Tuesday, 4 April 2017

ড. আম্বেদকর ও জাত বর্ণ শ্রেণি - শ্যামল চক্রবর্তী

ভারতে হিন্দুধর্মের হিংস্র বর্ণ-বৈষম্যের মধ্য থেকে নিম্নবর্ণে থাকা মানুষের মুক্তির জন্য এবং শিক্ষার সার্বিক প্রসারের জন্য তিনি বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে থাকেন । তাঁর অদম্য মানসিকতা এবং প্রভূত জ্ঞানের পরিচয় পেয়ে শাসক ১৯৪২ সালে ২ রা জুলাই ভাইসরয়-এর এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলে তাঁকে শ্রম-দপ্তরের সদস্য মনোনীত করে । ঐ পদটি ছিল কার্যত ভারতের শ্রম-মন্ত্রীর পদ । ঐ পদ গ্রহণ করে তিনি অনেক বাধা অতিক্রম করে শ্রমজীবী মানুষের কল্যাণের জন্য উৎসাহ-ব্যঞ্জক নজির সৃষ্টি করেছিলেন । তাঁর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল - (১) শ্রমিকদের সন্তানদের শিক্ষা ও গৃহ নির্মাণে সাহায্য, (২) ট্রেড ইউনিয়ন করার আইনি স্বীকৃতি, (৩) মৃত শ্রমিকদের পরিবারকে এককালীন অর্থ সাহায্য, (৪) ন্যূনতম বেতন প্রদান, (৫) প্রসুতিকালীন সবেতন ছুটি ইত্যাদি । ফলে ভারতের শ্রমিকশ্রেণীর অধিকারের প্রশ্নে এক নতুন যুগের সূচনা হয়েছিল ।

=============================

আমাদের দেশে অনেক ধর্ম যেমন আছে আবার হিন্দু ধর্মের মধ্যে অনেক জাতও আছে । প্রায় সাড়ে ছয় হাজার । সেটি আরও বিভক্ত বর্ণাশ্রম জাতিভেদে, অর্থাৎ জাত ব্যবস্থায় । যতগুলি জাত ততোগুলি টুকরো । যার সংখ্যা এখন সাড়ে ছ হাজারেরও বেশি । যার প্রত্যেকটির সাথে প্রত্যেকটির 'বিরাগ' আছে । আর ড. আম্বেদকর বলেছেন 'ভারতের এই জাত ব্যবস্থা হল এমনই একটি বহুতল বাড়ি যার একটা তল থেকে আর একটা তলে যাবার সিঁড়ি নেই ।' কার্ল মার্কস যাকে বলেছেন 'বিরাগ', ড. আম্বেদকর তাকে আরও পরিষ্কার করেছেন 'graded inequality' বলে । অর্থাৎ বিরাগ বা ঘৃণার প্রকৃতিটা হলো ক্রমিক অসাম্য । এই যে হাজারটা জাত, মান মর্যাদায় তারা কিন্তু সবাই সমান নয় । প্রত্যেকটি জাত অপর একটি জাতের হয় উপরে নয়তো নিচে অবস্থান করছে, উলম্ব অবস্থান (vertical lay-out), অনুভূমিক (horizontal) নয় । এখানে কায়স্থরা মনে করে তারা মাহিষ্যদের থেকে উপরে এবং ব্রাহ্মণদের নিচে, মাহিষ্যরা মনে করে তারা সদগোপের থেকে উপরে কিন্তু কায়স্থদের থেকে নিচে, বাগদীরা মনে করে তারা সদগোপের থেকে নিচে কিন্তু ডোমেদের থেকে উপরে । নমঃশূদ্ররা মনে করে তারা পৌন্ড্রদের থেকে উপরে ।

এইভাবে ভারতবর্ষের হিন্দুদের প্রত্যেকের সঙ্গে প্রত্যেকের ঠোকাঠুকি । অন্য কারও থেকে উপরে আছে তাই সে সন্তুষ্ট । উচ্চবর্ণের বিরুদ্ধে জোট বাঁধার কথা ভাবতেই পারে না । একদিকে 'বিরাগ' আর অন্যদিকে সন্তুষ্টি, তাই মার্কসের ভাষায় সৃষ্টি হয়েছে 'স্থিতিসাম্য' (static balance) । এই static balance-এর জন্যই বর্ণ ব্যবস্থা এত দীর্ঘ সময় টিকে রয়েছে । এবং এই ব্যবস্থার সুফলটুকু অর্থাৎ ক্ষীরটুকু ব্রাহ্মণরা হিন্দু ধর্মের বড়ি খাইতে শূদ্রদের সম্মতি সাপেক্ষেই আত্মসাৎ করেছে ।

=============================

তিনি অচ্ছুতদের জন্যে জমি আর আলাদা কলোনি দাবি করেছিলেন । অবশ্য কৃষিবিপ্লব ছাড়া এ-সব করা সম্ভব নয় । তবে ভূমিদাসদের মতো অন্য সব জাতের মুখ চেয়ে বসে থাকার ব্যাপারটা থেকে বাঁচতে হলে সমস্ত অস্পৃশ্যকে জমি দেওয়ার ভাবনাচিন্তা খুবই সঠিক । কিন্তু সব ভূমিহীন মানুষের অভিন্ন সংগ্রামের ভেতর দিয়েই তো এই লক্ষ্যে পৌঁছানো যেত ।

আম্বেদকর হিন্দুসমাজের অন্যায় লোকাচারের, অন্যায় আচরণের হাত থেকে রেহাই পাবার জন্যে তাঁর অনুগামীদের বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করতে বললেন । কিন্তু অন্যায় ভূমিগত সম্পর্কের ভিতের ওপরে গড়ে উঠেছে সমাজের যে ভয়ঙ্কর বাস্তব অবস্থাটা, তা বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করলেই তো পালায় না । প্রেম আর সাম্যের সন্ধানে বেরিয়ে, তা যে পাওয়া গেল না, তার তো জলজ্যান্ত প্রমাণ সাম্প্রতিক নির্যাতন নিপীড়নের সব কান্ডকারখানা । পরিস্থিতিটা এমন করুন অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে যে, সবচেয়ে দলিত মথিত যে সম্প্রদায়গুলো, সেখান থেকেও উদ্ভূত বুদ্ধিজীবীদের দৃষ্টি সমতার সম্বন্ধে আনুষ্ঠানিক ঘোষণাটুকু, আরও চাকরি-বাকরি, আসন সংরক্ষণ, শিক্ষার সুযোগ সুবিধা - এইসব দাবির সঙ্কীর্ণ বেড়াটা পার হয়ে আদর্শগতভাবে আর বেশি দূরে এগুতে পারছে না । বর্তমান আর্থ-সামাজিক কাঠামোখানাকে একদম ভেঙে গুঁড়িয়ে দেবার কাজটা ওঁদের চৈতন্যের বৃত্তের মধ্যে ঠাঁই পায়নি । ভূমিগত সম্পর্কগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা বলতে অন্য আর সকলের সঙ্গে যুথবদ্ধ হয়ে অভিন্ন যুদ্ধ চালানোটাও যে বোঝায় - এটা কিন্তু ওঁদের নজরে পড়ল না । এইসব সম্প্রদায় থেকে যে সব বুদ্ধিজীবী উঠে এসেছেন, এঁরাও কেউ আগে, কেউ বা পরে বুর্জোয়া গণতন্ত্রের কাঠামোখানাকেই মেনে নিয়েছেন; জমির সঙ্গে, শিল্পের সঙ্গে বর্তমান সম্পত্তিগত সম্পর্কের ব্যাপারটা একটুও না ছুঁয়েই গণতান্ত্রিক অধিকারগুলো সম্বন্ধে একটা সাধারণ ঘোষণায় তৃপ্ত হয়ে রয়েছেন ।

=============================

ভারতীয় সমাজে জাতপাত প্রথা একটি বিশেষ ধরনের বৈশিষ্ট্য । এটা একমাত্র ভারতেরই বৈশিষ্ট্য । বিশ্বের অন্য কোনো দেশে এরকম নেই । ভারতে জাতিভেদ শ্রেণিভিত্তিক ভাগাভাগির একটা লক্ষণ । কারণ জাতিভেদ বর্ণপ্রথার নামে অথবা জাতের নামে সমাজের শ্রমজীবী অংশকে দাবিয়ে রাখার জন্যই তৈরি হয়েছে । জাতিভেদ প্রথা শ্রেণি শোষণেরই একটা হাতিয়ার । উদ্বৃত্ত অংশ যত বেশি সম্ভব আত্মসাৎ করার লক্ষ্যেই জাতপাত প্রথার সৃষ্টি । উৎপাদন সম্পর্কের সাথে জাতপাত প্রথা অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত ।

জাতপাত প্রথার সৃষ্টি হয়েছে প্রায় তিন হাজার বছর আগে । ক্রমান্বয়ে এর পরিমাণগত পরিবর্তন হয়েছে । কিন্তু শোষণের গুণগত উপাদান প্রায় একই রয়ে গেছে । জাতিভেদ প্রথার কিছু নির্দিষ্ট লক্ষণ আছে এবং কিছু নির্দিষ্ট সীমাও আছে । কিন্তু জাত আর শ্রেণি শোষণ ও জাতপাতভিত্তিক শোষণ মিলে গেলে শোষণের তীব্রতা ও পরিমাণ অনেকগুণ বেড়ে যায় । যে দেশে জাত ব্যবস্থা নেই সেই দেশগুলিতে শ্রমিক বা কৃষক বা উভয়ই অর্থাৎ সব ধরনের শোষিতরা দলবদ্ধভাবে বা সুযোগ পেলে ব্যক্তিগতভাবে মালিকের সঙ্গে দর কষাকষি করতে পারে । ইচ্ছে করলে একটা বৃত্তি বা পেশা থেকে অন্য পেশায় চলে যেতে পারে । কিন্তু জাতের ক্ষেত্রে সেটা সম্ভব না । কারণ পেশা হচ্ছে জাতভিত্তিক । ইচ্ছে থাকলেও কোনো পেশার বাইরে অন্য কোনো কাজ করতে পারবে না । পেশাও ঠিক হবে জন্মসূত্রে । কাজেই তার জোট বাঁধারও কোনো সুযোগ নেই । নীচু জাত হবার সুবাদে সমাজে উচ্চশ্রেণির লোকেরা তাকে দাবিয়ে রাখে । তাকে সবসময় একটা ভয় বা আতঙ্কের মধ্যে থাকতে হয় । শারীরিকভাবেও  নিগৃহীত হতে পারে অথবা তাকে সামাজিক দিক থেকেও বয়কট করা হতে পারে বা সমাজ থেকে বের করে দেওয়া হতে পারে । সমাজ থেকে বের করে দেওয়া বা সামাজিক বয়কট তার মৃত্যুর সমান ।

এই ভারতে সামাজিক বিভাজন ঠিক কবে থেকে শুরু তা নিয়ে কিছু সমস্যা আছে । ভারতে প্রাচীনতম সভ্যতা হরপ্পা সভ্যতা (খ্রিস্টপূর্ব তিন হাজার বছর) ছিল প্রথম নগর সভ্যতা । শ্রেণি বিভাগ বা শ্রেণি শোষণ ছাড়া নগর সভ্যতা গড়ে উঠতে পারে না । কাজেই শ্রেণি শোষণ ছিল এটা নিশ্চিত । কিন্তু যতদিন পর্যন্ত হরপ্পা লিপি পড়া না যাচ্ছে ততদিন পর্যন্ত জানা যাবে না যে তখন জাত ভাগ ছিল কিনা । বৈদিক সাহিত্য অনুযায়ী প্রায় খ্রিস্টপূর্ব এক হাজার সাল নাগাদ প্রথম দেখা যায় বর্ণভেদ ভারতে শুরু হয়েছিল । ঋকবেদের দশম মন্ডলে বর্ণভেদের কথা আছে ।

কিন্তু বিদ্বজ্জনেরা মনে করেন বর্ণ বিভাজন প্রথমে দেখা যায় যজুর্বেদে । পরে তা ঋকবেদে প্রক্ষিপ্ত হয়েছে । অনুমান করা হয় এক হাজার থেকে আটশত খ্রিস্টপূর্বের মধ্যে বর্ণ বিভাজন হয়ে যায় । সেই সময় সম্পত্তির মালিকানা তৈরি হয়েছিল । ফলে শ্রেণি বিভাজন হয় । ...

