Thursday, 9 March 2017

জ্যোতি বসু বিধায়ক থেকে মুখ্যমন্ত্রী


১৯৭৮ সালে বামফ্রন্ট জামানায় প্রথম পঞ্চায়েত নির্বাচনের মুখে প্রমোদ দাশগুপ্ত একবার বলেছিলেন, "গ্রাম পঞ্চায়েত হল এমনই একটা ধারালো অস্ত্র, যা দিয়ে শত্রুপক্ষকে কাটতে কাটতে এগনো যাবে । আর যদি ঠিকমতো ওই অস্ত্র ব্যবহার করা না-যায়, তাহলে নিজেদেরই জখম হতে হবে ।"

Sunday, 5 February 2017

লেনিন

'' কমিউনিস্টরা যখন ক্ষমতায় থাকে না পার্টি অফিসের দরজা তখন খোলা রেখো,মানুষ বাঁচার জন্য আসবে । আর কমিউনিস্টরা যখন ক্ষমতায় থাকবে পার্টি অফিসের দরজা তখন বন্ধ রেখো, বেনোজল যেনো ঢুকে না যায় । ''
- ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভ ( লেনিন )

Wednesday, 28 December 2016

পথের দাবী - শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়



শুধু কেবল আমাদের দেশে নয়, পৃথিবীর যে-কোন দেশে, যে-কোন যুগে যে-কেউ জন্মভূমিকে তার স্বাধীন করবার চেষ্টা করেচে, তাকে আপনার নয় বলবার সাধ্য আর যার থাক আমার নেই ।

নারীর স্বাধীনতার প্রসঙ্গে  মন তাহার কোনকালেই সায় দিতে চাহিত না । ইহাতে মঙ্গল নাই, ইহা ভাল নয় --- তাহার রুচি ও আজন্ম সংস্কার এ কথা অনুক্ষণ তাহার কানে কানে বলিত । অথচ, শাস্ত্রীয় অনুশাসনগুলার মধ্যেও যে ইহাদের প্রতি গভীর অবিচার নিহিত আছে এ সত্য তাহার ন্যায়নিষ্ঠ চিত্ত কিছুতেই অস্বীকার করিতে পারিত না । ইহাতে সে দুঃখ পাইত কিন্তু পথ পাইত না ।

কোন একটা কথা কেবলমাত্র বহুদিন ধরে বহু লোকে বলতে থাকলেই তা সত্য হয়ে ওঠে না ।

ক্ষতি ত অনেক জিনিসেই হয় না অপূর্ববাবু, কিন্তু বিনা প্রয়োজনেও কোন কাজ করা আমাদের বারণ ।

যেখানে ফেলে যাওয়াই মঙ্গল, সেখানে আঁকড়ে থাকাতেই অকল্যাণ ।

এ নরককুন্ড ত এরা বানায় নি । এরা শুধু তার প্রায়শ্চিত্ত করচে ।

মানুষের প্রতি মানুষে কত অত্যাচার করচে চোখ মেলে দেখতে শিখুন । কেবল ছোঁয়াছুঁয়ি বাঁচিয়ে, নিজে সাধু হয়ে থেকে ভেবেচেন পুণ্য সঞ্চয় করে একদিন স্বর্গে যাবেন ? মনেও করবেন না ।

এই হৃদয়হীনতা নিবারণ করিবার উপায় নাই, লোকে করে না, কেহ করিতে চাহিলে সবাই তাকে পাগল বলিয়া উড়াইয়া দেয় ।

এরা কারা অপূর্ববাবু ? এরা ত আমারই । এই ছোট্ট কথাটুকু যখনি ভুলচেন, তখনি আপনার গোল বাধচে । আর ভাল ? ভাল-করা বলে যদি সংসারে কোন কথা থাকে, তার যদি কোন অর্থ থাকে সে ত এইখানে । ভাল ত ডাক্তারবাবুর করা যায় না অপূর্ববাবু ।

চিরদিন সংসারে অত্যাচারিত, পীড়িত, দুর্বল বলিয়া মানুষের সহজ অধিকার হইতে যাহারা সবলের দ্বারা প্রবঞ্চিত, নিজের উপরে বিশ্বাস করিবার কোন কারণ যাহারা দুনিয়ায় খুঁজিয়া পায় না, দেবতা ও দৈবের প্রতি তাহাদেরই বিশ্বাস সব চেয়ে বেশী ।

ভাল বক্তার কাছে জনতা যুক্তিতর্ক চাহে না, যাহা মন্দ তাহা কেন মন্দ এ খবরে তাহাদের আবশ্যক হয় না, শুধু মন্দ যে কত মন্দ অসংখ্য বিশেষণ যোগে ইহাই শুনিয়া তাহারা চরিতার্থ হইয়া যায় ।

এ যে কেবল ধনীর বিরুদ্ধে দরিদ্রের আত্মরক্ষার লড়াই । এতে দেশ নেই, জাত নেই, ধর্ম নেই, মতবাদ নেই - হিন্দু নেই, মুসলমান নেই, - জৈন, শিখ কোন কিছুই নেই, - আছে শুধু ধনোন্মত্ত মালিক আর তার অশেষ প্রবঞ্চিত অভুক্ত শ্রমিক । তোমাদের গায়ের জোরকে তারা ভয় করে, তোমাদের শিক্ষার শক্তিকে তারা অত্যন্ত সংশয়ের চোখে দেখে, তোমাদের জ্ঞানের আকাঙ্ক্ষায় তাদের রক্ত শুকিয়ে যায় । অক্ষম, দুর্বল, মূর্খ, দুর্নীতিপরায়ণ তোমরাই যে তাদের বিলাস-ব্যসনের একমাত্র পাদপীঠ । তাই, মাত্র তোমাদের জীবনধারণটুকুর বেশী তিলার্ধ যে তারা স্বেচ্ছায় কোন দিন দেবে না - এই সত্য হৃদয়ঙ্গম করা কি তোমাদের এতই কঠিন ।

তোমরা অসাধু, তোমরা উচ্ছৃঙ্খল, তোমরা ইন্দ্রিয়াসক্ত - তাদের মুখ থেকে এই-সকল অপবাদই তোমরা চিরদিন শুনে এসেছ । তাই, যখনই তোমরা তোমাদের দাবী জানিয়েছ, তখনই তোমাদের সকল দুঃখকষ্টের মূলে তোমাদের অসংযত চরিত্রকেই দায়ী করে তারা তোমাদের সর্বপ্রকার উন্নতিকে নিবারিত করে এসেছে, - কেবল এই মিথ্যেই তোমাদের তারা অনুক্ষণ বুঝিয়ে এসেছে, - ভাল না হলে কারও উন্নতই কোন দিন হতে পারে না ।

আমার দেশ গেছে বলেই আমি এদের শত্রু নই । একদিন মুসলমানের হাতেও এ দেশ গিয়েছিল । কিন্তু সমস্ত মনুষ্যত্বের এতবড় পরম শত্রু জগতে আর নেই । স্বার্থের দায়ে ধীরে ধীরে মানুষকে অমানুষ করে তোলাই এদের মজ্জাগত সংস্কার । এই এদের ব্যবসা, এই এদের মূলধন ।

সময়মত স্থান ত্যাগ করা এবং একটিভিটি ত্যাগ করা এক বস্তু নয় আইয়ার ।

আরে পরাধীন দেশের সব চেয়ে বড় অভিসম্পাতই হোলো কৃতঘ্নতা । যাদের সেবা করবে তারাই তোমাকে সন্দেহের চোখে দেখবে, প্রাণ যাদের বাঁচাবে, তারাই তোমাকে বিক্রি করে দিতে চাইবে । মূঢ়তা আর অকৃতজ্ঞতা প্রতি পদক্ষেপে তোমায় ছুঁচের মত বিঁধবে । শ্রদ্ধা নেই, স্নেহ নেই, সহানুভূতি নেই, কেউ কাছে ডাকবে না, কেউ সাহায্য করতে আসবে না, বিষধর সাপের মত তোমাকে দেখে লোকে দূরে সরে যাবে । দেশকে ভালোবাসার এই আমাদের পুরস্কার, ভারতী এর বেশী দাবী করবার কিছু যদি থাকে, ত  সে শুধু পরলোকে ।

আপনাকে ভোলাবার অনেক রাস্তা আছে, ভারতী, কিন্তু সত্যে পৌঁছাবার আর দ্বিতীয় পথ নেই ।

ও কবি, ও গুণী, ওদের জাত আলাদা । ওদের ভাল-মন্দ ঠিক আমাদের সঙ্গে মেলে না । কিন্তু তাই বলে দুনিয়ার ভাল-মন্দের বাঁধা আইনে ওকে মাপ করা চলে না । ওর গুণের ফল তারা সবাই মিলে ভোগ করে, শুধু দোষের শাস্তিটুকু সহ্য করে ও নিজে ।

