Wednesday, 14 June 2017

কমিউনিজমের সামাজিক ও রাজনৈতিক মতবাদ - রজনী পাম দত্ত



সাম্যবাদের লক্ষ্য হল মানুষের প্রয়োজন মেটানোর জন্য সমাজের এবং অবশেষে একটি একীভূত অখণ্ড সত্তা হিসেবে সমগ্র বিশ্ব-সমাজের উৎপাদিকা শক্তিগুলিকে সংগঠিত করা, বিদ্যমান প্রাকৃতিক সম্পদ, বৈজ্ঞানিক সম্ভাবনা ও কার্যক্ষম প্রতিটি মানুষের সহযোগমূলক শ্রমকে যথাসম্ভব ভালভাবে ব্যবহার করা এবং এর সাহায্যে ত্রুটিপূর্ণ উপায়ে প্রাকৃতিক ও অর্থনৈতিক শক্তিকে কাজে লাগানোর বর্তমান নির্ভরতা থেকে মানবসমাজেকে মুক্ত করা, সেইসঙ্গে বর্তমানের নানান বৈরিতা ও শ্রেণীবিভাজন থেকেও মানবসমাজের মুক্তি ঘটানো । এই পথেই বাস্তবায়িত হবে ভবিষ্যতের স্বাধীন সাম্যবাদী সমাজব্যবস্থা ।

==============================================

সমাজ-গঠনের উচ্চতর পর্যায় হিসেবে সাম্যবাদের সুবিধাগুলি একান্তই স্পষ্ট ।

প্রথমত, বিদ্যমান উৎপাদিকা-শক্তিগুলি, যেগুলি আজ ক্রমবর্ধিত মাত্রায় অব্যবহৃত, অপব্যবহৃত অথবা বাধাপ্রাপ্ত হয়ে চলেছে, সেগুলিকে পরিপূর্ণভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হবে ।

দ্বিতীয়ত, বাজারের বেপরোয়া অধিপত্যের নৈরাজ্য, প্রাকৃতিক ও সামাজিক সম্পদের সীমাহীন অপচয় এবং ক্রমবর্ধিত বিধ্বংসী সংকটের বদলে সুসমঞ্জসভাবে পরিকল্পিত উৎপাদন ও উন্নয়ন ।

তৃতীয়ত, ক্রমবর্ধিত চাহিদা পূরণের জন্য উৎপাদনের অবাধ ও সুসমঞ্জস বিস্তার ঘটানো সম্ভব হবে - সেক্ষেত্রে সমাজের শ্রেণীকাঠামো ও পণ উৎপাদনের অবস্থা নিজের মর্জিমাফিক কোনও বাজার-সীমা চাপিয়ে দিয়ে তাকে ব্যাহত করতে পারবে না । উৎপাদনের বিস্তার এবং কলাকৌশলের উন্নতি বিদ্যমান যাবতীয় চাহিদাকে পূরণ করতে সক্ষম হলে তার ফলস্বরূপ আর দারিদ্র্য, সংকট ও সার্বিক বেকারিত্ব দেখা দেবে না, বরং সৃষ্টি হবে বাড়তি চাহিদা পূরণ করার এবং শ্রমের ভার লাঘব করার সম্ভাবনা ।

চতুর্থত, উৎপাদনের বিশ্বব্যাপী সংগঠন - যা একমাত্র সাম্যবাদী ভিত্তিতেই গড়ে উঠতে পারে - অন্য দেশ দখল করা, কাঁচামাল ও শোষণের বিভিন্ন ক্ষেত্রকে নিজেদের কব্জায় আনার জন্য সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলির পারস্পরিক সংঘাতের অবসান ঘটাবে এবং তার ফলস্বরূপ অবসান ঘটবে অস্ত্রশস্ত্রের বিপুল অপচয় ও বিধ্বংসী যুদ্ধের, যা এই মুহূর্তে গ্রাস করতে চলেছে সমগ্র মানবসমাজকে ।

পঞ্চমত, উন্নত ও পশ্চাদ্পদ জাতি ও দেশগুলির মধ্যেকার, শাসক ও শোষিত দেশগুলির মধ্যেকার পার্থক্য অন্তর্হিত হবে এবং অবসান ঘটবে বর্তমানের ভারসাম্যহীন বিশ্ব-বিকাশের, যেখানে পৃথিবীর অধিকাংশ অঞ্চল উন্নত উৎপাদন চালু করার মতো যাবতীয় সম্পদের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও আদিম কলাকৌশল আর শস্তা শ্রমের ঔপনিবেশিক এলাকা হিসেবে পিছিয়ে পড়ে আছে । এইসব এলাকা এবং সেখানকার বাসিন্দাদের দ্রূত উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করে সর্বাধিক উন্নত দেশগুলির সমান মাত্রায় উন্নীত করার কাজে ব্যবহার করা হবে বিশ্বের সম্পদকে । সমস্ত দেশের স্বাধীনতা ও সমতার মধ্যে দিয়েই উন্মুক্ত হবে ভবিষ্যতের ঐক্যবদ্ধ মানবজাতি গঠনের পথ ।

ষষ্ঠত, শ্রেণীসমূহের অবলুপ্তির ফলে অবসান ঘটবে বর্তমান সমাজকাঠামোর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত পরজীবীবৃত্তি ও অপচয়ের - অবসান ঘটবে ওপরতলার অলসতা আর লুণ্ঠনমূলক কার্যকলাপের, নীচের তোলার মানুষদের বিপথগামী শ্রম, অত্যাধিক মেহনত আর উন্নয়নহীনতার, এবং অর্থহীন প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক বিপণন-ব্যবস্থা ও অনুৎপাদিকা কার্যকলাপে সমাজের শ্রমশক্তির ক্রমবর্ধমান অপচয়ের । শ্রেণীর অবলুপ্তি ঘটলে এই সবকিছুরই অবসান ঘটবে ।

সপ্তমত, শ্রেণীগুলির অবলুপ্তি ঘটলে শ্রেণী-সংঘাতের সর্বনাশা বোঝার হাত থেকে মুক্তি পাবে সমাজ, আর তার ফলস্বরূপ অবসান ঘটবে সামাজিক ও রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার এবং সার্বজনীন গঠনমূলক কর্তব্যের বদলে শ্রমশক্তির ভিন্নপথে চালিত হওয়ার (যা বর্তমানে অপরিহার্য ও প্রয়োজনীয়, সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে উৎপাদনের উপকরণসমূহের সামাজিক মালিকানা অর্জিত না-হওয়া পর্যন্ত যা টিকে থাকবে)।

অষ্টমত, বিশ্বের জনসংখ্যার অর্ধেক হল নারীরা, যারা এখনও পরাধীন ও অনুন্নতই রয়ে গেছে । তাদের প্রকৃত মুক্তি একমাত্র তখনই সম্ভব, যখন সামাজিক উৎপাদনে সমানভাবে অংশগ্রহণ করতে পারবে নারীরা, যখন মাতৃত্বের দায়িত্ব সামাজিকভাবে বহন করা হবে এবং যখন অর্থনৈতিকভাবে নারীরা আর পুরুষদের ওপর নির্ভরশীল থাকবে না ।

নবমত, সংস্কৃতি আর একটিমাত্র শ্রেণীর একচেটিয়া সম্পত্তি হয়ে থাকবে না, তা পরিণত হবে সকলের সাধারণ ঐতিহ্যে । শ্রেণীগত পার্থক্যের যাবতীয় অবশেষ নিশ্চিহ্ন হওয়ার পর এবং নতুন ও পূর্ণবিকশিত সাম্যবাদী মানবতার বিবর্তন সম্পূর্ণ হওয়ার পর, মানসিক শ্রম ও কায়িক শ্রমের মধ্যেকার বৈরিতা, শহর ও গ্রামের মধ্যেকার বৈরিতা এবং বিদ্যমান শ্রমবিভাজনের উচ্চ-নীচ ভেদাভেদ সম্পূর্ণভাবে অবলুপ্ত হবে ।

দশমত, শ্রেণীগত পার্থক্য সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন হওয়ার পরবর্তী সাম্যবাদী সমাজে একটি অধীনস্থ শ্রেণীকে দমন করার এবং সামাজিক দ্বন্দ্বকে বলপ্রয়োগের সাহায্যের স্তব্ধ করার যন্ত্র হিসেবে রাষ্ট্রের অস্তিত্বের অবসান ঘটবে । তখন সামনে এসে দাঁড়াবে সামাজিক উৎপাদনের যৌথ পরিচালনার সার্বজনীন দায়িত্ব, যে-কাজে সকলেই অবাধে ও সচেতনভাবে অংশগ্রহণ করবে । মানবিক সম্পর্কের সমগ্র ব্যবস্থা থেকে অন্তর্হিত হবে সব ধরণের দমনপীড়ন । পরিপূর্ণভাবে বিকশিত সাম্যবাদী সমাজব্যবস্থার নীতি হল, 'প্রত্যেকে দেবে তার সামর্থ্য অনুযায়ী, পাবে তার প্রয়োজন অনুযায়ী ।'

সাম্যবাদের এইসব ধারণা নিছকই 'আকাশকুসুম', 'কাল্পনিক' ও 'ভাববাদী' হিসেবে প্রতিভাত হবে আজকের দিনের বাণিজ্যিক বা প্রশাসনিকভাবে প্রশিক্ষিত 'বাস্তববাদী মানুষ' বা 'সম্মানিত নাগরিক'-দের কাছে, যারা 'জানে' যে এই ধরনের কোনও সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার সামর্থ্য মানবচরিত্রের নেই, লোভ, অলসতা, দ্বন্দ্বপ্রিয়তা আর ব্যক্তিগত ক্ষমতালিপ্সাই মানবচরিত্রের সহজাত বৈশিষ্ট্য, মানবসমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশকে কাজ করতে ও নিজেদের ভাগ্যকে মেনে নিতে বাধ্য করানোর জন্য দমনপীড়ন ও বাহ্যিক শৃঙ্খলার চাবুক আর অনাহারের ভীতির মধ্যে রেখে দেওয়া একান্তই অপরিহার্য ।

তবে এইসব অদূরদর্শী ও সংকীর্ণমনা 'বাস্তববাদী মানুষরা', যারা একটি বিশেষ ঐতিহাসিক পর্যায়ের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে মানবজাতির তথাকথিত চিরন্তন ও বিশ্বজনীন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য খুঁজে বেড়ায়, তারা যেমনটা ভাবে কমিউনিস্টরা তেমন বাস্তবতাবর্জিত নয় । কমিউনিস্টরা খুব ভালভাবেই জানে যে তথাকথিত অপরিবর্তনীয় - বাস্তবে নিরন্তন পরিবর্তনশীল - মানবচরিত্র হচ্ছে প্রতিটি ঐতিহাসিক পর্যায়ে সেই পর্যায়ের সামাজিক অবস্থারই ফসল । তারা এ-ও জানে যে পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা অবশ্যম্ভাবীরূপে অত্যন্ত কুৎসিত ও সমাজবিরোধী চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের জন্ম দেয় এবং যারা এক নতুন সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করছে তাদের মধ্যে প্রথমদিকে পুরনো পুঁজিবাদী দুনিয়ার বেশ কিছু অভ্যাস ও দৃষ্টিভঙ্গি রয়ে যেতে বাধ্য, নতুন সমাজব্যবস্থা গঠনের চলমান প্রক্রিয়াই তার নির্মাণকারীদের চরিত্র ও সাংস্কৃতিক মানের উন্নয়ন ঘটাতে সক্ষম ।

এই কারণেই প্রকৃত সাম্যবাদী সমাজে উত্তরণ রাতারাতি বা এক বছরের মধ্যে ঘটে যেতে পারে না (এবং কল্পিত যাবতীয় সমস্যাগুলি এই ধরনের উদ্ভট অনুমান থেকেই জন্ম নেয়), বরং সেই উত্তরণ হচ্ছে বিকাশের এক দীর্ঘ প্রক্রিয়ারই চূড়ান্ত ফল । সাম্যবাদী সমাজমুখী এই বিকাশ একটি নিম্নতর স্তর অর্থাৎ সমাজতন্ত্রের পথ বেয়ে অগ্রসর হয়ে উন্নীত হবে উচ্চতর স্তরে অর্থাৎ সাম্যবাদে ।

==============================================

বিজ্ঞানী, বিশেষ বৃত্তিজীবী ব্যক্তি, স্থপতি ও প্রশিক্ষিত প্রশাসকদের মতো প্রকরণগত বুদ্ধিজীবীরা, সেইসঙ্গে চিকিৎসক, শিক্ষক ও অন্যান্যরা শ্রমিকশ্রেণী কর্তৃক ক্ষমতাদখল এবং তার পরবর্তী সমাজতন্ত্র নির্মাণের কাজে এক অমূল্য সহযোগীর ভূমিকা পালন  করতে পারেন । কিন্তু তাঁরা কোনও স্বাধীন ভূমিকা পালন করতে পারেন না (যেমনটা অনেক সময় বলা হয়ে থাকে) । উৎপাদনেরউপায়সমূহের স্বাধীন মালিকানা অর্জন করা তাঁদের পক্ষে সম্ভব নয় । তাঁদের সামনে দু'টিমাত্র পথ আছে : হয় পুঁজিপতি শ্রেণীর সেবা করা, নয়তো শ্রমিকশ্রেণীর সেবা করা । এঁদের মধ্যেকার সবথেকে প্রগতিশীল ব্যক্তিরা ক্রমশই এ-সত্য উপলব্ধি করতে শুরু করেছেন এবং শ্রমিকশ্রেণীর পাশে এসে দাঁড়াচ্ছেন ।

==============================================

শ্রমিকশ্রেণীর সচেতন অংশ অর্থাৎ অগ্রগামী কমিউনিস্টরা এই প্রক্রিয়ার বিকাশে সহায়তা করতে ও তাকে ত্বরান্বিত করতে পারে, এবং এর অবশ্যম্ভাবী ক্ষয়ক্ষতিকে কমিয়ে আনতে পারে, কিন্তু এই প্রক্রিয়াকে পরিহার করার কোনও সংক্ষিপ্ত পথ নেই --- কেননা এই প্রক্রিয়ায় শ্রমিকরা তাদের নিজেদের অভিজ্ঞতার সাহায্যে শিক্ষালাভ করে ।

==============================================

গুরুত্বপূর্ণ সোভিয়েতগুলিতে - পেত্রোগ্রাদ ও মস্কো সোভিয়েত, প্রাক-সংসদে ট্রেড ইউনিয়নভিত্তিক প্রতিনিধিত্বে, উত্তরাঞ্চলীয় সৈন্যবাহিনীতে, পেত্রোগ্রাদ  ও মস্কোর স্থানীয় নির্বাচন ইত্যাদিতে প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে বলশেভিক পার্টি সংখ্যাধিক্য অর্জন না-করা পর্যন্ত বলশেভিক বিপ্লব সম্পন্ন হয়নি ।