... জাত বিভাজন শুধু মাত্র শ্রম বিভাজন নয় । এটা শ্রমিকদের মধ্যেও বিভাজন । যে কোন সমাজে শ্রম বিভাজন দরকার হয় । কিন্তু ভারতে শ্রম বিভাজনটা একটা কৃত্রিম শৃঙ্খলে আবদ্ধ আছে । এখানে শ্রমিকদের মধ্যে এই বিভাজনটা স্তর বিন্যাস করে করা হয়েছে । পৃথিবীর কোন দেশেই শ্রম বিভাজনকে শ্রমিকদের স্তর বিন্যাসের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়নি ।শ্রম বিভাজন স্বতঃস্ফূর্তভাবেও হয়নি । স্বাভাবিক আগ্রহ থেকেও নয় । নিজের পেশা নিজে বেছে নিতে পারলে যে দক্ষতা অর্জন করা যায় বা নিজের জীবনের আর্থিক উন্নতি করা যায়, তা উপর থেকে চাপিয়ে দিলে হয় না ।

=============================

জাতপাত ব্যবস্থা ছিল প্রাথমিক উৎপাদকদের উদ্বৃত্ত থেকে বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে সামাজিক চেতনা তৈরি করার লক্ষ্যে একটা ধর্মীয় প্রক্রিয়া ।

=============================

আম্বেদকর একটি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছিলেন, যার উত্তর এখনও কোনো জাতীয়তাবাদী দিতে পারেননি । প্রশ্নটার ধরণ ছিল এইরকম - দু'টো পৃথক জাতের যৌন মিলনে জন্ম দেওয়া সন্তানের রক্তের বিশুদ্ধতা নষ্ট হতে পারে এমন যুক্তি না হয় বোঝা গেল । কিন্তু এক পংক্তিতে বসে খেলেও কী রক্তের বিশুদ্ধতা নষ্ট হয়ে যায় ?

=============================

পৃথিবীর কয়েকটা দেশে বর্ণবৈষম্যবাদ এখনও নির্মূল হয়নি । এটা ছিল গায়ের রঙের বর্ণবৈষম্যবাদ । গণতান্ত্রিক পরিবেশের ক্রমশ বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে তা দুর্বল হচ্ছে । ভারতে জাতপাতের বিভেদ কেবলমাত্র দু'টো সম্প্রদায় হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে নয় । ভারতের একশো কোটির মানুষের মধ্যে ৮২ কোটি মানুষ হিন্দু । এই হিন্দুদের মধ্যে কত রকমের ভাগ । শুধু ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র নয়, প্রতিটা ভাগে কত উপবিভাগ । প্রতিটা বিভাগ-উপবিভাগের সঙ্গে অন্য বিভাগ-উপবিভাগের ঘৃণা, বিদ্বেষ, রক্ত, খুন মাখানো সম্পর্ক । এর শীর্ষে বসে ডান্ডা ঘোরাচ্ছে সবচেয়ে উঁচুজাতি বলে দাবি করা ব্রাহ্মণরা । প্রায় তিন হাজার বছর ধরে সেই বৈদিক যুগ থেকে মানুষের অভ্যাসের সঙ্গে জীবনচর্চার মধ্যে এই ঘৃণা বিদ্বেষ জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে । দুনিয়ার মধ্যে ভারত একটা নিকৃষ্ট ব্যতিক্রম । এমন দেশটা কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি ।

=============================

খ্রিস্ট্রপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে বৌদ্ধধর্মের এই অগ্রগতি ও জনগণের দলে দলে বৌদ্ধধর্ম গ্রহণের প্রতিক্রিয়া হিসাবে ব্রাহ্মণ্যবাদে এক পুনরুত্থানবাদী ধারা শুরু হল । গৌতম বুদ্ধ সামাজিক ক্ষেত্রে বর্ণভেদের বিরোধিতা করেননি । বৌদ্ধ ধর্মের বাইরে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের মধ্যে জাতিভেদের উপাদান রয়েই গেল । কিন্তু বৌদ্ধ ধর্মের উত্থানের ফলে ব্রাহ্মণ পুনরুত্থানবাদীরা আরও আষ্টে-পৃষ্ঠে জাতপাতকে সামাজিক আইনে বেঁধে ফেলল । রাজশক্তি নিজস্বার্থে তাতে মদত দিল । ব্রাহ্মণ পুনরুত্থানবাদ জীবনের সবক্ষেত্রে, ধর্মীয়, বুদ্ধিবৃত্তিগত, গার্হস্থ এবং সামাজিক ইত্যাদি সবক্ষেত্রেই কঠোর আচরণবিধি দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ব্রাহ্মণ্য সাম্রাজ্যের দুর্গ তৈরি করল । স্মৃতি বা ধর্মশাস্ত্রগুলি, মহাভারত ও রামায়ণ মহাকাব্য এবং অন্যান্য ধর্মীয় সাহিত্যে এই পুনরুত্থানবাদী ধারার প্রবাহ চলল । কয়েক শত বৎসর ধরে বহু চারণ কবি রামকে প্রতীক হিসাবে তুলে ধরলেন । এদের বলা হতো লব কুশ । এই ধারা বেয়েই রামায়ণ তৈরি হল । রামের চরিত্র সৃষ্টি ব্রাহ্মণ্যবাদকে সুসংহত করার লক্ষ্যে পুনরুত্থানবাদী আন্দোলনের ফলশ্রূতি ।

=============================

ঋকবেদীয় পর্বে শ্রম বিভাজন অনেক এগিয়েছিল । অর্থব বেড পর্বের শেষদিকে অবশ্য কর্মবিভাজন (সামাজিক স্তর বিভাজন) হতে থাকে এবং জনগোষ্ঠী ও পরিবার গোষ্ঠী ক্রমে সামাজিক শ্রেণিতে বিভক্ত হয়ে যায় । শর্মার (আর এস শর্মা) মতে শূদ্র জনগোষ্ঠী বা আর্যদের যে অংশ দাসসুলভ কাজ করতেন, তাদের স্থান নির্ধারণ হল চতুর্থ বর্গে । পুরোহিতদের প্রভাবেই বর্ণ ব্যবস্থায় মতাদর্শের প্রভাব ঘটেছিল ।

=============================

বুদ্ধদেবের মতাদর্শে একটা অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব ছিল । তিনি হিন্দু সমাজের চতুর্বর্ণ সমাজের বিরোধিতা করেননি বরং তাকে স্বীকারই করেছিলেন । আবার তিনিই সমাজের বর্ণভেদ ভিত্তিক সামাজিক অসাম্যকে স্বীকার করেননি । তাঁর মত অনুযায়ী, মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব বা মূল্য নির্ধারিত হয় কোন জাতে সে জন্মগ্রহণ করেছে তার ফলে নয়, নির্ধারিত হয় তার আত্মিক ও নৈতিক গুণাবলী দিয়ে ।

=============================

কুরুক্ষেত্রে অর্জুন আত্মীয় বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে না চাইলে কৃষ্ণ তাকে উজ্জীবিত করার জন্য নাকি কিছু উপদেশ দেন, এই উপদেশগুলোই হল গীতা । যদিও অনেক শাস্ত্রকার ও ঐতিহাসিক সমাজতত্ত্ববিদ মনে করেন গীতা মূল মহাভারতে ছিল না । খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দী থেকে খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীর মধ্যে ভগবদগীতা পর্যায়ক্রমে রচিত । তারপরে মহাভারতে সংযুক্ত হয়েছিল । গীতার একটা বিখ্যাত উক্তি " স্বধর্মে নিধনং শ্রেয় -পরধর্ম ভয়াবহ" এই স্বধর্ম কী ? তখন কি কোনো গ্রন্থে হিন্দু ধর্ম নাম কোন ধর্মের কথা বলা হয়েছে ? এখানে জাতপাতকেই ধর্ম বলা হয়েছে ।

=============================

ব্রাহ্মণ্য ধর্মের চরম গোঁড়ামি, জাত-পাত, অস্পৃশ্যতার নিদারুন অত্যাচার ও অবিচারের বিকল্প হিসাবে গৌতম বুদ্ধ সংঘগুলিতে সাম্যের আবহাওয়া সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন । তাই ভারতীয় জনগণের একটা বিশাল অংশ বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেছিল । ইসলাম ধর্মের ক্ষেত্রেও তা একইভাবে প্রযোজ্য । ভারতে ইসলাম এক হাতে কোরান অপর হাতে তরবারি নিয়ে আসেনি । অল্প কিছু ক্ষেত্রে রাজশক্তি বা জোর করে ধর্মান্তর হলেও ইসলামের প্রভাব এখানে বেড়েছে দুটো প্রধান কারণে । সুফি ভক্তিবাদের ফলে এবং হিন্দু সমাজে জাতপাত ভেদের জন্য । নিম্নবর্ণের এবং দলিত জনগণের একাংশ উচ্চবর্ণের অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে । স্বামী বিবেকানন্দ একে চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন । ভারতে দলিত মানুষ ইসলামের মধ্যে সাম্যের উপাদান দেখতে পেয়েছিল । বিবেকানন্দের মতে এই জন্য ভারতে (বিবেকানন্দের সময় অবিভক্ত ভারত - লেখক) এক পঞ্চাংশ  ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন ।

=============================

হিন্দুধর্মের এবং সাধারণভাবে সমস্ত ধর্মেরই সামাজিক তথা অর্থনৈতিক ভূমিকাকে শ্রমিকশ্রেণির সামনে সঠিকভাবে তুলে না ধরলে আদর্শগত সংগ্রাম সফল হতে পারবে না । কৃষিবিপ্লব ঘটানোর জন্যে সংগ্রাম, একচেটিয়া পুঁজির দাপটচাপট আর সাম্রাজ্যবাদী শোষণের অবসান ঘটানোর জন্যে সংগ্রাম সমাজতন্ত্রের দিকে নিয়ে যাবে -- এমন ধরণের জনগণতন্ত্ররাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্যে সংগ্রাম--এ-সবই তো হচ্ছে আমাদের একালের প্রধান সংগ্রাম । এইসব সংগ্রাম থেকে সমাজের জাতপাতের ভেদাভেদ প্রথাটাকে দূর করে দেওয়ার প্রশ্নটাকে আলাদা করে দেখে ওটাকে খালি হিন্দু সমাজের সংস্কারের প্রশ্ন বলে মনে করা আর চলে না ।

=============================

সংরক্ষণের প্রশ্ন

ভারতের সংবিধানে পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়ের জন্য সংরক্ষণ চালু আছে । জনসংখ্যার অনুপাত অনুযায়ী সংরক্ষণ-এর হার নির্ধারিত হবে কিন্তু কোনো সময়ই তা ৫০ শতাংশ অতিক্রম করতে পারবে না । শুধুমাত্র সরকারী চাকুরির ক্ষেত্রে সরকারি বা সরকার পোষিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীদের ক্ষেত্রে এই সংরক্ষণ প্রযোজ্য হয় । কিন্তু বেসরকারি ক্ষেত্রে সংরক্ষণ চালু করার প্রস্তাব থাকলেও তা এখনও আলোচনার স্তরে আছে । আর এস এস এবং বিজেপি-র বিভিন্ন মহল থেকে সংরক্ষণ প্রথার বিরোধিতা করা হচ্ছে এবং তা তুলে দেওয়ার জন্য সওয়াল করা হচ্ছে ।

ভারতের মত জাতপাত বিভক্ত সমাজে সংরক্ষণ থাকাটা খুবই প্রয়োজনীয় । কারণ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে উচ্চবর্ণের মানুষেরা সমাজ শাসন করেছেন, ধর্মের নামে বিভিন্ন বিধি বিধান দিয়েছেন তার অনিবার্য পরিণতিতে নিম্নবর্ণের মানুষদের শিক্ষা এবং সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছিল এবং তাদের উপরে অনেক বিধিনিষেধ জারি করা ছিল, এখনও কিছু কিছু আছে । উদাহরণস্বরূপ বলা যায় ডঃ আম্বেদকরকে স্কুলে সহপাঠীদের সাথে একসাথে বসতে দেওয়া হতো না, বাইরে চাটাই পেতে বসতে হতো । পানীয় জলের পাত্রের কাছে যেতে পারতেন না । এমনকি অধ্যাপনার চাকরি পাওয়ার পরেও অধ্যাপকদের জলপানের অধিকার ছিল না । শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তারা উচ্চবর্ণের তুলনায় ক্রমশ পিছিয়ে গেছে । উচ্চবর্ণরা সংখ্যায় কম হয়েও যুগের পর যুগ ধরে সিংহভাগ চাকরিবাকরি, শিক্ষার সুযোগ -সমস্ত কিছুই দখলে রাখতেন ।