জন-কতক কুলি-মজুরের ভাল করার জন্যে পথের-দাবী আমি সৃষ্টি করিনি । এর ঢের বড় লক্ষ্য । এই লক্ষ্যের মুখে হয়ত একদিন এদের ভেড়া-ছাগলের মতই বলি দিতে হবে , -

এমন করে এদের ভালো করা যায় না, - এদের ভালো-করা যায় শুধু বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে ? এবং সেই বিপ্লবের পথে চালনা করার জন্যেই আমার পথের-দাবীর সৃষ্টি । বিপ্লব শান্তি নয় । হিংসার মধ্যে দিয়েই তাকে চিরদিন পা ফেলে আসতে হয়, - এই তার বর, এই তার অভিশাপ ।

মানুষের চলার পথ মানুষে কোনদিন নিরুপদ্রবে ছেড়ে দেয় না ভারতী ।

মহামানবের মুক্তি-সাগরে মানবের রক্তধারা তরঙ্গ তুলে ছুটে যাবে সেই ত আমার স্বপ্ন ।

অশান্তি ঘটিয়ে তোলার মানেই অকল্যাণ ঘটিয়ে তোলা নয় । শান্তি ! শান্তি ! শান্তি ! শুনে শুনে কান একেবারে ঝালাপালা হয়ে গেছে । কিন্তু এ অসত্য এতদিন ধরে কারা প্রচার করেছে জানো ? পরের শান্তি হরণ করে যারা পরের রাস্তা জুড়ে অট্টালিকা প্রাসাদ বানিয়ে বসে আছে তারাই এই মিথ্যামন্ত্রের ঋষি । বঞ্চিত, পীড়িত, উপদ্রুত নরনারীর কানে অবিশ্রান্ত এই মন্ত্র জপ করে করে তাদের এমন করে তুলেছে যে, আজ তারাই অশান্তির নাম চমকে উঠে, -- ভাবে এ বুঝি পাপ, এ বুঝি অমঙ্গল ! বাঁধা গরু অনাহারে দাঁড়িয়ে মরতে দেখেচ ? সে দাঁড়িয়ে মরে তবু সেই জীর্ণ দড়িটা ছিঁড়ে ফেলে মনিবের শান্তি নষ্ট করে না । তাইত হয়েছে, তাইত আজ দীন-দরিদ্রের চলার পথ একেবারে রুদ্ধ হয়ে গেছে ! তবুও তাদেরই অট্টালিকা প্রাসাদ চূর্ণ করার কাজে তাদেরি সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে যদি আমরাও আজ অশান্তি বলে কাঁদতে থাকি ত পথ পাবো কোথায় ? না ভারতী, সে হবে না ও প্রতিষ্ঠান যত প্রাচীন, যত পবিত্র, যত সনাতনই হোক, -- মানুষের চেয়ে বড় নয়, -- আজ সে-সব আমাদের ভেঙ্গে ফেলতেই হবে । ধূলো ত উড়বেই, বালি ত ঝরবেই, ইঁট-পাথর খসে মানুষের মাথাতে ত পড়বেই ভারতী, এই ত স্বাভাবিক ।

ধর্মঘট বলে একটা বস্তু আছে, কিন্তু নিরুপদ্রব-ধর্মঘট বলে কোথাও কিছু নেই । সংসারে কোন ধর্মঘটই কখনো সফল হয় না, যতক্ষণ না পিছনে তার বাহুবল থাকে ।

ধনীর আর্থিক ক্ষতি এবং দরিদ্রের অনশন এক বস্তু নয় ।

দেশের মধ্যে ছোটবড় এমন অনেক প্রতিষ্ঠান আছে, যারা দেশের ঢের ভাল কাজ করে । আর্তের সেবা, নরনারীর পুন্যসঞ্চয়ে প্রবৃত্তি দান করা, লোকের জ্বর ও পেটের অসুখে ঔষধ যোগানো, জল-প্লাবনে সাহায্য ও সান্ত্বনা দেওয়া -- তাঁরাই তোমাকে পথ দেখিয়ে দেবেন, ভারতী, কিন্তু আমি বিপ্লবী । আমার মায়া নেই, দয়া নেই, স্নেহ নেই --পাপ-পুণ্য আমার কাছে মিথ্যা পরিহাস । ওই-সব ভাল কাজ আমার কাছে ছেলেখেলা । ভারতের স্বাধীনতাই আমার একমাত্র লক্ষ, আমার একটিমাত্র সাধনা । এই আমার ভাল, এই আমার মন্দ,-- এ ছাড়া এ জীবনে আর আমার কোথাও কিছু নাই ।

ভারতের স্বাধীনতা ছাড়া আমার নিজের আর দ্বিতীয় লক্ষ্য নেই, কিন্তু মানবজীবনে এর চেয়ে বৃহত্তর কাম্য আর নেই এমন ভুলও আমার কোন দিন হয়নি । স্বাধীনতাই স্বাধীনতার শেষ নয় । ধর্ম, শান্তি, কাব্য, আনন্দ --- এরা আরও বড় । এদের একান্ত বিকাশের জন্যই ত স্বাধীনতা, নইলে এর মূল্য ছিল কোথা ?

বিপ্লব মানেই ভারতী, কাটাকাটি রক্তারক্তি নয় । বিপ্লব মানে অত্যন্ত দ্রুত আমূল পরিবর্তন ।

যে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ জনপদ ভস্মসাৎ করে ফেলে, আয়তনে সে কতটুকু জানো ? শহর যখন পোড়ে সে আপনার ইন্ধন আপনি সংগ্রহ করে দগ্ধ হয় । তার ছাই হবার উপকরণ তারই মধ্যে সঞ্চিত থাকে, বিশ্ববিধানের এ নিয়ম কোন রাজশক্তিই কোনদিন ব্যত্যয় করতে পারে না ।

লজ্জাহীন উলঙ্গ স্বার্থ এবং পশু-শক্তির একান্ত প্রধান্যই এর মূলমন্ত্র । সভ্যতার নাম দিয়ে দুর্বল, অক্ষমের বিরুদ্ধে এতবড় মুষল মানুষের বুদ্ধি আর ইতিপূর্বে আবিষ্কার করেনি ।

মনে আছে আমার ছেলেবেলায় স্কুলের পড়ার বইয়ে একবার পড়েছিলাম, বিলেতে বসে আমাদের কল্যাণ ভেবে ভেবেই কেবল রাজমন্ত্রীর চোখের নিদ্রা এবং মুখের অন্ন বিস্বাদ হয়ে গেছে । এই সত্য ছেলেদের কণ্ঠস্থ করতে হয়, এবং উদরান্নের দায়ে শিক্ষকদের কণ্ঠস্থ করাতে হয় । সভ্য রাজ্যতন্ত্রের এই রাজনীতি ভারতী ।

দেশের ভালো যাঁরা করবেন তাঁরা চাঁদা তুলে দিকে দিকে অনাথ-আশ্রম, ব্রহ্মচর্যাশ্রম, বেদান্ত-আশ্রম, দরিদ্র-ভান্ডার প্রভৃতি নানা হিতকর কার্য করছেন, মহৎ লোক তাঁরা, আমি তাঁদের ভক্তি করি, - কিন্তু দেশের ভালো করার ভার আমি নিইনি, আমি স্বাধীন করার ভার নিয়েছি ।

প্রবল দুর্বলের সম্পদ কেন ছিনিয়ে নেবে না, এ কথা যে সভ্য ইয়োরোপের নৈতিক-বুদ্ধি ভাবতেই পারে না ।

ইউরোপীয় সভ্যতার অন্যায়-বোধটা অপরের ঘর-চড়াও হয়েই হয়, তাঁদের নিজেদের দেশের মধ্যে ঘটতে দেখা যায় না ।

নিরীহ চাষাভুষোর জন্যে তোমার দুশ্চিন্তার প্রয়োজন নেই ভারতী, কোন দেশেই তারা স্বাধীনতার কাজে যোগ দেয় না । বরঞ্চ বাধা দেয় । তাদের উত্তেজিত করার মত পণ্ডশ্রমের সময় নেই আমার । আমার কারবার শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত, ভদ্র-সন্তানদের নিয়ে । কোনদিন যদি আমার কাজে যোগ দিতে চাও ভারতী, এ কথাটা ভুলো না । আইডিয়ার জন্যে প্রাণ দিতে পারার মত প্রাণ, শান্তিপ্রিয়, নির্বিরোধী, নিরীহ কৃষকের কাছে আশা করা বৃথা । তারা স্বাধীনতা চায় না, শান্তি চায় । যে শান্তি অক্ষম, অশক্তের, ---- সেই পঙ্গুর জড়ত্বই তাদের ঢের বেশী কামনার বস্তু ।

বিপ্লব মানেই শুধু রক্তারক্তি কান্ড নয়, --- বিপ্লব মানে অত্যন্ত দ্রুত আমূল পরিবর্তন ! রাজনৈতিক বিপ্লব নয়, -- সে আমার । কবি, তুমি প্রাণ খুলে শুধু সামাজিক বিপ্লবের গান শুরু করে দাও । যা কিছু সনাতন, যা কিছু প্রাচীন, জীর্ণ, পুরাতন, --- ধর্ম, সমাজ, সংস্কার --- সমস্ত ভেঙ্গে-চুরে ধ্বংস হয়ে যাক, --- আর কিছু না পারো, শশী, কেবল এই মহাসত্যই মুক্তকণ্ঠে প্রচার করে দাও, --- এর চেয়ে ভারতরে বড় শত্রু আর নেই --- তারপরে থাক দেশের স্বাধীনতার বোঝা আমার এই মাথায় !

