ্যমে শ্রেণি শাসনের হাতিয়ারে পরিণত হয় । শ্রেণি শাসনে গরিব মানুষের আর্থিক ও সামাজিক অসহায়তা আরও তীব্র হওয়ায় 'ধর্ম বিশ্বাসের' শেকড় আরও শক্তপোক্ত হয়ে ওঠে ।

... প্রকৃতির কাছে মানুষের অসহায়তাজনিত অতিলৌকিক বিশ্বাসকে সমাজে প্রভুত্বকারী শ্রেণি ধর্মের মোড়কে হাজির করেছে এবং তাকে ব্যবহার করেছে, যার শেকড় রয়েছে মানুষের জীবন জীবিকার অধিকারের অপ্রাপ্তি ও অনিশ্চয়তাজনিত হতাশা ও ব্যর্থতার দীর্ঘ নিঃশ্বাসের গভীরে ।

=========================================================

ধর্মনিরপেক্ষতা বনাম সাম্প্রদায়িকতা 

ধর্মনিরপেক্ষতার ঠিক বিপরীতে রয়েছে সাম্প্রদায়িকতা । আমাদের দেশের সংবিধানে ১৯৭৭ সালে প্রথম 'ধর্মনিরপেক্ষতা' শব্দটি যুক্ত করা হয় । ধর্মনিরপেক্ষতা ধারণাটি এসেছে ইউরোপের ইতিহাস থেকে । ইউরোপের উদীয়মান বুর্জোয়াদের সামন্ততন্ত্রের সঙ্গে সংগ্রাম করে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করতে হয়েছিল । সামন্ত প্রভুদের সঙ্গে গীর্জার পাদ্রীদের দৃঢ় গাঁটছড়া বাঁধা ছিল । ফলে সামন্ত প্রভুদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে গিয়ে তাদের গীর্জার বিরুদ্ধেও লড়তে হয়েছে । ইতিহাসে এই যুদ্ধ 'ক্রুসেড' নামে খ্যাত । এই সংগ্রামের মাধ্যমেই বুর্জোয়ারা বুঝেছিল রাষ্ট্রের সঙ্গে ধর্মের সম্পর্ক ছেদ করতে হবে । রাষ্ট্র ধর্মের সঙ্গে যুক্তও হবে না আবার ধর্ম-বিরোধীও হবে না । প্রত্যেক নাগরিকেরই স্বাধীন ধর্মাচরণের অধিকার থাকবে । তবে কেউ কাউকে ধর্মাচরণ করতে বাধ্য করবে না, কারও ধর্মাচরণে বাধাও দেবে না । ধর্মের সঙ্গে রাষ্ট্রের এই সম্পর্ককেই ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র বলে গণ্য করা হয় । সেজন্যই ইউরোপের বিশেষত ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডে কার্যত সকলেই খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী হওয়া সত্ত্বেও ওরা ওদের দেশকে খ্রিস্টান ধর্মীয় রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করেনি ।

=========================================================

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বেদ, উপনিষদের উপর ভিত্তি করেই তাঁর আন্তর্জাতিক মানবতাবাদ গড়ে তুলেছিলেন । সেই উপলব্ধি থেকে তিনি লিখলেন, "এই বহু দেব দেবী, বিচিত্র পুরাণ এবং অন্ধ লোকাচার সংকুল আধুনিক বৃহৎ বিকারের নাম হিন্দুত্ব ।" "সাহেবি অনুকরণ আমাদের পক্ষে নিষ্ফল, হিন্দুয়ানী গোঁড়ামী আমাদের পক্ষে মৃত্যু ।" (হিন্দুর ঐক্য) ।