ব্রিটিশ আমলে সংরক্ষণের নীতি প্রথম চালু হয়েছিল । মূলস্রোতে আনবার জন্য সংরক্ষণই ছিল দরিদ্র নিম্নবর্ণের মানুষের কাছে একমাত্র অবলম্বন । যারা ইসলাম ধর্ম বা বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেছিল তারা কিন্তু এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিল । এদের সংরক্ষণের আওতায় আনবার জন্য ২০১০ সালে রঘুনাথ মিত্র কমিশন রায় দিয়েছিলেন যে আর্থিক দিক থেকে ধর্ম নির্বিশেষে পিছিয়ে পড়া মানুষকে সংরক্ষণের আওতায় আনা যেতে পারে । পশ্চিমবাংলার বামফ্রন্ট সরকারি এটি প্রথম কার্যকরী করে এবং শতকরা ১৭ ভাগ সংখ্যালঘুদের জন্য সংরক্ষণের সুযোগ পায় ।

সংরক্ষণের সুযোগ নেওয়ার জন্য গ্রূপ ডি চাকরি ছাড়া অন্য পদে ন্যূনতম মাধ্যমিক পাশ করা দরকার । কিন্তু সরকারী পরিসংখ্যান অনুযায়ী তফশিলভুক্ত জাতির শতকরা ৭১.৩ ভাগ স্কুল ফাইনাল পাশ করার সুযোগ পায় (ভুল সংশোধন - তফশিলভুক্ত জাতির শতকরা ৭১.৩ ভাগ স্কুল ছুট) । ফলে সরকারের খুবই নিম্নস্তরের কাজে প্রতি ৪ জন দরিদ্রের মধ্যে ১ জন মাত্র সংরক্ষণের সুযোগ নিতে পারে । ২০০১-এর আদমসুমারি অনুযায়ী দলিতদের মধ্যে মাত্র ২.২৪% স্নাতক । এখন নয়া উদার অর্থনীতির যুগে সব কিছুর সঙ্গে শিক্ষাও বেসরকারিকরণ করা হচ্ছে । ফলে সরকারি চাকরির সংখ্যা কমে যাচ্ছে । ১২০ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে ১ কোটি ৮০ লক্ষ মাত্র সরকারি চাকরি ।

তফশিল জাতি ও উপজাতির জন্য জাতীয় কমিশনের রিপোর্টে দেখা যায় যে কেন্দ্রীয় সরকারের এ গ্রেড অফিসারের ন্যূনতম ১৫ শতাংশ এই অংশের মানুষের হওয়া উচিত সেখানে ৮.৪ শতাংশ মাত্র চাকরি করেন । দিল্লি হাইকোর্টের ২০ জন বিচারকের মধ্যে একজনও দলিত নেই । তামিলনাড়ু সামাজিক ন্যায়ের জন্য বিখ্যাত কিন্তু সেখানেও হাইকোর্টের বিচারকের ৩৮ জনের মধ্যে মাত্র ৪ জন, কেরালায় ২৫ জনের মধ্যে ১ জন তফশিল জাতিভুক্ত ।

২০১১ আদমসুমারি অনুযায়ী ১২০ কোটির মধ্যে তফশিল জাতি ও উপজাতির সংখ্যা ৩০ কোটি । সংরক্ষণের মাধ্যমে আদিবাসিরা চাকরি পে ঝাড়ুদার বা জমাদার ইত্যাদি পদে ।

সংরক্ষণ নিয়ে দুটি প্রশ্ন যথাযথ উঠে এসেছে । তফশিল জাতিভুক্ত অনেক মানুষ আছেন যারা সংরক্ষণের সুবিধা পেয়ে অর্থনৈতিক মর্যাদা পেয়েছেন । যারা ব্যক্তিগতভাবে তফসিলী উপজাতিভুক্ত হওয়ার জন্য অর্থনৈতিক বা শিক্ষাক্ষেত্রে ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রে অনেক অগ্রসর হয়ে এসেছেন যেমন কলেজের অধ্যক্ষ বা অধ্যক্ষা, চিকিৎসক, সরকারি অফিসার নিম্ন আদালতের বিচারক ইত্যাদি । এইভাবে তফশিলভুক্ত উপজাতির মধ্যে একটা উচ্চতর অংশ তৈরি হয়েছে তাদের পরিবারের মানুষেরা এখন সমাজের প্রভাবশালী অংশের মধ্যে অন্যতম । তারা এখন সমাজের সংরক্ষণের সমগ্র সুবিধা ভোগ করে নিচ্ছেন । তাদের বলা হয় ক্রাম লেয়ার । আবার উচ্চবর্ণের মানুষ হলেও অর্থনৈতিক দিক থেকে খুবই পিছিয়ে পড়া প্রচুর মানুষ আছেন । কিন্তু তারা উচ্চবর্ণের মানুষ এইজন্যই কোনো সুযোগ পান না । তাদের জন্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে আয়ের একটা ঊর্ধ্বসীমা বেঁধে দেওয়া হোক এবং উচ্চবর্ণের হলেও অর্থনৈতিকভাবে পশ্চাৎপদদের সংরক্ষণের সুযোগ দিতে হবে ।

=============================

ভারতে এত জাতি ধর্ম আছে যে তা পরিচিতি সত্তার উর্বর ভূমি ।

বিভিন্ন দলিত গোষ্ঠী, ওবিসি আন্দোলন, সংরক্ষণের জন্য, সম্পদের ভাগ নেবার দাবিতে এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে এবং অন্য নানা কারণে পরস্পর বিরোধী রাজনীতিতে প্রশ্রয় দেয় । কিন্তু এই গোষ্ঠীগুলি মৌলিক সামাজিক কাঠামো এবং শ্রেণি শোষণ বদলানোর দাবিতে আন্দোলন সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যায় না । অন্যান্য নিপীড়িত মানুষের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলাতে তাদের আগ্রহ নেই ।...

...এ ধরনের পরিচিতি সত্তা নির্ভর রাজনীতি শুধুমাত্র দলিত বা পশ্চাৎপদশ্রেণির সংগঠনগুলির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই । নির্বাচনী শক্তি ও সমর্থন ভিত্তি বাড়াতে বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলিও পরিচিতি সত্তা-নির্ভর রাজনীতিকে ব্যবহার করে থাকে । উত্তরপ্রদেশে যেমন বিজেপি, এসপি এবং কংগ্রেসের মতো সব দলই জাতপাত ও সাবকাস্ট ভিত্তিক দলীয় সম্মেলনের আয়োজন করে থাকে । পরিচিতি সত্তা-নির্ভর রাজনীতিকে তারা ব্যবহার করে এবং জাতপাতভিত্তিক বিভাজন প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করে ।


=============================

ভারতীয় সমাজে শ্রেণি শোষণ এবং সামাজিক নিপীড়ন দুটোই আছে । আমাদের দেশের আর্থ সামাজিক কাঠামোয় জাতপাতভিত্তিক, জাতিগোষ্ঠীগত ও লিঙ্গভিত্তিক সামাজিক নিপীড়ন একই সঙ্গে পুঁজিবাদী ও আধা সামন্ততান্ত্রিক শ্রেণি শোষণের সঙ্গেই বিদ্যমান । শাসকশ্রেণিগুলি উদবৃত্ত শ্রম শোষণ করে শ্রেণি শোষণের মাধ্যমে এবং তাদের আধিপত্য বজায় রাখতে তারা বিভিন্ন ধরণের সামাজিক নিপীড়নকে কাজে লাগায় । সে জন্যই শ্রেণি সংগ্রাম চালিয়ে নিয়ে যাবার গুরুত্বের উপরও জোর দেবার পাশাপাশি সামাজিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রামও চালাতে হবে । বিশ্বজোড়া লগ্নিপুঁজির দাপট বাড়ার এবং সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়ন মাথাচাড়া দেবার পরই শাসকশ্রেণিগুলি পরিচিতি সত্তা-নির্ভর রাজনীতি ও আন্দোলনকে বড় আকারে মদত দিচ্ছে । এ ধরনের আন্দোলন নিপীড়িত শ্রেণীগুলির মধ্যে পেটি বুর্জোয়াদের একটা অংশকে ক্ষমতার সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসার সুযোগ করে দেয় ।

Tuesday, 28 March 2017

যুক্তিবাদীর চোখে গীতা, রামায়ণ, মহাভারত ইত্যাদি - প্রবীর ঘোষ (১)

পেটের জ্বালাই নানা অপরাধের আঁতুড়ঘর । তাই তো কোনও দেশ যত দেউলিয়া হতে থাকে, ততই গরিবি বাড়ে, ততই বাড়ে নানা অপরাধ ।

======================================================

মানুষ যৌনতার প্রতি আকর্ষণ ও যৌন অভিলাষ নিয়ে জন্মায় । সাধারণত তিন থেকে পাঁচ বছরের ছেলেমেয়েরা যৌনাঙ্গ নিয়ে নাড়াচাড়া করে এক ধরণের আনন্দ পায় । এই আনন্দ অনির্দিষ্ট ।

কৈশোরের শুরুতে সমকামিতা প্রচ্ছন্ন বা প্রকাশ্য রূপ পায় । যৌনগ্রন্থি, যৌনাঙ্গ যতই পরিণতির দিকে এগোতে থাকে ততই বিপরীত লিঙ্গের মানুষটির কাছে নিজেকে আকর্ষণীয় করে তুলতে চায় ।

তারপর আসে আত্মরতির পর্যায় । এই সময় কিশোর-কিশোরীদের (মেয়েদের ক্ষেত্রে ১৩-১৪ বছর, ছেলেদের ক্ষেত্রে ১৬-১৭ বছর পর্যন্ত সময়) যৌনগ্রন্থি, অন্যান্য প্রয়োজনীয় অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি যেমন পিটুইটারি ও অ্যাড্রেনাল গ্রন্থিগুলি সক্রিয় হয় ।

মেয়েদের রজঃস্রাব ও ছেলেদের বীর্য তৈরি হয় । এই সময় বন্ধুদের সঙ্গে যৌনতা নিয়ে আলোচনা, পর্নো বইয়ের প্রতি একটা স্বাভাবিক প্রবণতা আসে । বিচরণ করে এক অদ্ভুত স্বপ্নের জগতে । স্বপ্নের নায়ক-নায়িকা বা পরিচিত কোনও বিপরীত লিঙ্গের বন্ধু-বান্ধবীর সঙ্গে মিলিত হচ্ছে ভেবে আত্মরতি করে । এর পরের পর্যায়ে আসে যৌন-মিলনের আনন্দকে উপভোগ করার পর্যায় ।

এই যে একটু একটু করে যৌন অভিলাষের দিকে এগোনো, এর প্রতিটি পর্যায়ই স্বাভাবিক ঘটনা । এই স্বাভাবিক প্রবৃত্তির গতিময়তা বাধা পেলে অস্বাভাবিক যৌন আচরণ গড়ে উঠতে পারে ।

আমাদের সমাজের রীতিনীতি ও চাপিয়ে দেওয়া মূল্যবোধ মানতে গিয়ে অনেক সময় আমরা যৌন অভিলাষকে খারাপ, নোংরা ব্যাপার বলে মনে করি । কিন্তু স্বাভাবিক প্রবৃত্তির তাড়নাকে এড়াতে পারি না । ফলে আমাদের ভন্ড হতে হয় । মুখে যৌনতার বিরুদ্ধে সরব হয়, সুযোগ পেলেই 'কাম' নামের সহজাত প্রবৃত্তির কাছে আত্মসমর্পণ করি ।

অজাচার মধ্যবিত্ত মানসিকতার নারী-পুরুষদের মধ্যেই সাধারণত দেখা যায় । উচ্চবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানসিকতার নারী-পুরুষদের মধ্যে অজাচারের ঘটনা বিরল । 'লোকে কি বলবে' - ব্যাপারটাকে ওরা পাত্তা দিতে রাজি নয় । ওদের 'পেটে খিদে মুখে লাজ' নেই । দেহ-মিলনের সময় ওই দুই সমাজ-মানসিকতার নারী নিষ্ক্রিয় না থেকে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয় । দেহশুচিতার ভণ্ডামি নেই ।

মধ্যবিত্তদের একটা প্রবণতা - দেহশুচিতার পক্ষে সাড়ম্বরে বলা । যৌন অভিলাষ একটি সহজাত প্রবৃত্তি হওয়া সত্ত্বেও মধ্যবিত্ত সমাজ বিষয়টিকে 'খারাপ', রেখে-ঢেকে রাখার বিষয় বলে চিহ্নিত করে দিয়েছে ।

যৌন অভিলাষ নিশ্চয়ই প্রকাশ্যে সংঘটিত হওয়ার বিষয় নয় । কিন্তু যৌন-শিক্ষা, ছেলে-মেয়েদের বন্ধুত্বপূর্ণ মেলামেশাকে খারাপ ভাবাটাই কুশিক্ষা ।

এমন বহু মানুষের মুখোমুখি অবিরত হই, যাঁরা গর্বের সঙ্গে বলেন, "আমার মেয়ে খুব ভালো । একটিও ছেলে বন্ধু নেই ।" যেন ছেলে বন্ধু না থাকাটাই মেয়েদের ভালো হওয়ার আবশ্যিক শর্ত । অনেক ছেলের মা-বাবাও এমন বোকা বোকা গর্ববোধ নিয়ে থাকতে ভালোবাসেন । ...

