Tuesday, 28 March 2017

যুক্তিবাদীর চোখে গীতা, রামায়ণ, মহাভারত ইত্যাদি - প্রবীর ঘোষ

গীতা পড়লে আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় যে, যুদ্ধে বিমুখ অর্জুনকে যুদ্ধে পাঠাবার জন্যই গীতা লেখা হয়েছিল ।

আসুন যুক্তির আলোকে বিচার করি । কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে এমন সময় অর্জুন বেঁকে বসলেন । যুদ্ধে যাবেন না । দীর্ঘ সময় ধরে কৃষ্ণ শুরু করলেন জ্ঞান দেওয়া যুদ্ধের field-এ থেকেই ।

ভগবদগীতার এগারো পরিচ্ছেদে বিশ্বরূপ দর্শনের পরে কৃষ্ণকে অর্জুন 'my father' বলে মেনে নিলেন । এবং আঠারো পরিচ্ছেদে কৃষ্ণের দাসত্ব মেনে নিয়ে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হলেন । কিন্তু ভগবদগীতায় কৃষ্ণের বাণী শেষ হয়ে যাওয়ার পরে যুদ্ধের নবম দিনে অর্জুন আবার বেঁকে বসলেন, যুদ্ধে যাবেন না ।

এটা কেমন হল ! যে অর্জুন আগেই কৃষ্ণের মুখে বিশ্বরূপ দর্শন করে মোহভঙ্গ হয়ে যুদ্ধ করার জন্য চাঙ্গা হয়ে উঠলেন, সেই আবার পরে বলছেন যুদ্ধ করার কী প্রয়োজন ! দ্রষ্টব্য যে কৃষ্ণ একবারও তখন গীতার কথা না বলে অর্জুনের প্রতিজ্ঞা ও ক্ষত্রিয়ধর্মের কথাই বললেন । অর্জুনও পূর্বপ্রতিজ্ঞা ও ক্ষত্রিয়ধর্মের কারণেই আবার যুদ্ধে গেলেন ।

সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে গীতা মহাভারতে বিশেষ কারণে সংযোজিত হয়েছিল । গীতার মধ্য দিয়ে ব্রাহ্মণ্যধর্মের মূলনীতিকে ঈশ্বরের মুখ দিয়ে প্রচার করাই ছিল মুখ্য উদ্দেশ্য । ব্রাহ্মণ্যধর্মকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য রাজশক্তি প্রভূত সাহায্য করেছিল ।

প্রাক আর্যরা এবং বৌদ্ধ ও জৈনরা আত্মা, জন্মান্তরবাদ, যজ্ঞকর্ম ইত্যাদিতে বিশ্বাস করত না । তাই সে'সময়কার জনগোষ্ঠীর মধ্যে মধ্যে আত্মা চিরন্তন এই ভাবনাকে গেঁথে দিতে গীতার রচনা । কারণ আত্মার অস্তিত্ব না থাকলে ব্রাহ্মণ্যধর্মের অস্তিত্বই ধ্বংস হয়ে যায় । আত্মা নশ্বর হলে পুনর্জন্ম থাকে না । এই এতগুলো না থাকার কারণ ঈশ্বর পুজো এবং দ্বিজ ভক্তিই তো বাতিল হয়ে যায় । তাই দ্বিজ অর্থাৎ ব্রাহ্মণরা নিজেদের অস্তিত্ব সংকট থেকে বাঁচতে গীতার পক্ষে ধুন ধরেছিল ।


======================================================


আঠারো পরিচ্ছেদে মোক্ষযোগে (ভগবদ্ গীতা, ১৮/৬৬) বলা হয়েছে --
"সর্বধর্মান্‌ পরিত্যাজ্য মামেকং শরণং ব্রজ ।
অহং ত্বাং সর্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ ।।"

সব ধর্ম ছেড়ে আমাকেই গ্রহণ করো । শোক কোরো না, আমি তোমাকে সব পাপ থেকে মুক্ত করব ।

এই শ্লোকের মাধ্যমে সব ধর্ম ছেড়ে আর্যদের ঈশ্বরকে বা তাদের ধর্মমতকে গ্রহণ করার জন্য ডাক দেওয়া হয়েছে । পাপ থেকে মুক্ত করার লোভও দেখানো হয়েছে । কৃষ্ণের তত্ত্বকে প্রচার করা হয়েছে অন্যান্য ধর্মকে সরাসরি আক্রমণ করে ।

আর্যদের ধর্মকে গ্রহণ না করলে প্রাক আর্যদের চরম ক্ষতি হবে সেই হুমকিও দেওয়া হয়েছে । যেসব লোক ব্রাহ্মণ্যধর্ম গ্রহণ করে না, তাদেরকে কৃষ্ণ অর্থাৎ গীতা রচয়িতারা 'দুষ্কর্মকারী, মূঢ়, নরাধম ও অসুর' বলে চিহ্নিত করেছে (ভগবদ্ গীতা, ৭/১৫)।

গীতায় (ভগবদ্ গীতা ৯/১১) বলা হয়েছে, যে শ্রী ভগবান অর্থাৎ ব্রাহ্মণ্যধর্মকে অস্বীকার করে, তারা অসুর ও রাক্ষসযোনি প্রাপ্ত হয় ।

অসুর বা রাক্ষস বলতে প্রাক আর্য বা ভূমিপুত্রদেরই বলা হয় । এবং আরও অশ্লীলভাবে ষোলো পরিচ্ছেদে (ভগবদ্ গীতা ১৬/১৮-২০) বলা হয়েছে, যারা শ্রীভগবানকে মানে না তাদের অশুভ অসুর যোনিতে আবার ঢুকিয়ে দেওয়া হবে । অর্থাৎ প্রাক আর্যরা যে যোনি থেকে জন্মেছে সেখানে ঢুকিয়ে দেওয়া হবে । এ তো দেখছি পাড়ার কাঁচা খিস্তিবান মস্তানদের কথা ।

এমন জঘন্য ভাষা গীতিকারেরা গীতার অনেক জায়গাতেই লিখেছেন ।

গীতায় জ্ঞানযোগের চতুর্থ অধ্যায়ে (ভগবদ্ গীতা ৪/৭-৮) বলা হয়েছে -

"যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত।
অভ্যুত্থানম অধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম্॥
পরিত্রাণায় হি সাধুনাং বিনাশয় চ দুষ্কৃতাম।
ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে॥"

ধর্মের যখন অস্তিত্বের সংকট আসে এবং অধর্ম প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন আমি নিজেকে সৃষ্টি করি । দুষ্কৃতীদের মেরে সাধুদের বাঁচিয়ে আবার ধর্ম প্রতিষ্ঠিত করার উদ্দেশ্যে আমি যুগে যুগে সৃষ্টি হই ।

এই শ্লোকটি প্রচুর জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে । সাধারণভাবে এই শ্লোকটি পড়লে মনে হয় যেন কৃষ্ণ ভালো লোকদের বাঁচাতে যুগে যুগে আবির্ভূত হন এবং ধর্ম প্রতিষ্ঠিত করেন । আবার অনেকে মহাভারতের সঙ্গে একে মিলিয়ে মনে করেন - মহাভারতে অধার্মিক কৌরবদের মেরে ধার্মিক পাণ্ডবদের বাঁচানোর উদ্দেশ্যে ঈশ্বরের অবতার কৃষ্ণের আবির্ভাব ।

এবার বিশ্লেষণে আসা যাক । কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে কৌরবপক্ষকে ধরা হয় অধার্মিক এবং পাণ্ডবদের ধার্মিক । কিন্তু মহাভারতে দেখা যায় অধার্মিক কৌরবপক্ষের অনেকেই বেঁচে গেছেন যথা ধৃতরাষ্ট্র, যুযুৎসু, বিদুর ও সঞ্জয় । এবং পাণ্ডবদের সকলেই যে বেঁচে ছিলেন তা নয় । পঞ্চপান্ডব এবং যাদব যোদ্ধারা ছাড়া আর সবাই মারা গিয়েছিলেন । এমনকী, কৃষ্ণের বংশের অনেকেই মদ্যপান জিরে মাতাল হয়ে মারামারি করে মারা গেলেন । শেষপর্যন্ত অধার্মিক কৌরবপক্ষের সবাই মারা গিয়ে স্বর্গে পর্যন্ত গেল । কৌরবরা যদি অধার্মিক হয় তাহলে অধার্মিকদের বিনাশ হল কোথায় ? জতুগৃহে নিম্নবর্ণের (নিষাদ) পাঁচজন পুরুষ ও একজন রমণীকে আশ্রয় দিয়ে পুড়িয়ে মেরেছিলেন এই পঞ্চপান্ডব । তাহলে পঞ্চপান্ডবরাও কি ঘোর অধার্মিক নন ? স্বয়ং কৃষ্ণ ও পঞ্চপান্ডবরা ছলচাতুরি, অন্যায়ের আশ্রয় নিয়ে যুদ্ধে জিতেছিলেন । এ হল যে আইন রক্ষাকারী, সেই চোর ।

সুতরাং অধার্মিক-ধার্মিক তত্ত্ব বিশ্লেষণ করে বোঝা যাচ্ছে যে, গীতার এই শ্লোকটি মোটেও মহাভারতের সাথে খাপ খায় না ।

সুতরাং আর্যসভ্যতা ও ব্রাহ্মণ্যধর্ম বিরোধী সবাইকে হত্যা করে ব্রাহ্মণ্যধর্মের পুনঃপ্রতিষ্ঠাই ছিল গীতার ধর্মসংস্থাপনের মূল কথা । উল্লেখ্য, নবম শতাব্দীতে প্রথম গীতা ভাষ্যকার শংকরাচার্য রাজশক্তির সাহায্যে প্রচুর বৌদ্ধ হত্যা করেছিলেন । রাষ্ট্রশক্তির পৃষ্ঠপোষকতায় ব্রাহ্মণ্যধর্ম রাজধর্ম রূপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ।


======================================================


বৈদিক যুগ থেকেই প্রচলিত ছিল চতুর্বর্ণ প্রথা অর্থাৎ জাতপাতের ভেদাভেদ । বলা হলো ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়দের সমাজের সব থেকে উঁচুতে অবস্থান এবং তারপর বৈশ্যদের অবস্থান । সমাজের সব থেকে নিচে শূদ্ররা অবস্থিত । উচ্চ তিন বর্ণের সেবা করাই হল শূদ্রদের একমাত্র কাজ । প্রাক আর্য এবং নিরীশ্বরবাদীরা সংখ্যায় বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে এই চতুর্বর্ণ প্রথা লুপ্ত হতে থাকে । এইজন্য গীতার মাধ্যমে কৃষ্ণের মুখ দিয়ে চতুর্বর্ণ প্রতিষ্ঠা করা হল ।

চতুর্থ অধ্যায়ের জ্ঞানযোগে (ভগবদগীতা, ৪/১৩) বলা হল -

"“চাতুর্বর্ণ্যং ময়া সৃষ্টং গুণকর্মবিভাগশঃ।
 তস্য কর্তারমপি মাং বিদ্ধ্যকর্তারমব্যয়ম।"

আমি গুন্ অনুযায়ী কর্মের বিভাগ অনুসারে চতুর্বর্ণ সৃষ্টি করেছি । আমাকে এর কর্তা এবং অব্যয় অকর্তা রূপে জানবে ।

ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় = কায়স্থ, বৈশ্য = ব্যবসায়ী, শূদ্র = বাদবাকি যারা আছে । গীতায় বলা হয়েছে এই চারবর্ণের সৃষ্টিকর্তা স্বয়ং কৃষ্ণ । আবার মনুসংহিতায় এই চারবর্ণের সৃষ্টিকর্তা মনুকেই বলা হয়েছে । এবার আপনারাই বিচার করুন কার সৃষ্টি তত্ত্ব গ্রহণ করবেন । কারণ দু'জনের মধ্যে একজন অসত্য ভাষণ করেছেন ।


======================================================


চোদ্দ অধ্যায়ে (ভগবদগীতা, ১৪/১৮) কৃষ্ণ বলেছেন -
"ঊর্ধ্বং গচ্ছন্তি সত্ত্বস্থা মধ্যে তিষ্ঠন্তি রাজসাঃ।
জঘন্যগুণবৃত্তিস্থা অধো গচ্ছন্তি তামসাঃ ।।"

সত্ত্বগুণের অধিকারীরা ঊর্ধ্বে যায়, রজ বা রাজকীয় গুণসম্পন্নরা মধ্যে অবস্থান করে, আর তম বা অন্ধকার গুণসম্পন্ন লোকেরা জঘন্য বৃত্তিতে নিযুক্ত হয়ে অধোগামী হয় ।

গীতায় (ভগবদগীতা, ১৮/৪০), সত্ত্ব, রজ এবং তম গুনকে স্বভাবজাত বলা হয়েছে ।

গীতায় আঠারো অধ্যায়ে বলা হয়েছে (ভগবদগীতা, ১৮/৪১-৪৮) - "ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য এবং শূদ্রদের সহজাত গুণাবলি দ্বারাই তাদের কর্ম ভাগ করা হয়েছে ।"

এখানে বলে রাখি সহজাত গুণাবলি বলে কিছুই হয় না । যা হয় তা হল সহজাত প্রবৃত্তি । মানুষ যে জলপান করে সেটা দেখেই শিখেছে । মানুষ যে কথা বলে, হাঁটে সেটাও দেখেই শেখা । একটু একটু করে উত্তরণ হয়েছে ।