যত বড়ই হোক, কারও অভাবকেই যেন না আমরা সর্বনাশ বলে ভাবি, একজনের স্থান যেন জলস্রোতের মত আর একজন স্বচ্ছন্দে এবং অত্যন্ত অনায়াসেই পূর্ণ করে নিতে পারে এই শিক্ষাই ত আমাদের প্রথম এবং প্রধান শিক্ষা ভারতী ।

কারও সম্বন্ধেই কটূক্তি করা অন্যায়, কিন্তু অশ্রদ্ধেয়কে শ্রদ্ধা করাও অন্যায়, এমন কি তিনি পূর্বপিতামহ হলেও । এতে মিষ্টতা থাকতে পারে কিন্তু যুক্তি নেই ভারতী, যা কুসংস্কার তাকে পরিত্যাগ করতে শেখো ।

আমরা বিপ্লবী, পুরাতনের মোহ আমাদের জন্য নয় । আমাদের দৃষ্টি, আমাদের গতি, আমাদের লক্ষ্য শুধু সুমুখের দিকে । পুরাতনের ধ্বংস করেই ত শুধু আমাদের পথ করতে হয় । এর মধ্যে মায়া-মমতার অবকাশ কৈ ? জীর্ণ, মৃত পথ জুড়ে থাকলে আমরা পথের-দাবীর পথ পাবো কোথায় ?

পুরাতন মানেই পবিত্র নয়, ভারতী । মানুষ সত্তর বছরের প্রাচীন হয়েছে বলেই সে দশ বছরের শিশুর চেয়ে বেশী পবিত্র হয়ে ওঠে না । তোমার নিজের দিকেই চেয়ে দেখ, মানুষের অবিশ্রাম চলার পথে ভারতের বর্ণাশ্রম ধর্ম ত সকল দিকেই মিথ্যে হয়ে গেছে । ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র, কেউ ত আর সে আশ্রম অবলম্বন করে নেই । থাকলে তাকে মরতে হবে । সে যুগের সে বন্ধন আজ ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে গেছে । তবুও তাকেই পবিত্র মনে করে কে জানো, ভারতী ? ব্রাহ্মণ । চিরস্থায়ী বন্দোবস্তকেই নিরতিশয় পবিত্র জ্ঞানে করা আঁকড়ে থাকতে চায় জানো ? জমিদার ।

সমস্ত ধর্মই মিথ্যা, --- আদিম দিনের কুসংস্কার । বিশ্বমানবতার এতবড় পরম শত্রু আর নেই ।

কল্যাণ আমার কাম্য নয়, আমার কাম্য স্বাধীনতা ।

এই পরিবর্তনশীল জগতে সত্যোপলব্ধি বলিয়া কোন নিত্যবস্তু নাই । তাহার জন্ম আছে, মৃত্যু আছে, --- যুগে যুগে কালে কালে মানবের প্রয়োজনে তাহাকে নূতন হইয়া আসিতে হয় । অতীতের সত্যকে বর্তমানে স্বীকার করিতেই হইবে এ বিশ্বাস ভ্রান্ত, এ ধারণা কুসংস্কার ।

এই ত বিপ্লবীর চরম শিক্ষা । কান্না কার তরে ? নালিশ কার কাছে ? দাদার যদি ফাঁসি হয়েছে শোনো, যেন বিদেশীর হুকুমে সে ফাঁসি তার দেশের লোকেই তার গলায় বেঁধে দিয়েছে । দেবেই ত ! কসাইখানা থেকে গরুর মাংস গরুতেই ত বয়ে নিয়ে আসে ।

দূর থেকে এসে যারা জন্মভূমি আমার অধিকার করেছে, আমার মনুষ্যত্ব, আমার ক্ষুধার অন্ন, তৃষ্ণার জল, --- সমস্ত যে কেড়ে নিলে তারই রইল আমাকে হত্যা করবার অধিকার, আর রইল না আমার ?

সাহেবের বুটের তলায় চিত হয়ে শুয়ে শান্তির বাণী আমার মুখ দিয়ে ঠিক বার হবে না, --- হয়ত আটকাবে ।

তুমি কবির শ্লোক প্রায় আবৃত্তি করে বল, গিয়াছে দেশ দুঃখ কি, আবার তোরা মানুষ হ । কিন্তু দেশ ফিরে পাবার মত মানুষ হওয়া কাকে বলে শুনি ? ভেবেচ, মানুষ হবার পথ তোমার অবারিত ? মুক্ত ? ভেবেচ, দেশের দরিদ্র নারায়ণের সেবা আর ম্যালেরিয়ার কুইনিন জুগিয়ে বেড়ানোকেই মানুষ হওয়া বলে ? বলে না । মানুষ হয়ে জন্মানোর মর্যাদা-বোধকেই মানুষ হওয়া বলে । মৃত্যুর ভয় থেকে মুক্তি পাওয়াকেই মানুষ হওয়া বলে ।

সভ্যতার যদি কোন তাৎপর্য থাকে ত সে এই যে, অক্ষম ও দুর্বলের ন্যায্য অধিকার যেন প্রবলের গায়ের জোরে পরাভূত না হয় ।

'পথেরদাবী' চাষা-হিতকারিণী প্রতিষ্ঠান নয়, এ আমার স্বাধীনতা অর্জনের অস্ত্র । শ্রমিক এবং কৃষক এক নয় ভারতী । তাই, পাবে আমাকে কুলি-মজুর-কারিকরের মাঝখানে, কারখানার ব্যারাকে, কিন্তু পাবে না খুঁজে পাড়াগাঁয়ে চাষার কুটীরে ।

সংস্কার মানে মেরামত, --- উচ্ছেদ নয় । গুরুভারে যে অপরাধ আজ মানুষের অসহ্য হয়ে উঠেছে তাকেই সুসহ করা ; যে যন্ত্র বিকল হয়ে এসেছে মেরামত করে তাকেই সুপ্রতিষ্ঠিত করার যে কৌশল বোধ হয় তারই নাম শাসন-সংস্কার ।

আইডিয়ার জন্য সর্বস্ব বিসর্জন দিতে পারে শুধু শিক্ষিত ভদ্র-সন্তান, অশিক্ষিত কৃষকে পারে না ।

সকলে কিন্তু সকল কাজের যোগ্য হয় না ।


Wednesday, 9 November 2016

কমিউনিস্ট পার্টির সংগঠন (পার্টি - স্তালিন)


"আমরা হইতেছি একটি শ্রেণীর পার্টি, সুতরাং প্রায় গোটা শ্রেণীই আমাদের পার্টির নেতৃত্বে কাজ করিবে এবং পার্টির সহিত যথাসম্ভব ঘনিষ্ঠভাবে সংশ্লিষ্ট থাকিবে । কিন্তু কেহ যদি মনে করে যে পুঁজিতন্ত্রের আওতায় সমগ্র শ্রেণীই তাহার অগ্রগামী বাহিনী অর্থাৎ সোসালিস্ট পার্টির চেতনা ও কার্যকলাপের সমান পর্যায়ে উঠিতে সমর্থ হইবে, তাহা হইলে তাহার সে ধারণা হইবে নিছক ম্যানিলোভবাদ ও 'লেজুড়' হইয়া থাকারই সামিল  । ট্রেড ইউনিয়ন হইতেছে শ্রমিক-সংগঠনের অপেক্ষাকৃত আদিম রূপ এবং অনুন্নত স্তরের লোকেরাও এই সংগঠনের কার্যকলাপ হৃদয়ঙ্গম করিতে পারে, কোনো বুদ্ধিমান সোসালিস্টই কখনও এই বিষয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ পোষণ করে নাই যে, পুঁজিতন্ত্রের আওতায় ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠনগুলি সমগ্র বা প্রায় সমগ্র শ্রমিকশ্রেণীকে নিজের অন্তর্ভুক্ত করিতে পারে না । অগ্রগামী বাহিনীর প্রতি সমগ্র শ্রমিক সাধারণ ক্রমশই আকৃষ্ট হইতেছে ইহাদর সহিত অগ্রগামী বাহিনীর পার্থক্য আছে, অগ্রগামী বাহিনীর নিয়ত কর্তব্য হইতেছে শ্রমিকদের ব্যাপকতম স্তরকে চেতনার সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত করিয়া তোলা, সমগ্র শ্রমিক সাধারণের সহিত অগ্রগামী বাহিনীর পার্থক্য এবং তাহার এই কর্তব্যের কথা ভুলিয়া যাওয়ার অর্থ হইতেছে আত্মপ্রবঞ্চনা করা, নিজেদের কর্তব্যের বিরাট গুরুত্ব সম্পর্কে অন্ধ থাকা ও এই কর্তব্যকে সংকীর্ণ গন্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ করিয়া ফেলা ।" - লেনিন
=================================