... মানসিক কারণে শারীরিক অসুখে মধ্যবিত্ত নারীরাই বেশি ভোগেন । মধ্যবিত্ত বলতে আমি মধ্যবিত্ত মানসিকতার কথা বলছি । মা, মাসি, পিসি, দিদিমা, ঠাকুমারা মেয়েদের শিখিয়ে এসেছেন, লজ্জাই নারীর ভূষণ । স্বামীর কাছে মিলন প্রার্থনা করলে স্বামী চরিত্রহীনা ভাববে । মিলনকালে স্ত্রী সক্রিয়ভাবে অংশ নিলেন স্বামী কামুকা ভাববে । মধ্যবিত্ত নারীদের মিলন-আনন্দ উপভোগের সুযোগ থাকে না । ফলে বিয়ের কয়েক বছরের মধ্যেই স্ত্রীর কাছে এই মিলন ভরণ-পোষণের বিনিময়ে স্বামীর কাছে নিজের দেহকে তুলে দেবার প্রচলিত প্রথা হয়ে দাঁড়ায় । দীর্ঘ যৌন অবদমনের ফলে মানসিক কারণে নানা ধরণের শারীরিক অসুখের প্রকাশ ঘটে । নিম্নবিত্ত ও উচ্চবিত্ত মানসিক অবস্থার নারীদের মধ্যে একটা বিষয়ে মিল আছে; তাঁরা পুরুষদের সঙ্গে মিলনের সময় পুরুষদের মতোই সক্রিয়ভাবে অংশ নেন । ফলে সাধারণভাবে তাঁরা যৌন অবদমনের কারণে দেহজনিত (psycho-somatic disorder) রোগে ভোগেন না ।


======================================================


Democratic Experimentalism - Brian E. Butler



In his speech to the Constituent Assembly during the final debate before the adoption of the Constitution, Ambedkar commented, “On the 26th of January 1950, we are going to enter into a life of contradictions. In politics we will have equality and in social and economic life we will have inequality. In politics we will be recognizing the principle of one man one vote and one vote one value. In our social and economic life, we shall, by reason of our social and economic structure, continue to deny the principle of one man one value. How long shall we continue to live this life of contradictions? How long shall we continue to deny equality in our social and economic life? If we deny it for long, we will do so only by putting our democracy in peril.”

যুক্তিবাদীর চোখে গীতা, রামায়ণ, মহাভারত ইত্যাদি - প্রবীর ঘোষ

গীতা পড়লে আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় যে, যুদ্ধে বিমুখ অর্জুনকে যুদ্ধে পাঠাবার জন্যই গীতা লেখা হয়েছিল ।

আসুন যুক্তির আলোকে বিচার করি । কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে এমন সময় অর্জুন বেঁকে বসলেন । যুদ্ধে যাবেন না । দীর্ঘ সময় ধরে কৃষ্ণ শুরু করলেন জ্ঞান দেওয়া যুদ্ধের field-এ থেকেই ।

ভগবদগীতার এগারো পরিচ্ছেদে বিশ্বরূপ দর্শনের পরে কৃষ্ণকে অর্জুন 'my father' বলে মেনে নিলেন । এবং আঠারো পরিচ্ছেদে কৃষ্ণের দাসত্ব মেনে নিয়ে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হলেন । কিন্তু ভগবদগীতায় কৃষ্ণের বাণী শেষ হয়ে যাওয়ার পরে যুদ্ধের নবম দিনে অর্জুন আবার বেঁকে বসলেন, যুদ্ধে যাবেন না ।

এটা কেমন হল ! যে অর্জুন আগেই কৃষ্ণের মুখে বিশ্বরূপ দর্শন করে মোহভঙ্গ হয়ে যুদ্ধ করার জন্য চাঙ্গা হয়ে উঠলেন, সেই আবার পরে বলছেন যুদ্ধ করার কী প্রয়োজন ! দ্রষ্টব্য যে কৃষ্ণ একবারও তখন গীতার কথা না বলে অর্জুনের প্রতিজ্ঞা ও ক্ষত্রিয়ধর্মের কথাই বললেন । অর্জুনও পূর্বপ্রতিজ্ঞা ও ক্ষত্রিয়ধর্মের কারণেই আবার যুদ্ধে গেলেন ।

সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে গীতা মহাভারতে বিশেষ কারণে সংযোজিত হয়েছিল । গীতার মধ্য দিয়ে ব্রাহ্মণ্যধর্মের মূলনীতিকে ঈশ্বরের মুখ দিয়ে প্রচার করাই ছিল মুখ্য উদ্দেশ্য । ব্রাহ্মণ্যধর্মকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য রাজশক্তি প্রভূত সাহায্য করেছিল ।

প্রাক আর্যরা এবং বৌদ্ধ ও জৈনরা আত্মা, জন্মান্তরবাদ, যজ্ঞকর্ম ইত্যাদিতে বিশ্বাস করত না । তাই সে'সময়কার জনগোষ্ঠীর মধ্যে মধ্যে আত্মা চিরন্তন এই ভাবনাকে গেঁথে দিতে গীতার রচনা । কারণ আত্মার অস্তিত্ব না থাকলে ব্রাহ্মণ্যধর্মের অস্তিত্বই ধ্বংস হয়ে যায় । আত্মা নশ্বর হলে পুনর্জন্ম থাকে না । এই এতগুলো না থাকার কারণ ঈশ্বর পুজো এবং দ্বিজ ভক্তিই তো বাতিল হয়ে যায় । তাই দ্বিজ অর্থাৎ ব্রাহ্মণরা নিজেদের অস্তিত্ব সংকট থেকে বাঁচতে গীতার পক্ষে ধুন ধরেছিল ।


======================================================


আঠারো পরিচ্ছেদে মোক্ষযোগে (ভগবদ্ গীতা, ১৮/৬৬) বলা হয়েছে --
"সর্বধর্মান্‌ পরিত্যাজ্য মামেকং শরণং ব্রজ ।
অহং ত্বাং সর্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ ।।"

সব ধর্ম ছেড়ে আমাকেই গ্রহণ করো । শোক কোরো না, আমি তোমাকে সব পাপ থেকে মুক্ত করব ।

এই শ্লোকের মাধ্যমে সব ধর্ম ছেড়ে আর্যদের ঈশ্বরকে বা তাদের ধর্মমতকে গ্রহণ করার জন্য ডাক দেওয়া হয়েছে । পাপ থেকে মুক্ত করার লোভও দেখানো হয়েছে । কৃষ্ণের তত্ত্বকে প্রচার করা হয়েছে অন্যান্য ধর্মকে সরাসরি আক্রমণ করে ।

আর্যদের ধর্মকে গ্রহণ না করলে প্রাক আর্যদের চরম ক্ষতি হবে সেই হুমকিও দেওয়া হয়েছে । যেসব লোক ব্রাহ্মণ্যধর্ম গ্রহণ করে না, তাদেরকে কৃষ্ণ অর্থাৎ গীতা রচয়িতারা 'দুষ্কর্মকারী, মূঢ়, নরাধম ও অসুর' বলে চিহ্নিত করেছে (ভগবদ্ গীতা, ৭/১৫)।

গীতায় (ভগবদ্ গীতা ৯/১১) বলা হয়েছে, যে শ্রী ভগবান অর্থাৎ ব্রাহ্মণ্যধর্মকে অস্বীকার করে, তারা অসুর ও রাক্ষসযোনি প্রাপ্ত হয় ।

অসুর বা রাক্ষস বলতে প্রাক আর্য বা ভূমিপুত্রদেরই বলা হয় । এবং আরও অশ্লীলভাবে ষোলো পরিচ্ছেদে (ভগবদ্ গীতা ১৬/১৮-২০) বলা হয়েছে, যারা শ্রীভগবানকে মানে না তাদের অশুভ অসুর যোনিতে আবার ঢুকিয়ে দেওয়া হবে । অর্থাৎ প্রাক আর্যরা যে যোনি থেকে জন্মেছে সেখানে ঢুকিয়ে দেওয়া হবে । এ তো দেখছি পাড়ার কাঁচা খিস্তিবান মস্তানদের কথা ।

এমন জঘন্য ভাষা গীতিকারেরা গীতার অনেক জায়গাতেই লিখেছেন ।

গীতায় জ্ঞানযোগের চতুর্থ অধ্যায়ে (ভগবদ্ গীতা ৪/৭-৮) বলা হয়েছে -

"যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত।
অভ্যুত্থানম অধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম্॥
পরিত্রাণায় হি সাধুনাং বিনাশয় চ দুষ্কৃতাম।
ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে॥"

ধর্মের যখন অস্তিত্বের সংকট আসে এবং অধর্ম প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন আমি নিজেকে সৃষ্টি করি । দুষ্কৃতীদের মেরে সাধুদের বাঁচিয়ে আবার ধর্ম প্রতিষ্ঠিত করার উদ্দেশ্যে আমি যুগে যুগে সৃষ্টি হই ।

এই শ্লোকটি প্রচুর জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে । সাধারণভাবে এই শ্লোকটি পড়লে মনে হয় যেন কৃষ্ণ ভালো লোকদের বাঁচাতে যুগে যুগে আবির্ভূত হন এবং ধর্ম প্রতিষ্ঠিত করেন । আবার অনেকে মহাভারতের সঙ্গে একে মিলিয়ে মনে করেন - মহাভারতে অধার্মিক কৌরবদের মেরে ধার্মিক পাণ্ডবদের বাঁচানোর উদ্দেশ্যে ঈশ্বরের অবতার কৃষ্ণের আবির্ভাব ।

এবার বিশ্লেষণে আসা যাক । কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে কৌরবপক্ষকে ধরা হয় অধার্মিক এবং পাণ্ডবদের ধার্মিক । কিন্তু মহাভারতে দেখা যায় অধার্মিক কৌরবপক্ষের অনেকেই বেঁচে গেছেন যথা ধৃতরাষ্ট্র, যুযুৎসু, বিদুর ও সঞ্জয় । এবং পাণ্ডবদের সকলেই যে বেঁচে ছিলেন তা নয় । পঞ্চপান্ডব এবং যাদব যোদ্ধারা ছাড়া আর সবাই মারা গিয়েছিলেন । এমনকী, কৃষ্ণের বংশের অনেকেই মদ্যপান জিরে মাতাল হয়ে মারামারি করে মারা গেলেন । শেষপর্যন্ত অধার্মিক কৌরবপক্ষের সবাই মারা গিয়ে স্বর্গে পর্যন্ত গেল । কৌরবরা যদি অধার্মিক হয় তাহলে অধার্মিকদের বিনাশ হল কোথায় ? জতুগৃহে নিম্নবর্ণের (নিষাদ) পাঁচজন পুরুষ ও একজন রমণীকে আশ্রয় দিয়ে পুড়িয়ে মেরেছিলেন এই পঞ্চপান্ডব । তাহলে পঞ্চপান্ডবরাও কি ঘোর অধার্মিক নন ? স্বয়ং কৃষ্ণ ও পঞ্চপান্ডবরা ছলচাতুরি, অন্যায়ের আশ্রয় নিয়ে যুদ্ধে জিতেছিলেন । এ হল যে আইন রক্ষাকারী, সেই চোর ।

সুতরাং অধার্মিক-ধার্মিক তত্ত্ব বিশ্লেষণ করে বোঝা যাচ্ছে যে, গীতার এই শ্লোকটি মোটেও মহাভারতের সাথে খাপ খায় না ।

সুতরাং আর্যসভ্যতা ও ব্রাহ্মণ্যধর্ম বিরোধী সবাইকে হত্যা করে ব্রাহ্মণ্যধর্মের পুনঃপ্রতিষ্ঠাই ছিল গীতার ধর্মসংস্থাপনের মূল কথা । উল্লেখ্য, নবম শতাব্দীতে প্রথম গীতা ভাষ্যকার শংকরাচার্য রাজশক্তির সাহায্যে প্রচুর বৌদ্ধ হত্যা করেছিলেন । রাষ্ট্রশক্তির পৃষ্ঠপোষকতায় ব্রাহ্মণ্যধর্ম রাজধর্ম রূপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ।


======================================================


বৈদিক যুগ থেকেই প্রচলিত ছিল চতুর্বর্ণ প্রথা অর্থাৎ জাতপাতের ভেদাভেদ । বলা হলো ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়দের সমাজের সব থেকে উঁচুতে অবস্থান এবং তারপর বৈশ্যদের অবস্থান । সমাজের সব থেকে নিচে শূদ্ররা অবস্থিত । উচ্চ তিন বর্ণের সেবা করাই হল শূদ্রদের একমাত্র কাজ । প্রাক আর্য এবং নিরীশ্বরবাদীরা সংখ্যায় বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে এই চতুর্বর্ণ প্রথা লুপ্ত হতে থাকে । এইজন্য গীতার মাধ্যমে কৃষ্ণের মুখ দিয়ে চতুর্বর্ণ প্রতিষ্ঠা করা হল ।

চতুর্থ অধ্যায়ের জ্ঞানযোগে (ভগবদগীতা, ৪/১৩) বলা হল -

"“চাতুর্বর্ণ্যং ময়া সৃষ্টং গুণকর্মবিভাগশঃ।
 তস্য কর্তারমপি মাং বিদ্ধ্যকর্তারমব্যয়ম।"

আমি গুন্ অনুযায়ী কর্মের বিভাগ অনুসারে চতুর্বর্ণ সৃষ্টি করেছি । আমাকে এর কর্তা এবং অব্যয় অকর্তা রূপে জানবে ।

ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় = কায়স্থ, বৈশ্য = ব্যবসায়ী, শূদ্র = বাদবাকি যারা আছে । গীতায় বলা হয়েছে এই চারবর্ণের সৃষ্টিকর্তা স্বয়ং কৃষ্ণ । আবার মনুসংহিতায় এই চারবর্ণের সৃষ্টিকর্তা মনুকেই বলা হয়েছে । এবার আপনারাই বিচার করুন কার সৃষ্টি তত্ত্ব গ্রহণ করবেন । কারণ দু'জনের মধ্যে একজন অসত্য ভাষণ করেছেন ।


======================================================


চোদ্দ অধ্যায়ে (ভগবদগীতা, ১৪/১৮) কৃষ্ণ বলেছেন -
"ঊর্ধ্বং গচ্ছন্তি সত্ত্বস্থা মধ্যে তিষ্ঠন্তি রাজসাঃ।
জঘন্যগুণবৃত্তিস্থা অধো গচ্ছন্তি তামসাঃ ।।"

সত্ত্বগুণের অধিকারীরা ঊর্ধ্বে যায়, রজ বা রাজকীয় গুণসম্পন্নরা মধ্যে অবস্থান করে, আর তম বা অন্ধকার গুণসম্পন্ন লোকেরা জঘন্য বৃত্তিতে নিযুক্ত হয়ে অধোগামী হয় ।

গীতায় (ভগবদগীতা, ১৮/৪০), সত্ত্ব, রজ এবং তম গুনকে স্বভাবজাত বলা হয়েছে ।

গীতায় আঠারো অধ্যায়ে বলা হয়েছে (ভগবদগীতা, ১৮/৪১-৪৮) - "ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য এবং শূদ্রদের সহজাত গুণাবলি দ্বারাই তাদের কর্ম ভাগ করা হয়েছে ।"

এখানে বলে রাখি সহজাত গুণাবলি বলে কিছুই হয় না । যা হয় তা হল সহজাত প্রবৃত্তি । মানুষ যে জলপান করে সেটা দেখেই শিখেছে । মানুষ যে কথা বলে, হাঁটে সেটাও দেখেই শেখা । একটু একটু করে উত্তরণ হয়েছে ।


======================================================


গীতায় বর্ণিত চতুর্বর্ণ বিভাজন কোনওরকম ভাবেই সহজাত প্রবৃত্তি নয় ।

গীতায় (ভগবদগীতা, ২/৪৭-৪৮) বলা হল - শুধু কাজেই তোমার অধিকার আছে, ফলে নয় । ফললাভের আশা না করে শুধু কাজ করে যাও ।

মুখ বুজে সব অত্যাচার সহ্য করে শুধু উচ্চবর্ণের সেবার মধ্যেই শূদ্রদের কাজের সীমা বেঁধে দেওয়া হল । শূদ্রেরা যাতে উচ্চ তিন বর্ণের সেবার মধ্যেই নিযুক্ত থাকে, উচ্চ পেশায় আগ্রহ প্রকাশ না করে । সাবধান করে গীতার তৃতীয় অধ্যায়ে কর্মযোগে বলা হল - পরধর্মের চেয়ে গুণহীন নিজের ধর্মই শ্রেষ্ঠ । স্বধর্মে মৃত্যুও ভালো, কিন্তু পরধর্ম ভয়াবহ ।

এই একই শ্লোক আবার মনুসংহিতাতেও (১০:৯৭) পাওয়া যায় । অর্থাৎ শূদ্ররা যেন এই দাসবৃত্তি, সেবার মধ্যে নিজেকে জড়িয়ে রাখে । অত্যাচারের ফলে যদি তার মৃত্যুও হয় তাহলেও তা ভালো । কারণ সে সেবা করতে করতেই মারা গেছে । শূদ্রদের ছিন্ন ও মলিন বস্ত্র দেওয়া হত পোশাক হিসেবে । তাদের খাদ্য ছিল উচ্চবর্ণের উচ্ছিষ্ট খাদ্যবশেষ ।

ভগবদগীতা নিয়ে যাঁরা গদগদ, তাঁরা উপনিষদ ও গীতা পড়লে দ্বিধাহীনভাবে বুঝতে পারবেন, কৃষ্ণ অর্জুনের জন্য উপনিষদরূপী গাভী থেকে গীতামৃত দোহন করেছিলেন ।

বৈদিক যুগে বেদ পাঠ করা তো দূরের কথা, শোনাও ছিল শূদ্রদের পক্ষে ভয়ংকর রকমের অপরাধ । পরবর্তীকালে বেদ ও উপনিষদের কিছু কথা উচ্চবর্ণের স্বার্থে শূদ্রদের মাথায় ঢোকাবার প্রয়োজনেই তৈরি করা হল 'গীতা' । এই গীতা পাঠ করা বা পাঠ শোনা শূদ্রদের পক্ষে পুণ্যকর্মের পরিবর্তে অপরাধ বলে ঘোষিত হল ।


======================================================


গীতায় যোগের শ্রেষ্ঠত্বের কথা বলা হয়েছে । এখানে বলে রাখা দরকার যোগ এবং যোগব্যায়াম (free hand exercise) আলাদা । পতঞ্জলির যোগশাস্ত্রে রয়েছে হটযোগবলে উড়ে যাওয়ার কথা । রয়েছে রাজযোগের দ্বারা ইচ্ছেমতো আকাশে উড়ে যাওয়ার কথা, অদৃশ্য হওয়ার কথা, এমনকী অলৌকিক শক্তি লাভ করার কথা । খেচরীমুদ্রার সাহায্যে মৃত্যুকে জয় করা যায় অর্থাৎ অমর হওয়া যায় । এগুলো প্রত্যেকটাই অসম্ভব ।


======================================================


'ব্রাহ্মণ' শব্দটির উৎপত্তি ব্রহ্মতত্ত্ব থেকে । যে ব্যক্তি ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করেছেন, তিনি-ই 'ব্রাহ্মণ' । 'ব্রাহ্মণ্যবাদ' শব্দটি নবীন । চতুর্বর্ণ প্রথা ও ব্রাহ্মণদের তৈরি নানা শাস্ত্র অর্থাৎ অনুশাসন বা বিধি বিষয়ক মতবাদ-ই হল 'ব্রাহ্মণ্যবাদ'।


======================================================


বৈদিক-ধর্মের প্রধান বৈশিষ্ট্য যজ্ঞ । ব্রাহ্মণগ্রন্থগুলো যজ্ঞকেই সর্বশক্তির আধার বলে বর্ণনা করেছে । সমস্ত সৃষ্টিকে যজ্ঞক্রিয়ার ফল বলা হয়েছে । 

বেদগুলোকে দুটি ভাগে ভাগ করতে পারি আমরা । (১) মন্ত্র (২) ব্রাহ্মণ । 'মন্ত্র' হল দেবতার গুনকীর্তন ও প্রার্থনা ।

'ব্রাহ্মণ' হল যাগ-যজ্ঞের প্রণালী । ব্রাহ্মণের বক্তব্য অনুসারে ঋকবেদের দেবতারা যজ্ঞের ক্রিয়াকলাপের দ্বারা পরিচালিত হতে বাধ্য । অর্থাৎ যে জন্য যজ্ঞ করা, সে ফল পাওয়া যাবেই । ফলদানের বা ফল আটকে দেবার ক্ষমতা দেবতাদের নেই ।

এরপর যে প্রশ্ন উঠে আসা স্বাভাবিক - তাহলে মন্ত্র বা প্রার্থনার মূল্য কি রইল ? বেদেরই অংশ 'ব্রাহ্মণ' বলছে - বেদভক্তি, মন্ত্র ও প্রার্থনার কোনও মূল্য নেই । তবে যজ্ঞে ফল লাভ অনিবার্য ।

এটা আপাতভাবে বেদের স্ববিরোধ মনে হতেই পারে । কিন্তু এই স্ববিরোধ তৈরি করা । বেদ লেখক জাদু-পুরোহিতদেরই তৈরি করা । স্বার্থবুদ্ধি থেকেই তারা এমনটা করেছে । তারা চেয়েছে সুনিশ্চিত ফল পেতে যজমানরা দেবতার চেয়ে তাদের উপর নির্ভর করুক বেশি ।   


======================================================


বৃহদারণ্যক উপনিষদেও বলা হয়েছে - নারীর নিম্নদেশ যজ্ঞবেদি, যৌনকেশ যজ্ঞতৃণ, ত্বক সোমরস-পোষণের ভূমি এবং অন্ডকোষ দুটি অগ্নি । এই বিশ্বাস নিয়ে যে সঙ্গমে প্রবৃত্ত হয়, সে বাজপেয় যজ্ঞের ফললাভ করে ।

এখানে দেখছি যজ্ঞ না করেই শুধু মৈথুনেই যজ্ঞের ফল লাভের ঘোষণা করা হয়েছে । এখানে আরও বলা হয়েছে, কোনও নারী যৌনমিলন প্রত্যাখ্যান করলে তাকে জোর করে বাধ্য করা উচিত (বৃহদারণ্যক, ৬, ৪, ৬, ৭)। হিন্দুত্ববাদীরা কি হিন্দুধর্মের এই ধর্ষণ সমর্থনের কথা জানেন ?


======================================================


বৈদিক যুগ থেকে সমাজে নারীর অবস্থান ছিল সবথেকে নীচে । বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে নারীকে দুশ্চরিত্রা, অপবিত্রা আখ্যা দেওয়া হয়েছে । গীতাতেও গীতাকারের দ্বারা কৃষ্ণের মুখ দিয়ে নারীজাতির হীনত্ব প্রকাশিত হয়েছে ।

নারীদের 'পাপযোনি' সম্বোধন করে বলা হয়েছে (ভগবদগীতা, ৯/৩২-৩৩) -

'মাং হি পার্থ ব্যাপাশ্রিত্য য়েঽপি স্যুঃ পাপয়োনয়ঃ ।
স্ত্রিয়ো বৈশ্যাস্তথাশূদ্রাস্তেঽপি য়ান্তি পরাং গতিম্ ॥
কিং পুনর্ব্রাহ্মণাঃ পুণ্যা ভক্তা রাজর্ষয়স্তথা ।
অনিত্যমসুখং লোকমিমং প্রাপ্য ভজস্য মাম্ ॥'

অর্থাৎ আমাকে আশ্রয় করে স্ত্রী, বৈশ্য, শূদ্র এসব পাপযোনিরা পরমগতি লাভ করে থাকে । ব্রাহ্মণ ও রাজর্ষিদের মতো পুণ্যবান ভক্তদের আর কথা কি ? অনিত্য এবং সুখহীন ইহলোকে জন্মেছো, আমাকে ভজনা করো ।

এবং গীতায় (ভগবদগীতা, ১/৪১) অর্জুনের মুখ দিয়ে বলানো হল -

"অধর্মাভিভবাৎ কৃষ্ণ প্রদুষ্যন্তি কুলস্ত্রিয়ঃ ।
স্ত্রীষু দুষ্টাসু বার্ষ্ণেয় জায়তে বর্ণসঙ্কর ।।"

কৃষ্ণ অধর্মের আবির্ভব হলে কুলস্ত্রীরা দূষিত হয় । এবং স্ত্রীরা দুষ্টা হলে বর্ণসংকরের সৃষ্টি হয় ।

বর্ণসংকরের পরিনাম সম্বন্ধে বলে হয়েছে (ভগবদগীতা, ১/৪২-৪৪) - বর্ণসংকর হলে পিতৃপুরুষদের পিন্ড এবং জল দেওয়ার কেউ থাকে না । তাই তারা চিরকাল নরকে বাস করে ।

পিতৃপুরুষ মানে বাবা, ঠাকুরদা, তাঁর বাবা, তাঁর বাবা, তাঁর বাবা, এরকম করে অনন্ত বাবাদেরকে বোঝায় । তারা নরক বাস করবে এ কথা বলেছে গীতা । কিন্তু কি মুশকিল ! আত্মাকে তো কাটা যায় না, পোড়ানো যায় না । তাহলে আত্মাকে আবার কি করে নরকযন্ত্রণা দেবে ! একথা যাঁরা লিখেছেন তাঁদের জ্ঞান-গম্যির বড়ই অভাব দেখছি ।

এবং ওই শ্লোকেই আরও লেখা আছে যে কুলধর্ম বর্ণসংকরের ফলে নষ্ট হয়ে যায় । ...

... এ সবই আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বুঝিয়ে দেয় বৈদিক সমাজের দুটি বৈশিষ্ট্যকে । এক : যৌন-শক্তিধর হওয়াটা প্রধান একটি গুণ হিসেবে গণ্য হত । বিশিষ্ট প্রত্নতত্ত্ববিদ ও নৃতত্ত্ববিধ ডঃ অতুল সুরের কথায়, 'মৈথুন ধর্মটাই সেকালের সনাতন ধর্ম ছিল" । (দেবলোকের যৌনজীবন, ডঃ অতুল সুর, প্রথম সংস্করণ পৃষ্ঠা ৬২) দুই : বৈদিক যাদুপুরোহিতরা প্রাকবৈদিক যুগের মাতৃপ্রাধান্যের শিকড় সমাজ থেকে উপড়ে ফেলতে চেয়েছিলেন । চেয়েছিলেন পুরুষতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে । মেয়েদের মৈথুন-যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন । তাই ব্রহ্মার বাণী বলে প্রচার করা হয়েছে - নারীরা পুরুষদের মৈথুনের জন্যই সৃষ্ট । তোমরা মৈথুন কর্ম চালিয়ে যাও । প্রজা উৎপাদন কর । তাতেই আমি তুষ্ট ।


======================================================


হিন্দু ধর্মীয় বিধানে নারী জন্ম পরাধীন, চির-পরাধীন । মনুর বিধানে (৯:৩) আছে ।
'পিতা রক্ষতি কৌমারে ভর্ত্তা রক্ষতি যৌবনে
রক্ষতি স্থবিরে পুত্রা ন স্ত্রী স্বাতন্ত্র্যমর্হতি॥'

অর্থাৎ নারীকে :
পিতা রক্ষা করবে কুমারীকালে, স্বামী রক্ষা করবে যৌবনে ।
বার্ধক্যে রক্ষা করবে পুত্ররা, স্ত্রী স্বাধীনতার যোগ্য নয় ।

মনুর বিধানে মানুষ বিভক্ত হয়েছিল সরাসরি দুটি ভাগে - 'পুরুষ' ও 'নারী' । পুরুষকে প্রভুর ভূমিকায় এবং নারীকে ক্রীতদাসীর চেয়েও অধম, ধর্ষিতার চেয়েও অত্যাচারিতা এবং গৃহপালিত পশুর চেয়েও হীন ভূমিকায় নামিয়ে এনেছিল মনুর আইন অর্থাৎ হিন্দু ধর্মীয় আইন ।

মনুর পদাঙ্ক অনুসরণ করে হিন্দু ধর্মগ্রন্থগুলো একইভাবে নারীকে চূড়ান্তভাবে শোষণ করতে নানা উপদেশ প্রয়োগ করেছে । নানা নীতিকথার নামে দুর্নীতি ছড়াতে চেয়েছে ।

মনুসংহিতার সময়কালে মেয়েদেরকে শুধুমাত্র সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র হিসেবেই দেখা হত । মনুও সেই একই মত পোষণ করেছেন । বিয়েই হল নারীর প্রকৃত সার্থকতা এবং মাতৃত্বেই তার চরিতার্থতা । গর্ভধরণের জন্য স্ত্রীলোক এবং গর্ভধানের জন্যই পুরুষের সৃষ্টি (৯:৯৬) ।

মনুসংহিতায় (২:২১৩) লেখা আছে -
'স্বভাব এষ নারীণাং নরাণামিহ দূষণম ।'

এই সংসারে নারীরা স্বভাবতই পুরুষের মনকে কামকলুষিত করে । অর্থাৎ নারী মাত্রেই লম্পট ।

তাই মনু (২:২১৫) বলেছেন 'মাত্রা স্বস্রা দুহিত্রা বা না বিবিক্তাসনো ভবেৎ ।'

অর্থাৎ, মা, বোন বা কন্যার সঙ্গে নির্জন গৃহে কোনও পুরুষের বাস করা উচিত নয় ।

শিক্ষা আনে চেতনার মুক্তি, যা দাসত্ব থেকে মুক্ত হতে উদ্বুদ্ধ করতে পারে বিবেচনায় মনুষ্যত্বের ও মানুষের চরম শত্রু মনুর বিধান দিলেন তার বিখ্যাত মনুসংহিতায় (২:৬৭) :
'বৈবাহিকো বিধিঃ স্ত্রীণাং সংস্কারো বৈদিকঃ স্মৃতঃ ।
পতিসেবা গুরৌবাসো গৃহার্থোহগ্নি পরিক্রিয়া ।।'

অর্থাৎ 'বিয়েই নারীর বৈদিক উপনয়ন । পতিসেবাই গুরুগৃহবাস, গৃহকর্মই হোমস্বরূপ অগ্নিপরিচর্যা ।'

এখানেই শেষ নয় । মনু আরও বলেছেন (৫:১৫৪), পতি সদাচারহীন, পরস্ত্রীর সঙ্গে যৌন সম্পর্কযুক্ত বা গুণহীন হলেও সতী স্ত্রী সেই পতিকে দেবতার মতোই পুজো করবে ।

তাহলে হিন্দু নারীর বিনোদন কি শুধুই নানা ব্রতপালন ও উপবাস ঘিরেই আবর্তিত হবে?

না । ব্রতপালন, উপবাসের স্বাধীনতা নারীকে দেননি মনু । তাঁর বিধানে আছে (৫:১৫৫) : স্ত্রী'র স্বামী ছাড়া পৃথক যজ্ঞ নেই, পতির অনুমতি ছাড়া ব্রত বা উপবাস নেই । নারী স্বর্গে যেতে পারে কেবলমাত্র স্বামীসেবার সাহায্যেই ।

মনু (৫:১৫৮) আরও বলেছেন, স্ত্রীলোক তার মৃত্যু পর্যন্ত কষ্ট সহ্য করবে, নিয়মচারিণী হবে এবং স্বামীর সেবা করবে, এটাই তার পরম ধর্ম ।

হিন্দু সমাজে পুরুষরা এভাবে নিজেদের লাম্পট্য, অসদাচরণ ও অত্যাচারকে নারীদের কাছে শুধুমাত্র প্রতিবাদহীনভাবে গ্রহণীয় করেনি, নিজেদের দেবতার আসনে বসিয়েছে ধর্মের বিধান খাড়া করে ।

ব্যভিচারী নারীদের জন্য শাস্তির ব্যবস্থা ছিল মনু সংহিতায় । যে নারী নিজেদের পতিকে পরিত্যাগ করে পরপুরুষের সঙ্গে মিলিত হবে, তাকে জনাকীর্ণ স্থানে কুকুর দিয়ে খাওয়ানোর কথা বলা হয়েছে (৮:৩৭১) ।

কিন্তু যে পুরুষ ধর্ষণ করে, ঘরে স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও পরস্ত্রীর সঙ্গে সহবাস করে, তার বিরুদ্ধে কোনও শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি । বরং বেদপাঠ, যজ্ঞ ইত্যাদি বিভিন্ন প্রায়শ্চিত্তের মাধ্যমে এই ধরণের ঘৃণ্য কাজের শাস্তি থেকে মুক্তি পাওয়ার বিধানও রয়েছে ।

স্ত্রীজাতিদের স্মৃতি ও বেদ শোনা বা পড়ার অধিকার ছিল না । মনু (৯:১৮) এদেরকে এইজন্য হীন ও অপদার্থ বলেছেন ।

মনুসংহিতায় (৯:৯৪) আরও লেখা আছে - ত্রিশবছরের পুরুষ বারো বছরের মেয়েকে এবং চব্বিশ বছরের পুরুষ আট বছরের মেয়েকে বিয়ে করবে । কিন্তু যদি ধর্মহানির আশঙ্কা থাকে তাহলে পুরুষ কম বয়সেও বিয়ে করতে পারে ।

কম বয়স বলতে কত বোঝায় ? চলুন হিসেব করে দেখি । ত্রিশ বছরে বারো বছরের কন্যা এবং চব্বিশ বছরে আট বছরের কন্যাকে বিয়ে করতে হবে বলে বলা হয়েছে । অর্থাৎ পুরুষের বয়সের অনুপাত ছয় বছর কমলে মেয়ের বয়স চার বছর করে কমবে । সোজা হিসেব ।

আবার বলা হয়েছে পুরুষ কম বয়সেও বিয়ে করতে পারে । তাহলে কোনও আঠারো বছরের ছেলে চার বছরের মেয়েকে বিয়ে করতে পারবে । এবার বুঝতে পারছেন কাম প্রবৃত্তির জন্য পুরুষেরা কী ভয়ঙ্কর কাজ করত । হিসেবমতো নাবালিকা ধর্ষণ করা হত সেইসময় । এবং মনুসংহিতা এই ধর্ষণকে সমর্থন করেছিল ।

হিন্দুধর্মের বিভিন্ন বিধানে পদে পদে পুরুষের লাম্পট্যের অধিকারকে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে । তৈত্তিরীয় সংহিতায় (৬/৬/৮৫) বলা হয়েছে, 'যজমান, দীক্ষার দিনে গণিকাসাহচর্য বর্জন করবেন, তার পরদিন পরস্ত্রীর সাহচর্য এবং তৃতীয় দিন নিজস্ত্রীর সাহচর্য বর্জন করবেন ।'

অর্থাৎ, দীক্ষার দিনেও পরস্ত্রীর সাহচর্য বৈধ ছিল । দীক্ষার দিন ছাড়া অন্যান্য দিন গণিকা গমনও বৈধতার ছাড়পত্র পেয়েছিল এবং গণিকাগমন পুরুষের কাছে কখনই দোষাবহ বা লজ্জার বলে চিহ্নিত হয়নি । বরং চিহ্নিত হয়েছিল পৌরুষের প্রতীক হিসেবেই ।

মনুর বিধানে (৯:৪) বলা হয়েছে, নিঃসন্তান স্ত্রীকে বিয়ের দশ বছর পর ত্যাগ করা যায়, যে স্ত্রী শুধুমাত্র কন্যা সন্তানের জন্ম দেয় তাকে ত্যাগ করা যায় বারো বছর পরে, মৃত সন্তানের জন্মদানকারী স্ত্রীকে ত্যাগ করা যায় পনেরো বছর পরে ।

সন্তানের জন্ম দেওয়ার অক্ষমতার কারণে স্বামীকে কিন্তু ত্যাগ করার কোনও বিধান নেই । অথচ এই যুগের বিজ্ঞান বলছে ছেলে জন্মাবে কী মেয়ে জন্মাবে, এক্ষেত্রে পুরুষের ভূমিকাই মুখ্য ।

মনু (৯:৪) ঝগড়ুটে স্ত্রীকে তক্ষুনি ত্যাগ করার অধিকার দিয়েছেন স্বামীকে । কিন্তু ঝগড়ুটে শুধু নয়, অত্যাচারী স্বামীকেও দেবতা জ্ঞানে পুজো করতে বলেছেন এই মনু নামক অমানুষ এক পুরুষ । মানুষের শত্রু, মনুষ্যত্বের শত্রু এই মনুকে দেবত্ব আরোপ করেছে হিন্দু পুরুষ সমাজ । মনুকে ব্রহ্মার অংশ হিসেবে চিত্রিত করে মনুর বিধানকেই আইনের বিধান বলে মেনে নেবার কথা বলেছেন হিন্দু শাস্ত্রকার, যাঁরা মানুষ ছিলেন না অবশ্যই, যাঁরা ছিলেন পুরুষ শ্রেণির প্রতিনিধি, যাঁদের হাতে ধর্মের আর এক নাম কখনওই মনুষ্যত্ব হয়ে ওঠেনি, বরং যাঁদের হাতে মনুষ্যত্ব হয়েছে খণ্ডিত, লাঞ্ছিত, ধর্ষিত ।


======================================================


মনু বিধান দিয়েছিলেন যে, কলিযুগে কন্যার বিয়ে যেন গোটা পুরুষদের সঙ্গে যৌথভাবে দেওয়া হয় । ঋকবেদে এবং অথর্ববেদে এমন কয়েকটি শ্লোক রয়েছে যা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় । যদি জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা কোনও কন্যাকে বিয়ে করে বধূ করত, তাহলে তার কনিষ্ঠ সহোদরদের প্রত্যেকেরই ওই কন্যার সঙ্গে রমণের অধিকার থাকত । এ-থেকেই 'দেবর' শব্দের উৎপত্তি ।

জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার মৃত্যু হলে স্ত্রী দেওরকেই বিয়ে করত । কিন্তু তারপরও অন্যান্য দেওররা তাকে রমণ করত । স্ত্রীরা বহুজনের সঙ্গে রমণের আনন্দ উপভোগ করত ।


======================================================



'দশরথজাতক' গ্রন্থে আছে কোশল বংশের রাজা দশরথ কোশল বংশের রাজকন্যা কৌশল্যকেই বিয়ে করেছিলেন, যাদের সম্পর্ক ছিল ভাই-বোনের উত্তর-ভারত, পূর্ব-ভারত মধ্য-ভারতে একসময় ভাই-বোনের বিয়ে প্রচলিত ছিল এসবের সামাজিক স্বীকৃতিও ছিল দশরথ জাতকে আছে - রামও তাঁর ভগ্নী সীতাকে বিয়ে করেছিলেন


======================================================


সীতাকে উদ্ধারের পর রাম রাজসভাতে মন্ত্রী-সভাসদ ও প্রজাদের সামনেই সীতাকে বললেন, আমি যুদ্ধ করে তোমাকে উদ্ধার করে এনেছি নিজের বংশকলঙ্ক মোচন করার জন্য । তোমার চরিত্র সন্দেহজনক । তুমি রাবণের কোলে বসে ওর ঘনিষ্ঠ আদর পেয়েছ । তোমাকে গ্রহণ করে কেমন করে আমার বংশের মর্যাদাহানি করব ? বুদ্ধিমান তুমি, আমি তোমাকে বলছি, লক্ষণ, ভরত, শত্রুঘ্ন, সুগ্রীব ও বিভীষণের মধ্যে যাকে ইচ্ছে মনোনীত করে নাও এবং তার সঙ্গেই মনোরম রমণ জীবন-যাপন করো । তুমি হলে কুকুরের চাটা ঘি । আমি তোমাকে গ্রহণ করতে পারি না ।

আহা ! রামের কী পত্নীপ্রেম !


======================================================


অধ্যাপক রাবণ তামিলনাড়ুর একজন স্বনামধন্য লেখক এবং গবেষক । দীর্ঘদিন তিনি রামায়ণের ওপর গবেষণা করেছেন । তিনি চাইছেন যে দক্ষিণ ভারতীয় মূলনিবাসীদের সঙ্গে উত্তর ভারতীয় আর্যদের মধ্যে যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে আদিকবি বাল্মীকি যে রামায়ণ রচনা করেছিলেন, জনস্বার্থের কারণেই তা সকলের সামনে আনা হোক । মূল রামায়ণের আলোকে ভারত তথা বিশ্বের জনগণ বিচার করে দেখুক বাল্মীকির নাম করে তুলসীদাস বা কীর্তিবাস প্রভৃতি কবিরা যে রামায়ণ রচনা করেছিলেন তা কতটা খাঁটি বা কতটা ভেজাল । তিনি মূল বাল্মীকি রামায়ণের মা স্বরুপনখার (সুর্পণখা নয়) কাহিনী প্রকাশ করে বললেন যে, আদিকবি বাল্মীকির রামায়ণের বহু কাহিনিকেই পরবর্তীকালে ব্রাহ্মণেরা নিজেদের মতো করে পরিবেশন করেছে যাতে আদি কাহিনিটি লুপ্ত হয়ে গিয়েছে । মা স্বরুপনখার কাহিনিটি হল :

স্বরুপনখা রাবণের বোন । অসুর রাজ বিদ্যুৎজ্জিতবাহুর সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয় । তাঁদের একটি ছেলে । তার নাম সাম্ব । অসুররাজ বিদ্যুৎজ্জিতবাহুর মৃত্যুর পর রাবণ স্বরুপনখাকে দণ্ডকারণ্যের শাসিকা হিসেবে নিয়োগ করেন এবং বীর খরকে সেনাপতি হিসেবে নিয়োগ করেন । রাম বনবাসের নামে ব্রাহ্মণ্য যজ্ঞ সংস্কৃতি ও শাসন ব্যবস্থা কায়েম করার জন্য দক্ষিণ প্রদেশগুলি আক্রমণ করে । বালক সাম্ব রামের সম্মুখীন হলে রাম তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে । মা স্বরুপনখা নিজের পুত্রের এমন নির্মম হত্যার কথা শুনে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে একাকী রামের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য হাজির হন । রাম তার পত্নী সীতার সামনেই স্বরুপনখাকে ধর্ষণ করে ।

তার শুধু নাক, কান নয় নিজের হাতেই রাম স্বরুপনখার স্তনও কেটে দেয় ।

কিন্তু তুলসীদাস বা কীর্তিবাস এই কাহিনিকে চেপে দিয়ে সম্পূর্ণভাবে তাঁদের মনগড়া কাহিনি আকারে পরিবেশন করেন ।


======================================================


উপনিষদগুলো বাগাড়ম্বর, হাস্যকর ও বিজ্ঞান-বিরোধী নানা তথ্যের জঞ্জাল । জগৎ ও জীবন সৃষ্টির এক আজগুবি তথ্য (বৃহদারণ্যক, ২/১/১০) দিয়ে বলা হয়েছে, 'আমি থেকে যেমন স্ফুলিঙ্গের উদ্ভব, তেমনই এই আত্মা থেকে উদ্ভব হয় প্রাণ, লোক দেব এবং বস্তুসমূহের । এই 'আমি' কে ? আত্মা ।'

আর এক জায়গায় (বৃহদারণ্যক, ১/৪/১-৪) সৃষ্টির বর্ণনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে, 'আত্মাই প্রথম পুরুষ । চতুর্দিকে দৃষ্টিপাত করে তিনি নিজেকে ব্যতীত দ্বিতীয় কাউকে দেখতে পেলেন না । তিনি উচ্চারণ করলেন 'সোহং' (আমিই একমাত্র) । অতঃপর তাঁর নাম হল 'অহং', যা আমরা নিজেদের নামোচ্চরণের আগে বোধ করি ।... তিনি আতঙ্কিত হলেন, আজও তাই নিঃসঙ্গ ব্যক্তিকে আতঙ্ক গ্রাস করে ।... তিনি দ্বিতীয় সত্তাকে কামনা করলেন ।... নিজ আত্মা ও শরীরকে দ্বিধাবিভক্ত করলেন, সৃষ্টি হল পতি ও পত্নী ...।'

আবার ছান্দোগ্যতে (ছান্দোগ্য উপনিষদ ৬/২/১-৪) সৃষ্টি বর্ণনায় আমরা পাচ্ছি, 'সৃষ্টি প্রথমে এক অদ্বিতীয় ভাবরূপেই ছিল, তিনি নিজেকে প্রকাশ করতে চাইলেন। তাই অগ্নি তথা তেজ উৎপন্ন করলেন । তেজ ইচ্ছা করলেন এবং জল সৃষ্টি হল...জল থেকে সৃষ্টি করলেন...অন্ন ।'

ছান্দোগ্যতে আমরা পরলোক তত্ত্বে 'পিতৃযান' ও 'দেবযান'-এর পরিচয় পেয়েছি । পিতৃযান তত্ত্বে দেওয়া আছে মৃতের আত্মা বা চেতনা মৃত্যুর পর কোথায় কোথায় কত দিন ধরে অবস্থান করে । তারপর চন্দ্রলোকে যায় । সেখান থেকে মেয়াদ শেষে আবার আত্মা ফিরে আসে । ফেরাটা এইরকম - চন্দ্রলোক, আকাশ, পিতৃলোক, দক্ষিণায়ন মাস, কৃষ্ণপক্ষ, রাত্রি, তারপর কায়াহীন এবং সবশেষে স্ত্রী-যোনিতে ।

দেবযান-এ যেতে পারলে আত্মাকে আর ফিরতে হয় না । দেবযানের যাত্রী আত্মাকে প্রথম যেতে হয় আলোর দেবতার কাছে । সেখান থেকে পর্যায়ক্রমে যেতে হয় দিনের দেবতা, শুল্কপক্ষের দেবতা, বর্ষার দেবতা, আদিত্য, চন্দ্র, বিদ্যুতের দেবতার কাছে । এখন থেকে আত্মাকে নিয়ে যাওয়া হয় ব্রহ্মার কাছে । এ-বার যাত্রা শেষ ।

পৃথিবীর বাইরে যেমন আকাশ আছে, শরীরের ভিতর তেমনই নাকি আকাশ আছে । আছে অগ্নি, বায়ু, চন্দ্র, সূর্য, পৃথিবী এবং জোতির্মন্ডল । এ সবই আছে শরীরের মধ্যে একটি ছোট কমলা রঙের ঘরে বা হৃদয়ে ।

হৃদয়াকাশে একত্রিত এই দ্যুলোক-ভূলোককে স্মরণের মধ্যেই তাই ব্রহ্ম উপাসনা করা যায় । হৃদয়কে বা মনকে ব্রহ্ম জেনেই উপাসনা করার উপদেশ রয়েছে ছান্দোগ্যতে ।

ঐতেরেয় উপনিষদ-এ আবার এসেছে সৃষ্টিতত্ত্ব । বলা হয়েছে, 'প্রথমে একমাত্র এই আত্মাই জীবিত ছিল । আত্মা মনে মনে ইচ্ছা করলেন লোকপাল সৃষ্টি করব । জল থেকে এক পুরুষকে তুলে তিনি তার দেহে কম্পন সৃষ্টি করে তাকে তপ্ত করলেন । তপ্ত করার পর তার মুখ বিকশিত হল । মুখ থেকে নির্গত হল বাণী, তা থেকে অগ্নি সৃষ্টি হল । নাসারন্ধ্র থেকে নির্গত হল নিঃশ্বাস, নিঃশ্বাস থেকে প্রাণ, প্রাণ থেকে বায়ু । চক্ষু থেকে সৃষ্টি হল দৃষ্টিশক্তি, তা থেকে সূর্য । কর্ণযুগল থেকে হল শ্রবণক্ষমতা, শ্রুতি থেকে দিশা । ত্বক থেকে রোম, রোম থেকে ওষধি বনস্পতি । হৃদপিন্ড স্ফুরিত হল, তা থেকে সৃষ্টি হল মন । মন থেকে চন্দ্র ।'  (ঐতেরেয় উপনিষদ, ১/১-৩) ।

আমরা উপনিষদ পড়ে জানলাম, প্রাণ সৃষ্টি রহস্য, যা বিবর্তনবাদের উল্টো দিকে চলেছে । আমরা জানলাম প্রাণ থেকেই সূর্য, চন্দ্র-র সৃষ্টি রহস্য । মন থাকে হৃদয়ে যা বিজ্ঞানের উল্টোপথের পথিক ।

আমরা জানলাম, বায়ু, অগ্নির সৃষ্টি রহস্য । তারপরও হিন্দু দার্শনিকরা কেন যে আজও নিজেদের যুক্তি বিচারকে নির্ভুল প্রমাণ করতে ভুলে ভরা উপনিষদের দোহাই পাড়েন, সেটাই রহস্য । আর একটা মজার কথা হল, উপনিষদ আবার নিজেদের জাহির করতে বেদের দোহাই পাড়ে ।

