Tuesday, 25 October 2016

আমি কি বাঙালি ? সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙার অন্যতম কারণ যে অঙ্গ রাজ্যগুলির ওপর রুশ ভাষার জবরদস্তি, তা আমাদের কত্তারা খেয়াল করেন না ।


বামপন্থীরা কেউ বাঙালি বা ভারতীয় নয় । মার্কসবাদ তো বিশ্বমানবিক আদর্শ । প্রখ্যাত ঐতিহাসিক টয়েনবি বলেছিলেন, কমিউনিজমের প্রধান প্রতিদ্বন্ধী হবে ন্যাশনালিজম, তাতে তাঁরা কর্ণপাত করেননি । মার্কসবাদী হয়েও চিন ও রাশিয়া নিজেদের সীমানা সম্পর্কে স্পর্শকাতর, সমাজতন্ত্রী হয়েও যে হাঙ্গেরি ও রুমানিয়ার মধ্যে তিক্ত ঝগড়া লেগেই ছিল, তাও তাঁরা দেখেও দেখতে চাননি । এবং দেশের উগ্র বামপন্থীরা বাঙালির যা কিছু গর্বের বস্তু, তাকে ভাঙতে বসলেন । রামমোহন সামন্ততন্ত্রের প্রতিভূ, বিদ্যাসাগর সিপাহিবিদ্রোহ সমর্থন করেননি সুতরাং প্রতিক্রিয়াশীল, রবীন্দ্রনাথ বুর্জোয়া কবি, সুভাষ বোস ফ্যাসিস্ত ! বিবেকানন্দ উল্লেখেরও অযোগ্য । তাঁদের সভা-সমিতিতে মার্কস-লেনিন-স্তালিনের বড় বড় ছবি ঝুলছে, বাঙালি তথা ভারতীয় কেউ স্থান পাননি । এমনকি মুজাফফর আহমেদের ছবিও না । মহাত্মা গান্ধী কংগ্রেসের সম্পত্তি, সুতরাং বামপন্থীদের কাছে অচ্ছুত ।


যাঁরা নিজেদের বাঙালি বলে পরিচয় দিতে লজ্জা বোধ করেন, যাঁরা আন্তর্জাতিক মানসিকতার অধিকারী বলে মনে করেন নিজেদের, তারা ভুলে যান যে নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে পরিপূর্ণ ভাবে অবহিত না হলে কোনও মানুষেরই মানসিক গঠন সম্পূর্ণ হয় না । যার পা দুটি গাঁথা থাকবে নিজের দেশের মাটিতে চোখ থাকবে নিজস্ব পারিপার্শ্বিকে আর চিন্তায় থাকবে সারা পৃথিবীর সভ্যতার ইতিহাস, সেই প্রকৃত আন্তর্জাতিক মানুষ । অ্যারিস্টটল থেকে মাও জে ডং পর্যন্ত অনেকেই এমন কথা বলে গেছেন । বাঙালির ঐতিহ্যকে অগ্রাহ্য করে প্রগতিশীল হওয়া যায় না ।

Thursday, 18 August 2016

তর্কপ্রিয় ভারতীয় - রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর ভারতবর্ষ

 রবীন্দ্রনাথ বরাবরই জোরালো ভাষায় ব্রিটিশ শাসনের সমালোচনা করে এসেছেন । যত দিন গেছে তা আরও জোরালো হয়েছে । এই ব্যাপারটা প্রায়ই লোকের নজর এড়িয়ে যায় । তার কারণ, তিনি বিশেষভাবে সচেষ্ট ছিলেন, যাতে ব্রিটিশ শাসনের সমালোচনার সঙ্গে ব্রিটিশ কিংবা পাশ্চাত্য দেশের মানুষ এবং সংস্কৃতির বিরূপ সমালোচনা না হয়ে যায় । ইংল্যান্ডে গাঁধীকে যখন প্রশ্ন করা হয়েছিল, পাশ্চাত্য সভ্যতা সম্পর্কে তাঁর অভিমত কী, তার জবাবে তাঁর সেই বিখ্যাত উক্তিটি, ("সে বস্তুটি থাকলে তো ভালই হত") রবীন্দ্রনাথের মুখ থেকে বেরোতে পারত না । কীসের প্ররোচনায় গাঁধীর এই প্রতিক্রিয়া হয়েছিল, রবীন্দ্রনাথ তা বুঝতে পারতেন - সাম্রাজ্যবাদী অত্যাচারের সঙ্গে সাংস্কৃতিক আত্মম্ভরিতা যুক্ত হয়েছিল । এই সাংস্কৃতিক দম্ভের এক চমৎকার দৃষ্টান্ত ডি. এইচ. লরেন্সের মধ্যে পাই : 'যতদিন যাচ্ছে আমি দেখে আরও বিস্মিত হচ্ছি, প্রকৃতপক্ষে প্রাচ্যের অধিবাসীরা, -- ভারতীয় এবংগ পারসিকেরা - যা কোনওদিন স্বপ্নেও দেখতে পারেনি, আমাদের ইউরোপীয় সভ্যতা তার চেয়ে কত উচ্ছে অবস্থিত । ... অতি ন্যক্কারজনক তাদের প্রতি এই মিথ্যা শ্রদ্ধার ভান, এই অবাঞ্চিত রবীন্দ্রপূজা ।' কিন্তু, তামাশার ছলেও, রবীন্দ্রনাথ পাশ্চাত্য সভ্যতাকে গাঁধীর মতো খারিজ করে দিতে পারেননি ।

Sunday, 7 August 2016

আম্বেদকর একটি সমাজতাত্ত্বিক পর্যালোচনা ১

সি কে কোলে নাম একজন সমাজ সংস্কারক ১৯২৬ সালে মুম্বাই বিধি সভায় এক প্রস্তাব রেখেছিলেন এইভাবে - সমস্ত প্রকাশ্য সামাজিক লোকালয়ে দলিতদের সমাজের মূল স্রোতের মতো মুখ্য অধিকার দেওয়া হোক । সেই সর্বজনীন অধিকারবোধের তালিকার অন্তর্গত হল যথাক্রমে বিচারালয়ের সমান অধিকার, বিদ্যালয়ে প্রবেশাধিকার ও পঠন, কুয়োর জল ব্যবহারের অধিকার এবং বাজার করবার সমতা দেন প্রভৃতি । দলিতদের জন্য এর প্রতিটির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা যেন বাধ্যতামূলক তুলে নেওয়া হয় । ওই আনীত প্রস্তাবের ভিত্তিতেই প্রণয়ন করা হল নতুন এক আইন । নতুন আইন মোতাবেক কোলাবার প্রসিদ্ধ 'চৌদুয়ার' জলাশয় দলিতদের ব্যবহার করবার অবাধ অনুমতি করা হল ।কিন্তু ওখানকার প্রচলিত নিয়ম মেনে পুরোনোপন্থীরা দলিতদের জল ব্যবহারে অযথা বাধা সৃষ্টি করত । তাই দলিতদের আইনী দাবির পূর্ণ কার্যকারিতার লক্ষ্যে বহিষ্কৃত হিতকারিনী সভা ১৯২৭ সালে ১৯/২০ মার্চে মাহারে এক পরিষদ তৈরি করল ।  ওই পরিষদের কর্মসূচী অনুযায়ী হাজার হাজার অস্পৃশ্য মানবমানবী একত্রিত হয়েছিলেন । ওখানে বাবাসাহেব বলেন, গণজাগরণের পর্ব সমাপ্ত হয়েছে, এখন চেতনার প্রত্যক্ষ রূপায়ণের প্রয়োজন । নেওয়া হল, সত্যাগ্রহ আন্দোলনের শপথসূচী । মহারাষ্ট্রের সমস্ত প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে প্রায় পাঁচ হাজার দলিত মাহার অভিযান সফল করলেন । ওই জনসভায় ১৫ বছরের দলিত থেকে ৭৫ বছরের অস্পৃশ্যদের জমায়েত ছিল নারী-পুরুষ নির্বিশেষে । ... গোটা জনসভা চারভাগে বিভক্ত হল । পূর্ণ শৃঙ্খলিত মর্যাদায় তারা এগিয়ে চলল পুকুরের দিকে । ভারতীয় সমাজ সংস্কারের ইতিহাসে এই সত্যাগ্রহ আন্দোলনের বিশেষ মাহাত্ম্য আছে । বাবাসাহেব স্বয়ং গেলেন পুকুর পর্যন্ত । চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে জল স্পর্শ করলেন আর আঁজলা ভরে সেই জল পান করলেন । হাজার হাজার মানুষ আম্বেদকরের পদাঙ্ক অনুসরণ করলেন । ... এদিকে গোঁড়াপন্থীরা ভেবে নিল, পুকুরের জল তো অশুদ্ধ । এদিকে বিকল্প কোনো জলের ব্যবস্থাও নেই । কীভাবে তাদের তৃষ্ণার পানীয় জল পাওয়া যায় ? তখন এই পুকুর থেকে ১০৭ ঘড়া জল তুলে নিল, ওতে মিশিয়ে দিল গোমূত্র আর গোবর । এবার ওই জল পুকুরে মিশিয়ে ঘোষণা করে দিল যে পুকুরের জল বিশুদ্ধ হয়ে গেছে । কি আশ্চর্য অসঙ্গতিময়, অজ্ঞান অন্ধ বিচারক্ষমতা আর সিদ্ধান্ত দান । মানুষের স্পর্শে অশুদ্ধ জল জন্তুজানোয়ারের বর্জ্য পদার্থের সংশ্রবে শুদ্ধ হয়ে গেল । এই ছিল তৎকালীন সামাজিক সনাতনী অভিধার স্মারক কথা ।


'আমার সংঘর্ষ তত্ত্বের বিরুদ্ধে, কোনো ব্যক্তিসত্তা বা জাতিগোষ্ঠীর বিরোধিতায় নয় । পুনের একজন ব্রাহ্মণ মহিলা এই সত্যাগ্রহে যোগদানের ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন । ওঁকে আমি কীভাবে নিবারণ করব ? আমার সংঘর্ষ ব্রাহ্মণদের অন্ধ কাঠিন্যের সঙ্গে । কিন্তু প্রগতিশীল উদারনৈতিক মানবতাবাদী ব্রাহ্মণদের সহযোগিতা আমি কীভাবে এড়িয়ে যাব ?'