পার্টি একটি সংগঠিত সমগ্র সত্তা - আমাদের পার্টির নিয়ম-কানুনের প্রথম প্যারায় লেনিন এই ধারণাকে রূপ দিয়েছেন, ইহা সুবিদিত । উহাতে বলা হইয়াছে : পার্টি হইতেছে তাহার অন্তর্ভুক্ত সংগঠনের সমষ্টি এবং পার্টিসভ্যকে পার্টির যে কোন একটি সংগঠনের সভ্য হইতে হইবে ।

=================================


"মার্তভের দৃষ্টিভঙ্গি হইতে দেখিলে পার্টির সীমারেখা অনির্দিষ্ট থাকিয়া যায়, কেন না প্রত্যেক ধর্মঘটীই 'নিজেকে পার্টি সভ্য বলিয়া ঘোষণা' করিতে পারে । এই শিথিলতার সুবিধা কি ? একটি 'পদবী'র ব্যাপক সম্প্রসারণ এইটুকু মাত্র । কিন্তু ক্ষতি এই যে, ইহাতে শ্রেণী ও পার্টিকে এক করিয়া গুলাইয়া ফেলার এমন এক ধারণা প্রচলন করা হয়, যাহাতে সংগঠনের সর্বনাশ ঘটে ।" - লেনিন

=================================


"পূর্বে আমাদের পার্টি যথারীতি সংগঠিত একটি সমগ্র সত্তারূপে সংহত হইয়া উঠে নাই, পার্টি তখন ছিল ভিন্ন ভিন্ন উপদলের সমষ্টি মাত্র, তাই তখন এইসব উপদলের মধ্যে এক ভাবাদর্শগত প্রভাবের সম্পর্ক ছাড়া অন্য কোন সম্পর্ক সম্ভব ছিল না । এখন আমরা একটি সংগঠিত পার্টির মধ্যে সংহত হইয়াছি এবং তাহার অর্থই হইতেছে যে, পার্টির কর্তৃত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত হইয়াছে, ভাবাদর্শের শক্তি এখন কর্তৃত্বের শক্তিতে রূপান্তর লাভ করিয়াছে, পার্টির ঊর্ধ্বতন সংগঠনের প্রতি অধস্তন সংগঠনের আনুগত্য এখন আয়ত্ত হইয়াছে ।" - লেনিন

=================================


"এই অভিজাতসুলভ উচ্ছৃঙ্খলতা বিশেষভাবে রুশ নিহিলিস্টদের (শূন্যতাবাদীদের) নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য । ইহারা পার্টি সংগঠনকে একটি বীভৎস 'কারখানা' মনে করে; সমগ্রের নিকট অংশের, সংখ্যাগরিষ্ঠের নিকট সংখ্যালঘিষ্টের বশ্যতাকে ইহারা 'ভূমিদাস-প্রথার' সমতুল মনে করে । একটি কেন্দ্রের পরিচালনায় শ্রমবিভাগের কথা শুনিলেই ইহারা সকরুণ প্রহসনের শুরে চিৎকার করিয়া উঠে যে, ইহাতে মানুষকে 'নাটবল্টুতে' পরিণত করা হইতেছে । পার্টির সাংগঠনিক নিয়মকানুনের উল্লেখ করিলেই ইহারা ঘৃণার সহিত মুখ বিকৃত করিয়া এই অবজ্ঞাসূচক মন্তব্য করে যে নিয়মকানুন একেবারে বাদ দিয়াই চলা যাইতে পারে ...।" "পরিষ্কার বুঝা যায়, বহুভাষিত আমলাতন্ত্রের বিরুদ্ধে চিৎকার একটি ধুয়া ছাড়া আর কিছুই নয়, কেন্দ্রে যে সব লোক কাজ করিতেছে, তাহাদের প্রতি অসন্তোষকে ঐ ধুয়ার আবরণে ঢাকা দিবার চেষ্টাই শুধু করা হয় । তুমি আমলাগিরি ফলাইতেছ কারণ আমার ইচ্ছানুযায়ী তুমি নির্বাচিত হও নাই, আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধেই তুমি কংগ্রেস কর্তৃক নির্বাচিত হইয়াছ । তুমি অন্ধভাবে বিধি অনুসরণ করিয়া চল - কারণ, তুমি আমার সম্মতির উপর নির্ভর করিয়া চল না, তুমি চল কংগ্রেসের বিধিবৎ সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করিয়া, তুমি স্থূল যন্ত্রের মতো কাজ কর - কারণ, পার্টি কংগ্রেসের যান্ত্রিক সংখ্যাগরিষ্ঠতার বলেই তুমি কর্তৃত্ব লাভ করিয়াছ, এবং কমিটিতে আসন পাইবার আমারও যে ইচ্ছা আছে, তাহা তুমি বিবেচনা কর না । তুমি স্বৈরাচারী - কারণ, তুমি পুরাতন দলের হাতে ক্ষমতা ছাড়িয়া দিতে রাজি নও ।" - লেনিন

=================================


"পার্টি হইতেছে শ্রেণী সংগঠনগুলির সর্বোত্তম রূপ এবং সর্বহারাশ্রেণীর অন্য প্রকারের সংগঠনের মধ্যেও এই সংগঠনের রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রসার লাভ করা কর্তব্য ।" - লেনিন

এই কারণেই পার্টি-বহির্ভূত সংগঠনসমূহে 'স্বাধীনতা' ও 'নিরপেক্ষতার' সুবিধাবাদী মতবাদ লেনিনবাদের তত্ত্ব ও ব্যবহারিক প্রয়োগের সহিত একেবারেই খাপ খায় না । আইনসভার মধ্যে পার্টি হইতে বিচ্ছিন্ন সদস্য ও সংবাদপত্র জগতে স্বাধীন সাংবাদিকদের উদ্ভব হয় এই মতবাদের প্রশ্রয়েই; এই মতবাদের ফলেই ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে সংকীর্ণচেতা কর্মীদের উদ্ভব হয় এবং সমবায়-সমিতি আন্দোলনে আত্মতুষ্ট ও পন্ডিতমূর্খ কর্মকর্তাদের আসর ইহার ফলেই জমিয়া উঠে ।

=================================


শ্রমিকশ্রেণীর পক্ষে পার্টির প্রয়োজন কেবল একাধিপত্য কায়েম করার জন্যই নয়, এই একাধিপত্যকে বজায় রাখার জন্য শ্রমিকশ্রেণীর পক্ষে পার্টি আরও বেশি প্রয়োজন, সমাজতন্ত্রের পূর্ণ সাফল্য আয়ত্ত করার উদ্দেশ্যে এই একাধিপত্যকে দৃঢ়তর ও সম্প্রসারিত করার জন্য শ্রমিকশ্রেণীর পক্ষে পার্টি প্রয়োজন । লেনিন বলিয়াছিলেন :
"এখন প্রায় প্রত্যেকেই নিশ্চয়ই উপলব্ধি করিতেছেন যে, পার্টির ভিতর কঠোরতম ও প্রকৃত পক্ষে লৌহকঠিন শৃঙ্খলা না থাকিলে এবং সমগ্র শ্রমিকশ্রেণীর পরিপূর্ণ ও অকুন্ঠ সমর্থন না পাইলে অর্থাৎ শ্রমিকশ্রেণীর মধ্যে যাঁহারা পশ্চাৎপদ স্তরকে সংগ্রামে টানিয়া আনিতে ও চালনা করিতে সক্ষম সেইরূপ চিন্তাশীল, সৎ, আত্মত্যাগী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের পূর্ণ সমর্থন না পাইলে, এই দীর্ঘ আড়াই বছর ধরিয়া কেন, আড়াই মাসও বলশেভিকদের পক্ষে ক্ষমতা বজায় রাখা সম্ভব হইত না ।"