==============================================

বিপ্লব অথবা একনায়কত্বকে কেউ নিশ্চয়ই গোলাপের রঙে চিত্রিত করার চেষ্টা করবেন না । কোনও বর্বর ও নির্মম শাসকশ্রেণীর বিরুদ্ধে সংগ্রামের কঠোর বাস্তবতাকে সহ্য করতে অপারগ ভাবপ্রবণ সমর্থনের বদলে পাঠক যদি কমিউনিজমের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন, তা-ও বরং ভাল । তবে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার আগে তাঁরা নিশ্চিতভাবে জেনে নিন-যে-জগতের দিকে তাঁরা মুখ ফেরাচ্ছেন সে-জগৎ হল ফ্যাসিবাদ, সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ  ঔপনিবেশিক দাসত্বের জগৎ, যাদের কৃত নির্বিচার গণহত্যা ও ধ্বংসের পরিমাণ সর্বহারা বিপ্লবের সমগ্র ঘটনার তুলনায় সহস্রগুণ অধিক । 

Thursday, 1 June 2017

শহীদ স্মৃতি - শিব বর্মা


এই স্মৃতিকথা পড়ে জনৈক বন্ধু মন্তব্য করেছিল যে, এতে মন্দিরের দেবতাগুলি ভেঙে যেতে পারে । আমি তার সঙ্গে একমত হতে পারিনি । আমার বিশ্বাস যখন মহাপুরুষের পদচিহ্ন ধরে আমরা চলতে চাই না অথবা তাঁর মতো নিজে হতে চাই না তখন তাঁকে দেবতা বানিয়ে মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত করি, তখন তিনি মানুষের সারি থেকে পৃথক হয়ে শুধু পূজার বস্তু হয়ে পড়েন যার গুনগান করা যায় বটে কিন্তু তাঁর মতো নিজেকে গড়ে তোলার কথা চিন্তা করা যায় না, কেন না সব মানুষ দেবতা হতে পারে না । তাছাড়া যখন আমরা কোন মানুষকে দেবতারূপে গড়ার জন্য যত্নবান হই তখন তার মানবসুলভ রূপ চাপা পড়ে যায় এবং সেখানে একটি কৃত্রিম বা মন-গড়া প্রতিমা তৈরি হয় । আদর্শ হলেও সে মূর্তি, কৃত্রিম হয়ে থাকে । আমরা তাকে সহৃদয়তা দিয়ে ভালোবাসতে পারি না । পারি না তার সঙ্গে অন্তরঙ্গ হয়ে আপন করে নিতে । এই স্মৃতিকথায়, আমি সাথীদের মানুষ হিসাবে যেমন পেয়েছিলাম, তেমন ভাবেই তাঁদের চিত্রিত করতে প্রয়াস পেয়েছি । রিটাচিং বা কাট-ছাঁট করে এদের দেবতা বানানো যেত । কিন্তু তাহলে এদের স্বাভাবিক আকর্ষণ মুছে যেত । তখন এই চিত্রের এই প্রতিমার সামনে মাথা নত হতো ঠিকই কিন্তু তাদের তুলে নিয়ে চুমো খাবার ইচ্ছা হয়তো হতো না । তাকে হয়তো পুষ্পার্ঘ্য নিশ্চয়ই দেওয়া হতো কিন্তু কর্মক্ষেত্রে তারা প্রেরণা যোগাতে পারতো না । - শিব বর্মা

=================================================

সর্দার ভগত সিংহ

ভগৎ সিংহের আগে বিপ্লবীদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল দেশের স্বাধীনতা । তবে এই স্বাধীনতা সম্পর্কে আমাদের কি মনোভাব, তার আগে সে-সম্পর্কে আমাদের ধারণা স্বচ্ছ ছিল না । ইংরেজ বড়োলাটকে হঠিয়ে সেই জায়গায় কোন ভারতীয়কে বসিয়ে দিলেই কি সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে ? সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং তার ভিত্তিতে মানুষের দ্বারা মানুষের শোষণ অব্যাহত থাকতে আমরা কি যথার্থভাবে স্বাধীনতা উপভোগ করতে পারবো ? স্বাধীনতার পর সরকার কার হবে, ভাবী সমাজের রূপরেখা কেমন হবে ইত্যাদি বিষয়ে বিপ্লবীদের মধ্যে বিশেষ অস্পষ্টতা ছিল । বিপ্লবীদের মধ্যে ভগত সিংহই প্রথম এই সব প্রশ্ন উত্থাপন করে এবং সমাজবাদকে দলের উদ্দিষ্টরূপে সামনে নিয়ে আসে । তার বক্তব্য, দেশের রাজনৈতিক স্বাধীনতার জন্যে লড়াই লক্ষ্যের দিকে প্রথম পদক্ষেপ মাত্র । সেখানে পৌঁছে যদি আমরা থেমে যাই তাহলে অভিযান আমাদের অর্ধ সমাপ্ত থেকেই যাবে । সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা না থাকায় রাজনৈতিক স্বাধীনতা আসলে অল্পসংখ্যক লোকের সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবার স্বাধীনতাই হয়ে দাঁড়াবে । শোষণ ও বৈষম্যের মূলোৎপাটন করার ভিত্তিতে গঠিত সমাজবাদী সমাজ ও সমাজবাদী রাষ্ট্র ক্ষমতাই রাষ্ট্রের সর্বাঙ্গীণ বিকাশ ঘটাতে পারে ।

সে সময়টায় সমাজবাদ ছিল যুগের ডাক । বিপ্লবীদের মধ্যে ভগত সিংহই সর্বপ্রথম সেই ডাক শুনে চিনতে পারে । তার অন্যান্য সাথীদের চেয়ে এইখানটায় তার মহত্ত্ব ।

=================================================

হাইকোর্টের সামনে বিপ্লবের পরিভাষা করতে গিয়ে সে বলে : "বিপ্লব হলো জগতের নিয়ম । এটা হলো মানব প্রকৃতির রহস্য ।" কিন্তু "এতে রক্তেরাঙ্গা সংঘর্ষ অনিবার্য, তাতে না আছে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার কোন স্থান । সেটা বোমা ও পিস্তলের কোন সম্প্রদায় নয় ।"

"বিপ্লব বিরোধীরা কেবল পিস্তল, বোমা, তলোয়ার ও রক্তপাতকেই বিপ্লব বলে থাকে । কিন্তু বিপ্লব এগুলিতেই সীমাবদ্ধ নয় । এই জিনিসগুলি বিপ্লবের উপকরণ হতে পারে কিন্তু এগুলির ব্যবহারের পেছনে বিপ্লবের বাস্তবিক শক্তি জনগণের, সমাজের অর্থনীতিক ও রাজনীতিক ব্যবস্থা পরিবর্তনের উদ্দেশ্যের মধ্যেই নিহিত থাকে ।"

"আমাদের বর্তমান পরিস্থিতিতে বিপ্লবের উদ্দেশ্য কিছু ব্যক্তির রক্তপাত করা নয় । আমাদের উদ্দেশ্য হলো মানুষের দ্বারা মানুষের শোষণ ব্যবস্থাকে শেষ করে এই দেশের জন্য আত্ম-নিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রাপ্ত করা ।"

=================================================

"আপনি সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের কথা বলছেন । আমি জিজ্ঞেস করি, সর্বশক্তিমান হওয়া সত্ত্বেও আপনার ভগবান অন্যায়, অত্যাচার, ক্ষুধা, দারিদ্র্য, শোষণ, অসাম্য, দাসত্ব, মহামারী, হিংসা ও যুদ্ধ প্রভৃতিকে শেষ করে দেয় না কেন ? এসবকে শেষ করে দেবার শক্তি থাকা সত্ত্বেও যদি সে মানবজাতিকে এই অভিশাপগুলি থেকে মুক্ত না করে তাহলে নিশ্চয়ই তাকে ভালো ভগবান বলা যায় না । আর যদি এগুলিকে শেষ করার ক্ষমতা তার না থাকে তাহলে সে সর্বশক্তিমান নয় । যদি সে এসব খানিকটা খেলা দেখাবার জন্য লীলার ছলে করে তাহলে একথাই বলতে হবে যে সে অসহায়দের জ্বালিয়ে পুড়িয়ে মজা দেখার এক নির্দয় ক্রূর সত্তা । জনহিতের জন্য সে যত তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যায় ততই ভালো । মায়াবাদ, ভাগ্যবাদ, ঈশ্বরবাদ ইত্যাদিকে আমি মুষ্টিমেয় ক্ষমতালোভী শোষকদের জনসাধারণকে ভুলিয়ে রাখার জন্য আবিষ্কৃত বিষাক্ত জিনিস ছাড়া আর কিছু মনে করি না ।"

=================================================

"আমি বিশ্বাস করি যে এপর্যন্ত যে অর্থে এই শব্দের ব্যবহার হয়ে এসেছে সেই অর্থে এখন এর আর বাজার নেই । আজ পর্যন্ত প্রায় সব ধর্মই মানুষকে পরস্পরের কাছ থেকে আলাদা করেছে, নিজেদের মধ্যে কলহ সৃষ্টি করেছে । জগতে আজ পর্যন্ত যত রক্তপাত ধর্মের নামে ধর্মের ঠিকাদাররা করেছে অত বোধ হয় কেউ করেনি । সত্য কথা হলো এই যে এই ধরিত্রীর স্বর্গকে ধর্মের নামেই তচনচ করা হয়েছে । যে ধর্ম মানুষকে মানুষ থেকে পৃথক করে, ভালোবাসার জায়গায় পরস্পরকে ঘৃণা করতে শেখায়, অন্ধবিশ্বাসকে উৎসাহ দান করে, মানসিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে, বুদ্ধিভ্রংশ ঘটায়, সেই ধর্ম কোনদিনই আমার ধর্ম হতে পারবে না । যা প্রতিপদে মানুষকে সুখী করতে পারে, সমতা, সমৃদ্ধি ও ভ্রাতৃত্বের পথে তাকে এক পা এগিয়ে দিতে পারে, আমার কাছে তাই হলো ধর্ম । অল্প কথায় বলতে গেলে এই পৃথিবী আর ভারতের এই পবিত্রভূমি হলো আমার স্বর্গ । এর মাটিতে বিচরণকারী প্রতিটি ব্যক্তি, প্রতিটি মানুষ আমার দেবতা, আমার ভগবান । আর ভগবানকে ভগবানের সঙ্গে লড়িয়ে আমার স্বর্গকে যে শক্তিগুলি নরক করে তুলেছে সেগুলিকে শেষ করে মানুষকে শ্রেণীহীন সমাজের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবার প্রত্যেকটি প্রচেষ্টা, প্রত্যেকটি পদক্ষেপ আমার ধর্ম ।"

=================================================

তাদের কাছ থেকে শেষবারের বিদায় নিয়ে আমরা যখন চলে যাচ্ছি তখন আমাদের মধ্যে একজন (জয়দেব কপূর) ভগত সিংহকে জিজ্ঞেস করলো, "সরদার, তুমি মরতে যাচ্ছ । আমি জানতে চাই তুমি এর জন্য আফসোস করছো না তো?"

প্রশ্নটি শুনে প্রথমে সরদার অট্টহাস্য করলো তারপর গম্ভীর হয়ে বললো, "বিপ্লবের পথে পা বাড়াবার সময় আমি ভেবেছিলুম যদি আমি আমার জীবন দিয়ে দেশের চতুর্দিকে ইনকিলাব জিন্দাবাদ-এর ধ্বনি পৌঁছে দিতে পারি তাহলে মনে করবো যে আমি আমার জীবনে মূল্য পেয়ে গিয়েছি । আজ ফাঁসির এই কুঠুরির মধ্যে গরাদের পিছনে বসেও আমি কোটি কোটি দেশবাসীর কণ্ঠ থেকে সেই ধ্বনির হুঙ্কার শুনতে পাই । আমি বিশ্বাস করি আমার এই ধ্বনি স্বাধীনতা সংগ্রামের চালক শক্তিরূপে সাম্রাজ্যবাদীদের ওপর শেষ পর্যন্ত আঘাত করতে থাকবে ।" আবার কিছুটা থেমে নিজের স্বাভাবিক স্মিতহাস্যের মধ্যে সে ধীরে বললো, "আর এত ছোট জীবনের এর চেয়ে বেশি মূল্য কিই বা হতে পারে ?"

=================================================

ফাঁসির মঞ্চে ওঠার সময় ভগত সিংহ একজন ইংরাজ ম্যাজিস্ট্রেটকে সম্বোধন করে বললো, "ম্যাজিস্ট্রেট মহাশয়, আপনি সত্যি সত্যিই বড় ভাগ্যবান, কারণ আপনি এই দৃশ্য দেখার সুযোগ পাচ্ছেন যে একজন ভারতীয় বিপ্লবী তার মহান আদর্শের জন্য কিভাবে হাসতে হাসতে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে।"

=================================================

চন্দ্রশেখর 'আজাদ' 

এ কথা ঠিক যে আমরা সশস্ত্র অভ্যুত্থানের প্রবক্তা ছিলাম কিন্তু সে বিপ্লবের লক্ষ্য ছিল প্রত্যেক মানুষের যাতে সুখ শান্তি হয় তার ব্যবস্থা করা । 'বসুধৈব কুটুম্বকম্' ছিল আমাদের উদ্দেশ্য । তাই প্রত্যেক মানুষের জীবনের প্রতি আমাদের ছিল গভীর মমত্ববোধ । আমরা সমকালীন ব্যবস্থার বিরোধী ছিলাম । কোন ব্যক্তি বিশেষের শত্রূ ছিলাম না । ব্যক্তি বিশেষের বিরুদ্ধে আমাদের কঠোর নীতি সেই সূত্রেই আসতো যখন যে চলতি রাজনীতি ও সামাজিক অসাম্য-ব্যবস্থার প্রতিনিধিরূপে আমাদের সম্মুখীন হতো ।

=================================================

যাঁরা আজাদকে ফ্যাসিস্ত বলেছেন তাঁরা তার কতকগুলি বাহ্যিক আচার আচরণই দেখেছেন । বস্তুত আজাদের অন্তর যে সর্বদাই আদর্শবোধে সজাগ থাকতো তা এরা বুঝতে পারেননি অথবা বুঝেও না বোঝার ভান করেছেন । অহিংসা নীতিতে অবিশ্বাস, মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ত্রাস নীতি, সেনাবাহিনীর প্রাধান্য হলো ফ্যাসিবাদের বাহ্যিক প্রকাশ । আজাদও অহিংসায় বিশ্বাস করতো না ঠিকই । নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে তার জন্ম এবং ছোটকাল থেকেই সে সামরিক প্রকৃতিরই ছিল । কিন্তু এটুকুর জন্য কি তাকে ফ্যাসিস্ত বলা যায় ? ফ্যাসিবাদের লক্ষ্য হলো বর্তমান বিপ্লবী আন্দোলনে বাধা সৃষ্টি করা, তাকে বিপথগামী করা, সাম্রাজ্যবাদের শক্তি বৃদ্ধি করা এবং সাধারণ মানুষকে গালভরা কথায় ভুলিয়ে ক্ষয়িষ্ণু পুঁজিবাদকে জিইয়ে রাখা । আজাদ এবং তার দল সম্পর্কে এর মধ্যে একটা কথাও প্রযোজ্য নয় । আজাদ ছিল সাম্রাজ্যবাদের ঘোরতর শত্রু । তাঁর জীবনের উদ্দেশ্য ছিল পুঁজিবাদের অবসান ঘটিয়ে সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা স্থাপন করা ।