======================================================


গীতায় বর্ণিত চতুর্বর্ণ বিভাজন কোনওরকম ভাবেই সহজাত প্রবৃত্তি নয় ।

গীতায় (ভগবদগীতা, ২/৪৭-৪৮) বলা হল - শুধু কাজেই তোমার অধিকার আছে, ফলে নয় । ফললাভের আশা না করে শুধু কাজ করে যাও ।

মুখ বুজে সব অত্যাচার সহ্য করে শুধু উচ্চবর্ণের সেবার মধ্যেই শূদ্রদের কাজের সীমা বেঁধে দেওয়া হল । শূদ্রেরা যাতে উচ্চ তিন বর্ণের সেবার মধ্যেই নিযুক্ত থাকে, উচ্চ পেশায় আগ্রহ প্রকাশ না করে । সাবধান করে গীতার তৃতীয় অধ্যায়ে কর্মযোগে বলা হল - পরধর্মের চেয়ে গুণহীন নিজের ধর্মই শ্রেষ্ঠ । স্বধর্মে মৃত্যুও ভালো, কিন্তু পরধর্ম ভয়াবহ ।

এই একই শ্লোক আবার মনুসংহিতাতেও (১০:৯৭) পাওয়া যায় । অর্থাৎ শূদ্ররা যেন এই দাসবৃত্তি, সেবার মধ্যে নিজেকে জড়িয়ে রাখে । অত্যাচারের ফলে যদি তার মৃত্যুও হয় তাহলেও তা ভালো । কারণ সে সেবা করতে করতেই মারা গেছে । শূদ্রদের ছিন্ন ও মলিন বস্ত্র দেওয়া হত পোশাক হিসেবে । তাদের খাদ্য ছিল উচ্চবর্ণের উচ্ছিষ্ট খাদ্যবশেষ ।

ভগবদগীতা নিয়ে যাঁরা গদগদ, তাঁরা উপনিষদ ও গীতা পড়লে দ্বিধাহীনভাবে বুঝতে পারবেন, কৃষ্ণ অর্জুনের জন্য উপনিষদরূপী গাভী থেকে গীতামৃত দোহন করেছিলেন ।

বৈদিক যুগে বেদ পাঠ করা তো দূরের কথা, শোনাও ছিল শূদ্রদের পক্ষে ভয়ংকর রকমের অপরাধ । পরবর্তীকালে বেদ ও উপনিষদের কিছু কথা উচ্চবর্ণের স্বার্থে শূদ্রদের মাথায় ঢোকাবার প্রয়োজনেই তৈরি করা হল 'গীতা' । এই গীতা পাঠ করা বা পাঠ শোনা শূদ্রদের পক্ষে পুণ্যকর্মের পরিবর্তে অপরাধ বলে ঘোষিত হল ।


======================================================


গীতায় যোগের শ্রেষ্ঠত্বের কথা বলা হয়েছে । এখানে বলে রাখা দরকার যোগ এবং যোগব্যায়াম (free hand exercise) আলাদা । পতঞ্জলির যোগশাস্ত্রে রয়েছে হটযোগবলে উড়ে যাওয়ার কথা । রয়েছে রাজযোগের দ্বারা ইচ্ছেমতো আকাশে উড়ে যাওয়ার কথা, অদৃশ্য হওয়ার কথা, এমনকী অলৌকিক শক্তি লাভ করার কথা । খেচরীমুদ্রার সাহায্যে মৃত্যুকে জয় করা যায় অর্থাৎ অমর হওয়া যায় । এগুলো প্রত্যেকটাই অসম্ভব ।


======================================================


'ব্রাহ্মণ' শব্দটির উৎপত্তি ব্রহ্মতত্ত্ব থেকে । যে ব্যক্তি ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করেছেন, তিনি-ই 'ব্রাহ্মণ' । 'ব্রাহ্মণ্যবাদ' শব্দটি নবীন । চতুর্বর্ণ প্রথা ও ব্রাহ্মণদের তৈরি নানা শাস্ত্র অর্থাৎ অনুশাসন বা বিধি বিষয়ক মতবাদ-ই হল 'ব্রাহ্মণ্যবাদ'।


======================================================


বৈদিক-ধর্মের প্রধান বৈশিষ্ট্য যজ্ঞ । ব্রাহ্মণগ্রন্থগুলো যজ্ঞকেই সর্বশক্তির আধার বলে বর্ণনা করেছে । সমস্ত সৃষ্টিকে যজ্ঞক্রিয়ার ফল বলা হয়েছে । 

বেদগুলোকে দুটি ভাগে ভাগ করতে পারি আমরা । (১) মন্ত্র (২) ব্রাহ্মণ । 'মন্ত্র' হল দেবতার গুনকীর্তন ও প্রার্থনা ।

'ব্রাহ্মণ' হল যাগ-যজ্ঞের প্রণালী । ব্রাহ্মণের বক্তব্য অনুসারে ঋকবেদের দেবতারা যজ্ঞের ক্রিয়াকলাপের দ্বারা পরিচালিত হতে বাধ্য । অর্থাৎ যে জন্য যজ্ঞ করা, সে ফল পাওয়া যাবেই । ফলদানের বা ফল আটকে দেবার ক্ষমতা দেবতাদের নেই ।

এরপর যে প্রশ্ন উঠে আসা স্বাভাবিক - তাহলে মন্ত্র বা প্রার্থনার মূল্য কি রইল ? বেদেরই অংশ 'ব্রাহ্মণ' বলছে - বেদভক্তি, মন্ত্র ও প্রার্থনার কোনও মূল্য নেই । তবে যজ্ঞে ফল লাভ অনিবার্য ।

এটা আপাতভাবে বেদের স্ববিরোধ মনে হতেই পারে । কিন্তু এই স্ববিরোধ তৈরি করা । বেদ লেখক জাদু-পুরোহিতদেরই তৈরি করা । স্বার্থবুদ্ধি থেকেই তারা এমনটা করেছে । তারা চেয়েছে সুনিশ্চিত ফল পেতে যজমানরা দেবতার চেয়ে তাদের উপর নির্ভর করুক বেশি ।   


======================================================


বৃহদারণ্যক উপনিষদেও বলা হয়েছে - নারীর নিম্নদেশ যজ্ঞবেদি, যৌনকেশ যজ্ঞতৃণ, ত্বক সোমরস-পোষণের ভূমি এবং অন্ডকোষ দুটি অগ্নি । এই বিশ্বাস নিয়ে যে সঙ্গমে প্রবৃত্ত হয়, সে বাজপেয় যজ্ঞের ফললাভ করে ।

এখানে দেখছি যজ্ঞ না করেই শুধু মৈথুনেই যজ্ঞের ফল লাভের ঘোষণা করা হয়েছে । এখানে আরও বলা হয়েছে, কোনও নারী যৌনমিলন প্রত্যাখ্যান করলে তাকে জোর করে বাধ্য করা উচিত (বৃহদারণ্যক, ৬, ৪, ৬, ৭)। হিন্দুত্ববাদীরা কি হিন্দুধর্মের এই ধর্ষণ সমর্থনের কথা জানেন ?


======================================================


বৈদিক যুগ থেকে সমাজে নারীর অবস্থান ছিল সবথেকে নীচে । বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে নারীকে দুশ্চরিত্রা, অপবিত্রা আখ্যা দেওয়া হয়েছে । গীতাতেও গীতাকারের দ্বারা কৃষ্ণের মুখ দিয়ে নারীজাতির হীনত্ব প্রকাশিত হয়েছে ।

নারীদের 'পাপযোনি' সম্বোধন করে বলা হয়েছে (ভগবদগীতা, ৯/৩২-৩৩) -

'মাং হি পার্থ ব্যাপাশ্রিত্য য়েঽপি স্যুঃ পাপয়োনয়ঃ ।
স্ত্রিয়ো বৈশ্যাস্তথাশূদ্রাস্তেঽপি য়ান্তি পরাং গতিম্ ॥
কিং পুনর্ব্রাহ্মণাঃ পুণ্যা ভক্তা রাজর্ষয়স্তথা ।
অনিত্যমসুখং লোকমিমং প্রাপ্য ভজস্য মাম্ ॥'

অর্থাৎ আমাকে আশ্রয় করে স্ত্রী, বৈশ্য, শূদ্র এসব পাপযোনিরা পরমগতি লাভ করে থাকে । ব্রাহ্মণ ও রাজর্ষিদের মতো পুণ্যবান ভক্তদের আর কথা কি ? অনিত্য এবং সুখহীন ইহলোকে জন্মেছো, আমাকে ভজনা করো ।

এবং গীতায় (ভগবদগীতা, ১/৪১) অর্জুনের মুখ দিয়ে বলানো হল -

"অধর্মাভিভবাৎ কৃষ্ণ প্রদুষ্যন্তি কুলস্ত্রিয়ঃ ।
স্ত্রীষু দুষ্টাসু বার্ষ্ণেয় জায়তে বর্ণসঙ্কর ।।"

কৃষ্ণ অধর্মের আবির্ভব হলে কুলস্ত্রীরা দূষিত হয় । এবং স্ত্রীরা দুষ্টা হলে বর্ণসংকরের সৃষ্টি হয় ।

বর্ণসংকরের পরিনাম সম্বন্ধে বলে হয়েছে (ভগবদগীতা, ১/৪২-৪৪) - বর্ণসংকর হলে পিতৃপুরুষদের পিন্ড এবং জল দেওয়ার কেউ থাকে না । তাই তারা চিরকাল নরকে বাস করে ।

পিতৃপুরুষ মানে বাবা, ঠাকুরদা, তাঁর বাবা, তাঁর বাবা, তাঁর বাবা, এরকম করে অনন্ত বাবাদেরকে বোঝায় । তারা নরক বাস করবে এ কথা বলেছে গীতা । কিন্তু কি মুশকিল ! আত্মাকে তো কাটা যায় না, পোড়ানো যায় না । তাহলে আত্মাকে আবার কি করে নরকযন্ত্রণা দেবে ! একথা যাঁরা লিখেছেন তাঁদের জ্ঞান-গম্যির বড়ই অভাব দেখছি ।

এবং ওই শ্লোকেই আরও লেখা আছে যে কুলধর্ম বর্ণসংকরের ফলে নষ্ট হয়ে যায় । ...

... এ সবই আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বুঝিয়ে দেয় বৈদিক সমাজের দুটি বৈশিষ্ট্যকে । এক : যৌন-শক্তিধর হওয়াটা প্রধান একটি গুণ হিসেবে গণ্য হত । বিশিষ্ট প্রত্নতত্ত্ববিদ ও নৃতত্ত্ববিধ ডঃ অতুল সুরের কথায়, 'মৈথুন ধর্মটাই সেকালের সনাতন ধর্ম ছিল" । (দেবলোকের যৌনজীবন, ডঃ অতুল সুর, প্রথম সংস্করণ পৃষ্ঠা ৬২) দুই : বৈদিক যাদুপুরোহিতরা প্রাকবৈদিক যুগের মাতৃপ্রাধান্যের শিকড় সমাজ থেকে উপড়ে ফেলতে চেয়েছিলেন । চেয়েছিলেন পুরুষতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে । মেয়েদের মৈথুন-যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন । তাই ব্রহ্মার বাণী বলে প্রচার করা হয়েছে - নারীরা পুরুষদের মৈথুনের জন্যই সৃষ্ট । তোমরা মৈথুন কর্ম চালিয়ে যাও । প্রজা উৎপাদন কর । তাতেই আমি তুষ্ট ।


======================================================


হিন্দু ধর্মীয় বিধানে নারী জন্ম পরাধীন, চির-পরাধীন । মনুর বিধানে (৯:৩) আছে ।
'পিতা রক্ষতি কৌমারে ভর্ত্তা রক্ষতি যৌবনে
রক্ষতি স্থবিরে পুত্রা ন স্ত্রী স্বাতন্ত্র্যমর্হতি॥'

অর্থাৎ নারীকে :
পিতা রক্ষা করবে কুমারীকালে, স্বামী রক্ষা করবে যৌবনে ।
বার্ধক্যে রক্ষা করবে পুত্ররা, স্ত্রী স্বাধীনতার যোগ্য নয় ।

মনুর বিধানে মানুষ বিভক্ত হয়েছিল সরাসরি দুটি ভাগে - 'পুরুষ' ও 'নারী' । পুরুষকে প্রভুর ভূমিকায় এবং নারীকে ক্রীতদাসীর চেয়েও অধম, ধর্ষিতার চেয়েও অত্যাচারিতা এবং গৃহপালিত পশুর চেয়েও হীন ভূমিকায় নামিয়ে এনেছিল মনুর আইন অর্থাৎ হিন্দু ধর্মীয় আইন ।

মনুর পদাঙ্ক অনুসরণ করে হিন্দু ধর্মগ্রন্থগুলো একইভাবে নারীকে চূড়ান্তভাবে শোষণ করতে নানা উপদেশ প্রয়োগ করেছে । নানা নীতিকথার নামে দুর্নীতি ছড়াতে চেয়েছে ।