একাধিপত্য 'বজায় রাখা' ও 'সম্প্রসারিত করা' বলিতে কী বুঝায় - লক্ষ লক্ষ শ্রমিককে শৃঙ্খলা ও সংগঠনের প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ করা; শ্রমিক সাধারণের সংহতির শক্তি গড়িয়া তোলা, এবং খুদে বুর্জোয়াদেড় ক্ষয়কারক প্রভাব ও অভ্যাসের সংস্পর্শ হইতে শ্রমিকশ্রেণীকে রক্ষা করিবার উপযোগী দুর্ভেদ্য শক্তি গঠন করা, পেটি-বুর্জোয়া স্তরকে নতুনভাবে শিক্ষা দিয়া নতুন সমাজজীবনের উপযোগী করিয়া তাহাদের গড়িয়া তোলার জন্য সর্বহারাদের সাংগঠনিক কাজের সম্প্রসারণ করা । শ্রেণীভেদ দূর করিতে এবং সমাজতান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থা সংগঠিত করার অনুকূল অবস্থা গড়িয়া তুলিতে শ্রমিকশ্রেণী যাহাতে সক্ষম হয় সেই জন্য তাহাকে উপযুক্ত শক্তি হিসাবে শিক্ষিত হইয়া উঠিতে সাহায্য করা । কিন্তু দৃঢ়তা ও শৃঙ্খলার দিক হইতে শক্তিশালী এক পার্টি ব্যতীত এইসব কাজ সুসম্পন্ন করা অসম্ভব । লেনিন বলিয়াছেন :
"সর্বহারাশ্রেণীর একাধিপত্য বলিতে বুঝায় পুরাতন সমাজের শক্তি ও রীতিনীতির বিরুদ্ধে নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম । এই সংগ্রাম কখনো চলে ভীষণ রক্তপাতের মধ্য দিয়ে, কখনো রক্তপাত ছাড়া, কখনো সশস্ত্র উপায়ে কখনো শান্তিপূর্ণভাবে, এই সংগ্রাম সামরিক ও অর্থনৈতিক, শিক্ষার ক্ষেত্রে ও শাসনবিভাগেও এই সংগ্রাম চলে । লক্ষ লক্ষ, কোটি কোটি লোকের অভ্যস্ত জীবনধারার শক্তি সাংঘাতিক । বহু সংগ্রামের অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ লৌহ-দৃঢ় এক পার্টি ব্যতীত, শ্রমিকশ্রেণীর মধ্যে সমস্ত সৎ লোকের বিশ্বাসভাজন পার্টি ব্যতীত জনগণের মনোভাবের প্রতি লক্ষ্য রাখিয়া তাহাদের ঠিক পথে পরিচালিত করার উপযোগী প্রভাবশালী পার্টি ব্যতীত ঐ সংগ্রাম সাফল্যজনকভাবে পরিচালিত করা অসম্ভব । স্বকীয় একাধিপত্য বজায় রাখার জন্য সর্বহারাশ্রেণীর পক্ষে পার্টি প্রয়োজন । পার্টি সর্বহারাশ্রেণীর একাধিপত্য প্রতিষ্ঠার একটি হাতিয়ার ।

সুতরাং সমাজে যখন কোন শ্রেণীর অস্তিত্ব থাকিবে না এবং সর্বহারাশ্রেণীর একাধিপত্যের যখন ক্রমবিলোপ ঘটিবে, তখন পার্টিরও ক্রমবিলোপ ঘটিবে ।

=================================


"বর্তমান তীব্র অন্তর্যুদ্ধের যুগের কমিউনিস্ট পার্টি যদি খুব কেন্দ্রীভূতভাবে সুসংবদ্ধ হয় এবং পার্টির মধ্যে লৌহকঠিন শৃঙ্খলা যদি সামরিক শৃঙ্খলার পর্যায়ে উন্নীত হয়, পার্টিকেন্দ্র যদি শক্তি ও কর্তৃত্বের আধার হয়, এই কেন্দ্র যদি ব্যাপক ক্ষমতার অধিকারী ও পার্টি সভ্যদের বিশ্বাসভাজন হয়, - তবেই শুধু কমিউনিস্ট পার্টি বর্তমান তীব্র অন্তর্যুদ্ধের যুগে তাহার কর্তব্য সম্পাদন করিতে সক্ষম হয় ।" - লেনিন

=================================


"সর্বহারাশ্রেণীর পার্টির লৌহকঠিন শৃঙ্খলা যাহারাই বিন্দুমাত্র খর্ব করে, বিশেষত সর্বহারাশ্রেণীর একাধিপত্যের যুগে, তাহারাই শ্রমিকশ্রেণীর বিরুদ্ধে বুর্জোয়াদেরই সাহায্য করে ।" - লেনিন

=================================


...পার্টির দশম কংগ্রেসে 'পার্টি-ঐক্য' বিষয়ক প্রস্তাবে লেনিন "পার্টি ঐক্যের দিক হইতে উপদল গঠনের ক্ষতিকর ফল" সম্বন্ধে সকলকে সাবধান করিয়া দিয়াছেন, এবং "সর্বহারাশ্রেণীর একাধিপত্য সাফল্যমন্ডিত করার জন্য সর্বহারাশ্রেণীর অগ্রগামী বাহিনীর মধ্যে সম্মিলিত ইচ্ছা গড়িয়া তোলাকেই মূল শর্ত" বলিয়া ঘোষণা করিয়াছেন ।

এই কারণেই "পার্টির মধ্যে উপদলীয় নীতি বরবাদ করিতে এবং কোনরকম ব্যতিক্রম না দেখাইয়া পার্টির ভিতরকার সমস্ত উপদল অবিলম্বে নিশ্চিহ্ন করিতে" লেনিন দাবি জানাইয়াছেন । "যে-সব উপদল আলাদা নীতি ও কর্মপদ্ধতি অনুসরণ করিতেছে তাহাদের ধ্বংসের জন্য প্রয়োজন হইলে বিনা শর্তে এখনই পার্টি হইতে তাহাদের বহিষ্কারের" জন্যও তিনি দাবি জানাইয়াছেন ।

=================================


"বুর্জোয়া-মনোভাবাপন্ন এই সব শ্রমিককে 'বাবু-শ্রমিক' বলিলেই ঠিক হয়; জীবনযাত্রার প্রণালী, উপার্জনের পরিমাণ ও দৃষ্টিভঙ্গির দিক হইতে ইহারা সম্পূর্ণরূপে পন্ডিতমূর্খদের সামিল; এই স্তরের শ্রমিকরাই দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের প্রধান খুঁটি এবং আমাদের যুগে বুর্জোয়াশ্রেণীর প্রধান সামাজিক (সামরিক নয়) অবলম্বন ইহারাই । শ্রমিক আন্দোলনে ইহারাই বুর্জোয়াদের প্রধান দালাল; ধনিকশ্রেণীর পক্ষ হইয়া শ্রমিকদের নেতৃত্ব করে, বিপ্লবের পরিবর্তে সংস্কার ও শ্রেণীসংগ্রামের পরিবর্তে জঙ্গি জাতিদর্পের উন্মাদনা প্রচারের ইহারাই প্রধান বাহন ।" - লেনিন
=================================


"আমাদের মধ্যে সংস্কারপন্থী ও মেনশেভিকদের থাকিতে দিলে শ্রমিকবিপ্লবের জয়লাভ করা অসম্ভব, বিপ্লবের সাফল্য বজায় রাখা অসম্ভব । নীতির দিক হইতে একথা খুব স্পষ্ট এবং রাশিয়া ও হাঙ্গেরি উভয় দেশেরই অভিজ্ঞতা এই কথাই পরিষ্কার সমর্থন করিয়াছে । রাশিয়াতে অনেকবারই এমন দূরূহ অবস্থার উদ্ভব হইয়াছে যখন এই শ্রেণীর সুবিধাবাদী ও মেনশেভিকরা, সংস্কারপন্থী মধ্যবিত্ত ও গণতন্ত্রীরা আমাদের পার্টির মধ্যে থাকিলে সোভিয়েতের রাষ্ট্র নিশ্চয়ই উচ্ছন্নে যাইত । ইতালিতে ক্ষমতা দখলের জন্য বুর্জোয়াশ্রেণীর ও শ্রমিকশ্রেণীর মধ্যে চরম সংগ্রামের দিন ঘনাইয়া আসিয়াছে, একথা সাধারণত স্বীকার করা হইয়া থাকে । এই অবস্থায় মেনশেভিক, সংস্কারপন্থী ও তুরাতিপন্থীদের পার্টি হইতে বহিষ্কার করা একান্ত প্রয়োজন; শুধু তাই নয়; সে সব চমৎকার কমিউনিস্ট এখনো মত ও পথ ঠিক করিতে না পারিয়া অনিশ্চয়তার দোলায় দুলিতেছে এবং সংস্কারপন্থীদের হিত 'ঐক্য' স্থাপনের দিকে ঝুঁকিতেছে, তাহাদেরও দায়িত্বশীল পদ হইতে অপসারণ করা দরকার । ... বিপ্লবের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে যখন তীব্রতম সংগ্রামের ভিতর দিয়া অগ্রসর হইতে হয়, তখন পার্টির মধ্যে বিন্দুমাত্র দ্বিধাসংকোচ থাকিলে তাহার ফলে শ্রমিকশ্রেণীর হাত হইতে ক্ষমতা খসিয়া পড়িতে পারে; কারণ এই ক্ষমতা অদ্যাবধি সুদৃঢ় হইয়া উঠে নাই, ইহার বিরুদ্ধে আক্রমণ এখনো বেশ জোরালো । এই অবস্থায় অস্থিরমতি নেতারা যদি পার্টির কাজ হইতে অবসর গ্রহণ করে, তাহা হইলে পার্টি এবং শ্রমিকশ্রেণীর আন্দোলন ও বিপ্লবের শক্তি তাহার ফলে খর্ব তো হইবেই না, বরং বৃদ্ধিই পাইবে ।" - লেনিন