১৯২৭ সালের ২৫শে ডিসেম্বর সকলকে বিস্মিত করে বাবাসাহেব মনুস্মৃতির প্রসঙ্গ তুলে মাহারে ইতিহাসের পুনর্মূল্যায়ন করলেন । 'মনুস্মৃতি' বলে বর্ণব্যবস্থা শাস্ত্রানুগ, শাস্ত্রসিদ্ধ । মনু সামাজিক বৈষম্য সমর্থন করেছেন শূদ্র জাতির নিন্দা করে । তাই তিনি প্রকাশ্যে জ্বালিয়ে দিলেন 'মনুস্মৃতি'। আত্মস্বাতন্ত্র্যবোধের পূর্ণ সন্ধান লাভ করতে গেলে এই গ্রন্থ প্রতি মুহূর্তের অন্তরায় । অস্পৃশ্যদের কাছে গ্রন্থটি অপমানজনক বলেই তিনি সেটিকে দগ্ধ করবার সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে জানিয়ে দিয়েছিলেন । 'মনুস্মৃতি' দগ্ধ করে বাবাসাহেব সামাজিক পরাধীনতার বিরুদ্ধে কার্যত যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন ।


নাসিকের কলারাম মন্দিরে প্রবেশ ঘিরে সত্যাগ্রহ আন্দোলনে সবর্ণদের মানসিকতায় বিক্ষুব্ধ হয়ে দলিতরা ১৯২৮ সালে নাসিকেই এক শীর্ষ বৈঠক করেন । বৈঠকে পৌরোহিত্য করবার জন্য ভাবা হল ডঃ বাবাসাহেবের নাম । দলিত বর্ণের উদ্দেশ্য ছিল স্বতন্ত্র মন্দির নির্মাণ প্রকল্প । কিন্তু পরিষদের অধ্যক্ষপদের স্থান থেকে বাবাসাহেব এই কর্মসূচীর বিরোধিতাই করলেন ।

তিনি বললেন, নিজের সন্তের নামাঙ্কিত মন্দির নির্মাণে কোনো সফল উদেশ্য চরিতার্থ হবে না । উল্টে গোটা ঘটনাটাই তখন ওই পরিস্থিতিতে আগুনে ঘি ঢালার মতো হিতে বিপরীত ডেকে আনবে । কেননা, অস্পৃশ্যতার কলঙ্ক নিয়ে স্বতন্ত্র দেবমন্দির গঠনে সেই সামাজিক দূরত্ব আরও স্বকৃত জটিলতা সৃষ্টি করবে । তাছাড়া এই জাতীয় মন্দির নির্মাণে ব্যয়ভার বহনের দায় বর্তাবে গরিবগুর্বো দলিতদের ওপর । আর দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি হল বাবাসাহেব কোনোদিনই মানুষের চাইতে দেবতার মূর্তি পুজোয় সায় দেননি ।


১৯২৮-এ মুম্বাই-এ দেড় লক্ষ মজুর নিজেদের অধিকারের দাবী তুলে হরতাল করেছিলেন । ওই হরতালে দলিতদের ভূমিকায় ছিল উল্লেখযোগ্য প্রাধান্য আর বৈচিত্র্য । হরতাল শেষ না হলে দলিতদের আত্মহত্যা করা ছাড়া বিকল্প পথ খোলা ছিল না । তাই ওই হরতালের প্রতি সমর্থন নয় বিরোধিতা করেছিলেন বাবাসাহেব । উনি আরও সূক্ষ্মভাবে লক্ষ্য করেছিলেন যে সবর্ণেরা নেতৃত্বের দিক থেকে দলিত মজুরদের শ্রমিক মজুর রূপে না দেখে শুধু দলিত রূপেই দেখে । ভেতরে ভেতরে দলিতদের জন্য দূরত্বময় ঘৃণা আর উপেক্ষাই তাদের লক্ষ্য । এমনকি দলিতদের অপমানজনক, সম্মানহানির কাজগুলোই করতে হত । তাই আম্বেদকর ভেবে নিলেন, শিক্ষা ব্যতীত দলিত-সামাজিক-জীবনের কোনো পরিবর্তিত পরিস্থিতি তৈরি হবে না ।


জাতিপ্রথার অসহনীয় রক্ষণশীলতা ভেঙে ফেলবার জন্য অসবর্ণ অন্তর্বিবাহকেই মাধ্যম হিসেবে মনে মনে স্বীকৃতি জানিয়েছিলেন বাবাসাহেব ।


বাবাসাহেব বললেন যে, কংগ্রেসীদের মতামত স্ববিরোধী । মুখে তাঁরা বলছেন, জাতপাতের ঊর্ধ্বে মনুষ্যত্বের ওপর বিশ্বাস তৈরি বাঞ্চনীয় । কিন্তু কার্যত শ্লোগান দেবার কর্মসূচীতে অন্যরকম বক্তব্য । এখানে হিন্দু সমাজ মনে করে, কেবল হিন্দু-মুসলমানেরই সমস্যা বর্তমান । কিন্তু দলিতদের কোনো সমস্যার অস্তিত্ব সম্বন্ধে তারা উদাসীন । এমনকি কোনো সমস্যা শোনবার মতো তাদের ধৈর্যও নেই । তাই ভবিষ্যতে এ দেশের গঠিত সংবিধানে দলিতদের অধিকার বোধের আর সুরক্ষা সম্পর্কে নিরাপত্তা থাকা দরকার । তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে এদেশের অস্পৃশ্যদের অধিকার ফিরিয়ে দেবেনই, এমনকি রক্তের শেষ বিন্দু দিয়ে তাদের হৃত সম্মানবোধ প্রতিষ্ঠা করে যাবেন । তিনি স্পষ্টই জানিয়ে দেন যে ভবিষ্যতে শুধুমাত্র হিন্দুদের একচেটিয়া সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ঔদ্ধত্য মেনে নেবেন না কোনো মূল্যেই ।


বাবাসাহেব বলেছিলেন, 'মহাত্মাজী আমার কোনো মাতৃভূমি নেই ।' গান্ধীজী উত্তর দিয়েছিলেন, 'আপনার মাতৃভূমি আছে, এটিই আপনার জন্মস্থান ।' বাবাসাহেব পুনরায় বললেন, 'আবার বলছি আমার কোনো মাতৃভূমি নেই ।' গান্ধীজী অবাক-দৃষ্টিতে সপ্রশ্ন হলেন । আম্বেদকর বলেছিলেন যে কুকুরের থেকেও নিম্নমানের জীবনধারণ প্রক্রিয়ায় কেউ জন্মস্থানকে মাতৃভূমি বলে চিহ্নিত করতে পারে না ।


তৃতীয় গোলমেজ অধিবেশনে যোগদানের আগে পুনেতে আহূত এক সভায় তিনি বলেছিলেন যে 'দেশদ্রোহী', 'রাষ্ট্রদ্রোহী', 'হিন্দুধর্ম-বিধ্বংসী' বলে আখ্যাত ব্যক্তিত্বটি তিনি নিজেই । কারণ এই সমাজে জন্ম নিয়ে এই সমাজেই তাঁর মৃত্যু অনিবার্য । হিন্দুদের মন বলে কিছু নেই । ওঁরা নির্জীব । ওঁদের মন পাথর আর ইঁটের দেওয়ালের মতো দুর্লঙ্ঘনীয় । ওই দেয়ালে মাথা ঠোকাই সার হবে । ওতে মাথা চৌচির হলেও হিন্দুদের মনের কোনো পরিবর্তন হবে না ।


দলিত সমাজের পতন এবং কমজোরী আন্দোলনের জন্য দায়ী হিন্দু সমাজ । সমাজে সমান প্রবেশাধিকার পাওয়ার জন্য, ব্যক্তিগত সমান অধিকারে, মানবতায় দীক্ষিত হওয়ার তাগিদে দ্বিতীয় কোনো ধর্মে দীক্ষিত হতে পারা যায় না কি ? অর্থাৎ সমান্তরাল ধর্মচিন্তার কথায় তখন তিনি আন্দোলিত । ওই একটি বিন্দুতে যুক্তিদানের দক্ষ উচ্চারণ স্পষ্ট হল ওঁর কণ্ঠে । 'তথাকথিত হিন্দুধর্মের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করো, স্বাভিমান আর শান্তির লক্ষে অন্যত্র যাও । কিন্তু স্মরণে রাখবে, তোমার নির্বাচিত ধর্মবোধে যেন সমান অধিকারবোধ, সম আচরণ ক্ষেত্র আর সমস্তর চেতনার স্পন্দন থাকে ।' বক্তৃতার অন্তিম অংশটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর - 'আমি অস্পৃশ্য জাতিতে জন্ম নিয়েছি, এতে কোনো অপরাধ ছিল না, কিন্তু মৃত্যুর সময় আমি হিন্দুরূপে থাকব না ।'