উভয় সাম্প্রদায়িক শক্তির উগ্র প্রচারে বিরক্ত কবি লিখলেন, "একটা দিন আসিল যখন হিন্দু আপন হিন্দুত্ব লইয়া গৌরব করিতে উদ্যত হইল। তখন মুসলমান যদি হিন্দুর গৌরব মানিয়া লইয়া নিজেরা চুপচাপ পড়িয়া থাকিত তবে হিন্দু খুব খুশি হইত সন্দেহ নাই, কিন্তু যে কারণে হিন্দুর হিন্দুত্ব উগ্র হইয়া উঠিল সেই কারণেই মুসলমানের মুসলমানি মাথা তুলিয়া উঠিল। ... আমি হিন্দুর তরফ থেকেই বলছি, মুসলমানের ত্রুটি বিচারটা থাক্‌-- আমরা মুসলমানকে কাছে টানতে যদি না পেরে থাকি তবে সেজন্যে যেন লজ্জা স্বীকার করি।"

তিনি আরও বললেন, "ভারতবর্ষের অধিবাসীদের দুই মোটা ভাগ, হিন্দু ও মুসলমান। যদি ভাবি, মুসলমানদের অস্বীকার করে এক পাশে সরিয়ে দিলেই দেশের সকল মঙ্গলপ্রচেষ্টা সফল হবে, তা হলে বড়োই ভুল করব। ছাদের পাঁচটা কড়িকে মানব, বাকি তিনটে কড়িকে মানবই না, এটা বিরক্তির কথা হতে পারে, কিন্তু ছাদ-রক্ষার পক্ষে সুবুদ্ধির কথা নয়। আমাদের সবচেয়ে বড়ো অমঙ্গল বড়ো দুর্গতি ঘটে যখন মানুষ মানুষের পাশে রয়েছে অথচ পরস্পরের মধ্যে সম্বন্ধ নেই, অথবা সে সম্বন্ধ বিকৃত।" এভাবেই উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐক্য ও সম্প্রীতির বন্ধন গড়ে তোলার মাধ্যমেই ভারতের প্রকৃত মঙ্গল হতে পারে বলে কবি দৃঢ় মত পোষণ করেন ।

সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বীভৎসতা দেখে তিনি উপলব্ধি করে লিখলেন, "এই মোহমুগ্ধ ধর্ম বিভীষিকার চেয়ে সোজাসুজি নাস্তিকতা অনেক ভাল ।  আজ মিছে ধর্মকে পুড়িয়ে ফেলে ভারত যদি খাঁটি ধর্ম, খাঁটি নাস্তিকতা পায় তবে ভারত সত্যই নব জীবন লাভ করবে ।"

আর এস এস হিন্দু ধর্ম প্রচারের নামে 'হিন্দুত্ব' শব্দটিকে সামনে এনেছে । 'হিন্দুত্ব' শব্দটি হিন্দু ধর্মের কোথাও নেই । কোন হিন্দু ধর্ম গুরুর লেখাতে এই শব্দটি পাওয়া যায় না । হিন্দু ধর্মকে ফ্যাসিবাদের মোড়কে হাজির করার উদ্দেশ্যেই প্রথমে হিন্দু মহাসভা পরে আর এস এস নেতা সাভারকার সম্পূর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে ১৯২৩ সালে প্রথম 'হিন্দুত্ব' শব্দটি ব্যবহার করেন । 'হিন্দুত্ব' শব্দের আড়ালে তিনি ভারতে বসবাসকারী সকলকে হিন্দুত্বের অনুসারী হওয়ার নিদান দেন । অর্থাৎ অন্য ধর্ম মতগুলির বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়িয়ে ধর্মীয় বিভাজনের উদ্দেশ্যে একাজ তিনি করেন । তিনি দাবি করেন 'হিন্দুত্ব' হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট জীবন-ধারা, যার উদ্ভব ভারতেই । অতএব ভারতে থাকতে হলে হিন্দুত্বের জীবনধারা গ্রহণ করতে হবে । এর বাইরে যারা থাকবেন তাদের ভারতের নাগরিকত্ব থাকবে না অর্থাৎ তাদের ভারত ত্যাগ করতে হবে নইলে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকের মতো করে থাকতে হবে । এটা খোলাখুলি অন্য ধর্মগুলির প্রতি আক্রমণের আহবান । সোজা কথায় মুসলিম নিধনের আহবান ।