Tuesday, 25 October 2016

আমি কি বাঙালি ? সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙার অন্যতম কারণ যে অঙ্গ রাজ্যগুলির ওপর রুশ ভাষার জবরদস্তি, তা আমাদের কত্তারা খেয়াল করেন না ।


বামপন্থীরা কেউ বাঙালি বা ভারতীয় নয় । মার্কসবাদ তো বিশ্বমানবিক আদর্শ । প্রখ্যাত ঐতিহাসিক টয়েনবি বলেছিলেন, কমিউনিজমের প্রধান প্রতিদ্বন্ধী হবে ন্যাশনালিজম, তাতে তাঁরা কর্ণপাত করেননি । মার্কসবাদী হয়েও চিন ও রাশিয়া নিজেদের সীমানা সম্পর্কে স্পর্শকাতর, সমাজতন্ত্রী হয়েও যে হাঙ্গেরি ও রুমানিয়ার মধ্যে তিক্ত ঝগড়া লেগেই ছিল, তাও তাঁরা দেখেও দেখতে চাননি । এবং দেশের উগ্র বামপন্থীরা বাঙালির যা কিছু গর্বের বস্তু, তাকে ভাঙতে বসলেন । রামমোহন সামন্ততন্ত্রের প্রতিভূ, বিদ্যাসাগর সিপাহিবিদ্রোহ সমর্থন করেননি সুতরাং প্রতিক্রিয়াশীল, রবীন্দ্রনাথ বুর্জোয়া কবি, সুভাষ বোস ফ্যাসিস্ত ! বিবেকানন্দ উল্লেখেরও অযোগ্য । তাঁদের সভা-সমিতিতে মার্কস-লেনিন-স্তালিনের বড় বড় ছবি ঝুলছে, বাঙালি তথা ভারতীয় কেউ স্থান পাননি । এমনকি মুজাফফর আহমেদের ছবিও না । মহাত্মা গান্ধী কংগ্রেসের সম্পত্তি, সুতরাং বামপন্থীদের কাছে অচ্ছুত ।


যাঁরা নিজেদের বাঙালি বলে পরিচয় দিতে লজ্জা বোধ করেন, যাঁরা আন্তর্জাতিক মানসিকতার অধিকারী বলে মনে করেন নিজেদের, তারা ভুলে যান যে নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে পরিপূর্ণ ভাবে অবহিত না হলে কোনও মানুষেরই মানসিক গঠন সম্পূর্ণ হয় না । যার পা দুটি গাঁথা থাকবে নিজের দেশের মাটিতে চোখ থাকবে নিজস্ব পারিপার্শ্বিকে আর চিন্তায় থাকবে সারা পৃথিবীর সভ্যতার ইতিহাস, সেই প্রকৃত আন্তর্জাতিক মানুষ । অ্যারিস্টটল থেকে মাও জে ডং পর্যন্ত অনেকেই এমন কথা বলে গেছেন । বাঙালির ঐতিহ্যকে অগ্রাহ্য করে প্রগতিশীল হওয়া যায় না ।

Thursday, 18 August 2016

তর্কপ্রিয় ভারতীয় - রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর ভারতবর্ষ

 রবীন্দ্রনাথ বরাবরই জোরালো ভাষায় ব্রিটিশ শাসনের সমালোচনা করে এসেছেন । যত দিন গেছে তা আরও জোরালো হয়েছে । এই ব্যাপারটা প্রায়ই লোকের নজর এড়িয়ে যায় । তার কারণ, তিনি বিশেষভাবে সচেষ্ট ছিলেন, যাতে ব্রিটিশ শাসনের সমালোচনার সঙ্গে ব্রিটিশ কিংবা পাশ্চাত্য দেশের মানুষ এবং সংস্কৃতির বিরূপ সমালোচনা না হয়ে যায় । ইংল্যান্ডে গাঁধীকে যখন প্রশ্ন করা হয়েছিল, পাশ্চাত্য সভ্যতা সম্পর্কে তাঁর অভিমত কী, তার জবাবে তাঁর সেই বিখ্যাত উক্তিটি, ("সে বস্তুটি থাকলে তো ভালই হত") রবীন্দ্রনাথের মুখ থেকে বেরোতে পারত না । কীসের প্ররোচনায় গাঁধীর এই প্রতিক্রিয়া হয়েছিল, রবীন্দ্রনাথ তা বুঝতে পারতেন - সাম্রাজ্যবাদী অত্যাচারের সঙ্গে সাংস্কৃতিক আত্মম্ভরিতা যুক্ত হয়েছিল । এই সাংস্কৃতিক দম্ভের এক চমৎকার দৃষ্টান্ত ডি. এইচ. লরেন্সের মধ্যে পাই : 'যতদিন যাচ্ছে আমি দেখে আরও বিস্মিত হচ্ছি, প্রকৃতপক্ষে প্রাচ্যের অধিবাসীরা, -- ভারতীয় এবংগ পারসিকেরা - যা কোনওদিন স্বপ্নেও দেখতে পারেনি, আমাদের ইউরোপীয় সভ্যতা তার চেয়ে কত উচ্ছে অবস্থিত । ... অতি ন্যক্কারজনক তাদের প্রতি এই মিথ্যা শ্রদ্ধার ভান, এই অবাঞ্চিত রবীন্দ্রপূজা ।' কিন্তু, তামাশার ছলেও, রবীন্দ্রনাথ পাশ্চাত্য সভ্যতাকে গাঁধীর মতো খারিজ করে দিতে পারেননি ।

Sunday, 7 August 2016

আম্বেদকর একটি সমাজতাত্ত্বিক পর্যালোচনা ১

সি কে কোলে নাম একজন সমাজ সংস্কারক ১৯২৬ সালে মুম্বাই বিধি সভায় এক প্রস্তাব রেখেছিলেন এইভাবে - সমস্ত প্রকাশ্য সামাজিক লোকালয়ে দলিতদের সমাজের মূল স্রোতের মতো মুখ্য অধিকার দেওয়া হোক । সেই সর্বজনীন অধিকারবোধের তালিকার অন্তর্গত হল যথাক্রমে বিচারালয়ের সমান অধিকার, বিদ্যালয়ে প্রবেশাধিকার ও পঠন, কুয়োর জল ব্যবহারের অধিকার এবং বাজার করবার সমতা দেন প্রভৃতি । দলিতদের জন্য এর প্রতিটির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা যেন বাধ্যতামূলক তুলে নেওয়া হয় । ওই আনীত প্রস্তাবের ভিত্তিতেই প্রণয়ন করা হল নতুন এক আইন । নতুন আইন মোতাবেক কোলাবার প্রসিদ্ধ 'চৌদুয়ার' জলাশয় দলিতদের ব্যবহার করবার অবাধ অনুমতি করা হল ।কিন্তু ওখানকার প্রচলিত নিয়ম মেনে পুরোনোপন্থীরা দলিতদের জল ব্যবহারে অযথা বাধা সৃষ্টি করত । তাই দলিতদের আইনী দাবির পূর্ণ কার্যকারিতার লক্ষ্যে বহিষ্কৃত হিতকারিনী সভা ১৯২৭ সালে ১৯/২০ মার্চে মাহারে এক পরিষদ তৈরি করল ।  ওই পরিষদের কর্মসূচী অনুযায়ী হাজার হাজার অস্পৃশ্য মানবমানবী একত্রিত হয়েছিলেন । ওখানে বাবাসাহেব বলেন, গণজাগরণের পর্ব সমাপ্ত হয়েছে, এখন চেতনার প্রত্যক্ষ রূপায়ণের প্রয়োজন । নেওয়া হল, সত্যাগ্রহ আন্দোলনের শপথসূচী । মহারাষ্ট্রের সমস্ত প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে প্রায় পাঁচ হাজার দলিত মাহার অভিযান সফল করলেন । ওই জনসভায় ১৫ বছরের দলিত থেকে ৭৫ বছরের অস্পৃশ্যদের জমায়েত ছিল নারী-পুরুষ নির্বিশেষে । ... গোটা জনসভা চারভাগে বিভক্ত হল । পূর্ণ শৃঙ্খলিত মর্যাদায় তারা এগিয়ে চলল পুকুরের দিকে । ভারতীয় সমাজ সংস্কারের ইতিহাসে এই সত্যাগ্রহ আন্দোলনের বিশেষ মাহাত্ম্য আছে । বাবাসাহেব স্বয়ং গেলেন পুকুর পর্যন্ত । চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে জল স্পর্শ করলেন আর আঁজলা ভরে সেই জল পান করলেন । হাজার হাজার মানুষ আম্বেদকরের পদাঙ্ক অনুসরণ করলেন । ... এদিকে গোঁড়াপন্থীরা ভেবে নিল, পুকুরের জল তো অশুদ্ধ । এদিকে বিকল্প কোনো জলের ব্যবস্থাও নেই । কীভাবে তাদের তৃষ্ণার পানীয় জল পাওয়া যায় ? তখন এই পুকুর থেকে ১০৭ ঘড়া জল তুলে নিল, ওতে মিশিয়ে দিল গোমূত্র আর গোবর । এবার ওই জল পুকুরে মিশিয়ে ঘোষণা করে দিল যে পুকুরের জল বিশুদ্ধ হয়ে গেছে । কি আশ্চর্য অসঙ্গতিময়, অজ্ঞান অন্ধ বিচারক্ষমতা আর সিদ্ধান্ত দান । মানুষের স্পর্শে অশুদ্ধ জল জন্তুজানোয়ারের বর্জ্য পদার্থের সংশ্রবে শুদ্ধ হয়ে গেল । এই ছিল তৎকালীন সামাজিক সনাতনী অভিধার স্মারক কথা ।