১৯৩৫ সালে আইনমাফিক অনেক প্রদেশে নির্বাচন ঘোষণা করা হয় । দলিতদের লড়াইকে অধিক গতিময় করে তোলবার তাগিদেই তিনি 'স্বতন্ত্র মজদুর পার্টি' স্থাপন করেন । ১৯৩৬-এর ১৫ই আগস্ট 'টাইমস অফ ইন্ডিয়া'-কে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে বাবাসাহেব বলেছিলেন দেশ শাসনে অপ্রত্যক্ষ বা প্রত্যক্ষ রীতিতে ভাগনির্ভর করে নিজের আনুকূল্য না তৈরি করে দলিত আর শোষিত বর্গের দুঃখ দূরীভূত করা যাবেই না ।অন্য কেউ দলিত বা শোষিত বর্গের কাজ করবে না । সে আশাও দুরাবহ । তাই মজুর পার্টির স্বাতন্ত্র্য আবশ্যিক । লক্ষ্য করবার বিষয় হল যে, বাবাসাহেব এখানে দলিত শব্দের স্থানে 'মজুর' শব্দের সচেতন প্রয়োগ করলেন । .... মজুরদের প্রকাশ্য সভায় বলতেন দুনিয়ায় দুই বর্গ বর্তমান - (১) বড়লোক, (২) গরীবলোক । শোষক আর শোষিত । তৃতীয়স্থানে মধ্যমবর্গ । ওদের বর্গ অত্যন্ত ক্ষুদ্র । তাই কৃষক আর মজুর নিজের অবস্থান চিহ্নিত করে নিক । জাতি ধর্ম বর্ণ নিরপেক্ষতায় মজুর সংগঠনের আবশ্যিকতা রয়ে গেছে । ডঃ আম্বেদকরজীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈপ্লবিক কর্মবিন্যাসের অন্তর্গত হল, ভারতীয় মজুরদের স্বতন্ত্র ধারণাবোধ ।


কংগ্রেসের ঐতিহাসিক 'ভারতছাড়ো' আন্দোলনের সূচনা পর্ব ঘোষিত হয় । বাবাসাহেব উল্টে বলেছিলেন - 'ছাড়ো ভারতের চেয়ে আমি নতুন ভারতের প্রতীক্ষায় থাকব ।'


'৪৭ সালের ১৪ই জুলাই ব্রিটিশ সংসদে ভারতের স্বাধীনতার প্রস্তাব আনীত হয় এবং সংবিধানসভার হাতে পূর্ণ অধিকার দেওয়া হয় । সংবিধান সমিতির সিদ্ধান্তে বাবাসাহেব বাংলা বিধানসভা থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন । কিন্তু বঙ্গভঙ্গের কারণে ওঁর সদস্যপদ আপনাআপনি রুদ্ধ হয়ে যায় । সংবিধান সভায় বাবাসাহেবের মতো বড় মাপের পন্ডিতের উপস্থিতি সর্বজনস্বীকৃত । সংবিধান সভায় ওঁর প্রতিনিধিত্বের দাবীতে ডঃ জয়কর ত্যাগপত্র পেশ করলেন । মুম্বাই বিধিমন্ডলের কংগ্রেস পার্টি আম্বেদকরজীকে নির্বাচিত করেন ।


সমস্ত বিশ্বের গণতান্ত্রিক সংবিধানের রূপরেখার সতর্ক অধ্যয়নে ভারতের সংবিধানকে দিতে চেয়েছিলেন স্বতন্ত্র মাত্রা । এমন এক নিরপেক্ষ রূপকার হতে চাইলেন এই কর্মী বিপ্লবী মানুষটি, যেখানে মানুষের বর্ণ, বর্গ, ভাষা বা লিঙ্গবৈষম্য কোনোভাবেই মানবতাকে আঘাত না করে । প্রতিটি মানুষের সুযোগ্য অধিকারবোধের সচেতন প্রয়োগকুশলতাকে তিনি গুরুত্ব দিতে চেয়েছিলেন ।


সংবিধানের গুরুত্ব সম্বন্ধে মতামত দিতে গিয়ে বাবাসাহেব বলেন যে ভারতীয় সংবিধানে সম্বন্বিত তত্ত্ব ওই শতাব্দীর ব্যক্তিত্বচিহ্নিত স্বতন্ত্র চেতনামাত্র । সভাগৃহের মূল বক্তব্য আর সিদ্ধান্ত সংবিধানে ব্যক্ত হয়েছে । সংবিধানের ভালো-মন্দ নির্ভর করে শাসনকর্তার প্রয়োগদক্ষতার ওপর । সংবিধান সভায় ভাষণ দেবার সময় ভারতীয় জনগণের উদ্দেশ্যে তিনি সাবধানবাণী উচ্চারণ করেছিলেন । বলেছিলেন, রাজনৈতিক পার্টিগুলো রাষ্ট্রহিতের পরিবর্তে নিজেদের ক্ষুদ্র অস্তিত্ববোধের স্বার্থ দেখলে ভারতের স্বাধীনতা বিপন্ন হবে । এছাড়াও তিনি আঙ্গুলি সংকেত করেছিলেন দ্বিতীয় এক অশনি নির্দেশের প্রতি । সেটি হল ব্যক্তিপূজার ধারণা । যে কোনো পরিস্থিতিতেই জনগণ ব্যাক্তিস্বাতন্ত্র্যবোধ থেকে যেন বিচ্যুত না হয়ে যায় । আত্মমর্যাদাবোধ সমর্পন করে কোনো ব্যাক্তিমানুষকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া অনুচিত । সেই ব্যক্তিমানুষ যত বড়ই হোক না কেন, সমগ্র জাতীয়তাবোধের ঊর্ধ্বে তার গুরুত্ব নেই । নির্বোধ অন্ধ আনুগত্যময় ব্যক্তিপুজো দেশের স্বাধীন চেতনাকে আঘাত করতে পারে । বাবাসাহেব আরও স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে সামাজিক আর অর্থনৈতিক উন্নতিপ্রকল্পে জনগণের সাংবিধানিক পথকেই মর্যাদা দেওয়া কর্তব্য । অসংবিধানিকতার পদাঙ্ক অনুসরণের নাম অরাজকতার পৃষ্ঠপোষকতা । এছাড়া তিনি দেশের জনগণকে শুধু রাজনৈতিক স্বার্থবোধে লালিত হতে নিষেধ করলেন । কেননা সামাজিক অসাম্যতায় কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতার অর্থ হল স্বল্পসংখ্যক মানুষের বহুসংখ্যক মানুষের ওপর কর্তৃত্বের কায়েম করতে দেওয়া । অর্থাৎ ক্ষমতায়ণ চিহ্নিত হয়েই রইবে মুষ্টিমেয় মানুষের কুক্ষিগত স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর । 

Thursday, 28 July 2016

আম্বেদকর একটি সমাজতাত্ত্বিক পর্যালোচনা

ধর্ম সংস্কারক, সমাজ সংস্কারক, ব্রাহ্মণ্যবাদ বিরোধী, হিন্দু ধর্ম বিরোধী, অর্থনীতিবিদ, রাজনৈতিক নেতা, সংবিধানের মুখ্য স্থপতি, শিক্ষাবিদ - এই বিশেষণগুলির সবকটিই সত্য, কিন্তু এর কোনো একটিকে নিয়ে তাঁর পূর্ণাঙ্গ জীবনের রূপকে ধরা সম্ভব নয় ।


“Lost sights are never regained by begging and by appeals to the conscience of the usurpers but by relentless struggle’. তিনি মনে করেছিলেন ভারতের স্বাধীনতা মানেই ভারতের জনগণের স্বাধীনতা নয় । প্রথমটা যে দ্বিতীয়টাকে সুনিশ্চিত করবে এমন কোন কথা নেই । আর আম্বেদকর জনগণের স্বাধীনতার স্বাধীনতার ধারণাতেই বেশি আগ্রহী ছিলেন ।

রাজনৈতিক সংস্কার ও সামাজিক সংস্কারের মধ্যে আম্বেদকর সামাজিক সংস্কারের ধারণাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন । প্রকৃত সংস্কার কখনই কার্যকরী হবে না যদি না সামাজিক বিষয়টা অবহেলিত থাকে । তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে অধিকার আইনের দ্বারা রক্ষিত হয় না - অধিকার রক্ষা হয় প্রধানত 'সামাজিক ও নৈতিক বিবেক' দ্বারা ।মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী কালো মানুষদের কাছে মৌলিক অধিকারের কি গুরুত্ব আছে ? জার্মানীতে ইহুদি দমন হয়েছিল আইনী অধিকার সে দেশে সুপ্রতিষ্ঠিত থাকা সত্ত্বেও । ভারতে নীচু জাতিগুলির কাছেও তেমনি সংবিধান, মৌলিক অধিকার - এগুলি অর্থহীন কারণ রাজনৈতিক গণতন্ত্র সত্ত্বেও সামাজিক স্বৈরাচার চালু থাকতে পারে । তাই রাজনৈতিক ক্ষেত্রে গণতন্ত্র যদি সামাজিক ক্ষেত্রে গণতন্ত্রে দ্বারা পরিপূরিত না হয় তা হলে 'রাজনৈতিক গণতন্ত্র' ধারণাটিই অর্থহীন হয়ে পড়ে ।


"We must make our political democracy a social democracy as well. Political democracy cannot last unless there lies at the base of it social democracy. What does social democracy mean? It means a way of life which recognizes liberty, equality and fraternity as the principles of life.”


আম্বেদকর বলেছিলেন, "On 26.1.1950, we are going to enter a life of contradictions.”


দলিত সম্প্রদায়ের মধ্যে শিক্ষার আলো প্রবেশ করাতে হবে এবং আন্দোলনের জন্য তাদের সংগঠিত করতে হবে, যে তিনটি slogan তিনি দিয়েছিলেন তা হল 'educate, agitate and organize.' দলিত সম্প্রদায়ের জন্য আলাদা প্রতিনিধিত্বের কথা তিনি বলেছিলেন এবং কংগ্রেসের তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও এর সপক্ষে ব্রিটিশদের সওয়াল করেছিলেন, শেষ পর্যন্ত ১৯৩২ সালে গান্ধী এবং আম্বেদকরের মধ্যে Poona Pact সম্পাদিত হয় যার মাধ্যমে কংগ্রেস দলিতদের জন্য আরও বেশি প্রতিনিধিত্বের ধারণাকে মেনে নিয়েছিল এবং যা ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের মধ্যে স্বীকৃতি পায় । আম্বেদকর বলেছিলেন, "My criterion of my work is the welfare of my community. I have no other ambition. For that only, I cooperated with the Congress.” তিনি বলেছিলেন, “Whatever I have achieved, is entirely due to the strength of my community. I am proud to be born a Harijan.”