অথচ যে বিবেকানন্দকে ওরা ওদের মতের সপক্ষে বিকৃতভাবে প্রচার করে, তিনি বলছেন, "আমাদের দৃঢ় ধারণা যে, বেদান্তের মতবাদ যতই সূক্ষ্ম ও বিস্ময়কর হউক না কেন, কর্ম পরিণত ইসলাম ধর্মের সহায়তা ব্যতীত তাহা মানব সাধারণের অধিকাংশের নিকট সম্পূর্ণরূপে নিরর্থক। আমরা মানবজাতির সেই স্থানে লইয়া যাইতে চাই — যেখানে বেদও নাই, বাইবেলও নাই, কোরানও নাই , অথচ বেদ, বাইবেল ও কোরানের সমন্বয় দ্বারাই ইহা করিতে হইবে। মানবকে শিখাইতে হইবে যে, সকল ধর্ম একত্বরূপ সেই এক ধর্মেরই বিবিধ প্রকাশ মাত্র, সুতরাং যাহার যেটি সর্বাপেক্ষা উপযোগী সেইটিকেই সে বাছিয়া লইতে পারে । আমাদের মাতৃভূমির পক্ষে হিন্দু ও ইসলাম ধর্ম-রূপ এই দুই মহান মতের সমন্বয়ই বৈদান্তিক মস্তিষ্ক ও ইসলামীয় দেহ - একমাত্র আশা । আমি মানসচক্ষে দেখিতেছি, এই বিবাদ বিশৃঙ্খলা ভেদপূর্বক ভবিষ্যৎ পূর্ণাঙ্গ ভারত বৈদান্তিক মস্তিষ্ক ও ইসলামিক দেহ লইয়া মহা মহিমায় ও অপরাজেয় শক্তিতে জাগিয়া উঠিতেছে।"

সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে ধিক্কার জানিয়ে তিনি লিখছেন, 'কোনও ধর্মই কখনও মানুষের উপর অত্যাচার করে নাই, কোন ধর্মই কখনও এই ধরনের অন্যায় কার্যের সমর্থন করে নাই । তবে মানুষকে এ-সকল কার্যে উত্তেজিত করিল কিসে ? রাজনীতিই মানুষকে এই সকল অন্যায় কার্য করিতে প্ররোচিত করিয়াছে, ধর্ম নয় ।"

তিনি আরও লিখছেন, "সাম্প্রদায়িকতা, গোঁড়ামি ও এগুলির ভয়াবহ ফল স্বরূপ ধর্মোন্মত্ততা এই সুন্দর পৃথিবীকে বহুকাল অধিকার করিয়া রাখিয়াছে । ইহারা পৃথিবীকে হিংসায় পূর্ণ করিয়া রাখিয়াছে । ইহারা পৃথিবীকে হিংসায় পূর্ণ করিয়াছে, বারবার ইহাকে নরশোণিতে সিক্ত করিয়াছে, সভ্যতা ধ্বংস করিয়াছে এবং সমগ্র জাতিকে হতাশায় মগ্ন করিয়াছে । এই সকল ভীষণ পিশাচ যদি না থাকিত, তাহা হইলে মানব সমাজ আজ পূর্বাপেক্ষা অনেক উন্নত হইত । তবে ইহাদের মৃত্যুকাল উপস্থিত ।"

"যদি এই ভারতে যেখানে চিরদিন সকল সম্প্রদায়ই সম্মানিত হইয়া আসিয়াছেন সেই ভারতে এখনও এইসব সাম্প্রদায়িক বিবাদ, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে পরস্পর দ্বেষহিংসা থাকে, তবে ধিক্ তাহাদিগকে, যাহারা সেই মহিমান্বিত পূর্ব পুরুষগণের বংশধর বলিয়া নিজদের পরিচয় দেয়। ... আমরা সকলকেই আমাদের ভাবে আনিতে পারি না । আমরা যেরূপ ব্যাখ্যা করিব, সকলকেই সে ব্যাখ্যা গ্রহণ করিতে হইবে বা সকলকেই আমাদের প্রণালী অবলম্বন করিয়া চলিতে হইবে জোর করিয়া এরূপ চেষ্টা করা অত্যন্ত অন্যায় । ... অপরকে ঘৃণা করিতে থাকিলে কেহই নিজে অবনত না হইয়া থাকিতে পারে না ... সম্প্রসারণই জীবন, সঙ্কীর্ণতাই মৃত্যু, প্রেমই জীবন, দ্বেষই মৃত্যু ।"

ভাবলে শিউরে উঠতে হয় আর এস এস বিবেকানন্দকে যেভাবে তাদের স্বার্থে প্রচার করছে, বেঁচে থাকলে তিনি এদের সম্বন্ধে কী বলতেন ।

আজীবন নিষ্ঠাভরে হিন্দু ধর্মাচরণ পালন করেও গান্ধীজি আর এস এস-এর সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে স্পষ্ট করে বললেন, "কোটি কোটি ভারতবাসী যারা হিন্দু ছিল ও পরে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল তারা আর ভারতীয় রইল না --- এই ধারণার বিরুদ্ধে আমি বিদ্রোহ ঘোষণা করি । ... হিন্দু ধর্ম ও ইসলাম দুটি পরস্পর বিরোধী মতবাদ ও সংস্কৃতি - এই ধারণার বিরুদ্ধেও আমার সমস্ত প্রাণ মন বিদ্রোহী হয়ে ওঠে ।"

কমিউনিস্টরা ধর্মাচরণ না করাকেই শ্রেয় মনে করে, কারণ তাঁরা বিশ্ব - প্রকৃতির যাবতীয় সৃষ্টি ও ঘটনা, তার উদ্ভব ও লয়ের কারণ বাইরের কোন শক্তির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে - এই ভ্রান্ত ধারণার দ্বারা পরিচালিত হয় না । তাই বলে তারা কারও ধর্মবিশ্বাসকে আঘাত করে না । তারা শুধু মানুষের দুঃখ, দুর্দশা, কারও সম্পদের পাহাড়, কারও নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার জন্য ঈশ্বরকে দায়ী করা বা তাঁর ইচ্ছাতেই সব হচ্ছে এই ধারণার দ্বারা পরিচালিত না হওয়ার জন্য মানুষকে সমবেত করার চেষ্টা করে । বৈষম্যের কারণ বর্তমান বিশ্ব-ব্যবস্থা তথা আর্থিক-নীতির মধ্যেই নিহিত রয়েছে - এই সত্য তুলে ধরে তার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের মহাসাগরে সকলকে মেলাতে চায় ।

=========================================================





=========================================================

আমেরিকায় প্রবাসকালে বিবেকানন্দ গো মাংস ভক্ষণ করেছেন । এর বিরুদ্ধে ব্রাহ্মণ্যবাদীরা অভিযোগ করলে তিনি দৃঢ়ভাবে আত্মপক্ষ সমর্থন করেন এবং বলেন "ভারতবাসীরা যদি চায় আমি একমাত্র হিন্দু খাবার খাই, তারা যেন আমাকে একজন রান্নার লোক এবং তার জন্য অনেক টাকা পাঠায় ... আমি কারও আদেশে চলিনা, আমি আমার জীবনের উদ্দেশ্য জানি এবং আমার কোন সংকীর্ণতা নেই । আমি যতখানি ভারতীয় ততখানি বিশ্বমানব ।  তোমরা কি বলতে চাও যে আমি ঐ জাতিভেদে জর্জরিত কুসংস্কারাচ্ছন্ন, নিষ্ঠুর, ভন্ড, নাস্তিক ও কাপুরুষ শিক্ষিত হিন্দুদের মধ্যেই জীবন কাটাবার জন্য এবং মরবার জন্য জন্মেছি ?" (আলা সিংগা নামে তাঁর এক মাদ্রাজি শিষ্যকে লন্ডন থেকে ১৮৯৫ এর ১৮ নভেম্বর লেখা পত্র সংকলনে পাওয়া যায়) । ১৯০২ সালে বিবেকানন্দের মৃত্যুর পরে অমৃতবাজার পত্রিকায় 'The Meat Eating Swami' নামে একটি সম্পাদকীয় লেখা হয়েছিল । (সূত্র - 'সহাস্য বিবেকানন্দ' - শঙ্করীপ্রসাদ বসু )।