=================================================

শিবরাম হরি রাজগুরু

বিপ্লবী জীবনে ভগত সিংহকে তার সব চেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে গণ্য করতো রাজগুরু । জাতীয় মুক্তি অর্জনের সংগ্রামে কে এগিয়ে গিয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়বে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল তার জন্য । ভগত সিংহ তার আগে যেন শহীদ না হয় এটাই ছিল তার নিয়ত চিন্তা । যখনই কোন অ্যাকশনের কথা হতো তার একমাত্র দাবি থাকতো তাকে উক্ত অ্যাকশনে আগে পাঠাতে হবে ।

=================================================

দেশ ও জাতির পুনর্বাসনের প্রকৃষ্ট পন্থা যে সাম্যবাদ অথবা সমাজতন্ত্রবাদ, এ-বিশ্বাস তার পূর্ণমাত্রায় ছিল । এর মানে এই নয় যে এই উভয় তত্ত্ব সম্পর্কে সে গভীর ও বিস্তৃত জ্ঞান অর্জন করেছিল । সমাজতন্ত্রবাদ বলতে কি বোঝায়, এর রূপায়ণের জন্য কি ও কোন পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে, সমাজতান্ত্রিক সমাজের মৌল লক্ষণসমূহ কি হবে, ইত্যাদি প্রশ্নের উত্তর দিতে সমর্থ ছিল তাও বলছি না । মূল কথা সে যা বুঝেছিল তা হলো, পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যারা বিবিধ সম্পদ তৈরি করে তারা শ্রমের বিনিময়ে যৎসামান্যই পেয়ে থাকে । সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায়  এ বৈষম্য দূর করা সম্ভব হবে । সেখানে ধনী-দরিদ্র বিভেদ থাকবে না । সবাইকে শ্রম করে খেতে-পরতে হবে । কোন ব্যক্তি বিশেষ বা সম্প্রদায় বিশেষ কারো পরিশ্রমলব্ধ তৈরি সম্পদ আত্মস্বার্থে বা সম্প্রদায়-স্বার্থে ব্যবহার করতে পারবে না । সমগ্র সমাজের কল্যাণে উদ্বৃত্ত সম্পদ ব্যয়িত হবে । অপর কথায় শোষণব্যবস্থা লুপ্ত হবে । কোন দেশ তদ্দেশীয় কোন বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থে অপর দেশ অধিকার করে তা লুন্ঠন করবে না । অর্থাৎ দুর্বল ও অনগ্রসর দেশ ও জাতি সমূহকে গোলামে পরিণত করবে না ।

মার্কসবাদী তত্ত্ব এবং সাম্যবাদের বুনিয়াদী মতাদর্শ সমূহ না জানলেও রাজগুরু তার নিজ জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে গভীরভাবেই বুঝেছিল দারিদ্র্যের কি দুঃসহ জ্বালা, পদে-পদে কি ভীষণ লাঞ্ছনা, অনাদর আর অবহেলা । এই অভিজ্ঞতাই, সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার প্রতি তার নিষ্ঠা সঞ্চার করার ভিত্তি রচনা করেছিল; এই আদর্শে অনুপ্রাণিত করেছিল । কালক্রমে এটাই গভীর প্রত্যয় এবং প্রেরণা রূপে তার হৃদয়ে গেঁথে যায় ।

=================================================

আমি ঢাকা-ঢাকি না করে সোজাসুজিই বললাম, "মরতে ভয় পাচ্ছ ? যা কিছু করেছো তার জন্য অনুশোচনা হচ্ছে ?"

আমার কথা শুনে প্রথমে মৃদু হাসল । পরক্ষণেই গম্ভীর ও দৃঢ় কণ্ঠে বললো "তোমার কাছে এধরনের কথা শুনবো ভাবতে পারিনি । অন্তত তুমি ভালোভাবেই জান যে আমি মরতে ভয় পাই না ।  আজ তোমাকে যা বললাম তা হলো আমার অন্তরের অনুরণন । দারিদ্র্য হলো অভিশাপ । আর স্নেহ-প্রীতি-মমতার অনাস্বাদ হলো নরক । এই অনুভূতি হলো আমার বাইশ বছরের জীবন নিঙড়ানো বিশ্লেষণ । কিছু লোক আমাদের দারিদ্র্যের পঙ্কে ডুবিয়ে রাখে । স্নেহ-ভালোবাসার পরিবেশ থেকে বঞ্চিত করে তাই । এ পৃথিবী সুন্দর, মনোরম আর সুখকর । তাই এই সুন্দর পৃথিবীতে ভালোবাসা ও প্রীতির মধুর স্পর্শ আরো কিছুকাল ভোগ করতে কার না সাধ হয় । এই স্বাভাবিক মানবিক অনুভূতিকে তুমি বলবে মৃত্যুকে ভয় করা?" রাজগুরু কিছু সময়ের জন্য নীরব হয়ে গেল । আবার বলতে লাগল, "মৃত্যুর সঙ্গে গলাগলি করার জন্য প্রস্তুত হয়েই তো এই সত্যকে চিনেছি । তুমি কি ভাবছ যে সে সংগ্রামের এই অন্তিম পর্বে এসে, মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলবো আমায় ছেড়ে দাও । মনে রেখো আমি যা কিছু করছি তা তোমাদের মতো প্রত্যয়দৃঢ় হয়েই করেছি । যে স্বর্গ আমরা রচনা করতে চাই তার আবরণ উন্মোচন করে যদি এতটুকু আলোও দেখাতে ওয়ারী কোটি কোটি দেশবাসীকে আমার প্রাণের বিনিময়ে তা'হলে তাই হবে অনেক । বাকি কাজ দেশের মানুষ নিজেরাই পূর্ণ করে নেবে । এমন আলোকোজ্জ্বল মহান মৃত্যুকে যে ভয় করে তাকে মূর্খ ছাড়া আর কি বলবো । একজন বিপ্লবীর নিকট এ মৃত্যু আশীর্বাদ ।"

=================================================

সুখদেব

বিপ্লবীদের উদ্দেশ্যের সাফল্যে তার বিশ্বাস কতখানি অটল ছিল তার প্রমাণ ফাঁসির কিছু পূর্বে গান্ধীকে লেখা তার চিঠি । "বিপ্লবীদের লক্ষ্য হলো এদেশে সোস্যালিস্ট গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করা । এ লক্ষ্যের সংশোধনের কোনো সুযোগ নেই । ... আমি মনে করি ... আপনার এই ধারণা হবে না যে বিপ্লবীরা যুক্তিহীন হয় এবং তারা নিছক ধ্বংসের কাজে আনন্দ পায় । আমরা আপনাকে জানিয়ে দিতে চাই যে, সত্য কথা এর বিপরীত । তারা প্রত্যেকটি পদক্ষেপের পূর্বে চারদিককার সম্বন্ধে বিচার করে নেয় । তারা তাদের দায়িত্ব সম্বন্ধে সদা সচেতন থাকে । তারা আপন বিপ্লবী বিধানে গঠনমূলক কাজের উপযোগিতাকে মুখ্য স্থান দেয়, যদিও বর্তমান পরিস্থিতিতে তার ধ্বংসাত্মক দিকটাই বেশি নজর দিতে হয়েছে ।"

"... সে দিন আর বেশী দূর নেই তাদের (বিপ্লবীদের) নেতৃত্বে ও তাদের পতাকার তলে জনগণকে তাদের সমাজবাদী প্রজাতন্ত্রের উচ্চ লক্ষ্যের দিকে অগ্রসর হতে দেখা যাবে ।"

এই চিঠির এক স্থলে তার ফাঁসির সাজা সম্বন্ধে সে লিখলো, "লাহোর ষড়যন্ত্র মামলার তিন জন অভিযুক্তদের মৃত্যুদণ্ডের হুকুম হয়েছে এবং যারা ঘটনাক্রমে দেশে যথেষ্ট খ্যাতি লাভ করেছে তারাই বিপ্লবী দলের সব কিছু নয় । বাস্তবিক পক্ষে তাদের মৃত্যুদণ্ড মকুব হলে দেশের পক্ষে ততো কল্যাণকর হবে না যতখানি হবে তাদের ফাঁসির মঞ্চে মৃত্যুবরণ করলে ।"

=================================================

মহাবীর সিংহ

মহাবীরের বাবার সে চিঠির অক্ষর ও শব্দ আজ বিয়াল্লিশ বছর পরও আমার হুবহু মনে পড়ছে । তিনি লিখেছিলেন :

"একথা জেনে খুবই আনন্দিত হলাম যে, তুমি দেশের কাজে নিজেকে অর্পণ করতে কৃতনিশ্চয় হয়েছ । আমার তো ধারণা হয়েছিল যে, আমাদের বংশে পূর্বপুরুষের রক্ত আর নেই । সবাই মনে-প্রাণে দাসত্ব মেনে নিয়েছে । তোমার চিঠি পড়ে আজ আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করছি ।"

"যেখানে তোমার বিয়ের কথাবার্তা চলছিল, তাদের আজ উত্তর লিখে দিয়েছি । তুমি এ বিষয়ে নিশ্চিত থেকো যে আমি এমন কিছু করবো না যাতে তোমার সংকল্পে বাধা সৃষ্টি হয় ।"

"দেশ সেবার যে পথ তুমি বেছে নিয়েছ, মনে রেখো, তা সাধনার পথ, বড়ই দুরূহ সেই পথ । তবু তুমি যখন এই পথে পা বাড়িয়েছ তখন আর পিছনে ফফিরে তাকাবে না । সাথীদের ধোঁকা দিও না এবং তোমার বৃদ্ধ পিতার নামের খেয়াল রেখো ।"

"তুমি যেখানেই থাক না কেন আমার আশীর্বাদ তোমার সঙ্গে থাকবে ।"

- তোমার পিতা, দেবী সিংহ

=================================================

অনশন শেষ হবার পর সহকর্মী জয়দেব কাপুর মহাবীর সিংহের একটি নোট বই পেয়েছিল । কাপুরের কথায় ঐ নোট বইয়ের প্রথম পৃষ্ঠায় পুশকিনের একটি ছোট কবিতা লেখা ছিল যা মহাবীর সিংহের উপযুক্ত । ওই কবিতা ও তার অনুবাদ নিচে দিলাম । এই কবিতার ছত্রগুলি মহাবীর সিংহের বিপ্লবী জীবন বুঝতে সাহায্য করবে ।


I know destruction awaits him,
who first rises
Against the oppressor's yoke;
My fate is sealed aand closed,
But tell me where and when
Without victims
Was ever freedom won?
For my native land I perish
I feel it and I know it
And in my heart O Holy father!
My fatal star
I bless!

=================================================

যতীন্দ্রনাথ দাশ

লাহোরে কেন্দ্রীয় কারাগারে ১৬২ দিন অনশন সংগ্রাম চালানোর পর শহীদের মৃত্যুবরণ করেন ।

অবশেষে ১৩ই জুলাই, ভগত সিংহ ও দত্তের সমর্থনে আমাদের মধ্যে দু'চার জন ব্যতীত আর সবাই অনশন সংগ্রাম আরম্ভ করলো ।

আমাদের মধ্যে একমাত্র যতীন দাশ ছাড়া কারো অনশনের অভিজ্ঞতা ছিল না । ভাবাবেগে চালিত হয়ে অনশন সংগ্রামে যোগ দিতে যতীন্দ্রনাথ নিষেধ করলো সাথীদের । সে বললো, "রিভালবার পিস্তল নিয়ে লড়াই করার চেয়ে  অনেক বেশি কঠিন এক অনশন সংগ্রামে আমরা নামছি । অনশন সংগ্রামীকে তিল-তিল করে মৃত্যুর মুখে এগিয়ে যেতে হয় । শত্রুর সঙ্গে সম্মুখ লড়াইয়ে গুলির আঘাতে প্রাণ দেওয়া, বা ফাঁসির রশিতে জীবন দেওয়া অপেক্ষাকৃত সহজ । অনশনে অংশ নিয়ে পরে পিছু হটলে বিপ্লবীদের প্রতিষ্ঠা ধুলায় লুটিয়ে পড়বে । তাই বলছি যে যোগ দিয়ে পিছিয়ে পড়ার চেয়ে প্রথম থেকেই অনশনে যোগ না দেওয়াই সমীচীন ।"

সে আরো বলে যে, সে নিজে অনশন আরম্ভ করলে যতদিন না সরকার দাবিসনদ মেনে না নেয়, ততদিন অনশন চালিয়ে যাবে । সঙ্গে সঙ্গে সবাইকে বলে যে, তাড়াহুড়ো করে কিছু না করাই ভালো । আরো একদিন সময় নিক তারা । ভালো করে বুঝে-সুঝে অনশনে যোগ দিক । যারা নিজেদের আত্মবিশ্বাস ও মনোবলে সন্দিহান, তাদের অনশনে যোগ না দেওয়াই বাঞ্চনীয় । সে একথাও স্পষ্ট করে বলে যে, যারা অনশন করবে না তারাও অন্যদের মতো সম্মানিত বিপ্লবী হিসাবে গণ্য হবে ।

=================================================

সেইদিন থেকে তিলে তিলে তার মৃত্যুর পথে যাত্রা শুরু হলো । শহীদের মৃত্যুবরণের পথে প্রত্যেকটি মুহূর্তে তার শান্ত ও সৌম্য চেহারায় দৃঢ় সংকল্পের রেখা আরও গভীর হয়ে ফুটে উঠলো ।

কয়েকদিনের মধ্যে তার অবস্থা খারাপ হলো । সারা দেহে বিষক্রিয়া ছড়িয়ে গেল । চোখ বন্ধ হয়ে এল । ডাক্তার ডুশ প্রয়োগ করতে চাইল । কিন্তু সে অসম্মতি জানাল । কংগ্রেসের বহু নেতা, ডিফেন্স কমিটির সদস্যবৃন্দও অনুরোধ জানালো । কিন্তু তাতে কাজ হলো না । সরকারকে কেউ জানালো যে, হয়তো সে ভগত সিংহের কথা মানবে । এই পরামর্শ পাবার পর ভগত সিংহকে কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে আনা হলো । ভগত সিংহ তাকে একবার অনুরোধ করাতে দাশ ডুশ নিতে রাজি হলো । জেলের জনৈক কর্তাব্যক্তি জিজ্ঞাসা করেছিল যতীন্দ্রনাথকে "আপনি কারো অনুরোধ রাখেননি । কিন্তু ভগত সিংহ বলতেই রাজি হলেন কেন ?" উত্তরে সে বলে, "আপনি জানেন না ভগত সিংহ কি ধরনের বীরপুরুষ । আমি কখনো তার কথা ফেলতে পারি না ।"