তাঁর মতে, হিন্দুরা টিঁকে রয়েছে সমস্যাগুলিকে এড়িয়ে গিয়ে - তার মুখোমুখি হয়ে সমাধান করে নয় । হিন্দু সমাজের প্রগতিশীলতার ধারণাকে তিনি তীব্রভাবে সমালোচনা করেছেন, কারণ তিনি মনে করেছিলেন যে সমাজ জাতি-ব্যবস্থা ও অসাম্যের ওপর নির্ভরশীল, তা কখনও সামাজিক ন্যায়কে প্রতিষ্ঠা করতে পারে না - সেই সমাজ কখনও প্রগতিশীল বলে পরিগণিত হতে পারে না ।


তিনি বলেছিলেন যে, হিন্দু সমাজ শূদ্রদের যে চোখে দেখে, নারীদেরও সেই একইভাবে দেখে - উভয়ের ক্ষেত্রেই সমাজ তাদের কোনো অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়নি । হিন্দু বিবাহের নিয়ম হচ্ছে - 'polygamy for the man and perpetual slavery for the woman' । তাই নারীর অধিকারের প্রশ্নটি হচ্ছে দাসত্ব না স্বাধীনতা-এর কোনটি প্রাধান্য পাবে সেই প্রশ্ন ! বিবাহ বিচ্ছেদের অধিকার নিয়ে সেই সময়ে যে বিতর্ক চলেছিল সেখানে আম্বেদকর এক পরিস্কার stand নিয়েছিলেন । তিনি বলেছিলেন, যে বিবাহ বিচ্ছেদের বিষয়টি হিন্দু সমাজে প্রচলিতই রয়েছে । 'Shudras forming 90 p.c. of the population had customary divorce. Are we for 90 p.c. or for 10 p.c. of the high caste people?' আম্বেদকর বলেছিলেন, "হিন্দুসমাজের বর্ণাশ্রম ব্যবস্থা কেবলমাত্র পুরুষদের জন্য নারীর বর্ণাশ্রম নেই, কেন ? তারা কি মানব সমাজের বাইরে ? তারা কি গুণহীন ? হিন্দু শাস্ত্রকারদের মতে নারীমাত্রই শূদ্রাণী এবং তার কোন স্বাধীন সত্তা নেই । নারী সমাজের প্রতি এত বড় অসম্মান আর কোনো ধর্ম করেনি ।"


========================================================================

আর্যদের ভারতে পদসঞ্চারের সময় কোনো জাতিবিভেদজনিত প্রথা ছিল না । কিন্তু ব্যবসার ওপর বর্গীকরণ করবার প্রবণতা ছিল । ভারতীয় সাহিত্যে প্রথমে 'বর্ণ' শব্দের উল্লেখ ছিল, 'জাতি' শব্দের প্রয়োগ ঘটেছে অনেক পরে । 'বর্ণ' শব্দের প্রয়োগ মূলত গায়ের রঙ নির্ভর । ধর্মশাস্ত্রতে জাতি ও বর্ণের প্রয়োগ সমার্থক । এইখানেই ডঃ আম্বেদকরের আগমনের প্রস্তুতি ক্ষেত্রের বীজ নিহিত রয়েছে । বৈদিকযুগে আর্যসমাজে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় এবং বৈশ্যদের মধ্যে বর্গীকরণ ছিল না । ঋকবেদের যুগে শূদ্ররা তিরস্কৃতও ছিল না । আদতে ঋকবেদে ছিল তিনটি বর্ণ - ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় এবং বৈশ্য । উপনিষদের সময় থেকে চতুর্থ বর্গ তথা শূদ্র সম্প্রদায়ের নির্মিতি করা হয়েছে । উপনিষদের কালসীমা প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ১২০০ থেকে ৬০০ পর্যন্ত । স্পষ্টত উল্লেখ্য, বর্ণ আর জাতি বিভাজনের নাম মানুষের অবনমন এবং সর্বাত্মক ক্ষেত্রে অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার প্রবণতা খুবই প্রাচীনকালজাত । গুনকেন্দ্রিক বর্ণব্যবস্থার রূপান্তরীকরণ এবং জন্মগ্রহণ কবে, কিভাবে কোন সালে হয়েছে, তার নিশ্চিত প্রমাণ সঠিকভাবে প্রত্যক্ষ নয় । আসলে এই প্রক্রিয়া হয়েছে অত্যন্ত ধীরে ধীরে । প্রকৃত জ্ঞান আর তর্কচেতনাকে বহিষ্কার করে ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি লাভকেন্দ্রিক অনুভবের প্রহর থেকেই জন্মসূত্রকেন্দ্রিক জাতিব্যবস্থার প্রচলন হয়েছে । সমাজশোধনকারী 'মনুস্মৃতি' থেকে নবীন সমাজ ব্যবস্থায়  জন্মসূত্রে ব্রাহ্মণের শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকৃত । সামাজিক বর্গীকরণ পুরোপুরি জন্মভিত্তিক ।  বর্গীকরণের জন্মসূত্রকেন্দ্রিকতায় শূদ্র আর অচ্ছুতের মানবিক অধিকারবোধ সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত । ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে তাদের অস্তিত্ব সুস্থ-মানবিকতা । কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, মনুর পূর্বেই শূদ্র আর অচ্ছুতের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে । সমাজের তথাকথিত প্রচলিত নিয়মাবলি মনু ক্রমানুসারে শাস্ত্রবন্দী করে গেছেন । বিদগ্ধদের অনুমান, মনুর সময়সীমা খ্রিস্টপূর্ব ২০০ । সূচনাপর্ব থেকে 'মনুস্মৃতি' অনেক স্তরে বিন্যস্ত । গ্রন্থটির পূর্ণাঙ্গ রচনাকাল একটি নির্দিষ্ট সময়বন্দী না হয়ে খ্রিস্টপূর্ব ২০০ থেকে খ্রিস্টীয় ২০ পর্যন্ত বিস্তৃত । গৌতমবুদ্ধের জন্মকালীন সময়সীমা হল খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ৬০০'র মধ্যে । তথাকথিত যজ্ঞব্যবস্থা বা বর্ণবিভাজনের তীব্র বিরোধিতা করে মানবতাবোধের আদর্শে নিজের দর্শন তৈরি করেছিলেন বুদ্ধদেব । এখানে একটা কথা স্পষ্ট যে, কিছু মানুষের স্বার্থকেন্দ্রিক ক্রুরতার প্রভাবে তামাম পদদলিত মানুষ প্রায় তিন হাজার বছর থেকেই ক্রন্দনরত । বর্ণব্যবস্থার ভিন্নতর নির্বাচনী সূত্র ধরে বুদ্ধদেব 'সমতাবাদী ব্যবস্থা' স্থাপনের চেষ্টা করেছিলেন । কিন্তু এর স্থিতিশীলতা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি । কেননা, বর্ণব্যবস্থায় এ যাবৎকাল প্রচলিত একদল মানুষের উদ্দেশ্যবোধ আর তথাকথিত নিরাপত্তা যে এক্ষেত্রে বিঘ্নিত হল; তাই ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির প্রশ্নে বৌদ্ধধর্মকে স্বীকার করতে তারা দ্বিধাগ্রস্ত হল । আবার বৌদ্ধধর্ম এত তর্কশুদ্ধ আর মানবিক ছিল যে, তার বিরোধিতাও প্রায় অসম্ভব ছিল । তাই শ্রেষ্ঠ মূল্যবোধকে স্বীকার করে নিয়ে বৌদ্ধধর্মকে আত্মপক্ষের আনুকূল্যে প্রযুক্ত করা হয়েছিল । এখানেও যখন সম্ভব-অসম্ভবের প্রশ্ন এল, তখন হিন্দুধর্মকেই বৌদ্ধধর্মের অনুকূল করবার চেষ্টা করা হল । এই কারণেই 'শঙ্করাচার্য' 'প্রচ্ছন্ন বুদ্ধ' নাম খ্যাত ।


উচ্চবর্ণ নিম্নবর্ণকে ক্ষুদ্র মনে করত আর নিম্নবর্ণও হীনম্মন্যতায় ভুগত । বর্ণব্যবস্থায় প্রান্তিক শূদ্র এবং তার নিম্নে অবস্থানকারী শূদ্র সর্বদাই উপেক্ষিত, অপাংক্তেয় আর অপমানিত হত । ধর্মের ধুয়ো তুলে সমাজের সর্বক্ষেত্রেই তারা  অপাংক্তেয় ছিল । পৃথিবীর কোনো দেশে ধর্ম বা সর্বশক্তিমানের এদেশের নির্ভরতায় একটি সম্পূর্ণ বর্ণের এত ঘোরতর উপেক্ষা হয়নি । ভারতবর্ষেই এটি ঘটেছে । কোনো গোষ্ঠীকে বর্ণ বা জাতির নাম দিয়ে সমাজব্যবস্থার মূল ছাঁচ থেকে ক্রম-বহিষ্কারে স্বাভাবিক মানবিক অধিকারের বঞ্চনায় তৈরি করে নেওয়া হয় পূর্ণ গোলামিতে । ওই গোষ্ঠী নিরুপায় হয়ে গোলামির পরাধীনতায় সমর্পিত হয় । মানুষের সংবেদনশীলতা একমাত্র নির্ণীত হয় জ্ঞানের কারণে । শিক্ষাকেন্দ্রিক জ্ঞানের অভাবেই তাদের সংবেদনশীল সচেতনতা জন্ম নেয়নি ।


শ্রী জ্যোতিরাও গোবিন্দরাও ফুলে (১৮২৭ - ১৮৯০)  ব্যাক্তিত্ব, যিনি উপেক্ষিত ভারতীয় কৃষকসমাজের প্রতি ইংরেজ শাসকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন । তাঁর স্থির ধারণা ছিল যে, ভারতীয় চাষীদের দুর্দশা-গ্রস্ততার অন্যতম কারণত্রয়ী হল, অজ্ঞানতা, অন্ধ-অনুগত্য এবং ধর্মান্ধতা ।


ভারতীয় সমাজসংস্কারের তিনটি সূত্র বাবাসাহেবের চিন্তাশীলতায় গৃহীত । সূত্র তিনটি হল - 'পড়ো', 'সংগঠিত হয়ে যাও' এবং 'সংঘর্ষ করো' ।

========================================================================




  

Wednesday, 25 May 2016

বাল্মীকির রাম ফিরে দেখা - সুকুমারী ভট্টাচার্য

রাম উপাখ্যানে কতগুলো প্রশ্ন জাগে । প্রথমত, বালী বধ বিষয়ে । স্পষ্টতই ক্ষত্রিয় বীরের পক্ষে কাজটা গর্হিত, এক বানররাজাকে আড়ালে লুকিয়ে থেকে হত্যা করা, এটা কোনো নীতিতেই সমর্থন করা যায় না । উত্তরে যদি বলি, সীতাকে খুঁজে পাবার জন্যে সুগ্রীবের সাহায্য অত্যাবশ্যক ছিল, তাহলেও প্রশ্ন ওঠে যে এতে রামের বীরত্ব সম্বন্ধে জাগে । সম্মুখ-সমরে তাহলে বালীকে হারাবার শক্তি বা সে শক্তি সম্বন্ধে আত্মবিশ্বাস রামের ছিল না । এটা এক যশস্বী ক্ষত্রিয়বীরের পক্ষে গ্লানিকর । কাজটা কাপুরুষোচিত, সম্পূর্ণ স্বার্থ প্রনেদিত । এবং আরও কলঙ্ককর হলো, বালীকে নিজের প্রজা বলে শাসন করেছেন বলা, বানর মাংস অভক্ষ্য তবুও বালী হত্যাকে মৃগয়া বলা এবং আনুষঙ্গিক বিস্তর কুযুক্তির অবতারণা করা।

গুহকের আতিথ্য গ্রহণ না করার মধ্যেও বর্ণ-বৈষম্যের প্রশ্ন ওঠে । ফলাহারী ঋষিরাও অন্যের দেওয়া ফল খেতে পারেন, বনবাসকালে রাম কয়েকবার মুনিঋষির আতিথ্য নিয়েওছেন । গুহক চন্ডাল, তাই তার কাছে শুধু পশুর খাদ্যই গ্রহণ করলেন।

অন্ধমুনি বৈশ্য, তাঁর স্ত্রী শূদ্রা (২/৫৭/৬৩) । তিনি নিজেকে 'বানপ্রস্থী' বলছেন কী করে ? তাহলে 'শম্বুকের সাধনাও তো অশাস্ত্রীয় হয় না ? এই শম্বুককে রাম বধ করেছেন এবং ব্রাহ্মণের অকাল মৃত পুত্রকে বাঁচাতে । তাহলে প্রাণের মূল্য রাম রাজত্বে বর্ণগতভাবে আপেক্ষিক, ব্রাহ্মণ-পুত্রের প্রাণ শূদ্রের প্রাণের চেয়ে দামি ? এটা মেনে নেওয়া হয়েছে সমস্ত প্রক্ষিপ্ত অংশে । রামরাজ্যে চন্ডালের সঙ্গে বন্ধুত্ব শুধু কথায় ?যে ফল জল ব্রাহ্মণদের কাছে নেওয়া যায় তা চন্ডাল বন্ধুর কাছে নেওয়া যায় না ? শূদ্র শম্বুক তপস্বী, কৃচ্ছসাধনে রত কিন্তু সাধারণ এক ব্রাহ্মণ বালকের তুলনায় তার প্রাণের মূল্য কিছু নেই ।

বালীকে বধ করা, শম্বুককে হত্যা করা ছাড়াও যেটি আমাদের বেশি ভাবায় তা হলো সীতা প্রত্যাখ্যান । সুন্দরকান্ডে সীতাহরণের পরে রামের যে বিলাপ তার ভাব সম্পূর্ণতই বিরহার্ত প্রেমিকের, কিন্তু সে কি শুধু অলঙ্কারিক বিরহ ? শুধু সীতাসম্ভোগ-বঞ্চিতের বিলাপ ? নতুবা দীর্ঘ অদর্শনের পরে রামের 'হৃদয়ান্তর্গতভাব' এমন হলো কেন যে সীতাকে দেখা মাত্রই তাঁর দুই চক্ষু পীড়িত বোধ করল এবং রাজনন্দিনী রাজকুলবধু সীতাকে শিবিকা থেকে নেমে হেঁটে আসবার হুকুম দিলেন, সীতা আসামাত্রই বললেন, 'গচ্ছ বৈদেহি' তোমার জন্য যুদ্ধ করিনি, করেছি ইক্ষবাকু বংশের গৌরব রক্ষার জন্য ? কোথায় ছিল সে ইক্ষবাকু কুলের গর্ব যখন লঙ্কায় প্রকাশ্য সভায় অপ্রমাণিত, অসত্য আশংকায় রাজকুলবধূকে কটু কথা বলেছিলেন ? কোথায় ছিল সে কুলগর্ব যখন দেবতাদের সাক্ষ্য, ঋষি বাল্মীকির শপথ সব অগ্রাহ্য করে পুত্রদের, প্রজাদের, অতিথিদের সামনে ইক্ষবাকু কুলবধূ সীতাকে আবার অগ্নিপরীক্ষা দিতে বললেন ? কোথায় রইল সে গর্ব যখন দেবী বসুমতী বারংবার সন্দেহে পীড়িত, লাঞ্ছিত, অপমানিত কন্যাকে কোলে নিয়ে অন্তর্ধান করলেন ? কে অপরাধী প্রমাণিত হলো ? অকারণ সন্দেহ এবং তার বশে দণ্ডদানের অপরাধে কলঙ্কিত হলেন না, ইক্ষবাকু-কুলতিলক রামচন্দ্র ? সীতা লক্ষ্মণকে দিয়ে বলে পাঠিয়েছিলেন। 'রামকে বোলো, আমাকে চিরদিনই সম্পূর্ণ নির্দোষ জেনে, রামের হিতব্রতিনী জেনে, শুধু লোকাপবাদের আতঙ্কে ভয় পেয়ে ত্যাগ করলেন তিনি ।' এতে কি ইক্ষবাকু কুলের গৌরব বাড়ল ? গৌরব বাড়ল অন্যায় দণ্ডদাতা রাজার ? এ-ই রাম রাজ্যের নমুনা ?

========================================================================


কলিতে শূদ্র দ্বিজাতির প্রতিস্পর্ধী হয়ে উঠবে একথা রামায়ণ মহাভারত উভয় মহাকাব্যের ভার্গব প্রক্ষেপে অত্যন্ত স্পষ্ট । কাজেই এমন আদর্শ রাজার আকল্প নির্মান করতে হবে যিনি কঠোর হাতে প্রতিস্পর্ধী শূদ্রকে দমন করেন, বিনা দ্বিধায়, বিনা চিন্তায় । সেই আদর্শ রাজা রামচন্দ্র, যিনি শম্বুককে হত্যা করলেও দেবতারা পুষ্পবৃষ্টি করে বলেন - তুমি দেবতাদের কাজ করেছ । বর্ণগুলোর ক্রম যাতে নষ্ট না হয় সেটা দেখা রাজার কর্তব্য । রাম সেই আদর্শ রাজা, যাঁর এক খড়গাঘাতে প্রতিস্পর্ধী শূদ্র মরল এবং বর্ণশ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণের অকালমৃত পুত্রও বাঁচল । কলির আসন্ন সংক্রমণ থেকে যিনি প্রজাকুলকে বাঁচালেন, সমাজকে আশ্বস্ত এবং সুস্থির করলেন ।

পিতৃভক্ত, বন্ধু-বৎসল, প্রজাহিতৈষী, ভ্রাতৃ-বৎসল দেবদ্বিজে ভক্তিমান, সুবিচারক, যজ্ঞকারী - অতএব আদর্শ যুগোচিত নায়ক । শূদ্র যদি ত্রিবর্ণের সেবা ছাড়া অন্য কিছুর আকাঙ্ক্ষা করে তবে বর্ণ-ধর্মরক্ষাকারী রাজা তো তাকে মেরে ফেলবেনই । স্ত্রী যদি অনিচ্ছাতেও পর-পুরুষের দ্বারা স্পৃষ্ট বা অপহৃত হয় - তবে যতই সচ্চরিত্রা হোন না তিনি, অগ্নিপরীক্ষা, নির্বাসন, পুনর্বার পরীক্ষা এইসব অবমাননা তাঁকে নির্বিকার চিত্তে মেনে নিতেই হবে । সমাজ কখনোই নারীকে ব্যক্তি বল স্বীকার করেনি, ভোগ্যবস্তু পণ্যদ্রব্য এইসব আখ্যা দিয়েছে । .... সীতার সচ্চরিত্রা নিঃসংশয়ে প্রমাণিত হবার পরও তাঁর গর্ভজাত সন্তানদের ইক্ষবাকু কুলের রাজসিংহাসনে অধিকার দেওয়া গেল না । প্রজারা নিশ্চয়ই পুলকিত হলো, আদর্শ রাজা রাজকুল-মর্যাদায় এতটুকু কলুষের বা তার সন্দেহেরও স্পর্শ লাগতে দিলেন না ।