উপনিষদের প্রতিটি বিভাগই এই ধরণের বিজ্ঞান বিরোধী, অদ্ভুতুড়ে, অর্থহীন ভাষায় ঠাসা । একই সঙ্গে ঠাসা কুসংস্কারে ।


======================================================



বেদের যুগ ছিল উচ্চবর্ণদের সুবর্ণ সুযোগ । 'খাও-পিও-মৌজ করো' । কাজ করবে শূদ্র দাসেরা । উচ্চবর্ণের লোকেদের কাজ ছিল লাম্পট্য - মনুসংহিতা ও আর্য-সাহিত্যই তার প্রমান ।

বেদ ও মনুর অনুশাসনের প্রতি শূদ্রদের অনাগ্রহ, সন্দেহ, ক্ষোভ দেখে আর্য শাসক ও পুরোহিত গোষ্ঠী বিপদের গন্ধ পেলেন । ধোঁয়া থেকে আগুন সৃষ্টি হওয়ার আগেই ধোঁয়ায় উৎপত্তিতে জল ঢেলে দেওয়ার প্রয়োজন অনুভব করলেন ।

এমনই এক প্রয়োজনীয় মুহূর্তে উচ্চবর্ণদের এই সংকটে উদ্ধারকর্তার ভূমিকায় হাজির হলেন পাঞ্চালের রাজা জৈবলি ও ব্রাহ্মণ উদ্দালক আরুণি (গৌতম) । তাঁরা তৈরি করলেন ছান্দোগ্য উপনিষদ (৭০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে) । 'উপনিষদ' শব্দের অর্থ হল - 'গুরু কর্তৃক শিষ্যের নিকট বর্ণিত রহস্য' । ছান্দোগ্য উপনিষদে জৈবলি ও আরুণি নিয়ে এলেন এক নতুন মতবাদ, 'জন্মান্তরবাদ' । পৃথিবীর একমাত্র ধর্ম হিসেবে সনাতন হিন্দু উপাসনা ধর্মে যুক্ত হল 'জন্মান্তর' বিশ্বাস । উপনিষদের এই 'জন্মান্তরবাদ' ও কর্মফল ভারতবর্ষের দাস শ্রমিকদের মাথায় 'সার্থকভাবে' ঢোকানো গিয়েছিল । এই দেশের জনসমষ্টির বেশিরভাগই ছিলেন দাস । সংখ্যাধিক্যের এই সুবিধে থাকা সত্ত্বেও দাসেরা বিদ্রোহ করেননি । কারণ, আগামী জন্মে আবার দাস হতে চাননি । পৃথিবীর অন্যান্য দেশে দাস-বিদ্রোহের আগুন জ্বলতে দেখেছি । কিন্তু আমাদের দেশে জ্বলতে দেখিনি । এই 'মহান' দেশে দাস-বিদ্রোহের আগুন জ্বলতে দেয়নি জন্মান্তরবাদের জলকামান ।

শুধু কি তাই ? উপনিষদ মৃত্যুর পর মানুষকে স্বর্গসুখের ভয়ংকর মিথ্যে প্রলোভন দেখিয়ে অত্যাচারিত, শোষিত মানুষদের প্রতারিত করেছে ।

বেদ তৈরি করেছিল স্থূল কুসংস্কার । উপনিষদ তৈরি করেছিল সূক্ষ্ম কুসংস্কার, যা বেদের কুসংস্কারের চেয়েও বহুগুন
শক্তিশালী । এই আপাত নিরীহ সূক্ষ্ম কুসংস্কারই আজও দুঃখপীড়িত মানুষদের ক্ষোভে জল ঢেলে চলেছে ।


======================================================


বেদে কিন্তু ব্রহ্মাকে পরম ব্রহ্ম বলা হয়েছে । কিন্তু বেদান্ততে শ্রীকৃষ্ণকে পরম ব্রহ্ম বলা হচ্ছে । অর্থাৎ পরম ব্রহ্মের পদ পরিবর্তন হয়েছে । এই পরিবর্তন কেন ? কারণ বেদান্তের রচয়িতা ছিলেন বৈষ্ণব । বৈষ্ণবদের আরাধ্য দেবতা ছিলেন শ্ৰীকৃষ্ণ । তাই ব্রহ্মাকে হঠিয়ে শ্রীকৃষ্ণকে প্রতিষ্ঠা করে ছিল তাঁদের মুখ্য উদ্দেশ্য ।


======================================================


বেদান্ততে রয়েছে অধার্মিকগণ মৃত্যুর পর নরকে গিয়ে দুঃখ, যন্ত্রনা ভোগ করে ফিরে আসে । বেদান্তে বলা হয়েছে রৌরবাদি সাতটি নরকের কথা । আবার পৌরাণিক অভিধান অনুযায়ী নরক আঠাশটি । ...

... আবার অপরদিকে গীতায় এটাও বলা হয়েছে আত্মাকে কাটা যায় না, পোড়ানো যায় না, আত্মা যন্ত্রনা ভোগ করে না । এর মধ্যে কোনটা ঠিক আপনারাই বলুন ।


======================================================


মানব সভ্যতা সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর এই তিন যুগে মোট ৩৮ লক্ষ ৮৮ হাজার বছর অতিক্রম করে এসেছে এমনটা যাঁরা ভাবেন,তাঁদের 'বোকা' বললে বোকাদের-ই অসম্মান করা হবে ।


======================================================


সত্যযুগে হিরণ্যাক্ষ দানব সমুদ্রের নীচে পৃথিবীকে নিয়ে গেলে বিষ্ণু পৃথিবীকে উদ্ধারের জন্য বরাহ বা শূকর রূপ ধারণ করেন । বরাহ রূপ ধারণ করে দীর্ঘ একহাজার বছর ধরে যুদ্ধ করেন ওই দানবের সঙ্গে । এবং অবশেষে হত্যা করেন । এরপর পৃথিবীকে আবার ওপরে উঠিয়ে নিয়ে আসেন ।

তাহলে বরাহপুরাণ থেকে জানা গেল পৃথিবীকে তার মধ্যেই অবস্থিত সমুদ্রের মধ্যে নিয়ে যাওয়া যায় । অথবা এটাও হতে পারে মহাকাশের বাইরে পৃথিবীর নীচে সমুদ্রে ভাসমান অবস্থায় রয়েছে । RSS-এর কোনও ধর্মবেত্তা কিন্তু মহাকাশ বিজ্ঞানীদের এই তথ্যটি দিতে পারেন । তবে মহাকাশ গবেষণার ক্ষেত্রে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে যেতে পারে । হাজার হোক বিষ্ণুর কীর্তি বলে কথা । স্বয়ং প্রণম্য কৃষ্ণ বেদব্যাস হয়ে নিজের এই অবতারত্বের কথা রচনা করেছেন । বিষ্ণুর এই কাহিনি কি মিথ্যে হতে পারে ! তিনি অবতার হয়ে কি এই আষাঢ়ে গল্প ফাঁদতে পারেন !


======================================================


বিষ্ণুর নবম অবতার হিসেবে বুদ্ধ অবতার রূপে জন্মগ্রহণ করেছিলেন । বুদ্ধ ছিলেন নিরীশ্বরবাদী । যে বুদ্ধ নিরীশ্বরবাদী, কার্যকারণ সম্পর্কে বিশ্বাসী - সেই বুদ্ধকে দেবতা বানানোর জন্য বুদ্ধ অবতার কাহিনি লেখা হয়েছিল । বুদ্ধকে ঘিরে কাহিনি ও তথাকথিত ইতিহাসে অলৌকিক ঘটনার ছড়াছড়ি । পালি ভাষায় বৌদ্ধ ধর্ম নিয়ে প্রথম লেখা হয় তাও বুদ্ধের মৃত্যুর কয়েকশো বছর পরে । তখন আদি বৌদ্ধ ধর্মের রূপান্তর ও বিভাজন চলছে । পালি বৌদ্ধশাস্ত্রে আমরা পেলাম পল্লবিত, অলৌকিকে ভরা বৌদ্ধকে ।

বুদ্ধের উপদেশাবলি বুঝতে হলে বুদ্ধের মূল চার সিদ্ধান্ত জানাটা খুবই জরুরি । সিদ্ধান্তগুলো হল (এক) ঈশ্বরের অস্তিত্ব স্বীকার না করা, (দুই) আত্মাকে 'নিত্য' স্বীকার না করা, (তিন) কোনও গ্রন্থকে স্বতঃপ্রমাণ হিসেবে স্বীকার না করা ।

এবার বলুন এই নিরীশ্বরবাদী বুদ্ধ কীভাবে বিষ্ণুর অবতার হন ?


======================================================


পুরাণ অনুযায়ী সত্যযুগে কোনও পাপকাজ বলে কিছু ছিল না । সবাই পুণ্যবান ছিলেন । অর্থাৎ মানুষের ওপর কোনও অত্যাচার হত না ।

কিন্তু এ-যুগেই বিষ্ণু কূর্ম ও নৃসিংহ অবতার রূপে অত্যাচারী হিরণাক্ষ দানব ও হিরণ্যকশিপুর অত্যাচার থেকে পৃথিবীকে বাঁচাতে আবির্ভূত হয়েছিলেন । এ তো চরম স্ববিরোধিতা । সত্যযুগে যদি সবাই পুণ্যবান হন, তাহলে পাপী হিরণাক্ষ দানব এবং হিরণ্যকশিপু কীভাবে জন্মগ্রহণ করেন ? পুরাণের কাহিনি অনুযায়ী তো এই পাপীদের সত্যযুগের পরের যুগগুলোতে জন্মগ্রহণ করার কথা, যেখানে পাপ ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করছিল ।

আসলে এই স্ববিরোধিতা থাকাটা স্বাভাবিক । কারণ মানুষ মাত্রেই ভুল হয় । পুরাণ রচয়িতারাও ভুল করেছিলেন ।


======================================================


Friday, 10 March 2017

জীবনানন্দ দাশ.

জীবন গিয়েছে চলে আমাদের কুড়ি-কুড়ি বছরের পার---
তখন আবার যদি দেখা হয় তোমার-আমার !

==========================

আমার এ-গান
কোনদিন শুনিবে না তুমি এসে,--
আজ রাত্রে আমার আহবান
ভেসে যাবে পথের বাতাসে,--
তবুও হৃদয়ে গান আসে !
ডাকিবার ভাষা
তবুও ভুলি না আমি,--
তবু ভালোবাসা
জেগে থাকে প্রাণে !
পৃথিবীর কানে
নক্ষত্রের কানে
তবু গাই গান !
কোনোদিন শুনিবে না তুমি তাহা,--জানি আমি--
আজ রাত্রে আমার আহবান
ভেসে যাবে পথের বাতাসে,--
তবুও হৃদয়ে গান আসে !


==========================

আমারে সে ভালোবাসিয়াছে,
আসিয়াছে কাছে,
উপেক্ষা সে করেছে আমারে,
ঘৃণা করে চলে গেছে - যখন ডেকেছি বারেবারে
ভালোবেসে তারে;
তবুও সাধনা ছিল একদিন, - এই ভালোবাসা;
আমি তার উপেক্ষার ভাষা
আমি তার ঘৃণার আক্রোশ
অবহেলা করে গেছি; যে নক্ষত্র - নক্ষত্রের দোষ
আমার প্রেমের পথে বারবার দিয়ে গেছে বাধা
আমি তা ভুলিয়া গেছি;
তবু এই ভালোবাসা -- ধুলো আর কাদা -- ।


==========================


Thursday, 9 March 2017

জ্যোতি বসু বিধায়ক থেকে মুখ্যমন্ত্রী


১৯৭৮ সালে বামফ্রন্ট জামানায় প্রথম পঞ্চায়েত নির্বাচনের মুখে প্রমোদ দাশগুপ্ত একবার বলেছিলেন, "গ্রাম পঞ্চায়েত হল এমনই একটা ধারালো অস্ত্র, যা দিয়ে শত্রুপক্ষকে কাটতে কাটতে এগনো যাবে । আর যদি ঠিকমতো ওই অস্ত্র ব্যবহার করা না-যায়, তাহলে নিজেদেরই জখম হতে হবে ।"

Sunday, 5 February 2017

লেনিন

'' কমিউনিস্টরা যখন ক্ষমতায় থাকে না পার্টি অফিসের দরজা তখন খোলা রেখো,মানুষ বাঁচার জন্য আসবে । আর কমিউনিস্টরা যখন ক্ষমতায় থাকবে পার্টি অফিসের দরজা তখন বন্ধ রেখো, বেনোজল যেনো ঢুকে না যায় । ''
- ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভ ( লেনিন )