মনুসংহিতার সময়কালে মেয়েদেরকে শুধুমাত্র সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র হিসেবেই দেখা হত । মনুও সেই একই মত পোষণ করেছেন । বিয়েই হল নারীর প্রকৃত সার্থকতা এবং মাতৃত্বেই তার চরিতার্থতা । গর্ভধরণের জন্য স্ত্রীলোক এবং গর্ভধানের জন্যই পুরুষের সৃষ্টি (৯:৯৬) ।

মনুসংহিতায় (২:২১৩) লেখা আছে -
'স্বভাব এষ নারীণাং নরাণামিহ দূষণম ।'

এই সংসারে নারীরা স্বভাবতই পুরুষের মনকে কামকলুষিত করে । অর্থাৎ নারী মাত্রেই লম্পট ।

তাই মনু (২:২১৫) বলেছেন 'মাত্রা স্বস্রা দুহিত্রা বা না বিবিক্তাসনো ভবেৎ ।'

অর্থাৎ, মা, বোন বা কন্যার সঙ্গে নির্জন গৃহে কোনও পুরুষের বাস করা উচিত নয় ।

শিক্ষা আনে চেতনার মুক্তি, যা দাসত্ব থেকে মুক্ত হতে উদ্বুদ্ধ করতে পারে বিবেচনায় মনুষ্যত্বের ও মানুষের চরম শত্রু মনুর বিধান দিলেন তার বিখ্যাত মনুসংহিতায় (২:৬৭) :
'বৈবাহিকো বিধিঃ স্ত্রীণাং সংস্কারো বৈদিকঃ স্মৃতঃ ।
পতিসেবা গুরৌবাসো গৃহার্থোহগ্নি পরিক্রিয়া ।।'

অর্থাৎ 'বিয়েই নারীর বৈদিক উপনয়ন । পতিসেবাই গুরুগৃহবাস, গৃহকর্মই হোমস্বরূপ অগ্নিপরিচর্যা ।'

এখানেই শেষ নয় । মনু আরও বলেছেন (৫:১৫৪), পতি সদাচারহীন, পরস্ত্রীর সঙ্গে যৌন সম্পর্কযুক্ত বা গুণহীন হলেও সতী স্ত্রী সেই পতিকে দেবতার মতোই পুজো করবে ।

তাহলে হিন্দু নারীর বিনোদন কি শুধুই নানা ব্রতপালন ও উপবাস ঘিরেই আবর্তিত হবে?

না । ব্রতপালন, উপবাসের স্বাধীনতা নারীকে দেননি মনু । তাঁর বিধানে আছে (৫:১৫৫) : স্ত্রী'র স্বামী ছাড়া পৃথক যজ্ঞ নেই, পতির অনুমতি ছাড়া ব্রত বা উপবাস নেই । নারী স্বর্গে যেতে পারে কেবলমাত্র স্বামীসেবার সাহায্যেই ।

মনু (৫:১৫৮) আরও বলেছেন, স্ত্রীলোক তার মৃত্যু পর্যন্ত কষ্ট সহ্য করবে, নিয়মচারিণী হবে এবং স্বামীর সেবা করবে, এটাই তার পরম ধর্ম ।

হিন্দু সমাজে পুরুষরা এভাবে নিজেদের লাম্পট্য, অসদাচরণ ও অত্যাচারকে নারীদের কাছে শুধুমাত্র প্রতিবাদহীনভাবে গ্রহণীয় করেনি, নিজেদের দেবতার আসনে বসিয়েছে ধর্মের বিধান খাড়া করে ।

ব্যভিচারী নারীদের জন্য শাস্তির ব্যবস্থা ছিল মনু সংহিতায় । যে নারী নিজেদের পতিকে পরিত্যাগ করে পরপুরুষের সঙ্গে মিলিত হবে, তাকে জনাকীর্ণ স্থানে কুকুর দিয়ে খাওয়ানোর কথা বলা হয়েছে (৮:৩৭১) ।

কিন্তু যে পুরুষ ধর্ষণ করে, ঘরে স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও পরস্ত্রীর সঙ্গে সহবাস করে, তার বিরুদ্ধে কোনও শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি । বরং বেদপাঠ, যজ্ঞ ইত্যাদি বিভিন্ন প্রায়শ্চিত্তের মাধ্যমে এই ধরণের ঘৃণ্য কাজের শাস্তি থেকে মুক্তি পাওয়ার বিধানও রয়েছে ।

স্ত্রীজাতিদের স্মৃতি ও বেদ শোনা বা পড়ার অধিকার ছিল না । মনু (৯:১৮) এদেরকে এইজন্য হীন ও অপদার্থ বলেছেন ।

মনুসংহিতায় (৯:৯৪) আরও লেখা আছে - ত্রিশবছরের পুরুষ বারো বছরের মেয়েকে এবং চব্বিশ বছরের পুরুষ আট বছরের মেয়েকে বিয়ে করবে । কিন্তু যদি ধর্মহানির আশঙ্কা থাকে তাহলে পুরুষ কম বয়সেও বিয়ে করতে পারে ।

কম বয়স বলতে কত বোঝায় ? চলুন হিসেব করে দেখি । ত্রিশ বছরে বারো বছরের কন্যা এবং চব্বিশ বছরে আট বছরের কন্যাকে বিয়ে করতে হবে বলে বলা হয়েছে । অর্থাৎ পুরুষের বয়সের অনুপাত ছয় বছর কমলে মেয়ের বয়স চার বছর করে কমবে । সোজা হিসেব ।

আবার বলা হয়েছে পুরুষ কম বয়সেও বিয়ে করতে পারে । তাহলে কোনও আঠারো বছরের ছেলে চার বছরের মেয়েকে বিয়ে করতে পারবে । এবার বুঝতে পারছেন কাম প্রবৃত্তির জন্য পুরুষেরা কী ভয়ঙ্কর কাজ করত । হিসেবমতো নাবালিকা ধর্ষণ করা হত সেইসময় । এবং মনুসংহিতা এই ধর্ষণকে সমর্থন করেছিল ।

হিন্দুধর্মের বিভিন্ন বিধানে পদে পদে পুরুষের লাম্পট্যের অধিকারকে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে । তৈত্তিরীয় সংহিতায় (৬/৬/৮৫) বলা হয়েছে, 'যজমান, দীক্ষার দিনে গণিকাসাহচর্য বর্জন করবেন, তার পরদিন পরস্ত্রীর সাহচর্য এবং তৃতীয় দিন নিজস্ত্রীর সাহচর্য বর্জন করবেন ।'

অর্থাৎ, দীক্ষার দিনেও পরস্ত্রীর সাহচর্য বৈধ ছিল । দীক্ষার দিন ছাড়া অন্যান্য দিন গণিকা গমনও বৈধতার ছাড়পত্র পেয়েছিল এবং গণিকাগমন পুরুষের কাছে কখনই দোষাবহ বা লজ্জার বলে চিহ্নিত হয়নি । বরং চিহ্নিত হয়েছিল পৌরুষের প্রতীক হিসেবেই ।

মনুর বিধানে (৯:৪) বলা হয়েছে, নিঃসন্তান স্ত্রীকে বিয়ের দশ বছর পর ত্যাগ করা যায়, যে স্ত্রী শুধুমাত্র কন্যা সন্তানের জন্ম দেয় তাকে ত্যাগ করা যায় বারো বছর পরে, মৃত সন্তানের জন্মদানকারী স্ত্রীকে ত্যাগ করা যায় পনেরো বছর পরে ।

সন্তানের জন্ম দেওয়ার অক্ষমতার কারণে স্বামীকে কিন্তু ত্যাগ করার কোনও বিধান নেই । অথচ এই যুগের বিজ্ঞান বলছে ছেলে জন্মাবে কী মেয়ে জন্মাবে, এক্ষেত্রে পুরুষের ভূমিকাই মুখ্য ।

মনু (৯:৪) ঝগড়ুটে স্ত্রীকে তক্ষুনি ত্যাগ করার অধিকার দিয়েছেন স্বামীকে । কিন্তু ঝগড়ুটে শুধু নয়, অত্যাচারী স্বামীকেও দেবতা জ্ঞানে পুজো করতে বলেছেন এই মনু নামক অমানুষ এক পুরুষ । মানুষের শত্রু, মনুষ্যত্বের শত্রু এই মনুকে দেবত্ব আরোপ করেছে হিন্দু পুরুষ সমাজ । মনুকে ব্রহ্মার অংশ হিসেবে চিত্রিত করে মনুর বিধানকেই আইনের বিধান বলে মেনে নেবার কথা বলেছেন হিন্দু শাস্ত্রকার, যাঁরা মানুষ ছিলেন না অবশ্যই, যাঁরা ছিলেন পুরুষ শ্রেণির প্রতিনিধি, যাঁদের হাতে ধর্মের আর এক নাম কখনওই মনুষ্যত্ব হয়ে ওঠেনি, বরং যাঁদের হাতে মনুষ্যত্ব হয়েছে খণ্ডিত, লাঞ্ছিত, ধর্ষিত ।


======================================================


মনু বিধান দিয়েছিলেন যে, কলিযুগে কন্যার বিয়ে যেন গোটা পুরুষদের সঙ্গে যৌথভাবে দেওয়া হয় । ঋকবেদে এবং অথর্ববেদে এমন কয়েকটি শ্লোক রয়েছে যা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় । যদি জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা কোনও কন্যাকে বিয়ে করে বধূ করত, তাহলে তার কনিষ্ঠ সহোদরদের প্রত্যেকেরই ওই কন্যার সঙ্গে রমণের অধিকার থাকত । এ-থেকেই 'দেবর' শব্দের উৎপত্তি ।

জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার মৃত্যু হলে স্ত্রী দেওরকেই বিয়ে করত । কিন্তু তারপরও অন্যান্য দেওররা তাকে রমণ করত । স্ত্রীরা বহুজনের সঙ্গে রমণের আনন্দ উপভোগ করত ।


======================================================



'দশরথজাতক' গ্রন্থে আছে কোশল বংশের রাজা দশরথ কোশল বংশের রাজকন্যা কৌশল্যকেই বিয়ে করেছিলেন, যাদের সম্পর্ক ছিল ভাই-বোনের উত্তর-ভারত, পূর্ব-ভারত মধ্য-ভারতে একসময় ভাই-বোনের বিয়ে প্রচলিত ছিল এসবের সামাজিক স্বীকৃতিও ছিল দশরথ জাতকে আছে - রামও তাঁর ভগ্নী সীতাকে বিয়ে করেছিলেন


======================================================


সীতাকে উদ্ধারের পর রাম রাজসভাতে মন্ত্রী-সভাসদ ও প্রজাদের সামনেই সীতাকে বললেন, আমি যুদ্ধ করে তোমাকে উদ্ধার করে এনেছি নিজের বংশকলঙ্ক মোচন করার জন্য । তোমার চরিত্র সন্দেহজনক । তুমি রাবণের কোলে বসে ওর ঘনিষ্ঠ আদর পেয়েছ । তোমাকে গ্রহণ করে কেমন করে আমার বংশের মর্যাদাহানি করব ? বুদ্ধিমান তুমি, আমি তোমাকে বলছি, লক্ষণ, ভরত, শত্রুঘ্ন, সুগ্রীব ও বিভীষণের মধ্যে যাকে ইচ্ছে মনোনীত করে নাও এবং তার সঙ্গেই মনোরম রমণ জীবন-যাপন করো । তুমি হলে কুকুরের চাটা ঘি । আমি তোমাকে গ্রহণ করতে পারি না ।

আহা ! রামের কী পত্নীপ্রেম !