=========================================================

Wednesday, 14 June 2017

কমিউনিজমের সামাজিক ও রাজনৈতিক মতবাদ - রজনী পাম দত্ত



সাম্যবাদের লক্ষ্য হল মানুষের প্রয়োজন মেটানোর জন্য সমাজের এবং অবশেষে একটি একীভূত অখণ্ড সত্তা হিসেবে সমগ্র বিশ্ব-সমাজের উৎপাদিকা শক্তিগুলিকে সংগঠিত করা, বিদ্যমান প্রাকৃতিক সম্পদ, বৈজ্ঞানিক সম্ভাবনা ও কার্যক্ষম প্রতিটি মানুষের সহযোগমূলক শ্রমকে যথাসম্ভব ভালভাবে ব্যবহার করা এবং এর সাহায্যে ত্রুটিপূর্ণ উপায়ে প্রাকৃতিক ও অর্থনৈতিক শক্তিকে কাজে লাগানোর বর্তমান নির্ভরতা থেকে মানবসমাজেকে মুক্ত করা, সেইসঙ্গে বর্তমানের নানান বৈরিতা ও শ্রেণীবিভাজন থেকেও মানবসমাজের মুক্তি ঘটানো । এই পথেই বাস্তবায়িত হবে ভবিষ্যতের স্বাধীন সাম্যবাদী সমাজব্যবস্থা ।

==============================================

সমাজ-গঠনের উচ্চতর পর্যায় হিসেবে সাম্যবাদের সুবিধাগুলি একান্তই স্পষ্ট ।

প্রথমত, বিদ্যমান উৎপাদিকা-শক্তিগুলি, যেগুলি আজ ক্রমবর্ধিত মাত্রায় অব্যবহৃত, অপব্যবহৃত অথবা বাধাপ্রাপ্ত হয়ে চলেছে, সেগুলিকে পরিপূর্ণভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হবে ।

দ্বিতীয়ত, বাজারের বেপরোয়া অধিপত্যের নৈরাজ্য, প্রাকৃতিক ও সামাজিক সম্পদের সীমাহীন অপচয় এবং ক্রমবর্ধিত বিধ্বংসী সংকটের বদলে সুসমঞ্জসভাবে পরিকল্পিত উৎপাদন ও উন্নয়ন ।

তৃতীয়ত, ক্রমবর্ধিত চাহিদা পূরণের জন্য উৎপাদনের অবাধ ও সুসমঞ্জস বিস্তার ঘটানো সম্ভব হবে - সেক্ষেত্রে সমাজের শ্রেণীকাঠামো ও পণ উৎপাদনের অবস্থা নিজের মর্জিমাফিক কোনও বাজার-সীমা চাপিয়ে দিয়ে তাকে ব্যাহত করতে পারবে না । উৎপাদনের বিস্তার এবং কলাকৌশলের উন্নতি বিদ্যমান যাবতীয় চাহিদাকে পূরণ করতে সক্ষম হলে তার ফলস্বরূপ আর দারিদ্র্য, সংকট ও সার্বিক বেকারিত্ব দেখা দেবে না, বরং সৃষ্টি হবে বাড়তি চাহিদা পূরণ করার এবং শ্রমের ভার লাঘব করার সম্ভাবনা ।

চতুর্থত, উৎপাদনের বিশ্বব্যাপী সংগঠন - যা একমাত্র সাম্যবাদী ভিত্তিতেই গড়ে উঠতে পারে - অন্য দেশ দখল করা, কাঁচামাল ও শোষণের বিভিন্ন ক্ষেত্রকে নিজেদের কব্জায় আনার জন্য সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলির পারস্পরিক সংঘাতের অবসান ঘটাবে এবং তার ফলস্বরূপ অবসান ঘটবে অস্ত্রশস্ত্রের বিপুল অপচয় ও বিধ্বংসী যুদ্ধের, যা এই মুহূর্তে গ্রাস করতে চলেছে সমগ্র মানবসমাজকে ।