আর একবার ভগত সিংহ তাকে ওষুধ খেতে অনুরোধ করে । তখন সে জবাব দেয়, "শোন ভগত সিংহ, আমি জানি যে, আমার শপথ ভঙ্গ করা উচিত নয় । কিন্তু তোমার অনুরোধও অগ্রাহ্য করতে পারি না । যাই হোক, এর পর কোন অনুরোধ আমায় করো না ।" তার অবস্থার অবনতি দেখে তাকে মেয়ো হাসপাতালে পাঠাতে চাইলো সরকার । কিন্তু যতীন্দ্রনাথ সে হাসপাতালে যেতে অস্বীকার করলে সরকার তাকে জামিনে খালাস করার সিদ্ধান্ত নিলো । জনৈক সাজানো শেঠ জামিনদার হতে রাজিও হলো । হঠাৎ ছাড়া পাবার খবর পেয়ে যতীন্দ্রনাথ সবাইকে তার পাশে ডেকে নিয়ে বসলো "এ সব ধোঁকাবাজি, সরকার জানে আমার দিন ঘনিয়ে এসেছে । আমার মৃত্যুর দায়িত্ব সে নিতে চায় না । তাই আমাকে জেলের বাইরে বার করে দিয়ে আমার থেকে রেহাই পেতে চায় । আমি এটা হতে দেব না ।" এ-কথা বলে আমাদের দিকে তাকাল । বললো, "আমি এখানে মাঝে থেকে, লড়াই করেই মরতে চাই । আমি চাই তোমরাও সাধ্যমতো বাধা দাও যাতে আমাকে এখান থেকে না সরিয়ে নিয়ে যেতে পারে ।"

=================================================

Wednesday, 24 May 2017

নন্দীগ্রাম সিঙ্গুর পেরিয়ে - ডঃ সমীরকুমার মুখোপাধ্যায়

১৯৭৭ সালে ক্ষমতায় আসার ঠিক পরের বছরই পঞ্চায়েত নির্বাচন করে গ্রামের মানুষকে ক্ষমতায়নের পথে এগিয়ে দেওয়ার পথে চালিত করে বাম সরকার । এতে করে একদিকে যেমন কৃষকের ক্ষমতায়ন ও তাদের মর্যাদার আইনী স্বীকৃতি ঘটেছিল অন্যদিকে তেমনি কৃষকেরা জমিদার জোতদার-মহাজনী চক্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার প্রতিষ্ঠানিক হাতিয়ার পেয়েছিলেন । গ্রাম বাংলায় ক্ষমতার কাঠামোর যেমন আমূল পরিবর্তন ঘটল তেমনি কৃষির উৎপাদন ক্রমান্বয়ে বাড়তে শুরু করল । ধান, গম, আলু, পাট, শস্য উৎপাদনে দেশের সামনের সারিতে উঠে আসে পশ্চিমবঙ্গ । একই সঙ্গে গ্রাম বাংলার সমাজ-অর্থনীতিতে মৌলিক রূপান্তর ঘটেছিল, অবশ্যই তা সমাজতান্ত্রিক নয়, তা ছিল কৃষিতে সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে 'লাঙ্গল যার, জমি তার' নীতির আক্ষরিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে গ্রাম বাংলাকে গণতান্ত্রিক ভিতের ওপর প্রতিষ্ঠিত করা । সারা দেশে কৃষি জমির মাত্র ৩% এই রাজ্যে, অথচ বন্টিত জমির ২০% এই রাজ্যে । কলকাতার বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের আলোচনায় যাঁরা ৩৪ বছরকে এই রাজ্যের কৃষ্ণ গহ্বরে ঢুকে যাওয়ার কলঙ্কময় অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত করেন তাঁদের প্রতি সনির্বন্ধ অনুরোধ বামেদের আপনারা তুলোধোনা করুন, ওটাই আপনাদের কাজ তবে তথ্যগুলোকে আড়াল করবেন না, জানবেন আমাদের মতন অর্ধ ও স্বল্পশিক্ষিত লোকেরা আপনাদের আলোচনা থেকে আলোকিত হতে চেষ্টা করি । প্রসঙ্গত বলি কলকাতার একটি টিভি চ্যানেলের সঞ্চালক 'ঈশ্বর পরিত্যক্ত এই রাজ্যে', 'বামেদের রক্তক্ষরণ', 'বামেদের শীতঘুম', 'জুরাসিক যুগের তত্ত্ব', 'একবার ক্ষমতা থেকে চলে গেলে বামেরা আর ক্ষমতায় ফেরে না' প্রভৃতি শব্দবন্ধের মাধ্যমে বাম্পন্থাকে হেয় করে প্রচুর আনন্দ পান, সেটা পাওয়ার অধিকার তাঁর নিশ্চয়ই আছে, তবে আমার ছোট্ট অনুরোধ সঞ্চালকের আসনে থাকাকালীন তাঁর আপাত নিরপেক্ষতাটা যেন না হারান ।


==========================================================


তাত্ত্বিকভাবে মূল লক্ষ্যের প্রতি অবিচল থেকে বাস্তবোচিত নীতি গ্রহণই হল pragmatism ।

Tuesday, 11 April 2017

জাতিসমস্যায় মার্কসবাদ - সুপ্রকাশ রায়

"জাতি হইল, ইতিহাসের বিভিন্ন যুগের মধ্য দিয়া ক্রমবিকাশ-প্রাপ্ত, এক-ভাষাভাষী, নির্দিষ্ট স্থানে বসবাসকারী, একই অর্থনীতিক জীবন-সম্পন্ন এবং সাংস্কৃতিক ক্রিয়াকলাপের মধ্য দিয়া প্রকাশিত একই মানসিক গঠনযুক্ত স্থায়ী জনসমাজ ।" - J.V.Stalin : Marxism and the National and Colonial Question

=====================================

অস্ট্রালয়েড, মঙ্গোলয়েড এবং "আর্য" নামক মিশ্রিত মনোবসংখ্যাকে লইয়াই বর্তমান বাঙালী জাতি গঠিত । পণ্ডিতগণের মতে, বাঙালী জাতির মধ্যে "আর্য" রক্তের পরিমাণ শতকরা মাত্র পাঁচ ভাগ । বাকি সমস্তই "অনার্য" রক্ত । কোন সুদূর অতীতে কোল-সাঁওতাল-মুন্ডা-ওরাওঁদের পূর্বপুরুষ অর্থাৎ অস্ট্রালয়েড মানবশাখা, কোচ প্রভৃতি মঙ্গোলয়েড, "দ্রাবিড়" বলিয়া কথিত মিশ্রিত মানবগোষ্ঠী বাঙলাদেশে বন-জঙ্গল সাফ করিয়া বসতি স্থাপন করিয়াছিল । পরে "আর্য" বলিয়া কথিত মানুষ আসিয়া বাঙলাদেশে বাস করিতে থাকে । তাহার পর কালক্রমে এই জনসমষ্টি পরস্পরের সহিত মিশিয়া গিয়া এবং ইতিহাসের অর্থাৎ সমাজ-বিকাশের বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করিয়া বাঙালী জাতিতে পরিণত হইয়াছে ।

=====================================

কেবলমাত্র কৃষি মানব-শাখার ঐক্য সাধনে অক্ষম । ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থাই উহার শোষণ-কার্যের প্রয়োজনে বিভিন্ন মানবগোষ্ঠীর মিশ্রণ ঘটাইতে এবং উহাদের একজাতিরূপে গড়িয়া তুলিতে পারে ।

=====================================

বহু ভিন্ন ভিন্ন জাতি-গোষ্ঠী বা উপজাতির মিশ্রণের ভিত্তিতেই প্রত্যেকটি আধুনিক জাতির জন্ম । এঙ্গেলস-এর কথায় :
"ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপেই কোন জাতিগোষ্ঠী বা উপজাতির মানুষ ভিতরে ও বাইরে সংহত ও ঘনিষ্ঠ হতে বাধ্য হয় । এইভাবে সর্বত্র পরস্পর-সম্পর্কযুক্ত বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীও সঙ্ঘবদ্ধ হইয়া বসবাসের এবং শীঘ্রই পরস্পরের সহিত মিশিয়া যাইবার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে । ইহারাই অনিবার্য পরিণতিস্বরূপ ঐ নিজ নিজ বাসভূমি একত্র করিয়া একটিমাত্র জাতির বাসভূমি সৃষ্টি করে ।"

F.Engels : The Origin of the Family, Private Property and the State

=====================================

আধুনিক ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে মূলধনী শ্রেণীর পণ্যের বাজার সৃষ্টির তাগিদে দেশের বিভিন্ন অংশের মধ্যে এবং আদিবাসীদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ গড়িয়া উঠে । জাতীয় সংহতি সৃষ্টির কার্যে ধনতন্ত্রের শক্তি অসাধারণ । ধনতন্ত্রই সামন্ততন্ত্রের বাধা চূর্ণ করিয়া জনসমষ্টিকে ঐক্যবদ্ধ করিয়া তোলে । ধনতন্ত্রই বিশাল শিল্পাঞ্চলগুলিতে শ্রমিকরূপে বিপুল জনসংখ্যার সমাবেশ ঘটায় । ধনতন্ত্রই শিল্পকেন্দ্র শহরের সহিত কাঁচামালের সরবরাহ-ক্ষেত্র গ্রামাঞ্চলের সংযোগ স্থাপন করে এবং সঙ্গে সঙ্গে সৃষ্টি করে ইহার সহিত অঙ্গাঙ্গী সম্বন্ধযুক্ত একটি মধ্যশ্রেণী । এই মধ্যশ্রেণীই তখন ধনতন্ত্রের মুখপাত্ররূপে জাতীয়তার ধারণা অর্থাৎ জাতীয়তাবাদ প্রচার করে । ভারতবর্ষেও ধনতন্ত্রের প্রয়োজনে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে জাতীয় আন্দোলন গড়িয়া উঠিয়াছে । ভারতবর্ষের মূলধনীশ্রেণীও উহার অনুগত মধ্যশ্রেণীর সহায়তায় জাতীয়তাবাদের সৃষ্টি করিয়াছে এবং উহাদের শোষণের প্রয়োজনে বহু জাতিতে বিভক্ত হওয়া সত্ত্বেও সকল ভারতবাসীকে এক জাতি বলিয়া প্রচার করিয়াছে এবং এখনও করিতেছে ।

=====================================

"জাতি হইল সমাজের বিকাশ-ধারার বুর্জোয়াযুগের একটি অনিবার্য রূপ --- একটি অতি প্রয়োজনীয় পরিণতি ।"

Lenin : The Teachings of Karl Marx

=====================================

পশ্চিম ইউরোপে এক-একটি জাতি লইয়া এক-একটি রাষ্ট্র গঠিত হইয়াছে । এই সকল রাষ্ট্রে অন্য কোন জাতির অস্তিত্ব না থাকায়, এই সকল একজাতিভিত্তিক রাষ্ট্রে জাতীয় উৎপীড়নের কোন প্রশ্ন উঠে নাই । কিন্তু পূর্ব-ইউরোপে ও প্রাচ্য জগতে, যেমন ভারতবর্ষে, বহুজাতি-ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠিত হইয়াছে । এই সকল বহুজাতি-ভিত্তিক রাষ্ট্রে প্রভুত্ব করিতেছে ঐ রাষ্ট্রেরই কোন একটি বিশেষ উন্নত জাতি, আর অনগ্রসর জাতিগুলি বা জাতীয় জনশাখা বা উপজাতিগুলি প্রথমে ঐ প্রভুত্বকারী জাতিটির রাজনীতিক দাসত্বের এবং পরে অর্থনীতিক দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ হইয়াছে । প্রাচ্য জগতের এই বহুজাতি-ভিত্তিক রাষ্ট্রগুলিই জাতীয় উৎপীড়নের প্রধান ক্ষেত্র । এই প্রকারের জাতীয় উৎপীড়ন, অর্থাৎ একজাতির উপর অন্য জাতির উৎপীড়ন হইতেই জাতিতে জাতিতে সংঘর্ষ, জাতীয় আন্দোলন, জাতিগত সমস্যা প্রভৃতির সৃষ্টি হইয়াছে ।

=====================================

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর বৈপ্লবিক সংগ্রামের জোয়ারে সমগ্র ভারতবর্ষের সাম্রাজ্যবাদী, সামন্ততান্ত্রিক ও ধনতান্ত্রিক শোষণ-ব্যবস্থা ভাসিয়া যাইবার উপক্রম হয় তখন প্রত্যক্ষ শাসন আর সম্ভব নয় বুঝিয়া সাম্রাজ্যবাদীরা সমগ্র ভারতবর্ষকে ভাঙিয়া ভারত, পাকিস্তান ও ব্রহ্মদেশ এই তিনটি বহু-জাতিভিত্তিক নূতন রাষ্ট্রের সৃষ্টি করে এবং এই তিনটি নূতন রাষ্ট্রের বৃহৎ বুর্জোয়া ও সামন্ততান্ত্রিক প্রভুদের হাতে শাসনভার ছাড়িয়া দিয়া পর্দার আড়ালে সরিয়া দাঁড়ায় ।

=====================================

যুদ্ধের সময় ঔপনিবেশিক বা আধা-ঔপনিবেশিক দেশসমূহের জনসাধারণের নিকট সাম্রাজ্যবাদীদের সাহায্যের আবেদনের ফলে উহাদের দুর্বলতা জনসাধারণের নিকট স্পষ্ট হইয়া উঠে, ঔপনিবেশিক দেশগুলির জনসাধারণের মনে আত্মশক্তিতে বিশ্বাস দেখা দেয় এবং সাম্রাজ্যবাদের শোষণ-উৎপীড়ন হইতে মুক্তিলাভের জন্য সংগ্রামের সাহস ও সংকল্প জাগিয়া উঠে । তাহার ফলেই আরাম্ভ হয় জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম । প্রথম ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর ভারতবর্ষেও এই সংগ্রাম চরমরূপ গ্রহণ করিয়াছিল ।

=====================================

প্রথম মহাযুদ্ধের পর আর একটি বিশেষ কারণেও জাতিগত সমস্যা ব্যাপকতর হইয়াছে, উহা বিশ্বব্যাপী ঔপনিবেশিক সমস্যায় পরিণত হইয়াছে এবং জাতীয় মুক্তি-সংগ্রামের শক্তি বহুগুণ বৃদ্ধি পাইয়াছে । এই সময় জাতিগত সমস্যা প্রথমে বিচ্ছিন্ন অগ্নিস্ফুলিঙ্গের আকারে এবং পরে সর্বগ্রাসী দাবাগ্নির আকারে বিশ্বব্যাপী মুক্তি-সংগ্রামরূপে দেখা দিয়াছে । এই বিশেষ কারণটি ছিল, সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলির দ্বারা তুরস্কের অঙ্গচ্ছেদ এবং রাষ্ট্র হিসাবে উহার অস্তিত্বের বিলোপসাধনের প্রয়াস । সে সময় তুরস্ক ছিল রাজনীতিক দিক থেকে সমগ্র মুসলিম জগতে সর্বাপেক্ষা অগ্রসর এবং অসাধারণ মানমর্যাদার অধিকারী । সাম্রাজ্যবাদীদের এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে তুরস্ক উহার জাতীয় স্বাধীনতা অক্ষুন্ন রাখিবার জন্য সংগ্রাম আরম্ভ করে । তাহার সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদের পদানত দেশগুলি অর্থাৎ প্রাচ্যের ঔপনিবেশিক জগতের সমগ্র মুসলমান জনসাধারণ তুরস্কের পক্ষে দন্ডায়মান হয় এবং সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত ঔপনিবেশিক জগতের মুক্তি-সংগ্রামে যোগদান করে । ইহার ফলে ঔপনিবেশিক জগতের সংগ্রামী শক্তি বহুগুণ বৃদ্ধি পায় । ভারতবর্ষে 'খিলাফত সংগ্রাম' ইহার উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্ত । এইভাবে সংগ্রামের ক্ষেত্রে অনগ্রসর মুসলমান জনসাধারণের আবির্ভাব জাতীয় মুক্তি-সংগ্রামের পক্ষে একটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ।