======================================================


অধ্যাপক রাবণ তামিলনাড়ুর একজন স্বনামধন্য লেখক এবং গবেষক । দীর্ঘদিন তিনি রামায়ণের ওপর গবেষণা করেছেন । তিনি চাইছেন যে দক্ষিণ ভারতীয় মূলনিবাসীদের সঙ্গে উত্তর ভারতীয় আর্যদের মধ্যে যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে আদিকবি বাল্মীকি যে রামায়ণ রচনা করেছিলেন, জনস্বার্থের কারণেই তা সকলের সামনে আনা হোক । মূল রামায়ণের আলোকে ভারত তথা বিশ্বের জনগণ বিচার করে দেখুক বাল্মীকির নাম করে তুলসীদাস বা কীর্তিবাস প্রভৃতি কবিরা যে রামায়ণ রচনা করেছিলেন তা কতটা খাঁটি বা কতটা ভেজাল । তিনি মূল বাল্মীকি রামায়ণের মা স্বরুপনখার (সুর্পণখা নয়) কাহিনী প্রকাশ করে বললেন যে, আদিকবি বাল্মীকির রামায়ণের বহু কাহিনিকেই পরবর্তীকালে ব্রাহ্মণেরা নিজেদের মতো করে পরিবেশন করেছে যাতে আদি কাহিনিটি লুপ্ত হয়ে গিয়েছে । মা স্বরুপনখার কাহিনিটি হল :

স্বরুপনখা রাবণের বোন । অসুর রাজ বিদ্যুৎজ্জিতবাহুর সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয় । তাঁদের একটি ছেলে । তার নাম সাম্ব । অসুররাজ বিদ্যুৎজ্জিতবাহুর মৃত্যুর পর রাবণ স্বরুপনখাকে দণ্ডকারণ্যের শাসিকা হিসেবে নিয়োগ করেন এবং বীর খরকে সেনাপতি হিসেবে নিয়োগ করেন । রাম বনবাসের নামে ব্রাহ্মণ্য যজ্ঞ সংস্কৃতি ও শাসন ব্যবস্থা কায়েম করার জন্য দক্ষিণ প্রদেশগুলি আক্রমণ করে । বালক সাম্ব রামের সম্মুখীন হলে রাম তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে । মা স্বরুপনখা নিজের পুত্রের এমন নির্মম হত্যার কথা শুনে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে একাকী রামের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য হাজির হন । রাম তার পত্নী সীতার সামনেই স্বরুপনখাকে ধর্ষণ করে ।

তার শুধু নাক, কান নয় নিজের হাতেই রাম স্বরুপনখার স্তনও কেটে দেয় ।

কিন্তু তুলসীদাস বা কীর্তিবাস এই কাহিনিকে চেপে দিয়ে সম্পূর্ণভাবে তাঁদের মনগড়া কাহিনি আকারে পরিবেশন করেন ।


======================================================


উপনিষদগুলো বাগাড়ম্বর, হাস্যকর ও বিজ্ঞান-বিরোধী নানা তথ্যের জঞ্জাল । জগৎ ও জীবন সৃষ্টির এক আজগুবি তথ্য (বৃহদারণ্যক, ২/১/১০) দিয়ে বলা হয়েছে, 'আমি থেকে যেমন স্ফুলিঙ্গের উদ্ভব, তেমনই এই আত্মা থেকে উদ্ভব হয় প্রাণ, লোক দেব এবং বস্তুসমূহের । এই 'আমি' কে ? আত্মা ।'

আর এক জায়গায় (বৃহদারণ্যক, ১/৪/১-৪) সৃষ্টির বর্ণনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে, 'আত্মাই প্রথম পুরুষ । চতুর্দিকে দৃষ্টিপাত করে তিনি নিজেকে ব্যতীত দ্বিতীয় কাউকে দেখতে পেলেন না । তিনি উচ্চারণ করলেন 'সোহং' (আমিই একমাত্র) । অতঃপর তাঁর নাম হল 'অহং', যা আমরা নিজেদের নামোচ্চরণের আগে বোধ করি ।... তিনি আতঙ্কিত হলেন, আজও তাই নিঃসঙ্গ ব্যক্তিকে আতঙ্ক গ্রাস করে ।... তিনি দ্বিতীয় সত্তাকে কামনা করলেন ।... নিজ আত্মা ও শরীরকে দ্বিধাবিভক্ত করলেন, সৃষ্টি হল পতি ও পত্নী ...।'

আবার ছান্দোগ্যতে (ছান্দোগ্য উপনিষদ ৬/২/১-৪) সৃষ্টি বর্ণনায় আমরা পাচ্ছি, 'সৃষ্টি প্রথমে এক অদ্বিতীয় ভাবরূপেই ছিল, তিনি নিজেকে প্রকাশ করতে চাইলেন। তাই অগ্নি তথা তেজ উৎপন্ন করলেন । তেজ ইচ্ছা করলেন এবং জল সৃষ্টি হল...জল থেকে সৃষ্টি করলেন...অন্ন ।'

ছান্দোগ্যতে আমরা পরলোক তত্ত্বে 'পিতৃযান' ও 'দেবযান'-এর পরিচয় পেয়েছি । পিতৃযান তত্ত্বে দেওয়া আছে মৃতের আত্মা বা চেতনা মৃত্যুর পর কোথায় কোথায় কত দিন ধরে অবস্থান করে । তারপর চন্দ্রলোকে যায় । সেখান থেকে মেয়াদ শেষে আবার আত্মা ফিরে আসে । ফেরাটা এইরকম - চন্দ্রলোক, আকাশ, পিতৃলোক, দক্ষিণায়ন মাস, কৃষ্ণপক্ষ, রাত্রি, তারপর কায়াহীন এবং সবশেষে স্ত্রী-যোনিতে ।

দেবযান-এ যেতে পারলে আত্মাকে আর ফিরতে হয় না । দেবযানের যাত্রী আত্মাকে প্রথম যেতে হয় আলোর দেবতার কাছে । সেখান থেকে পর্যায়ক্রমে যেতে হয় দিনের দেবতা, শুল্কপক্ষের দেবতা, বর্ষার দেবতা, আদিত্য, চন্দ্র, বিদ্যুতের দেবতার কাছে । এখন থেকে আত্মাকে নিয়ে যাওয়া হয় ব্রহ্মার কাছে । এ-বার যাত্রা শেষ ।

পৃথিবীর বাইরে যেমন আকাশ আছে, শরীরের ভিতর তেমনই নাকি আকাশ আছে । আছে অগ্নি, বায়ু, চন্দ্র, সূর্য, পৃথিবী এবং জোতির্মন্ডল । এ সবই আছে শরীরের মধ্যে একটি ছোট কমলা রঙের ঘরে বা হৃদয়ে ।

হৃদয়াকাশে একত্রিত এই দ্যুলোক-ভূলোককে স্মরণের মধ্যেই তাই ব্রহ্ম উপাসনা করা যায় । হৃদয়কে বা মনকে ব্রহ্ম জেনেই উপাসনা করার উপদেশ রয়েছে ছান্দোগ্যতে ।

ঐতেরেয় উপনিষদ-এ আবার এসেছে সৃষ্টিতত্ত্ব । বলা হয়েছে, 'প্রথমে একমাত্র এই আত্মাই জীবিত ছিল । আত্মা মনে মনে ইচ্ছা করলেন লোকপাল সৃষ্টি করব । জল থেকে এক পুরুষকে তুলে তিনি তার দেহে কম্পন সৃষ্টি করে তাকে তপ্ত করলেন । তপ্ত করার পর তার মুখ বিকশিত হল । মুখ থেকে নির্গত হল বাণী, তা থেকে অগ্নি সৃষ্টি হল । নাসারন্ধ্র থেকে নির্গত হল নিঃশ্বাস, নিঃশ্বাস থেকে প্রাণ, প্রাণ থেকে বায়ু । চক্ষু থেকে সৃষ্টি হল দৃষ্টিশক্তি, তা থেকে সূর্য । কর্ণযুগল থেকে হল শ্রবণক্ষমতা, শ্রুতি থেকে দিশা । ত্বক থেকে রোম, রোম থেকে ওষধি বনস্পতি । হৃদপিন্ড স্ফুরিত হল, তা থেকে সৃষ্টি হল মন । মন থেকে চন্দ্র ।'  (ঐতেরেয় উপনিষদ, ১/১-৩) ।

আমরা উপনিষদ পড়ে জানলাম, প্রাণ সৃষ্টি রহস্য, যা বিবর্তনবাদের উল্টো দিকে চলেছে । আমরা জানলাম প্রাণ থেকেই সূর্য, চন্দ্র-র সৃষ্টি রহস্য । মন থাকে হৃদয়ে যা বিজ্ঞানের উল্টোপথের পথিক ।

আমরা জানলাম, বায়ু, অগ্নির সৃষ্টি রহস্য । তারপরও হিন্দু দার্শনিকরা কেন যে আজও নিজেদের যুক্তি বিচারকে নির্ভুল প্রমাণ করতে ভুলে ভরা উপনিষদের দোহাই পাড়েন, সেটাই রহস্য । আর একটা মজার কথা হল, উপনিষদ আবার নিজেদের জাহির করতে বেদের দোহাই পাড়ে ।

উপনিষদের প্রতিটি বিভাগই এই ধরণের বিজ্ঞান বিরোধী, অদ্ভুতুড়ে, অর্থহীন ভাষায় ঠাসা । একই সঙ্গে ঠাসা কুসংস্কারে ।


======================================================



বেদের যুগ ছিল উচ্চবর্ণদের সুবর্ণ সুযোগ । 'খাও-পিও-মৌজ করো' । কাজ করবে শূদ্র দাসেরা । উচ্চবর্ণের লোকেদের কাজ ছিল লাম্পট্য - মনুসংহিতা ও আর্য-সাহিত্যই তার প্রমান ।

বেদ ও মনুর অনুশাসনের প্রতি শূদ্রদের অনাগ্রহ, সন্দেহ, ক্ষোভ দেখে আর্য শাসক ও পুরোহিত গোষ্ঠী বিপদের গন্ধ পেলেন । ধোঁয়া থেকে আগুন সৃষ্টি হওয়ার আগেই ধোঁয়ায় উৎপত্তিতে জল ঢেলে দেওয়ার প্রয়োজন অনুভব করলেন ।

এমনই এক প্রয়োজনীয় মুহূর্তে উচ্চবর্ণদের এই সংকটে উদ্ধারকর্তার ভূমিকায় হাজির হলেন পাঞ্চালের রাজা জৈবলি ও ব্রাহ্মণ উদ্দালক আরুণি (গৌতম) । তাঁরা তৈরি করলেন ছান্দোগ্য উপনিষদ (৭০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে) । 'উপনিষদ' শব্দের অর্থ হল - 'গুরু কর্তৃক শিষ্যের নিকট বর্ণিত রহস্য' । ছান্দোগ্য উপনিষদে জৈবলি ও আরুণি নিয়ে এলেন এক নতুন মতবাদ, 'জন্মান্তরবাদ' । পৃথিবীর একমাত্র ধর্ম হিসেবে সনাতন হিন্দু উপাসনা ধর্মে যুক্ত হল 'জন্মান্তর' বিশ্বাস । উপনিষদের এই 'জন্মান্তরবাদ' ও কর্মফল ভারতবর্ষের দাস শ্রমিকদের মাথায় 'সার্থকভাবে' ঢোকানো গিয়েছিল । এই দেশের জনসমষ্টির বেশিরভাগই ছিলেন দাস । সংখ্যাধিক্যের এই সুবিধে থাকা সত্ত্বেও দাসেরা বিদ্রোহ করেননি । কারণ, আগামী জন্মে আবার দাস হতে চাননি । পৃথিবীর অন্যান্য দেশে দাস-বিদ্রোহের আগুন জ্বলতে দেখেছি । কিন্তু আমাদের দেশে জ্বলতে দেখিনি । এই 'মহান' দেশে দাস-বিদ্রোহের আগুন জ্বলতে দেয়নি জন্মান্তরবাদের জলকামান ।

শুধু কি তাই ? উপনিষদ মৃত্যুর পর মানুষকে স্বর্গসুখের ভয়ংকর মিথ্যে প্রলোভন দেখিয়ে অত্যাচারিত, শোষিত মানুষদের প্রতারিত করেছে ।

বেদ তৈরি করেছিল স্থূল কুসংস্কার । উপনিষদ তৈরি করেছিল সূক্ষ্ম কুসংস্কার, যা বেদের কুসংস্কারের চেয়েও বহুগুন
শক্তিশালী । এই আপাত নিরীহ সূক্ষ্ম কুসংস্কারই আজও দুঃখপীড়িত মানুষদের ক্ষোভে জল ঢেলে চলেছে ।


======================================================


বেদে কিন্তু ব্রহ্মাকে পরম ব্রহ্ম বলা হয়েছে । কিন্তু বেদান্ততে শ্রীকৃষ্ণকে পরম ব্রহ্ম বলা হচ্ছে । অর্থাৎ পরম ব্রহ্মের পদ পরিবর্তন হয়েছে । এই পরিবর্তন কেন ? কারণ বেদান্তের রচয়িতা ছিলেন বৈষ্ণব । বৈষ্ণবদের আরাধ্য দেবতা ছিলেন শ্ৰীকৃষ্ণ । তাই ব্রহ্মাকে হঠিয়ে শ্রীকৃষ্ণকে প্রতিষ্ঠা করে ছিল তাঁদের মুখ্য উদ্দেশ্য ।


======================================================


বেদান্ততে রয়েছে অধার্মিকগণ মৃত্যুর পর নরকে গিয়ে দুঃখ, যন্ত্রনা ভোগ করে ফিরে আসে । বেদান্তে বলা হয়েছে রৌরবাদি সাতটি নরকের কথা । আবার পৌরাণিক অভিধান অনুযায়ী নরক আঠাশটি । ...

... আবার অপরদিকে গীতায় এটাও বলা হয়েছে আত্মাকে কাটা যায় না, পোড়ানো যায় না, আত্মা যন্ত্রনা ভোগ করে না । এর মধ্যে কোনটা ঠিক আপনারাই বলুন ।


======================================================


মানব সভ্যতা সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর এই তিন যুগে মোট ৩৮ লক্ষ ৮৮ হাজার বছর অতিক্রম করে এসেছে এমনটা যাঁরা ভাবেন,তাঁদের 'বোকা' বললে বোকাদের-ই অসম্মান করা হবে ।


======================================================


সত্যযুগে হিরণ্যাক্ষ দানব সমুদ্রের নীচে পৃথিবীকে নিয়ে গেলে বিষ্ণু পৃথিবীকে উদ্ধারের জন্য বরাহ বা শূকর রূপ ধারণ করেন । বরাহ রূপ ধারণ করে দীর্ঘ একহাজার বছর ধরে যুদ্ধ করেন ওই দানবের সঙ্গে । এবং অবশেষে হত্যা করেন । এরপর পৃথিবীকে আবার ওপরে উঠিয়ে নিয়ে আসেন ।

তাহলে বরাহপুরাণ থেকে জানা গেল পৃথিবীকে তার মধ্যেই অবস্থিত সমুদ্রের মধ্যে নিয়ে যাওয়া যায় । অথবা এটাও হতে পারে মহাকাশের বাইরে পৃথিবীর নীচে সমুদ্রে ভাসমান অবস্থায় রয়েছে । RSS-এর কোনও ধর্মবেত্তা কিন্তু মহাকাশ বিজ্ঞানীদের এই তথ্যটি দিতে পারেন । তবে মহাকাশ গবেষণার ক্ষেত্রে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে যেতে পারে । হাজার হোক বিষ্ণুর কীর্তি বলে কথা । স্বয়ং প্রণম্য কৃষ্ণ বেদব্যাস হয়ে নিজের এই অবতারত্বের কথা রচনা করেছেন । বিষ্ণুর এই কাহিনি কি মিথ্যে হতে পারে ! তিনি অবতার হয়ে কি এই আষাঢ়ে গল্প ফাঁদতে পারেন !