পঞ্চমত, উন্নত ও পশ্চাদ্পদ জাতি ও দেশগুলির মধ্যেকার, শাসক ও শোষিত দেশগুলির মধ্যেকার পার্থক্য অন্তর্হিত হবে এবং অবসান ঘটবে বর্তমানের ভারসাম্যহীন বিশ্ব-বিকাশের, যেখানে পৃথিবীর অধিকাংশ অঞ্চল উন্নত উৎপাদন চালু করার মতো যাবতীয় সম্পদের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও আদিম কলাকৌশল আর শস্তা শ্রমের ঔপনিবেশিক এলাকা হিসেবে পিছিয়ে পড়ে আছে । এইসব এলাকা এবং সেখানকার বাসিন্দাদের দ্রূত উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করে সর্বাধিক উন্নত দেশগুলির সমান মাত্রায় উন্নীত করার কাজে ব্যবহার করা হবে বিশ্বের সম্পদকে । সমস্ত দেশের স্বাধীনতা ও সমতার মধ্যে দিয়েই উন্মুক্ত হবে ভবিষ্যতের ঐক্যবদ্ধ মানবজাতি গঠনের পথ ।

ষষ্ঠত, শ্রেণীসমূহের অবলুপ্তির ফলে অবসান ঘটবে বর্তমান সমাজকাঠামোর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত পরজীবীবৃত্তি ও অপচয়ের - অবসান ঘটবে ওপরতলার অলসতা আর লুণ্ঠনমূলক কার্যকলাপের, নীচের তোলার মানুষদের বিপথগামী শ্রম, অত্যাধিক মেহনত আর উন্নয়নহীনতার, এবং অর্থহীন প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক বিপণন-ব্যবস্থা ও অনুৎপাদিকা কার্যকলাপে সমাজের শ্রমশক্তির ক্রমবর্ধমান অপচয়ের । শ্রেণীর অবলুপ্তি ঘটলে এই সবকিছুরই অবসান ঘটবে ।

সপ্তমত, শ্রেণীগুলির অবলুপ্তি ঘটলে শ্রেণী-সংঘাতের সর্বনাশা বোঝার হাত থেকে মুক্তি পাবে সমাজ, আর তার ফলস্বরূপ অবসান ঘটবে সামাজিক ও রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার এবং সার্বজনীন গঠনমূলক কর্তব্যের বদলে শ্রমশক্তির ভিন্নপথে চালিত হওয়ার (যা বর্তমানে অপরিহার্য ও প্রয়োজনীয়, সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে উৎপাদনের উপকরণসমূহের সামাজিক মালিকানা অর্জিত না-হওয়া পর্যন্ত যা টিকে থাকবে)।

অষ্টমত, বিশ্বের জনসংখ্যার অর্ধেক হল নারীরা, যারা এখনও পরাধীন ও অনুন্নতই রয়ে গেছে । তাদের প্রকৃত মুক্তি একমাত্র তখনই সম্ভব, যখন সামাজিক উৎপাদনে সমানভাবে অংশগ্রহণ করতে পারবে নারীরা, যখন মাতৃত্বের দায়িত্ব সামাজিকভাবে বহন করা হবে এবং যখন অর্থনৈতিকভাবে নারীরা আর পুরুষদের ওপর নির্ভরশীল থাকবে না ।

নবমত, সংস্কৃতি আর একটিমাত্র শ্রেণীর একচেটিয়া সম্পত্তি হয়ে থাকবে না, তা পরিণত হবে সকলের সাধারণ ঐতিহ্যে । শ্রেণীগত পার্থক্যের যাবতীয় অবশেষ নিশ্চিহ্ন হওয়ার পর এবং নতুন ও পূর্ণবিকশিত সাম্যবাদী মানবতার বিবর্তন সম্পূর্ণ হওয়ার পর, মানসিক শ্রম ও কায়িক শ্রমের মধ্যেকার বৈরিতা, শহর ও গ্রামের মধ্যেকার বৈরিতা এবং বিদ্যমান শ্রমবিভাজনের উচ্চ-নীচ ভেদাভেদ সম্পূর্ণভাবে অবলুপ্ত হবে ।

দশমত, শ্রেণীগত পার্থক্য সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন হওয়ার পরবর্তী সাম্যবাদী সমাজে একটি অধীনস্থ শ্রেণীকে দমন করার এবং সামাজিক দ্বন্দ্বকে বলপ্রয়োগের সাহায্যের স্তব্ধ করার যন্ত্র হিসেবে রাষ্ট্রের অস্তিত্বের অবসান ঘটবে । তখন সামনে এসে দাঁড়াবে সামাজিক উৎপাদনের যৌথ পরিচালনার সার্বজনীন দায়িত্ব, যে-কাজে সকলেই অবাধে ও সচেতনভাবে অংশগ্রহণ করবে । মানবিক সম্পর্কের সমগ্র ব্যবস্থা থেকে অন্তর্হিত হবে সব ধরণের দমনপীড়ন । পরিপূর্ণভাবে বিকশিত সাম্যবাদী সমাজব্যবস্থার নীতি হল, 'প্রত্যেকে দেবে তার সামর্থ্য অনুযায়ী, পাবে তার প্রয়োজন অনুযায়ী ।'

সাম্যবাদের এইসব ধারণা নিছকই 'আকাশকুসুম', 'কাল্পনিক' ও 'ভাববাদী' হিসেবে প্রতিভাত হবে আজকের দিনের বাণিজ্যিক বা প্রশাসনিকভাবে প্রশিক্ষিত 'বাস্তববাদী মানুষ' বা 'সম্মানিত নাগরিক'-দের কাছে, যারা 'জানে' যে এই ধরনের কোনও সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার সামর্থ্য মানবচরিত্রের নেই, লোভ, অলসতা, দ্বন্দ্বপ্রিয়তা আর ব্যক্তিগত ক্ষমতালিপ্সাই মানবচরিত্রের সহজাত বৈশিষ্ট্য, মানবসমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশকে কাজ করতে ও নিজেদের ভাগ্যকে মেনে নিতে বাধ্য করানোর জন্য দমনপীড়ন ও বাহ্যিক শৃঙ্খলার চাবুক আর অনাহারের ভীতির মধ্যে রেখে দেওয়া একান্তই অপরিহার্য ।

তবে এইসব অদূরদর্শী ও সংকীর্ণমনা 'বাস্তববাদী মানুষরা', যারা একটি বিশেষ ঐতিহাসিক পর্যায়ের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে মানবজাতির তথাকথিত চিরন্তন ও বিশ্বজনীন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য খুঁজে বেড়ায়, তারা যেমনটা ভাবে কমিউনিস্টরা তেমন বাস্তবতাবর্জিত নয় । কমিউনিস্টরা খুব ভালভাবেই জানে যে তথাকথিত অপরিবর্তনীয় - বাস্তবে নিরন্তন পরিবর্তনশীল - মানবচরিত্র হচ্ছে প্রতিটি ঐতিহাসিক পর্যায়ে সেই পর্যায়ের সামাজিক অবস্থারই ফসল । তারা এ-ও জানে যে পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা অবশ্যম্ভাবীরূপে অত্যন্ত কুৎসিত ও সমাজবিরোধী চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের জন্ম দেয় এবং যারা এক নতুন সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করছে তাদের মধ্যে প্রথমদিকে পুরনো পুঁজিবাদী দুনিয়ার বেশ কিছু অভ্যাস ও দৃষ্টিভঙ্গি রয়ে যেতে বাধ্য, নতুন সমাজব্যবস্থা গঠনের চলমান প্রক্রিয়াই তার নির্মাণকারীদের চরিত্র ও সাংস্কৃতিক মানের উন্নয়ন ঘটাতে সক্ষম ।

এই কারণেই প্রকৃত সাম্যবাদী সমাজে উত্তরণ রাতারাতি বা এক বছরের মধ্যে ঘটে যেতে পারে না (এবং কল্পিত যাবতীয় সমস্যাগুলি এই ধরনের উদ্ভট অনুমান থেকেই জন্ম নেয়), বরং সেই উত্তরণ হচ্ছে বিকাশের এক দীর্ঘ প্রক্রিয়ারই চূড়ান্ত ফল । সাম্যবাদী সমাজমুখী এই বিকাশ একটি নিম্নতর স্তর অর্থাৎ সমাজতন্ত্রের পথ বেয়ে অগ্রসর হয়ে উন্নীত হবে উচ্চতর স্তরে অর্থাৎ সাম্যবাদে ।

==============================================

বিজ্ঞানী, বিশেষ বৃত্তিজীবী ব্যক্তি, স্থপতি ও প্রশিক্ষিত প্রশাসকদের মতো প্রকরণগত বুদ্ধিজীবীরা, সেইসঙ্গে চিকিৎসক, শিক্ষক ও অন্যান্যরা শ্রমিকশ্রেণী কর্তৃক ক্ষমতাদখল এবং তার পরবর্তী সমাজতন্ত্র নির্মাণের কাজে এক অমূল্য সহযোগীর ভূমিকা পালন  করতে পারেন । কিন্তু তাঁরা কোনও স্বাধীন ভূমিকা পালন করতে পারেন না (যেমনটা অনেক সময় বলা হয়ে থাকে) । উৎপাদনেরউপায়সমূহের স্বাধীন মালিকানা অর্জন করা তাঁদের পক্ষে সম্ভব নয় । তাঁদের সামনে দু'টিমাত্র পথ আছে : হয় পুঁজিপতি শ্রেণীর সেবা করা, নয়তো শ্রমিকশ্রেণীর সেবা করা । এঁদের মধ্যেকার সবথেকে প্রগতিশীল ব্যক্তিরা ক্রমশই এ-সত্য উপলব্ধি করতে শুরু করেছেন এবং শ্রমিকশ্রেণীর পাশে এসে দাঁড়াচ্ছেন ।

==============================================

শ্রমিকশ্রেণীর সচেতন অংশ অর্থাৎ অগ্রগামী কমিউনিস্টরা এই প্রক্রিয়ার বিকাশে সহায়তা করতে ও তাকে ত্বরান্বিত করতে পারে, এবং এর অবশ্যম্ভাবী ক্ষয়ক্ষতিকে কমিয়ে আনতে পারে, কিন্তু এই প্রক্রিয়াকে পরিহার করার কোনও সংক্ষিপ্ত পথ নেই --- কেননা এই প্রক্রিয়ায় শ্রমিকরা তাদের নিজেদের অভিজ্ঞতার সাহায্যে শিক্ষালাভ করে ।

==============================================

গুরুত্বপূর্ণ সোভিয়েতগুলিতে - পেত্রোগ্রাদ ও মস্কো সোভিয়েত, প্রাক-সংসদে ট্রেড ইউনিয়নভিত্তিক প্রতিনিধিত্বে, উত্তরাঞ্চলীয় সৈন্যবাহিনীতে, পেত্রোগ্রাদ  ও মস্কোর স্থানীয় নির্বাচন ইত্যাদিতে প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে বলশেভিক পার্টি সংখ্যাধিক্য অর্জন না-করা পর্যন্ত বলশেভিক বিপ্লব সম্পন্ন হয়নি ।

==============================================

বিপ্লব অথবা একনায়কত্বকে কেউ নিশ্চয়ই গোলাপের রঙে চিত্রিত করার চেষ্টা করবেন না । কোনও বর্বর ও নির্মম শাসকশ্রেণীর বিরুদ্ধে সংগ্রামের কঠোর বাস্তবতাকে সহ্য করতে অপারগ ভাবপ্রবণ সমর্থনের বদলে পাঠক যদি কমিউনিজমের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন, তা-ও বরং ভাল । তবে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার আগে তাঁরা নিশ্চিতভাবে জেনে নিন-যে-জগতের দিকে তাঁরা মুখ ফেরাচ্ছেন সে-জগৎ হল ফ্যাসিবাদ, সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ  ঔপনিবেশিক দাসত্বের জগৎ, যাদের কৃত নির্বিচার গণহত্যা ও ধ্বংসের পরিমাণ সর্বহারা বিপ্লবের সমগ্র ঘটনার তুলনায় সহস্রগুণ অধিক ।