=====================================

বিশ্বব্যাপী জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম দুর্বার হইয়া উঠে ১৯১৭ খ্রীষ্টাব্দে হইতে । বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার গর্ভ হইতে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের মত দেখা দেয় 'নভেম্বর বিপ্লব' । তাহার ফলে ১৯১৭ খ্রীষ্টাব্দে ঔপনিবেশিক জগতের মুক্তির বাণী লইয়া আবির্ভূত হয় সমাজতন্ত্রী সোভিয়েত রাষ্ট্র । সাম্রাজ্যবাদের কবল হইতে প্রাচ্যের ঔপনিবেশিক জগতের মুক্তির বাণী ছিল ইহার পতাকায় অঙ্কিত । রুশিয়ার জার সাম্রাজ্যবাদের ঔপনিবেশিক দাসত্ব হইতে মুক্তিলাভ করিল বহু জাতি । এই সফলতায়  প্রাচ্যের ঔপনিবেশিক জগতের মানুষ মুক্তি-সংগ্রামের দুর্বার প্রেরণা লইয়া জাগিয়া উঠে । এইভাবে স্তালিনের ভাষায়, 'গড়িয়া উঠে আয়ার্ল্যান্ড হইতে ভারতবর্ষ পর্যন্ত এক অখণ্ড ও বিশাল সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী ফ্রন্ট ।"

=====================================

প্রথম মহাযুদ্ধের পরবর্তীকালের মত দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরেও, অর্থাৎ সম্প্রতিকালেও কতকগুলি নূতন বহুজাতিভিত্তিক রাষ্ট্র আবির্ভূত হইয়াছে । এই সকল রাষ্ট্রও দীর্ঘকালের জাতীয় আন্দোলনের পরেই জন্মলাভ করিয়াছে । বুর্জোয়াশ্রেণীই ছিল এই সকল জাতীয় আন্দোলনের পরিচালক । সুতরাং এই নূতন রাষ্ট্রগুলিও বুর্জোয়া রাষ্ট্র রূপে দেখা দিয়াছে । দৃষ্টান্তস্বরূপ ভারত, পাকিস্তান এবং ব্রহ্মদেশের নাম করা যায় । বুর্জোয়া রাষ্ট্র বলিয়াই এই সকল নবজাত বহুজাতিভিত্তিক রাষ্ট্রেও বিভিন্ন জাতির শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান সম্ভব হয় নাই এবং বিভিন্ন জাতি, গোষ্ঠী বা উপজাতির উপর একটি বা কয়েকটি বৃহৎ ও উন্নততর জাতির শোষণ-উৎপীড়নেরও অবসান ঘটে নাই । ইহার মূল কারণ এই যে, এই সকল নূতন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে ব্যক্তিগত সম্পত্তি এবং শ্রেণীর শোষণ-উৎপীড়নের ভিত্তির উপর, শ্রমিকশ্রেণী ও কৃষকের উপর মূলধনী ও জমিদার শ্রেণীর উপর শ্রেণীর শোষণ-উৎপীড়নের ভিত্তির উপর । সংক্ষেপে বলা যায়, এই নূতন বহুজাতিভিত্তিক রাষ্ট্রগুলি হইল শ্রেণীরাষ্ট্র এবং ইহারা শোষক-শ্রেণীগুলির শোষণ-উৎপীড়নের যন্ত্র ভিন্ন অন্য কিছু নয় । সুতরাং এই সকল রাষ্ট্র শ্রেণী শোষণ অব্যাহত রাখিবার জন্য পীড়ন-যন্ত্র অর্থাৎ শাসন-ক্ষমতা বা রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যতীত একদিনও টিকিয়া থাকিতে পারে না ।

=====================================

এই প্রকারের রাষ্ট্রই নিজ স্বার্থ রক্ষার জন্য, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ বিগ্রহ পরিচালনার জন্য শেষ পর্যন্ত আর্থিক ও সামরিক দিক হইতে শক্তিশালী সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলির সাহায্যপ্রার্থী হইতে বাধ্য হয় । এই আর্থিক ও সামরিক সাহায্য লাভের শর্ত হিসাবেই এই প্রকারের রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত বৃহৎ সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির আজ্ঞাবহ ভৃত্যে পরিণত না হইয়া পারে না,-- যেমন হইয়াছে তথাকথিত স্বাধীন ভারতরাষ্ট্র ।

=====================================

"উৎপীড়িত জাতিসমূহের মুক্তি ও স্বাধীনতা ব্যতীত সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠার কথা যেমন ভাবা যায় না, তেমনই বিভিন্ন জাতির উপর উৎপীড়ন ব্যতীত ধনতন্ত্রের অর্থাৎ বুর্জোয়া শাসনের অস্তিত্বের কথাও চিন্তা করা যায় না । যতদিন পর্যন্ত কৃষক জনসাধারণ এবং পাতিবুর্জোয়াশ্রেণী জাতীয়তাবাদের মোহে আচ্ছন্ন হইয়া থাকিবে এবং বুর্জোয়াশ্রেণীর নির্দেশে পরিচালিত হইবে, ততদিন উগ্র জাতীয়তাবাদ এবং জাতিতে জাতিতে সংঘর্ষ অনিবার্য । কিন্তু যখনই কৃষক জনসাধারণ শ্রমিকশ্রেণীর অনুগামী ও শ্রমিকশ্রেণীর নির্দেশে পরিচালিত হইবে তখনই বিভিন্ন জাতির মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হইবে, এক জাতির উপর হইতে অন্য জাতির শোষণ-উৎপীড়নের অবসান ঘটিবে এবং জাতিসমূহের স্বাধীনতা সুনিশ্চিত হইবে ।" - স্তালিন

=====================================

মার্কস-এঙ্গেলস তাঁহাদের 'কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো'-তে জাতি-সমস্যাটিকে কোন সংকীর্ণ জাতিগত দৃষ্টিকোণ হইতে বিচার না করিয়া শ্রমিকশ্রেণীর আন্তর্জাতিক আদর্শ দ্বারাই বিচার করিয়াছেন এবং দেখাইয়াছেন যে, কেবল শ্রমিকশ্রেণীর আন্তর্জাতিকতা দ্বারাই এই সমস্যার পূর্ণ সমাধান সম্ভব । এই শ্রমিক আন্তর্জাতিকতাই সমগ্র 'কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো'র মূল আদর্শ । তাই 'কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো' ঘোষণা করিয়াছে :

"অন্যান্য শ্রমিক পার্টি ও কমিউনিস্টদের মধ্যে পার্থক্য এই যে, - (১) বিভিন্ন দেশের শ্রমিকশ্রেণীর জাতীয় সংগ্রামে কমিউনিস্টরা সমগ্র শ্রমিকশ্রেণীর স্বার্থকে সংকীর্ণ জাতীয়তার প্রশ্ন হইতে স্বতন্ত্রভাবে বিচার করিবে এবং সেই ভাবেই এই প্রশ্নের উপর গুরুত্ব আরোপ করিবে; (২) বুর্জোয়াশ্রেণীর বিরুদ্ধে শ্রমিকশ্রেণীর সংগ্রাম যে সকল বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করিয়া অগ্রসর হইবে, সংগ্রামের সেই সকল স্তরে কমিউনিস্টরা সকল সময় এবং সমগ্র শ্রমিক-সংগ্রামেরই প্রতিনিধিত্ব করিবে ।"

ইহাই জাতিগত প্রশ্নে কমিউনিস্টদের বিচারের মূল ভিত্তি । শ্রমিকশ্রেণী সকল প্রকারের শোষণ-উৎপীড়নের বিরুদ্ধেই সংগ্রাম করে । সুতরাং তাহারা তাহাদের শ্রেণীগত আদর্শ হিসাবেই প্রত্যেকটি উৎপীড়িত জাতির স্বাধীনতা-সংগ্রামও সক্রিয়ভাবে সমর্থন করে । কিন্তু তাই বলিয়া শ্রমিকশ্রেণী কখনও "ন্যায়-অন্যায় যাহাই করুক না কেন আমার জাতি, আমার দেশ" অথবা "আমার দেশ সবার ঊর্দ্ধে"-প্রভৃতি বুর্জোয়া ও পাতিবুর্জোয়া নীতি সমর্থন করে না । কোন জাতির মুক্তি-সংগ্রামের গতি প্রকৃতি গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের দিকে কিনা তাহা বিচার করিয়াই শ্রমিকশ্রেণী জাতীয় সংগ্রাম সমর্থন করে ।

=====================================

মার্কসবাদীদের মতে, যে প্রতিক্রিয়াশীল শাসন ও শোষণব্যবস্থা ক্ষুদ্র-বৃহৎ সমস্ত জাতির স্বাধীন বিকাশ ও স্বাধীন অস্তিত্বের পক্ষে বাধাস্বরূপ, সেই শোষণ ও শাসন-ব্যবস্থার ধ্বংস সাধনেই প্রত্যেকটি জাতির মূলস্বার্থ রক্ষিত হইতে পারে । সুতরাং জাতীয় স্বাধীনতার জন্য যে সংগ্রাম পরিচালিত হয় তাহা নিঃসন্দেহে প্রগতিশীল । কিন্তু সেই সংগ্রাম আন্তর্জাতিক মুক্তি-সংগ্রামের সহিত কতখানি সম্পর্কযুক্ত তাহাই উহার প্রগতিশীলতার মাপকাঠি । এই জাতীয় স্বাধীনতার সংগ্রাম যে পরিমাণে বিশ্বের সমগ্র মানবজাতির পশ্চাদপদ অবস্থা ও শোষণ-উৎপীড়নের বিরুদ্ধে এবং অগ্রগতির জন্য আন্তর্জাতিক সংগ্রামের সহিত সম্পর্কযুক্ত হইবে, জাতীয় স্বাধীনতার সংগ্রাম কেবল ততখানিই প্রগতিশীল বলিয়া গণ্য হইবে । আন্তর্জাতিক সংগ্রাম হইতে বিচ্ছিন্ন জাতীয়তাবাদকে শ্রমিকশ্রেণী বা মার্কসবাদ অগ্রাহ্য করে ।

=====================================

মার্কস-এঙ্গেলস উৎপীড়ক দেশের শ্রমিকশ্রেণীর কর্তব্য বিশেষভাবে নির্দেশ করিয়া গিয়াছেন । যে প্রতিক্রিয়াশীল রাষ্ট্রের সমস্ত ক্ষমতা ঐ রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন জাতির শোষণ-উৎপীড়নের জন্য এবং প্রতিবেশী দেশসমূহকে গ্রাস করিবার জন্য ব্যবহৃত হয়, সেই রাষ্ট্রের শ্রমিকশ্রেণী কখনও তাহাদের তথাকথিত পিতৃভূমিকে সমর্থন করিতে পারে না । সেই রাষ্ট্র-ক্ষমতার বিরুদ্ধেই শ্রমিকশ্রেনীকে সংগ্রাম করিতে হইবে ।

=====================================

১৯৬৪ সালে আমেরিকার নিগ্রো জনসাধারণের সংগ্রাম সমর্থন করিবার জন্য সমস্ত বিশ্বের জনসাধারণকে আহবান জানাইয়া মাও সে-তুঙ লিখিয়াছিলেন :
"শেষ বিশ্লেষণে জাতীয় সংগ্রাম মূলত শ্রেণী সংগ্রাম ।"

=====================================

রাজনীতিক ও সামাজিক মুক্তি কেবল বিপ্লবের দ্বারাই সম্ভব । সুতরাং বলা যায় : 'প্রত্যেকটি শোষিত জাতি ও শ্রেণীর পক্ষে বিপ্লবই মূল প্রশ্ন ।' - মাও সে-তুং

=====================================

জাতীয় বিপ্লব জাতির জনসাধারণের - শ্রমিক কৃষকের - প্রত্যেকটি শোষিত ও নিপীড়িত শ্রেণীর বিপ্লবের প্রশ্ন । কারণ, জাতির সর্বাধিক জনসংখ্যার - শ্রমিক-কৃষক ও অন্যান্য শোষিত শ্রেণীর স্বার্থই জাতীয় স্বার্থ । সুতরাং জাতীয় মুক্তির অর্থ, শোষণ-উৎপীড়ন হইতে জাতির সর্বাধিক জনসংখ্যার, বিশেষত শ্রমজীবী জনসাধারণের, শ্রমিক-কৃষকের মুক্তি ।

=====================================

ভারতের সংশোধনবাদী কমিউনিস্ট নেতৃত্ব সেদিন অর্থাৎ ১৯৪৬ সালে হিন্দু-মুসলমানের মিলন ও ঐক্যের অজুহাতে কেবল ধর্মের ভিত্তিতে হিন্দুস্থান-পাকিস্তান এই দুই ভাগে ভারত ভাগের সহায়তা করিয়া মার্কসবাদকে কবরস্থ করিয়াছিল ।

ধর্ম জাতিত্বের কোন নিয়ামক উপাদান হইতে পারে না - এই মার্কসবাদী সত্যটিকে সংশোধনবাদী কমিউনিস্ট নেতৃত্ব সেদিন অস্বীকার করিয়াছিলেন । জাতি-সমস্যার সমাধান যে কেবল বিপ্লবের মধ্য দিয়াই সম্ভব - মার্কসবাদের এই মহাসত্যটিকে এড়াইবার জন্যই কমিউনিস্ট নেতৃত্বের এই বিশ্বাসঘাতকতা ।

=====================================

সর্বশ্রেষ্ঠ বিপ্লবী শ্রেণী বলিয়া শ্রমিকশ্রেণীই হইবে ভারতের ঐক্যবদ্ধ বৈপ্লবিক 'ফ্রন্টের' নায়ক ও সংগঠক । শ্রমিকশ্রেণী একটি আন্তর্জাতিক বিপ্লবী শক্তি । তাই শ্রমিকশ্রেণী জাতি-বন্ধন ও দেশ-বন্ধনের ঊর্ধ্বে । এই জন্য একমাত্র শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বেই জাতি-উপজাতিসমূহের মুক্তি-সংগ্রাম, আত্মনিয়ন্ত্রণের সংগ্রাম, মুক্ত জাতি-উপজাতিসমূহের সমাজতন্ত্রের পথে জয়যাত্রার সংগ্রাম সফল হইতে পারে । ভূমির বন্ধনে আবদ্ধ কৃষক-সম্প্রদায়কে একমাত্র শ্রমিকশ্রেণীই পারে সামন্ততন্ত্রের বন্ধন হইতে মুক্ত করিয়া সমাজতন্ত্রের পথে চালিত করিতে । তাই ভারতের শ্রমিকশ্রেণীই হইবে ভারতের ঐক্যবদ্ধ বৈপ্লবিক 'ফ্রন্টের' জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের চালক-শক্তি ।