======================================================


বিষ্ণুর নবম অবতার হিসেবে বুদ্ধ অবতার রূপে জন্মগ্রহণ করেছিলেন । বুদ্ধ ছিলেন নিরীশ্বরবাদী । যে বুদ্ধ নিরীশ্বরবাদী, কার্যকারণ সম্পর্কে বিশ্বাসী - সেই বুদ্ধকে দেবতা বানানোর জন্য বুদ্ধ অবতার কাহিনি লেখা হয়েছিল । বুদ্ধকে ঘিরে কাহিনি ও তথাকথিত ইতিহাসে অলৌকিক ঘটনার ছড়াছড়ি । পালি ভাষায় বৌদ্ধ ধর্ম নিয়ে প্রথম লেখা হয় তাও বুদ্ধের মৃত্যুর কয়েকশো বছর পরে । তখন আদি বৌদ্ধ ধর্মের রূপান্তর ও বিভাজন চলছে । পালি বৌদ্ধশাস্ত্রে আমরা পেলাম পল্লবিত, অলৌকিকে ভরা বৌদ্ধকে ।

বুদ্ধের উপদেশাবলি বুঝতে হলে বুদ্ধের মূল চার সিদ্ধান্ত জানাটা খুবই জরুরি । সিদ্ধান্তগুলো হল (এক) ঈশ্বরের অস্তিত্ব স্বীকার না করা, (দুই) আত্মাকে 'নিত্য' স্বীকার না করা, (তিন) কোনও গ্রন্থকে স্বতঃপ্রমাণ হিসেবে স্বীকার না করা ।

এবার বলুন এই নিরীশ্বরবাদী বুদ্ধ কীভাবে বিষ্ণুর অবতার হন ?


======================================================


পুরাণ অনুযায়ী সত্যযুগে কোনও পাপকাজ বলে কিছু ছিল না । সবাই পুণ্যবান ছিলেন । অর্থাৎ মানুষের ওপর কোনও অত্যাচার হত না ।

কিন্তু এ-যুগেই বিষ্ণু কূর্ম ও নৃসিংহ অবতার রূপে অত্যাচারী হিরণাক্ষ দানব ও হিরণ্যকশিপুর অত্যাচার থেকে পৃথিবীকে বাঁচাতে আবির্ভূত হয়েছিলেন । এ তো চরম স্ববিরোধিতা । সত্যযুগে যদি সবাই পুণ্যবান হন, তাহলে পাপী হিরণাক্ষ দানব এবং হিরণ্যকশিপু কীভাবে জন্মগ্রহণ করেন ? পুরাণের কাহিনি অনুযায়ী তো এই পাপীদের সত্যযুগের পরের যুগগুলোতে জন্মগ্রহণ করার কথা, যেখানে পাপ ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করছিল ।

আসলে এই স্ববিরোধিতা থাকাটা স্বাভাবিক । কারণ মানুষ মাত্রেই ভুল হয় । পুরাণ রচয়িতারাও ভুল করেছিলেন ।


======================================================


Friday, 10 March 2017

জীবনানন্দ দাশ.

জীবন গিয়েছে চলে আমাদের কুড়ি-কুড়ি বছরের পার---
তখন আবার যদি দেখা হয় তোমার-আমার !

==========================

আমার এ-গান
কোনদিন শুনিবে না তুমি এসে,--
আজ রাত্রে আমার আহবান
ভেসে যাবে পথের বাতাসে,--
তবুও হৃদয়ে গান আসে !
ডাকিবার ভাষা
তবুও ভুলি না আমি,--
তবু ভালোবাসা
জেগে থাকে প্রাণে !
পৃথিবীর কানে
নক্ষত্রের কানে
তবু গাই গান !
কোনোদিন শুনিবে না তুমি তাহা,--জানি আমি--
আজ রাত্রে আমার আহবান
ভেসে যাবে পথের বাতাসে,--
তবুও হৃদয়ে গান আসে !


==========================

আমারে সে ভালোবাসিয়াছে,
আসিয়াছে কাছে,
উপেক্ষা সে করেছে আমারে,
ঘৃণা করে চলে গেছে - যখন ডেকেছি বারেবারে
ভালোবেসে তারে;
তবুও সাধনা ছিল একদিন, - এই ভালোবাসা;
আমি তার উপেক্ষার ভাষা
আমি তার ঘৃণার আক্রোশ
অবহেলা করে গেছি; যে নক্ষত্র - নক্ষত্রের দোষ
আমার প্রেমের পথে বারবার দিয়ে গেছে বাধা
আমি তা ভুলিয়া গেছি;
তবু এই ভালোবাসা -- ধুলো আর কাদা -- ।


==========================


Thursday, 9 March 2017

জ্যোতি বসু বিধায়ক থেকে মুখ্যমন্ত্রী


১৯৭৮ সালে বামফ্রন্ট জামানায় প্রথম পঞ্চায়েত নির্বাচনের মুখে প্রমোদ দাশগুপ্ত একবার বলেছিলেন, "গ্রাম পঞ্চায়েত হল এমনই একটা ধারালো অস্ত্র, যা দিয়ে শত্রুপক্ষকে কাটতে কাটতে এগনো যাবে । আর যদি ঠিকমতো ওই অস্ত্র ব্যবহার করা না-যায়, তাহলে নিজেদেরই জখম হতে হবে ।"

Sunday, 5 February 2017

লেনিন

'' কমিউনিস্টরা যখন ক্ষমতায় থাকে না পার্টি অফিসের দরজা তখন খোলা রেখো,মানুষ বাঁচার জন্য আসবে । আর কমিউনিস্টরা যখন ক্ষমতায় থাকবে পার্টি অফিসের দরজা তখন বন্ধ রেখো, বেনোজল যেনো ঢুকে না যায় । ''
- ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভ ( লেনিন )

Wednesday, 28 December 2016

পথের দাবী - শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়



শুধু কেবল আমাদের দেশে নয়, পৃথিবীর যে-কোন দেশে, যে-কোন যুগে যে-কেউ জন্মভূমিকে তার স্বাধীন করবার চেষ্টা করেচে, তাকে আপনার নয় বলবার সাধ্য আর যার থাক আমার নেই ।

নারীর স্বাধীনতার প্রসঙ্গে  মন তাহার কোনকালেই সায় দিতে চাহিত না । ইহাতে মঙ্গল নাই, ইহা ভাল নয় --- তাহার রুচি ও আজন্ম সংস্কার এ কথা অনুক্ষণ তাহার কানে কানে বলিত । অথচ, শাস্ত্রীয় অনুশাসনগুলার মধ্যেও যে ইহাদের প্রতি গভীর অবিচার নিহিত আছে এ সত্য তাহার ন্যায়নিষ্ঠ চিত্ত কিছুতেই অস্বীকার করিতে পারিত না । ইহাতে সে দুঃখ পাইত কিন্তু পথ পাইত না ।

কোন একটা কথা কেবলমাত্র বহুদিন ধরে বহু লোকে বলতে থাকলেই তা সত্য হয়ে ওঠে না ।

ক্ষতি ত অনেক জিনিসেই হয় না অপূর্ববাবু, কিন্তু বিনা প্রয়োজনেও কোন কাজ করা আমাদের বারণ ।

যেখানে ফেলে যাওয়াই মঙ্গল, সেখানে আঁকড়ে থাকাতেই অকল্যাণ ।

এ নরককুন্ড ত এরা বানায় নি । এরা শুধু তার প্রায়শ্চিত্ত করচে ।

মানুষের প্রতি মানুষে কত অত্যাচার করচে চোখ মেলে দেখতে শিখুন । কেবল ছোঁয়াছুঁয়ি বাঁচিয়ে, নিজে সাধু হয়ে থেকে ভেবেচেন পুণ্য সঞ্চয় করে একদিন স্বর্গে যাবেন ? মনেও করবেন না ।

এই হৃদয়হীনতা নিবারণ করিবার উপায় নাই, লোকে করে না, কেহ করিতে চাহিলে সবাই তাকে পাগল বলিয়া উড়াইয়া দেয় ।

এরা কারা অপূর্ববাবু ? এরা ত আমারই । এই ছোট্ট কথাটুকু যখনি ভুলচেন, তখনি আপনার গোল বাধচে । আর ভাল ? ভাল-করা বলে যদি সংসারে কোন কথা থাকে, তার যদি কোন অর্থ থাকে সে ত এইখানে । ভাল ত ডাক্তারবাবুর করা যায় না অপূর্ববাবু ।

চিরদিন সংসারে অত্যাচারিত, পীড়িত, দুর্বল বলিয়া মানুষের সহজ অধিকার হইতে যাহারা সবলের দ্বারা প্রবঞ্চিত, নিজের উপরে বিশ্বাস করিবার কোন কারণ যাহারা দুনিয়ায় খুঁজিয়া পায় না, দেবতা ও দৈবের প্রতি তাহাদেরই বিশ্বাস সব চেয়ে বেশী ।

ভাল বক্তার কাছে জনতা যুক্তিতর্ক চাহে না, যাহা মন্দ তাহা কেন মন্দ এ খবরে তাহাদের আবশ্যক হয় না, শুধু মন্দ যে কত মন্দ অসংখ্য বিশেষণ যোগে ইহাই শুনিয়া তাহারা চরিতার্থ হইয়া যায় ।

এ যে কেবল ধনীর বিরুদ্ধে দরিদ্রের আত্মরক্ষার লড়াই । এতে দেশ নেই, জাত নেই, ধর্ম নেই, মতবাদ নেই - হিন্দু নেই, মুসলমান নেই, - জৈন, শিখ কোন কিছুই নেই, - আছে শুধু ধনোন্মত্ত মালিক আর তার অশেষ প্রবঞ্চিত অভুক্ত শ্রমিক । তোমাদের গায়ের জোরকে তারা ভয় করে, তোমাদের শিক্ষার শক্তিকে তারা অত্যন্ত সংশয়ের চোখে দেখে, তোমাদের জ্ঞানের আকাঙ্ক্ষায় তাদের রক্ত শুকিয়ে যায় । অক্ষম, দুর্বল, মূর্খ, দুর্নীতিপরায়ণ তোমরাই যে তাদের বিলাস-ব্যসনের একমাত্র পাদপীঠ । তাই, মাত্র তোমাদের জীবনধারণটুকুর বেশী তিলার্ধ যে তারা স্বেচ্ছায় কোন দিন দেবে না - এই সত্য হৃদয়ঙ্গম করা কি তোমাদের এতই কঠিন ।

তোমরা অসাধু, তোমরা উচ্ছৃঙ্খল, তোমরা ইন্দ্রিয়াসক্ত - তাদের মুখ থেকে এই-সকল অপবাদই তোমরা চিরদিন শুনে এসেছ । তাই, যখনই তোমরা তোমাদের দাবী জানিয়েছ, তখনই তোমাদের সকল দুঃখকষ্টের মূলে তোমাদের অসংযত চরিত্রকেই দায়ী করে তারা তোমাদের সর্বপ্রকার উন্নতিকে নিবারিত করে এসেছে, - কেবল এই মিথ্যেই তোমাদের তারা অনুক্ষণ বুঝিয়ে এসেছে, - ভাল না হলে কারও উন্নতই কোন দিন হতে পারে না ।

আমার দেশ গেছে বলেই আমি এদের শত্রু নই । একদিন মুসলমানের হাতেও এ দেশ গিয়েছিল । কিন্তু সমস্ত মনুষ্যত্বের এতবড় পরম শত্রু জগতে আর নেই । স্বার্থের দায়ে ধীরে ধীরে মানুষকে অমানুষ করে তোলাই এদের মজ্জাগত সংস্কার । এই এদের ব্যবসা, এই এদের মূলধন ।

সময়মত স্থান ত্যাগ করা এবং একটিভিটি ত্যাগ করা এক বস্তু নয় আইয়ার ।

আরে পরাধীন দেশের সব চেয়ে বড় অভিসম্পাতই হোলো কৃতঘ্নতা । যাদের সেবা করবে তারাই তোমাকে সন্দেহের চোখে দেখবে, প্রাণ যাদের বাঁচাবে, তারাই তোমাকে বিক্রি করে দিতে চাইবে । মূঢ়তা আর অকৃতজ্ঞতা প্রতি পদক্ষেপে তোমায় ছুঁচের মত বিঁধবে । শ্রদ্ধা নেই, স্নেহ নেই, সহানুভূতি নেই, কেউ কাছে ডাকবে না, কেউ সাহায্য করতে আসবে না, বিষধর সাপের মত তোমাকে দেখে লোকে দূরে সরে যাবে । দেশকে ভালোবাসার এই আমাদের পুরস্কার, ভারতী এর বেশী দাবী করবার কিছু যদি থাকে, ত  সে শুধু পরলোকে ।

আপনাকে ভোলাবার অনেক রাস্তা আছে, ভারতী, কিন্তু সত্যে পৌঁছাবার আর দ্বিতীয় পথ নেই ।

ও কবি, ও গুণী, ওদের জাত আলাদা । ওদের ভাল-মন্দ ঠিক আমাদের সঙ্গে মেলে না । কিন্তু তাই বলে দুনিয়ার ভাল-মন্দের বাঁধা আইনে ওকে মাপ করা চলে না । ওর গুণের ফল তারা সবাই মিলে ভোগ করে, শুধু দোষের শাস্তিটুকু সহ্য করে ও নিজে ।

জন-কতক কুলি-মজুরের ভাল করার জন্যে পথের-দাবী আমি সৃষ্টি করিনি । এর ঢের বড় লক্ষ্য । এই লক্ষ্যের মুখে হয়ত একদিন এদের ভেড়া-ছাগলের মতই বলি দিতে হবে , -

এমন করে এদের ভালো করা যায় না, - এদের ভালো-করা যায় শুধু বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে ? এবং সেই বিপ্লবের পথে চালনা করার জন্যেই আমার পথের-দাবীর সৃষ্টি । বিপ্লব শান্তি নয় । হিংসার মধ্যে দিয়েই তাকে চিরদিন পা ফেলে আসতে হয়, - এই তার বর, এই তার অভিশাপ ।

মানুষের চলার পথ মানুষে কোনদিন নিরুপদ্রবে ছেড়ে দেয় না ভারতী ।

মহামানবের মুক্তি-সাগরে মানবের রক্তধারা তরঙ্গ তুলে ছুটে যাবে সেই ত আমার স্বপ্ন ।

অশান্তি ঘটিয়ে তোলার মানেই অকল্যাণ ঘটিয়ে তোলা নয় । শান্তি ! শান্তি ! শান্তি ! শুনে শুনে কান একেবারে ঝালাপালা হয়ে গেছে । কিন্তু এ অসত্য এতদিন ধরে কারা প্রচার করেছে জানো ? পরের শান্তি হরণ করে যারা পরের রাস্তা জুড়ে অট্টালিকা প্রাসাদ বানিয়ে বসে আছে তারাই এই মিথ্যামন্ত্রের ঋষি । বঞ্চিত, পীড়িত, উপদ্রুত নরনারীর কানে অবিশ্রান্ত এই মন্ত্র জপ করে করে তাদের এমন করে তুলেছে যে, আজ তারাই অশান্তির নাম চমকে উঠে, -- ভাবে এ বুঝি পাপ, এ বুঝি অমঙ্গল ! বাঁধা গরু অনাহারে দাঁড়িয়ে মরতে দেখেচ ? সে দাঁড়িয়ে মরে তবু সেই জীর্ণ দড়িটা ছিঁড়ে ফেলে মনিবের শান্তি নষ্ট করে না । তাইত হয়েছে, তাইত আজ দীন-দরিদ্রের চলার পথ একেবারে রুদ্ধ হয়ে গেছে ! তবুও তাদেরই অট্টালিকা প্রাসাদ চূর্ণ করার কাজে তাদেরি সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে যদি আমরাও আজ অশান্তি বলে কাঁদতে থাকি ত পথ পাবো কোথায় ? না ভারতী, সে হবে না ও প্রতিষ্ঠান যত প্রাচীন, যত পবিত্র, যত সনাতনই হোক, -- মানুষের চেয়ে বড় নয়, -- আজ সে-সব আমাদের ভেঙ্গে ফেলতেই হবে । ধূলো ত উড়বেই, বালি ত ঝরবেই, ইঁট-পাথর খসে মানুষের মাথাতে ত পড়বেই ভারতী, এই ত স্বাভাবিক ।

ধর্মঘট বলে একটা বস্তু আছে, কিন্তু নিরুপদ্রব-ধর্মঘট বলে কোথাও কিছু নেই । সংসারে কোন ধর্মঘটই কখনো সফল হয় না, যতক্ষণ না পিছনে তার বাহুবল থাকে ।

ধনীর আর্থিক ক্ষতি এবং দরিদ্রের অনশন এক বস্তু নয় ।

দেশের মধ্যে ছোটবড় এমন অনেক প্রতিষ্ঠান আছে, যারা দেশের ঢের ভাল কাজ করে । আর্তের সেবা, নরনারীর পুন্যসঞ্চয়ে প্রবৃত্তি দান করা, লোকের জ্বর ও পেটের অসুখে ঔষধ যোগানো, জল-প্লাবনে সাহায্য ও সান্ত্বনা দেওয়া -- তাঁরাই তোমাকে পথ দেখিয়ে দেবেন, ভারতী, কিন্তু আমি বিপ্লবী । আমার মায়া নেই, দয়া নেই, স্নেহ নেই --পাপ-পুণ্য আমার কাছে মিথ্যা পরিহাস । ওই-সব ভাল কাজ আমার কাছে ছেলেখেলা । ভারতের স্বাধীনতাই আমার একমাত্র লক্ষ, আমার একটিমাত্র সাধনা । এই আমার ভাল, এই আমার মন্দ,-- এ ছাড়া এ জীবনে আর আমার কোথাও কিছু নাই ।

ভারতের স্বাধীনতা ছাড়া আমার নিজের আর দ্বিতীয় লক্ষ্য নেই, কিন্তু মানবজীবনে এর চেয়ে বৃহত্তর কাম্য আর নেই এমন ভুলও আমার কোন দিন হয়নি । স্বাধীনতাই স্বাধীনতার শেষ নয় । ধর্ম, শান্তি, কাব্য, আনন্দ --- এরা আরও বড় । এদের একান্ত বিকাশের জন্যই ত স্বাধীনতা, নইলে এর মূল্য ছিল কোথা ?

বিপ্লব মানেই ভারতী, কাটাকাটি রক্তারক্তি নয় । বিপ্লব মানে অত্যন্ত দ্রুত আমূল পরিবর্তন ।

যে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ জনপদ ভস্মসাৎ করে ফেলে, আয়তনে সে কতটুকু জানো ? শহর যখন পোড়ে সে আপনার ইন্ধন আপনি সংগ্রহ করে দগ্ধ হয় । তার ছাই হবার উপকরণ তারই মধ্যে সঞ্চিত থাকে, বিশ্ববিধানের এ নিয়ম কোন রাজশক্তিই কোনদিন ব্যত্যয় করতে পারে না ।

লজ্জাহীন উলঙ্গ স্বার্থ এবং পশু-শক্তির একান্ত প্রধান্যই এর মূলমন্ত্র । সভ্যতার নাম দিয়ে দুর্বল, অক্ষমের বিরুদ্ধে এতবড় মুষল মানুষের বুদ্ধি আর ইতিপূর্বে আবিষ্কার করেনি ।

মনে আছে আমার ছেলেবেলায় স্কুলের পড়ার বইয়ে একবার পড়েছিলাম, বিলেতে বসে আমাদের কল্যাণ ভেবে ভেবেই কেবল রাজমন্ত্রীর চোখের নিদ্রা এবং মুখের অন্ন বিস্বাদ হয়ে গেছে । এই সত্য ছেলেদের কণ্ঠস্থ করতে হয়, এবং উদরান্নের দায়ে শিক্ষকদের কণ্ঠস্থ করাতে হয় । সভ্য রাজ্যতন্ত্রের এই রাজনীতি ভারতী ।

দেশের ভালো যাঁরা করবেন তাঁরা চাঁদা তুলে দিকে দিকে অনাথ-আশ্রম, ব্রহ্মচর্যাশ্রম, বেদান্ত-আশ্রম, দরিদ্র-ভান্ডার প্রভৃতি নানা হিতকর কার্য করছেন, মহৎ লোক তাঁরা, আমি তাঁদের ভক্তি করি, - কিন্তু দেশের ভালো করার ভার আমি নিইনি, আমি স্বাধীন করার ভার নিয়েছি ।

প্রবল দুর্বলের সম্পদ কেন ছিনিয়ে নেবে না, এ কথা যে সভ্য ইয়োরোপের নৈতিক-বুদ্ধি ভাবতেই পারে না ।

ইউরোপীয় সভ্যতার অন্যায়-বোধটা অপরের ঘর-চড়াও হয়েই হয়, তাঁদের নিজেদের দেশের মধ্যে ঘটতে দেখা যায় না ।

নিরীহ চাষাভুষোর জন্যে তোমার দুশ্চিন্তার প্রয়োজন নেই ভারতী, কোন দেশেই তারা স্বাধীনতার কাজে যোগ দেয় না । বরঞ্চ বাধা দেয় । তাদের উত্তেজিত করার মত পণ্ডশ্রমের সময় নেই আমার । আমার কারবার শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত, ভদ্র-সন্তানদের নিয়ে । কোনদিন যদি আমার কাজে যোগ দিতে চাও ভারতী, এ কথাটা ভুলো না । আইডিয়ার জন্যে প্রাণ দিতে পারার মত প্রাণ, শান্তিপ্রিয়, নির্বিরোধী, নিরীহ কৃষকের কাছে আশা করা বৃথা । তারা স্বাধীনতা চায় না, শান্তি চায় । যে শান্তি অক্ষম, অশক্তের, ---- সেই পঙ্গুর জড়ত্বই তাদের ঢের বেশী কামনার বস্তু ।

বিপ্লব মানেই শুধু রক্তারক্তি কান্ড নয়, --- বিপ্লব মানে অত্যন্ত দ্রুত আমূল পরিবর্তন ! রাজনৈতিক বিপ্লব নয়, -- সে আমার । কবি, তুমি প্রাণ খুলে শুধু সামাজিক বিপ্লবের গান শুরু করে দাও । যা কিছু সনাতন, যা কিছু প্রাচীন, জীর্ণ, পুরাতন, --- ধর্ম, সমাজ, সংস্কার --- সমস্ত ভেঙ্গে-চুরে ধ্বংস হয়ে যাক, --- আর কিছু না পারো, শশী, কেবল এই মহাসত্যই মুক্তকণ্ঠে প্রচার করে দাও, --- এর চেয়ে ভারতরে বড় শত্রু আর নেই --- তারপরে থাক দেশের স্বাধীনতার বোঝা আমার এই মাথায় !

যত বড়ই হোক, কারও অভাবকেই যেন না আমরা সর্বনাশ বলে ভাবি, একজনের স্থান যেন জলস্রোতের মত আর একজন স্বচ্ছন্দে এবং অত্যন্ত অনায়াসেই পূর্ণ করে নিতে পারে এই শিক্ষাই ত আমাদের প্রথম এবং প্রধান শিক্ষা ভারতী ।

কারও সম্বন্ধেই কটূক্তি করা অন্যায়, কিন্তু অশ্রদ্ধেয়কে শ্রদ্ধা করাও অন্যায়, এমন কি তিনি পূর্বপিতামহ হলেও । এতে মিষ্টতা থাকতে পারে কিন্তু যুক্তি নেই ভারতী, যা কুসংস্কার তাকে পরিত্যাগ করতে শেখো ।

আমরা বিপ্লবী, পুরাতনের মোহ আমাদের জন্য নয় । আমাদের দৃষ্টি, আমাদের গতি, আমাদের লক্ষ্য শুধু সুমুখের দিকে । পুরাতনের ধ্বংস করেই ত শুধু আমাদের পথ করতে হয় । এর মধ্যে মায়া-মমতার অবকাশ কৈ ? জীর্ণ, মৃত পথ জুড়ে থাকলে আমরা পথের-দাবীর পথ পাবো কোথায় ?

পুরাতন মানেই পবিত্র নয়, ভারতী । মানুষ সত্তর বছরের প্রাচীন হয়েছে বলেই সে দশ বছরের শিশুর চেয়ে বেশী পবিত্র হয়ে ওঠে না । তোমার নিজের দিকেই চেয়ে দেখ, মানুষের অবিশ্রাম চলার পথে ভারতের বর্ণাশ্রম ধর্ম ত সকল দিকেই মিথ্যে হয়ে গেছে । ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র, কেউ ত আর সে আশ্রম অবলম্বন করে নেই । থাকলে তাকে মরতে হবে । সে যুগের সে বন্ধন আজ ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে গেছে । তবুও তাকেই পবিত্র মনে করে কে জানো, ভারতী ? ব্রাহ্মণ । চিরস্থায়ী বন্দোবস্তকেই নিরতিশয় পবিত্র জ্ঞানে করা আঁকড়ে থাকতে চায় জানো ? জমিদার ।

সমস্ত ধর্মই মিথ্যা, --- আদিম দিনের কুসংস্কার । বিশ্বমানবতার এতবড় পরম শত্রু আর নেই ।

কল্যাণ আমার কাম্য নয়, আমার কাম্য স্বাধীনতা ।

এই পরিবর্তনশীল জগতে সত্যোপলব্ধি বলিয়া কোন নিত্যবস্তু নাই । তাহার জন্ম আছে, মৃত্যু আছে, --- যুগে যুগে কালে কালে মানবের প্রয়োজনে তাহাকে নূতন হইয়া আসিতে হয় । অতীতের সত্যকে বর্তমানে স্বীকার করিতেই হইবে এ বিশ্বাস ভ্রান্ত, এ ধারণা কুসংস্কার ।

এই ত বিপ্লবীর চরম শিক্ষা । কান্না কার তরে ? নালিশ কার কাছে ? দাদার যদি ফাঁসি হয়েছে শোনো, যেন বিদেশীর হুকুমে সে ফাঁসি তার দেশের লোকেই তার গলায় বেঁধে দিয়েছে । দেবেই ত ! কসাইখানা থেকে গরুর মাংস গরুতেই ত বয়ে নিয়ে আসে ।

দূর থেকে এসে যারা জন্মভূমি আমার অধিকার করেছে, আমার মনুষ্যত্ব, আমার ক্ষুধার অন্ন, তৃষ্ণার জল, --- সমস্ত যে কেড়ে নিলে তারই রইল আমাকে হত্যা করবার অধিকার, আর রইল না আমার ?

সাহেবের বুটের তলায় চিত হয়ে শুয়ে শান্তির বাণী আমার মুখ দিয়ে ঠিক বার হবে না, --- হয়ত আটকাবে ।

তুমি কবির শ্লোক প্রায় আবৃত্তি করে বল, গিয়াছে দেশ দুঃখ কি, আবার তোরা মানুষ হ । কিন্তু দেশ ফিরে পাবার মত মানুষ হওয়া কাকে বলে শুনি ? ভেবেচ, মানুষ হবার পথ তোমার অবারিত ? মুক্ত ? ভেবেচ, দেশের দরিদ্র নারায়ণের সেবা আর ম্যালেরিয়ার কুইনিন জুগিয়ে বেড়ানোকেই মানুষ হওয়া বলে ? বলে না । মানুষ হয়ে জন্মানোর মর্যাদা-বোধকেই মানুষ হওয়া বলে । মৃত্যুর ভয় থেকে মুক্তি পাওয়াকেই মানুষ হওয়া বলে ।

সভ্যতার যদি কোন তাৎপর্য থাকে ত সে এই যে, অক্ষম ও দুর্বলের ন্যায্য অধিকার যেন প্রবলের গায়ের জোরে পরাভূত না হয় ।

'পথেরদাবী' চাষা-হিতকারিণী প্রতিষ্ঠান নয়, এ আমার স্বাধীনতা অর্জনের অস্ত্র । শ্রমিক এবং কৃষক এক নয় ভারতী । তাই, পাবে আমাকে কুলি-মজুর-কারিকরের মাঝখানে, কারখানার ব্যারাকে, কিন্তু পাবে না খুঁজে পাড়াগাঁয়ে চাষার কুটীরে ।

সংস্কার মানে মেরামত, --- উচ্ছেদ নয় । গুরুভারে যে অপরাধ আজ মানুষের অসহ্য হয়ে উঠেছে তাকেই সুসহ করা ; যে যন্ত্র বিকল হয়ে এসেছে মেরামত করে তাকেই সুপ্রতিষ্ঠিত করার যে কৌশল বোধ হয় তারই নাম শাসন-সংস্কার ।

আইডিয়ার জন্য সর্বস্ব বিসর্জন দিতে পারে শুধু শিক্ষিত ভদ্র-সন্তান, অশিক্ষিত কৃষকে পারে না ।

সকলে কিন্তু সকল কাজের যোগ্য হয় না ।


Wednesday, 9 November 2016

কমিউনিস্ট পার্টির সংগঠন (পার্টি - স্তালিন)


"আমরা হইতেছি একটি শ্রেণীর পার্টি, সুতরাং প্রায় গোটা শ্রেণীই আমাদের পার্টির নেতৃত্বে কাজ করিবে এবং পার্টির সহিত যথাসম্ভব ঘনিষ্ঠভাবে সংশ্লিষ্ট থাকিবে । কিন্তু কেহ যদি মনে করে যে পুঁজিতন্ত্রের আওতায় সমগ্র শ্রেণীই তাহার অগ্রগামী বাহিনী অর্থাৎ সোসালিস্ট পার্টির চেতনা ও কার্যকলাপের সমান পর্যায়ে উঠিতে সমর্থ হইবে, তাহা হইলে তাহার সে ধারণা হইবে নিছক ম্যানিলোভবাদ ও 'লেজুড়' হইয়া থাকারই সামিল  । ট্রেড ইউনিয়ন হইতেছে শ্রমিক-সংগঠনের অপেক্ষাকৃত আদিম রূপ এবং অনুন্নত স্তরের লোকেরাও এই সংগঠনের কার্যকলাপ হৃদয়ঙ্গম করিতে পারে, কোনো বুদ্ধিমান সোসালিস্টই কখনও এই বিষয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ পোষণ করে নাই যে, পুঁজিতন্ত্রের আওতায় ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠনগুলি সমগ্র বা প্রায় সমগ্র শ্রমিকশ্রেণীকে নিজের অন্তর্ভুক্ত করিতে পারে না । অগ্রগামী বাহিনীর প্রতি সমগ্র শ্রমিক সাধারণ ক্রমশই আকৃষ্ট হইতেছে ইহাদর সহিত অগ্রগামী বাহিনীর পার্থক্য আছে, অগ্রগামী বাহিনীর নিয়ত কর্তব্য হইতেছে শ্রমিকদের ব্যাপকতম স্তরকে চেতনার সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত করিয়া তোলা, সমগ্র শ্রমিক সাধারণের সহিত অগ্রগামী বাহিনীর পার্থক্য এবং তাহার এই কর্তব্যের কথা ভুলিয়া যাওয়ার অর্থ হইতেছে আত্মপ্রবঞ্চনা করা, নিজেদের কর্তব্যের বিরাট গুরুত্ব সম্পর্কে অন্ধ থাকা ও এই কর্তব্যকে সংকীর্ণ গন্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ করিয়া ফেলা ।" - লেনিন
=================================


পার্টি একটি সংগঠিত সমগ্র সত্তা - আমাদের পার্টির নিয়ম-কানুনের প্রথম প্যারায় লেনিন এই ধারণাকে রূপ দিয়েছেন, ইহা সুবিদিত । উহাতে বলা হইয়াছে : পার্টি হইতেছে তাহার অন্তর্ভুক্ত সংগঠনের সমষ্টি এবং পার্টিসভ্যকে পার্টির যে কোন একটি সংগঠনের সভ্য হইতে হইবে ।

=================================


"মার্তভের দৃষ্টিভঙ্গি হইতে দেখিলে পার্টির সীমারেখা অনির্দিষ্ট থাকিয়া যায়, কেন না প্রত্যেক ধর্মঘটীই 'নিজেকে পার্টি সভ্য বলিয়া ঘোষণা' করিতে পারে । এই শিথিলতার সুবিধা কি ? একটি 'পদবী'র ব্যাপক সম্প্রসারণ এইটুকু মাত্র । কিন্তু ক্ষতি এই যে, ইহাতে শ্রেণী ও পার্টিকে এক করিয়া গুলাইয়া ফেলার এমন এক ধারণা প্রচলন করা হয়, যাহাতে সংগঠনের সর্বনাশ ঘটে ।" - লেনিন

=================================


"পূর্বে আমাদের পার্টি যথারীতি সংগঠিত একটি সমগ্র সত্তারূপে সংহত হইয়া উঠে নাই, পার্টি তখন ছিল ভিন্ন ভিন্ন উপদলের সমষ্টি মাত্র, তাই তখন এইসব উপদলের মধ্যে এক ভাবাদর্শগত প্রভাবের সম্পর্ক ছাড়া অন্য কোন সম্পর্ক সম্ভব ছিল না । এখন আমরা একটি সংগঠিত পার্টির মধ্যে সংহত হইয়াছি এবং তাহার অর্থই হইতেছে যে, পার্টির কর্তৃত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত হইয়াছে, ভাবাদর্শের শক্তি এখন কর্তৃত্বের শক্তিতে রূপান্তর লাভ করিয়াছে, পার্টির ঊর্ধ্বতন সংগঠনের প্রতি অধস্তন সংগঠনের আনুগত্য এখন আয়ত্ত হইয়াছে ।" - লেনিন

=================================


"এই অভিজাতসুলভ উচ্ছৃঙ্খলতা বিশেষভাবে রুশ নিহিলিস্টদের (শূন্যতাবাদীদের) নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য । ইহারা পার্টি সংগঠনকে একটি বীভৎস 'কারখানা' মনে করে; সমগ্রের নিকট অংশের, সংখ্যাগরিষ্ঠের নিকট সংখ্যালঘিষ্টের বশ্যতাকে ইহারা 'ভূমিদাস-প্রথার' সমতুল মনে করে । একটি কেন্দ্রের পরিচালনায় শ্রমবিভাগের কথা শুনিলেই ইহারা সকরুণ প্রহসনের শুরে চিৎকার করিয়া উঠে যে, ইহাতে মানুষকে 'নাটবল্টুতে' পরিণত করা হইতেছে । পার্টির সাংগঠনিক নিয়মকানুনের উল্লেখ করিলেই ইহারা ঘৃণার সহিত মুখ বিকৃত করিয়া এই অবজ্ঞাসূচক মন্তব্য করে যে নিয়মকানুন একেবারে বাদ দিয়াই চলা যাইতে পারে ...।" "পরিষ্কার বুঝা যায়, বহুভাষিত আমলাতন্ত্রের বিরুদ্ধে চিৎকার একটি ধুয়া ছাড়া আর কিছুই নয়, কেন্দ্রে যে সব লোক কাজ করিতেছে, তাহাদের প্রতি অসন্তোষকে ঐ ধুয়ার আবরণে ঢাকা দিবার চেষ্টাই শুধু করা হয় । তুমি আমলাগিরি ফলাইতেছ কারণ আমার ইচ্ছানুযায়ী তুমি নির্বাচিত হও নাই, আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধেই তুমি কংগ্রেস কর্তৃক নির্বাচিত হইয়াছ । তুমি অন্ধভাবে বিধি অনুসরণ করিয়া চল - কারণ, তুমি আমার সম্মতির উপর নির্ভর করিয়া চল না, তুমি চল কংগ্রেসের বিধিবৎ সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করিয়া, তুমি স্থূল যন্ত্রের মতো কাজ কর - কারণ, পার্টি কংগ্রেসের যান্ত্রিক সংখ্যাগরিষ্ঠতার বলেই তুমি কর্তৃত্ব লাভ করিয়াছ, এবং কমিটিতে আসন পাইবার আমারও যে ইচ্ছা আছে, তাহা তুমি বিবেচনা কর না । তুমি স্বৈরাচারী - কারণ, তুমি পুরাতন দলের হাতে ক্ষমতা ছাড়িয়া দিতে রাজি নও ।" - লেনিন

=================================


"পার্টি হইতেছে শ্রেণী সংগঠনগুলির সর্বোত্তম রূপ এবং সর্বহারাশ্রেণীর অন্য প্রকারের সংগঠনের মধ্যেও এই সংগঠনের রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রসার লাভ করা কর্তব্য ।" - লেনিন

এই কারণেই পার্টি-বহির্ভূত সংগঠনসমূহে 'স্বাধীনতা' ও 'নিরপেক্ষতার' সুবিধাবাদী মতবাদ লেনিনবাদের তত্ত্ব ও ব্যবহারিক প্রয়োগের সহিত একেবারেই খাপ খায় না । আইনসভার মধ্যে পার্টি হইতে বিচ্ছিন্ন সদস্য ও সংবাদপত্র জগতে স্বাধীন সাংবাদিকদের উদ্ভব হয় এই মতবাদের প্রশ্রয়েই; এই মতবাদের ফলেই ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে সংকীর্ণচেতা কর্মীদের উদ্ভব হয় এবং সমবায়-সমিতি আন্দোলনে আত্মতুষ্ট ও পন্ডিতমূর্খ কর্মকর্তাদের আসর ইহার ফলেই জমিয়া উঠে ।

=================================


শ্রমিকশ্রেণীর পক্ষে পার্টির প্রয়োজন কেবল একাধিপত্য কায়েম করার জন্যই নয়, এই একাধিপত্যকে বজায় রাখার জন্য শ্রমিকশ্রেণীর পক্ষে পার্টি আরও বেশি প্রয়োজন, সমাজতন্ত্রের পূর্ণ সাফল্য আয়ত্ত করার উদ্দেশ্যে এই একাধিপত্যকে দৃঢ়তর ও সম্প্রসারিত করার জন্য শ্রমিকশ্রেণীর পক্ষে পার্টি প্রয়োজন । লেনিন বলিয়াছিলেন :
"এখন প্রায় প্রত্যেকেই নিশ্চয়ই উপলব্ধি করিতেছেন যে, পার্টির ভিতর কঠোরতম ও প্রকৃত পক্ষে লৌহকঠিন শৃঙ্খলা না থাকিলে এবং সমগ্র শ্রমিকশ্রেণীর পরিপূর্ণ ও অকুন্ঠ সমর্থন না পাইলে অর্থাৎ শ্রমিকশ্রেণীর মধ্যে যাঁহারা পশ্চাৎপদ স্তরকে সংগ্রামে টানিয়া আনিতে ও চালনা করিতে সক্ষম সেইরূপ চিন্তাশীল, সৎ, আত্মত্যাগী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের পূর্ণ সমর্থন না পাইলে, এই দীর্ঘ আড়াই বছর ধরিয়া কেন, আড়াই মাসও বলশেভিকদের পক্ষে ক্ষমতা বজায় রাখা সম্ভব হইত না ।"