'আমার সংঘর্ষ তত্ত্বের বিরুদ্ধে, কোনো ব্যক্তিসত্তা বা জাতিগোষ্ঠীর বিরোধিতায় নয় । পুনের একজন ব্রাহ্মণ মহিলা এই সত্যাগ্রহে যোগদানের ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন । ওঁকে আমি কীভাবে নিবারণ করব ? আমার সংঘর্ষ ব্রাহ্মণদের অন্ধ কাঠিন্যের সঙ্গে । কিন্তু প্রগতিশীল উদারনৈতিক মানবতাবাদী ব্রাহ্মণদের সহযোগিতা আমি কীভাবে এড়িয়ে যাব ?'


১৯২৭ সালের ২৫শে ডিসেম্বর সকলকে বিস্মিত করে বাবাসাহেব মনুস্মৃতির প্রসঙ্গ তুলে মাহারে ইতিহাসের পুনর্মূল্যায়ন করলেন । 'মনুস্মৃতি' বলে বর্ণব্যবস্থা শাস্ত্রানুগ, শাস্ত্রসিদ্ধ । মনু সামাজিক বৈষম্য সমর্থন করেছেন শূদ্র জাতির নিন্দা করে । তাই তিনি প্রকাশ্যে জ্বালিয়ে দিলেন 'মনুস্মৃতি'। আত্মস্বাতন্ত্র্যবোধের পূর্ণ সন্ধান লাভ করতে গেলে এই গ্রন্থ প্রতি মুহূর্তের অন্তরায় । অস্পৃশ্যদের কাছে গ্রন্থটি অপমানজনক বলেই তিনি সেটিকে দগ্ধ করবার সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে জানিয়ে দিয়েছিলেন । 'মনুস্মৃতি' দগ্ধ করে বাবাসাহেব সামাজিক পরাধীনতার বিরুদ্ধে কার্যত যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন ।


নাসিকের কলারাম মন্দিরে প্রবেশ ঘিরে সত্যাগ্রহ আন্দোলনে সবর্ণদের মানসিকতায় বিক্ষুব্ধ হয়ে দলিতরা ১৯২৮ সালে নাসিকেই এক শীর্ষ বৈঠক করেন । বৈঠকে পৌরোহিত্য করবার জন্য ভাবা হল ডঃ বাবাসাহেবের নাম । দলিত বর্ণের উদ্দেশ্য ছিল স্বতন্ত্র মন্দির নির্মাণ প্রকল্প । কিন্তু পরিষদের অধ্যক্ষপদের স্থান থেকে বাবাসাহেব এই কর্মসূচীর বিরোধিতাই করলেন ।

তিনি বললেন, নিজের সন্তের নামাঙ্কিত মন্দির নির্মাণে কোনো সফল উদেশ্য চরিতার্থ হবে না । উল্টে গোটা ঘটনাটাই তখন ওই পরিস্থিতিতে আগুনে ঘি ঢালার মতো হিতে বিপরীত ডেকে আনবে । কেননা, অস্পৃশ্যতার কলঙ্ক নিয়ে স্বতন্ত্র দেবমন্দির গঠনে সেই সামাজিক দূরত্ব আরও স্বকৃত জটিলতা সৃষ্টি করবে । তাছাড়া এই জাতীয় মন্দির নির্মাণে ব্যয়ভার বহনের দায় বর্তাবে গরিবগুর্বো দলিতদের ওপর । আর দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি হল বাবাসাহেব কোনোদিনই মানুষের চাইতে দেবতার মূর্তি পুজোয় সায় দেননি ।


১৯২৮-এ মুম্বাই-এ দেড় লক্ষ মজুর নিজেদের অধিকারের দাবী তুলে হরতাল করেছিলেন । ওই হরতালে দলিতদের ভূমিকায় ছিল উল্লেখযোগ্য প্রাধান্য আর বৈচিত্র্য । হরতাল শেষ না হলে দলিতদের আত্মহত্যা করা ছাড়া বিকল্প পথ খোলা ছিল না । তাই ওই হরতালের প্রতি সমর্থন নয় বিরোধিতা করেছিলেন বাবাসাহেব । উনি আরও সূক্ষ্মভাবে লক্ষ্য করেছিলেন যে সবর্ণেরা নেতৃত্বের দিক থেকে দলিত মজুরদের শ্রমিক মজুর রূপে না দেখে শুধু দলিত রূপেই দেখে । ভেতরে ভেতরে দলিতদের জন্য দূরত্বময় ঘৃণা আর উপেক্ষাই তাদের লক্ষ্য । এমনকি দলিতদের অপমানজনক, সম্মানহানির কাজগুলোই করতে হত । তাই আম্বেদকর ভেবে নিলেন, শিক্ষা ব্যতীত দলিত-সামাজিক-জীবনের কোনো পরিবর্তিত পরিস্থিতি তৈরি হবে না ।


জাতিপ্রথার অসহনীয় রক্ষণশীলতা ভেঙে ফেলবার জন্য অসবর্ণ অন্তর্বিবাহকেই মাধ্যম হিসেবে মনে মনে স্বীকৃতি জানিয়েছিলেন বাবাসাহেব ।


বাবাসাহেব বললেন যে, কংগ্রেসীদের মতামত স্ববিরোধী । মুখে তাঁরা বলছেন, জাতপাতের ঊর্ধ্বে মনুষ্যত্বের ওপর বিশ্বাস তৈরি বাঞ্চনীয় । কিন্তু কার্যত শ্লোগান দেবার কর্মসূচীতে অন্যরকম বক্তব্য । এখানে হিন্দু সমাজ মনে করে, কেবল হিন্দু-মুসলমানেরই সমস্যা বর্তমান । কিন্তু দলিতদের কোনো সমস্যার অস্তিত্ব সম্বন্ধে তারা উদাসীন । এমনকি কোনো সমস্যা শোনবার মতো তাদের ধৈর্যও নেই । তাই ভবিষ্যতে এ দেশের গঠিত সংবিধানে দলিতদের অধিকার বোধের আর সুরক্ষা সম্পর্কে নিরাপত্তা থাকা দরকার । তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে এদেশের অস্পৃশ্যদের অধিকার ফিরিয়ে দেবেনই, এমনকি রক্তের শেষ বিন্দু দিয়ে তাদের হৃত সম্মানবোধ প্রতিষ্ঠা করে যাবেন । তিনি স্পষ্টই জানিয়ে দেন যে ভবিষ্যতে শুধুমাত্র হিন্দুদের একচেটিয়া সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ঔদ্ধত্য মেনে নেবেন না কোনো মূল্যেই ।


বাবাসাহেব বলেছিলেন, 'মহাত্মাজী আমার কোনো মাতৃভূমি নেই ।' গান্ধীজী উত্তর দিয়েছিলেন, 'আপনার মাতৃভূমি আছে, এটিই আপনার জন্মস্থান ।' বাবাসাহেব পুনরায় বললেন, 'আবার বলছি আমার কোনো মাতৃভূমি নেই ।' গান্ধীজী অবাক-দৃষ্টিতে সপ্রশ্ন হলেন । আম্বেদকর বলেছিলেন যে কুকুরের থেকেও নিম্নমানের জীবনধারণ প্রক্রিয়ায় কেউ জন্মস্থানকে মাতৃভূমি বলে চিহ্নিত করতে পারে না ।