এই যে নতুন আদর্শের প্রজাপালক রাজার নির্মাণ হলো, ইনি কিন্তু মহাকাব্যের নায়ক নন । সে নায়ক ক্ষত্রিয় যোদ্ধা বীর, আদর্শ রাজা হওয়া তাঁর কাছে প্রতীক্ষিত ছিল না । ক্ষত্রিয় নায়কের অঙ্গীকার ও কর্তব্য শেষ হয়েছে যুদ্ধ-জয়ে রাবণ-বধে । তারপর শুরু হলো মহাকাব্যটি ঢেলে সাজানো, আদিকান্ডে প্রথমার্ধে ও উত্তরাকান্ডে এঁর নবকলেবর রূপায়ণ ঘটল । এখন ইনি বর্ণধর্মের পরিপালক রাজা । শূদ্র ও নারীর কোনোরকম স্বাধীনতা, স্পর্ধা বা অধিকার স্বীকার করলে পাছে কলির স্পর্শদোষ ঘটে রাজ্যে, তাই ইনি সমাজের স্থিতবস্থা রক্ষা করেছেন অতন্দ্রভাবে । এর কিছু মূল্য দিতে হয়েছে তাঁকে, এক-পত্নীক রাজা সীতাকে হারালেন । সমাজে নারীর সতীত্ব শুচিতা নিয়ে যে নতুন নিরিখ তৈরি হয়েছে তার কাছে বলি দিতে হলো আপন দাম্পত্য-সুখ । কিন্তু এর মূল্য দিতে তাঁর বিশেষ বাজেনি, কারণ সীতাকে যখন তিনি প্রথম কঠিন কথাগুলো বলেন লঙ্কায়, তখন তা তাঁর হৃদয়ান্তর্গত ভাব । অর্থাৎ, সমাজের নির্মম নির্দেশ তিনি নিজ অন্তরে স্বীকার করে নিয়েছিলেন বলেই পারলেন ওই কথাগুলি বলতে । এইখানে মহাকাব্যের পরাজয় ঘটল শাস্ত্রকারদের কাছে ।

আজ যখন 'রামরাজ্য' সম্বন্ধে একটা স্বপ্নকে পুনর্বার কৃত্রিমভাবে সৃষ্টি করার একটা উগ্র চেষ্টা হচ্ছে এ দেশের লোকমানসে, তখন যেন আমরা নিজেদের প্রশ্ন করি : নারী শূদ্রের ওপর অত্যাচার যে তন্ত্রে অপরিহার্যভাবে গৃহীত, যেখানে ধর্মাকাঙ্ক্ষী শূদ্র ব্রাহ্মণ-পুত্রের জন্য প্রাণ দিতে বাধ্য হয়, নিষ্পাপ অন্তঃসত্ত্বা নারী অকারণে যেতে বাধ্য হয় নির্বাসনে, দেওরালা-আড়ওয়ালের পরও আমরা কি সেই রাজতন্ত্রই চাই ? এরই নায়ক কি 'মর্যাদা পুরুষোত্তম' ? অর্থাৎ পুরুষের সর্বোত্তম আদর্শ অসহায়কে বিপন্নকে ও নারীকে রক্ষা করাই তো এতদিন আদর্শ পুরুষদের অবশ্য করণীয় ছিল, তাকে বর্জন করে যে রাজতন্ত্র, তা কি সাধারণ মানুষের পক্ষে চূড়ান্ত অভিশাপ হয়ে উঠবে না ? তাকে ঠেকানোই কি আজ আমাদের প্রধান কর্তব্য নয় ?

Sunday, 15 May 2016

বামফ্রন্ট সরকার ৩৪ বছরের ইতিহাস সংকলন

বামফ্রন্ট সাফল্যকে অনুধাবন করতে ব্যাপক তথ্যাবলীর চেয়ে জীবনের অভিজ্ঞতা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ । কিন্তু কোন মানুষই জীবনের সমস্ত ক্ষেত্রে কখনো বিচরণ করতে পারেন না, তাই কেবলমাত্র ব্যক্তিজীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে ব্যাপকতম সত্যকে স্পর্শ করা সম্ভব নয় । তবে সমাজজীবনের বৃহত্তর অংশগুলির জন্য কোন ইতিবাচক কাজ হলে তার পরোক্ষ প্রভাব সমাজের সর্বত্রই ছড়িয়ে পড়ে । পশ্চিমবাংলায় সে অনুভব এত প্রত্যক্ষ ও স্পষ্ট যে, অজস্র মিথ্যা প্রচারেও সেগুলিকে নিষ্প্রভ করা যায়নি । কেননা এখানে উন্নয়নের সুফলে উপকৃত সর্বজনীন মানুষ । তবে ভিন্ন একটু মাধ্যম ও মাত্রা রয়েছে যার নিরিখে অনেক সময়ই সত্যকে চিন্হিত করা যায় । তা হলো বিবেচ্য বিষয় প্রসঙ্গে তৃতীয় কোন নিরপেক্ষ অভিজ্ঞতা ও অভিমত । তৃতীয় পক্ষ অর্থে তেমন অংশের মানুষ বা প্রতিষ্ঠান যে বা যারা ঘটনাবলীর দাতা ও গ্রহীতা না, দূরের অবলোকনকারী বা সমীক্ষক । পশ্চিমবাংলায় বামফ্রন্ট সরকারের সাফল্য উপলব্ধিতে সংক্ষেপে এমন নিরিখ কিছুটা লক্ষ্য করা যাক ----

১) সাধারণ মানুষের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ক্ষেত্রে ও রাজ্যের সাফল্য সমগ্র দেশ তথা বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে । বিশেষ করে দারিদ্র দূরীকরণে এ রাজ্যের অভাবনীয় সাফল্য আন্তর্জাতিক মঞ্চে বহুল আলোচিত বিষয় । রাষ্ট্রসংঘের দারিদ্রতা সম্পর্কিত প্রতিবেদনে পশ্চিমবঙ্গের সাফল্য প্রশংসিত হয়েছে । রাষ্ট্রসংঘ পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রশংসা করেই ক্ষান্ত হয়নি অন্যদের অনুরূপ পথে চলার পরামর্শ দিয়েছে ।

২) ২০০০ সালের ৩১শে জানুয়ারি প্রকাশিত বিশ্বব্যাঙ্কের "ভারত : দারিদ্র্য দূরীকরণ, উন্নয়ন, উন্নয়ন ত্বরান্বিতকরণ" রিপোর্টে ভারতের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে সবচেয়ে দ্রুততার সঙ্গে দারিদ্র প্রমশনের ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে এবং এর কারণও চিন্হিত করা হয়েছে । বলা হয়েছে পশ্চিমবাংলার ক্ষেত্রে এই সময়ে ভূমিসংস্কার ও উচ্চহারে কৃষি উত্পাদন বৃদ্ধি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় । এরই পাশাপাশি রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিষেবা সম্পর্কে রিপোর্টে মন্তব্য করা হয়, "বিকেন্দ্রীকরণের চেষ্টা রাষ্ট্রায়ত্ত স্বাস্থ্য পরিষেবার বিশ্বাসযোগ্যতা কয়েকটি রাজ্যে বাড়িয়েছে - উদাহরণ পশ্চিমবঙ্গ ও কেরালা" ।

৩) একদা ভারতের যোজনা কমিশনের অন্যতম সদস্য মন্টেক সিং আলুওয়ালিয়া ন্যাশনাল কাউন্সিল অব অ্যাপ্লায়েড ইকনেমিক রিসার্চের সুবর্ণজয়ন্তী বক্তৃতায় দেশের প্রধান ১৪ টি রাজ্যের (যেখানে ৯৫ শতাংশ মানুষ বাস করেন) উন্নয়নের তুলনামূলক ব্যাখ্যা করেন । সেখানে তুলে ধরা হয়েছে "১৯৮০-৮১ সাল থেকে ১৯৯০-৯১ সাল (৮০-র দশক) এবং ১৯৯০-৯১ সাল থেকে ১৯৯৭-৯৮ সালের (৯০-এর দশক) মধ্যে ১৪ টি রাজ্যের উন্নয়নমূলক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে । ঐ রিপোর্ট থেকে দেখা গেছে ৮০-র দশকে মোট আভ্যন্তরীণ উত্পাদন বৃদ্ধির হারের দিক থেকে পশ্চিমবঙ্গের স্থান ছিল দশম । ৯০-এর দশকে পাঞ্জাব, হরিয়ানা, কর্নাটক, তামিলনাডু, অন্ধ্রপ্রদেশ, উত্তর প্রদেশ এবং রাজস্থানকে অতিক্রম করে পশ্চিমবঙ্গ তৃতীয় স্থানে উঠে এসেছে । মহারাষ্ট্র ও গুজরাটের পরই পশ্চিমবঙ্গের স্থান । মাথাপিছু রাজ্যের মোট আভ্যন্তরীণ উত্পাদন বৃদ্ধির দিক থেকে ৮০-এর দশকে পশ্চিমবঙ্গের স্থান ছিল একাদশ । ৯০-এর দশকে উঠে এসেছে তৃতীয় স্থানে, মহারাষ্ট্র ও গুজরাটের পরেই ।

৪) হল্যান্ডের আমস্টারডাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ জি কে লিটেন এক দীর্ঘ গবেষণামূলক প্রবন্ধে লিখেছেন "অনেক পর্যবেক্ষকের কাছে এটা বিস্ময়কর যে, পশ্চিমবঙ্গে কমিউনিস্ট প্রধান বামফ্রন্ট সরকার এখন প্রায় দুই দশক হলো ক্ষমতায় রয়েছে । এই সরকার অনেকগুলি জাতীয়, প্রাদেশিক ও স্থানীয় স্তরের নির্বাচনের পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়েছে । ভারতীয় রাজনীতির ক্রমবর্ধমান ঘূর্ণাবর্তের মধ্যেও তা অবিচল রয়েছে । অবজ্ঞামূলক অস্বীকৃতি এবং নিঃশর্ত প্রশস্তি, এই দুই চরমাবস্থা কাটিয়ে একজন নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক সরাসরি স্বীকার করে নিতে পারেন যে, পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েত ব্যবস্থা ভালই কাজ করেছে এবং সেটাই হলো তার সাফল্যের উত্সস্বরূপ"।

৫) দেশের অন্যতম বনিকসভা - অ্যাসোসিয়েটেড চেম্বার অব কমার্স বিভিন্ন রাজ্যের উত্পাদন বৃদ্ধির হার সম্পর্কে একটি সমীক্ষা রিপোর্ট প্রকাশ করেছে । তাতে ৮০-র দশক এবং ১৯৯১ থেকে ১৯৯৮ সালের মধ্যে বিভিন্ন রাজ্যের অভ্যন্তরীণ উত্পাদন বৃদ্ধির হার তুলনামূলকভাবে তুলে ধরা হয়েছে । তাতে দেখা গেছে আলোচ্য সময়ে গড় উত্পাদন বৃদ্ধির হার বিহারে ১.৭৯ শতাংশ, পাঞ্জাবে ০.৬৯ শতাংশ, রাজস্থানে ০.৬ শতাংশ কমেছে । এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম পশ্চিমবঙ্গ । ৮০-র দশকের তুলনায় ৯০-র দশকে (১৯৯১-১৯৯৮) পশ্চিমবঙ্গে উত্পাদন বৃদ্ধির হার ৪.৭১ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৬.৯১ শতাংশ হয়েছে ।

৬) রাষ্ট্রসংঘের অ্যাটাকিং পর্ভাটি রিপোর্ট (২০০০-০১) পশ্চিমবঙ্গের বর্গা অপারেশন-এর প্রশংসা করা হয়েছে ।

৭) পশ্চিমবঙ্গের ত্রিস্তর পঞ্চায়েত ব্যবস্থা সারা দেশের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে । শ্রেণী দৃষ্টিভঙ্গির দ্বারা পরিচালিত বিকেন্দ্রীকৃত ব্যবস্থার প্রসারের এবং কর্মসূচির সুষ্ঠ রূপায়ণের ফলে কমেছে গ্রামীণ দারিদ্রতা । বিশ্বব্যাঙ্ক পশ্চিমবঙ্গের ভূমিকাকে প্রশংসা করে পশ্চিমবঙ্গকে অভিহিত করেছিল "leader state" হিসাবে ।

৮) কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অরুণ শৌরী কর্তিক প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায় যে, ১৯৯৩-৯৪ সালের মধ্যে অর্থনৈতিক বিকাশের হার পশ্চিমবঙ্গে সর্বাধিক । আলোচ্য সময়ে অর্থনৈতিক বিকাশের হার কমেছে অন্ধ্রপ্রদেশে ৮৩ শতাংশ, দিল্লিতে ৪০.২ শতাংশ, পাঞ্জাবে ৩৫ শতাংশ এবং উত্তর প্রদেশে ৪ শতাংশ । আর বেড়েছে ওড়িশায় ১.০২ শতাংশ, মধ্যপ্রদেশে ৫.৫৮ শতাংশ,বিহারে ১৮ শতাংশ, মহারাষ্ট্রে ২২ শতাংশ, রাজস্থানে ৫০ শতাংশ, কর্নাটকে ৮৫ শতাংশ, তামিলনাড়ুতে ৮৮ শতাংশ, ত্রিপুরায় ১০১ শতাংশ, গুজরাটে ১২১ শতাংশ এবং কেরালায় ১৪০ শতাংশ বেড়েছে । পশ্চিমবঙ্গে বেড়েছে সর্বাধিক হারে ১৮০ শতাংশ ।

৯) পশ্চিমবঙ্গের ত্রিস্তর পঞ্চায়েত ব্যবস্থার সাফল্য প্রসঙ্গে ভূয়শী প্রশংসা করেছেন বিশ্ববিখ্যাত পন্ডিত, বিশেষজ্ঞ, গবেষক নোয়াম চমস্কি ।

১০) পশ্চিমবঙ্গের সাক্ষরতার কর্মসূচীর বিপুল সাফল্যের জন্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসাবে ইউনেস্কো পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে পুরস্কৃত করেছে ।

১১) ১৯৮৯ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত পূর্বাঞ্চল ও উত্তর পূর্বাঞ্চলের সমস্ত রাজ্যগুলির পঞ্চায়েতরাজ সম্মেলনের উদ্বোধন করতে এসে তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত রাজীব গান্ধী বামফ্রন্ট সরকারের আমলে পশ্চিমবঙ্গে পঞ্চায়েত ব্যবস্থা এবং বিকেন্দ্রীকরণের উদ্যোগকে প্রশংসা করে তাকে সমগ্র দেশের 'মডেল' হিসাবেই চিন্হিত করেছিলেন ।

১২) সামাজিক বনসৃজনের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকে যুক্ত করে বনরক্ষার সাফল্যের জন্য বামফ্রন্ট সরকার অর্জন করে আন্তর্জাতিক সন্মান 'পল গেটি পদক' ।

১৩) পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা ব্যবস্থা প্রসঙ্গে প্রতীচী ট্রাস্ট ২০১০ সালে একটি সমীক্ষা করে । ঐ সমীক্ষার ভিত্তিতে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক অমর্ত্য সেন যে মন্তব্য করেছেন তাহা এখানে উল্লেখ করা হলো : প্রথমত --- "শুধু ছাত্র ভর্তির সংখ্যাই বেশী নয়, ছাত্রদের উপস্থিতির গড়ও উল্লেখযোগ্য । (প্রাথমিক স্কুলে ও শিশু শিক্ষা কেন্দ্রে যথাক্রমে ৫৮ শতাংশ এবং ৬৪ শতাংশ থেকে বেড়ে উভয় ক্ষেত্রেই ৭৫ শতাংশ হয়েছে)" । দ্বিতীয়ত --- "শিক্ষক-শিক্ষিকাদের অবদান সম্পর্কে অবদান সম্পর্কে পিতামাতাদের সন্তুষ্টির মাত্রা বেড়েছে । (প্রাথমিক স্কুলের ক্ষেত্রে ৫২ শতাংশ থেকে ৬৪ শতাংশ এবং শিশু শিক্ষা কেন্দ্রের ক্ষেত্রে ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ) । যদিও সামগ্রিক সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য এখনও চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে । সন্তানদের উন্নতির ক্ষেত্রেও পিতামাতারা আগের থেকে অনেক বেশী সন্তুষ্ট । (প্রাথমিক স্কুলে ৪২ শতাংশ থেকে ৭১ শতাংশ, শিশু শিক্ষা কেন্দ্রের ক্ষেত্রে ৪৯ শতাংশ থেকে ৭৩ শতাংশ)" । তৃতীয়ত --- "২০০১-০২ সালে ছাত্ররা কে কতটা শিখেছে, তার উপর সমীক্ষা চালাতে গিয়ে আমরা প্রতিটি ছাত্রের আলাদা আলাদা করে পরীক্ষা নিয়েছিলাম । আমরা দেখেছিলাম এমনকি তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্রদের ৩০ শতাংশ নিজের নাম লিখতে পারে না ।এতে আমরা খুবই আশাহত হয়েছিলাম । কিন্তু এখন এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে । বর্তমানে এই সংখ্যা ৩০ শতাংশ থেকে কমে হয়েছে ৫ শতাংশ । (যদিও সংখ্যাটি শূন্য হওয়াটাই কাম্য, কিন্তু এই সংখ্যাটি হ্রাস পাওয়াও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়)" । চতুর্থত --- "এখন বেশিরভাগ প্রাথমিক স্কুল ও শিশু শিক্ষা কেন্দ্রে মিড ডে মিল দেওয়া হয় । স্কুলগুলিতে শিক্ষা ও ছাত্রদের পুষ্টি বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও যে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, তা-ও স্পষ্ট । স্কুলে মিল দেওয়ার জন্য অবশ্যই ছাত্রদের উপস্থিতির হার বৃদ্ধি পেয়েছে । আবার শিক্ষকদের সংগঠনগুলিও শিক্ষক-শিক্ষিকাদের অনুপস্থিতি কমাতে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেছে । এই উদ্যোগের ফলেও বহু অঞ্চলে শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি ঘটেছে" । পঞ্চমত ---"শিক্ষকদের সঙ্গে বাবা-মায়েদের সাক্ষাত এখন অনেক বেশী বাস্তবায়িত হচ্ছে । বিশেষ করে মা ও শিক্ষক-শিক্ষিকাদের নিয়ে কমিটি তৈরী হচ্ছে । তা সত্ত্বেও এঁদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের উন্নতির ব্যাপারে আমাদের নির্দিষ্ট কিছু পরামর্শ আছে" । "স্কুল শিক্ষার ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ঘটেছে " ।

১৪) প্রবীণ চলচ্চিত্রকার মৃণাল সেন বলেছেন - "প্রায় ৩৫ বছর ধরে আমি এই বামফ্রন্টকে দেখছি, দেখে আসছি ১৯৭৭ সাল থেকে কিভাবে এই দলটি নিয়মিত পরিবর্তনের ভিতর দিয়ে নিজেদের গড়ে তুলেছে । প্রত্যাবর্তন কিন্তু পরিবর্তনের ভিতর দিয়েই হয় । সহজ স্বাভাবিক স্বচ্ছন্দ জীবন পেয়েছে সাধারণ মানুষ এই বামফ্রন্টের আমলেই । নতুন রাস্তাঘাট, ব্রিজ থেকে ছোট-বড় অনেক কাজই করেছে এই সরকার । সেই সঙ্গে আমি তো অবশ্যই বলব যে, শিল্পী-সাহিত্যিকতা সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা পেয়েছেন এই বামফ্রন্ট সরকারের আমলেই । সিনেমার কর্মী হিসাবে আমি যেমন নন্দন-এর কথা উল্লেখ না করে পারছি না । আমার বিদেশী বন্ধুবান্ধবের যাঁরাই এসে দেখেছেন, বলেছেন, আন্তর্জাতিক মানের সিনেমা কমপ্লেক্স । রক্ষনাবেক্ষণ নিয়ে সমস্যা তো থাকতেই পারে । নন্দন তৈরি হয়েছিল জ্যোতি বসুর আমলে, তারপর বিশেষ করে বুদ্ধদেব যথেষ্ট মাথা ঘামিয়েছেন নন্দন-এর সূত্রে সিনেমার উন্নত সংস্কৃতি এ-রাজ্যে তৈরি করতে । সব পরিকল্পনা হয়তো বাস্তবে রূপায়িত হয়নি । তা নিয়ে আমার একটু অস্বস্তি ছিল, বেশ ছিল । বলে রাখা ভাল, আমি কিন্তু কোন বামপন্থী দলের সভ্য নই । কমিউনিস্ট পার্টি যখন অবিভক্ত চিলম তখনও আমি তাদের মেম্বার বা কার্ডহোল্ডার --- কিছুই ছিলাম না । তাছাড়া এই বামফ্রন্টের দলীয় মত কোন ভাবেই আমার উপর বিস্তার করে না । আরও স্পষ্ট করে বলা ভাল, আমার ভাবনাচিন্তা কাজকর্মের ব্যাপারে আমি কখনই তাদের মতামতের অপেক্ষায় থাকি না " ।

Thursday, 12 May 2016

সিঙ্গুর - না বলা কথা ।

আজ ১২ই মে ২০১৬ "এই সময়" পত্রিকায় "সিপিএম-কে বামপন্থার পাঠ দিল সুপ্রিম কোর্ট" শীর্ষক খবরটা পড়তে পড়তে বহুদিনের না বলা কিছু কথা বলতে ইচ্ছে হলো । ইতিমধ্যেই ইচ্ছুক অনিচ্ছুক নিয়ে রাজ্য রাজনীতি তোলপাড় - ৩৫ বছর দীর্ঘ সময়কালব্যাপী বামফ্রন্ট সরকার পতন -  বামফ্রন্টের নিজস্ব মূল্যায়নেও সিঙ্গুর আন্দোলন সরকার পতনের একটা প্রধান কারণ হিসাবে উঠে এসেছে - তত্কালীন বিরোধী দল সরকারে এসেই সিঙ্গুর সমস্যার সমাধান করবে বলে কথা দিয়েও কথা রাখেনি - সিঙ্গুরের জমি অধিগ্রহণ সমস্যা নিয়ে টাটা ও বর্তমান সরকার সুপ্রিম কোর্টে - এসবই আমাদের জানা । "এই সময়" পত্রিকা বলছে  তত্কালীন বিরোধী নেত্রী এটা বলেছিলেন, ওটা বলেছিলেন - উনি কি বলেছিলেন বা কি করতে চেয়েছিলেন এটা নিয়ে এখন আর কোনো প্রশ্ন থাকারই কথা নয় - তত্কালীন বিরোধী নেত্রী ও তার দলের অবস্থান নিয়ে কোনো আলোচনা করতেও চাই না - তাদের ঐকান্তিক কৃষক প্রীতি এই ৫ বছরে আমাদের বারবার দৃষ্টিগোচর হয়েছে ।

আমার প্রশ্নটা অন্য জায়গাতে - গণতন্ত্রে একটা মানুষের অধিকার নিয়ে - টাটা একটা নির্দিষ্ট জায়গাতে কারখানা বানাতে চেয়েছিল - কিন্তু কিছু কৃষক বা ক্ষুদ্র জমির মালিক তাদের স্বল্প চাষের জমি বিক্রি করতে চাননি - জমির পরিমান ৪০০ একর নাকি ৪০ একর - সেটাও প্রশ্ন নয় । প্রশ্নটা হলো - গণতন্ত্রে কোটিপতি ব্যবসায়ী হিসাবে টাটার যেমন একটা চাহিদা আছে - মালিকপক্ষ হিসাবে তার যেমন মত প্রকাশের স্বাধীনতা আছে, তেমনই ৫০০০ টাকার জমিতে লাঙ্গল টানা একজন প্রান্তিক কৃষকেরও তার নিজস্ব মত প্রকাশের স্বাধীনতা আছে - গণতান্ত্রিক কাঠামোতে সেটাও ফেলনা নয় । অনিচ্ছুক কৃষকদের সাথে বসে আলোচনার মাধ্যমে অধিগ্রহণ প্রক্রিয়াটার জটিলতাটাকে কাটিয়ে ওঠা যেত না কি ? মানছি, বিরোধী দল রাজ্যের উন্নয়নের প্রশ্নটাকে সরিয়ে কতিপয় অনিচ্ছুক জমির মালিক্গুলোকে সামনে রেখে শুধুই রাজনীতি করতে চেয়েছিলেন - কিন্তু বামফ্রন্ট শাসিত রাজ্যে প্রান্তিক কৃষকদের অধিকার ক্ষুন্ন হওয়া কি কোনোভাবেই সমর্থন যোগ্য ?

আমি নিজে একজন কৃষক পরিবারের সদস্য হয়ে মনে করি - আমার ছোট জমিতে আমি চাষ করবো, আমি আমার জমি কোনো কারখানার মালিককে বিক্রি করবো না - আমি আমার জমি বিক্রি করে, জীবিকার সন্ধানে একটা বেসরকারী কারখানায় দারোয়ানের কাজ করবো না - আমাদের দেশের গণতন্ত্র আমাকে আমার নিজের মত প্রকাশের স্বাধীনতা দেয় । আর সিঙ্গুর কোনো জনস্বার্থে অধিগ্রহণ নয় - সিঙ্গুরের জমি অধিগ্রহণ করে কোনো নতুন রাস্তা হতো না, কোনো নতুন রেলপথ গড়ে উঠত না, কোনো নতুন সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রও গড়ে উঠত না - কোন দিক থেকে একটা কারখানার মালিকের জন্য জমি অধিগ্রহণকে জনস্বার্থে অধিগ্রহণ বলা যায় ? আমিও জানি রাজ্যের উন্নয়নের স্বার্থে, ভবিষ্যত প্রজন্মের স্বার্থে কল কারখানা দরকার - কল কারখানার জন্য জমিও চাই - কিন্তু কোনভাবেই কি বহুফসলি জমি অধিগ্রহণ এড়ানো যেত না ?

বর্তমান সরকারের জমি অধিগ্রহণ নীতি অনুযায়ী সরকার শিল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ করে দেবে না - মালিকপক্ষকে নিজের জমির ব্যবস্থা নিজেকেই করে নিতে হবে । একটা এলাকাতে ২০০০ জনের জমি থাকলে, মালিকপক্ষকে ২০০০ মানুষের সাথে দরাদরি করতে হবে - এটা অবাস্তব -  প্রধানত এই জমি অধিগ্রহণ নীতির কারণেই বিগত ৫ বছরে পশ্চিমবঙ্গ একটাও বড় শিল্পের মুখ দেখেনি । যদি মালিকপক্ষ এই জমি অধিগ্রহণ নীতি মেনেও নেন - তাহলে শিল্পপতি আর ক্ষুদ্র জমির মালিকের মধ্যে ঢুকবে জমির মাফিয়া, সিন্ডিকেট - আখেরে প্রতারিত হবেন প্রান্তিক কৃষকেরা । তাই প্রান্তিক কৃষকদের স্বার্থরক্ষার প্রশ্নে রাজ্য সরকারেরই মধ্যস্থতা বাঞ্চনীয় । তত্কালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের জমি অধিগ্রহণ পদ্ধতিতে ভুল থাকতে পারে - কিন্তু তাঁর ও বামফ্রন্ট সরকারের সদিচ্ছা সংশয়াতীত - কিন্তু কোথাও যেন একটা ভুল হয়ে গেল - যার মাসুল আজও দিতে হচ্ছে আমাদের সবাইকে । পড়াশোনা শেষ করেই অন্য রাজ্যে পাড়ি দাও - বাবা-মা, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব ছেড়ে এক নিঃসঙ্গ জীবনকে নিয়ে চলতে হচ্ছে আমাদের যুবসমাজকে - সেটা অবশ্যই কাম্য নয়  । সিঙ্গুর প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে পশ্চিমবঙ্গ শিল্পায়নে একটা জোয়ার আসতো - যা সকলের মত আমারও স্বপ্ন । পশ্চিমবঙ্গের মত কৃষিনির্ভরশীল রাজ্যে যেখানে ক্ষুদ্র জমির মালিকানা বেশি - সেখানে শিল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়াটা অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় অনেকাংশেই জটিল । কিন্তু বামপন্থী শাসিত একটি রাজ্যে সামান্য একটি কৃষকেরও স্বার্থ ক্ষুন্ন হওয়াটা কি বাঞ্চনীয় ?

প্রক্রিয়াগতভাবে অবশ্যই ভুল হয়েছে কিন্তু সমস্যা সমাধানে বামফ্রন্ট সরকারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ছিল - কিছু বাধাকে সেসময় প্রতিহত করা যায়নি  - কিন্তু থেমে যাওয়া যাবে না - এই ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েই ভবিষ্যতের দিকে এগোতে হবে । ২০১৬ বিধানসভা ভোটে জয়ী হলে বামফ্রন্ট ও ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক জোট অবশ্যই শিল্পের প্রতি মনোযোগী হবে - বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে এটাই জনগনের প্রত্যাশা । আশা রাখি - নতুন সরকার জমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত বিষয়ে অনেক বেশি সংবেদনশীল হবে, কোনভাবেই কৃষকের স্বার্থ ক্ষুন্ন হবে না আর সিঙ্গুরবাসীও  আলাপ আলোচনার মাধ্যমে এই সমস্যা সমাধানে উত্সাহী হবেন ।


ধীমান