শ্রমিকশ্রেণী একটি অখণ্ড সর্বভারতীয় শক্তি । বাহিরের দিক হইতে জাতিগতভাবে বিভক্ত হইলেও শ্রেণীগতভাবে ইহারা এক ও অখণ্ড, শ্রেণী-চরিত্রের দিক হইতে অবিভাজ্য । ভারতের শ্রমিকশ্রেণী আজ একটি সর্বভারতীয় বিপ্লবী রাজনীতিক শক্তিরূপে আবির্ভূত, বৈপ্লবিক ভূমিকায় সুপ্রতিষ্ঠিত । তাই ভারতের বিভিন্ন জাতীয় মুক্তি-সংগ্রামগুলিকে শ্রমিকশ্রেণীই জাতীয় পরিসরে সংগঠিত করিবে, ইহাদের মধ্যে ঐক্য গড়িয়া তুলিবে । ভারতের শ্রমিকশ্রেণীই শহরাঞ্চলের শোষিত মধ্যশ্রেণীর সংগ্রাম, জাতীয়-বুর্জোয়াগোষ্ঠীর সংগ্রাম গড়িয়া তুলিবে, এই সংগ্রামগুলিকে পরিচালিত করিবে এবং এক বৈপ্লবিক 'ফ্রন্টে' ঐক্যবদ্ধ করিবে ।

ভারতের শ্রমিকশ্রেণীই হইবে বিভিন্ন জাতি-উপজাতির এবং বিভিন্ন অঞ্চলের খন্ড খন্ড গণতান্ত্রিক বিপ্লবসমূহের সংগঠক, ঐক্যসাধক ও পরিচালক । শ্রমিকশ্রেণীর পরিচালনায়ই এই জাতীয় ও উপজাতীয় বিপ্লবসমূহ বিচ্ছিন্ন না থাকিয়া এক মহাজাতীয় বিপ্লবে পরিণত হইবে এবং দ্রুত গণতান্ত্রিক স্তর উত্তীর্ণ হইয়া সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের স্তরে প্রবেশ করিবে ।

=====================================

"মানব-সমাজ যে বিভিন্ন রাষ্ট্রে ও জাতিতে বিভক্ত হইয়া রইয়াছে কেবল তাহার অবসান ঘটানোই সমাজতন্ত্রের লক্ষ্য নয়, কেবল জাতিসমূহের বাহ্যিক মিলন ঘটানোই সমাজতন্ত্রের লক্ষ্য নয় , সকল মানুষ যাহাতে মিলিয়ে মিশিয়া একাকার হইয়া যায় তাহাই সমাজতন্ত্রের লক্ষ্য । ... উৎপীড়িত শ্রেণীসমূহের একনায়কত্বের পরিবর্তনশীল যুগের মধ্য দিয়া যাহাতে মানব জাতির মধ্য হইতে সকল শ্রেণীর অস্তিত্ব লোপ পায়, যাহাতে উৎপীড়িত জাতিসমূহ বিচ্ছিন্নতা ও স্বাধীনতার যুগের মধ্য দিয়া শেষ পর্যন্ত পূর্নমুক্তি লাভ করিয়া মিলিয়ে একাকার হইয়া যাইতে পারে তাহাই সমাজতন্ত্রের চরম লক্ষ্য ।" - Lenin : The Significance of Self-Determination






Thursday, 6 April 2017

শ্রীমদভগবাদগীতা ও বর্ণবৈষম্য

শমঃ,দমঃ,তপঃ শৌচম্‌ ক্ষান্তি আর্জবম্‌ এব চ ।
জ্ঞানম্‌ বিজ্ঞানম্‌ অস্তিকম্‌ ব্রহ্ম কর্ম সভাবজম্‌ ।।(১৮:৪২)
অর্থ - শম, দম, তপ, শৌচ, ক্ষান্তি, সরলতা, জ্ঞান, বিজ্ঞান ও আস্তিক্য এগুলো ব্রাহ্মনদের স্বভাবজাত কর্ম।

শৌর্যম্‌ তেজঃ ধৃতিঃ দাক্ষ্যম্‌ যুদ্ধে চ অপি অপলায়নম্‌ ।
আনম্‌ ঈশ্বরম্‌ ভাবঃ চ ক্ষাত্রম্‌ কর্ম স্বভবজম্‌ ।।(১৮:৪৩)
অর্থ - শৌর্য, তেজ, ধৃতি, দক্ষ্যতা, যুদ্ধে অপরাম্মুখতা, দানশীলতা ও শাসন ক্ষমতা এইগুলি ক্ষত্রিয়ের স্বভাবজাত কর্ম  ।

কৃষি গোরক্ষা বানিজ্যম্‌ বৈশ্য কর্ম স্বভাবজম ।
পরিচর্যা আত্মকম্‌ কর্মঃ শুদ্রস্য অপি স্বভাবজম্‌ ।।(১৮:৪৪)
অর্থ - কৃষি, গোরক্ষা ও বানিজ্য এইগুলো বৈশ্যের স্বভাবজাত কর্ম । পরিচর্যা শুদ্রের স্বভাবজাত কর্ম ।

এই পরিচর্যাত্মাক কর্মের অর্থ হলো সেবা করা।উচ্চ তিন বর্ণের মানুষদের ক্রমাগত সেবা করা । মানে যাকে বলে জন্মদাস এবং এটা নাকি আবার স্বভাবজাত । দাসগিরি করা কিভাবে একটি গোত্রের সকল মানুষের স্বভাব হয়ে গেল তা বোঝা গেল না । ঠিক একই ভাবে জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চা কিভাবে শুধুমাত্র ব্রাহ্মণদেরই স্বভাব কর্ম হয়ে গেল তাও বোঝা কঠিন । কোন শূদ্র কখনো জ্ঞান চর্চা করতে পারবে না, দেশ শাসন করতে পারবে না, কারণ তার জন্ম একটা শূদ্র পরিবারে । মোটকথা ব্রাহ্মণ আর ক্ষত্রিয় মিলে খাবে-দাবে, ভোগ করবে, দেশ শাসন করবে, বৈশ্যরা করবে গরু পালন আর চাষবাস, শূদ্ররা হবে জন্মোদাস । কি চমৎকার ভগবানের বাণী !


https://blog.mukto-mona.com/2014/02/04/39541/

Tuesday, 4 April 2017

ড. আম্বেদকর ও জাত বর্ণ শ্রেণি - শ্যামল চক্রবর্তী

ভারতে হিন্দুধর্মের হিংস্র বর্ণ-বৈষম্যের মধ্য থেকে নিম্নবর্ণে থাকা মানুষের মুক্তির জন্য এবং শিক্ষার সার্বিক প্রসারের জন্য তিনি বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে থাকেন । তাঁর অদম্য মানসিকতা এবং প্রভূত জ্ঞানের পরিচয় পেয়ে শাসক ১৯৪২ সালে ২ রা জুলাই ভাইসরয়-এর এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলে তাঁকে শ্রম-দপ্তরের সদস্য মনোনীত করে । ঐ পদটি ছিল কার্যত ভারতের শ্রম-মন্ত্রীর পদ । ঐ পদ গ্রহণ করে তিনি অনেক বাধা অতিক্রম করে শ্রমজীবী মানুষের কল্যাণের জন্য উৎসাহ-ব্যঞ্জক নজির সৃষ্টি করেছিলেন । তাঁর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল - (১) শ্রমিকদের সন্তানদের শিক্ষা ও গৃহ নির্মাণে সাহায্য, (২) ট্রেড ইউনিয়ন করার আইনি স্বীকৃতি, (৩) মৃত শ্রমিকদের পরিবারকে এককালীন অর্থ সাহায্য, (৪) ন্যূনতম বেতন প্রদান, (৫) প্রসুতিকালীন সবেতন ছুটি ইত্যাদি । ফলে ভারতের শ্রমিকশ্রেণীর অধিকারের প্রশ্নে এক নতুন যুগের সূচনা হয়েছিল ।

=============================

আমাদের দেশে অনেক ধর্ম যেমন আছে আবার হিন্দু ধর্মের মধ্যে অনেক জাতও আছে । প্রায় সাড়ে ছয় হাজার । সেটি আরও বিভক্ত বর্ণাশ্রম জাতিভেদে, অর্থাৎ জাত ব্যবস্থায় । যতগুলি জাত ততোগুলি টুকরো । যার সংখ্যা এখন সাড়ে ছ হাজারেরও বেশি । যার প্রত্যেকটির সাথে প্রত্যেকটির 'বিরাগ' আছে । আর ড. আম্বেদকর বলেছেন 'ভারতের এই জাত ব্যবস্থা হল এমনই একটি বহুতল বাড়ি যার একটা তল থেকে আর একটা তলে যাবার সিঁড়ি নেই ।' কার্ল মার্কস যাকে বলেছেন 'বিরাগ', ড. আম্বেদকর তাকে আরও পরিষ্কার করেছেন 'graded inequality' বলে । অর্থাৎ বিরাগ বা ঘৃণার প্রকৃতিটা হলো ক্রমিক অসাম্য । এই যে হাজারটা জাত, মান মর্যাদায় তারা কিন্তু সবাই সমান নয় । প্রত্যেকটি জাত অপর একটি জাতের হয় উপরে নয়তো নিচে অবস্থান করছে, উলম্ব অবস্থান (vertical lay-out), অনুভূমিক (horizontal) নয় । এখানে কায়স্থরা মনে করে তারা মাহিষ্যদের থেকে উপরে এবং ব্রাহ্মণদের নিচে, মাহিষ্যরা মনে করে তারা সদগোপের থেকে উপরে কিন্তু কায়স্থদের থেকে নিচে, বাগদীরা মনে করে তারা সদগোপের থেকে নিচে কিন্তু ডোমেদের থেকে উপরে । নমঃশূদ্ররা মনে করে তারা পৌন্ড্রদের থেকে উপরে ।

এইভাবে ভারতবর্ষের হিন্দুদের প্রত্যেকের সঙ্গে প্রত্যেকের ঠোকাঠুকি । অন্য কারও থেকে উপরে আছে তাই সে সন্তুষ্ট । উচ্চবর্ণের বিরুদ্ধে জোট বাঁধার কথা ভাবতেই পারে না । একদিকে 'বিরাগ' আর অন্যদিকে সন্তুষ্টি, তাই মার্কসের ভাষায় সৃষ্টি হয়েছে 'স্থিতিসাম্য' (static balance) । এই static balance-এর জন্যই বর্ণ ব্যবস্থা এত দীর্ঘ সময় টিকে রয়েছে । এবং এই ব্যবস্থার সুফলটুকু অর্থাৎ ক্ষীরটুকু ব্রাহ্মণরা হিন্দু ধর্মের বড়ি খাইতে শূদ্রদের সম্মতি সাপেক্ষেই আত্মসাৎ করেছে ।

=============================

তিনি অচ্ছুতদের জন্যে জমি আর আলাদা কলোনি দাবি করেছিলেন । অবশ্য কৃষিবিপ্লব ছাড়া এ-সব করা সম্ভব নয় । তবে ভূমিদাসদের মতো অন্য সব জাতের মুখ চেয়ে বসে থাকার ব্যাপারটা থেকে বাঁচতে হলে সমস্ত অস্পৃশ্যকে জমি দেওয়ার ভাবনাচিন্তা খুবই সঠিক । কিন্তু সব ভূমিহীন মানুষের অভিন্ন সংগ্রামের ভেতর দিয়েই তো এই লক্ষ্যে পৌঁছানো যেত ।

আম্বেদকর হিন্দুসমাজের অন্যায় লোকাচারের, অন্যায় আচরণের হাত থেকে রেহাই পাবার জন্যে তাঁর অনুগামীদের বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করতে বললেন । কিন্তু অন্যায় ভূমিগত সম্পর্কের ভিতের ওপরে গড়ে উঠেছে সমাজের যে ভয়ঙ্কর বাস্তব অবস্থাটা, তা বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করলেই তো পালায় না । প্রেম আর সাম্যের সন্ধানে বেরিয়ে, তা যে পাওয়া গেল না, তার তো জলজ্যান্ত প্রমাণ সাম্প্রতিক নির্যাতন নিপীড়নের সব কান্ডকারখানা । পরিস্থিতিটা এমন করুন অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে যে, সবচেয়ে দলিত মথিত যে সম্প্রদায়গুলো, সেখান থেকেও উদ্ভূত বুদ্ধিজীবীদের দৃষ্টি সমতার সম্বন্ধে আনুষ্ঠানিক ঘোষণাটুকু, আরও চাকরি-বাকরি, আসন সংরক্ষণ, শিক্ষার সুযোগ সুবিধা - এইসব দাবির সঙ্কীর্ণ বেড়াটা পার হয়ে আদর্শগতভাবে আর বেশি দূরে এগুতে পারছে না । বর্তমান আর্থ-সামাজিক কাঠামোখানাকে একদম ভেঙে গুঁড়িয়ে দেবার কাজটা ওঁদের চৈতন্যের বৃত্তের মধ্যে ঠাঁই পায়নি । ভূমিগত সম্পর্কগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা বলতে অন্য আর সকলের সঙ্গে যুথবদ্ধ হয়ে অভিন্ন যুদ্ধ চালানোটাও যে বোঝায় - এটা কিন্তু ওঁদের নজরে পড়ল না । এইসব সম্প্রদায় থেকে যে সব বুদ্ধিজীবী উঠে এসেছেন, এঁরাও কেউ আগে, কেউ বা পরে বুর্জোয়া গণতন্ত্রের কাঠামোখানাকেই মেনে নিয়েছেন; জমির সঙ্গে, শিল্পের সঙ্গে বর্তমান সম্পত্তিগত সম্পর্কের ব্যাপারটা একটুও না ছুঁয়েই গণতান্ত্রিক অধিকারগুলো সম্বন্ধে একটা সাধারণ ঘোষণায় তৃপ্ত হয়ে রয়েছেন ।

=============================

ভারতীয় সমাজে জাতপাত প্রথা একটি বিশেষ ধরনের বৈশিষ্ট্য । এটা একমাত্র ভারতেরই বৈশিষ্ট্য । বিশ্বের অন্য কোনো দেশে এরকম নেই । ভারতে জাতিভেদ শ্রেণিভিত্তিক ভাগাভাগির একটা লক্ষণ । কারণ জাতিভেদ বর্ণপ্রথার নামে অথবা জাতের নামে সমাজের শ্রমজীবী অংশকে দাবিয়ে রাখার জন্যই তৈরি হয়েছে । জাতিভেদ প্রথা শ্রেণি শোষণেরই একটা হাতিয়ার । উদ্বৃত্ত অংশ যত বেশি সম্ভব আত্মসাৎ করার লক্ষ্যেই জাতপাত প্রথার সৃষ্টি । উৎপাদন সম্পর্কের সাথে জাতপাত প্রথা অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত ।

জাতপাত প্রথার সৃষ্টি হয়েছে প্রায় তিন হাজার বছর আগে । ক্রমান্বয়ে এর পরিমাণগত পরিবর্তন হয়েছে । কিন্তু শোষণের গুণগত উপাদান প্রায় একই রয়ে গেছে । জাতিভেদ প্রথার কিছু নির্দিষ্ট লক্ষণ আছে এবং কিছু নির্দিষ্ট সীমাও আছে । কিন্তু জাত আর শ্রেণি শোষণ ও জাতপাতভিত্তিক শোষণ মিলে গেলে শোষণের তীব্রতা ও পরিমাণ অনেকগুণ বেড়ে যায় । যে দেশে জাত ব্যবস্থা নেই সেই দেশগুলিতে শ্রমিক বা কৃষক বা উভয়ই অর্থাৎ সব ধরনের শোষিতরা দলবদ্ধভাবে বা সুযোগ পেলে ব্যক্তিগতভাবে মালিকের সঙ্গে দর কষাকষি করতে পারে । ইচ্ছে করলে একটা বৃত্তি বা পেশা থেকে অন্য পেশায় চলে যেতে পারে । কিন্তু জাতের ক্ষেত্রে সেটা সম্ভব না । কারণ পেশা হচ্ছে জাতভিত্তিক । ইচ্ছে থাকলেও কোনো পেশার বাইরে অন্য কোনো কাজ করতে পারবে না । পেশাও ঠিক হবে জন্মসূত্রে । কাজেই তার জোট বাঁধারও কোনো সুযোগ নেই । নীচু জাত হবার সুবাদে সমাজে উচ্চশ্রেণির লোকেরা তাকে দাবিয়ে রাখে । তাকে সবসময় একটা ভয় বা আতঙ্কের মধ্যে থাকতে হয় । শারীরিকভাবেও  নিগৃহীত হতে পারে অথবা তাকে সামাজিক দিক থেকেও বয়কট করা হতে পারে বা সমাজ থেকে বের করে দেওয়া হতে পারে । সমাজ থেকে বের করে দেওয়া বা সামাজিক বয়কট তার মৃত্যুর সমান ।

এই ভারতে সামাজিক বিভাজন ঠিক কবে থেকে শুরু তা নিয়ে কিছু সমস্যা আছে । ভারতে প্রাচীনতম সভ্যতা হরপ্পা সভ্যতা (খ্রিস্টপূর্ব তিন হাজার বছর) ছিল প্রথম নগর সভ্যতা । শ্রেণি বিভাগ বা শ্রেণি শোষণ ছাড়া নগর সভ্যতা গড়ে উঠতে পারে না । কাজেই শ্রেণি শোষণ ছিল এটা নিশ্চিত । কিন্তু যতদিন পর্যন্ত হরপ্পা লিপি পড়া না যাচ্ছে ততদিন পর্যন্ত জানা যাবে না যে তখন জাত ভাগ ছিল কিনা । বৈদিক সাহিত্য অনুযায়ী প্রায় খ্রিস্টপূর্ব এক হাজার সাল নাগাদ প্রথম দেখা যায় বর্ণভেদ ভারতে শুরু হয়েছিল । ঋকবেদের দশম মন্ডলে বর্ণভেদের কথা আছে ।

কিন্তু বিদ্বজ্জনেরা মনে করেন বর্ণ বিভাজন প্রথমে দেখা যায় যজুর্বেদে । পরে তা ঋকবেদে প্রক্ষিপ্ত হয়েছে । অনুমান করা হয় এক হাজার থেকে আটশত খ্রিস্টপূর্বের মধ্যে বর্ণ বিভাজন হয়ে যায় । সেই সময় সম্পত্তির মালিকানা তৈরি হয়েছিল । ফলে শ্রেণি বিভাজন হয় । ...

... জাত বিভাজন শুধু মাত্র শ্রম বিভাজন নয় । এটা শ্রমিকদের মধ্যেও বিভাজন । যে কোন সমাজে শ্রম বিভাজন দরকার হয় । কিন্তু ভারতে শ্রম বিভাজনটা একটা কৃত্রিম শৃঙ্খলে আবদ্ধ আছে । এখানে শ্রমিকদের মধ্যে এই বিভাজনটা স্তর বিন্যাস করে করা হয়েছে । পৃথিবীর কোন দেশেই শ্রম বিভাজনকে শ্রমিকদের স্তর বিন্যাসের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়নি ।শ্রম বিভাজন স্বতঃস্ফূর্তভাবেও হয়নি । স্বাভাবিক আগ্রহ থেকেও নয় । নিজের পেশা নিজে বেছে নিতে পারলে যে দক্ষতা অর্জন করা যায় বা নিজের জীবনের আর্থিক উন্নতি করা যায়, তা উপর থেকে চাপিয়ে দিলে হয় না ।

=============================

জাতপাত ব্যবস্থা ছিল প্রাথমিক উৎপাদকদের উদ্বৃত্ত থেকে বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে সামাজিক চেতনা তৈরি করার লক্ষ্যে একটা ধর্মীয় প্রক্রিয়া ।

=============================

আম্বেদকর একটি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছিলেন, যার উত্তর এখনও কোনো জাতীয়তাবাদী দিতে পারেননি । প্রশ্নটার ধরণ ছিল এইরকম - দু'টো পৃথক জাতের যৌন মিলনে জন্ম দেওয়া সন্তানের রক্তের বিশুদ্ধতা নষ্ট হতে পারে এমন যুক্তি না হয় বোঝা গেল । কিন্তু এক পংক্তিতে বসে খেলেও কী রক্তের বিশুদ্ধতা নষ্ট হয়ে যায় ?

=============================

পৃথিবীর কয়েকটা দেশে বর্ণবৈষম্যবাদ এখনও নির্মূল হয়নি । এটা ছিল গায়ের রঙের বর্ণবৈষম্যবাদ । গণতান্ত্রিক পরিবেশের ক্রমশ বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে তা দুর্বল হচ্ছে । ভারতে জাতপাতের বিভেদ কেবলমাত্র দু'টো সম্প্রদায় হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে নয় । ভারতের একশো কোটির মানুষের মধ্যে ৮২ কোটি মানুষ হিন্দু । এই হিন্দুদের মধ্যে কত রকমের ভাগ । শুধু ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র নয়, প্রতিটা ভাগে কত উপবিভাগ । প্রতিটা বিভাগ-উপবিভাগের সঙ্গে অন্য বিভাগ-উপবিভাগের ঘৃণা, বিদ্বেষ, রক্ত, খুন মাখানো সম্পর্ক । এর শীর্ষে বসে ডান্ডা ঘোরাচ্ছে সবচেয়ে উঁচুজাতি বলে দাবি করা ব্রাহ্মণরা । প্রায় তিন হাজার বছর ধরে সেই বৈদিক যুগ থেকে মানুষের অভ্যাসের সঙ্গে জীবনচর্চার মধ্যে এই ঘৃণা বিদ্বেষ জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে । দুনিয়ার মধ্যে ভারত একটা নিকৃষ্ট ব্যতিক্রম । এমন দেশটা কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি ।

=============================

খ্রিস্ট্রপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে বৌদ্ধধর্মের এই অগ্রগতি ও জনগণের দলে দলে বৌদ্ধধর্ম গ্রহণের প্রতিক্রিয়া হিসাবে ব্রাহ্মণ্যবাদে এক পুনরুত্থানবাদী ধারা শুরু হল । গৌতম বুদ্ধ সামাজিক ক্ষেত্রে বর্ণভেদের বিরোধিতা করেননি । বৌদ্ধ ধর্মের বাইরে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের মধ্যে জাতিভেদের উপাদান রয়েই গেল । কিন্তু বৌদ্ধ ধর্মের উত্থানের ফলে ব্রাহ্মণ পুনরুত্থানবাদীরা আরও আষ্টে-পৃষ্ঠে জাতপাতকে সামাজিক আইনে বেঁধে ফেলল । রাজশক্তি নিজস্বার্থে তাতে মদত দিল । ব্রাহ্মণ পুনরুত্থানবাদ জীবনের সবক্ষেত্রে, ধর্মীয়, বুদ্ধিবৃত্তিগত, গার্হস্থ এবং সামাজিক ইত্যাদি সবক্ষেত্রেই কঠোর আচরণবিধি দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ব্রাহ্মণ্য সাম্রাজ্যের দুর্গ তৈরি করল । স্মৃতি বা ধর্মশাস্ত্রগুলি, মহাভারত ও রামায়ণ মহাকাব্য এবং অন্যান্য ধর্মীয় সাহিত্যে এই পুনরুত্থানবাদী ধারার প্রবাহ চলল । কয়েক শত বৎসর ধরে বহু চারণ কবি রামকে প্রতীক হিসাবে তুলে ধরলেন । এদের বলা হতো লব কুশ । এই ধারা বেয়েই রামায়ণ তৈরি হল । রামের চরিত্র সৃষ্টি ব্রাহ্মণ্যবাদকে সুসংহত করার লক্ষ্যে পুনরুত্থানবাদী আন্দোলনের ফলশ্রূতি ।

=============================

ঋকবেদীয় পর্বে শ্রম বিভাজন অনেক এগিয়েছিল । অর্থব বেড পর্বের শেষদিকে অবশ্য কর্মবিভাজন (সামাজিক স্তর বিভাজন) হতে থাকে এবং জনগোষ্ঠী ও পরিবার গোষ্ঠী ক্রমে সামাজিক শ্রেণিতে বিভক্ত হয়ে যায় । শর্মার (আর এস শর্মা) মতে শূদ্র জনগোষ্ঠী বা আর্যদের যে অংশ দাসসুলভ কাজ করতেন, তাদের স্থান নির্ধারণ হল চতুর্থ বর্গে । পুরোহিতদের প্রভাবেই বর্ণ ব্যবস্থায় মতাদর্শের প্রভাব ঘটেছিল ।

=============================

বুদ্ধদেবের মতাদর্শে একটা অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব ছিল । তিনি হিন্দু সমাজের চতুর্বর্ণ সমাজের বিরোধিতা করেননি বরং তাকে স্বীকারই করেছিলেন । আবার তিনিই সমাজের বর্ণভেদ ভিত্তিক সামাজিক অসাম্যকে স্বীকার করেননি । তাঁর মত অনুযায়ী, মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব বা মূল্য নির্ধারিত হয় কোন জাতে সে জন্মগ্রহণ করেছে তার ফলে নয়, নির্ধারিত হয় তার আত্মিক ও নৈতিক গুণাবলী দিয়ে ।

=============================

কুরুক্ষেত্রে অর্জুন আত্মীয় বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে না চাইলে কৃষ্ণ তাকে উজ্জীবিত করার জন্য নাকি কিছু উপদেশ দেন, এই উপদেশগুলোই হল গীতা । যদিও অনেক শাস্ত্রকার ও ঐতিহাসিক সমাজতত্ত্ববিদ মনে করেন গীতা মূল মহাভারতে ছিল না । খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দী থেকে খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীর মধ্যে ভগবদগীতা পর্যায়ক্রমে রচিত । তারপরে মহাভারতে সংযুক্ত হয়েছিল । গীতার একটা বিখ্যাত উক্তি " স্বধর্মে নিধনং শ্রেয় -পরধর্ম ভয়াবহ" এই স্বধর্ম কী ? তখন কি কোনো গ্রন্থে হিন্দু ধর্ম নাম কোন ধর্মের কথা বলা হয়েছে ? এখানে জাতপাতকেই ধর্ম বলা হয়েছে ।

=============================

ব্রাহ্মণ্য ধর্মের চরম গোঁড়ামি, জাত-পাত, অস্পৃশ্যতার নিদারুন অত্যাচার ও অবিচারের বিকল্প হিসাবে গৌতম বুদ্ধ সংঘগুলিতে সাম্যের আবহাওয়া সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন । তাই ভারতীয় জনগণের একটা বিশাল অংশ বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেছিল । ইসলাম ধর্মের ক্ষেত্রেও তা একইভাবে প্রযোজ্য । ভারতে ইসলাম এক হাতে কোরান অপর হাতে তরবারি নিয়ে আসেনি । অল্প কিছু ক্ষেত্রে রাজশক্তি বা জোর করে ধর্মান্তর হলেও ইসলামের প্রভাব এখানে বেড়েছে দুটো প্রধান কারণে । সুফি ভক্তিবাদের ফলে এবং হিন্দু সমাজে জাতপাত ভেদের জন্য । নিম্নবর্ণের এবং দলিত জনগণের একাংশ উচ্চবর্ণের অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে । স্বামী বিবেকানন্দ একে চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন । ভারতে দলিত মানুষ ইসলামের মধ্যে সাম্যের উপাদান দেখতে পেয়েছিল । বিবেকানন্দের মতে এই জন্য ভারতে (বিবেকানন্দের সময় অবিভক্ত ভারত - লেখক) এক পঞ্চাংশ  ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন ।

=============================

হিন্দুধর্মের এবং সাধারণভাবে সমস্ত ধর্মেরই সামাজিক তথা অর্থনৈতিক ভূমিকাকে শ্রমিকশ্রেণির সামনে সঠিকভাবে তুলে না ধরলে আদর্শগত সংগ্রাম সফল হতে পারবে না । কৃষিবিপ্লব ঘটানোর জন্যে সংগ্রাম, একচেটিয়া পুঁজির দাপটচাপট আর সাম্রাজ্যবাদী শোষণের অবসান ঘটানোর জন্যে সংগ্রাম সমাজতন্ত্রের দিকে নিয়ে যাবে -- এমন ধরণের জনগণতন্ত্ররাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্যে সংগ্রাম--এ-সবই তো হচ্ছে আমাদের একালের প্রধান সংগ্রাম । এইসব সংগ্রাম থেকে সমাজের জাতপাতের ভেদাভেদ প্রথাটাকে দূর করে দেওয়ার প্রশ্নটাকে আলাদা করে দেখে ওটাকে খালি হিন্দু সমাজের সংস্কারের প্রশ্ন বলে মনে করা আর চলে না ।

=============================

সংরক্ষণের প্রশ্ন

ভারতের সংবিধানে পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়ের জন্য সংরক্ষণ চালু আছে । জনসংখ্যার অনুপাত অনুযায়ী সংরক্ষণ-এর হার নির্ধারিত হবে কিন্তু কোনো সময়ই তা ৫০ শতাংশ অতিক্রম করতে পারবে না । শুধুমাত্র সরকারী চাকুরির ক্ষেত্রে সরকারি বা সরকার পোষিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীদের ক্ষেত্রে এই সংরক্ষণ প্রযোজ্য হয় । কিন্তু বেসরকারি ক্ষেত্রে সংরক্ষণ চালু করার প্রস্তাব থাকলেও তা এখনও আলোচনার স্তরে আছে । আর এস এস এবং বিজেপি-র বিভিন্ন মহল থেকে সংরক্ষণ প্রথার বিরোধিতা করা হচ্ছে এবং তা তুলে দেওয়ার জন্য সওয়াল করা হচ্ছে ।

ভারতের মত জাতপাত বিভক্ত সমাজে সংরক্ষণ থাকাটা খুবই প্রয়োজনীয় । কারণ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে উচ্চবর্ণের মানুষেরা সমাজ শাসন করেছেন, ধর্মের নামে বিভিন্ন বিধি বিধান দিয়েছেন তার অনিবার্য পরিণতিতে নিম্নবর্ণের মানুষদের শিক্ষা এবং সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছিল এবং তাদের উপরে অনেক বিধিনিষেধ জারি করা ছিল, এখনও কিছু কিছু আছে । উদাহরণস্বরূপ বলা যায় ডঃ আম্বেদকরকে স্কুলে সহপাঠীদের সাথে একসাথে বসতে দেওয়া হতো না, বাইরে চাটাই পেতে বসতে হতো । পানীয় জলের পাত্রের কাছে যেতে পারতেন না । এমনকি অধ্যাপনার চাকরি পাওয়ার পরেও অধ্যাপকদের জলপানের অধিকার ছিল না । শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তারা উচ্চবর্ণের তুলনায় ক্রমশ পিছিয়ে গেছে । উচ্চবর্ণরা সংখ্যায় কম হয়েও যুগের পর যুগ ধরে সিংহভাগ চাকরিবাকরি, শিক্ষার সুযোগ -সমস্ত কিছুই দখলে রাখতেন ।

ব্রিটিশ আমলে সংরক্ষণের নীতি প্রথম চালু হয়েছিল । মূলস্রোতে আনবার জন্য সংরক্ষণই ছিল দরিদ্র নিম্নবর্ণের মানুষের কাছে একমাত্র অবলম্বন । যারা ইসলাম ধর্ম বা বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেছিল তারা কিন্তু এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিল । এদের সংরক্ষণের আওতায় আনবার জন্য ২০১০ সালে রঘুনাথ মিত্র কমিশন রায় দিয়েছিলেন যে আর্থিক দিক থেকে ধর্ম নির্বিশেষে পিছিয়ে পড়া মানুষকে সংরক্ষণের আওতায় আনা যেতে পারে । পশ্চিমবাংলার বামফ্রন্ট সরকারি এটি প্রথম কার্যকরী করে এবং শতকরা ১৭ ভাগ সংখ্যালঘুদের জন্য সংরক্ষণের সুযোগ পায় ।

সংরক্ষণের সুযোগ নেওয়ার জন্য গ্রূপ ডি চাকরি ছাড়া অন্য পদে ন্যূনতম মাধ্যমিক পাশ করা দরকার । কিন্তু সরকারী পরিসংখ্যান অনুযায়ী তফশিলভুক্ত জাতির শতকরা ৭১.৩ ভাগ স্কুল ফাইনাল পাশ করার সুযোগ পায় (ভুল সংশোধন - তফশিলভুক্ত জাতির শতকরা ৭১.৩ ভাগ স্কুল ছুট) । ফলে সরকারের খুবই নিম্নস্তরের কাজে প্রতি ৪ জন দরিদ্রের মধ্যে ১ জন মাত্র সংরক্ষণের সুযোগ নিতে পারে । ২০০১-এর আদমসুমারি অনুযায়ী দলিতদের মধ্যে মাত্র ২.২৪% স্নাতক । এখন নয়া উদার অর্থনীতির যুগে সব কিছুর সঙ্গে শিক্ষাও বেসরকারিকরণ করা হচ্ছে । ফলে সরকারি চাকরির সংখ্যা কমে যাচ্ছে । ১২০ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে ১ কোটি ৮০ লক্ষ মাত্র সরকারি চাকরি ।

তফশিল জাতি ও উপজাতির জন্য জাতীয় কমিশনের রিপোর্টে দেখা যায় যে কেন্দ্রীয় সরকারের এ গ্রেড অফিসারের ন্যূনতম ১৫ শতাংশ এই অংশের মানুষের হওয়া উচিত সেখানে ৮.৪ শতাংশ মাত্র চাকরি করেন । দিল্লি হাইকোর্টের ২০ জন বিচারকের মধ্যে একজনও দলিত নেই । তামিলনাড়ু সামাজিক ন্যায়ের জন্য বিখ্যাত কিন্তু সেখানেও হাইকোর্টের বিচারকের ৩৮ জনের মধ্যে মাত্র ৪ জন, কেরালায় ২৫ জনের মধ্যে ১ জন তফশিল জাতিভুক্ত ।

২০১১ আদমসুমারি অনুযায়ী ১২০ কোটির মধ্যে তফশিল জাতি ও উপজাতির সংখ্যা ৩০ কোটি । সংরক্ষণের মাধ্যমে আদিবাসিরা চাকরি পে ঝাড়ুদার বা জমাদার ইত্যাদি পদে ।

সংরক্ষণ নিয়ে দুটি প্রশ্ন যথাযথ উঠে এসেছে । তফশিল জাতিভুক্ত অনেক মানুষ আছেন যারা সংরক্ষণের সুবিধা পেয়ে অর্থনৈতিক মর্যাদা পেয়েছেন । যারা ব্যক্তিগতভাবে তফসিলী উপজাতিভুক্ত হওয়ার জন্য অর্থনৈতিক বা শিক্ষাক্ষেত্রে ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রে অনেক অগ্রসর হয়ে এসেছেন যেমন কলেজের অধ্যক্ষ বা অধ্যক্ষা, চিকিৎসক, সরকারি অফিসার নিম্ন আদালতের বিচারক ইত্যাদি । এইভাবে তফশিলভুক্ত উপজাতির মধ্যে একটা উচ্চতর অংশ তৈরি হয়েছে তাদের পরিবারের মানুষেরা এখন সমাজের প্রভাবশালী অংশের মধ্যে অন্যতম । তারা এখন সমাজের সংরক্ষণের সমগ্র সুবিধা ভোগ করে নিচ্ছেন । তাদের বলা হয় ক্রাম লেয়ার । আবার উচ্চবর্ণের মানুষ হলেও অর্থনৈতিক দিক থেকে খুবই পিছিয়ে পড়া প্রচুর মানুষ আছেন । কিন্তু তারা উচ্চবর্ণের মানুষ এইজন্যই কোনো সুযোগ পান না । তাদের জন্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে আয়ের একটা ঊর্ধ্বসীমা বেঁধে দেওয়া হোক এবং উচ্চবর্ণের হলেও অর্থনৈতিকভাবে পশ্চাৎপদদের সংরক্ষণের সুযোগ দিতে হবে ।

=============================

ভারতে এত জাতি ধর্ম আছে যে তা পরিচিতি সত্তার উর্বর ভূমি ।

বিভিন্ন দলিত গোষ্ঠী, ওবিসি আন্দোলন, সংরক্ষণের জন্য, সম্পদের ভাগ নেবার দাবিতে এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে এবং অন্য নানা কারণে পরস্পর বিরোধী রাজনীতিতে প্রশ্রয় দেয় । কিন্তু এই গোষ্ঠীগুলি মৌলিক সামাজিক কাঠামো এবং শ্রেণি শোষণ বদলানোর দাবিতে আন্দোলন সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যায় না । অন্যান্য নিপীড়িত মানুষের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলাতে তাদের আগ্রহ নেই ।...

...এ ধরনের পরিচিতি সত্তা নির্ভর রাজনীতি শুধুমাত্র দলিত বা পশ্চাৎপদশ্রেণির সংগঠনগুলির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই । নির্বাচনী শক্তি ও সমর্থন ভিত্তি বাড়াতে বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলিও পরিচিতি সত্তা-নির্ভর রাজনীতিকে ব্যবহার করে থাকে । উত্তরপ্রদেশে যেমন বিজেপি, এসপি এবং কংগ্রেসের মতো সব দলই জাতপাত ও সাবকাস্ট ভিত্তিক দলীয় সম্মেলনের আয়োজন করে থাকে । পরিচিতি সত্তা-নির্ভর রাজনীতিকে তারা ব্যবহার করে এবং জাতপাতভিত্তিক বিভাজন প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করে ।


=============================

ভারতীয় সমাজে শ্রেণি শোষণ এবং সামাজিক নিপীড়ন দুটোই আছে । আমাদের দেশের আর্থ সামাজিক কাঠামোয় জাতপাতভিত্তিক, জাতিগোষ্ঠীগত ও লিঙ্গভিত্তিক সামাজিক নিপীড়ন একই সঙ্গে পুঁজিবাদী ও আধা সামন্ততান্ত্রিক শ্রেণি শোষণের সঙ্গেই বিদ্যমান । শাসকশ্রেণিগুলি উদবৃত্ত শ্রম শোষণ করে শ্রেণি শোষণের মাধ্যমে এবং তাদের আধিপত্য বজায় রাখতে তারা বিভিন্ন ধরণের সামাজিক নিপীড়নকে কাজে লাগায় । সে জন্যই শ্রেণি সংগ্রাম চালিয়ে নিয়ে যাবার গুরুত্বের উপরও জোর দেবার পাশাপাশি সামাজিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রামও চালাতে হবে । বিশ্বজোড়া লগ্নিপুঁজির দাপট বাড়ার এবং সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়ন মাথাচাড়া দেবার পরই শাসকশ্রেণিগুলি পরিচিতি সত্তা-নির্ভর রাজনীতি ও আন্দোলনকে বড় আকারে মদত দিচ্ছে । এ ধরনের আন্দোলন নিপীড়িত শ্রেণীগুলির মধ্যে পেটি বুর্জোয়াদের একটা অংশকে ক্ষমতার সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসার সুযোগ করে দেয় ।

Tuesday, 28 March 2017

যুক্তিবাদীর চোখে গীতা, রামায়ণ, মহাভারত ইত্যাদি - প্রবীর ঘোষ (১)

পেটের জ্বালাই নানা অপরাধের আঁতুড়ঘর । তাই তো কোনও দেশ যত দেউলিয়া হতে থাকে, ততই গরিবি বাড়ে, ততই বাড়ে নানা অপরাধ ।

======================================================

মানুষ যৌনতার প্রতি আকর্ষণ ও যৌন অভিলাষ নিয়ে জন্মায় । সাধারণত তিন থেকে পাঁচ বছরের ছেলেমেয়েরা যৌনাঙ্গ নিয়ে নাড়াচাড়া করে এক ধরণের আনন্দ পায় । এই আনন্দ অনির্দিষ্ট ।

কৈশোরের শুরুতে সমকামিতা প্রচ্ছন্ন বা প্রকাশ্য রূপ পায় । যৌনগ্রন্থি, যৌনাঙ্গ যতই পরিণতির দিকে এগোতে থাকে ততই বিপরীত লিঙ্গের মানুষটির কাছে নিজেকে আকর্ষণীয় করে তুলতে চায় ।

তারপর আসে আত্মরতির পর্যায় । এই সময় কিশোর-কিশোরীদের (মেয়েদের ক্ষেত্রে ১৩-১৪ বছর, ছেলেদের ক্ষেত্রে ১৬-১৭ বছর পর্যন্ত সময়) যৌনগ্রন্থি, অন্যান্য প্রয়োজনীয় অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি যেমন পিটুইটারি ও অ্যাড্রেনাল গ্রন্থিগুলি সক্রিয় হয় ।

মেয়েদের রজঃস্রাব ও ছেলেদের বীর্য তৈরি হয় । এই সময় বন্ধুদের সঙ্গে যৌনতা নিয়ে আলোচনা, পর্নো বইয়ের প্রতি একটা স্বাভাবিক প্রবণতা আসে । বিচরণ করে এক অদ্ভুত স্বপ্নের জগতে । স্বপ্নের নায়ক-নায়িকা বা পরিচিত কোনও বিপরীত লিঙ্গের বন্ধু-বান্ধবীর সঙ্গে মিলিত হচ্ছে ভেবে আত্মরতি করে । এর পরের পর্যায়ে আসে যৌন-মিলনের আনন্দকে উপভোগ করার পর্যায় ।

এই যে একটু একটু করে যৌন অভিলাষের দিকে এগোনো, এর প্রতিটি পর্যায়ই স্বাভাবিক ঘটনা । এই স্বাভাবিক প্রবৃত্তির গতিময়তা বাধা পেলে অস্বাভাবিক যৌন আচরণ গড়ে উঠতে পারে ।

আমাদের সমাজের রীতিনীতি ও চাপিয়ে দেওয়া মূল্যবোধ মানতে গিয়ে অনেক সময় আমরা যৌন অভিলাষকে খারাপ, নোংরা ব্যাপার বলে মনে করি । কিন্তু স্বাভাবিক প্রবৃত্তির তাড়নাকে এড়াতে পারি না । ফলে আমাদের ভন্ড হতে হয় । মুখে যৌনতার বিরুদ্ধে সরব হয়, সুযোগ পেলেই 'কাম' নামের সহজাত প্রবৃত্তির কাছে আত্মসমর্পণ করি ।

অজাচার মধ্যবিত্ত মানসিকতার নারী-পুরুষদের মধ্যেই সাধারণত দেখা যায় । উচ্চবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানসিকতার নারী-পুরুষদের মধ্যে অজাচারের ঘটনা বিরল । 'লোকে কি বলবে' - ব্যাপারটাকে ওরা পাত্তা দিতে রাজি নয় । ওদের 'পেটে খিদে মুখে লাজ' নেই । দেহ-মিলনের সময় ওই দুই সমাজ-মানসিকতার নারী নিষ্ক্রিয় না থেকে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয় । দেহশুচিতার ভণ্ডামি নেই ।

মধ্যবিত্তদের একটা প্রবণতা - দেহশুচিতার পক্ষে সাড়ম্বরে বলা । যৌন অভিলাষ একটি সহজাত প্রবৃত্তি হওয়া সত্ত্বেও মধ্যবিত্ত সমাজ বিষয়টিকে 'খারাপ', রেখে-ঢেকে রাখার বিষয় বলে চিহ্নিত করে দিয়েছে ।

যৌন অভিলাষ নিশ্চয়ই প্রকাশ্যে সংঘটিত হওয়ার বিষয় নয় । কিন্তু যৌন-শিক্ষা, ছেলে-মেয়েদের বন্ধুত্বপূর্ণ মেলামেশাকে খারাপ ভাবাটাই কুশিক্ষা ।

এমন বহু মানুষের মুখোমুখি অবিরত হই, যাঁরা গর্বের সঙ্গে বলেন, "আমার মেয়ে খুব ভালো । একটিও ছেলে বন্ধু নেই ।" যেন ছেলে বন্ধু না থাকাটাই মেয়েদের ভালো হওয়ার আবশ্যিক শর্ত । অনেক ছেলের মা-বাবাও এমন বোকা বোকা গর্ববোধ নিয়ে থাকতে ভালোবাসেন । ...

... মানসিক কারণে শারীরিক অসুখে মধ্যবিত্ত নারীরাই বেশি ভোগেন । মধ্যবিত্ত বলতে আমি মধ্যবিত্ত মানসিকতার কথা বলছি । মা, মাসি, পিসি, দিদিমা, ঠাকুমারা মেয়েদের শিখিয়ে এসেছেন, লজ্জাই নারীর ভূষণ । স্বামীর কাছে মিলন প্রার্থনা করলে স্বামী চরিত্রহীনা ভাববে । মিলনকালে স্ত্রী সক্রিয়ভাবে অংশ নিলেন স্বামী কামুকা ভাববে । মধ্যবিত্ত নারীদের মিলন-আনন্দ উপভোগের সুযোগ থাকে না । ফলে বিয়ের কয়েক বছরের মধ্যেই স্ত্রীর কাছে এই মিলন ভরণ-পোষণের বিনিময়ে স্বামীর কাছে নিজের দেহকে তুলে দেবার প্রচলিত প্রথা হয়ে দাঁড়ায় । দীর্ঘ যৌন অবদমনের ফলে মানসিক কারণে নানা ধরণের শারীরিক অসুখের প্রকাশ ঘটে । নিম্নবিত্ত ও উচ্চবিত্ত মানসিক অবস্থার নারীদের মধ্যে একটা বিষয়ে মিল আছে; তাঁরা পুরুষদের সঙ্গে মিলনের সময় পুরুষদের মতোই সক্রিয়ভাবে অংশ নেন । ফলে সাধারণভাবে তাঁরা যৌন অবদমনের কারণে দেহজনিত (psycho-somatic disorder) রোগে ভোগেন না ।


======================================================