একাধিপত্য 'বজায় রাখা' ও 'সম্প্রসারিত করা' বলিতে কী বুঝায় - লক্ষ লক্ষ শ্রমিককে শৃঙ্খলা ও সংগঠনের প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ করা; শ্রমিক সাধারণের সংহতির শক্তি গড়িয়া তোলা, এবং খুদে বুর্জোয়াদেড় ক্ষয়কারক প্রভাব ও অভ্যাসের সংস্পর্শ হইতে শ্রমিকশ্রেণীকে রক্ষা করিবার উপযোগী দুর্ভেদ্য শক্তি গঠন করা, পেটি-বুর্জোয়া স্তরকে নতুনভাবে শিক্ষা দিয়া নতুন সমাজজীবনের উপযোগী করিয়া তাহাদের গড়িয়া তোলার জন্য সর্বহারাদের সাংগঠনিক কাজের সম্প্রসারণ করা । শ্রেণীভেদ দূর করিতে এবং সমাজতান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থা সংগঠিত করার অনুকূল অবস্থা গড়িয়া তুলিতে শ্রমিকশ্রেণী যাহাতে সক্ষম হয় সেই জন্য তাহাকে উপযুক্ত শক্তি হিসাবে শিক্ষিত হইয়া উঠিতে সাহায্য করা । কিন্তু দৃঢ়তা ও শৃঙ্খলার দিক হইতে শক্তিশালী এক পার্টি ব্যতীত এইসব কাজ সুসম্পন্ন করা অসম্ভব । লেনিন বলিয়াছেন :
"সর্বহারাশ্রেণীর একাধিপত্য বলিতে বুঝায় পুরাতন সমাজের শক্তি ও রীতিনীতির বিরুদ্ধে নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম । এই সংগ্রাম কখনো চলে ভীষণ রক্তপাতের মধ্য দিয়ে, কখনো রক্তপাত ছাড়া, কখনো সশস্ত্র উপায়ে কখনো শান্তিপূর্ণভাবে, এই সংগ্রাম সামরিক ও অর্থনৈতিক, শিক্ষার ক্ষেত্রে ও শাসনবিভাগেও এই সংগ্রাম চলে । লক্ষ লক্ষ, কোটি কোটি লোকের অভ্যস্ত জীবনধারার শক্তি সাংঘাতিক । বহু সংগ্রামের অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ লৌহ-দৃঢ় এক পার্টি ব্যতীত, শ্রমিকশ্রেণীর মধ্যে সমস্ত সৎ লোকের বিশ্বাসভাজন পার্টি ব্যতীত জনগণের মনোভাবের প্রতি লক্ষ্য রাখিয়া তাহাদের ঠিক পথে পরিচালিত করার উপযোগী প্রভাবশালী পার্টি ব্যতীত ঐ সংগ্রাম সাফল্যজনকভাবে পরিচালিত করা অসম্ভব । স্বকীয় একাধিপত্য বজায় রাখার জন্য সর্বহারাশ্রেণীর পক্ষে পার্টি প্রয়োজন । পার্টি সর্বহারাশ্রেণীর একাধিপত্য প্রতিষ্ঠার একটি হাতিয়ার ।

সুতরাং সমাজে যখন কোন শ্রেণীর অস্তিত্ব থাকিবে না এবং সর্বহারাশ্রেণীর একাধিপত্যের যখন ক্রমবিলোপ ঘটিবে, তখন পার্টিরও ক্রমবিলোপ ঘটিবে ।

=================================


"বর্তমান তীব্র অন্তর্যুদ্ধের যুগের কমিউনিস্ট পার্টি যদি খুব কেন্দ্রীভূতভাবে সুসংবদ্ধ হয় এবং পার্টির মধ্যে লৌহকঠিন শৃঙ্খলা যদি সামরিক শৃঙ্খলার পর্যায়ে উন্নীত হয়, পার্টিকেন্দ্র যদি শক্তি ও কর্তৃত্বের আধার হয়, এই কেন্দ্র যদি ব্যাপক ক্ষমতার অধিকারী ও পার্টি সভ্যদের বিশ্বাসভাজন হয়, - তবেই শুধু কমিউনিস্ট পার্টি বর্তমান তীব্র অন্তর্যুদ্ধের যুগে তাহার কর্তব্য সম্পাদন করিতে সক্ষম হয় ।" - লেনিন

=================================


"সর্বহারাশ্রেণীর পার্টির লৌহকঠিন শৃঙ্খলা যাহারাই বিন্দুমাত্র খর্ব করে, বিশেষত সর্বহারাশ্রেণীর একাধিপত্যের যুগে, তাহারাই শ্রমিকশ্রেণীর বিরুদ্ধে বুর্জোয়াদেরই সাহায্য করে ।" - লেনিন

=================================


...পার্টির দশম কংগ্রেসে 'পার্টি-ঐক্য' বিষয়ক প্রস্তাবে লেনিন "পার্টি ঐক্যের দিক হইতে উপদল গঠনের ক্ষতিকর ফল" সম্বন্ধে সকলকে সাবধান করিয়া দিয়াছেন, এবং "সর্বহারাশ্রেণীর একাধিপত্য সাফল্যমন্ডিত করার জন্য সর্বহারাশ্রেণীর অগ্রগামী বাহিনীর মধ্যে সম্মিলিত ইচ্ছা গড়িয়া তোলাকেই মূল শর্ত" বলিয়া ঘোষণা করিয়াছেন ।

এই কারণেই "পার্টির মধ্যে উপদলীয় নীতি বরবাদ করিতে এবং কোনরকম ব্যতিক্রম না দেখাইয়া পার্টির ভিতরকার সমস্ত উপদল অবিলম্বে নিশ্চিহ্ন করিতে" লেনিন দাবি জানাইয়াছেন । "যে-সব উপদল আলাদা নীতি ও কর্মপদ্ধতি অনুসরণ করিতেছে তাহাদের ধ্বংসের জন্য প্রয়োজন হইলে বিনা শর্তে এখনই পার্টি হইতে তাহাদের বহিষ্কারের" জন্যও তিনি দাবি জানাইয়াছেন ।

=================================


"বুর্জোয়া-মনোভাবাপন্ন এই সব শ্রমিককে 'বাবু-শ্রমিক' বলিলেই ঠিক হয়; জীবনযাত্রার প্রণালী, উপার্জনের পরিমাণ ও দৃষ্টিভঙ্গির দিক হইতে ইহারা সম্পূর্ণরূপে পন্ডিতমূর্খদের সামিল; এই স্তরের শ্রমিকরাই দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের প্রধান খুঁটি এবং আমাদের যুগে বুর্জোয়াশ্রেণীর প্রধান সামাজিক (সামরিক নয়) অবলম্বন ইহারাই । শ্রমিক আন্দোলনে ইহারাই বুর্জোয়াদের প্রধান দালাল; ধনিকশ্রেণীর পক্ষ হইয়া শ্রমিকদের নেতৃত্ব করে, বিপ্লবের পরিবর্তে সংস্কার ও শ্রেণীসংগ্রামের পরিবর্তে জঙ্গি জাতিদর্পের উন্মাদনা প্রচারের ইহারাই প্রধান বাহন ।" - লেনিন
=================================


"আমাদের মধ্যে সংস্কারপন্থী ও মেনশেভিকদের থাকিতে দিলে শ্রমিকবিপ্লবের জয়লাভ করা অসম্ভব, বিপ্লবের সাফল্য বজায় রাখা অসম্ভব । নীতির দিক হইতে একথা খুব স্পষ্ট এবং রাশিয়া ও হাঙ্গেরি উভয় দেশেরই অভিজ্ঞতা এই কথাই পরিষ্কার সমর্থন করিয়াছে । রাশিয়াতে অনেকবারই এমন দূরূহ অবস্থার উদ্ভব হইয়াছে যখন এই শ্রেণীর সুবিধাবাদী ও মেনশেভিকরা, সংস্কারপন্থী মধ্যবিত্ত ও গণতন্ত্রীরা আমাদের পার্টির মধ্যে থাকিলে সোভিয়েতের রাষ্ট্র নিশ্চয়ই উচ্ছন্নে যাইত । ইতালিতে ক্ষমতা দখলের জন্য বুর্জোয়াশ্রেণীর ও শ্রমিকশ্রেণীর মধ্যে চরম সংগ্রামের দিন ঘনাইয়া আসিয়াছে, একথা সাধারণত স্বীকার করা হইয়া থাকে । এই অবস্থায় মেনশেভিক, সংস্কারপন্থী ও তুরাতিপন্থীদের পার্টি হইতে বহিষ্কার করা একান্ত প্রয়োজন; শুধু তাই নয়; সে সব চমৎকার কমিউনিস্ট এখনো মত ও পথ ঠিক করিতে না পারিয়া অনিশ্চয়তার দোলায় দুলিতেছে এবং সংস্কারপন্থীদের হিত 'ঐক্য' স্থাপনের দিকে ঝুঁকিতেছে, তাহাদেরও দায়িত্বশীল পদ হইতে অপসারণ করা দরকার । ... বিপ্লবের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে যখন তীব্রতম সংগ্রামের ভিতর দিয়া অগ্রসর হইতে হয়, তখন পার্টির মধ্যে বিন্দুমাত্র দ্বিধাসংকোচ থাকিলে তাহার ফলে শ্রমিকশ্রেণীর হাত হইতে ক্ষমতা খসিয়া পড়িতে পারে; কারণ এই ক্ষমতা অদ্যাবধি সুদৃঢ় হইয়া উঠে নাই, ইহার বিরুদ্ধে আক্রমণ এখনো বেশ জোরালো । এই অবস্থায় অস্থিরমতি নেতারা যদি পার্টির কাজ হইতে অবসর গ্রহণ করে, তাহা হইলে পার্টি এবং শ্রমিকশ্রেণীর আন্দোলন ও বিপ্লবের শক্তি তাহার ফলে খর্ব তো হইবেই না, বরং বৃদ্ধিই পাইবে ।" - লেনিন



Tuesday, 25 October 2016

আমি কি বাঙালি ? সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙার অন্যতম কারণ যে অঙ্গ রাজ্যগুলির ওপর রুশ ভাষার জবরদস্তি, তা আমাদের কত্তারা খেয়াল করেন না ।


বামপন্থীরা কেউ বাঙালি বা ভারতীয় নয় । মার্কসবাদ তো বিশ্বমানবিক আদর্শ । প্রখ্যাত ঐতিহাসিক টয়েনবি বলেছিলেন, কমিউনিজমের প্রধান প্রতিদ্বন্ধী হবে ন্যাশনালিজম, তাতে তাঁরা কর্ণপাত করেননি । মার্কসবাদী হয়েও চিন ও রাশিয়া নিজেদের সীমানা সম্পর্কে স্পর্শকাতর, সমাজতন্ত্রী হয়েও যে হাঙ্গেরি ও রুমানিয়ার মধ্যে তিক্ত ঝগড়া লেগেই ছিল, তাও তাঁরা দেখেও দেখতে চাননি । এবং দেশের উগ্র বামপন্থীরা বাঙালির যা কিছু গর্বের বস্তু, তাকে ভাঙতে বসলেন । রামমোহন সামন্ততন্ত্রের প্রতিভূ, বিদ্যাসাগর সিপাহিবিদ্রোহ সমর্থন করেননি সুতরাং প্রতিক্রিয়াশীল, রবীন্দ্রনাথ বুর্জোয়া কবি, সুভাষ বোস ফ্যাসিস্ত ! বিবেকানন্দ উল্লেখেরও অযোগ্য । তাঁদের সভা-সমিতিতে মার্কস-লেনিন-স্তালিনের বড় বড় ছবি ঝুলছে, বাঙালি তথা ভারতীয় কেউ স্থান পাননি । এমনকি মুজাফফর আহমেদের ছবিও না । মহাত্মা গান্ধী কংগ্রেসের সম্পত্তি, সুতরাং বামপন্থীদের কাছে অচ্ছুত ।


যাঁরা নিজেদের বাঙালি বলে পরিচয় দিতে লজ্জা বোধ করেন, যাঁরা আন্তর্জাতিক মানসিকতার অধিকারী বলে মনে করেন নিজেদের, তারা ভুলে যান যে নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে পরিপূর্ণ ভাবে অবহিত না হলে কোনও মানুষেরই মানসিক গঠন সম্পূর্ণ হয় না । যার পা দুটি গাঁথা থাকবে নিজের দেশের মাটিতে চোখ থাকবে নিজস্ব পারিপার্শ্বিকে আর চিন্তায় থাকবে সারা পৃথিবীর সভ্যতার ইতিহাস, সেই প্রকৃত আন্তর্জাতিক মানুষ । অ্যারিস্টটল থেকে মাও জে ডং পর্যন্ত অনেকেই এমন কথা বলে গেছেন । বাঙালির ঐতিহ্যকে অগ্রাহ্য করে প্রগতিশীল হওয়া যায় না ।