তৃতীয় গোলমেজ অধিবেশনে যোগদানের আগে পুনেতে আহূত এক সভায় তিনি বলেছিলেন যে 'দেশদ্রোহী', 'রাষ্ট্রদ্রোহী', 'হিন্দুধর্ম-বিধ্বংসী' বলে আখ্যাত ব্যক্তিত্বটি তিনি নিজেই । কারণ এই সমাজে জন্ম নিয়ে এই সমাজেই তাঁর মৃত্যু অনিবার্য । হিন্দুদের মন বলে কিছু নেই । ওঁরা নির্জীব । ওঁদের মন পাথর আর ইঁটের দেওয়ালের মতো দুর্লঙ্ঘনীয় । ওই দেয়ালে মাথা ঠোকাই সার হবে । ওতে মাথা চৌচির হলেও হিন্দুদের মনের কোনো পরিবর্তন হবে না ।


দলিত সমাজের পতন এবং কমজোরী আন্দোলনের জন্য দায়ী হিন্দু সমাজ । সমাজে সমান প্রবেশাধিকার পাওয়ার জন্য, ব্যক্তিগত সমান অধিকারে, মানবতায় দীক্ষিত হওয়ার তাগিদে দ্বিতীয় কোনো ধর্মে দীক্ষিত হতে পারা যায় না কি ? অর্থাৎ সমান্তরাল ধর্মচিন্তার কথায় তখন তিনি আন্দোলিত । ওই একটি বিন্দুতে যুক্তিদানের দক্ষ উচ্চারণ স্পষ্ট হল ওঁর কণ্ঠে । 'তথাকথিত হিন্দুধর্মের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করো, স্বাভিমান আর শান্তির লক্ষে অন্যত্র যাও । কিন্তু স্মরণে রাখবে, তোমার নির্বাচিত ধর্মবোধে যেন সমান অধিকারবোধ, সম আচরণ ক্ষেত্র আর সমস্তর চেতনার স্পন্দন থাকে ।' বক্তৃতার অন্তিম অংশটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর - 'আমি অস্পৃশ্য জাতিতে জন্ম নিয়েছি, এতে কোনো অপরাধ ছিল না, কিন্তু মৃত্যুর সময় আমি হিন্দুরূপে থাকব না ।'


১৯৩৫ সালে আইনমাফিক অনেক প্রদেশে নির্বাচন ঘোষণা করা হয় । দলিতদের লড়াইকে অধিক গতিময় করে তোলবার তাগিদেই তিনি 'স্বতন্ত্র মজদুর পার্টি' স্থাপন করেন । ১৯৩৬-এর ১৫ই আগস্ট 'টাইমস অফ ইন্ডিয়া'-কে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে বাবাসাহেব বলেছিলেন দেশ শাসনে অপ্রত্যক্ষ বা প্রত্যক্ষ রীতিতে ভাগনির্ভর করে নিজের আনুকূল্য না তৈরি করে দলিত আর শোষিত বর্গের দুঃখ দূরীভূত করা যাবেই না ।অন্য কেউ দলিত বা শোষিত বর্গের কাজ করবে না । সে আশাও দুরাবহ । তাই মজুর পার্টির স্বাতন্ত্র্য আবশ্যিক । লক্ষ্য করবার বিষয় হল যে, বাবাসাহেব এখানে দলিত শব্দের স্থানে 'মজুর' শব্দের সচেতন প্রয়োগ করলেন । .... মজুরদের প্রকাশ্য সভায় বলতেন দুনিয়ায় দুই বর্গ বর্তমান - (১) বড়লোক, (২) গরীবলোক । শোষক আর শোষিত । তৃতীয়স্থানে মধ্যমবর্গ । ওদের বর্গ অত্যন্ত ক্ষুদ্র । তাই কৃষক আর মজুর নিজের অবস্থান চিহ্নিত করে নিক । জাতি ধর্ম বর্ণ নিরপেক্ষতায় মজুর সংগঠনের আবশ্যিকতা রয়ে গেছে । ডঃ আম্বেদকরজীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈপ্লবিক কর্মবিন্যাসের অন্তর্গত হল, ভারতীয় মজুরদের স্বতন্ত্র ধারণাবোধ ।


কংগ্রেসের ঐতিহাসিক 'ভারতছাড়ো' আন্দোলনের সূচনা পর্ব ঘোষিত হয় । বাবাসাহেব উল্টে বলেছিলেন - 'ছাড়ো ভারতের চেয়ে আমি নতুন ভারতের প্রতীক্ষায় থাকব ।'


'৪৭ সালের ১৪ই জুলাই ব্রিটিশ সংসদে ভারতের স্বাধীনতার প্রস্তাব আনীত হয় এবং সংবিধানসভার হাতে পূর্ণ অধিকার দেওয়া হয় । সংবিধান সমিতির সিদ্ধান্তে বাবাসাহেব বাংলা বিধানসভা থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন । কিন্তু বঙ্গভঙ্গের কারণে ওঁর সদস্যপদ আপনাআপনি রুদ্ধ হয়ে যায় । সংবিধান সভায় বাবাসাহেবের মতো বড় মাপের পন্ডিতের উপস্থিতি সর্বজনস্বীকৃত । সংবিধান সভায় ওঁর প্রতিনিধিত্বের দাবীতে ডঃ জয়কর ত্যাগপত্র পেশ করলেন । মুম্বাই বিধিমন্ডলের কংগ্রেস পার্টি আম্বেদকরজীকে নির্বাচিত করেন ।


সমস্ত বিশ্বের গণতান্ত্রিক সংবিধানের রূপরেখার সতর্ক অধ্যয়নে ভারতের সংবিধানকে দিতে চেয়েছিলেন স্বতন্ত্র মাত্রা । এমন এক নিরপেক্ষ রূপকার হতে চাইলেন এই কর্মী বিপ্লবী মানুষটি, যেখানে মানুষের বর্ণ, বর্গ, ভাষা বা লিঙ্গবৈষম্য কোনোভাবেই মানবতাকে আঘাত না করে । প্রতিটি মানুষের সুযোগ্য অধিকারবোধের সচেতন প্রয়োগকুশলতাকে তিনি গুরুত্ব দিতে চেয়েছিলেন ।


সংবিধানের গুরুত্ব সম্বন্ধে মতামত দিতে গিয়ে বাবাসাহেব বলেন যে ভারতীয় সংবিধানে সম্বন্বিত তত্ত্ব ওই শতাব্দীর ব্যক্তিত্বচিহ্নিত স্বতন্ত্র চেতনামাত্র । সভাগৃহের মূল বক্তব্য আর সিদ্ধান্ত সংবিধানে ব্যক্ত হয়েছে । সংবিধানের ভালো-মন্দ নির্ভর করে শাসনকর্তার প্রয়োগদক্ষতার ওপর । সংবিধান সভায় ভাষণ দেবার সময় ভারতীয় জনগণের উদ্দেশ্যে তিনি সাবধানবাণী উচ্চারণ করেছিলেন । বলেছিলেন, রাজনৈতিক পার্টিগুলো রাষ্ট্রহিতের পরিবর্তে নিজেদের ক্ষুদ্র অস্তিত্ববোধের স্বার্থ দেখলে ভারতের স্বাধীনতা বিপন্ন হবে । এছাড়াও তিনি আঙ্গুলি সংকেত করেছিলেন দ্বিতীয় এক অশনি নির্দেশের প্রতি । সেটি হল ব্যক্তিপূজার ধারণা । যে কোনো পরিস্থিতিতেই জনগণ ব্যাক্তিস্বাতন্ত্র্যবোধ থেকে যেন বিচ্যুত না হয়ে যায় । আত্মমর্যাদাবোধ সমর্পন করে কোনো ব্যাক্তিমানুষকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া অনুচিত । সেই ব্যক্তিমানুষ যত বড়ই হোক না কেন, সমগ্র জাতীয়তাবোধের ঊর্ধ্বে তার গুরুত্ব নেই । নির্বোধ অন্ধ আনুগত্যময় ব্যক্তিপুজো দেশের স্বাধীন চেতনাকে আঘাত করতে পারে । বাবাসাহেব আরও স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে সামাজিক আর অর্থনৈতিক উন্নতিপ্রকল্পে জনগণের সাংবিধানিক পথকেই মর্যাদা দেওয়া কর্তব্য । অসংবিধানিকতার পদাঙ্ক অনুসরণের নাম অরাজকতার পৃষ্ঠপোষকতা । এছাড়া তিনি দেশের জনগণকে শুধু রাজনৈতিক স্বার্থবোধে লালিত হতে নিষেধ করলেন । কেননা সামাজিক অসাম্যতায় কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতার অর্থ হল স্বল্পসংখ্যক মানুষের বহুসংখ্যক মানুষের ওপর কর্তৃত্বের কায়েম করতে দেওয়া । অর্থাৎ ক্ষমতায়ণ চিহ্নিত হয়েই রইবে মুষ্টিমেয় মানুষের কুক্ষিগত স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর ।